২২. গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রী চরিত্র
অধ্যায় : ২২ [৫৫৫–৫৬২]
গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রী চরিত্র
কতিপয়তন্ত্রের অনিবার্য পরিণাম গণতন্ত্র। কারণ, কতিপয় শাসক সংখ্যায় অল্প। সমস্ত সম্পদ তারা নিজেরা পুঞ্জিভূত করেছে। ব্যক্তিগত ধনাগার তারা তৈরি করেছে। দরিদ্রকে তারা নিঃস্ব করেছে। তাদের তারা ভিক্ষুকে পরিণত করেছে। কিন্তু দরিদ্ররা ব্যক্তিগতভাবে অক্ষম হলেও তাদের সংখ্যাই শক্তি। শাসকশ্রেণী তাদের সংখ্যাকে ভয় করে। শাসকশ্রেণী তার।।মরিক বাহিনীতে নিযুক্ত করতেও ভরসা পায় না। পাছে অস্ত্র পেয়ে সেই অস্ত্র সে শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে লক্ষ্য করে। কিন্তু সংকটকালে দরিদ্রের উপর নির্ভর করা ব্যতীত শাসকের গত্যন্তর নেই। বৈদেশিক শক্তির আক্রমণ আছে। অপর সংকট আছে। তাই পরস্পরের সাক্ষাৎ এড়ানো সম্ভব নয়। “হয়তো তীর্থযাত্রায় কিংবা যুদ্ধাভিযানে সহ-সৈনিকের ভূমিকায় তাদের পরস্পরের সাক্ষাৎ ঘটে যায়। একে অপরকে দেখে। … এরূপ অবস্থাতে এমন হওয়া খুবই সম্ভব যে, যুদ্ধক্ষেত্রে রোদেপোড়া মানুষটির অবস্থান ঘটবে ধনবান মেদবহুল সেই লোকটির পাশে যার দেহের বর্ণটি সূর্যের তাপে বিবর্ণ হতে পারেনি। রোদেপোড়া দরিদ্র মানুষটি যখন এরূপ মেদবহুল ধনবানকে যুদ্ধের ক্ষেত্রে হতশ্বাস এবং হতবুদ্ধি অবস্থায় দেখতে পায় তখন সে এই সিদ্ধান্ত না করে পারে না যে, এই অপদার্থগুলি অর্থবান হতে পেরেছে কেবলমাত্র শাসিতের সাহসের অভাবে। … নিজেদের মধ্যে তারা একে অপরকে বলে : দেখেছ, যোদ্ধা হিসাবে এরা কী অপদার্থ! এদের দিন শেষ হয়ে গেছে!” কতিপয়তন্ত্রের দুর্বলতা প্লেটো মুক্তচিত্তে প্রকাশ করেছেন। দরিদ্রের শক্তিকে তিনি উপলব্ধি করেছেন। এবং কতিপয়তন্ত্র থেকে গণতন্ত্র যে অনিবার্য তাও তাঁর উপস্থাপনায় স্বীকৃত। কিন্তু প্লেটোর নিকট গণতন্ত্র আদর্শ রাষ্ট্রের অধিকতর বিচ্যুতি। আদর্শ রাষ্ট্র থেকে এর অবস্থান অনেক দূরে। কারণ, প্লেটোর মতে সম্মানের আকঙ্ক্ষা যেমন অর্থের আকঙ্ক্ষার চেয়ে উত্তম, তেমনি অর্থের আকঙ্ক্ষা সংখ্যার নীতিহীনতার চেয়ে উত্তম। কারণ, কতিপয়তন্ত্রের একটা আদর্শ আছে। সে-আদর্শ হচ্ছে অর্থসংগ্রহ। সেদিক থেকে গণতন্ত্রের কোনো আদর্শ নেই। না জ্ঞান, না সম্মান, না অর্থ–কোনো আদর্শই গণতন্ত্রের আদর্শ নয়। তাই প্লেটোর কাছে গণতন্ত্র হচ্ছে নীতিহীন সংখ্যার শাসন। প্লেটো এথেন্সের প্রচলিত গণতন্ত্রের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তাঁর পারিবারিক সম্পর্কেও প্লেটো যুক্ত ছিলেন অভিজাতশ্রেণীর সঙ্গে। তাঁর যুক্তিবাদী মন অবশ্য তাঁকে অভিজাততন্ত্র বা পিলোপনেশীয় যুদ্ধের শেষের দিকে স্বৈরাচারী ত্রিশের অভ্যুত্থানের পরিপূর্ণ সমর্থক হতে দেয়নি। গণতন্ত্রের নীতিহীনতা, ব্যক্তিচরিত্রের দায়িত্বহীনতা, বল্গাহীন বাগাড়ম্বর ইত্যাদি তাঁকে গণতন্ত্রের সমালোচকে পরিণত করেছিল, কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারও তাঁর যুক্তিবাদী মনকে স্বৈরতন্ত্রের পরিপোষক হতে দেয়নি। তাই প্লেটোর বর্ণনায় গণতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্র, উভয় পদ্ধতির তুলনাহীন স্পষ্ট এবং বিদ্রূপাত্মক উপস্থাপনা এবং সমালোচনার আমরা সাক্ষাৎ পাই। প্লেটোর মতে “গণতন্ত্রে কারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যার শাসন করার গুণ আছে, সে শাসন করতে বাধ্য নয়। যার আনুগত্য পোষণ করার আবশ্যকতা আছে সেও অনুগত হতে বাধ্য নয়। …যে অপরাধী, সে দণ্ডিত নয়। যে দণ্ডিত, সে অপরাধী নয়। স্বচ্ছন্দে সে ঘুরে বেড়ায়। বলা চলে এ এক অবাধ ‘স্বাধীনতার’ রাজত্ব। এখানকার পশুরাও অপর কোনো রাজত্ব থেকে অধিক স্বাধীন। গণতন্ত্র তৈরি করে গণতন্ত্রী চরিত্র যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে মূহূতের দাস। …এই মুহূর্তে হয়তো সে সুরা, নারী এবং সঙ্গীতে লিপ্ত। পরমুহূর্তে সে ভোজ্যদ্রব্যে ভুক্ত। এই মুহূর্তে সে কঠিন শরীরচর্চায় রত। পরমুহূর্তে সে অলস আয়েশি জীবনে তৃপ্ত; আবার পরমুহূর্তে দর্শনের চর্চায় সে উদ্ব্যস্ত। তার পরের মুহূর্তেই সে রাজনীতিক হল্লায় উচ্চকণ্ঠ।” মোটকথা “তুমি বলতে পার, এ হচ্ছে এক অদ্ভুত রকমের অরাজক ব্যবস্থা, যেখানে বৈচিত্র্যের অভাব নেই আর যেখানে সমান এবং অসমান—সকলেই সমান।”
