Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    সরদার ফজলুল করিম এক পাতা গল্প669 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ১৯. জ্ঞানের চারটি স্তর

    অধ্যায় : ১৯ [৫১৪–৫৪১]

    জ্ঞানের চারটি স্তর

    দার্শনিকের উচ্চতর শিক্ষার যে-প্রসঙ্গ ষষ্ঠ পুস্তকের শেষের দিকে উপস্থাপিত হয়েছে তারই বিস্তারিত আলোচনা সমগ্র সপ্তম পুস্তক জুড়ে করা হয়েছে। এদিক দিয়ে সপ্তম পুস্তককে প্রধানত উচ্চতর দর্শন বা যথার্থ জ্ঞান কাকে বলে তার আলোচনার পুস্তক বলা চলে।

    জ্ঞানের প্রকৃতি কী, তার আলোচনা ষষ্ঠ পুস্তকের শেষে সক্রেটিস একটি রেখার অসম ভাগের মাধ্যমে উত্থাপন করেছেন। “এবার তুমি একটি রেখাকে কল্পনা করো। রেখাটিকে তুমি দুটি অসম ভাগে বিভক্ত করো। এর একটি ভাগকে আমরা বলব দৃশ্য জগতের সূচক এবং অপরটিকে বলব মনো-জগতের সূচক।” … এই দুটি ভাগেরও অপর দুটি উপবিভাগ আছে। এইভাবে সক্রেটিস জ্ঞানের চারটি স্তর চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এই চারটি স্তরকে যথাক্রমে জ্ঞান, বোধ, ধারণা এবং ভ্রম বলে ব্যাখ্যা করা হয়। এই আলোচনাটির জোর হচ্ছে এখানে যে, সকল ধারণাই জ্ঞান নয়। আমাদের প্রচলিত ‘জ্ঞানের’ অধিকাংশ হচ্ছে অলীক। দার্শনিকের সাধনা হবে মূল সত্যের জ্ঞান-লাভ করা। জ্ঞান ও ধারণার মধ্যকার পার্থক্য প্লেটো তাঁর বিখ্যাত ‘গুহার রূপকে’র মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। গুহার মধ্যে শৃঙ্খলিত বন্দিরা কেবল ছায়াকেই জানতে পারে, জ্ঞানকে নয়, সত্যকে নয়। সেই ছায়াকেই তারা জ্ঞান বলে মনে করে। কিন্তু যে-বন্দি মুক্ত হয়ে গুহার বাইরে সূর্যের আলোকে এসেছে সে যথার্থ জ্ঞানের সাক্ষাৎলাভ করে। কিন্তু সেই যথার্থ জ্ঞানের সাক্ষাৎ সরাসরি হতে পারে না। তার স্তর আছে। অন্ধকার হতে তীব্র আলোতে এসে প্রথমে সে অন্ধের মতো হয়ে যাবে। তার মনে হবে গুহাতেই সে ভালো ছিল। সেখানেই সে সত্যকে জেনেছে। কিন্তু চোখ যখন আলোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে তখন সে জ্ঞানের সাক্ষাৎলাভ করতে থাকবে এবং সত্য এবং গুহার ছায়ার পার্থক্য তখন সে উপলব্ধি করতে পারবে। সকল মানুষই এই সত্য জ্ঞান লাভ করতে পারে না। অধিকাংশ মানুষই হচ্ছে গুহার বন্দি। তারা ছায়াকেই সত্য মনে করে। এটা তাদের জ্ঞান নয়, এটা তাদের ধারণা। খুব অল্পসংখ্যকেরই গুহা থেকে মুক্তির সৌভাগ্য জোটে। কিন্তু সকলেরই কামনা হবে সেই মুক্তির। অন্ধকার থেকে আলোতে আসার। প্রতিবিম্বের বদলে প্রতিবিম্বের উৎসকে জানার। গণিত, সরল জ্যামিতি, ঘন জ্যামিতি, জ্যোতিষ, সঙ্গতি এবং দ্বান্দ্বিকতা বা উচ্চতর দর্শনের মাধ্যমেই মাত্র এই চরম জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। কাজেই দার্শনিক-শাসকের জন্য যে-শিক্ষা, তাতে উল্লিখিত জ্ঞানচর্চার ব্যবস্থা অবশ্যই রাখতে হবে। কিন্তু কারোর পক্ষে পরম সত্যের জ্ঞানলাভই যথেষ্ট নয়। কেবল জ্ঞানী হলেই চলবে না। তাকে দায়িত্বও পালন করতে হবে। গুহা থেকে মুক্তি পেয়ে সূর্যের আলোতে যদি সে আগমনের সৌভাগ্য লাভ করে থাকে, তবে তাকে আবার গুহার মধ্যে বন্দিদের কাছে ফিরে যেতে হবে। বন্দিদের আত্মাকেও আলোর দিকে ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা তাকে করতে হবে। অর্থাৎ জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য দার্শনিককে শাসক হতে হবে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে। কোনো শ্রেণীবিশেষের জন্য নয়, সকলের সুখের জন্য, মঙ্গলের জন্য তাকে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। “তাদের শুরু করতে হবে নগরীর অধিবাসী, যাদের বয়স দশ বৎসরের অধিক হয়েছে তাদের সকলকে নগরীর বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে।—অবশিষ্ট নিষ্কলঙ্ক শিশুদের শিক্ষিত করতে হবে রাষ্ট্রের আদর্শ, বিধিবিধান এবং অভ্যাসে।” রাষ্ট্রগঠন এবং পরিচালনার কর্তব্যপালন করে নিজেদের উত্তরপুরুষ সৃষ্টি করে দার্শনিক-শাসকগণ জীবনের শেষে পরলোকের শান্তির দ্বীপে যাত্রা করবে।

    প্লেটো শিক্ষার যে-ক্রম বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তার বিভিন্ন স্তরকে নিম্নোক্তভাবে সংক্ষেপে উল্লেখ করা চলে :

    ১. ১৮ বৎসর পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা। সাহিত্য, সঙ্গীত এবং প্রাথমিক গণিত হবে এই প্রাথমিক স্তরের পাঠ্য বিষয়। এই প্ৰাথমিক শিক্ষাকে কিশোরদের নিকট আনন্দময় করে তুলতে হবে। জবরদস্তি যত কম হয় তত উত্তম। কারণ “যে-জ্ঞানে জবরদস্তি সে-জ্ঞান মনের কোনো উন্নতিসাধন করতে পারে না। …তাই জ্ঞানদানে কোনো জবরদস্তি কোরো না। শৈশবের শিক্ষা আনন্দের বিষয় হোক। তা হলেই তুমি যার মধ্যে যে-স্বাভাবিক প্রবণতা আছে তাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে।” [৫৩৭]

    ২. ১৮ থেকে ২০ বৎসর : এ-পর্যায়ের প্রধান জোর হবে শরীরচর্চা এবং সামরিক কৌশলের গভীর প্রশিক্ষণ। ফলে এই সময়ে অপর কোনো বিষয় অধ্যয়নের অবকাশ থাকবে না।

    ৩. ২০ থেকে ৩০ বৎসর : প্রথম এবং দ্বিতীয় স্তর পর্যায়ক্রমে যারা উত্তীর্ণ হতে পেরেছে তাদের এই তৃতীয় স্তরে উচ্চতর গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতিষ, সঙ্গীত আত্যন্তিকভাবে শিক্ষাদান করা হবে। গণিত এবং বাস্তবের সম্পর্ক অনুধাবন করানো হবে এই পর্যায়ের শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য।

    ৪. ৩০ থেকে ৩৫ বৎসর : তৃতীয় পর্যায়কে যারা সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করতে পারবে, সংখ্যা তাদের যত অল্পই হোক, বাছাই-করা সেই কৃতী শিক্ষার্থীদের ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ—এই পাঁচ বছর একাগ্রভাবে উচ্চতর দর্শন অধ্যয়ন করতে হবে। উত্তম কাকে বলে তার অনুধাবন এবং সকল জ্ঞানের মধ্যকার ঐক্যসূত্রের উপলব্ধি হবে এই পর্যায়ের শিক্ষার লক্ষ্য। উচ্চতর দর্শনপাঠের একটা সময় আছে। তার পূর্বে দর্শনের সঙ্গে শিক্ষার্থীর পরিচয় ঘটলে মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলের আশঙ্কা অধিক। পরিপক্ক বয়স ব্যতীত দর্শনের গুরুত্ব উপলব্ধি করা শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব নয়।

    ৫. ৩৫ থেকে ৫০ বৎসর পর্যন্ত পূর্ববর্তী স্তরের সফল শিক্ষার্থীকে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ করে তোলা হবে। নিম্নতর রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপালনের মাধ্যমে তারা শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করবে।

    ৬. ৫০ বৎসর বয়সে পূর্ববর্তী স্তরসমূহের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হতে যারা সর্বোত্তম বলে বিবেচিত হয়েছে তারা এবার তাদের সমগ্র শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরম উত্তমের জ্ঞানলাভ করবে। পরম উত্তমের জ্ঞানই হচ্ছে শাসক হওয়ার একমাত্র শর্ত। এবার এই সর্বোত্তমগণ রাষ্ট্রশাসনের সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাদের একমাত্র চিন্তা হবে রাষ্ট্রের সুশাসন। উত্তমের অধ্যয়ন এবং রাষ্ট্রের সুশাসন—এই হবে সর্বোত্তমদের একমাত্র করণীয়।

    *

    আমি বললাম : এসো, এবার আমরা একটি রূপকের মাধ্যমে দেখি আমরা কতখানি জ্ঞানী এবং কতখানি অজ্ঞ। গ্লকন, কল্পনা করো, সমগ্র মনুষ্যজাতি মাটির নিচে একটা গুহার মধ্যে বাস করছে। পৃথিবীপৃষ্ঠের আলোর দিকে গুহার একটি মুখ আছে। মুখটি ভূপৃষ্ঠ থেকে গুহা পর্যন্ত দীর্ঘ। এই গুহার মধ্যে সব মানুষ তাদের শৈশবকাল থেকেই রয়েছে। তাদের পা এবং গলা শেকল দিয়ে আবদ্ধ। ডানে, বাঁয়ে কিংবা পেছনে মুখ ফেরাতে তারা অক্ষম। শেকল তাদের মাথার এরূপ সঞ্চালনকে আটকে রাখে। গুহার দেয়ালের দিকেই তাদের মুখ ঘোরানো। তাদের সম্মুখের দেয়ালকেই মাত্র তারা দেখতে পায়। এবার কল্পনা করো, তাদের পশ্চাতে মাটির উপরে গুহার বাইরে কিছুদূর আগুন জ্বলছে। বন্দি মানুষ এবং বাইরের আগুন—এ দুই-এর মধ্যভাগে রয়েছে উঁচু একটি পথ। তুমি খেয়াল করলে দেখতে পাবে এই পথ ধরে তৈরি হয়েছে একটি নিচু দেয়াল, একটি পর্দার মতো,—যেমন ছায়ানৃত্যের নৃত্যশিল্পীর সামনে থাকে, যে-পর্দার উপর শিল্পীরা তাদের পুতুলদের নাচ দেখায়। ছবিটি তুমি দেখতে পাচ্ছ গ্লকন?

    হ্যাঁ, আমি দেখছি।

    এবার তুমি খেয়াল করো। দেখবে নিচু দেয়ালটির পথ ধরে একদল লোক চলে যাচ্ছে। তাদের হাতে বিভিন্নরকম বস্তু আছে : পাথর, কাঠ কিংবা অন্যকিছুতে তৈরি নানা পাত্র, মূর্তি, পশুর প্রতিকৃতি। এরা কেউ-কেউ কথা বলছে। কেউ নীরবে অগ্রসর হচ্ছে। আর এই শোভাযাত্রার ছবিটি আগুনের আলোতে গুহার ভিতরে তার দেয়ালে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে।

    এ তো এক অদ্ভুত ছবি তৈরি করেছ, সক্রেটিস। তোমার বন্দিরাও অদ্ভুত ধরনের বন্দি।

    আমি বললাম : বন্দিরা আমাদেরই মতো। তাদের মুখ দেয়ালগাত্রে ফেরানো। আলোর প্রতিভাসে তারা কেবল তাদের কিংবা একে অপরের ছায়াই দেখতে পায়।

    একথা সত্য। তাদের মাথা যদি তারা আদৌ সঞ্চালন করতে না পারে তা হলে ছায়া বই অপর কিছু তারা কেমন করে দেখবে?

    বাইরে জনতার মিছিল যেসব দ্রব্য হাতে করে নিচ্ছে তারও ছায়াই মাত্র তারা দেখতে পাচ্ছে।

    হ্যাঁ, তা-ই হবে।

    এখন ধরো, বন্দিরা পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করছে। এই আলাপে তারা তাদের সম্মুখে দেয়ালের ছায়াকেই কি সত্য বস্তু বলে পরস্পরের নিকট উল্লেখ করবে না?

    অবশ্যই তারা তা-ই করবে।

    তা ছাড়া মনে করো, গুহার মধ্যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। তা হলে বাইরের মিছিলের যে-শব্দ গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হবে, সে-শব্দকে কি তারা তাদের সম্মুখের ছায়াদের উচ্চারিত শব্দ বলেই মনে করবে না?

    নিঃসন্দেহে।

    তা হলে তাদের কাছে সত্য হচ্ছে প্রতিকৃতির ছায়ামাত্র।

    অবশ্যই তা-ই।

    বেশ, এবার দ্যাখো, বন্দিরা যদি মুক্তি পায় এবং তাদের ভুল ভাঙে তা হলে কী ঘটে। মনে কর, এদের মধ্যে কেউ-একজন হঠাৎ মুক্তি পেয়ে উঠে দাঁড়াল এবং মুখ ঘুরিয়ে আলোর দিকে ছুটে গেল। এমন হলে প্রথমেই সে তীব্ৰ যন্ত্ৰণা বোধ করবে। আলোর ঝলক তার চোখকে ধাঁধিয়ে দেবে। যে-প্রতিকৃতির ছায়া সে গুহার দেয়ালে দেখে এসেছে তার যথার্থ আকারকে প্রথমে সে দেখতেই পাবে না। এবার মনে করো কেউ তাকে বলল, সে পূর্বে যা দেখেছিল তা ভ্রান্ত এবং এখন চোখের ধাঁধা কেটে যাবার পরে যা দেখছে তা-ই সত্য। এমন কথা বললে তার জবাব কী হবে? আরও মনে করা যাক তার প্রদর্শক তাকে তার সম্মুখের চলমান বস্তু সকলের নাম বলতে বলল। এ-প্রশ্নে সে নিশ্চয়ই বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। তার মনে হবে, যে-ছায়া সে পূর্বে দেখেছে সে-ছায়া বর্তমানের বস্তু থেকে অধিক সত্য।

    হ্যাঁ, তাকেই সে অধিকতর সত্য বলে মনে করবে।

    এবার সে যদি সোজা আলোর দিকে তাকায় তা হলে তার চোখে আলোর আঘাতে যে-যন্ত্রণা হবে তার ফলে মুখ ফিরিয়ে সে যে-দৃশ্য অধিক স্পষ্ট বোধ হয় তাকে সে দেখবে এবং আলোর ঝলকে প্রদর্শিত বস্তুর চেয়ে এই বস্তুকে অধিক সত্য বলে মনে করবে?

    হ্যাঁ, তা-ই করবে।

    ঠিক আছে। আর-একটু কল্পনা করো। ধরো, তাকে গুহার মধ্য থেকে জোর করে সেই অমসৃণ পথ দিয়ে উপরে এনে সূর্যের আলোতে ধরে রাখা হল। সূর্যের তীব্র আলোয় চোখে নিশ্চয়ই তার তীব্র জ্বালা হবে। এত আলোতে বাইরের জগতের কোনো বস্তুই সে দেখতে পাবে না।

    না, আলোর প্রথম আঘাতে সে কিছুই দেখতে পাবে না।

    তার অর্থ, তার চোখকে বাইরের দৃশ্যে অভ্যস্ত হতে হবে। গোড়াতে ছায়াগুলিকেই সে ভালো দেখবে। এবং শেষে বাইরের জগতের বস্তুকে দেখতে পাবে। সে এবার চাঁদের আলো, তারার ঝিকিমিকি এবং নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকাবে। দিনের সূর্যের আলোর চেয়ে রাত্রির খচিত আকাশের দিকে তাকাবে। দিনের সূর্যের আলোর চেয়ে রাত্রির আকাশ এবং তারার মালাকে সে ভালো দেখতে পাবে। ঠিক নয় কি?

