১৮. দার্শনিক-শাসকের শিক্ষা
অধ্যায় : ১৮ [৫০৩–৫১১]
দার্শনিক-শাসকের শিক্ষা
‘দার্শনিক-শাসক’ যদি অবাস্তব কল্পনা না হয় তা হলে বাস্তব ক্ষেত্রে দার্শনিকের শাসক হতে হলে তাকে উপযুক্তরূপে শিক্ষিত হতে হবে। অপর যে-কেউ ক্ষমতা দখল করে শাসক হতে পারে। কিন্তু দার্শনিকের সর্বোত্তম জ্ঞান অর্জন না করে শাসক হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কাজেই যখন ধরে নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে দার্শনিক শাসক হতে পারে তখন তার জ্ঞান তথা শিক্ষার প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। দার্শনিক-শাসকের শিক্ষা অবশ্যই ভিন্ন ধরনের অর্থাৎ উচ্চতর ধরনের হতে হবে। আঠার বছর পর্যন্ত নাগরিক-মাত্রের সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার কথা পূর্বে বলা হয়েছে। সে-শিক্ষার জোর ছিল শরীর চর্চা এবং সঙ্গীতের উপর। দার্শনিক-শাসককে বাছাই করতে হলে এবার উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আঠারো থেকে কুড়ি বছর—অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার পরে আরও দুবছর তার শরীরচর্চা চলতে পারে। কিন্তু বিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর পর্যন্ত তার চলবে উচ্চতর দর্শনের চর্চা। এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীকে জানতে হবে পরম উত্তম কাকে বলে, পরম সত্য কী, ধারণা এবং জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কী, বহু এবং এক-এর মধ্যে পার্থক্যের ভিত্তি কী, ভাব কী এবং মূল এবং প্রতিরূপের সম্পর্ক কি?
*
আমি প্রথমে স্ত্রীদের স্বামিত্ব, সন্তানপ্রজনন, শাসকদের নিযুক্তি ইত্যাদি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম আমাদের আদর্শ রাষ্ট্রকে ঈর্ষার চোখে দেখা হবে। আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়নের সমস্যার দিকটিও আমার স্মরণে ছিল। তাই আমি তাদের আলোচনা এড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার সে-চাতুর্য কোনো কাজে আসেনি। কারণ, সেসব প্রশ্ন আমাকে আলোচনা করতে হয়েছে। যাক, মেয়েদের এবং সন্তানদের সমস্যা শেষ হয়েছে। কিন্তু অপর প্রশ্ন হচ্ছে শাসকদের। এ-প্রশ্নকে গোড়া থেকেই আমাদের আলোচনা করতে হবে। এ্যাডিম্যান্টাস, তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে আমরা বলেছিলাম, শাসকদের দেশপ্রেমিক হতে হবে। আনন্দ কিংবা বেদনায়, কষ্টে কিংবা বিপদে কিংবা অপর যে-কোনো সংকটে তাদের দেশপ্রেমকে তারা হারাতে পারবে না। এই পরীক্ষায় তাদের সফল হতে হবে। যে ব্যর্থ হবে তাকে নাকচ করা হবে। কিন্তু নিষ্কলুষ স্বর্ণের মতো, যে অগ্নিপরীক্ষায় শুদ্ধ হয়ে বেরিয়ে আসবে তাকে আমরা শাসক করব। সে মৃত্যুর এপারে এবং ওপারে সম্মানিত এবং পুরস্কৃত হবে। এ-পর্যন্ত আমাদের আলোচনা ভালোই চলছিল। কিন্তু এর পরেই আলোচনায় সংকট ঘটেছে। যে-প্রশ্ন এখন উঠে আসছে তাকে এতক্ষণ আমরা স্বীকার করতে চাইনি।
হ্যাঁ, আলোচনার ধারাটি আমার স্মরণ আছে।
হ্যাঁ, আর তখন কথাটি আমি সাহস করে বলতে পারিনি। কিন্তু এখন আমাকে সাহস করে বলতে হয় : উত্তম শাসককে অবশ্যই দার্শনিক হতে হবে।
হ্যাঁ, সে কথাটি এবার বলা অবশ্যক।
কিন্তু তাদের সংখ্যা কি অধিক হবে? তেমন মনে কোরো না। কারণ এজন্য যে সকল গুণকে আমরা অপরিহার্য মনে করেছি তাদের সম্মিলন কদাচিত ঘটে। তাদের একত্র পাওয়ার চেয়ে বিচ্ছিন্নভাবেই অধিক পাওয়া যায়।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তুমি কী বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?
আমি বললাম : তুমি নিশ্চয়ই জান এ্যাডিম্যান্টাস, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি, বিচক্ষণতা, প্রাখর্য—এইসব এবং অনুরূপ অন্য গুণ একখানে মেলা ভার। কিন্তু যদি কারও এই সকল গুণ থাকে এবং একই সঙ্গে সে যদি তেজি এবং অকৃপণ হয় তা হলে সে-চরিত্র খুব স্থিরতা, শান্তি এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে না। তারা সর্বক্ষণ তাদের প্রবণতা দিয়ে তাড়িত হয় এবং তাদের উত্তমনীতি সব বিনষ্ট হতে থাকে।
তোমার কথা খুবই সত্য, সক্রেটিস।
অপরদিকে, যারা স্থির, বিশ্বাসী এবং নির্ভরযোগ্য তারা যেমন বুদ্ধি কিংবা বিপদে ভীত হয় না, তেমনি কোনোকিছু শেখার প্রতিও তাদের কোনো আগ্রহ থাকে না। এ ক্ষেত্রেও তারা যুদ্ধক্ষেত্রের ন্যায়ই অনড় এবং অভেদ্য। তারা সব সময়েই জড়ের অবস্থায় বাস করে। মানসিক কোনো পরিশ্রমের প্রয়োজন হলে তারা হাই তুলতে থাকে এবং অচিরে নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ে।
যথার্থ বলেছ।
তবু আমরা বলেছি, যাদের উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে, যাদের সরকার-পরিচালনার কিংবা সামরিক বাহিনীর অধিনায়কত্বদানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে তাদের মধ্যে এই উভয় প্রকার গুণের অস্তিত্বই আবশ্যক।
অবশ্যই।
কিন্তু এমন শ্রেণীর লোক কি দুর্লভ হবে না?