.
এবার গণতন্ত্রের কথা আসে। গণতন্ত্রের উদ্ভব এবং প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের আলোচনা করা আবশ্যক। এ-আলোচনা আমাদের বাকি রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আলোচনার পরে গণতন্ত্রী ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা আলোচনা করব। উভয়ের চরিত্রের পরিচয়ের পরে উভয়কে বিচার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে।
হ্যাঁ সক্রেটিস, এই ধারতেই আমাদের অগ্রসর হওয়া সঙ্গত।
কিন্তু কতিপয়তন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে পরিবর্তনকে আমরা কীভাবে প্রকাশ করব? এই পরিবর্তনের ধারাটি কি এই নয় যে, কতিপয়তন্ত্র সম্পদ অর্জনের যে-লক্ষ্যের পেছনে ছুটে চলে, সে-লক্ষ্যের তৃষ্ণা অপূরণীয়?
ধনের তৃষ্ণা অবশ্যই অপূরণীয়। কিন্তু তার পরে কী ঘটে?
এ-রাষ্ট্রের শাসকরা যখন বুঝতে পারে তাদের ক্ষমতার ভিত্তি হচ্ছে অর্থ, তখন তারা অমিতব্যয়ী তরুণের অপব্যয়ের অভ্যাসকে আইন দ্বারা হ্রাস করতে অস্বীকার করে। কারণ, তরুণের ধ্বংসকে তারা নিজেদের লাভ বলে গণ্য করে। অপব্যয়ী তরুণদের কাছ থেকে তারা সুদ গ্রহণ করতে শুরু করে এবং পরিশেষে তাদের সমস্ত সম্পত্তি হস্তগত করে। এমনিভাবে তারা নিজেদের সম্পদ এবং শক্তিকে বৃদ্ধি করে।
হ্যাঁ, এভাবেই তারা তাদের সম্পদ এবং শক্তিকে বৃদ্ধি করে।
আর এ-সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই যে, অর্থের লিপ্সা এবং সংযমের মনোভাব একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে অধিক পরিমাণে থাকতে পারে না। এদের একটি অবশ্যই অবজ্ঞাত হবে।
হ্যাঁ, একথা বোধগম্য।
কতিপয়তন্ত্রের অমিতব্যয়ের এবং অপব্যয়ের কারণে উত্তম অনেক পরিবারই ভিক্ষাজীবীতে পরিণত হয়ে যায়।
হ্যাঁ, প্রায়ই এরূপ ঘটে।
কিন্তু তথাপি এরূপ লোক নগরীতে বাস করে। এরা হৃতসর্বস্ব হলেও এরা শক্তিহীন নয়। এরা আঘাত করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। এদের মধ্যে এমন আছে যারা অর্থের ঋণে ঋণী। এমন থাকে যারা তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আবার এমনও থাকে যারা এই উভয়রকম বিপদেই বিপন্ন হয়েছে। এরা স্বভাবতই যারা তাদের সম্পদকে হস্তগত করেছে তাদের প্রতি এবং অপর সকলের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। তারা বিপ্লবের জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে।
একথা সত্য।
আর ওদিকে অর্থগৃধুর দল তাদের অর্থসংগ্রহ করার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। এক্ষেত্রে তারা ভ্রূক্ষেপহীন। দৃষ্টি তাদের ভূমির দিকে। যাদের সর্বনাশ ইতিমধ্যে তারা সাধন করেছে তাদের যেন এরা দেখতেই পায় না। তারা নতুন শিকার অন্বেষণ করে। অপর কোনো অসতর্ক শিকারের দেহে তাদের অর্থের হুল বিদ্ধ করে। যে-পুঁজি একদিন তারা ঋণ হিসাবে দিয়েছিল তার সুদের সন্তানসন্ততির মারফত সে-পুঁজির শতগুণ অধিক তারা আদায় করে। এমনিভাবে এরা রাষ্ট্রের মধ্যে কর্মহীন অলস এবং নিঃস্বের সংখ্যা বৃদ্ধি করে চলে।
হ্যাঁ, এরূপ নিঃস্বের সংখ্যা যে বহু তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এবার এই পাপে আগুন ধরে যায়। সে-আগুন দাউদাউ করে ওঠে। কিন্তু তবু এই অধম শাসকবর্গ ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে কিংবা অপর কোনো উপায়ে এ-আগুনকে নির্বাপিত করার চেষ্টা করে না।
সম্পত্তির বিধিনিষেধ ব্যতীত অপর কী উপায় আছে?