    অবশ্যই।

    সবশেষে সে সূর্যের দিকেও তাকাতে পারবে। পানিতে তার প্রতিবিম্ব নয়, সূর্যের বাস্তব অস্তিত্বকে সে দেখতে পাবে। তার বিষয়ে সে এবার চিন্তা করবে।

    হ্যাঁ, এবার সে সূর্য সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে।

    এবার সে সিদ্ধান্ত করতে সক্ষম হবে, এই সূর্যের কারণেই ঋতুর বৈচিত্র্য, বৎসরের পরিক্রমা। সূর্যই হচ্ছে দৃশ্যজগতের সবকিছুর শাসক। সে এবং তার সঙ্গীরা যা-কিছু দেখতে অভ্যস্ত তার কারণ হচ্ছে সূর্য।

    গ্লকন বললেন : নিঃসন্দেহে। সে প্রথমে সূর্যকে দেখবে এবং পরে সূর্য সম্পর্কে এই সিদ্ধান্তে সে পৌঁছবে।

    এবার যদি সে গুহায় ফেলে-আসা তার সহবন্দিদের কথা ভাবে, গুহার ভেতরে যে-জ্ঞান তারা লাভ করত তাকে যদি সে স্মরণ করে তা হলে সে কি তার নিজের পরিবর্তনে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবে না এবং গুহার বন্দিদের জন্য করুণা বোধ করবে না?

    অবশ্যই, সে তাদের জন্য করুণা বোধ করবে।

    গুহার বন্দিদের মধ্যে যদি এই রেওয়াজ থেকে থাকে যে, তাদের দেয়ালগাত্রে কোন্ ছায়া আগে গেল, কোন্ ছায়া পরে গেল, কোন্ ছায়াগুলি পরস্পরসংলগ্ন সে-সম্পর্কে যে-বন্দির পর্যবেক্ষণক্ষমতা অধিক, যে ছায়াদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমানে পারদর্শী তাকে সম্মানিত এবং পুরস্কৃত করা হয়, তা হলে গ্লকন তুমি কি মনে কর, আমাদের এই মুক্তবন্দির মনে সেই সম্মান ও পুরস্কার হারাবার জন্য দুঃখ সঞ্চারিত হবে কিংবা গুহার পুরস্কৃত এবং সম্মানিত বন্দিদের জন্য সে ঈর্ষা বোধ করবে? না সে হোমারের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে উচ্চারণ করবে :

    “তার চেয়ে অধিক ভালো দরিদ্র প্রভুর দরিদ্র দাসের ভাগ্য।”

    এবং যা-কিছু সহ্য করার তা-ই সে করবে তবুও গুহার বন্দিদের ন্যায় আর সে চিন্তা করবে না, তাদের ন্যায় জীবন আর সে ধারণ করবে না?

    আমার তো মনে হয়, সে সহ্য করবে কিন্তু এইসব মিথ্যা ধারণা সে আর পোষণ করবে না এবং দুর্দশার জীবনযাপন করবে না।

    গ্লকন, এবার মনে করো এই মুক্তবন্দিকে আবার হঠাৎ তার পুরনো জায়গাতে নিয়ে যাওয়া হল। সূর্যের আলো থেকে হঠাৎ গুহার অন্ধকারে আসায় সে কি আবার ‘অন্ধ’ হয়ে যাবে না?

    অবশ্যই। সে আবার অন্ধ হয়ে যাবে।

    এবার গুহার মধ্যে দেয়ালগাত্রের ছায়া চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে যদি বন্দিদের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা হয় তা হলে তার চোখ যখন অন্ধকারে এখনও অভ্যস্ত হয়নি, আর অভ্যস্ত হতে যখন সময় আবশ্যক হবে অনেক, তখন বন্দিদের নিকট তার অক্ষমতার জন্য সে কি হাসির পাত্র হয়ে উঠবে না? গুহার বন্দিগণ তার সম্পর্কে বলবে : চক্ষু নিয়ে সে উপরে উঠেছিল; অন্ধ হয়ে সে ফিরে এসেছে। তার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গুহার মানুষ বলবে : কেউ যেন আর উপরে যাবার চিন্তা না করে। কেউ যদি অপর কাউকে মুক্ত করে গুহার বাইরে আলোতে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে তা হলে তাকে গুহার মানুষ অপরাধী ঘোষণা করে তাকে ধরতে পারলে মেরেই ফেলবে। ঠিক নয় কি?

    নিঃসন্দেহে।

    প্রিয় গ্লকন, এবার এই সমগ্র রূপটিকে তুমি আমাদের আগের যুক্তির সঙ্গে জুড়ে নাও* : গুহার বন্দিশালা হচ্ছে আমাদের দৃশ্যজগত; মশালমিছিলের আলো হচ্ছে সূর্য। আর গুহা থেকে উপরে ওঠাকে তুমি আত্মার মুক্তি অর্থাৎ বুদ্ধির জগতে আত্মার আরোহণ বলে কল্পনা করতে পার। আমার এ-ব্যাখ্যা সত্য কিংবা মিথ্যা, তা বিধাতা জানেন। আমার কৈফিয়ত, তোমরা চেয়েছ বলেই আমার বুদ্ধিমতো আমি কথা বলেছি। এই রূপক সত্য কিংবা মিথ্যা যা-ই হোক আমার বিশ্বাস, জ্ঞানের জগতে উত্তমের ভাব আমরা সবার শেষেই মাত্ৰ লাভ করত পারি। এবং উত্তমের সে-জ্ঞান বিনা আয়াসে লাভ করা সম্ভব নয়। কিন্তু উত্তমের জ্ঞান যখন আমরা লাভ করি তখন আমরা উপলব্ধি করি, উত্তমের ভাবই হচ্ছে সবকিছুর মূল। সুন্দর কিংবা ন্যায়ের কারণ হচ্ছে উত্তম। উত্তমই দৃশ্যজগতের আলোর মূল। উত্তমই হচ্ছে সত্য এবং বুদ্ধির মূল। এবং এ-কারণেই ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা সামাজিক সংগঠনে, যে-মানুষ যুক্তির ভিত্তিতে তার জীবনের কর্মসাধন করতে চাইবে তাকে উত্তমের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হবে।

    [* পূর্বে প্রদত্ত সূর্য এবং রেখার উপমা (৫১০)।]

    আমি যতটুকু বুঝতে পারছি তাতে আমি তোমার সঙ্গে একমত, সক্রেটিস। আর তাই যারা উত্তমের এই রূপকে উপলব্ধি করতে পারে তারা মানুষের বৈষয়িক জীবনেও যে নিজেদের জড়িত করতে চাইবে না, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। আমাদের গুহার উপাখ্যানের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, বন্দি মানুষের আত্মা নিয়ত সত্যের জগতে ঊর্ধ্বারোহণ করতে চায় এবং সেই ঊর্ধ্বজগতে আরোহণ করতে সক্ষম হলে আত্মা স্বাভাবিক ভাবে সেই জগতেই বাস করতে চায়।

    হ্যাঁ, ঊর্ধ্বজগতে বাস করতে চাওয়াই আত্মার পক্ষে স্বাভাবিক।

    এবং উত্তমের জ্ঞানলব্ধ মানুষ যখন আবার অজ্ঞানতার গুহার মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে তখন তার আচরণ যদি অদ্ভুত বলে বোধ হয় তাতেও বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ, তার চোখ অন্ধকারে এখনও অভ্যস্ত হয়নি। তাই যে-বন্দি মানুষ চরম ন্যায়ের জ্ঞান লাভ করেনি তার সঙ্গে জাগতিক আদালতে কিংবা অন্যত্র, প্রতিরূপের ছায়ার সত্যতা-অসত্যতা নিয়ে তাকে লড়াই করতে হয়।

    না, তার এই আচরণে বিস্ময়ের কিছু নেই।

    যার সাধারণ জ্ঞান আছে, সে-ই বুঝতে পারবে চোখের বিভ্রম দুরকমের। দুটি কারণে এর উদ্ভব। একটি কারণ হচ্ছে, অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসা। অপরটি আলো থেকে অন্ধকারে যাওয়া। দেহের চোখের ক্ষেত্রে এ কথা যেরূপ সত্য, মনের চোখের ক্ষেত্রেও এ কথা তেমনই সত্য। এই সত্য যার জানা আছে সে যখন কারুর দৃষ্টিভ্রম দেখে, তখন তার হাসির কোনো কারণ থাকে না। তার প্রশ্ন হবে, যে বিভ্রান্ত সে কি উজ্জ্বল আলো থেকে অন্ধকারে এসেছে এবং তার চোখ এখনও অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়নি? কিংবা অন্ধকার থেকে সে দিনের আলোতে বেরিয়ে এসেছে এবং আলোর আধিক্যে তার চোখ বাধিয়ে গেছে? কেউ যদি তার মতো সত্যের সন্ধান লাভ করে থাকে তাকে সে নিজের মতোই সুখী বলে বিবেচনা করবে। কিন্তু যে আলো থেকে অন্ধকারে গেছে তার জন্য অবশ্যই তার সহানুভূতি থাকবে। কিন্তু সে যদি অন্ধকার থেকে আলোতে অতিক্রান্ত আত্মাকে পরিহাস করতে চায়, তা হলে যে ঊর্ধ্বদেশ থেকে গুহার অন্ধকারে প্রত্যাবর্তন করেছে তার প্রতি তার পরিহাসের চেয়ে তাকে অধিক হেতুময় হতে হবে।

    দুটির পার্থক্য তুমি যথার্থভাবেই প্রকাশ করেছ।

    কিন্তু এক্ষেত্রে আমার কথা যদি সত্য হয়, তা হলে আমি সেই পণ্ডিতপ্রবরদের অবশ্যই ভ্রান্ত বলব যারা বলে যে, অন্ধকে যেমন দৃষ্টিদান করা যায়, আত্মাকেও তেমনি জ্ঞানদান করা যায়। কথাটি এমন যেন আত্মার মধ্যে জ্ঞান না থাকলেও তুমি বাইরে থেকে জ্ঞান এনে আত্মার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পার।

    হ্যাঁ, পণ্ডিতেরা তা-ই বলে বটে।

    কিন্তু আমাদের যুক্তিতে আমরা দেখেছি, জ্ঞানের ক্ষমতা অর্থাৎ শেখার শক্তি আত্মার মধ্যে থাকে। এবং সমস্ত শরীরটাকে না ঘুরিয়ে আমরা যেমন আমাদের চোখটাকে ঘুরিয়ে পিছনদিকে দৃষ্টি দিতে পারিনে, তেমনি আত্মাকেও সমগ্রভাবে নশ্বর জগৎ থেকে অবিনশ্বর জগতের দিকে না ঘুরিয়ে, বিবর্তমান জগৎ থেকে অস্তিত্বের জগতে জ্ঞানের মাধ্যমকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আত্মাকেও আলোতে অভ্যস্ত হতে হবে। অস্তিত্বের দৃশ্য সে ক্ৰমান্বয়ে দেখতে পাবে। পারিণামে সে উজ্জ্বলতম অস্তিত্ব অর্থাৎ পরম উত্তমকেই দেখতে পাবে।

    খুবই যথার্থ।

    কিন্তু এমন কোনো উপায় কি আমরা কল্পনা করতে পারিনে, যে-উপায়ে এই অন্ধকার থেকে আলোতে উত্তরণ অর্থাৎ সত্যের জ্ঞানলাভকে অধিকতর সহজ এবং দ্রুত করা যায়? আমরা দৃষ্টিদানের কথা বলছিনে। চোখকে দৃষ্টিদান করা যায় না। চোখে দৃষ্টি তো রয়েছে। কিন্তু সে-দৃষ্টি ভ্রান্ত পথে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সত্য থেকে তাই সে দূরে সরে গেছে। প্রয়োজন হচ্ছে দৃষ্টিকে ফিরিয়ে আনা

    হ্যাঁ, সহজ উপায়ের কথা নিশ্চয়ই আমরা কল্পনা করতে পারি।

    আত্মার কতগুলি গুণ আছে যে গুলিকে দেহের গুণ বলেই আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কারণ এগুলিকে আত্মার মধ্যে প্রয়োজনমতো অভ্যাস এবং পরিচর্যার মাধ্যমে উপ্ত করা চলে। এরা আত্মার সহজাত গুণ নয়। কিন্তু জ্ঞানের গুণ আত্মার সহজাত। এই গুণের স্ফূর্তি ঘটে যদি আত্মার চোখকে সত্য পথে ফিরিয়ে আনা যায়। না হলে এ-গুণ ক্ষতিকর এবং অসার্থক হয়ে দাঁড়ায়। গ্লকন, তুমি কি কখনো চতুর দুষ্ট লোকের চোখে বুদ্ধির ঝিলিক দেখনি? দেখনি, দুষ্টের আত্মা কেমন করে তার হীন স্বার্থ উদ্ধারের সঠিক পথটি আবিষ্কার করে ফেলে? এমন আত্মাকে আমরা অন্ধ বলতে পারিনে। এ অন্ধের বিপরীত। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। কিন্তু সে-তীক্ষ্ণদৃষ্টি হীন স্বার্থে নিয়োজিত। আর তাই তার যেমন চতুরতা, তেমনি খলতা।

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    কিন্তু এই স্বভাবকে যদি শৈশবেই তার নিম্নতর প্রবণতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যেত, যদি তাকে তার পান, ভোজন ইত্যাকার যে-ইন্দ্রিয়ভোগের প্রবণতা ভারী বস্তুর ন্যায় জন্ম থেকে তার স্বভাবে জড়িত হয়ে তাকে কেবল অধোগামী করতে চায়, সেই প্রবণতাকে তার চরিত্র থেকে কেটে আলাদা করে দেওয়া যেত, তা হলে তার আত্মা তার তীক্ষ্ণ চোখের মতোই সত্যকে দেখতে পেত।

    খুবই সম্ভব।

    হ্যাঁ, এরূপ সম্ভব। এ-সম্পর্কে অপর একটি সিদ্ধান্তও স্বাভাবিকভাবে পূর্বকথার ভিত্তিতে আমাদের গ্রহণ করতে হয়। সিদ্ধান্তটি এই যে, যারা শিক্ষাহীন এবং সত্যকে জানে না, তারা যেমন উত্তমরূপে রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বপালনে সক্ষম হবে না; ঠিক তেমনি যারা তাদের শিক্ষাকে কোনোদিন সমাপ্ত করে না তারাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ব্যর্থ হবে। প্রথমোক্তরা ব্যর্থ হবে, কারণ, ব্যক্তিগত কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে তাদের সকল কর্মের নিয়ন্ত্রক কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। আর শেষোক্তরা ব্যর্থ হবে, কারণ, বাধ্য না হলে তারা কোনো দায়িত্বপালনের ইচ্ছা পোষণ করে না। তারা মনে করে, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এক স্বর্গীয় দ্বীপের তারা অধিবাসী। দায়িত্বপালনের দায় কেন তারা বহন করবে?

    খুবই সত্য কথা।

    কাজেই রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে আমাদের কাজ হবে, উত্তম মনের যারা অধিকারী তাদের সেই সর্বোচ্চ জ্ঞানকে অর্জন করতে বাধ্য করা, যে-জ্ঞানকে আমরা সর্বোত্তম জ্ঞান বলে নির্দিষ্ট করেছি। পরম যে-উত্তম তার সন্নিধানে না পৌঁছা পর্যন্ত জ্ঞানের এই ক্রমারোহণে তাদের বিরমহীনভাবে অগ্রসর হতে হবে। কিন্তু জ্ঞানের চূড়ায় আরোহণের পর আর তাদের বর্তমানের জ্ঞানীদের ন্যায় আচরণ করতে দেওয়া হবে না।

    তুমি কী বলতে চাচ্ছ?

    আমি বলছি, তাদের তখন আর ‘ঊর্ধ্ব জগতে’ থাকতে দেওয়া হবে না। তাদের বাধ্য করা হবে গুহার মধ্যে বন্দিদের নিকট আবার নেমে যেতে। বন্দিদের শ্রমের, কষ্টের এবং সম্মানের অংশীদার তাদের হতে হবে। এরূপ শ্রম, কষ্ট এবং সম্মানভোগের যোগ্য তারা হোক কিংবা না হোক।

    গ্লকন বললেন : কিন্তু এটা কি তাদের প্রতি অন্যায় নয়? যখন তারা একটি উত্তম জীবনের যোগ্য হয়েছে, তখন কি সঙ্গত হবে আবার অধম জীবনে তাদের অবনত করা?

