১. ন্যায়ের সংজ্ঞা : আলোচনার সূত্রপাত
অধ্যায় : ১ [৩২৭–৩৩১]
ন্যায়ের সংজ্ঞা : আলোচনার সূত্রপাত
সিফালাসের অভিমত : কথায় ও কাজে সততাই হচ্ছে ন্যায়
‘রিপাবলিক’ সংলাপের প্রধান কথক সক্রেটিস। ইতিপূর্বে সংঘটিত ঘটনার বর্ণনা হিসাবে সক্রেটিস তাঁর নিজের আলাপ এবং অন্যান্য চরিত্রের অংশগ্রহণকে এখানে পেশ করছেন। কল্পনা করা যেতে পারে যে, সংলাপের নীরব শ্রোতাও আছেন। তাঁদের সংখ্যা কিংবা অংশগ্রহণের কোনো উল্লেখ নেই। সক্রেটিসের সঙ্গে প্রশ্ন এবং জবাব কিংবা টিপ্পনী কাটার মাধ্যমে যেসব চরিত্র সংলাপে অংশগ্রহণ করছেন তাদের মধ্যে আছেন : গ্লকন এবং অ্যাডিম্যান্টাস (প্লেটোর দুই জ্যেষ্ঠ সহোদর), সিফালাস, সিফালাসের দুই পুত্র পলিমারকাস এবং লিসিয়াস, ইউথিডেমাস, ক্লিটোফন এবং চ্যালসেডনের থ্র্যাসিমেকাস। ইনি একজন প্রখ্যাত শিক্ষক বা সফিষ্ট। এ ছাড়া সক্রেটিসের তরুণ শিষ্যরাও আছে। সংলাপটির স্থান ছিল এথেন্সের নিকটবর্তী পাইরিউস বন্দরে প্রবীণ বণিক সিফালাসের গৃহ। বেন্দি দেবীর উদ্দেশে অনুষ্ঠিত বলিদান উপলক্ষে একটি সমাবেশ ঘটেছিল সে-সমাবেশের উল্লেখ সংলাপের শুরুতে পাওয়া যায়। সিফালাস ব্যবসায়-বাণিজ্যে ধন লাভ করেছেন যথেষ্ট। কিন্তু তিনি অর্থসম্পদকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে গণ্য করেন না। অর্থ ও সম্পদ জীবনের প্রয়োজন মাত্র। তাঁর মতে অর্থ ও সম্পদের মূল্য হচ্ছে এই যে, অর্থ ও সম্পদ ব্যক্তির মনে শান্তির সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু শান্তির মূল উৎস সততা এবং দেবতা কিংবা মানুষ যার যা প্রাপ্য তা পরিশোধের দাযিত্ববোধ। তাঁর মতে “সম্পদের যেটা বড় আশীর্বাদ সে হচ্ছে উত্তম ও সৎ-কে এই অভয়দান যে, ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় কাউকে প্রতারণা কিংবা বঞ্চিত করার কোনো কারণ তার ঘটেনি।” কিন্তু আলোচনাটি সম্পদের লাভালাভে সীমাবদ্ধ থাকল না। সক্রেটিসের কথায় : “তুমি ঠিকই বলেছ, সিফালাস। এর চেয়ে সম্পদের বড় আশীর্বাদ আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু তা হলে ন্যায় সম্পর্কে আমরা কী বলব? সত্যকথন কিংবা ঋণ-পরিশোধকে কি আমরা ন্যায় কিংবা ধর্মের সংজ্ঞা বলে নির্দিষ্ট করতে পারি?” কাজেই বর্তমান সংলাপের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়। এবং সক্রেটিস অধিক বিলম্ব না করে তাকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তুললেন।
.