হ্যাঁ, আছে। তাকে আমরা দ্বিতীয় উৎকৃষ্ট উপায় বলতে পারি। এ-উপায়ের প্রধান গুণ হচ্ছে, এ নাগরিককে তার চরিত্র সংশোধন করতে বাধ্য করবে। আমি বলব, একটি সাধারণ আইন এক্ষেত্রে প্রণয়ন করা যায়, যে-আইন নাগরিকদের বলবে, ঋণের ক্ষেত্রে নাগরিকরা যে যার নিজের দায়িত্বে অপরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে। এতে রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব থাকবে না। এরূপ বিধান প্রণীত হলে টাকা তৈরির এই পাপ-স্বভাব কিছুটা রুদ্ধ হবে এবং এ থেকে রাষ্ট্রের যে-অনিষ্ট সাধিত হয়, তাও বেশ পরিমাণ হ্রাস পাবে।
একথা ঠিক। তা হলে রাষ্ট্রের অনিষ্ট অনেকটা হ্রাস পাবে।
কতিপয়ের শাসনব্যবস্থায় কী ঘটে? যে-মনোভাবের আমরা উল্লেখ করেছি এর শাসকরা সেই মনোভাব থেকে শাসিতদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে। একদিকে তারা এবং তাদের অনুসারীগণ, বিশেষ করে শাসকশ্রেণীর তরুণরা, দেহ এবং মনের অলস এবং বিলাসপরায়ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে; অপরদিকে তারা আনন্দ কিংবা কষ্ট কোনোকিছুকে প্রতিরোধের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
খুবই সত্য কথা।
এদের একমাত্র চিন্তা, কেমন করে টাকা বানানো যায় এবং নিঃস্ব ভিক্ষুকের মতো এরাও মহৎ গুণের চর্চায় সম্পূর্ণ নিস্পৃহ।
সক্রেটিস, একথা ঠিক। এ-ব্যাপারে এরা নিঃস্বের মতোই নির্বিকার।
কতিপয়তন্ত্রের শাসকদের এই হচ্ছে অবস্থা। কিন্তু আবার অনেক সময় এরূপ ঘটে যে, শাসক এবং শাসিত একই পথের পথিক হয়ে পড়ে—তাদের পরস্পরের সাক্ষাৎ ঘটে যায়। হয়তো তীর্থযাত্রায় কিংবা যুদ্ধাভিযানে সহ-সৈনিকের ভূমিকায় অথবা সমুদ্রের বুকে জাহাজে সহ-নাবিক হিসাবে একের সঙ্গে অপরের সাক্ষাৎ ঘটে যায়। তখন ঘনিষ্ঠভাবে বিপদের মুহূর্তে একে অপরের আচরণ লক্ষ করতে সক্ষম হয়। কারণ, বিপদের মধ্যে অন্তত এই আশঙ্কা থাকে না যে, ধনবান দরিদ্রকে ঘৃণা করবে। এমন অবস্থাতে এরূপ হওয়া খুবই সম্ভব যে, যুদ্ধক্ষেত্রে রোদে-পোড়া মানুষটির অবস্থান ঘটবে ধনবান-মেদবহুল সেই লোকটির পাশে যার দেহের বর্ণটি সূর্যের তাপে বিবর্ণ হতে পারেনি। রোদে-পোড়া দরিদ্র মানুষটি যখন এরূপ মেদবহুল ধনবানকে যুদ্ধের ক্ষেত্রে হতশ্বাস এবং হতবুদ্ধি অবস্থায় দেখতে পায় তখন সে এই সিদ্ধান্ত না করে পারে না যে, এই অপদার্থগুলি অর্থবান হতে পেরেছে কেবলমাত্র শাসিতদের সাহসের অভাবে। এর পরে শাসিতগণ যখন নিজেদের মধ্যে মিলিত হয়, তখন তারা একে অপরকে বলে : ‘দেখেছ যোদ্ধা হিসাবে এরা কী অপদার্থ! এদের দিন শেষ হয়ে গেছে।’
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমি নিশ্চিত, শাসিতরা তখন পরস্পরকে একথা বলবে।
এখানে একটা জিনিস আমরা স্মরণ করতে পারি : একটা লোকের দেহ যখন দুর্বল, তখন তাকে অল্পতেই অসুস্থ করে তোলা যায়। তার অসুখ ভেতর থেকেও হতে পারে। দেহের ক্ষেত্রে যা সত্য, একটা দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তা সত্য। বাইরের সামান্য প্ররাচনায় সে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। ভিতরের কোনো দল কিংবা উপদল প্রতিবেশী কতিপয়তন্ত্র কিংবা গণতন্ত্রকে যদি হস্তক্ষেপের জন্য ডেকে আনে তা হলেই এরূপ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। কোনো সময়ে বহির্দেশীয় কোনো প্ররোচনা ব্যতিরেকেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উপদলীয় লড়াই শুরু হয়ে যেতে পারে।