    কিন্তু প্রিয় বন্ধু, বিধায়ক হিসাবে আমাদের লক্ষ্যকে তুমি আবার বিস্মৃত হচ্ছ। আমাদের রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কোনো একটি শ্রেণীকে অপর সকল শ্রেণীর চেয়ে সুখী করা নয়। সুখ যা তা সমগ্র রাষ্ট্রের। সমগ্র রাষ্ট্রে সুখ অবস্থান করবে। রাষ্ট্রের বিধায়ক বুদ্ধি এবং বিধানের মাধ্যমে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ রাখবে এবং নিজেরা রাষ্ট্রের উপকারকে পরিণত হবে। এই উপকারসাধনে পরস্পরের উপকারসাধন। বিধানের সৃষ্টি এই কারণে, নিজেদের সুখী করার জন্য নয়। বিধান হবে রাষ্ট্রকে সংঘবদ্ধ রাখতে বিধায়কের উপায় বা মাধ্যম।

    গ্লকন বললেন : যথার্থ। লক্ষ্যটি আমি বিস্মৃত হচ্ছিলাম।

    কিন্তু আমাদের দার্শনিকদের অপরের যত্নগ্রহণে বাধ্য করার মধ্যে কোনো অন্যায় নেই, গ্লকন। আমরা তাদের বুঝিয়ে বলব, অন্য রাষ্ট্রে তাদের শ্রেণীর লোকেরা রাজনীতির দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য হয় না। এটা বোধগাম্য। কারণ সেখানে তারা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। সরকার এমন লোককে দায়িত্বদানে আগ্রহবোধ করে না। নিজেদের ইচ্ছামতো শিক্ষাগ্রহণের কারণে তাদের পক্ষে ভিন্নতর শিক্ষার মূল বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, এরূপ শিক্ষা তারা লাভ করেনি। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের দার্শনিকগণ ভিন্ন ধরনের দার্শনিক। তাদের আমরা রাষ্ট্রের শাসক হওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছি। আমরা অন্য রাষ্ট্রের চেয়ে তাদের উত্তম এবং পরিপূর্ণ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি যেন তারা নিজের শাসন এবং অপরের শাসন—এই উভয় দায়িত্ব উত্তমরূপে সম্পন্ন করতে পারে। তারা যেমন নিজের শাসক হবে, তেমনি অপর সকলের শাসক হবে। এবং এ-কারণেই তাদের মধ্যে যার যখন দায়িত্ব পড়বে, তার তখন সাধারণ মানুষের সেই গুহার মধ্যে অবতরণ করতে হবে এবং সেই অন্ধকারে দেখার জন্য দৃষ্টিকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। তাদের চোখ যখন অভ্যস্ত হবে তখন তারা গুহার অধিবাসীদের চাইতে সকল বিষয়কে সহস্র গুণ অধিক স্পষ্ট দেখতে পাবে। তখন প্রতিকৃতির কোটি কী এবং কোটি কিসের প্রতিকৃতি তাও তারা নির্ধারণ করতে সক্ষম হবে। কারণ তারা সুন্দর, সত্য এবং উত্তমকে যথার্থরূপে ইতিপূর্বে প্রত্যক্ষ করেছে। তারা এবার উপলব্ধি করবে তাদের রাষ্ট্র এবং আমাদের রাষ্ট্রে কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের রাষ্ট্রই তাদের রাষ্ট্র। তাদের দায়িত্বপালনে এ-রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয়ে উঠবে। তখন আর আদর্শ রাষ্ট্র স্বপ্নের রাজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এবং অপর রাষ্ট্রে যেখানে ছায়া নিয়ে একে অপরের সাথে লড়াই করে এবং ক্ষমতাকে উত্তম মনে করে এবং তার দ্বন্দ্বে নিজেরা লিপ্ত হয়, সেখানে আমাদের রাষ্ট্রের শাসন সেরকম হবে না। বস্তুত যথার্থ সত্য হচ্ছে এই : যে-রাষ্ট্রের শাসকগণ যত অনিচ্ছুক শাসক, সে-রাষ্ট্র তত উত্তম রাষ্ট্র। সে-রাষ্ট্র তত শান্তিতে শাসিত হয়। এবং যে-রাষ্ট্রের শাসক, শাসক হওয়ার জন্য যত অধিক আগ্রহী সে-রাষ্ট্র তত অধিক অধম।

    খুবই সত্য কথা।

    এবার ভেবে দেখ আমাদের দার্শনিক শিক্ষার্থীগণ কি এই ব্যাখ্যা শোনার পরে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে আর অসম্মত হবে? তেমন অসম্মতির আর কারণ থাকবে না। কেননা অধিকাংশ সময়ই শাসকগণ পরস্পরের সঙ্গে স্বর্গীয় জ্ঞানের আলোতেই বাস করতে পারবে। তাদের সেরূপ সুযোগ দেওয়া হবে।

    না, এরপর তাদের পক্ষে দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করা অসম্ভব। কারণ তারা হচ্ছে উত্তম নাগরিক। এবং যে-দায়িত্ব আমরা তাদের উপর ন্যস্ত করছি সে হচ্ছে উত্তম দায়িত্ব। এবার আর সন্দেহ নেই, তারা সকলেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে একটি অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা হিসাবে গ্রহণ করবে, আমাদের বর্তমান শাসকদের ন্যায় তাকে একটা রীতি অর্থাৎ ক্ষমতার মাধ্যম হিসাবে নয়।

    হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। এবং এটাই হচ্ছে মূল কথা। আমাদের ভবিষ্যৎ-শাসকদের জন্য তোমাকে অবশ্যই শুধু শাসনের চেয়ে উত্তম কোনো কর্তব্য স্থির করতে হবে। তা হলেই মাত্র তুমি সম্পদবানকে শাসক হিসাবে পেতে পারবে। এ-সম্পদবান স্বর্ণ এবং রৌপ্যের সম্পদে সম্পদবান নয়, এ-সম্পদবানের সমৃদ্ধি ন্যায় এবং যুক্তির সম্পদে। অপরদিকে তোমার শাসকরা যদি নৈতিকভাবে এত নিঃস্ব হয় যে, রাষ্ট্রকে দান করার তাদের কোনো সম্পদই নেই; বরঞ্চ তারা তাদের নিঃস্বতাকে রাজনীতিক ব্যবসায়ের লাভ দ্বারা পূরণ করতে উদ্গ্রীব, তা হলে তোমার রাষ্ট্র কখনো সুশাসিত হতে পারবে না। কারণ তারা ক্ষমতার জন্য লড়াই শুরু করবে এবং এর পরিণামে রাষ্ট্রের মধ্যে যে-অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আত্মকলহের সূত্রপাত ঘটবে তাতে শাসকগণ নিজেরা এবং রাষ্ট্র—উভয়ই ধ্বংস হয়ে যাবে।

    একান্তই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    এবং রাজনীতিক উচ্চাভিলাষী এই জীবনকে কেবলমাত্র যথার্থ দার্শনিকই অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতে পারে, অপর কেউ না। যথার্থ দার্শনিক ব্যতীত অপর কোনো জীবনের মধ্যে এই দৃষ্টির সাক্ষাৎ তুমি পেতে পার কি?

    না, এরূপ অপর কোনো জীবনের কথা আমি জানিনে, সক্রেটিস।

    কাজেই যারা শাসক হবে শাসনের প্রতি তাদের কোনো লোভ থাকবে না। কারণ, শাসনের জন্য যদি তারা লোভী অর্থাৎ প্রেমিক হয় তা হলে অবশ্যই শাসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমিকও থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমিকগণ তখন নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করবে।

    নিঃসন্দেহে।

    তা হলে শাসক বা অভিভাবক হতে বাধ্য করব আমরা কাদের? নিশ্চয়ই আমরা বাধ্য করব তাদের যারা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সর্বোত্তমরূপে জ্ঞানী এবং যাদের দ্বারা রাষ্ট্র সর্বোত্তমরূপে শাসিত হবে এবং যাদের রাজনীতির চেয়ে কোনো উত্তম এবং সম্মানীয় জীবন থাকবে।

    হ্যাঁ, এদেরকেই আমরা শাসকরূপে নিযুক্ত করব।

    তা হলে এবার আমাদের আলোচনা করতে হয়, এই শাসকগণ কেমন করে তৈরি হবে, কী প্রকারে তাদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসতে আমরা সক্ষম হব। অধোজগৎ থেকে আরোহণ করে ঊর্ধ্বজগতে দেবতাদের নিকট পৌঁছার দৃষ্টান্ত নিশ্চয়ই আছে। আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয় তা-ই হবে।

    হ্যাঁ, এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হয়।

    ব্যাপারটি কিন্তু কোনো মুদ্রার ‘মাথা না লেজ’-এর খেলা নয়।* কাজটি হচ্ছে একটি আত্মাকে প্রত্যুষের অন্ধকার থেকে পুরো দিনের আলোতে নিয়ে আসা। একেই আমরা বলব অধোদেশ থেকে ঊর্ধ্বদেশে আরোহণ।

    [* জোয়েট অনুবাদ করেছেন : “এটি ঝিনুকের এপিট ওপিঠেরখেলা নয়।” এবং এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন : এটি একটি খেলার উল্লেখ যে খেলায় দুটি দল ঝিনুক আকাশে ছুঁড়ে দিয়ে পরস্পরকে ধাওয়া করত এবং জয়-পরাজয় ঝিনুকের উজ্জ্বল কিংবা কালো দিকটি উপরের দিকে পড়ার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট হত।
    –জোয়েট : ডায়ালগস অব প্লেটো : ৩য় ভলিউম।]

    হ্যাঁ, তোমার কথা ঠিক।

    আমাদের তা হলে স্থির করতে হবে, কোন্ জ্ঞান দ্বারা এই পরিবর্তন সাধিত হতে পারে?

    অবশ্যই।

    কোন্ জ্ঞান আত্মাকে পরিবর্তন থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে? আর-একটি বিষয় আমার স্মরণে আসছে। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে গ্লকন, আমাদের তরুণদের যুদ্ধকৌশলীতেও পরিণত হতে হবে?

    হ্যাঁ আমার মনে পড়ছে।

    তা হলে এই জ্ঞানের একটা নূতন বৈশিষ্ট্য থাকবে?

    কী বৈশিষ্ট্য?

    অর্থাৎ এ-জ্ঞানকে যুদ্ধক্ষেত্রেরও উপযোগী হতে হবে।

    হ্যাঁ, যদি সেরূপ সম্ভব হয়।

    আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ইতিপূর্বে আমরা দুটি ভাগে ভাগ করেছিলাম। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, ঠিক। তার দুটো ভাগ ছিল।

    শিক্ষার একটি ভাগ ছিল শরীরচর্চা। শরীরকে গঠন করাই এর লক্ষ্য। এদিক থেকে ক্ষয় ও বৃদ্ধি তার আলোচ্য ছিল।

    যথার্থ।

    কিন্তু বর্তমানে আমাদের সেরূপ জ্ঞানের আবশ্যকতা নেই। আমরা সে-জ্ঞানকে আবিষ্কার করতে যাচ্ছিনে।

    না।

    কিন্তু সঙ্গীতের বিষয়ে তুমি কী বলবে? আমাদের পূর্বের শিক্ষা ব্যবস্থায় সঙ্গীতেরও একটি স্থান ছিল।

    গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, সঙ্গীত ছিল শরীরচর্চার পরিপূরক। সঙ্গীত তার স্বভাব দিয়ে, তার ঐক্য এবং ছন্দ দিয়ে অভিভাবকদের জীবন সঙ্গতিপূর্ণ এবং ঐক্যময় করে তুলত। কিন্তু সঙ্গীত তাদের জ্ঞানদান করত না। সঙ্গীতের মধ্যে সাহিত্যও ছিল : বাস্তব কিংবা কল্পনা যা-ই হোক-না-কেন। এ-সাহিত্যও তাদের নৈতিক চরিত্রকে গঠিত করত। কিন্তু যে-পরিবর্তন তোমার বর্তমানের লক্ষ্য, সঙ্গীত সে পরিবর্তন সাধন করতে পারে না।

    তোমার স্মৃতি যথার্থই বলেছে। আমরা যা চাই সঙ্গীতে তা পেতে পারিনে। কিন্তু কোথায় আমরা সে-জ্ঞানকে পেতে পারি? বাস্তব দক্ষতাকেও আমরা আত্মার জন্য তেমন মঙ্গলকর বলে ভাবতে পারিনে।

    সেকথা ঠিক। কিন্তু শরীরচর্চা এবং সঙ্গীতকে যদি আমরা বাদ দিই এবং বাস্তব দক্ষতাও যদি উপযুক্ত না হয় তা হলে আর কী অবশিষ্ট থাকে?

    আমি বললাম : না, বিষয়গুলির মধ্যে আর তেমন অবশিষ্ট থাকে না। আমাদের তা হলে বিষয়ের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আবদ্ধ থেকে লাভ নেই। সকল বিষয়ের মধ্যে যদি কোনো চরিত্র সমানভাবে বর্তমান থাকে, তা হলে আমাদের তার প্রতিই নজর দিতে হয়?

    তুমি কী বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

    আমি বলতে চাচ্ছি, এমন কিছু আছে কি না যা সকল কলা, জ্ঞান এবং বুদ্ধির ক্ষেত্রে সাধারণ—অর্থাৎ সবার মধ্যেই যে বর্তমান এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে যাকে আমাদের প্রথমেই আয়ত্ত করা আবশ্যক।

    কী এমন জিনিস?

    না, তেমন বিরাট কিছু না। সে হচ্ছে এক, দুই, তিন ইত্যাকার সংখ্যাকে গণনা করা এবং পৃথক্করণের ক্ষমতা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল বিষয়েই এটা কি প্রাথমিক প্রয়োজন নয়?

    হ্যাঁ, তা ঠিক।

    তা হলে যুদ্ধের যা কলা তাতেও এর আবশ্যকতা আছে?

    নিঃসন্দেহে।

    আচ্ছা গ্লকন, তুমি কি খেয়াল করেছ, এই সংখ্যার অজ্ঞতায় আগামেমনন কীরূপ হাস্যকর চরিত্র হয়ে উঠেছে? পালামেডিস বলছে, সে-ই প্রথম সংখ্যাকে আবিষ্কার করেছে এবং ট্রয়ে সৈন্য বাহিনীকে সেই-ই সুবিন্যাস্ত করেছে এবং জাহাজের সংখ্যা সে-ই গণনা করেছে। তার এ-দাবির অর্থ দাঁড়ায় তার পূর্বে এগুলির কোনো গণনা হয়নি এবং আগামেমনন জানত না তার নৌবহরের সংখ্যা কত। কারণ আগামেমনন গণনা করতে জানত না। ফলে আগামেমনন একজন কৌতুকজনক সেনাধিনায়কে পরিণত হয়েছে।

    হ্যাঁ, এ-কাহিনী সত্য হলে সে অবশ্যই একজন কৌতুকজনক সেনাধিনায়ক ছিল।

    তা হলে অন্য বিষয়ের সঙ্গে গণনা করা এবং হিসাবের শিক্ষাও সৈনিকের অবশ্যক?

    অবশ্যই। সেনাবাহিনী গঠন করতে হলে গণনা করা তাদের শিখতে হবে। অর্থাৎ মানুষ হিসাবে এ তাদের শিখতেই হবে।

    কিন্তু এই শাস্ত্র সম্পর্কে তোমার মত কি এক? তোমার মত কী?

    আমার তো মনে হয় এরকম বিষয়েরই আমরা অন্বেষণ করছি। কারণ, এই বিষয়টি মানুষকে চিন্তার পথে নিয়ে যায়। কিন্তু এ-শাস্ত্রের সঠিক ব্যবহার এখনও হয়নি। কারণ, সঠিক ব্যবহারের অর্থ হচ্ছে আত্মাকে অস্তিত্বের দিকে আকর্ষণ করা।

    একটু ব্যাখ্যা করো, সক্রেটিস।

    চেষ্টা করছি। আমার চেষ্টায় তুমিও যোগ দিও গ্লকন। কোন্ বিষয়ের এই আকর্ষণী ক্ষমতা আছে তাকে স্থির করার চেষ্টায় তুমি আমাকে অন্তত ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বলে অভয় দিও যেন আমি নিঃসন্দেহ হতে পারি যে, গণিতকে আমি যেরূপ মনে করছি, গণিতশাস্ত্র সেরূপই।

    তুমি ব্যাখ্যা করো।

    আমি বলতে চাচ্ছি : ইন্দ্রিয়গোচর বস্তু দুই প্রকারের। এদের কিছু আছে এমন যা চিন্তার লক্ষ্যের মধ্যে আসে না। কারণ এদের অনুধাবনের জন্য ইন্দ্ৰিয়ই যথেষ্ট। কিন্তু অন্য বস্তুর ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়, নির্ভরের এত অযোগ্য যে এদের উপর অধিকতর অনুসন্ধান অপরিহার্য।

    সক্রেটিস, তুমি কি দূর থেকে দৃষ্ট বস্তুর কথা বলছ?

    না, আমার কথা তা নয়।

    তা হলে তুমি কী বলতে চাচ্ছ?

    আমি বলছি, যে-বস্তু চিন্তার লক্ষ্যে আসে না সে-বস্তুর দৃশ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটে না—অর্থাৎ তার মধ্যে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর ঘটে না। চিন্তার যোগ্য হচ্ছে সেই বস্তু যার মধ্যে দৃশ্যান্তর সংঘটিত হয়। এক্ষেত্রে ইন্দ্রিয় যখন বস্তুর উপর নিপতিত হয়, সে-বস্তু নিকটবর্তী কিংবা দূরবর্তী যা-ই হোক, তখন ইন্দ্রিয়ের ওপর কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর স্পষ্ট ছাপ তৈরি হয় না। একটি দৃষ্টান্ত দিলে আমার কথার অর্থটি পরিষ্কার হতে পারে। ধরো আমার এই তিনটি আঙুল আছে : একটা কড়ে আঙুল, একটা দ্বিতীয় আঙুল এবং একটা মধ্য আঙুল।

    ভালো কথা।

    তোমার মনে হবে আঙুল তিনটি পরস্পর খুবই সন্নিবদ্ধ। আর এখানেই হচ্ছে মূল কথা।

    কী কথা?