অবশ্যই দুর্লভ হবে।
তা হলে এই দয়িত্বের যে আকাঙ্ক্ষী তাকে কেবল যে আনন্দ, কষ্ট, ভয়, বিপদ—এই সব পরীক্ষায়ই পরীক্ষিত হতে হবে, তা-ই নয়, তাকে ভিন্নতর পরীক্ষাতেও কৃতকার্য হতে হবে। এ-বিষয় আমরা পূর্বে উল্লেখ করিনি। তাকে বহুবিধ জ্ঞানের পরীক্ষায় পরীক্ষিত হতে হবে। চরম জ্ঞানলাভে সে সক্ষম কি না কিংবা অপরে যেমন কঠিন দৈহিক শ্রমে চেতনা হারিয়ে ফেলে তেমনি চরম জ্ঞানের চাপে তার আত্মা সংবিৎ হারিয়ে ফেলবে অথবা দৃঢ় থাকতে সক্ষম হবে সে-পরীক্ষারও প্রয়োজন হবে।
হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ, সক্রেটিস। শাসককে পরীক্ষিত হতে হবে। কিন্তু ‘চরম জ্ঞান’ বলতে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ?
তোমার নিশ্চয় স্মরণ আছে, এ্যাডিম্যান্টাস, আত্মাকে আমরা তিনটি অংশে বিভক্ত করেছিলাম এবং তার পরে পৃথকভাবে আমরা ন্যায়, সংযম, সাহস এবং জ্ঞানের চরিত্র নির্ধারণ করেছিলাম।
হ্যাঁ, এ কথা আমার মনে আছে। কারণ, একথা ভুলে গেলে এ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করারই আমার কোনো অধিকার থাকে না।
কিন্তু সে-আলোচনার পূর্বে আমি যে সাবধানবাণীটি উচ্চারণ করেছিলাম সেটি কি তোমার স্মরণ আছে?
তুমি কিসের উল্লেখ করছ, সক্রেটিস?
আমার নিজেরও যদি সঠিক স্মরণ থাকে তা হলে আমি বলব আমরা বলেছিলাম, যে এই গুণকে তাদের পরম সত্তায় প্রত্যক্ষ করতে চায় তাকে দীর্ঘতর এবং জটিলতর পথ অতিক্রম করতে হবে। এই দীর্ঘ এবং জটিল পথের শেষে আমরা এইসব গুণের সম্যক পরিচয় লাভ করতে পারব। অবশ্য একটি সাধারণ পরিচয়ও এদের দেওয়া হয়। কিন্তু সেটি হবে অসম্পূর্ণ। এ-প্রস্তাবে তুমি তখন বলেছিলে, এরূপ ব্যাখ্যাতেই তোমার চলবে। আর সে-কারণেই আমি এই গুণগুলির একটি আলোচনা তোমাদের কাছে উপস্থিত করেছিলাম। কিন্তু সে-আলোচনার অসম্পূর্ণতার দিকটি আমি ভুলিনি। এখন তুমি বলতে পার, সে-আলোচনায় তুমি সন্তুষ্ট হতে পেরছিলে কি না?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ সক্রেটিস, আমিও যেমন, তেমনি আমার অপর সঙ্গীরাও মনে করেছেন, সে-আলোচনায় সত্যের বেশ পরিমাণ পরিচয়ই তুমি আমাদের দিয়েছিলে।
আমি বললাম : কিন্তু প্রিয় বন্ধু, এসব বিষয়ে বেশ পরিমাণও সমগ্র সত্যের চেয়ে কম। এবং যে-আলোচনা আমাদের নিকট সমগ্র সত্যকে প্রকাশ করে না, সে আলোচনাকে আমরা যথেষ্ট বলতে পারিনে। সাধারণ মানুষ অবশ্য জ্ঞানের ক্ষেত্রে অল্পতেই তুষ্ট। তারা মনে করে, অধিক অনুসন্ধানের আর আবশ্যকতা নেই। কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো অসম্পূর্ণতাই সম্পূর্ণতার পরিমাপক হতে পারে না।
সাধারণ মানুষ পরিশ্রমে বিমুখ। কাজেই তাদের পক্ষে এরূপ ভাবা স্বাভাবিক।
হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। কিন্তু রাষ্ট্র এবং বিধানের যে অভিভাবক তার চরিত্রে এর চেয়ে ক্ষতিকর কোনো ত্রুটি আর হতে পারে না।
খুবই ঠিক কথা।
তা হলে যে অভিভাবক, যে শাসক, তাকে সত্যের দীর্ঘতর পথই গ্ৰহণ করতে হবে। তাকে বুদ্ধির বিকাশ এবং শরীরের চর্চা—উভয়ক্ষেত্রে পরিশ্রম করতে হবে। অন্যথায় যে চরম জ্ঞানে তাকে অবশ্যই পৌঁছতে হবে সে-চরম
জ্ঞান কখনো সে লাভ করতে পারবে না।
কিন্তু ন্যায় এবং অপর যে-গুণের আমরা আলোচনা করেছি তার চেয়ে উচ্চতর জ্ঞান কি কিছু হতে পারে?
হ্যাঁ, তার চেয়ে উচ্চতর জ্ঞান হতে পারে। কিন্তু গুণের ক্ষেত্রে কোনো গুণের কেবল আভাস পেলে আমাদের চলবে না। তার সত্তার পরিপূর্ণ ছবিই আমাদের তৈরি করতে হবে। কত ক্ষুদ্র বিষয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিবরণ তৈরির পেছনে অসীম পরিশ্রম এবং কষ্ট আমরা ব্যয়িত হতে দেখি। এমনি পরিশ্রমে তাদের অস্তিত্ব পরিপূর্ণ সৌন্দর্য এবং স্পষ্টতায় প্রকাশিত হয়। গুরুত্বহীন বিষয়ের ক্ষেত্রে যদি এরূপ হতে পারে তা হলে পরম সত্যকে চরম নির্ভুলতায় প্রকাশ করার চেষ্টায় আমাদের কার্পণ্য কি হাস্যকর নয়?
অবশ্যই হাস্যকর। কিন্তু তা হলেও তুমি কি মনে কর যে, এই চরম জ্ঞানের বিষয়ে আমরা তোমাকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকব?
না, আমি তা বলিনে। প্রশ্ন করতে চাও, তোমরা প্রশ্ন করো। কিন্তু প্রশ্নের জবাব আমি পূর্বেও বহুবার দিয়েছি। এখন দেখতে পাচ্ছি, হয় তোমরা তা বোঝনি কিংবা আমার মনে হচ্ছে তোমরা এখন একটা গণ্ডগোল সৃষ্টি করতে চাচ্ছ। কারণ, আমি বহুবার বলেছি যে, উত্তমের জ্ঞানই হচ্ছে চরম জ্ঞান। আমদের যা-কিছু প্রয়োজনীয় এবং উপকারী তা সবই এই জ্ঞানের ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল। তুমি নিশ্চয়ই জান, আমি এ বিষয়ের আলোচনাটিই শুরু করতে যাচ্ছিলাম। এটি তোমার না-জানার কথা নয়। আর এ কথাও আমি একাধিকবার বলেছি যে, এই বিষয়ে যেমন আমাদের জ্ঞান খুবই সামান্য তেমনি আবার এই জ্ঞান ব্যতিরেকে অপর কোনো জ্ঞানই আমাদের কোনো উপকারে আসবে না। যা-ই আমাদের থাকুক-না-কেন, উত্তমকে যদি আমরা লাভ করতে না পারি তা হলে সবই কি নিরর্থক নয়? জ্ঞানের ক্ষেত্রেও পরম সুন্দর এবং পরম উত্তমের জ্ঞান ব্যতীত সব জ্ঞানই নিরর্থক। নয় কি?
নিঃসন্দেহে, সক্রেটিস।
তা ছাড়া, এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি এ কথাও জান, অধিকসংখ্যক লোক আনন্দকেই উত্তম বিবেচনা করে। কিন্তু যারা বুদ্ধিমান তারা জ্ঞানকে উত্তম মনে করে।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
কিন্তু আবার একথাও ঠিক, যারা জ্ঞানকে উত্তম বলে, তারা ব্যাখ্যা করে বলতে পারে না ‘জ্ঞান’ বলতে তারা কী বোঝাতে চায়। যুক্তির ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কেবল বলে, উত্তমের জ্ঞানকে তারা বোঝাতে চায়।
এরূপ বলা নিশ্চয়ই হাস্যকর।
হ্যাঁ, হাস্যকরই বটে। কারণ তারা শুরু করে এই অভিযোগ নিয়ে যে, আমরা উত্তমের ব্যাপারে অজ্ঞ। কিন্তু তাদের যখন প্রশ্ন করা হয়, উত্তম কাকে বলে, তখন তারা জবাব দেয় : উত্তম কাকে বলে তা তো তোমরা জানই। তারা উত্তমকে উত্তমের জ্ঞান বলে সংজ্ঞায়িত করে। তাদের ভাব, যেন তাদের পক্ষে ‘উত্তম’ কথাটি উচ্চারণ করাই যথেষ্ট, কেননা উত্তমকে আমরা জানি। এটা হাস্যকরই বটে।
তোমার একথা খুবই সত্য।
এবং ‘আনন্দ’কে যারা উত্তম মনে করে তাদের অবস্থাও একইরূপ। তারাও এমনি বিভ্রমের মধ্যে বাস করে। কারণ যুক্তির ধারায় তারা এ কথা স্বীকারে বাধ্য হয় যে, আনন্দ কেবল এক প্রকার নয়। আনন্দের উত্তম আছে। আনন্দের অধমও আছে।
অবশ্যই।
কিন্তু আনন্দকে উত্তম বলার অর্থ—উত্তম এবং অধমের কোনো পার্থক্য নেই। দু’টিই এক।
হ্যাঁ, তা-ই দাঁড়ায়।
একটা বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, প্রশ্নটির মধ্যে অনেক অসুবিধা আছে। হ্যাঁ, সক্রেটিস, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তা ছাড়া একটি বিষয় তো আমরা জানি যে, অনেকে যথার্থরূপে ন্যায়বান কিংবা সম্মানীয় না হয়েও এরূপ গুণে গুণী বলে বাহ্যিকভাবে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। কিন্তু কেউ যথার্থ উত্তমকে বাদ দিয়ে কেবল উত্তম বলে যা বোধ হয় তাতে সন্তুষ্ট হতে পারে না। উত্তমের ক্ষেত্রে যথার্থ উত্তমেরই সবাই সন্ধান করে। উত্তমের অলীক রূপকে সকলে ঘৃণা করে। সত্য নয় কি?
খুবই সত্য।
তা হলে আত্মার সকল অনুসন্ধানের লক্ষ্য হচ্ছে ‘উত্তম’। আমরা সকলে ধরে নিই যে, উত্তম আছে। উত্তম অস্তিত্বময়। সে-কারণেই আমরা তার অনুসন্ধান করি। কিন্তু আমরা কেউ জানিনে সে-উত্তম কী? তার রূপ কী? আমরা সে-উত্তমকে ধরতে কিংবা ছুঁতে পারিনে, যেমন আমরা জাগতিক অন্য সব বস্তুকে ধরতে পারি, ছুঁতে পারি। বস্তুর নিশ্চয়তা আমরা বোধ করি। কিন্তু বস্তুর ন্যায় উত্তমের নিশ্চয়তা আমরা বোধ করিনে। এ হচ্ছে সাধারণ মানুষের কথা। কিন্তু আমরা কি ভাবতে পারি আমাদের মধ্যে মহত্তম যে-নাগরিক, যাদের উপর আমরা ন্যস্ত করব রাষ্ট্রের সমস্ত দায়িত্ব, তারাও উত্তম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ন্যায় অজ্ঞানতার অন্ধকারে বাস করবে?
কোনোক্রমেই আমরা এরূপ ভাবতে পারিনে।
মোটকথা, যে-লোক সুন্দর এবং ন্যায়ের উত্তমকে জানে না, যে জানে না কী কারণে সুন্দর এবং ন্যায়—উভয়ই উত্তম, সে নিশ্চয়ই সুন্দর এবং ন্যায়ের খুব উত্তম শাসক নয়। আর যে উত্তম সম্পর্কে অজ্ঞ তার পক্ষে সুন্দর এবং ন্যায়ের যথার্থ জ্ঞান অর্জনও সম্ভব নয়।
তোমার এ-সন্দেহ ভিত্তিহীন নয়।
কিন্তু এমন শাসক আমরা যদি পাই যার এ-জ্ঞান আছে তা হলে আমাদের রাষ্ট্র কি আদর্শ রাষ্ট্ররূপে গঠিত হবে না?
নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে : তোমার নিজের কী মত সক্রেটিস? তুমি কি উত্তমকেই জ্ঞান বলবে? না জ্ঞান হচ্ছে আনন্দ? কিংবা তুমি বলতে চাও, জ্ঞান এদের উভয় থেকেই ভিন্নতর কিছু?
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে বললাম : চমৎকার লোক তুমি এ্যাডিম্যান্টাস। আমি জানতাম তোমার মতো কঠিন ‘ভদ্রলোক’ অপরের কোনো কথায় সন্তুষ্ট হতে পারে না।
সত্য কথা, সক্রেটিস। কিন্তু আমি বলব, তোমার মতো লোক, যে তার সমস্ত জীবন দর্শনের অধ্যয়নে ব্যয় করেছে তার পক্ষে নিজের অভিমত প্রকাশ
না করে অপরের মতামতকে বারংবার বলা শোভা পায় না।
ঠিক কথা। কিন্তু যে-লোক যে-বিষয় সম্পর্কে জানে না তার কি সে-বিষয়ে জোর করে কিছু বলা শোভনীয়?
না, জোর করে বলবে এমন কথা আমি বলছিনে। কিন্তু সে-বিষয়ে তার কি ধারণা তা তো সে একটি মত হিসাবে বলতে পারে।
কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি কি জান না, কেবল ধারণা কিছু ভালো জিনিস নয়? কারণ জ্ঞান বাদে ধারণা মূল্যহীন। বড় জোর তুমি তাকে অন্ধের সঙ্গে তুলনা করতে পার। জ্ঞান বাদে যার শুধু ধারণা আছে, সে হচ্ছে অন্ধ। এমন লোকের যদি সত্য ধারণাও থাকে তবু সে হবে অন্ধ লোকের সত্য ধারণা। সঠিক রাস্তার উপর অন্ধ লোকের হাতড়ে চলার মতো।
খুবই সত্য কথা।
কিন্তু অপরে যেখানে তোমাকে জ্ঞানের আলো এবং সৌন্দর্য দান করতে পারবে তুমি কি সেখানে আমার মতো অন্ধ, পঙ্গু এবং অধমের ধারণাকে জানতে চাও?
এবার গ্লকন বললেন : তবু আমার অনুরোধ, সক্রেটিস, আমরা যখন প্রায় আমাদের লক্ষ্যের কাছে উপনীত হয়েছি তখন তুমি আর অস্বীকার কোরো না। ন্যায়, সংযম এবং অপর সব গুণ সম্পর্কে যেরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছ, তেমনি ব্যাখ্যা উত্তম সম্পর্কে দিলেই আমরা সন্তুষ্ট হব।
বন্ধুবর! কেবল তোমরা নও, সেরূপ ব্যাখ্যা দিতে পারলে আমি নিজেও সন্তুষ্ট হব। কিন্তু আমার ভয়, আমি তাতেও ব্যর্থ হব এবং আমার এই হঠকারী উৎসাহের জন্য আমি উপহাসের পাত্র হয়ে উঠব। কাজেই বন্ধুগণ! সে কাজ করে লাভ নেই। উত্তমের সঠিক প্রকৃতি কী, সে-প্রশ্ন এখন তুলে লাভ নেই। সে-প্রশ্নের জবাবদান এখনও আমার শক্তির বাইরে। তবে উত্তমের সন্তান অবশ্যই উত্তমের মতো। তোমরা যদি চাও, তা হলে উত্তমের সন্তান সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারি। তোমরা না চাইলে অবশ্য আমি সে-চেষ্টা করব না।
গ্লকন বললেন : ঠিক আছে, তুমি আপাতত সন্তান সম্পর্কেই বলো। জনকের ঋণটা বাকি থাকুক।
আমার পক্ষে সম্ভব হলে কেবল সন্তান নয়, জনকের ঋণও আমি তোমাদের পরিশোধ করে দিতাম। যাহোক, সন্তানের দেয়টিই এখন মূলের সুদ হিসাবে গ্রহণ করো। তবে খেয়াল রেখো, আমার পরিশোধটা যেন অচল টাকায় না হয়। অবশ্য আমি ইচ্ছাকৃতভাবে তোমাদের প্রতারণা করব, একথা আমি বলছিনে।
তুমি অগ্রসর হও, সক্রেটিস। আমরা যতটা পারি সতর্ক থাকব।
ঠিক আছে। তবে তোমাদের সঙ্গে প্রথমে আমার একটা বন্দোবস্ত আবশ্যক। এই আলোচনার মধ্যে এবং অন্যত্র আমি যে-কথা তোমাদের বহুবার বলেছি তাকে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
কিসের কথা বলছ তুমি?
সে পুরনো কথা : সুন্দরের বৈচিত্র্য আছে। উত্তমেরও বৈচিত্র্য আছে। এমনি করেই আমরা সুন্দর, উত্তম, কিংবা অপর সব সত্তার সংজ্ঞা প্রকাশ করি। আমরা বলি উত্তম, সুন্দর—সকলের ওপরই ‘বহু’ কথাটি প্রযোজ্য।
হ্যাঁ, এরূপ আমরা বলি।
কিন্তু যে-সকল বস্তু বা সত্তার উপর আমরা ‘বহু’ কথাটি প্রয়োগ করি তাদের প্রত্যেকেরই একটি চরম সত্তা আছে। বহু সুন্দরের এক পরম সুন্দর আছে। বহু উত্তমের এক পরম উত্তম আছে। কারণ বহুকে আমরা তাদের অপরিহার্য গুণ বা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একটি ভাব কিংবা শ্রেণীতে বদ্ধ করি। এই ভাবকেই আমরা প্রত্যেক শ্রেণীর মূল বা সার বলে অভিহিত করি।
খুবই সত্য কথা।
আমরা বলতে পারি : বহুকে আমরা দেখি কিন্তু জানি না; এবং ভাবকে আমরা জানি কিন্তু দেখি না।
যথার্থ
আচ্ছা, দৃশ্যবস্তুকে আমরা আমাদের কোন্ ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখি?
গ্লকন জবাব দিলেন : আমরা চোখ দিয়ে দেখি।
ঠিক। এবং আমরা কান দিয়ে শুনি। আমাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয়, বস্তুকে এমনিভাবে অনুভব করে। সব বস্তুই এমনিভাবে ইন্দ্রিয়গোচর হয়।
ঠিক।
কিন্তু একটা জিনিস তুমি খেয়াল করেছ, গ্লকন? সব ইন্দ্রিয়ের মধ্যে দৃষ্টি বা চোখ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ইন্দ্রিয়। দেহের কারিগর চোখকেই সবচেয়ে জটিল কারিগরি দিয়ে তৈরি করেছেন।
না সক্রেটিস, বিষয়টি আমি খেয়াল করিনি।
তা হলে আর একটা বিষয়ে চিন্তা করে দ্যাখো। কান বল কিংবা কণ্ঠস্বর বল—এদের কি কার্যকর হতে কোনো তৃতীয় ইন্দ্রিয়ের আবশ্যক হয়? অর্থাৎ কানকে শোনার জন্য এবং স্বরকে শ্রুত হওয়ার জন্য তৃতীয় কোনো শক্তির উপর কি তাদের নির্ভর করতে হয়?
না, অপর কিছুর আবশ্যক হয় না।
তোমার কথা ঠিক। অপর কিছুর আবশ্যক হয় না। এ কথা সব ইন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রে সত্য না হলেও বেশির ভাগ ইন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রে এ কথা সত্য। এদের কারোরই অপর কোনো শক্তির সাহায্য আবশ্যক হয় না।
না, তা হয় না।
কিন্তু দৃষ্টির বেলা ব্যাপারটি ভিন্ন। অন্য কোনোকিছুর সাহায্য ব্যতীত কিছু দেখা কিংবা দৃষ্ট হওয়া : এর কোনোটাই সম্ভব নয়।
কীভাবে?
দৃষ্টি বলতে আমরা চোখকে বুঝি। যার দৃষ্টি আছে সে দেখতে চায়। ধরো, সে রংকে দেখতে চায়। দেখার জন্য রংও আছে। কিন্তু তবু উপযুক্ত তৃতীয় কোনোকিছু না হলে চোখের মালিক কিছুই দেখবে না। রং তার কাছে অদৃশ্য থাকবে।
কিন্তু তৃতীয় কিসের কথা তুমি বলতে চাচ্ছ?
আমি বললাম : যাকে তুমি আলো বল। তৃতীয় বস্তু হচ্ছে আলো।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
চোখ এবং দৃশ্যের মধ্যে আলো হচ্ছে একটি বন্ধন। আমরা বলব একটি মহৎ বন্ধন। অপর বন্ধনের সঙ্গে এর প্রকৃতিগত পার্থক্য আছে। কারণ আলোকে তুমি অবজ্ঞা করতে পার না।
না সক্রেটিস, আলো অবজ্ঞেয় নয়। বরঞ্চ তার বিপরীত।
বেশ। কিন্তু স্বর্গের দেবতাদের মধ্যে কে এই মহৎ শক্তির উৎস? কার আলোতে আমরা বস্তুকে দেখি এবং বস্তু দৃশ্যমান হয়ে ওঠে?
তুমি নিশ্চয়ই সূর্যের কথা বলবে? আমরা সকলে তা-ই বলি।
তা হলে দৃষ্টির সঙ্গে আলোর দেবতার সম্পর্কটি কি আমরা নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করতে পারিনে?
কীভাবে?
চোখ কিংবা—দৃশ্য—যার মধ্যে দৃষ্টি আছে বলে আমরা মনে করি তাদের কারোর অবস্থানই কিন্তু সূর্যের মধ্যে নয়।
না। এরা কেউ সূর্যের মধ্যে থাকে না।
কিন্তু সকল ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সূর্যের সঙ্গে চোখের সাদৃশ্যই সবচেয়ে বেশি।
হ্যাঁ, চোখ সূর্যের মতো।
এবং চোখের যে-শক্তি তাকে আমরা সূর্যের বিচ্ছুরিত শক্তির প্রতিফলন বলতে পারি। ঠিক নয় কি?
ঠিক কথা।
তা হলে সূর্যকে আমরা দৃষ্টি বলব না। সূর্য হচ্ছে দৃষ্টির উৎস।
দৃষ্টি সে উৎস অর্থাৎ সূর্যকে দেখে।
এ কথাও সত্য।
একেই আমি বলতে চেয়েছি উত্তমের সন্তান। উত্তম নিজের প্রতিকৃতিতে তার সন্তানকে দৃশ্যমান জগতের জন্য তৈরি করেছে। মানসিক জগতে বুদ্ধির সঙ্গে বোধ্যর যে সম্পর্ক, দৃষ্টির ক্ষেত্রে, দৃশ্যের সঙ্গে দৃষ্টিরও সেই সম্পর্ক
আর-একটু পরিষ্কার করে বলো সক্রেটিস।
কেন, তুমি কি খেয়াল করনি, চোখ যখন কোনো বস্তুকে দেখতে চায়—যে-বস্তুর উপর সূর্যের আলো নেই কিন্তু চাঁদ এবং তারার আলো মাত্র পড়েছে, তখন চোখ তাকে আবছাভাবে মাত্র দেখতে পায়। চোখের মধ্যে এমন অবস্থায় দৃষ্টির কোনো স্পষ্টতা থাকে না। সে প্রায় অন্ধ হয়ে যায়।
হ্যাঁ, এ তো সত্য।
কিন্তু চোখ যখন এমন বস্তুকে দেখতে চায় যার উপর সূর্যের আলো পড়েছে তখন সে তাকে স্পষ্ট দেখতে পায়। চোখে তখন দৃষ্টি থাকে। ঠিক নয় কি?
অবশ্যই।
তা হলে আত্মাকে আমরা চোখের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। আত্মা হচ্ছে চোখ। আত্মা যখন এমন বস্তুকে দেখতে চায় যার উপর সত্যের আলো পড়েছে এবং সে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তখন আত্মা তাকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। বুদ্ধির ঔজ্জ্বল্যে আত্মা ভাস্বর হয়ে ওঠে। কিন্তু আত্মার দৃষ্টি যখন প্রদোষ-আঁধারে অস্থির এবং ক্ষীয়মাণ বস্তুর উপর নিবদ্ধ হয় তখন আত্মা স্পষ্ট দেখতে পায় না। তখন, আমরা বলব, আত্মার জ্ঞান নেই, আত্মার কেবল ধারণা আছে। তাকে বুদ্ধিহীন বলে বোধ হয়।
হ্যাঁ, এমন অবস্থায়, আত্মা এরূপই হয়।
তা হলে জ্ঞাত এবং জ্ঞানীর জ্ঞানের ক্ষমতাকে যে সত্য করে তোলে তাকেই আমরা বলব উত্তমের ভাব : উত্তমের জ্ঞান। এই ভাবই হচ্ছে জ্ঞান এবং সত্যের মূল। একে একদিকে যেমন আমরা স্বজ্ঞান, তেমনি অপর দিকে তাকে জ্ঞান এবং সত্যেরও অধিক বলে কল্পনা করতে পারি। এবং আলো এবং দৃষ্টিকে যেমন আমরা সূর্যসদৃশ মনে করেছি, কিন্তু সূর্য মনে করাকে ভুল বলেছি, এখানে জ্ঞান এবং সত্যকেও আমরা পরম উত্তম সদৃশ বলতে পারি। কিন্তু জ্ঞান কিংবা সত্য—কাউকেই পরম উত্তম বলে মনে করা ভুল হবে। যে পরম উত্তম, তার স্থান জ্ঞান এবং সত্যের চেয়েও উচ্চতর এবং সম্মানীয়।
গ্লকন বললেন : যে-সত্তা জ্ঞান এবং সত্যের মূল এবং যে-সৌন্দর্যে জ্ঞান এবং সত্যেরও অধিক, তার সৌন্দর্য যে কী বিস্ময়কর তা কল্পনা করাও আমাদের পক্ষে অসম্ভব। কারণ, সক্রেটিস, কেবল আনন্দকে নিশ্চয়ই তুমি পরম উত্তম বলবে না?
বিধাতা আমাকে রক্ষা করুন। কিন্তু উত্তমের প্রতিকল্পকে অন্য দিক থেকেও তো দেখা যায়।
কোনদিক থেকে?
সূর্যকে তুমি কী বলবে? তুমি নিশ্চয়ই বলবে সূর্য কেবল দৃশ্যের মূল নয়; সূর্য, বস্তুর সৃষ্টি, পুষ্টি এবং বৃদ্ধিরও কারণ। কিন্তু সূর্য নিজে সৃষ্টি নয়। ঠিক নয় কি?
তোমার একথা অবশ্যই ঠিক
ঠিক তেমনিভাবে আমরা বলতে পারি, পরম যে উত্তম সে কেবল সকল জ্ঞাত বস্তুর জ্ঞানের মূল নয়, বস্তুর অস্তিত্বের সে মূল, বস্তুর সারেরও সে মূল—কিন্তু পরম উত্তম নিজে সার নয়। মর্যাদা এবং শক্তির দিক থেকে সে সারকেও অতিক্রম করে যায়।
গ্লকন এবার অদ্ভুত একাগ্রতায় বলে উঠলেন : বাপরে বাপ! কী বিস্ময়করভাবে বিরাট!
আমি বললাম : হ্যাঁ, আধিক্য যদি কিছু এতে থাকে তার কারণ তুমি। কারণ তুমিই আমার কল্পনার দুয়ার খুলে দিয়ে এসব বলতে বাধ্য করেছ।
কিন্তু তবু তুমি থেমো না সক্রেটিস। অন্তত সূর্যের সাদৃশ্য সম্পর্কে যদি আরও কিছু বলার থাকে, আমরা তা শুনতে চাই।
আমি বললাম : হ্যাঁ, বলার অনেক কিছু আছে।
যা-ই থাকুক-না কেন, এবং সে যত ক্ষুদ্র হোক-না কেন, তুমি সব বলো। কোনো কিছু বাদ দিও না।
গ্লকন, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কিন্তু অনেক কিছুকেই বাদ দিতে হবে। তোমাকে এবার কল্পনা করতে হবে : দুটো নিয়ন্ত্রকশক্তি আছে। এর একটি মনো-জগতে। অপরটি দৃশ্যজগতে। আমি অন্তরীক্ষ বা স্বর্গের কথা বললাম না। তেমন বললে তুমি ভাববে আমি শব্দ নিয়ে খেলা করছি।* যা-ই হোক, দৃশ্য এবং মনো-জগতের বা বুদ্ধি জগতের পার্থক্যটি আশা করি তুমি ধরতে পেরেছ?
[* ‘শব্দ নিয়ে খেলা করার’ কথাটি এসেছে এই কারণে যে গ্রীক ভাষায় ‘দৃশ্য’ এবং ‘স্বর্গ’ শব্দ দুটির মধ্যে কিছুটা সাদৃশ্য আছে। উভয়ের অর্থের মধ্যেও সম্পর্ক থাকতে পারে—লীর অনুবাদ; পৃঃ ২৭৫।]
হ্যাঁ, এ পার্থক্যটিকে আমি বুঝি।
বেশ। এবার তুমি একটি রেখাকে কল্পনা করো। রেখাটিকে তুমি দুটি অসম ভাগে বিভক্ত করো। এর একটি ভাগকে আমরা বলব দৃশ্যজগতের সূচক এবং অপরটিকে বলব মনোজগতের সূচক। এবার এই দুটো ভাগকে পূর্বের অনুপাতে আবার ভাগ করো। এই ভাগের অংশগুলি স্পষ্টতা এবং অস্পষ্টতার সূচক হবে। এবার তুমি দেখতে পাবে দৃশ্য ভাগ তৈরি হয়েছে প্রতিরূপ নিয়ে। প্রতিরূপ বলতে আমি বোঝাতে চাই প্রথমত ছায়াকে; দ্বিতীয়ত পানি কিংবা জমাট বস্তু, মসৃণ এবং সমতল ইত্যাকার বস্তুর উপর পতিত প্রতিবিম্বকে। আমার বক্তব্যটি তুমি বুঝতে পারছ, গ্লকন?
হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি।
এবার অন্য ভাগটির কথাও চিন্তা করো। এই ভাগটি হচ্ছে প্রতিরূপের মূল নিয়ে—যেমন জন্তু, গাছপালা এবং সকল রকম তৈরি-করা দ্রব্য।
ভালো কথা।
কিন্তু তুমি কি এবার এ কথা বলতে রাজি আছ, এই ভাগগুলি সত্যের পরিমাণের ক্ষেত্রে পৃথক? এবং প্রতিরূপ ও মূলের মধ্যে যে-সম্পর্ক সে-সম্পর্কটি ধারণা এবং জ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্কেরই অনুরূপ?
হ্যাঁ, আমি একথা স্বীকার করি।
তা হলে এবার বুদ্ধিগত ভাগটির কথা ধরা যাক। এটিকে আমরা কীভাবে ভাগ করতে পারি?
তুমি বলো, কেমন করে ভাগ করতে পারি?
এখানে দুটি উপবিভাগ আছে। এর মধ্যে নিম্নতর উপবিভাগটিতে আত্মা প্রথম বিভাগের প্রতিরূপকে ব্যবহার করে। কিন্তু এর পদ্ধতিটিকে আমরা বলতে পারি অনুমানমূলক। কেননা একটি অনুমান বা ধারণা থেকে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছি : সিদ্ধান্ত থেকে কোনো সাধারণ সূত্রে নয়। কিন্তু অপর ভাগটিতে আমরা ধারণা থেকে স্বতঃসিদ্ধের দিকে অগ্রসর হই। এখানে প্রতিরূপের কোনো ব্যবহার নেই। এখানে আমরা কেবল ভাবের ভিত্তিতেই সত্যে পৌঁছার চেষ্টা করি।
তোমার কথাটি আমি ঠিক বুঝতে পারছিনে।
তা হলে আমি আবার চেষ্টা করে দেখি। কিন্তু তোমার বোঝার সুবিধার জন্য প্রাথমিকভাবে কয়েকটি কথা বলে নিই। তুমি নিশ্চয়ই জান জ্যামিতি, গণিত এবং জ্ঞানের অনুরূপ শাখার শিক্ষার্থীমাত্রই জোড় এবং বেজোড় সংখ্যা, জ্যামিতিক চিত্র, কোণের ত্রিবিভাগ এবং অনুরূপ কতকগুলি সূত্রকে গোড়া থেকেই ধরে নিয়ে অগ্রসর হয়। এগুলি হচ্ছে তাদের দত্ত সত্য। তারা ধরে নেয়, এগুলিকে তারা জানে। এগুলি হচ্ছে তাদের মৌলিক সূত্র। এগুলির ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। কারণ, এরা স্বতঃসিদ্ধ। এই দত্ত সূত্র থেকে শুরু করে সঙ্গতিপূর্ণ ধারাবাহিক স্তর বা পর্যায়ের মাধ্যমে তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।*
[* এখানে যুক্তির অবরোহী পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হচ্ছে।]
হ্যাঁ, এবার আমি বুঝতে পারছি।
কিন্তু এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়। যদিও এখানে শিক্ষার্থী দৃশ্যচিত্রকে* ব্যবহার করে যুক্তি প্রদর্শন করে, কিন্তু তাদের চিন্তা এই চিত্র নিয়ে নয়। তাদের চিন্তা এই চিত্রগুলির মূল নিয়ে, যে-মূলের সাদৃশ্যে চিত্রগুলিকে তৈরি করা হয়েছে। কাজেই শিক্ষার্থীগণ যখন বর্গক্ষেত্র কিংবা চতুর্ভুজের কর্ণ নিয়ে আলোচনা করে তখন তাদের আলোচ্য তাদের অঙ্কিত বর্গক্ষেত্র কিংবা চতুর্ভুজের কর্ণ নয় : অর্থাৎ চিত্রগুলি যা-ই হোক-না কেন, চিত্রগুলি তাদের আলোচ্য নয়, তাদের আলোচ্য হচ্ছে চিত্রের মূল। যে-চিত্র তারা অঙ্কন করে কিংবা গঠন করে—এগুলির প্রতিছায়া থাকতে পারে, যেমন পানিতে তাদের ছায়া পড়তে পারে। কিন্তু এগুলি দৃষ্টান্তমাত্র। শিক্ষার্থীর অনুসন্ধানের যথার্থ বিষয় দৃশ্য, কোনো গঠন নয়। সে হচ্ছে এদের মূল। এবং মূল মনের চোখেই মাত্ৰ প্ৰত্যক্ষ।
[* জ্যামিতিক চিত্রঃ যেমন রেখা কোণ, বর্গক্ষেত্র, ব্যাস প্রভৃতি।]
তোমার এ কথা সত্য, সক্রেটিস।
আর তাই আমি যখন আমাদের উল্লিখিত রেখাটির বুদ্ধিগ্রাহ্য বিভাগের কথা বলি তখন বুঝতে হবে, আমি তাকেই বোঝাতে চাচ্ছি যাকে বুদ্ধি বিশুদ্ধ চিন্তার মাধ্যমে অনুধাবন করতে পারে। এখানে বুদ্ধি অনুমান বা ধারণাকে কোনো সূত্র হিসাবে গণ্য করে না। ধারণা এখানে সার্বিক এবং স্বতঃসিদ্ধ সূত্রে আরোহণের প্রয়োজনীয় সূচনা এবং স্তর মাত্র। সেই স্বতঃসিদ্ধ সূত্রে পৌঁছার পরে সূত্রের ফল বা অনুবন্ধকে অনুসরণ করে শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছাও সম্ভব। এই সমগ্র পদ্ধতিটিই ভাবগত ব্যাপার, দৃশ্যগত নয়। ভাবই এর আলোচ্য। ভাব দিয়ে এর শুরু; ভাবের মধ্য দিয়ে এর অগ্রগমন এবং ভাবেই এর সমাপ্তি।
তোমাকে আমি বুঝতে পারছি, সক্রেটিস। যদিও সম্পূর্ণরূপে নয়। কারণ আমার মনে হচ্ছে, তুমি আমাদের জন্য একটি বিরাট দায়িত্বের কথা ব্যাখ্যা করছ। আমি বুঝতে পারছি, তুমি বলতে চাচ্ছ : বিশুদ্ধ চিন্তার বিষয় হচ্ছে জ্ঞান এবং সত্তা। আর এই জ্ঞান এবং সত্তা কেবল ধারণার উপর নির্ভরশীল, বুদ্ধির অপর বিভাগ থেকে অধিকতর নিঃসন্দেহ এবং নিশ্চিত। বুদ্ধির নিম্নতর বিভাগও চিন্তার ব্যবহার করে। কিন্তু যেহেতু এখানে আমরা কেবল ধারণার উপর নির্ভর করি এবং কোনো সূত্রে আরোহণ করি না, সে-কারণে তোমার মতে এখানে উচ্চতর প্রজ্ঞার কোনো ব্যবহার ঘটে না। অবশ্য এর সঙ্গে মৌলিক সূত্রের যোগ ঘটলে প্রজ্ঞার নিকট এ বোধ্য হয়ে ওঠে। এবং জ্যামিতিক যুক্তির বিষয়ে তুমি বলছ, এখানে বোধের ব্যবহার আছে, কিন্তু বুদ্ধির নয়। বোধ বলতে তুমি এখানে ধারণা এবং বুদ্ধির মধ্যবর্তী কোনো স্তরকে বোঝাতে চাচ্ছ।
গ্লকন, তুমি আমার কথা বেশ সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছ। এবার আমি বলব, আমাদের উল্লিখিত রেখাটির যে-চারটি ভাগ আছে সে-চারটি ভাগ বরাবর আমাদের মনেরও চারটি ভাগ আছে : ঊর্ধ্বতম ভাগে রয়েছে জ্ঞান; দ্বিতীয় ভাগ বোধ; তৃতীয় ভাগে ধারণা এবং চতুর্থ ভাগে ভ্রম। এগুলিকে তুমি এদের সত্যের পরিমাণ এবং বিষয়ের বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিমাপ রেখায়ও বিন্যস্ত করতে পার।
গ্লকন বললেন : আমি বুঝতে পারছি। তোমার এ প্রস্তাবটির সঙ্গেও আমি একমত, সক্রেটিস।