খুবই সত্য কথা।
তা হলে আমরা বলতে পারি গণতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে তখন, যখন রাষ্ট্রের যারা নিঃস্ব তারা জয়লাভ করে, যখন তারা তাদের বিরোধীপক্ষীয়দের হত্যা করে কিংবা নির্বাসিত করে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সকল অধিকার এবং সুযোগ দরিদ্রগণ সমানভাবে ভোগ করে। শাসনক্ষমতাকে তখন তারা লটারির মাধ্যমে বণ্টন করে।
এ্যাডিম্যান্টাস আমার কথাকে স্বীকার করে বললেন : হ্যাঁ, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এভাবেই ঘটে। হয় তারা অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করে কিংবা বিরোধীপক্ষকে আতঙ্কিত করে পলায়নে বাধ্য করে।
কিন্তু এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রটি কী? এর শাসনব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয়? এই প্রশ্নের জবাবের মধ্য দিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মানুষের চরিত্রেরও পরিচয় পাব। ঠিক নয় কি?
অবশ্যই।
বেশ। কিন্তু এই রাষ্ট্রের মানুষকে কি তুমি স্বাধীন বলবে? একথা ঠিক যে বাক আর ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিমাণ এখানে প্রচুর। এখানে যার যেমন ইচ্ছা তেমন করার স্বাধীনতা আছে।
হ্যাঁ, গণতন্ত্রের সমর্থনকারীগণ তাই বলে।
তাই যদি হয় তা হলে একথাও সত্য যে, এমন রাষ্ট্রে প্রত্যেকেই নিজের পছন্দমতো জীবন যাপন করতে চাইবে?
অবশ্যই।
ফলে এমন রাষ্ট্রে চরিত্রের বৈচিত্র্যের কোনো অভাব ঘটবে না।
না, বৈচিত্র্যের অভাব ঘটবে না।
এ্যাডিম্যান্টাস, আমি বরঞ্চ বলব, সমস্ত শাসনব্যবস্থার মধ্যে গণতন্ত্র হচ্ছে সর্বাধিক আকর্ষণীয়। বিচিত্র বর্ণের পোশাকের ন্যায় এ-রাষ্ট্রের চরিত্রের বৈচিত্র্য একে খুবই মনোহর করে তোলে। আর এজন্যই, মেয়েরা এবং শিশুরা যেমন বর্ণ দেখেই বিচার করে, তেমনি বিচিত্র এই রাষ্ট্রকে অনেকে সর্বোত্তম বলে গণ্য করে।
হ্যাঁ, অনেকের পক্ষে এরূপ মনে করা স্বাভাবিক।
সেদিক থেকে সংবিধান-শিকারের যদি কোনো ব্যাপার থাকে তা হলে গণতান্ত্রিক রাজ্যকে সংবিধান-শিকারের উত্তম রাজ্য বলে আমরা গণ্য করতে পারি।* সীমাহীন স্বাধীনতার জন্য এখানে সকল রকম সংবিধান-চরিত্রেরই সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। কাজেই আমাদের মতো, সংবিধান বছাই করে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব যারা গ্রহণ করেছে তাদের অবশ্যই গণতন্ত্রের বাজার ভ্রমণ করা উচিত। বিচিত্র সংবিধানের সমাবেশ থেকে তাদের পছন্দসই সংবিধান তারা এই বাজারেই সংগ্রহ করতে পারবে। আর তা-ই দিয়ে তারা তাদের রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার কাজে অনয়াসে অগ্রসর হতে পারবে।
[* গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিচয় দান এবং সমালোচনার মধ্যে প্লেটোর বিদ্রূপের সুরটি লক্ষণীয়।]
হ্যাঁ, একথা সত্য। এ-বিপনিতে সংবিধানের নমুনার কোনো অভাব হবে না।