    এরা প্রত্যেকেই তোমার কাছে আঙুল বলে বোধ হবে। মধ্যমেই দেখ কিংবা একেবারে পাশে, সাদা কিংবা কালো, মোটা কিংবা চিকন— যেভাবেই দেখ-না কেন। এরা আঙুল। উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য আঙুল হিসাবে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না। মধ্যম, সাদা কিংবা মোটা : আঙুল হিসাবে প্রত্যেকই আঙুল। এক্ষেত্রে কাউকে তার মনের কাছে জিজ্ঞেস করতে হয় নাঃ আঙুল কী? কারণ আঙুলের দৃশ্য মনের মধ্যে আঙুলকে আঙুল ব্যতীত অপর কিছু বলে বিভ্রম সৃষ্টি করে না। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    আর এ-কারণেই আমি বলেছি, এমন ক্ষেত্রে চিন্তার কোনো আবশ্যক হয় না।

    না, এমন ক্ষেত্রে চিন্তার কোনো আবশ্যক হয় না।

    কিন্তু আঙুলের ছোটত্ব, বড়ত্বের ক্ষেত্রে কি একথা বলা চলে? দৃষ্টির পক্ষে কি এরূপ বৈশিষ্ট্য সম্যকভাবে অনুভব করা সম্ভব? একটি আঙুল মধ্যস্থানে, কিংবা অপরটি পাশের দিকে আছে—এগুলি কি আঙুলের ছোটত্ব এবং বড়ত্বের বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে না? এমনিভাবে স্পর্শ কি সম্যকভাবে বস্তুর ঘনত্ব, তার কৃশতা কিংবা পেলবতা অথবা তার কাঠিন্যকে অনুভব করতে পারে? অন্য ইন্দ্রিয় সম্পর্কেও একথা বলা যায়। এরা কি বস্তুর সঠিক পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম? এদের কর্মপদ্ধতিটি কি এরূপ নয় যে, স্পর্শ-ইন্দ্রিয় যখন বস্তুর কাঠিন্যকে অনুভব করে, তখন সে তার পেলবতাকেও অনুভব করে। ফলে সে মনের কাছে একই বস্তুর পরিচয় দিতে যেয়ে বলে : বস্তুটি যেমন কঠিন তেমনি নরম।

    তুমিই ঠিকই বলছ, সক্রেটিস।

    তা হলে মনের অবস্থা কী হবে? যে-বস্তু কঠিন, সে-বস্তু নরম—ইন্দ্রিয়দত্ত এমন পরিচয়ে মন কি বিভ্রান্ত হবে না? তেমনি হালকা এবং ভারী—এরই-বা অর্থ কী? ইন্দ্রিয় যদি বলে, যা হালকা তা ভারী এবং যা ভারী তা-ই হালকা তা হলে মন কী করবে?

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, একথা ঠিক। এরূপ পরিচয় মনের জন্য বিভ্রান্তিকর। কাজেই এদের উপযুক্ত ব্যাখ্যা আবশ্যক।

    হ্যাঁ, এরূপ সংকটে মনকে হিসাবের আশ্রয় নিতে হয়, তার বুদ্ধিকে ব্যবহার করতে হয়। আর এই উপায়ে মন স্থির করে : বস্তুগুলি এক, না বিভিন্ন?

    যথার্থ।

    যদি দেখা যায়, বস্তু দুটি পৃথক তা হলে এদের উভয়েই ভিন্ন বস্তু হবে। নয় কি?

    হ্যাঁ, ভিন্ন বস্তু হবে।

    প্রত্যেকেই যদি ভিন্ন অস্তিত্ব হয় এবং পরস্পরবিরোধী দুটো গুণ মিলে দুটি বস্তু হয়, তা হলে মন তখন তাদের দুটি বস্তু হিসাবেই দেখবে—একটি হিসাবে নয়।

    একথাও ঠিক।

    কিন্তু দৃষ্টির ক্ষেত্রে এই পার্থক্য স্পষ্ট নয়। দৃষ্টির কাছে ছোট-বড় অনেক সময়ে একাকার হয়ে যায়।

    হ্যাঁ, চোখের কাছে ছোটকে বড় এবং বড়কে ছোট বোধ হতে পারে।

    কিন্তু মনকে এই জট ছাড়াতে বিপরীত পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয় এবং ছোট বড়কে একাকার না করে ছোটকে ছোট হিসাবে এবং বড়কে বড় হিসাবে দেখতে হয়।

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    এখানেই কি আমাদের প্রশ্নেরও শুরু নয় : বড় কী? ছোট কী?

    অবশ্যই। এখানেই শুরু।

    এবং তার ভিত্তিতেই এসেছে দৃশ্য এবং বোধ্য-এর পার্থক্য?

    খুবই সত্য কথা।

    গ্লকন, আমি যখন বলেছিলাম, এমন বস্তু আছে যার জন্য বুদ্ধির আবশ্যক—অর্থাৎ যা একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী গুণসম্পন্ন বস্তু হিসাবে দৃষ্ট হয়, তাকে বোঝার জন্য বুদ্ধির আবশ্যক—তখন আমি এই কথাই বোঝাতে চেয়েছিলাম। আবার যে পরস্পরবিরোধী বলে বোধ হয় না, তার জন্য বুদ্ধির আবশ্যক হয় না।

    আমি তোমাকে বুঝতে পারছি, সক্রেটিস। তোমার সঙ্গে আমি একমত।

    তা হলে ঐক্য এবং সংখ্যাকে আমরা কিসের অন্তর্ভুক্ত করব?

    আমি ঠিক জানিনে, সক্রেটিস।

    একটু চিন্তা করো গ্লকন। চিন্তা করলে দেখবে, পূর্বে যে-আলোচনা হয়েছে তার মধ্যেই এরও জবাব নিহিত আছে। কারণ সহজ ঐক্য যদি আমাদের দৃষ্টি কিংবা অপর কোনো ইন্দ্রিয়, একটি আঙুলের ন্যায় অনুভব করতে পারে তা হলে আর চিন্তার আবশ্যক হবে না। অস্তিত্বের দিকে তখন অগ্রসর হওয়ার আবশ্যক হবে না। কিন্তু যদি সব সময়েই কোনো পরস্পরবিরোধিতা দেখা দেয়, একটিকে অপরটির বিরোধী বলে বোধ হয় এবং বহুত্বের ভাব এর মধ্যে নিহিত থাকে তা হলে আমাদের মধ্যে চিন্তা আলোড়িত হয়ে ওঠে। চিত্ত তখন সংকটগ্রস্ত হয় এবং সিদ্ধান্তের জন্য সে প্রশ্ন করে : চরম ঐক্য কী? এইভাবেই একক বা ঐক্যের আলোচনার একটা ক্ষমতা আছে মনকে যথার্থ অস্তিত্বের দিকে আকর্ষিত করার।

    গ্লকন বললেন : আর এটি বিশেষ করে ঘটে একের প্রশ্নে। কারণ আমরা একই বস্তুকে এক এবং বৈচিত্র্যে অসংখ্য বলে অনুভব করি।

    আমি বললাম : হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছে। এবং একথা একের সম্পর্কে যেরূপ সত্য, তেমনি সকল সংখ্যা সম্পর্কেই সত্য।

    অবশ্যই।

    আর গণিত এবং গণনা—সকলকেই সংখ্যা দিয়ে কারবার করতে হয়? হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    এবং তারা মনকে সত্যের পথে নিয়ে যায়?

    হ্যাঁ, বিশেষভাবেই তারা মনকে সত্যের পথে নিয়ে যায়।

    তা হলে, যে-জ্ঞানের আমরা অন্বেষণ করছি সে এই জ্ঞানই হবে— যাকে সামরিক এবং দার্শনিক, উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহার করা চলবে। কারণ, যোদ্ধাকেও গণনার কৌশল জানতে হবে। না হলে তার পক্ষে সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে বিন্যস্ত করা সম্ভব হবে না। দার্শনিককেও সংখ্যার কৌশল আয়ত্ত করতে হবে, কারণ, তাকে পরিবর্তনের সমুদ্রকে অতিক্রম করে যথার্থ অস্তিত্বের উদ্ঘাটন করতে হবে। কাজেই তাকেও গাণিতিক হতে হবে।

    তোমার কথা সত্য।

    আর আমাদের অভিভাবক তথা শাসক হচ্ছে যোদ্ধা এবং দার্শনিক উভয়ই।

    অবশ্যই।

    তা হলে আমাদের রাষ্ট্রের বিধানকারীকে এরূপ জ্ঞানের বিধান করতে হবে। যে আমাদের রাষ্ট্রের শাসক হবে তাকে গণিতশাস্ত্র অধ্যয়নে সম্মত করতে হবে। কিন্তু সে অধ্যয়ন কোনো শৌখিন ব্যাপার নয়। তাকে গুরুত্বসহকারে সংখ্যার তত্ত্বকে অধ্যয়ন করতে হবে। যতক্ষণ-না তার মন সংখ্যার প্রকৃতিকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, ততক্ষণ এই শিক্ষা তার চলতে থাকবে। তার সংখ্যার শিক্ষা বণিক কিংবা ব্যবসায়ীর মনোভাবে নিয়ে করলে চলবে না। কেননা বেচাকেনায় তার সংখ্যার শিক্ষা সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংখ্যাশাস্ত্রকে শিখতে হবে যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে ব্যবহারের জন্য এবং আত্মাকে উন্নত করার জন্য। কারণ আত্মার জন্য, পরিবর্তনের প্রবাহ থেকে অস্তিত্বে উত্তরণের এটিই হচ্ছে

    সহজতম পথ।

    তুমি চমৎকাররূপে বলেছে, সক্রেটিস।

    বিষয়টির প্রয়োজনীয়তার কথা আমি বলেছি। এবার আমি বলব, কী চমৎকার জ্ঞানের এই মাধ্যমটি। দোকানির মনোভাব নয়, দার্শনিকের মনোভাব নিয়ে যদি আমরা চর্চা করি তা হলে কত উপায়ে যে এ আমাদের লক্ষ্যসাধনে সাহায্য করে তার ইয়ত্তা নেই।

    কেমন করে সাহায্য করে?

    আমি আগেই বলেছি, গণিতের একটা বড় রকমের মহৎকরণের প্রভাব আছে। গণিত আত্মাকে বিশ্লিষ্ট সংখ্যা নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে এবং যুক্তির মধ্যে দৃশ্যকে টেনে আনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তুমি নিশ্চয়ই জান এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ যখন হিসেব করেন তখন তাঁরা অবিভাজ্য এককে ভাগ করাতে আপত্তি করেন এবং কেউ এরূপ ভাগ করার চেষ্টা করলে তাকে উপহাস করে নিবৃত্ত করার প্রয়াস পান। তুমি যদি ‘এক’কে ভাগ কর তখনই তারা তাকে গুণের মাধ্যমে পুরো করে দেবেন। তাঁদের সতর্ক দৃষ্টি : যেন ‘একে’র পুরো অস্তিত্ব বজায় থাকে এবং ভগ্নাংশের মধ্যে তার অস্তিত্ব হারিয়ে না যায়।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    এবার মনে করো, কোনো মানুষ এই বিশেষজ্ঞগণকে লক্ষ্য করে বলল : “মহামতিগণ। আপনাদের এই মহাশ্চর্য ‘সংখ্যা’ বস্তুটি কী যার উপর আপনারা এত মাথা ঘামাচ্ছেন, যার সম্পর্কে আপনাদের দাবি যে, এর প্রতিটি একক অপর এককের ঠিক সমান, আবার একক হিসাবে এরা কেউই বিভাজ্য নয়?” তা হলে—বিশষজ্ঞগণ এ-প্রশ্নের কী জবাব দেবেন বলে তুমি মনে কর গ্লকন?

    আমার তো মনে হয় তাঁরা জবাবে বলবেন যে, তাঁরা এমন সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করছেন যা কেবল চিন্তার মাধ্যমেই উপলদ্ধি করা সম্ভব।

    তা হলে এ-জ্ঞানকে আমরা যথার্থভাবেই প্রয়োজনীয় বলতে পারি, কারণ, বিশুদ্ধ সত্যের দর্শনে এ-জ্ঞান বিশুদ্ধ বুদ্ধির ব্যবহারকে প্রয়োজনীয় করে তোলে।

    হ্যাঁ, এটি তার একটি বৈশিষ্ট্য।

    তা ছাড়া তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ যাদের মধ্যে হিসাবের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা আছে তারা অন্য সব বিষয়ও দ্রুত শিখতে পারে। এমনকি যাদের বুদ্ধি কিছু কম, তাদেরও যদি অঙ্কের শিক্ষা দেওয়া যায় তা হলে অপর কোনো লাভ না হলেও, তাদের বুদ্ধি পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পায়।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    তবে হ্যাঁ, অঙ্কের মতো কঠিন বিষয়ও কম আছে।

    একথা খুবই সত্য।

    এই সকল কারণে, গণিত এমন একটি জ্ঞান যার শিক্ষায় উত্তম নাগরিককে শিক্ষিত করা আবশ্যক এবং এ-শিক্ষা পরিত্যাগ করা উচিত নয়।

    তোমার সঙ্গে আমি একমত।

    তা হলে আমাদের শিক্ষাসূচিতে গণিত একটি বিষয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। এবার গণিতের অনুরূপ অন্য বিষয় সম্পর্কেও আমাদের আলোচনা করতে হয়।

    তুমি কি জ্যামিতির কথা বলছ, সক্রেটিস?

    তুমি ঠিকই ধরেছ, গ্লকন

    হ্যাঁ, জ্যামিতির যেদিক যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত সেদিক নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে। কারণ শিবিরস্থাপন, বাহিনী নিয়ে অবস্থানগ্ৰহণ অথবা ব্যূহকে চেপে ধরা বা বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধি বৃদ্ধি করা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা অগ্রগতির পথে, অপর কোনো কৌশলের জন্য অধিনায়ককে অবশ্যই জ্যামিতিজ্ঞ হতে হবে। সমর-অধিনায়কের এ-বিষয়ে জ্ঞান থাকা না-থাকার উপর অবস্থার বিপুল ব্যবধান ঘটে যাবে।

    তুমি ঠিক বলেছ, গ্লকন। কিন্তু এ জন্য জ্যামিতি বা গণিতের অল্পকিছু জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু আমি বলছি জ্যামিতির উচ্চতর দিকের কথা। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জ্যামিতির সেই দিক আমাদের উত্তমের জ্ঞানকে অধিকতর সহজ করে কি না। আমরা বলেছি, জ্ঞানের যে-কোনো বিষয়ের করণীয় হচ্ছে আত্মাকে আলোর দিকে আকৃষ্ট করা।

    যথার্থ।

    জ্যামিতি যদি আমাদের সত্যদর্শনে বাধ্য করে তা হলে জ্যামিতি আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু যদি তার লক্ষ্য হয় কেবল পরিবর্তনকে প্রকাশ করা, তা হলে জ্যামিতিতে আমাদের প্রয়োজন নেই।

    হ্যাঁ, তা-ই আমরা বলব।

    কিন্তু যাদের জ্যামিতির সঙ্গে সামান্য পরিচয়ও আছে তারাই বলবে যে জ্যামিতির এরূপ ধারণা জ্যামিতিকদের সাধারণ ভাষার একেবারেই বিরোধী।

    কীভাবে?

    কারণ, এরা ‘বর্গক্ষেত্র’, প্রয়োগ’ ‘যোগ’ ইত্যাকার সব কর্মের কথা বলে। এরূপ ভাষার অর্থ হচ্ছে, জ্যামিতির লক্ষ্য যেন কিছু করা। অথচ সমগ্র বিষয়টির উদ্দেশ্য হচ্ছে, জ্ঞান : স্থায়ী অস্তিত্বের জ্ঞান। যে-অস্তিত্ব এখন আছে তখন নেই, তার জ্ঞান নয়।

    হ্যাঁ, এ-সম্পর্কে ভিন্নমতের কারণ নেই : জ্যামিতি অবশ্যই শাশ্বত অস্তিত্বের জ্ঞান।

    তা-ই যদি হয়, তা হলে জ্যামিতি আত্মাকে সত্যের দিকেই আকর্ষণ করবে এবং দার্শনিকবোধের দৃষ্টি বর্তমানে যেখানে জাগতিক বিষয়ে নিবদ্ধ সেখানে জ্যামিতি তাকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলবে।

    নিঃসন্দেহে।

    তা হলে এ-বিধান আমাদের কঠিনভাবেই প্রণয়ন করতে হবে যে, আমাদের মহৎ নগরীর সকল অধিবাসীকে অবশ্যই জ্যামিতির শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া জ্যামিতির পরোক্ষ ফলও কম নয়।

    কীরকমের পরোক্ষ ফল?