এরিসটনের পুত্র গ্লকনকে সঙ্গী করে গতকাল আমি পাইরিউস গিয়েছিলাম। পাইরিউস যাবার আমার দুটো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, পাইরিউস মন্দিরের অধিশ্বরীকে[১] আমার পূজার্চনা পেশ করা; দ্বিতীয়ত এখানকার উৎসবটি কী করে অনুষ্ঠিত হয় সেটি দেখা। এই উৎসবটির প্রচলন এখানে নূতন। এজন্য এর অনুষ্ঠানটি দেখার আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল। স্থানীয় অধিবাসীগণের শোভাযাত্রাটি আমার মনে প্রকৃতই আনন্দের সঞ্চার করেছে। থ্রেসবাসীদের ক্রীড়াকৌশল দেখেও আমি চমৎকৃত হয়েছি। বস্তুত ক্রেসবাসীদের প্রদর্শনী অন্যান্যদের চেয়ে অধিকতর চিত্তাকর্ষক না হলেও অপর কারু চেয়ে তারা কিছুতেই কম ছিল না। আর সবার মতই তারাও সুন্দর ক্রীড়াকৌশল দেখিয়েছে।
আমাদের পূজার্চনা তখন শেষ করেছি; অনুষ্ঠান দর্শনও তখন সমাপ্ত হয়েছে; নগরী লক্ষ্য করে আমাদের বাড়ির পথে আমরা সবেমাত্র চলতে শুরু করেছি—ঠিক সেই মুহূর্তে সিফালাস-পুত্র পলিমারকাস দূর থেকে আমাদের দু’জনকে দেখে ফেললেন। আমাদের দেখতে পেয়েই তিনি তাঁর ভৃত্যকে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, আমরা যেন তাঁর জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। ভৃত্যটি দৌড়াতে দৌড়াতে পিছন থেকে আমার জোব্বাটির নাগাল পেয়ে তাকে টেনে ধরেই বলে উঠল : হুজুর, প্রভু পলিমারকাস আপনাদের খানিকটা অপেক্ষা করতে বলেছেন।
আমি পেছনে ফিরে বললাম : কই হে! তোমার মনিব কোথায়?
বেচারি অনুনয়ের সুরে বলল : এই যে হুজুর তিনি আসছেন। আপনারা একটু অপেক্ষা করলেই তিনি এসে পৌঁছে যাবেন।
গ্লকন বললেন : বেশ বেশ, আমরা অপেক্ষা করছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পলিমারকাসকে দেখতে পেলাম। শুধু পলিমারকাস নয়, পলিমারকাসের সঙ্গে গ্লকনের ভ্রাতা এ্যাডিম্যান্টাসকে এবং নিসিয়াস-পুত্র নিকারাটাসসহ শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী আরও অনেককেই দেখা গেল।
আমার নিকটবর্তী হয়ে পলিমারকাস বললেন : সক্রেটিস, তোমার সঙ্গীকে নিয়ে তুমি ইতিমধ্যেই শহরে ফিরে চলেছ?
আমি বললাম : তোমার অনুমান খুব মিথ্যা নয় পলিমারকাস।
পলিমারকাস আমার কথার জবাবে বলে উঠলেন : কিন্তু সক্রেটিস, আমাদের সংখ্যাটি নিশ্চয়ই তুমি দেখতে পাচ্ছ
আমি বললাম : নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছি।
কিন্তু তোমার শক্তি কি আমাদের সবার চাইতে বেশি? যদি তা না হয় তা হলে তুমি একথা ঠিক জেনো যে, তুমি যেখানে রয়েছ সেখানেই তোমাকে থাকতে হবে।
আমি বললাম : এমন চরম কথা কেন? আমরাও তো আমাদের অবস্থাটি তোমাদের এমনভাবে বুঝিয়ে বলতে পারি যাতে তোমরা অবশ্যই আমাদের চলে যাওয়ার অনুমতি দেবে।
পলিমারকাস দুষ্টামির ভঙ্গিতে বললেন : কিন্তু বুঝতে আমরা যদি না চাই, বোঝাতে পারবে আমাদের? এমন সাধ্য আছে তোমাদের?
গ্লকন হাল ছেড়ে বললেন : না না, সে-সাধ্য আমাদের আদৌ নেই!
: বেশ তা হলে জেনে রাখো, তোমাদের কোনো কথা আমরা আদপেই শুনছিনে।
এ্যাডিম্যানটাস বললেন : তোমরা কি শোননি রাত্রিবেলা দেবীর উদ্দেশে অশ্বপৃষ্ঠে এক মশাল-মিছিলের অনুষ্ঠান ঘটবে?
আমি একটু অবাক হলাম : কী বলছ— অশ্বপৃষ্ঠে মশালযাত্রা! এ তো অবশ্যই এক নূতন দৃশ্য। ব্যাপারটি কীরূপ? অশ্বারোহী কি তা হলে মশালসহ দৌড়ে গিয়ে নিজের মশালটি অপর অশ্বারোহীর হাতে পৌঁছে দেবে?