আমি এবার বললাম : তা হলে গণতন্ত্রে কারোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যার শাসন করার ক্ষমতা আছে, সে শাসন করতে বাধ্য নয়; যার আনুগত্য পোষণ করার আবশ্যকতা, সেও অনুগত হতে বাধ্য নয়। অনুগত হওয়া না-হওয়া তোমার ইচ্ছার ব্যাপার। যদি যুদ্ধ চলতে থাকে তুমি যুদ্ধ নাও করতে পার। আর দেশ যদি শান্ত থাকে, তুমি শান্ত নাও থাকতে পার। তুমি নিজেই একটা আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ শুরু করে দিতে পার। রাজনীতিক অথবা বিচারের কোনো দায়িত্বগ্রহণে তোমার উপর যদি কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়ে থাকে, তুমি তাকে অবজ্ঞা করে এরূপ দায়িত্ব স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পার। মুহূর্তের বিচারে এমন ব্যবস্থা অবশ্য মনোহর
হ্যাঁ সক্রেটিস, মুহূর্তের জন্যই বটে। তার অধিক নয়।
আরও চমৎকার হচ্ছে তাদের বিষয়টি, বিচারালয় যাদের কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত করেছে। এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, গণতন্ত্রে হয়তো কাউকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে কিংবা কাউকে নির্বাসিত করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সে নগরীর রাস্তায় নাগরিকদের মধ্যে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এজন্য কেউ আঁতকে উঠছে না। অদৃশ্য ভূত বা প্রেতকে যেমন কেউ দেখে না, তেমনি এই দণ্ডিত অপরাধীদেরও তার সঙ্গীরা যেন দেখেও দেখে না।
হ্যাঁ, একথা সত্য। এরূপ আমি অনেক সময়েই দেখেছি।
তারপর, রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে-সকল মূলনীতির আমরা উল্লেখ করেছি সে-সম্পর্কে গণতন্ত্রের শাসকদের বিবেচনা দ্যাখো। সে-মূলনীতি কঠিনভাবে পালন করার পরিবর্তে তার প্রতি তারা অবজ্ঞাই প্রদর্শন করে। আমরা বলেছিলাম : অসাধারণ গুণ নিয়ে যে জন্মগ্রহণ করেনি, শৈশব থেকে উত্তম পরিবেশ এবং উত্তম শিক্ষা ব্যতীত তার পক্ষে উত্তম ব্যক্তি হিসাবে বিকাশলাভ করা অসম্ভব। গণতন্ত্র এক নিশ্বাসে এই নীতিকে উড়িয়ে দিতে দ্বিধা করে না। রাজনীতিকদের অভ্যাস এবং ইতিহাস যা-ই হোক-না কেন, তাতে কোনোকিছু যায়-আসে না। তারা ‘জনতার বন্ধু’–একথাটি উচ্চারণ করাই যথেষ্ট।
কী অদ্ভুত বিবেচনা!
এ্যাডিম্যান্টাস, তা হলে এই হচ্ছে গণতন্ত্রের চরিত্র। এই হচ্ছে তার বৈশিষ্ট্য। তুমি বলতে পার এ হচ্ছে এক অদ্ভুত রকমের অরাজক ব্যবস্থা যেখানে বৈচিত্র্যের অভাব নেই আর যেখানে সমান এবং অসমান—সকলেই সমান।
সক্রেটিস, চরিত্রটি আমাদের অপরিচিত নয়। আমরা সহজেই একে চিনতে পারি।
এবার তা হলে এসো, আমরা গণতান্ত্রিক ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা করি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আলোচনায় যেরূপ, ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তার উদ্ভবটি আমাদের প্রথম দেখা আবশ্যক। এর উদ্ভবটি এরূপ। কতিপয়তন্ত্রের শাসকের কৃপণ এবং অধম চরিত্রকে আমরা দেখেছি। এই অধম চরিত্রের একটি পুত্র হল। পুত্রকে সে নিজের পথেই মানুষ করতে লাগল।
বেশ, তারপর?
পুত্রও পিতার মতো অর্থের ব্যয়ের দিকটি জোর করে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করল—কিন্তু অর্থ-উপার্জনের দিকটি নয়। যে ব্যয় তার নিকট অপ্রয়োজনীয়, সে ব্যয়েতে সে পিতার মতোই কৃপণ।
খুবই স্বাভাবিক।
তার প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় আনন্দ কোন্গুলি এবং কিসের ভিত্তিতে সে এর মধ্যে পার্থক্য নির্দিষ্ট করে, সে-বিষয়টি আমরা একটু দেখতে পারি। কী বল?