    আমি বললাম : সামরিক সুবিধার কথা তুমি ইতিপূর্বেই বলেছ। তা ছাড়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, সকল বিভাগেই যারা জ্যামিতি অধ্যয়ন করেছে তাদের অনুধাবনক্ষমতা যারা জ্যামিতি অধ্যয়ন করেনি তাদের চেয়ে বহু গুণ অধিক।

    হ্যাঁ, একথা সত্য। উভয়ের মধ্যে ব্যবধান বিরাট।

    তা হলে এসো আমরা স্থির করি, তরুণদের জন্য জ্যামিতি দ্বিতীয় বিষয় হিসাবে আমাদের শিক্ষাসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে।

    হ্যাঁ, এরূপ সিদ্ধান্তই আমরা করব।

    তা হলে আমাদের তৃতীয় বিষয় কী হবে? জ্যোতির্বিজ্ঞান? তুমি কী বল?

    এ-প্রস্তাবটি আমি বিশেষভাবেই সমর্থন করি। কারণ ঋতু, মাস এবং বর্ষ-পরিক্রমের পর্যবেক্ষণ যেমন কৃষক এবং নাবিকের জন্য প্রয়োজন, তেমনি সমর-অধিনায়কের জন্যও প্রয়োজন।

    পাছে লোকে তোমাকে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবক মনে করে, তার জন্য যে তুমি বেশ শঙ্কিত বোধ করছ, সেটি আমার নজর এড়ায়নি। বস্তুত, এ-সত্য অনুধাবন করা কঠিন যে, আমাদের প্রত্যেকের আত্মায় এমন একটি চোখ আছে, যে আমাদের সত্যদর্শনের একমাত্র উপায় এবং যার আলো অপর কোনো আকর্ষণে নির্বাপিত কিংবা স্তিমিত হলে এরূপ বিশুদ্ধ বিষয়ের অধ্যয়ন তাকে আবার প্রজ্বলিত করে তোলে। যারা আত্মার এই ক্ষমতাকে স্বীকার করে তারা তোমার প্রস্তাব নির্দ্বিধায় সমর্থন করবে। কিন্তু যারা আত্মার এই ক্ষমতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ, তারা এ-প্রস্তাবকে নিরর্থক গণ্য করবে। কারণ, এরূপ বিষয়ের অধ্যয়নে তারা তাদের স্বার্থসাধনকারী কোনো লাভকে দেখতে পাবে না। কাজেই তোমাকে স্থির করতে হবে, কোন্ পক্ষের তুমি জবাব দেবে। অথবা তুমি বলতে পার, কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্তিপ্রদানের তোমার আগ্রহ নেই। তোমার যুক্তিপ্রদানের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজেকে উন্নত করা। অপর কেউ যদি তোমার এ-আলোচনায় উপকৃত বোধ করে তা হলে এ-আলোচনায় তার যোগদানেও তোমার কোনো আপত্তি হবে না।

    আমি বলব আমার নিজের জন্যই আমি আলোচনাটি চালিয়ে যেতে চাই।

    তা হলে চলো, এক পা আমরা পিছিয়ে যাই। কারণ শিক্ষাসূচিতে বিষয়ের ক্রমে আমরা কিছু ভুল করেছি।

    কী ভুল করেছি, সক্রেটিস?

    সরল জ্যামিতি থেকে একচোটে আমরা ঘন জ্যামিতির ঘূর্ণমান বস্তুর বিষয়ে চলে গেছি। আমাদের উচিত ঘনবস্তু নিয়েই প্রথমে আলোচনা করা। কারণ, বস্তুর তৃতীয় মাত্রা তার দ্বিতীয় মাত্রার পরেই আসে। এবং তখনই মাত্ৰ আমরা বস্তুর ঘনক এবং বেধসম্পন্ন অপর সকল গঠন নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

    একথা ঠিক। কিন্তু সক্রেটিস, এ-বিষয়টির উপর আলোচনা খুব কমই হয়েছে।

    তার কারণ দুটি। প্রথমত, কোনো সরকারই এর পৃষ্ঠপোষকতা করে না। ফলে এর চর্চায় যে-উৎসাহের প্রয়োজন তার অভাব ঘটে। বিষয়টি কঠিন। দ্বিতীয়ত, কোনো ছাত্রের পক্ষে এ-জ্ঞান শিক্ষক ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এ-বিষয়ে কোনো শিক্ষক পাওয়াও কঠিন। এবং বর্তমান অবস্থায় যদিবা শিক্ষক পাওয়া যায় তবু যে-ছাত্রগণ অহংকারী হয়ে উঠেছে তারা এই শিক্ষকের নির্দেশ পালন করবে না। অবশ্য রাষ্ট্র নিজে যদি এই বিষয়ের শিক্ষক হয় এবং এ-বিষয়ের শিক্ষাদাতাকে সম্মানিত করে, তা হলে অবস্থাটির পরবর্তন হবে। তখন শিক্ষার্থীর অভাব হবে না। ছাত্রগণ তখন এ-বিষয়ের শিক্ষায় যোগদান করতে চাইবে, বিষয়ের উপর ধারাবাহিক এবং নিষ্ঠাপূর্ণ অনুসন্ধানও চলবে এবং আবিষ্কারও সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমানে যখন সাধারণ জগৎ একে অবহেলা করছে এবং তার নিজের অবয়বকে বিকৃত করা হয়েছে এবং এর অনুসারীদের কেউ যখন যথার্থভাবে এর উপকারিতার কথা বলতে পারে না, তখন জ্যোতির্বিজ্ঞান তার স্বাভাবিক আকর্ষণশক্তিতে জ্ঞানের মধ্যে নিজের জন্য একটি আসন তৈরি করে নিয়েছে। তাই একথা অবশ্যই বলা যায় যে, রাষ্ট্রের সাহায্য পেলে জ্ঞানের এই বিষয়টি উজ্জ্বল আলোতে বেরিয়ে এসে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত।

    হ্যাঁ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটা অদ্ভুত প্রভাব আছে। কিন্তু বিষয়ক্রমে ভুলের কথাটি আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না, সক্রেটিস। তুমি তো প্রথমে সমতলের জ্যামিতি নিয়ে শুরু করেছিলে?

    হ্যাঁ, আমি তা-ই করেছিলাম, গ্লকন।

    এবং জ্যোতিষকে তুমি তার পরে এনেছিলে। কিন্তু তার পরে দেখছি তুমি এক পা পিছিয়ে গেলে।

    হ্যাঁ গ্লকন, এবং ওরূপ তাড়াহুড়া করতে যেয়েই আমি তোমার বিলম্ব ঘটিয়ে দিলাম। স্বাভাবিকভাবে ঘন জ্যামিতির দুরবস্থার বিষয়টি তার পরই আসত। কিন্তু আমি তাকে বাদ দিয়ে সরল জ্যামিতির পরেই ঘূর্ণমান বস্তুর বিজ্ঞান, জ্যোতিষ নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম।

    হ্যাঁ, তুমি তা-ই করলে।

    যা-ই হোক, রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা করলে যে-জ্ঞানকে আমরা বাদ রেখেছিলাম সে নিজের আসন করে নিতে পারবে, একথা ধরে নিয়ে এসো, আমরা জ্যোতিষকে আমাদের শিক্ষাসূচির চতুর্থ স্থানে স্থাপিত করি।

    গ্লকন বললেন : এ-ক্রম ঠিকই হবে। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে আমার ইতিপূর্বে স্থুল প্রশংসাকে তুমি ভর্ৎসনা করেছিলে। এবার তা হলে আমি তোমার মনোভাব নিয়েই এই জ্ঞানের প্রশংসা করি। কারণ, আমিও মনে করি, যে-কাউকেই স্বীকার করতে হবে, জ্যোতিষ আত্মাকে ঊর্ধ্বমুখী হতে বাধ্য করে এবং এই লোক থেকে অপর কোনো লোকে আমাদের নিয়ে যায়।

    আমি বললাম : আমাকে বাদ দিয়ে অপর সকলকেই সে হয়তো অপর কোনো লোকে নিয়ে যায়। কেননা বিষয়টি অপর সকলের নিকট পরিষ্কার হলে ও আমার নিকট পরিষ্কার হয়নি।

    তা হলে তুমি কী বলতে চাও, সক্রেটিস?

    আমি বরঞ্চ বলব, যারা জ্যোতিষকে দর্শনে পরিণত করে তারা আমাদের অধোমুখীই করে, উর্ধমুখী নয়।

    তোমার এমন কথার অর্থ কি?

    আমি বললাম : গ্লকন, ঊর্ধ্বলোকের জ্ঞান সম্পর্কে তোমার একটি পবিত্র ধারণা রয়েছে। আমি বলতে পারি, যদি কোনো মানুষ তার মাথাটা পেছনে হেলিয়ে উপরের ক্ষয়গ্রস্ত ছাদকে পর্যবেক্ষণ করে, তবু তুমি বলবে তার চোখ নয়, তার মনই এই ঊর্ধ্বলোককে অবলোকন করছে। হতে পারে তুমিই ঠিক এবং আমি মূর্খ। কিন্তু আমার মতে কেবল সেই জ্ঞানই আমাদের আত্মাকে ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে যে জ্ঞান হচ্ছে অদৃশ্যের এবং অস্তিত্বের জ্ঞান। এ ছাড়া কেউ বিস্ময়ান্বিত হয়ে ঊর্ধ্বাকাশের দিকে হাঁ করে তাকাল কিংবা নিম্নমুখী হয়ে সে দৃষ্টিকে সংকুচিত করল—এটা আমার নিকট মূল্যবান নয়। বস্তুত, এমনিভাবে দৃশ্যজগতের সে যা কিছুই শিখতে চাক-না কেন, আমি বলব তার পক্ষে কোনোকিছুই শেখা সম্ভব হবে না। কেননা, এর কিছুই জ্ঞান নয়। সমুদ্রে কিংবা ভূমিতে সে ভাসমান কিংবা তার নিজ পৃষ্ঠদেশের উপর সে শায়িত, তার জ্ঞানের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসলে তার আত্মা অধোমুখী, ঊর্ধ্বমুখী নয়।

    গ্লকন বললেন : তোমার ভর্ৎসনার যাথার্থ্যকে আমি স্বীকার করি। তবুও আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জ্যোতিষকে অধিকতর জ্ঞানদায়ী করে আমরা আর কীরূপে তাকে অধ্যয়ন করতে পারি?

    আমি বলছি : নক্ষত্রময় যে-আকাশকে একটা দৃশ্যমান পটভূমিতে আমরা দেখি, সে-আকাশ দৃশ্যমান বস্তুপুঞ্জের মধ্যে যতই বিস্ময়কর এবং উৎকৃষ্ট বলে বোধ হোক-না কেন, সে-আকাশ যেহেতু দৃশ্যমান সে-কারণেই যথার্থ সত্যের তুলনায় সে ঢের বেশি নিকৃষ্ট। চরম গতি এবং চরম স্থিতি—যারা কেবল যে পরস্পরনির্ভরশীল তা-ই নয়, যারা তাদের অন্তর্ভুক্ত সকল গঠন এবং সংখ্যাকেই তাদের গতির সঙ্গে বহন করে, সেই গতি এবং স্থিতির তুলনায় আমাদের দৃশ্যমান আকাশ অনেক বেশি নিকৃষ্ট। কিন্তু এই যথার্থ গতি এবং স্থিতিকে কেবলমাত্র বুদ্ধির মাধ্যমেই উপলব্ধি করা চলে, দৃষ্টির মাধ্যমে নয়। তুমি কী বল?

    তুমি ঠিক বলেছ, সক্রেটিস।

    নক্ষত্রখচিত আকশকে আমরা একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে ব্যবহার করব।

    আমাদের উদ্দেশ্য হবে এর মাধ্যমে উচ্চতর জ্ঞানকে অর্জন করা। তাদের সৌন্দর্য ডিডালাস* কিংবা অপর কোনো শিল্পীর হাতে উত্তমরূপে অঙ্কিত চিত্রের সৌন্দর্যের মতো। যে-কোনো জ্যামিতিক সে-ছবি দেখেছে সে-ই তার গঠনের কারিগরি কৌশলের প্রশংসা করবে। কিন্তু তাই বলে সেই গঠনের মধ্যে জ্যামিতিক তার যথার্থ সমতার, কিংবা দ্বিত্বের বা অপর কোনো অনুপাতের সাক্ষাৎলাভ করবে, এরূপ কল্পনাও নিশ্চয়ই কেউ করবে না।

    [ডিডালাস : গ্রীক উপাখ্যানে বর্ণিত বিখ্যাত শিল্পী। ডিডালাস আইকারাসের পিতা ছিলেন। ডিডালাস নিজের দেহে পাখা যুক্ত করে ক্রিটের রাজা মিনোসের রোষ থেকে বাঁচার জন্য পুত্র আইকারাসকে সঙ্গে নিয়ে ইজিয়ান সাগরের উপর দিয়ে ক্রিট থেকে সিসিলি উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।]

    না। এরূপ কল্পনা করা অদ্ভুতই হবে।

    এবং যথার্থ জ্যোতির্বিদ সে যখন নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে তখন তার মনেও কি অনুরূপ ভাবেরই সৃষ্টি হবে না? তারও মনে হবে, ঊর্ধ্বাকাশ এবং তার নক্ষত্ররাজির যে স্রষ্টা সে তাদের এমনি পূর্ণ করে তৈরি করেছে। কিন্তু সে নিশ্চয়ই মনে করবে না যে রাত্রি এবং দিনের যে-অনুপাত কিংবা এদের উভয়ের সঙ্গে মাসের এবং মাসের সঙ্গে বৎসরের কিংবা নক্ষত্রের সঙ্গে এদের কিংবা তাদের পরস্পরের কিংবা অপর কোনো বস্তুর যে-অনুপাত, যা আমাদের কাছে দৃশ্য, তাও শাশ্বত এবং তাদের কোনো বিচ্যুতি ঘটতে পারে না। এমন চিন্তা করা স্পষ্টতই অসঙ্গত হবে। এবং এদের যথার্থ সত্যনির্ধারণের জন্য এত পরিশ্রমসহকারে অনুসন্ধানকার্য চালানোকে আমরা সমভাবেই অসঙ্গত বলব।

    আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপেই একমত, সক্রেটিস। তবে এ-সম্পর্কে আমি পূর্বে চিন্তা করিনি।

    তা হলে জ্যামিতির ক্ষেত্রে যেমন, জ্যোতিষের ক্ষেত্রেও তেমনি আমরা যদি আমাদের বুদ্ধির স্বাভাবিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে চাই এবং বিষয়টিকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে চাই তা হলে ঊর্ধ্বাকাশের বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে জ্যোতিষের সমাধানযোগ্য সমস্যা নির্দিষ্ট করাই আমাদের আবশ্যক।

    গ্লকন বললেন : কিন্তু তেমন সমস্যার সমাধান আমাদের বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ক্ষমতার নিশ্চয়ই বাইরে?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক। কিন্তু বিধায়ক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব যদি পালন করতে চাই তা হলে তাদের জন্য এরূপ সমস্যা আমাদের নির্দিষ্ট করতে হবে। কিন্তু তুমি কি উপযুক্ত অপর কোনো বিষয়ের কথা চিন্তা করছ?

    না। এই মুহূর্তে আমার তেমন কোনো বক্তব্য নেই।

    আমি বললাম : গতিরও অনেক রূপ আছে, কেবল একটি নয়। দুটি রূপ তো আমাদের মতো সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছেই স্পষ্ট। অন্য রূপগুলোর অনুধাবানের কাজ অবশ্য অধিকতর জ্ঞানীদের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।

    কিন্তু যে-দুটি রূপের কথা বলছ—সে-দুটি রূপ কী?

    দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমাদের উল্লিখিত একটির পরিপূরক।

    কী সেটি?

    এই দ্বিতীয়টি আমাদের কানের নিকট তেমনই বোধ হবে, প্রথমটি চোখের কাছে যেরূপ বোধ হয়েছে। কারণ, আমি মনে করি চোখ যেমন তৈরি হয়েছে ঊর্ধ্ব নক্ষত্রের দিকে তাকাবার জন্য, তেমনি আমাদের কানও তৈরি হয়েছে সঙ্গতিপূর্ণ গতির জন্য। এবং পাইথাগোরীয়গণ* যেভাবে বলেছেন, এ-দুটি জ্ঞান তেমনিভাবে সহযোগী জ্ঞান। এ বিষয়ে পাইথাগোরীয়দের সঙ্গে আমরা একমত হতে পারি, কী বল গ্লকন?

    [* পাইথাগোরীয়গণ : প্রাচীন দার্শনিক পাইথাগোরাস বা পিথাগোরাস (৫৮০-৫০০ খ্রিঃ পূঃ)-এর অনুসারীগণ। পাইথাগোরাসের মতে বিশ্ব-অস্তিত্বের মূল হচ্ছে সংখ্যা। তাঁর অনুসারীগণ সংখ্যার উপর অলৌকিক ক্ষমতাও আরোপ করতেন। সংখ্যা ছিল তাঁদের কাছে শক্তির প্রতীক।]

    হ্যাঁ, এক্ষেত্রে আমরা তাঁদের সঙ্গে একমত হতে পারি।

    আমি বললাম : কিন্তু এটি বেশ পরিশ্রমসাধ্য বিষয়। এই আলোচনার পূর্বে আমাদের একে শিখতে হবে। এর শিক্ষকরাই আমাদের বলবেন, এই সমস্ত জ্ঞানের অপর কোনো প্রয়োগ সম্ভব কি না। যা-ই হোক আমাদের উচ্চতর লক্ষ্যটিকেও বিস্মৃত হলে চলবে না।

    উচ্চতর কোন্ লক্ষ্যের কথা বলছ?