পলিমারকাস জবাব দিলেন : হ্যাঁ, তা তো বটেই; তা ছাড়া রাত্রে আরও একটি উৎসবের আয়োজন হয়েছে। এটি তোমাদের অবশ্যই দেখা আবশ্যক। এসো আমরা সকলে অপেক্ষা করি। রাত্রির ভোজনের পরেই আমরা উৎসবে যোগদান করব। উৎসব ক্ষেত্রে বিরাট এক তরুণদলও সমবেত হবে। আমাদের সবার মধ্যে তখন একটি উত্তম আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারবে। কাজেই আমাদের অনুরোধ, তোমরা অরসিক হয়ো না। তার বদলে খুশি মনে রাত্রির অনুষ্ঠানের জন্য এখানে অবস্থান করো।
গ্লকন দেখলেন উপায়ান্তর নেই। তিনি বললেন : তোমরা যখন এত করে বলছ, তখন আমাদের অবস্থান করতেই হয়।
আমি বললাম, উত্তম গ্লকন। তবে তা-ই হোক।
এই পরিকল্পনানুযায়ী আমরা সদলবলে পলিমারকাসের গৃহে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সেখানে আমরা লীসিয়াস এবং ইউথিডেমাস ভ্রাতৃদ্বয়কে যেমন দেখতে পেলাম, তেমনি তাদের সঙ্গে উপস্থিত দেখলাম চালসিডোনবাসী থ্রাসিমেকাসকে, পিনিয়াবাসী চারমানটাইডিসকে এবং এ্যারিসটোনেমাস পুত্ৰ ক্লিটোফনকেও। পলিমারকাসের পিতা সিফালাসও উপস্থিত ছিলেন। অনেক দিন পরে আজ তাঁকে এই প্রথম দেখলাম। মনে হল সিফালাস ইতিমধ্যে যেন অনেকখানি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। গদিসজ্জিত একটি আরামকেদারায় সিফালাস তখন উপবিষ্ট। তাঁর মস্তক ঘিরে একটি পুষ্পমাল্য শোভা পাচ্ছিল। বুঝতে পারলাম উৎসব-প্রাঙ্গণে তিনি বলিদানকার্যে নিরত ছিলেন। তাঁর পাশে অর্ধবৃত্তাকারে আরও অনেকগুলি আসনের আয়োজন ছিল। আমরা তাঁর দুপাশে সবাই মিলে আসন গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে সাগ্রহে সম্বোধন করে বললেন :
সক্রেটিস, তুমি তো আমাকে আর তেমন দেখতে আসো না। দ্যাখো, আমার যদি চলৎশক্তি থাকত এবং নিজেই তোমার কাছে যেতে পারতাম তা হলে আর তোমাকে আসতে বলতাম না। কিন্তু বুঝতেই পারছ আমার এই বয়সে আর আমার পক্ষে শহর পর্যন্ত ধাওয়া করা সম্ভব নয়। তাই বলছি, পাইরিউসে তোমারই আরও বেশি করে আসা উচিত। কারণ, সত্যি করে বলতে কী সক্রেটিস! দেহের শক্তি আর উচ্ছলতা যতই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে, ততই আমি যেন তোমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় অধিকতর আনন্দ এবং আকর্ষণ বোধ করছি। কাজেই আমার এ-অনুরোধটি তুমি প্রত্যাখ্যান কোরো না। আমার এ-গৃহ তোমার বিশ্রামনিবাস হোক, এই আমার অনুরোধ। চারপাশে এই তরুণদল রয়েছে। তাদের তুমি সঙ্গদান কোরো। তোমার আমার পারস্পরিক বন্ধুত্বের বন্ধন তো শুধুমাত্র আজকের কথা নয়। পুরাতন আমাদের বন্ধুত্ব। আমার গৃহে তোমার সঙ্কোচের কোনো কারণ কি থাকতে পারে?
আমি বললাম : সিফালাস, প্রিয়বরেষু! আমার নিজের কথা বলতে গেলে আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, বয়সে যাঁরা অভিজ্ঞ তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাতেই আমার সর্বাধিক আনন্দ। কেননা আমি মনে করি, বয়সে যাঁরা আমার অগ্রজ তাঁরা জীবনের দীর্ঘতর পথ অতিক্রম করে এসেছেন। সে-পথ হয়তো-বা আমাকেও অতিক্রম করতে হবে। কাজেই আমার প্রয়োজন সেই অগ্রপথিকদের কাছে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেওয়া তাঁদের অতিক্রান্ত সে-পথ সহজ, নিরঙ্কুশ অথবা সে দুর্গম কঠিন। তোমার কাছেও আমার সেই জিজ্ঞাসা সিফালাস। কবিরা যাকে বলেন ‘বার্ধক্যের বেলাভূমি’ তুমি আজ সেখানে উপস্থিত হয়েছ। তুমি আমায় বলো, প্রবুদ্ধ! জীবনের দিগন্ত কি সত্যিই দুর্গম?