হ্যাঁ, আমাদের এ-বিষয়টি দেখা আবশ্যক।
আমরা নিজেরা কী করি? আমরা কি আমাদের সেই আনন্দকে প্রয়োজনীয় বলিনে যেগুলি আমাদের জন্য অপরিহার্য এবং লাভজনক? এবং এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতিগতভাবেই আমরা তাকেই কামনা করি যা আমাদের প্রয়োজনীয় এবং যা আমাদের উপকারসাধন করে। এরূপ কামনা করতেই আমরা বাধ্য।
ঠিক কথা।
কাজেই যা আমাদের উপকারী তাকে প্রয়োজনীয় বলা আমাদের পক্ষে অসঙ্গত নয়।
না। এরূপ বলাই আমাদের পক্ষে সঙ্গত।
আবার যে-ইচ্ছাকে মানুষ শৈশব থেকে চেষ্টা করলে নিজের চরিত্র থেকে বাদ দিতে পারে, যে-ইচ্ছা অপকার বই কোনো উপকারসাধন করে না, সে-ইচ্ছাকে সঙ্গতভাবেই আমরা অনাবশ্যক বলতে পারি?
অবশ্যই। আমরা তাকে অনাবশ্যক ইচ্ছা বলব।
আমাদের ধারণা স্পষ্ট করার জন্য দুরকম ইচ্ছারই আমরা দৃষ্টান্ত দিতে পারি।
উত্তম কথা।
ধরো আহারের ইচ্ছা অর্থাৎ সাধারণ খাদ্য এবং মশলাদি গ্রহণের ইচ্ছার কথা। স্বাস্থ্য এবং শক্তির জন্য এদের যতখানি প্রয়োজন আমরা এদের ততখানি আবশ্যক বলে অভিহিত করতে পারি। নয় কি?
হ্যাঁ, এদের আমরা আবশ্যক ইচ্ছা বলতে পারি।
আহারের যে-আনন্দ তার প্রয়োজন দুধরনের : সে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং সে আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য।
একথা ঠিক।
কিন্তু মশলাদির প্রয়োজন কেবল স্বাস্থ্যের কারণে। এরা স্বাস্থ্যের যতটুকু উপকার করে ততটুকু এদের প্রয়োজন।
একথাও যথার্থ।
কিন্তু আহারের যে-ইচ্ছা একে অতিক্রম করে যায় অর্থাৎ সুস্বাদ, অন্য আহার কিংবা বিলাস-উপকরণ—যেগুলি দেহের জন্য ক্ষতিকর এবং আত্মার জ্ঞান এবং মহৎ গুণের চর্চায় যেগুলি প্রতিবন্ধক—সেগুলিকে আমরা সঠিকভাবেই অনাবশ্যক ইচ্ছা বলতে পারি এবং এগুলিকে শৈশব থেকে চেষ্টা করলে আমরা আমাদের চরিত্র থেকে বাদ দিতে পারি। ঠিক নয় কি?
নিঃসন্দেহে।
এই দুধরনের ইচ্ছার একটিকে বলা চলে উপকারী, অপরটিকে অপকারী : একটি মিতব্যয়ী, অপরটি অমিতব্যয়ী।
অবশ্যই।
এবং যৌন-আনন্দ বা ইচ্ছা এবং অন্যান্য ইচ্ছা সম্পর্কেও একথা সত্য।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
এবং যে-অলস মৌমাছির কথা আমরা বলেছি, সে-অলস মৌমাছি অনাবশ্যক আনন্দে নিমজ্জিত, অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছার সে দাস এবং যে-চরিত্র ব্যয়ে কৃপণ এবং স্বভাবে অধম, অর্থাৎ অধম কতিপয়ী চরিত্র, সে অপরিহার্য ইচ্ছার অধীন। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
এবার দেখা যাক, এই কতিপয়ী চরিত্র থেকে গণতান্ত্রিক চরিত্রের উদ্ভব কেমন করে ঘটে। প্রক্রিয়াটিকে আমরা এভাবে দেখাতে পারি—
কী ভাবে?