    প্রত্যেক জ্ঞানেরই একটা লক্ষ্য থাকবে, সম্পূর্ণতাকে অর্জন করা। আমাদের শিক্ষার্থীদেরও সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। জ্যোতিষশাস্ত্রের ক্ষেত্রে আমরা যেরূপ ব্যর্থতা দেখেছি, এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীর সেরূপ ব্যর্থ হলে চলবে না। কারণ, তুমি নিশ্চয়ই জান সঙ্গতির জ্ঞানেও একই সমস্যা। জ্যোতিষশাস্ত্রীয়দের মতো, সঙ্গতি বা ঐকতানের যাঁরা শিক্ষক তাঁরাও শব্দ এবং তার শ্রুত মিলকে তুলনা করার বৃথা চেষ্টায় তাঁদের সময় নষ্ট করেন।

    গ্লকন বললেন : তুমি ঠিক বলেছ, সক্রেটিস। এ-বিষয়ে তাঁদের আলোচনা যথার্থই বালসুলভ। তাঁরা দুই শব্দের মধ্যবর্তী বিষয়কে অন্বেষণ করেন এবং তাকে পাবার জন্য এরূপ একনিষ্ঠতার সঙ্গে কান পেতে থাকেন যেন তাঁরা প্রতিবেশীর কোনো আলোচনাকে আড়ি পেতে শ্রবণ করছেন। এই প্রক্রিয়ায় একদল বলে ওঠেন, তাঁরা একটি অন্তরালকে আবিষ্কার করেছেন এবং শব্দ-পরিমাপের একক হিসাবে ন্যূনতম বিষয়কে তাঁরা স্থির করেছেন। অপরপক্ষ প্রতিবাদ করে বলেন : না, শব্দ দুটি মিলে গেছে—তাদের মধ্যে কোনো বিরাম নেই। এই সমস্যার সমাধানে দু দলই যেন তাঁদের বুদ্ধির দেয়ালে কান পেতে বসে থাকেন।

    গ্লকন, তুমি নিশ্চয়ই সেই ভদ্রলোকদের কথা বলছ যারা বীণার তারগুলোর কান মলে মলে তাদের বিরক্তির একশেষ করে ছাড়েন। আমি তোমার উপমাটি আর-একটু বাড়িয়ে নিয়ে ছিলার ওপর ধনুকের আঘাত, তার বিরুদ্ধে করা এবং না-করার অভিযোগ, তার কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা এবং ছিলার দ্বিধাহীন অস্বীকারের কথা বলতে পারি।* কিন্তু আমি তা বলব না। আমি শুধু বলব, এদের কথা আমি ভাবিনি। আমি ভেবেছি পাইথাগোরীয়দের কথা। তারাই শব্দের ঐকতান সম্পর্কে আমাদের বলতে পারে। কারণ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যেমন, এঁরাও তেমনি শ্রুত শব্দের মধ্যে সাংখ্যিক সম্পর্ক আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। কিন্তু এঁরাও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতোই ভ্রান্ত। কারণ, এঁরা এর কোনো সমস্যা নির্ধারণ করতে পারেন না। অর্থাৎ সংখ্যার স্বাভাবিক সঙ্গতির সত্যকে এঁরা আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হন। এঁরা বলতে পারেন না, সংখ্যার মধ্যে কতকগুলিকে এঁরা কেন সঙ্গতিময় বলছেন, কেনই-বা অপরগুলিকে সঙ্গতিহীন বলছেন।

    [* এই উপমাটিতে অভিযোগের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য দাসদের উপর অত্যাচারের প্রচলিত প্রথাটির আভাস পাওয়া যায়। — কর্নফোর্ড]

    এ-সমস্যার সমাধান নিশ্চয়ই মানুষের সাধ্য নয়।

    কিন্তু তবু এরূপ চেষ্টাকে আমরা কাজের চেষ্টা বলতে পারি, একেবারে অকাজের নয়। পরিণামে উত্তম এবং সুন্দরকে লাভ করাই যদি উদ্দেশ্যে হয়, তা হলে এ-চেষ্টা কাজের চেষ্টা। অন্যথায় এ হবে অকাজের চেষ্টা।

    খুবই সত্য কথা।

    কিন্তু এই সমস্ত বিষয়কে আমাদের সংবদ্ধ করতে হবে। সকল জ্ঞান যখন সুসংবদ্ধ হবে, তাদের পরস্পরের মধ্যে যখন আন্তঃসম্পর্ক স্থাপিত হবে, এবং তাদের পারস্পরিক সাযুজ্যের চরিত্রে যখন আমরা সকল জ্ঞানকে উপলব্ধি করতে পারব, তখনই মাত্র আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য সর্থক হবে। অন্যথায় এ-শিক্ষা আমাদের কোনো উপকারসাধন করবে না।

    আমিও তাই মনে করি। কিন্তু সক্রেটিস, তুমি এক বিরাট দায়িত্বের কথা বলছ।

    কী বলছ গ্লকন! সূচনাকেই তুমি বিরাট বলছ? তুমি কি জান না, যে-বিষয়গুলির আমরা উল্লেখ করেছি তা আমাদের মূল বিষয়ে যাওয়ার সূচনামাত্র। কারণ তুমি নিশ্চয়ই দক্ষ গাণিতিককে একজন দ্বান্দ্বিক বা দার্শনিক বলবে না?

    অবশ্যই না। কারণ এমন কোনো গাণিতিককে আমি জানিনে যে একই সঙ্গে যুক্তিবিদও।

    কিন্তু যে-মানুষ যুক্তি আদান-প্রদানে দক্ষ নয় তার পক্ষে যে-জ্ঞানের আমরা উল্লেখ করেছি সে-জ্ঞান কি অর্জন করা সম্ভব হবে?

    না। এরূপও আমরা আশা করতে পারিনে।

    গ্লকন, তা হলে আমরা বলতে পারি যে, আমরা দ্বান্দ্বিকতা বা দর্শনের* স্তব-ক্ষেত্রটিতে উপস্থিত হয়েছি। এ-জ্ঞানের প্রক্রিয়া হচ্ছে, কেবল বুদ্ধির প্রক্রিয়া। অবশ্য দৃশ্যজগতেও এর অনুকারী থাকে। কারণ তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে দৃষ্টি সম্পর্কে আমরা বলেছিলাম যে, দৃষ্টিও কিছু পরে যথার্থ জন্তু এবং তারকা এবং সবশেষে সূর্যকেও দেখতে পারে। দর্শনের ক্ষেত্রেও তা-ই। যখন কোনো মানুষ কেবলমাত্র যুক্তির আলোতে, ইন্দ্রিয়ের কোনোরূপ সাহায্য ব্যতিরেকে পরম সত্তাকে আবিষ্কারের যাত্রা শুরু করে এবং বিরামহীনভাবে এই উদ্দেশ্য নিয়ে সে-অভিযানে অগ্রসর হতে থাকে যে, বিশুদ্ধ যুক্তি দ্বারা পরম সত্যকে উপলব্ধি না করা পর্যন্ত তার যাত্রা সে থামাবে না, তা হলে দৃষ্টি যেমন দৃশ্যের শেষে সূর্যকে দেখছে, তেমনি যুক্তি তার যাত্রার শেষে পরম সত্তাকে অবলোকন করবে।

    [* ইংরেজি ‘ডায়ালেকটিকস’ শব্দটির অর্থ স্পষ্ট করার জন্য ‘দ্বান্দ্বিকতা বা দর্শন’ কথাটির ব্যবহার করা হয়েছে।]

    যথার্থ বলেছ, সক্রেটিস।

    তা হলে এই অগ্রগতিকেই তুমি দ্বান্দ্বিকতা বা দর্শন বলবে?

    হ্যাঁ।

    আমাদের গুহার বন্দিদের মুক্ত করে দিয়ে তাদের মুখকে ছায়া থেকে প্রতিকৃতির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে-প্রতিকৃতি ছায়াগুলিকে নিক্ষেপ করেছিল এবং অগ্নির দিকেও তাদের দৃষ্টি পড়েছিল। গুহা থেকে তারপর বন্দিরা সূর্যের আলোতে উঠে এসেছিল। এখানে তারা জন্তু এবং উদ্ভিদ এবং সূর্যকে প্রথম দেখতে পাচ্ছিল না। তখন তারা পানির মধ্যে যথার্থ বস্তুর নিক্ষিপ্ত ছায়ার দিকে তাকাল। এ-ছায়া যথার্থ বস্তুর ছায়া ছিল, আগুনের আলো দ্বারা নিক্ষিপ্ত প্রতিকৃতির ছায়া নয়। এই পরিক্রমেই আমাদের শিক্ষার বিষয়গুলি আত্মার উত্তম চরিত্রকে ধাপে ধাপে পরম সত্য অবলোকনের দিকে অগ্রসর করে নিয়ে যাবে—যেমন করে আমাদের দেহের সবচাইতে অনুভবকারী ইন্দ্রিয় দৃশ্যজগতের সার্বাধিক উজ্জ্বল বস্তুকে ক্রমান্বয়ে এবং সর্বশেষে দেখতে সক্ষম হয়েছে।

    সক্রেটিস, তুমি যা বলেছ, তার সঙ্গে আমি একমত। যদিও এর কিছু আছে যা গ্রহণ করা শক্ত এবং কিছু আছে যা অস্বীকার করা শক্ত। যাহোক, বিষয়টির আলোচনা এখনই শেষ হবে, এমন আমরা মনে করতে পারিনে। একে বারংবারই আমাদের আলোচনা করতে হবে। তাই আমাদের সিদ্ধান্ত পরিণামে সত্য কিংবা মিথ্যা প্রমাণিত হবে সে-প্রশ্ন মুলতুবি রেখে আমাদের অভিমতকে সত্য ধরে নিয়ে সূচনা থেকে সরাসরি মূল বিষয়টিতে যাওয়া এবং ভূমিকার মতোই বিস্তৃতভাবে বিষয়টির আলোচনা করা আমাদের পক্ষে সঙ্গত হবে। তুমি আমাদের বলো, এই দ্বান্দ্বিকতার বা দর্শনের শক্তি কী এবং তার বিভাগ কয়টি এবং কী উপায়ে আমরা এই দর্শনে পৌঁছতে সক্ষম হব। কারণ, এই পথ ধরেই আমরা আমাদের এই যাত্রার শেষ লক্ষ্যে গিয়ে উপনীত হতে পারব।

    প্রিয় গ্লকন, এর অধিক তুমি আমার সঙ্গে অগ্রসর হতে পারবে না। আমার অনিচ্ছার কারণে নয়, কারণ, এর পর যা তুমি অবলোকন করবে তা আর প্রতিকৃতি হবে না, তা যথার্থ সত্য হবে। আমার দৃষ্টির ক্ষমতা সম্পর্কেও আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু একথা নিশ্চিত যে, এবার আমাদের জন্য যথার্থই দর্শনীয় কিছু থাকবে। তুমি কি এরূপ মনে কর না?

    নিঃসন্দেহে।

    কিন্তু গ্লকন, তোমাকে আমি একথাও স্মরণ করিয়ে দেব যে, দ্বান্দ্বিকতার শক্তিই মাত্র এই সত্যকে উদ্‌ঘাটিত করতে পারে এবং আমরা যেসব জ্ঞানের উল্লেখ করেছি তার অনুসারীদের নিকটই মাত্র এই সত্য উদ্ভাসিত হবে। ঠিক নয় কি?

    এ-সম্পর্কে তুমি পূর্বের ন্যায়ই নিশ্চিত হতে পার।

    এবং একথা অস্বীকার করা চলে না যে, কেবল দ্বান্দ্বিকতার এই প্রক্রিয়াই বস্তুর অপরিহার্য চারিত্রকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে। অন্য প্রক্রিয়ার কোনোটি মানুষের ধারণা কিংবা ইচ্ছা বা কোনোকিছুকে তৈরি করা এবং তৈরি হলে কিংবা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে তাদের পরিচর্যা করা—প্রভৃতি প্রশ্ন সমাধানের চেষ্টা করে। আবার জ্যামিতির ন্যায় জ্ঞানের অপর বিষয়গুলি যদিও সত্য নিয়ে চিন্তা করে কিন্তু তারাও যতক্ষণ তাদের সূত্রগুলিকে বিনা প্রশ্নে ধরে নেবে এবং তাদের ব্যাখ্যাদানে ব্যর্থ হবে, ততক্ষণ সত্যকে স্বপ্নে দেখার ন্যায় লাভ করা ব্যতীত সত্যকে স্পষ্টভাবে তারা অবলোকন করতে পারবে না। কারণ, যে-প্রতিজ্ঞা বা দত্ত সত্যের কোনো জ্ঞান তোমার নেই তার উপর ভিত্তি করে কেবল যুক্তির শেকল দ্বারা তুমি যখন মধ্যবর্তী স্তর তৈরি কর এবং এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর যে-স্তর এবং সিদ্ধান্ত অজানার উপর প্রতিষ্ঠিত বলে তার জ্ঞানও তোমার জানা নেই, তখন এই প্রক্রিয়াটি তোমাকে যথার্থ জ্ঞান কেমন করে দান করতে পারে?

    না, এ-প্রক্রিয়া আমাকে জ্ঞানদান করতে পারে না।

    দ্বান্দ্বিকতা বা দর্শনই হচ্ছে একমাত্র জ্ঞানমাধ্যম যার পদ্ধতি হচ্ছে তার মৌলিক সূত্র বা দত্ত সত্যকে সত্যের মাপকাঠিতে পরীক্ষা করা যাতে জ্ঞানের পরিক্রম দৃঢ় নীতির ভিত্তিতে শুরু হতে পারে। তাই আমাদের আত্মার চোখ যখন অজ্ঞানতার কাদামাটিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখনই দর্শন তাকে সযত্নে তুলে এনে জ্ঞানমশালের সাহায্যে তাকে সত্যের পথে পথ প্রদর্শন করে এগিয়ে নেয়। আমাদের আলোচিত বিষয়গুলিকে আমরা প্রচলিত রীতিতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বলে অভিহিত করেছি। আদতে আমাদের প্রয়োজন, ভিন্ন কোনো উপযুক্ত শব্দের যার দ্বারা আমরা এদের বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ ধারণার চেয়ে এরা যে স্পষ্টতর এবং জ্ঞানের চেয়ে যে অস্বচ্ছ, সেকথা প্রকাশ করতে পারি। পূর্বে আমরা এজন্য ‘বোধ’ শব্দকে ব্যবহার করেছি। যা-ই হোক, শব্দ নিয়ে ঝগড়া করে লাভ নেই। আমাদের বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ যে শব্দের তর্ক এখানে অচল।

    এ কথা সত্য।

    তাই মনের যে-ক্ষমতাকে আমরা বোঝাতে চাচ্ছি, তাকে যে-শব্দ প্ৰকাশ করতে সক্ষম হবে তাকেই আমরা ব্যবহার করব।

    তা ঠিক।

    এ ক্ষেত্রে আমরা মনের সেই চারটি ভাগেই সন্তুষ্ট থাকব। বুদ্ধির দুটি ভাগ এবং ধারণার দুটি। এদের প্রথমটিকে আমরা বলেছি জ্ঞান, দ্বিতীয়টিকে বোধ, তৃতীয়টিকে ধারণা এবং চতুর্থটিকে ভ্রম। ভ্রমের অনুভব হচ্ছে ছায়া, ধারণার হচ্ছে পরিবর্তন এবং বোধের অস্তিত্ব। এদের অনুপাত বোঝাতে গিয়ে আমরা বলতে পারি :

    [* দ্রষ্টব্য : ৫১১।]

    পরিবর্তনের সঙ্গে অস্তিত্বের যে অনুপাত, জ্ঞানের সঙ্গে ধারণার সেই অনুপাত এবং ধারণার সঙ্গে জ্ঞানের যে অনুপাত ধারণার সঙ্গে বোধের সেই অনুপাত এবং বোধের সঙ্গে ভ্রমেরও তেমনি অভিন্ন অনুপাত। কিন্তু এ-অনুপাতের অধিকতর সম্পর্ক এবং ধারণা ও বুদ্ধির উপভাগের প্রশ্নটি আমাদের স্থগিত রাখা ভালো। কারণ, এ-আলোচনা বর্তমানের চেয়ে অধিকতর দীর্ঘ হওয়ারই আশঙ্কা।

    গ্লকন বললেন : আমি যত দূর বুঝতে পারছি তাতে তোমার প্রস্তাবের সঙ্গে আমি একমত সক্রেটিস।

    তা হলে তুমি কি আমার সঙ্গে একমত হয়ে বলবে যে, দ্বান্দ্বিক বা দার্শনিক হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে প্রত্যেক বস্তুর অপরিহার্য সত্তাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম? এবং যে-ব্যক্তির বস্তুর এই সত্তার জ্ঞান নেই এবং সে-কারণে সেই জ্ঞানদানে সে অক্ষম, সে-ব্যক্তি তার সেই অক্ষমতার অনুপাতে জ্ঞানের ক্ষেত্রেও অক্ষম বলে বিবেচিত হবে? এরূপ অভিমত কি তুমি সমর্থন করবে?