: সক্রেটিস, এ-ব্যাপারে আমার নিজের মনোভাবটি তোমায় বলছি। আমার বয়সী যারা—অর্থাৎ আমরা যারা বৃদ্ধ তারা অনেক সময়েই এক ঝাঁকে সমবেত হই। কারণ, প্রবাদের কথায়, আমরা একই পালের পাখি। আমাদের এরূপ সমাবেশে আমি আমার বন্ধুদের নিকট থেকে অভিযোগের সুরে শুনতে পাই, কেউ বলছে, ‘ভাই! আর খেতে পারছিনে’, কেউ বলছে, ‘কোথায় আর জীবনের সেই পানোৎসব; যৌবনের তারুণ্য আর প্রেমের জোয়ার আজ ভাটার টানে পলাতক, বিশুষ্ক। জীবনে একটা দিন এসেছিল বটে, আনন্দের আর প্রেমের। কিন্তু সে আজ অন্তর্হিত, জীবনআজ মৃত।’ কেউ অভিযোগ করে, আত্মজনেরা আজ তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখছে, কেউ বলে বার্ধক্যই সব দুঃখের মূল; তাদের দুঃখভরা কন্ঠে যত করুণ কাহিনী বর্ণিত হয় তাদের সবার দায়িত্ব ‘বার্ধক্যের’ কাঁধে গিয়ে বর্তায়। কিন্তু সক্রেটিস, আমার মনে হয় আমার অভিযোগকারী বন্ধুগণ তাদের দুঃখের মূল খুঁজে পাচ্ছে না। বৃথাই তারা বার্ধক্যকে দায়ী করছে। কারণ, বার্ধক্য যদি সব দুঃখের কারণ হত তা হলে বৃদ্ধ আমি এবং বৃদ্ধ আর সকলের মনেই তো একই অভিযোগ আর দুঃখবোধের সৃষ্টি হত। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা এরূপ নয়। এমন কিছু বৃদ্ধ অপর বন্ধুও আমার রয়েছে যাদের অভিজ্ঞতাও এরূপ নয়। সফোক্লিস আজ নয়, বহু বছর পূর্বে এ-প্রসঙ্গে সুন্দর জবাবই দিয়েছিলেন। বৃদ্ধ কবি যখন জিজ্ঞাসিত হলেন : কবি, বলো বার্ধক্যে কি প্রেম সাজে? যে-তরুণ একদিন তুমি ছিলে আজও কি তুমি তা-ই রয়েছ? কবি বললেন : “শান্ত হও! তোমরা যার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছ আমি যে তার শৃঙ্খলকে এড়াতে পেরেছি তাতেই আমার পরম সন্তোষ। উন্মত্ত আর অমিত সে প্রভু। তার হাত থেকে রেহাই পেয়েছি, মুক্তি পেয়েছি এ-আনন্দই আমার বড়।’ বৃদ্ধ কবির এ-বাণী আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। উক্তির দিনটি থেকে আজ পর্যন্ত কতবার এ-বাণীকে আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছি। এ-বাণীর যথার্থতা উক্তির দিনটির ন্যায় আজও অম্লান। বার্ধক্য সত্যই আমাদের জীবনে একটা শান্তি আর মুক্তির অনুভূতি নিয়ে আসে। সফোক্লিসের বাণীর মর্মানুযায়ী, আমাদের উদগ্র বাসনার বন্ধন যখন শিথিল হয় তখন আমরা যে কেবল একটি দুর্দম প্রভুর দাসত্ব থেকেই মুক্তি পাই তা-ই নয়, আমাদের বশকারী বহু প্রভুর বন্ধন থেকেই আমরা মুক্তির আস্বাদ লাভ করি। সক্রেটিস, এক্ষেত্রে