কার্পণ্য এবং স্থূল প্রবৃত্তির মধ্যে যে-পুত্র লালিত হচ্ছিল, যার কথা আমরা কিছু পূর্বে উল্লেখ করেছি, সে যখন অলস মৌমাছির মধুভক্ষণের স্বাদ পেয়ে যায়, যখন তার এমন সব সঙ্গীসাথি জুটে যায় যারা তাকে সকলরকম উদ্দাম আনন্দ এবং বিলাসের অনুসন্ধান দানে সক্ষম, তখনই তার মধ্যে কতিপয়ের নীতির ভাঙন এবং গণতান্ত্রিক চরিত্রের উদ্ভব শুরু হয় বলে তুমি বলতে পার।
হ্যাঁ এ-উদ্ভব তখন অনিবার্য।
কিন্তু এই তরুণের চরিত্রের মধ্যে কতিপয়ী নীতির সমর্থক উপাদান তার পিতা কিংবা স্বজনের প্রভাব যদি এখনও বিদ্যমান থাকে এবং তারা যদি তার এই বিচ্যুতিকে ভর্ৎসনা করতে থাকে এবং তাকে নিবৃত্ত করার জন্য উপদেশদান করে, তা হলে তার আত্মা পরস্পরবিরোধী উপসত্তায় বিভক্ত হয়ে যাবে। এর এক ভাগ অপর ভাগের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে রত হবে। অর্থাৎ তার নিজের সঙ্গেই তার লড়াই বেধে যাবে।
হ্যাঁ, তার চরিত্রের অভ্যন্তরে লড়াই বেধে যাবে।
এ-লড়াইতে দুএক সময়ে এমন হয় যে, তার চরিত্রের কতিপয়ী নীতির কাছে গণতান্ত্রিক নীতিকে পরাজয় বরণ করতে হয় এবং তার কোনো কোনো ইচ্ছার মৃত্যু ঘটে, কোনো ইচ্ছার নির্বাসন ঘটে। তরুণদের মনে একটা শ্রদ্ধার ভাব সৃষ্ট হয় এবং তার চরিত্রে একটা শৃঙ্খলা স্থাপিত হয়।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, কোনো কোনো সময়ে এরূপ ঘটে।
কিন্তু এ-অবস্থা সাময়িক। পুরনো ইচ্ছার বহিষ্কারের পর আবার অনুরূপ নূতন ইচ্ছার আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু এই ইচ্ছার যে-জনক সেই চরিত্র এর নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষায় অক্ষম। ফলে এদের বিক্রম এবং সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
হ্যাঁ, এরূপ হওয়াই সম্ভব।
এই নূতন ইচ্ছা তাকে পুনরায় তার সঙ্গীদের কাছে আকর্ষণ করে নিয়ে যায়। নূতন আর পুরনো ইচ্ছার মধ্যে গোপন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। নূতনতর ইচ্ছার জন্ম ঘটে। ফলত এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলে।
খুবই যথার্থ বর্ণনা।
পরিণামে এই ইচ্ছার দল আত্মার দুর্গকে দখল করে ফেলে। কারণ, তারা দেখতে পেয়েছে তরুণের আত্মা জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে। তার নীতি এবং সত্য বিসর্জিত হয়েছে। আর জ্ঞান, নীতি এবং সত্য—এই হচ্ছে আত্মার সবচেয়ে উত্তম রক্ষক।
হ্যাঁ, এরাই হচ্ছে আত্মার সবচেয়ে উত্তম রক্ষক।
আর এই শূন্যস্থানে এবার আসন গ্রহণ করে অহংকার এবং অসার বাক্য।
হ্যাঁ, এবার এদেরই বিক্ৰম।
এবার সেই তরুণ আবার তার পুরনো সঙ্গীদের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সেখানেই সে তার স্থায়ী আবাসকে নির্দিষ্ট করে। এখনও তার চরিত্রে কতিপয়ী নীতির রেশ যদি কিছু থাকে এবং তারা যদি তাকে রসদাদি পাঠিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করে, তা হলে তার চরিত্রের অহংকার এবং দম্ভ সেই সাহায্যকে প্রত্যাখ্যান করে আত্মার দুর্গের দ্বারকে সকল নীতির মুখের উপর একেবারে রুদ্ধ করে দেয়। পুরনো এবং বিশ্বস্ত মহৎ বন্ধুর সদুপদেশকেও এরা দুর্গে প্রবেশ করতে দেয় না। এই সময়ে হয়তো কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং অধমরা জয়লাভ করে। এবার সৌজন্য এবং সংকোচকে বিজয়ীরা বিকার বলে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করে দেয়। তাদের তারা নির্বাসিত করে এবং সংযমকে কাপুরুষতা আখ্যা দিয়ে তাকে পঙ্কে পদদলিত করে বিসর্জন দেয়। জনসাধারণকে তারা বোঝাতে থাকে, সংযম এবং মিতব্যয় হচ্ছে স্থূলতা এবং দীনতা। এমনিভাবে অধম প্রবৃত্তিরা কোলাহল তুলে সংযম এবং মিতাচারকে আত্মার সীমানার বাইরে দূর করে দেয়।
এ-বর্ণনাও যথার্থ।
অধম প্রবৃত্তির দল এবার তাদের হাতে বন্দি আত্মাকে তার সকল মহৎ গুণ থেকে শোধন করতে শুরু করে। এবার তারা দম্ভ, অনাচার, অমিতব্যয় এবং নির্লজ্জতাকে মশাল-শোভাযাত্রাসহকারে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করে এবং প্রশংসার মধুর বাণী উচ্চারণ করে বরণ করে এনে আত্মাশূন্য ঘরে তাদের প্রতিষ্ঠিত করে। এবার তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে, অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা আর মূর্খতাকে বলে বিক্রম। যে-তরুণের কথা আমরা বলতে শুরু করেছিলাম তার মূল চরিত্র এবার পরিপূর্ণরূপেই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যে এক দিন লালিত হয়েছিল অপরিহার্য প্রয়োজনের বোধে, সে এবার অধম এবং অনাবশ্যক ভোগ এবং সুখের অবাধ স্বাধীনতা এবং সেচ্ছাচারের পঙ্কে নিমজ্জিত।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, পরিবর্তনের এ-বিপুলতা কার দৃষ্টি এড়াতে পারে?
এবার আমাদের এই গণতান্ত্রিক তরুণ বাকি জীবন প্রয়োজনীয় ইচ্ছার পেছনে যে-পরিমাণ অর্থ, সময় এবং পরিশ্রম ব্যয় করে, ঠিক সে-পরিমাণ অর্থ, সময় এবং পরিশ্রম তার ব্যয়িত হয় অনাবশ্যক ইচ্ছার পেছনে। তবে তার ভাগ্য যদি প্রসন্ন হয় এবং ধ্বংসের চরমে যদি সে না পৌঁছে থাকে তা হলে বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার এই উচ্ছৃঙ্খল উদ্দামতা হয়তো হ্রাস পেতে থাকে এবং নির্বাসিত মহৎ গুণের কিছু হয়তো আবার আত্মার দুর্গে প্রত্যাবর্তন করে। ফলে পরিপক্ক বয়সে হয়তো আক্রমণকারীর প্রথম প্রবৃত্তির একাধিকপত্য আর তত বজায় থাকে না। এবার তার চরিত্রে কিছুটা ভারসাম্য সৃষ্ট হয়। আবশ্যক এবং অনাবশ্যক আনন্দ এবং ভোগের মধ্যে একটা সমতা স্থাপিত হয়। পূর্ণরূপে তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মুহূর্তের উল্লাসকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতাই সে অর্পণ করে। কিন্তু পরিতৃপ্তির পরে অনুরূপ স্বাধীনতা অপর ইচ্ছাকেও সে প্রদান করে। কাজেই আবশ্যক এবং অনাবশ্যক কোনো ইচ্ছাই আর অতৃপ্ত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে তুলতে পারে না।
হ্যাঁ, একে একটা সমতা বলা যায় বটে।
এবার যদি কেউ তাকে বলে, যে আনন্দের উৎস উত্তম ইচ্ছা, তাকেই তার উৎসাহিত করা উচিত এবং যে-আনন্দের উৎস হচ্ছে অধম প্রবৃত্তি, তার বল্গা টেনে ধরা উচিত, তা হলে এরূপ পরামর্শের প্রতি সে কর্ণপাত করবে না। সত্যের জন্য অন্তরের দ্বার সে উন্মুক্ত করবে না। তার মাথা নেড়ে সে বলবে : সকল আনন্দই আমার চোখে সমান এবং সকলেরই সমান অধিকার থাকা সঙ্গত।
হ্যাঁ, এরূপ সঙ্গতির কথাই সে বলে।
আমি বললাম : আসলে সে মুহূর্তের ভোগের মধ্যেই বাস করে। এই মুহূর্তে হয়তো সে সুরা, নারী এবং সঙ্গীতে লিপ্ত, পরিমুহূর্তে সে ভোজ্যদ্রব্যে ভুক্ত। এই মুহূর্তে সে কঠিন শরীরচর্চায় রত, পরমুহূর্তে সে অলস-আয়েশি জীবনে তৃপ্ত, আবার পরমুহূর্তে দর্শনের চর্চায় সে উদ্ব্যস্ত! এবং পরক্ষণেই সে রাজনীতিক হল্লায় উচ্চকণ্ঠ। বলা চলে সে সর্বদাই ব্যস্ত। ব্যস্তবাগীশের মতো দুপায়ে খাড়া অবস্থাতে সে যখন যা মাথায় আসছে তা-ই ভাবছে, যখন যা মুখে আসছে তা-ই বলছে। কোনো সময় মনে হবে, তার সকল কামনা সমরবিদ হওয়ার জন্য, কখনো মনে হবে, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার লক্ষ্য ব্যবসায় অর্থাৎ অর্থোপার্জনে সাফল্য। তার জীবনে সংযম বা শৃঙ্খলা বলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। এমন মানুষ তার জীবনকে আনন্দময়, স্বাধীন এবং সুখী বলে বিবেচনা করে।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : স্বাধীনতা এবং সাম্যে বিশ্বাসীর একটি যথার্থ বর্ণনাই বটে।
হ্যাঁ, আর তার চরিত্রের এইসব বিদ্যায় পারদর্শিতার ভাব এবং বহু বৈশিষ্ট্যের বর্ণাঢ্য বৈচিত্র্যের সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে-বৈচিত্র্য, তার সাদৃশ্য তো স্পষ্ট। এমন জীবন অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় বলে বোধ হতে পারে। কারণ, এর সম্ভাবনা বিচিত্র।
হ্যাঁ, এর সম্ভাবনা বিচিত্র, একথা বলা যায়।
তা হলে এই ব্যক্তিই হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিভূ। আমরা একে বলতে পারি : গণতান্ত্রিক চরিত্র।
হ্যাঁ, এই হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যক্তির চরিত্র।