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, একে আমি অস্বীকার করি কী প্রকারে?

    উত্তমের ধারণা সম্পর্কেও তোমাকে এই কথাই বলতে হবে। কারণ, যাকে তুমি উত্তমের জ্ঞানী বলতে চাও সে যদি উত্তমের ভাবকে অপর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্তির ভিত্তিতে উত্তমের সংজ্ঞানির্ধারণ করতে সক্ষম না হয়, যদি তার সংজ্ঞাকে সকল প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে, কেবল ধারণার ভিত্তিতে নয়, যুক্তির ভিত্তিতে রক্ষা করতে এবং তার যুক্তিকে বিজয়ী করতে না পারে, তা হলে তাকে তুমি পরম উত্তমের জ্ঞানে কিংবা কোনো উত্তমের জ্ঞানেই জ্ঞানী বলতে পার না। এরূপ লোকের যা-কিছু ‘জ্ঞান’ তার ভিত্তি ধারণা, যথার্থ জ্ঞান নয়। তুমি বলতে পার, সে এক স্বপ্নের জগতে বাস করছে এবং করবে। চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার পূর্বে সে আর এই স্বপ্ন থেকে জাগরিত হতে পারবে না।

    তুমি যা বলেছ তার সঙ্গে আমি অবশ্যই একমত।

    এবং এও তুমি নিশ্চয়ই চাইবে না, তোমার আদর্শ রাষ্ট্রের সন্তানরা অর্থাৎ যাদের তুমি প্রতিপালন করছ এবং শিক্ষিত করে তুলছ, যারা তোমার রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শাসক, তারা যুক্তিশূন্য দণ্ড হয়ে রাষ্ট্রের গুরু দায়িত্ব বহন করবে?

    অবশ্যই না।

    তা হলে তোমাকে একটি বিধান করতে হবে যে, তরুণদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে যাতে তারা প্রশ্নের জিজ্ঞাসায় এবং জবাবে সর্বাধিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, তুমি এবং আমি মিলিতভাবেই এই বিধানও তৈরি করব।

    দ্বান্দ্বিকতা বা দর্শনকে তাই আমরা সকল জ্ঞানের শীর্ষ প্রস্তর বলে আখ্যায়িত করতে পারি। সকল জ্ঞানের উপর এ-প্রস্তর স্থাপিত। কোনো জ্ঞানই একে অতিক্রম করে যেতে পারে না।

    একথা ঠিক।

    কিন্তু এই শিক্ষার দায়িত্ব আমরা কাদের উপর ন্যস্ত করব? এবং কী প্রকারে এ দ্বায়িত্ব ন্যস্ত করা হবে—এ প্রশ্নও আমাদের আলোচনা করতে হবে।

    হ্যাঁ, এ-আলোচনা আমাদের বাকি রয়েছে।

    তোমার নিশ্চয় স্মরণ আছে, শাসকদের আমরা কীভাবে বাছাই করেছিলাম?

    হ্যাঁ, সেকথা আমার অবশ্যই স্মরণ আছে।

    সেই চরিত্রকে আমাদের এখানেও বাছাই করতে হবে। যারা সবচেয়ে দৃঢ় এবং সাহসী, তাদের এবং সম্ভব হলে যারা সবচেয়ে সুন্দর তাদেরকে আমরা অপর সকলের তুলনায় অগ্রগণ্য বিবেচনা করব। এদের মেজাজ হতে হবে মহৎ এবং উদার এবং এদের মধ্যে এমন সহজাত গুণ থাকতে হবে যে-গুণ তাদের শিক্ষাকে সহজ করে তুলবে।

    কোন্ সহজাত গুণের কথা বলছ?

    যেমন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং জ্ঞানলাভের ত্বরিত ক্ষমতা। কারণ, মনের জন্য অধ্যয়নের কষ্ট শরীরচর্চার চেয়ে কম নয়। মন অনেক সময়ে অধ্যয়নের কষ্টে সংবিৎ হারিয়ে ফেলে। অধ্যয়নের কষ্ট সমগ্ররূপেই মনের। তার এই কষ্ট দেহ ভাগ করে নিয়ে হ্রাস করতে পারে না। সত্য নয় কি?

    খুবই সত্য কথা।

    তা ছাড়া যাদের অনুসন্ধান করছি, তাদের স্মরণশক্তিও উত্তম হতে হবে। এবং তাদের ক্লান্তিহীন হতে হবে এবং যে-কোনো প্ররিশ্রমে তাদের আগ্রহী হতে হবে। তা না হলে যে বিরাট পরিমাণ শারীরিক এবং মানসিক শ্রম এবং অধ্যয়নের ভার বহন করতে হবে, তা বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।

    নিঃসন্দেহে। তাদের এই স্বাভাবিক গুণগুলি থাকতে হবে।

    বর্তমানের ত্রুটি হচ্ছে এই যে, যারা দর্শন অধ্যয়ন করে তারা কোনো দায়িত্বপালন করে না। আমি পূর্বে বলেছি* এ-কারণেই দার্শনিকদের দুর্নাম। আমাদের রাষ্ট্রের যারা উপযুক্ত সন্তান, যারা কলঙ্কজাত নয়, তাদেরই অধিকার থাকবে দর্শনকে বরণ করার।

    [* দ্রষ্টব্য : ৪৯৭।]

    তোমার একথার কী অর্থ?

    প্রথমত, দর্শনের যে ভক্ত তাকে শ্রমে দ্বিধাগ্রস্ত হলে চলবে না। অর্থাৎ কিছুটা পরিশ্রমী এবং কিছুটা অলসতাকে এমন স্বভাবের হলে চলবে না। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে সেই মানুষ যে একদিকে শরীরচর্চা, শিকার এবং অন্যান্য দৈহিক পরিশ্রমে বিশেষ আগ্রহী কিন্তু শিক্ষার পরিশ্রমে কিংবা আলোচনা শ্রবণে বা জিজ্ঞাসায় সে বিমুখ। আবার এর বিপরীত প্রবণতার লোকও রয়েছে।

    যথার্থ।

    তেমনি সত্যের ক্ষেত্রেও আমরা সেই আত্মাকে অবশ্যই দ্বিধাগ্রস্ত এবং পঙ্গু বল গণ্য করব, যে-আত্মা স্বেচ্চাকৃত ভুলকে ঘৃণা করে এবং যারা মিথ্যা বলে তাদের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বটে কিন্তু অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাকে সহ্য করতে যার আদৌ বাধে না এবং যে অক্লেশে মানুষের শূকরের ন্যায় অজ্ঞানতার পাঁকে ডুবে থাকতে কোনো সঙ্কোচ বোধ করে না। এবং এরূপ অবস্থায় সে দৃষ্ট হলেও কোনো লজ্জা বোধ করে না।

    তোমার সঙ্গে আমি একমত, সক্রেটিস

    তা ছাড়া সংযম, সাহস, মহানুভবতা এবং অনুরূপ সব গুণের ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রের যথার্থ সন্তান এবং কলঙ্কজাত চরিত্রের মধ্যে সতর্কতার সঙ্গে পার্থক্য স্থির করতে হবে। কারণ যেখানে এরূপ পার্থক্য নির্দিষ্ট নয় সেখানেই রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির অচেতন ভ্রান্তির জন্ম হয়। ফলে রাষ্ট্র এমন ব্যক্তিকে শাসক তৈরি করে এবং ব্যক্তি এমন লোককে সুহৃদ বলে গ্রহণ করে যে-ব্যক্তি চরিত্রগত ত্রুটির কারণে পঙ্গু কিংবা কলঙ্কিত বলেই বিবেচতি হওয়ার যোগ্য।

    তোমার একথাও সত্য, সক্রেটিস।

    তা হলে এই বিষয়গুলির প্রতি আমাদের সযত্ন দৃষ্টি রাখতে হবে। যে-বিরাট শিক্ষার পরিকল্পনা আমরা রচনা করেছি তার জন্য যদি আমরা দেহ এবং মনে যারা সুস্থ কেবল তাদেরই নির্দিষ্ট করি তা হলে আমাদের বিরুদ্ধে ন্যায়ের কোনো অভিযোগ থাকবে না। এ-কর্তব্য সম্পাদন দ্বারা আমাদের সংবিধান এবং রাষ্ট্রের পরিত্রাতার ভূমিকাই আমরা পালন করব। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীগণ যদি ভিন্ন চরিত্রের হয় তা হলে তার ফল বিপরীত হবে। তখন দর্শন যত-না দুর্নাম পূর্বে ভোগ করেছে, তার চেয় অধিক পরিমাণে সে পরিহাস এবং দুর্নামের পাত্র হয়ে উঠবে।

    হ্যাঁ। তা হলে সেটা আমাদের জন্য কোনো প্রশংসার বিষয় হবে না।

    অবশ্যই তা প্রশংসার বিষয় হবে না। কিন্তু গ্লকন, আমি হয়তো আমার রসিকতাকে একটু অধিক গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করে নিজেকেই পরিহাসের পাত্র করে তুলছি।

    কীভাবে, সক্রেটিস?

    আসলে আমি ভুলে গেছি যে, আমরা এই কথাটাকে খুব গুরুগম্ভীর ভাবে বলতে চাইনি। সেটি ভুলে গিয়ে আমরা বেশি মাত্রায় উত্তেজনা প্রকাশ করেছি। দর্শনকে অযোগ্যের পায়ের নিচে দলিত হতে দেখে আমি এই দূর্বত্তদের প্রতি বিক্ষুব্ধ না হয়ে পারিনি। কিন্তু আমার মনের সেই ক্রোধ অমাকে অত্যধিক পরিমাণে উত্তেজিত করে ফেলেছে।

    আচ্ছা! তোমার কথা শোনাতেই এত নিবিষ্ট ছিলাম যে ব্যাপারটি আমি লক্ষ করিনি।

    কিন্তু বক্তা হিসাবে বলতে বলতে আমি উত্তেজনাটি বোধ করছিলাম। গ্লকন, এখানে একটা জিনিস তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া আবশ্যক। যদিও পূর্বে আমরা বৃদ্ধ মানুষকেও বাছাই করেছিলাম, কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে বৃদ্ধদের বাছাই করলে চলবে না। সলোন* বলেছিলেন মানুষ যখন বৃদ্ধ হয় তখন সে অনেক কিছু শিখতে পারে। আমরা বলব, এমন বক্তব্যে সলোন ভ্রান্ত ছিলেন। কারণ বৃদ্ধবয়সে সে যেমন দৌড়ে পটু নয়, তেমনি সে শিক্ষায়ও পটু হতে পারে না। যৌবনই হচ্ছে শ্রমের সময় : সকল অসাধ্য সাধনের সময়।

    [* সলোন (৬৪০-৫৫৯ খ্রিঃ পূঃ ) প্রাচীন এথেন্সের রাষ্ট্রনেতা এবং আইনবিদ। অভিজাত এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরোধ-নিরসনে এবং এথেন্সের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধানের প্রগতিমূলক সংস্কার-সাধনে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন।]

    নিঃসন্দেহে।

    কাজেই গণিত এবং জ্যামিতি এবং শিক্ষাসূচির অপর যেসব বিষয় দ্বান্দ্বিকতা বা দর্শনের পথকে প্রস্তুত করে তার শিক্ষা শৈশবেই দেওয়া আবশ্যক। অবশ্য এজন্য কোনো জবরদস্তিকে আমরা প্রয়োগ করব না।

    কেন?

    কারণ, যে স্বাধীন মানুষ সে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও দাস হতে পারে না। শরীরচর্চা বাধ্যতামূলক হতে পারে। শরীরচর্চা বাধ্যতামূলক হলে তাতে দেহের কোনো ক্ষতি সাধিত নয় না। কিন্তু যে জ্ঞানে জবরদস্তি, সে জ্ঞান মনের কোনো উন্নতি সাধন করতে পারে না।

    খুবই যথার্থ কথা।

    আমি বললাম : প্রিয় বন্ধু, তাই জ্ঞানদানে জবরদস্তি প্রয়োগ কোরো না। শৈশবের শিক্ষা আনন্দের বিষয় হোক। তা হলেই তুমি যার মধ্যে যে- স্বাভাবিক প্রবণতা আছে তাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে।

    তোমার এ-অভিমতটি খুবই যুক্তিসঙ্গত।

    আচ্ছা গ্লকন, তোমার কি স্মরণ আছে, আমরা বলেছিলাম তরুণদের অশ্বপৃষ্ঠে যুদ্ধক্ষেত্রেও নিয়ে যেতে হবে। এবং বিপদের আশঙ্কা না থাকলে যুদ্ধের সন্নিকটে তাদের নিয়ে যেতে হবে এবং শিকারি কুকুরের ন্যায় তাদের রক্তের স্বাদও পেতে দিতে হবে?

    হ্যাঁ, একথা আমার স্মরণ আছে।

    সেই একই কৌশল আমাদের এইসব বিষয়ে–শ্রম, শিক্ষা এবং বিপদের ক্ষেত্রে, গ্রহণ করতে হবে। আর এই পরীক্ষায় যে সর্বোত্তম বলে পরিচিত হবে তাকেই আমরা নির্বাচিতদের তালিকাভুক্ত করে নেব।

    কিন্তু কোন্ বয়সে?

    এর শুরু হবে শরীরচর্চা যখন শেষ হয়েছে তখন। যে-দুতিন বছর এরূপ শিক্ষায় ব্যয়িত হতে পারে সে-সময়টা অন্য কোনো শিক্ষার জন্য উপযুক্ত নয়। কারণ, ব্যায়াম এবং নিদ্রা কোনো বুদ্ধিগত শিক্ষার সহায়ক নয়। এই শিক্ষার সময়ে তাই শারীরিক কসরতে কে প্রথম হতে পারল, সেটাকেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলে গণ্য করতে হবে।

    হ্যাঁ, ব্যায়ামের সময়ে এটাই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে।

    এরপর বিশ বৎসর বয়স্ক থেকে যাদের বাছাই করা হবে তাদের উচ্চতর সম্মানে উন্নীত করা হবে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব জ্ঞানশিক্ষায় কোনো ক্রম অনুসরণ করা হয়নি সেসব বিষয়কে সম্মিলিত করা হবে এবং শিক্ষার্থীগণ এবার সকল জ্ঞানের পরস্পরের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্ককে যেমন অনুধাবন করতে পারবে তেমনি যথার্থ সত্যের সঙ্গেও সকল জ্ঞানের সম্পর্ক উপলদ্ধি করতে সক্ষম হবে।

    হ্যাঁ, এরূপ জ্ঞানই মাত্র দৃঢ়মূল হতে পারে।

    হ্যাঁ, এবং এরূপ জ্ঞানের ক্ষমতাই দ্বান্দ্বিক বা দার্শনিক দক্ষতার স্মারক। কারণ দ্বান্দ্বিক ক্ষমতার অর্থ হচ্ছে সামগ্রিক দৃষ্টির ক্ষমতা। সামগ্রিক মনই দ্বান্দ্বিক বা দার্শনিক মন।

    আমি তোমার সঙ্গে একমত।

    এই বিষয়গুলি আমাদের বিবেচনা করতে হবে। যাদের এই সামগ্রিক উপলব্ধির ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, যারা তাদের শিক্ষায় অধিক অবিচল এবং যারা সামরিক এবং অন্য দায়িত্বে অধিকতর দৃঢ় তাদের বয়স যখন ত্রিশে পৌঁছেছে, তখন তাদের বাছাই করে উচ্চতর সম্মানে উন্নীত করতে হবে। এবং দ্বান্দ্বিকতার পরীক্ষায় আমরা নির্দিষ্ট করব তাদের, যারা চোখ কিংবা অপর কোনো ইন্দ্রিয় ব্যতিরেকে বিশুদ্ধ সত্তার সত্যকে অনুধাবনে সক্ষম। এখানে আমাদের অতিশয় সতর্কতার সঙ্গেই অগ্রসর হতে হবে।

    বিশেষ সতর্কতার কথা কেন বলছ, সক্রেটিস?

    গ্লকন, তুমি দ্বান্দ্বিকতার মারাত্মক ক্ষতির দিকটি লক্ষ করনি? এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীর মনে যে-ক্ষতি সে সাধন করতে পারে সে-বিষয়টি খেয়াল করনি?

    কী ক্ষতির কথা বলছ?

    এ-বিদ্যা শিক্ষার্থীর মনকে উচ্ছৃঙ্খলতায় পূর্ণ করে তোলে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, এটা অস্বীকার করা যায় না।

    কিন্তু একে কি তুমি খুব অস্বাভাবিক বলে ভাবতে পার? শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এরূপ মনোভাব কি ক্ষমার অযোগ্য? না, এদের পক্ষেও বলার কিছু আছে বলে তুমি মনে করবে?