যারা বৃদ্ধ বয়সে আত্মীয়স্বজনদের উপর অবজ্ঞার দোষ আরোপ করে তারাও আসল কারণটিকে নির্ধারণ করতে পারে না। অবজ্ঞাত হওয়ার আসল কারণ বার্ধক্য নয়, আসল কারণ তাদের আপন আপন চরিত্র এবং মেজাজ। কেননা, একথা আমরা জানি, যে চরিত্রে শান্তএবং সুখী, সে তার বয়সের বোঝা আদৌ বোধ করে না। অপরদিকে চরিত্রই যার বিপরীতধর্মী, কী তারুণ্য কী বার্ধক্য সবই তার নিকট ভার হয়ে দাঁড়ায়।
মুগ্ধ হয়ে আমি সিফালাসের আলোচনাট শুনছিলাম এবং যাতে তিনি তাঁর এই মেজাজটি নিয়ে আরও অগ্রসর হয়ে যেতে পারেন সেজন্য আমি বললাম : তোমার কথা অবশ্যই ঠিক সিফালাস। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার এরূপ বক্তব্যের উপর সাধারণ লোক কোনো আস্থা স্থাপন করবে না। কেননা, তারা হয়তো ভাববে যে, বার্ধক্য যদি সিফালাসের নিকট বোঝা বলে অনুভূত হয়ে না থাকে তো সে এজন্য নয় যে সিফালাস প্রকৃতিগতভাবে ধীর, শান্ত ও বিবেচক। আসল কারণ হচ্ছে, সিফালাস অর্থবান, সিফালাস সম্পদশালী। কেননা, লোকে বলে সম্পদই মানুষের মনে শান্তি আনে।
আমার কথা শুনে সিফালাস বললেন : তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস, সাধারণ লোক আমার কথা বিশ্বাস করে না। এবং আমার সম্পর্কে তাদের বক্তব্য যে একেবারে মিথ্যে একথাও আমি বলছিনে। অবশ্য তাদের কথা যতখানি যথার্থ বলে তারা মনে করে ততখানি যথার্থ নয়। এক্ষেত্রে থেমিসটোক্লিসের ন্যায় আমিও তাদের একটি জবাব দিতে পারি। তুমি জান যে, জনৈক সেরিফিয় তাঁর প্রতি কটূক্তি উচ্চারণ করে বলেছিল যে, থেমিসটোক্লিসের খ্যাতির পেছনে তাঁর নিজের গুণ কিছু নেই; এথেন্সের অধিবাসী বলেই তিনি খ্যাত। সেরিফিয়বাসীর এ উক্তির জবাবে থেমিসটোক্লিস বলেছিলেন : ‘যথার্থ। আর এজন্যেই আমি বলছি যে, তুমি যদি আমার দেশের অধিবাসী হতে, কিংবা আমি তোমার দেশের অধিবাসী হতাম তা হলে তুমি কিংবা আমি কারুর ভাগ্যেই খ্যাতির কোনো প্রসাদই জুটতো না।’ থেমিসটোক্লিসের ন্যায় আমিও যারা সম্পদে বঞ্চিত আর বার্ধক্যে উদ্বিগ্ন তাদের লক্ষ্য করে বলতে পারি : যে নির্ধন কিন্তু সৎ, তার কাছে যেমন বার্ধক্য কোনো বোঝাস্বরূপ বোধ হতে পারে না, তেমনি যে সম্পদে সমৃদ্ধ কিন্তু অসৎ, সে-ও কখনো অন্তরের শান্তি লাভ করতে পারে না।
আমি বললাম : সিফালাস, আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি তোমার এই সম্পদ সবই কি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, না তোমার স্বোপার্জিত?
: সক্রেটিস, অবশ্যই স্বোপার্জিত। কিন্তু তুমি কি যথার্থই জানতে চাও, আমার উপার্জিত সম্পদের পরিমাণ কতখানি? অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে আমাকে তুমি আমার পিতামহ আর পিতার মধ্যবর্তী মনে করতে পার। আমার পিতামহ যাঁর নাম আমি ধারণ করছি তাঁর কথা বললে আমি বলব যে তিনি তাঁর পৈতৃক সম্পদকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিলেন। আমার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ যতটুকু, তিনি ততটুকুই মাত্র উত্তরাধিকার হিসাবে লাভ করেছিলেন। কিন্তু আমার পিতা লীসানিয়াস আবার তাকে ক্ষয় করে বর্তমানের চেয়েও নিচে নামিয়ে দিয়েছিলেন। আর নিজের বেলায় আমি বলব যে, যেটুকু আমি পেয়েছিলাম যেন তার কম নয় বরঞ্চ একটু বেশি আমি আমার পুত্রদের জন্য রেখে যেতে পারি। এটুকু হলেই আমি সুখী হব, আমি আর কিছুই চাইব না।
: আমার জিজ্ঞাসার কারণও তা-ই সিফালাস। কেননা অর্থ এবং সম্পদ সম্পর্কে তোমার যে নিস্পৃহতা দেখা যায় সে-বৈশিষ্ট্য কেবল জন্মগতভাবে প্ৰভূত সম্পদের উত্তরাধিকারীদের চরিত্রেই দৃষ্ট হয়, সম্পদ উপার্জনকারীদের চরিত্রে নয়। অর্থ এবং সম্পদকে যারা নিজেরা উপার্জন করে তারা আপন সৃষ্ট বলে একান্তভাবে ভালোবাসে। তাদের এ-ভালোবাসা হচ্ছে কাব্যের প্রতি কবির কিংবা পুত্রের প্রতি পিতার ভালোবাসারই সদৃশ। অর্থ এবং সম্পদের একটা ব্যবহারিক মূল্য আছে। সেজন্য মানুষমাত্রই তাকে ভালোবাসে। আমাদের সে-ভালোবাসা সাধারণ; কিন্তু সম্পদসর্বস্বদের এই ভালোবাসা অস্বাভাবিক এজন্য এদের সঙ্গ খুব বাঞ্ছনীয় নয়। এরা সঙ্গী হিসাবে পরিত্যাজ্য। কেননা, তাদের পক্ষে কারু সঙ্গে অর্থ এবং সম্পদের প্রশংসা ব্যতীত অপর কোনো আলোচনা করাই সম্ভব নয়।
সিফালাস বললেন : তোমার একথা যথার্থ সক্রেটিস।
: হ্যাঁ, একথা অবশ্যই সত্য। কিন্তু তোমার নিকট আমার আর একটি প্রশ্ন রয়েছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পদ থেকে কী শান্তি তুমি লাভ করেছ?
সিফালাস বললেন : সম্পদের একটি আশীর্বাদের কথা আমি বলতে পারি। অবশ্য আমি জানি, আমার কথাটি অপরকে সহজে বিশ্বাস করানো সম্ভব নয়। তথাপি, সক্রেটিস, আমি মনে করি যে, সম্পদের এই দানটি খুবই মূল্যবান। কেননা, মানুষ যখন মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে আসে তখন তার মনে এতদিন পর্যন্ত যে-চিন্তা, ভাবনা ও ভীতির উদয় হয়নি, সেগুলোরই উদ্ভব ঘটতে থাকে; পাতাললোকে যাত্রা যখন তার আসন্ন হয়ে উঠেছে তখন তার কৃতকর্মের ফলস্বরূপ যে-শাস্তি তাকে সেই পরলোকে পেতে হবে তার কথা আতঙ্কজনকভাবে তার মনে উদয় হতে থাকে। মর্তলোকের কার্যাবলীর জন্য পাতাললোকে দণ্ড কিংবা পুরস্কারলাভের কাহিনী সে পূর্বেও শুনেছে। কিন্তু পূর্বে যে-কাহিনী ছিল তার নিকট পরিহাসের বস্তু আজ তাই হয়ে উঠেছে তার নিকট আতঙ্কের বিষয়। আজ সে ভাবছে, এতকাল যাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, সে-কাহিনী শেষ পর্যন্ত সত্যও হতে পারে। পাতাললোকের সান্নিধ্য অথবা বয়সের আধিক্য—যে-কারণেই হোক-না কেন আজ যেন পাতাললোক সম্পর্কে তার দৃষ্টিটি বেশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে; উদ্বেগ এবং আতঙ্কে তাই সে অস্থির হয়ে উঠেছে। আজ সে ভাবতে শুরু করেছে, মর্তলোকের জীবনে কার প্রতি কোন্ অন্যায় সে করেছে। এই হিসাব-নিকাশে যখন সে দেখতে পায় যে, অন্যায়ের অংশ তার মোটেই কম নয় তখন শিশুর মতোই নিদ্রার মধ্যে দুঃস্বপ্নে সে আঁতকে ওঠে; মন তার নানা দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্যায় থেকে যে মুক্ত, পাপের দুশ্চিন্তার উদয় যার মনে ঘটে না, সুন্দর আশাই তার পরলোকের পথে প্রিয় সঙ্গী হিসাবে তাকে অভয় দিতে থাকে। এ কথাটিই সুন্দরভাবে প্রকাশ করে পিন্ডর বলেছেন :
যে ধর্মের পথে রয়েছে এবং পবিত্র জীবনযাপন করেছে আশা তার আত্মার সঙ্গী; তার বার্ধক্যে আর পাতাললোকের পথে আশা তাকে ভরসা যোগায়; কারণ, দুশ্চিন্তায় অস্থির আত্মাকে শান্ত করার ক্ষমতা একমাত্র আশারই আছে।
পিন্ডরের এ-কথাকয়টিকে আমি খুবই উত্তম বলে মনে করি। আর তাই সম্পদের যেটা সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ সে হচ্ছে উত্তম ও সৎকে এই অভয়দান যে, ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় কাউকে প্রতারণা কিংবা বঞ্চিত করার কোনো কারণ তার ঘটেনি। পাতাললোকে যাত্রার মুহূর্তে মানুষ কিংবা দেবতা কারু কাছে কোনো ঋণের চিন্তাতেই আর সে নিজেকে চিন্তাগ্রস্ত বোধ করে না। একথা অবশ্যই সত্য যে, এ-আশীর্বাদ কেবলমাত্র উত্তমের ভাগ্যেই জুটতে পারে, সকলের ভাগ্যে নয়। দুশ্চিন্তা থেকে মানুষের মুক্তিবোধের এই যে শান্তি সে কেবল সম্পদ থেকেই আমরা লাভ করতে পারি। সম্পদের সুবিধা এ ছাড়াও নিশ্চয়ই আরও অনেক রয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, যে-ব্যক্তি জ্ঞানী, যে চিন্তাশীল তার কাছে সম্পদের আশীর্বাদ এর চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না।
আমি বললাম : তুমি ঠিকই বলেছ সিফালাস, এর চেয়ে সম্পদের বড় আশীর্বাদ আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু তা হলে ন্যায় সম্পর্কে আমরা কী বলব? সত্যকথন কিংবা ঋণ-পরিশোধকে কি আমরা ন্যায় কিংবা ধর্মের সংজ্ঞা বলে নির্দিষ্ট করতে পারি? তা ছাড়া, এমন সংজ্ঞারও কি ব্যতিক্রমের কথা আমাদের স্বীকার করতে হয় না? কারণ, ধরো, আমার এক বন্ধু সুস্থ অবস্থা তাঁর একটি অস্ত্র আমার কাছে জমা রাখলেন। কিন্তু তিনি যখন তাঁর সে-অস্ত্র ফেরত চাইলেন, তখন তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। এখন আমার কী করণীয়? আমি কি তাঁকে তাঁর জমা-রাখা অস্ত্র ফেরত দেব? এমন অবস্থায় তাঁর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া আমার পক্ষে সঙ্গত বলে নিশ্চয়ই কেউ বলবে না। অনুরূপ অবস্থায় যিনি আছেন তাঁর কাছে সত্যকথন কেউ উচিত-কার্য বলে মনে করবে না।
সিফালাস বললেন : তোমার কথা যথার্থ সক্রেটিস।
আমি বললাম : তা হলে সত্যকথন এবং ঋণ-পরিশোধকে ন্যায় বা ধর্মের সঠিক সংজ্ঞা বলে অভিহিত করা চলে না।
এবার পলিমারকাসও আলাপে যোগ দিলেন। তিনি বললেন : তুমি ঠিকই বলেছ সক্রেটিস। সিমোনাইডিসের কথাকে যদি বিশ্বাস করতে হয় তা হলে ধর্মের সেরূপ সংজ্ঞা-নির্ধারণ আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এই সময়ে সিফালাস চলে যাওয়ার উপক্রম করে বলে উঠলেন : আমার তো আর বিলম্ব করার উপায় নেই সক্রেটিস। বলিদান অনুষ্ঠানের তদারক আমাকে করতে হবে। তাই পলিমারকাস এবং অন্য বন্ধুদের হাতে যুক্তির বল্লাটি তুলে দিয়ে আমি এবার নিষ্ক্রান্ত হতে চাই।
আমি বললাম : তা হলে পলিমারকাসই তোমার যুক্তি-সম্পদের উত্তরাধিকারী, কী বল?
সিফালাস যেতে যেতে সহাস্যমুখে বললেন : তাতে আর সন্দেহ কী?