    এদের পক্ষে বলার কী থাকতে পারে?

    আমি তোমাকে এদের অনুরূপ অপর একটি দৃষ্টান্তকে কল্পনা করতে বলি। মনে করো একটি যুবক প্রচুর ধনসম্পদের মধ্যে বর্ধিত হয়েছে। এরকম ধনবান পরিবারের সংখ্যা কম নয়। এরূপ পরিবারের সন্তান সে। তার স্তাবকের অভাব নেই। কিন্তু যখন সে পূর্ণবয়স্ক হয়ে উঠল, তখন সে শুনতে পেল যারা তার পিতামাতা বলে পরিচিত, আসলে তারা তার পিতামাতা নয়। কিন্তু তার যথার্থ পিতামাতা কে—তা বার করতেও সে অক্ষম। এমন অবস্থায় এই যুবক তার স্তাবকের দল এবং কথিত পিতামাতার প্রতি কীরূপ আচরণ করবে বলে তুমি মনে কর? তার দুটি ব্যবহারের তুলনা করো। প্রথমত, যখন সে তার এই ভিত্তিহীন সম্পর্কের ব্যাপারে অজ্ঞ ছিল অর্থাৎ তার এই ‘পিতামাতা’ যে তার যথার্থ পিতামাতা নয় সেকথা যখন সে জানত না এবং যখন সে জানল যে এই পিতামাতা তার যথার্থ পিতামাতা নয়—এই দুটি সময়ের আচরণ দুটি তার কী প্রকারের হবে বলে তুমি মনে কর? কিংবা তোমার জবাবটি আমি আন্দাজ করব?

    আমার জবাবই তুমি আন্দাজ করো, সক্রেটিস।

    তুমি হয়তো বলবে, সম্পর্কের সত্যতার বিষয়ে যখন সে অজ্ঞ, তখন সে তার পিতামাতা এবং আত্মীয়জনদের তার স্তাবকদের চাইতেও অধিক সম্মানের চোখে দেখবে। তাদের অভাবে এবং প্রয়োজনে তাদের প্রতি সেবামূলক মনোভাব তার কমের চেয়ে অধিক হবে এবং তাদের সম্পর্কে কোনো বিরূপ মন্তব্য উচ্চারণ করা থেকে সে বিরত থাকবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তাদের অবাধ্য হওয়ার প্রবণতা তার থাকবে না। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, আমার তা-ই মনে হয়।

    যখন সে সত্যকে আবিষ্কার করল (যখন সে জানতে পারল এই পিতামাতা তার যথার্থ পিতামাতা নয়) তখন তাদের প্রতি তার সম্মান ও শ্রদ্ধা হ্রাস পাবে। নয় কি? এবার সে তার স্তাবকদেরই অধিক অনুগত হবে। তার উপর তাদের প্রভাবের মাত্রা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাবে। এই স্তাবকদের জীবনযাত্রাই এখন তার জীবনযাত্রায় পরিণত হবে। সে এবার তাদের সঙ্গদানে অধিকতর নিঃসঙ্কোচ হয়ে উঠবে এবং তার চরিত্রটি যদি অস্বাভাবিক রকমের উত্তম না হয় তা হলে সে আর তার পূর্বের পিতামাতা এবং অপর আত্মীয়জনদের মঙ্গল-অমঙ্গল নিয়ে মোটেই চিন্তিত হবে না। সে বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

    সক্রেটিস, এইরূপ হওয়া খুবই সম্ভব। কিন্তু দর্শন-শিক্ষার্থীর উপর এ-উপমার প্রয়োগ তুমি কীভাবে করছ?

    আমরা এভাবে তার প্রয়োগ করতে পারি : ন্যায় এবং সম্মানের কতগুলি নীতি আছে। শৈশবে বিদ্যালয়ে এ-সকল নীতি আমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়, এবং এই নীতির অভিভাবকত্বেই আমরা বর্ধিত হয়ে উঠি। এই সমস্ত নীতির আমরা বাধ্য থাকি এবং এদের সম্মান করি। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    কিন্তু ভোগের এবং আনন্দের কুনীতিও এর বিপরীতে রয়েছে। তারা আমাদের আত্মাকে আকর্ষণ করতে চায়। কিন্তু যাদের মধ্যে ন্যায়ের বোধ আছে তাদের উপর এ-আকর্ষণ কার্যকর হয় না। এই আকর্ষণ উপেক্ষা করেই তারা তাদের অভিভাবকদের ন্যায়নীতিকে মেনে চলে। তাদের তারা সম্মান করে।

    হ্যাঁ, এ কথাও সত্য।

    কোনো লোকের এই যখন অবস্থা, তখন যদি তার সামনে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন তুলে ধরা হয়, তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সম্মানীয় কাকে বলে তখন সে প্রথমে অভিভাকদের শিক্ষা-দেওয়া নীতির ভিত্তিতেই তার জবাব দেয়। কিন্তু সে-নীতিরও প্রতিবাদের অভাব নেই। বিভিন্ন প্রতিযুক্তি তার যুক্তি এবং বিশ্বাসকে খণ্ডন করতে থাকে। এর পরিণামে সম্মান-অসম্মানের পার্থক্য, ন্যায়-অন্যায় কিংবা উত্তম-অধমের পার্থক্য তার কাছে লুপ্ত হয়ে যায় এবং এতদিনকার যেসব ধারণাকে সে মূল্যবান মনে করেছে তাকেও সে বিস্মৃত হয়। কাজেই এমন অবস্থায় সে কি আর তার পুরনো নীতিকে আগের ন্যায় মেনে চলবে? কিংবা তাদের সম্মান করবে? তুমি কী মনে কর?

    না। এমন অবস্থায় পুরনো নীতিকে সম্মান করা তার পক্ষে অসম্ভব।

    তা হলে, যখন সে পুরনোকে আর পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক কিংবা সম্মানীয় মনে করে না এবং সত্যকেও সে আবিষ্কারে সক্ষম হয়নি, তখন তার পক্ষে তার ইচ্ছার স্তাবকদের জীবন ব্যতীত অপর জীবনযাপন করা কি সম্ভব?

    না, তা সম্ভব নয়।

    ফলে, পূর্বে যেখানে সে বিধানের বাধ্য ছিল সেখানে এখন সে বিধানের লংঘনকারীতে পরিণত হয়েছে। ঠিক নয় কি?

    নিঃসন্দেহে।

    আমি বলব, দর্শনের ছাত্রদের ক্ষেত্রে এ সবই যেমন স্বাভাবিক তেমনি ক্ষমার যোগ্য।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ। আমি আর-একটু যোগ করে বলব : এদের অবস্থানটি দুঃখজনক

    কাজেই গ্লকন, আমাদের যে-নাগরিকদের বয়স ত্রিশে পৌঁছেছে তাদের যেন ভবিষ্যতে দুঃখ বোধ না করতে হয় সেজন্য খুবই সতর্কতার সাথে দর্শনের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটাতে হবে।

    অবশ্যই, সক্রেটিস।

    না হলে বিপদের আশঙ্কা হচ্ছে, তর্কের স্বাদ তারা উপযুক্ত সময়ের অনেক আগে পেয়ে যেতে পারে। কারণ, তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ তরুণদের মুখে তর্কের স্বাদ একবার এলে তারা কেবল আনন্দের জন্য, কেবল তর্কের জন্য তর্ক করতে শুরু করে। কুকুরছানা যেমন নিকটে যা পায় তাকেই টেনে ধরে এবং ছিঁড়ে ফেলে এবং তাতে মহা আনন্দ বোধ করে, তেমনি এই নতুন তার্কিকরা অপরের অনুকরণে সকলের মতের বিরুদ্ধতা করে, সকলের যুক্তিকেই খণ্ডন করে এবং তাতে আনন্দ বোধ করে।

    হ্যাঁ। তখন এদের কাছে এর চেয়ে মজার কিছু থাকে না।

    তারপর চলতে থাকে তাদের তর্ক-বির্তকের অভিযান। এ-অভিযানে বেশকিছু জয়-পরাজয়ের পরে তাদের চরিত্র পুরো অবিশ্বাসীর রূপ ধারণ করে। এখন আর তারা তাদের পুরাতন কোনো বিশ্বাসকে পোষণ করে না। পুরনো সব বিশ্বাসকে তারা জেদের সঙ্গেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে। ফলে কেবল যে তারা নিজেরা, তা-ই নয়, দর্শন এবং দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছু দুর্নামের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

    তোমার এ কথার চেয়ে আর সত্য কী হতে পারে?

    কিন্তু মানুষ যখন আরও বয়স্ক হয় তখন তার মধ্যে এই উন্মত্ততা আর থাকে না। তখন সে সত্যের সন্ধানী যথার্থ দার্শনিককে অনুকরণ করতে চায়। তর্কের জন্য যারা তর্ক করে, আমোদের জন্য অপরকে খণ্ডন করে, তেমন লোকের অনুকরণ আর সে করে না। এবং তার চরিত্রের এই সংযম এবার তার অনুসৃত বিদ্যার সম্মান হ্রাস না করে তাকে বৃদ্ধি করতে শুরু করে।

    খুবই সত্য কথা।

    এ-অবস্থার জন্য আমরা তৈরি ছিলাম। তাই আমরা পূর্বেই বলেছি, দর্শনের অনুসারীকে শৃঙ্খলাপরায়ণ হতে হবে এবং দৃঢ়চিত্ত হতে হবে। বর্তমানের ন্যায় যে-কোনো অনধিকারীর দর্শনচর্চার কোনো অধিকার থাকবে না।

    হ্যাঁ, আমাদের এ-ব্যবস্থা সঠিক।

    কিন্তু দর্শনচর্চার দৈর্ঘ্য কী হবে? মনে করো দর্শনকে শরীরচর্চার স্থানে স্থাপন করা হল এবং শরীরচর্চার জন্য যে সময় ব্যয় করা হয়েছে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার দ্বিগুণসংখ্যক বৎসর দর্শনের চর্চা করা হল—তা হলে কি যথেষ্ট হবে বলে তুমি মনে কর?

    তার অর্থ কি দুবৎসর না চার বৎসর?

    না, ধরো পাঁচ বৎসর। এই সময়ের শেষে তাদের অবশ্যই গুহার মধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হবে এবং তরুণদের উপযোগী সকল সামরিক এবং রাষ্ট্রীয় অপর দায়িত্ব তাদের পালন করতে হবে। এইভাবে তারা জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করবে এবং সর্বপ্রকার আকর্ষণের মুখে তারা দৃঢ় থাকবে কিংবা বিচলিত হবে সে-পরীক্ষারও আমাদের সুযোগ ঘটবে।

    কিন্তু তাদের জীবনের এই পর্যায়ের দৈর্ঘ্য কী হবে?

    আমি বললাম : এ-পর্যায়ের দৈর্ঘ্য পনেরো বছর। এবং এর পরে যারা পঞ্চাশ বৎসরের স্তরে এসে পৌঁছেছে, যারা সকল পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে এসেছে, যারা জীবনের প্রতিটি কর্মে এবং জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় কৃতিত্বের সঙ্গে নিজেদের যোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে, তারাই মাত্র যাত্রার লক্ষ্যে এসে উপনীত হতে পারবে। এবার সেই মাহেন্দ্র মুহূর্তটি উপস্থিত হয়েছে যখন এই কৃতী পথিকগণ তাদের আত্মার দৃষ্টিকে, সমস্ত সত্তাকে আলোকিত করে যে-মহৎ আলো, তার পানে তুলে ধরবে এবং পরম উত্তমকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবে। এই ধারাতেই তারা রাষ্ট্রকে, ব্যক্তির জীবনকে এবং তাদের নিজেদের জীবনের অবশিষ্ট কালকে সংগঠিত করবে। এজন্য দর্শনের চর্চাকে তাদের জীবনের প্রধান অবলম্বনে পরিণত করতে হবে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে যখন তাদের সময় আসবে জনসাধারণের স্বার্থে রাজনীতি এবং রাষ্ট্রশাসনের দায়িত্বপালনের, তখন সে-দায়িত্ব তারা পালন করবে—এ-দায়িত্বের সম্মানের জন্য নয়, কর্তব্যপালনের প্রয়োজনীয়তার বোধ থেকেই এবং পরিশেষে তাদের উত্তরপুরুষকে যখন তারা তৈরি করেছে এবং রাষ্ট্রশাসনে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে তখন তারা পবিত্র দ্বীপমণ্ডলীর জন্য শেষযাত্রা শুরু করবে এবং সেই শান্তির দ্বীপে পৌঁছে সেখানে নিরবধিকাল বাস করবে। শেষ যাত্রায় আমাদের নগরী তাদের জন্য প্রকাশ্য স্মৃতিসৌধ প্রস্তুত করবে, তাদের সম্মানিত করবে এবং পিথীয় ভবিষ্যদ্বক্তার অনুমতি হলে দেবতার মতো তাদের উদ্দেশে পশু উৎসর্গ করবে। তেমন অনুমতি না পেলেও তাদের ঋষিপুরুষ হিসাবে সমাহিত করা হবে।

    সক্রেটিস, তুমি বক্তা নও, তুমি ভাঙ্কর! কী বিস্ময়কর ত্রুটিহীন সৌন্দর্যে তুমি আমাদের শাসকবর্গের মূর্তিকে খোদাই করে দিয়েছ!

    আমি বললাম : কিন্তু গ্লকন, কেবল শাসনকারীর নয়; বলো শাসনকারিণীরও। কারণ আমি যা বলেছি তা কেবল পুরুষদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, মেয়েদের স্বভাবে যতখানি সম্ভব ততখানি মেয়েদের উপরও প্রজোয্য নয়—এরূপ মনে করা তোমার ঠিক হবে না।

    হ্যাঁ, একথা তোমার যথার্থ। কারণ আমরা সকল ক্ষেত্রেই মেয়েদের পুরুষদের সমান অংশীদার করেছি।

    আমি বললাম : আর গ্লকন, তুমি নিশ্চয়ই একথা স্বীকার করবে রাষ্ট্র এবং সরকার সম্পর্কে আমরা যা বলেছি এ কেবল স্বপ্নের ব্যাপার নয়, এর বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব নয়। কিন্তু তার বাস্তবায়ন কেবলমাত্র যে-পথের কথা আমরা বলেছি সে-পথেই সম্ভব। অপর কোনো পথে নয়। অর্থাৎ যখন রাষ্ট্রে এমন দার্শনিক-রাজা কিংবা দার্শনিক-শাসক জন্মগ্রহণ করবে যারা জাগতিক সম্মানকে ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ বলে বিবেচনা করবে এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সম্মানকে মহৎ বলে গণ্য করবে এবং ন্যায়কেই যারা মহত্তম এবং সর্বাধিক প্রয়োজনীয় বিষয় বলে বিবেচনা করবে এবং নিজেদের গণ্য করবে সেই ন্যায়েরই সেবক বলে, যে-ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠাকে তারা নিজেদের কর্তব্য বলে বিবেচনা করবে—এমন যথার্থ দার্শনিক-শাসক যখন নগরীকে সংগঠিত করবে এবং শাসন করবে তখনই মাত্র আমাদের কল্পনা বাস্তবায়িত হয়ে উঠবে

    কিন্তু এই শাসকদের শাসনের ধারাটি কীরূপ হবে?

    তাদের শুরু করতে হবে নগরীর সেই অধিবাসীদের নিয়ে যাদের বয়স দশ অতিক্রম করেনি। যাদের বয়স দশ বৎসরের অধিক হয়েছে তাদের সকলকে নগরীর বাইরে তারা পাঠিয়ে দেবে। এবার তারা সকল শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এই শিশুরা অবশ্যই তাদের পিতামাতার অভ্যাস ও আচরণে এখনও প্রভাবিত হয়নি। এই নিষ্কলঙ্ক শিশুদের শিক্ষিত করা হবে রাষ্ট্রের আদর্শ বিধি, বিধান এবং অভ্যাসে। অর্থাৎ যে-বিধানের কথা আমরা বলেছি সেই বিধান অনুযায়ী তারা বর্ধিত হবে। এমনি উপায়ে যে-রাষ্ট্র এবং সংবিধানের কথা আমরা বলেছি সে-রাষ্ট্র এবং তার অধিবাসীগণ অচিরে সুশাসন এবং শান্তি লাভ করবে।

    হ্যাঁ, শাসনের এই ধারাটিই সর্বোত্তম হবে এবং সক্রেটিস, আমি মনে করি এরূপ রাষ্ট্র কীরূপে জন্মলাভ করতে পারে সে বিষয়টিও তুমি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছ।

    তা হলে আদর্শ রাষ্ট্র এবং তার প্রতিকৃতিমূলক মানুষের সম্পর্কে যথেষ্ট বলা হয়েছে। এরূপ মানুষের কী বর্ণনা হবে তা বোঝাও আর আমাদের পক্ষে কঠিন হবে না।

    গ্লকন বললেন : না। আমাদের পক্ষে কঠিন হবে না। আর তাই আমি তোমার সঙ্গে একমত, এ-সম্পর্কে অধিকতর কিছু বলার আবশ্যকতা নেই।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার
    Next Article প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Our Picks

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }