১০. শাসক বাছাই : তিন শ্রেণীর পারস্পরিক সম্পর্ক
অধ্যায় : ১০ [৪১৩-৪১৭]
শাসক বাছাই : তিন শ্রেণীর পারস্পরিক সম্পর্ক
বিংশতি বছরে অভিভাবকদের একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে : এই পরীক্ষার মাধ্যমে অভিভাবকগণ আবার দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হবে। সহায়ক বাহিনী এবং শাসক। শাসকদের উপরই ন্যস্ত হবে রাষ্ট্রপরিচালনার মূল দায়িত্ব। সহায়ক বাহিনী শাসকদের সকল আদেশ পালন করবে। সহায়ক বাহিনীর দায়িত্ব বলতে বোঝাবে দেশরক্ষা, শান্তিরক্ষা (পুলিশি কাজ) এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন। শাসকদের পরীক্ষা এবং শিক্ষা হবে অন্যান্য সকলের চেয়ে কঠিন এবং বিস্তারিত। এই কঠিন পরীক্ষাসমূহের মাধ্যমে যারা সর্বোত্তম বলে স্থির হবে তাদেরকে শাসক হিসাবে বাছাই করা হবে। এবার শাসকদের বাছাই করার ফলে অর্থাৎ অভিভাবকগণ সহায়ক বাহিনী এবং শাসক হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার ফলে রাষ্ট্রের শ্রেণী দাঁড়ায় তিনটি : উৎপাদক, সহায়ক বাহিনী (অর্থাৎ সৈন্যবাহিনী) এবং শাসক।
এই তিনটি শ্রেণীর যার যে-দায়িত্ব তা পালন করাই যে তাদের পবিত্র কর্তব্য তার প্রতি বিশ্বাস জন্মানোর জন্য প্রয়োজন হলে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। এজন্য হিসিয়ডের স্বর্ণ, রৌপ্য এবং পিত্তল জাতির উপাখ্যানকে সত্য বলে চালানো যেতে পারে।
সেই উপাখ্যানটি আমাদের উৎপাদক, সহায়ক এবং শাসকশ্রেণীর শ্রেণীগত পার্থক্য যে অনিবার্য—সে-বিশ্বাসটি তৈরি করবে।
শাসকদের একমাত্র চিন্তা হবে রাষ্ট্রের মঙ্গল। সহায়ক বাহিনীকেও রাষ্ট্রের জন্যই জীবনযাপন করতে হবে। তাই শাসক এবং সহায়ক—উভয়ের জীবন হবে রাষ্ট্রের জন্য নিবেদিত জীবন। তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা থাকতে পারবে না। ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা ব্যক্তিকে তার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত করে। তাই আমাদের আদর্শ রাষ্ট্রের অভিভাবক অর্থাৎ শাসক ও সহায়কদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকতে পারবে না। ব্যক্তিগত স্বার্থের মূল হচ্ছে সম্পত্তি এবং পরিবার ও সন্তান। এ-কারণে অভিভাবকদের অর্থাৎ শাসক এবং সহায়কদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং পরিবার ও সন্তান থাকতে পারবে না। অভিভাবকদের চিন্তা হবে সমগ্র রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা, নিজেদের সুখবিধান করা নয়। কারণ, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সমগ্র রাষ্ট্রের সুখ, কোনো বিশেষ শ্রেণীর সুখ নয়”।
তৃতীয় শ্রেণী অর্থাৎ উৎপাদকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ব্যক্তিগত পরিবার ও সন্তান থাকবে। তারা শাসক এবং সহায়ক বাহিনীর প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর যোগান দেবে। তাদের প্রদত্ত অর্থ এবং দ্রব্যাদি শাসক এবং সহায়কদের সেবার জন্য মাহিনা বলে গণ্য করা হবে। অভিভাবকগণকে দৃষ্টি রাখতে হবে যেন তৃতীয় শ্রেণীর মধ্যে সম্পদ এবং দারিদ্র্যের চরম বৈষম্য সৃষ্টি হতে না পারে। সামরিক দক্ষতা যুদ্ধে বিজয়কে নিশ্চিত করবে। কিন্তু রাষ্ট্রের জনসংখ্যা যদি অধিক বৃদ্ধি পায় কিংবা অধিক হ্রাস পায় তা হলেও রাষ্ট্রের ঐক্য, সংহতি এবং শক্তি বিঘ্নিত হবে। তাই শাসকদের সতর্ক থাকতে হবে যেন রাষ্ট্রের লোকসংখ্যা রাষ্ট্রের সংহতির জন্য বিপজ্জনকভাবে অধিক কিংবা অল্প না হয়। শিক্ষার মানের দিকেও নজর রাখতে হবে। অধমকে উচ্চতর শ্রেণী থেকে নিম্নতর শ্রেণীতে যেমন অবনত করতে হবে, তেমনি নিম্নতর শ্রেণীর মধ্যে উত্তমের সাক্ষাৎ পাওয়া গেলে তাকে উচ্চতর শ্রেণীতে উন্নীত করতে হবে।
উত্তম শাসক যখন পাওয়া গেছে তখন আইন-প্রণয়নের আর আবশ্যক হবে না। যারা দার্শনিক, যারা সর্বোত্তমের জ্ঞানলাভ করেছে তাদের উপর যখন শাসনের দায়িত্ব, অর্থাৎ শাসিতের মঙ্গলসাধনের দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে, তখন অপর কোনো আইনের ব্যবস্থা থাকলে সে-আইন সর্বোত্তম শাসকের বিচারবোধ এবং মঙ্গলবোধের উপর শৃঙ্খল হিসাবে কাজ করবে। সর্বোত্তম দার্শনিক শাসক তখন স্বাধীনভাবে শাসিতের মঙ্গলসাধন করতে পারবে না। তাই আদর্শ রাষ্ট্রে সাধারণ রাষ্ট্রের ন্যায় আইন-প্রণয়ন অনাবশ্যক এবং অনুচিত।
.
আবার তাদের জীবনের প্রতি পর্যায়ে তাদের ওপর আমাদের নজর রাখতে হবে। আমাদের দেখতে হবে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের সংকল্প প্রতি পর্যায় থেকে পর্যায়ান্তরে তারা রক্ষা করেছে, কোনো জবরদস্তি বা আকর্ষণে তারা তাদের দায়িত্ববোধ বিস্মৃত হয়নি কিংবা পরিত্যাগ করেনি।
কেমন করে তারা দায়িত্ব পরিত্যাগ করতে পারে?
আমি বললাম, গ্লকন, আমি তোমায় ব্যাখ্যা করে বলছি। মানুষ তার মনের সংকল্প ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়—দুপ্রকারে বিস্মৃত হতে পারে। ইচ্ছা করে সে বিস্মৃত হয় তখন যখন একটা মিথ্যাকে পরিত্যাগ করে শিক্ষার মাধ্যমে সে সত্যকে গ্রহণ করে; এবং অনিচ্ছায়, যখন সত্য থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়।
গ্লকন বললেন : ইচ্ছায় সংকল্পত্যাগের ব্যাপারটি আমি বুঝলাম, সক্রেটিস। কিন্তু অনিচ্ছার ব্যাপারটি আমার বুঝতে এখনও বাকি আছে।
আমি বললাম, কেন, তুমি তো সাধারণভাবে দেখতে পাও যে, মানুষ যাকে উত্তম মনে করে তা থেকে যখন সে বঞ্চিত হয় তখন সে অনিচ্ছায় বঞ্চিত হয়। কিন্তু যাকে সে অন্যায় মনে করে তাকে সে স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করে। আর যাকে সত্য বলে কেউ বোধ করে তা থেকে বঞ্চিত হওয়াকে সে উত্তম বলে মনে করতে পারে না। তেমনি যাকে, কেউ সত্য মনে করে তার প্রাপ্তি অবশ্যই উত্তম। তা ছাড়া কোনোকিছুকে তার যথার্থ অবস্থায় অনুধাবন করা হচ্ছে সত্যকে লাভ করা। ঠিক নয় কি?
গ্লকন জবাব দিলেন : তোমার সঙ্গে এবার আমি একমত সক্রেটিস, মানুষ সত্য থেকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বঞ্চিত হয়।
এবং এই অনিচ্ছায় সত্য ত্যাগ হয় চুরি, নয় জবরদস্তি কিংবা কোনো জাদুকরি প্রভাবের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। নয় কি?
গ্লকন বললেন : কথাটা ঠিক বুঝতে পারছিনে, সক্রেটিস।
আমি বুঝতে পারছি আমার ব্যাখ্যাটা বিষাদাত্মক নাট্যকারের ন্যায় রহস্যময় হয়ে উঠছে। আসলে আমি বলতে চাচ্ছি : মানুষের মধ্যে কিছু লোক আছে যাদের পরিবর্তন ঘটে অন্যের প্রভাবে, আবার এমন কিছু লোক আছে যারা নিজেরাই কালক্রমে একটা বিষয় বিস্মৃত হয়। কিছু লোক আছে যুক্তিতে যাদের হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটে; কিছু আছে সময়ের স্রোতে তাদের পরিবর্তন ঘটে। আশা করি এবার তুমি আমাকে বুঝতে পারছ, গ্লকন।
হ্যাঁ, সক্রেটিস, এবার কথাটা আমি বুঝতে পারছি।
যারা বাধ্য হয়ে পরিবর্তিত হয়, কোনো যন্ত্রণার দুঃখ তাদের অভিমত পরিবর্তনের কারণ হয়।
গ্লকন বললেন : তুমি ঠিকই বলেছ সক্রেটিস।
তা ছাড়া তুমি এটাও স্বীকার করবে যে, জাদুতে যারা প্রভাবিত তাদের মনের পরিবর্তন ঘটে, হয় কোনো আনন্দের কোমল প্রভাবে অথবা ভীতির কঠিন প্রভাবে।
গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, যা কিছু প্রতারণা তাকে জাদু বই আর কী বলা চলে?
কাজেই আমি বলছিলাম, আমাদের বার করতে হবে, কারা নিজের বিশ্বাসের ভিত্তিতে সর্বোত্তম শাসক, কারা রাষ্ট্রের মঙ্গলকর বলে যা বিবেচনা করে তাকে নিজেদের জীবনের নীতি হিসাবে গ্রহণ করে। এদের যৌবনকাল থেকেই এদের ওপর আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। এবং যে-দায়িত্বে তাদের বিস্মৃতি কিংবা প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা অধিক সেই দায়িত্ব সম্পাদনের মাধ্যমে তাদের পরীক্ষিত হতে হবে। এমন পরীক্ষায় যারা তাদের দায়িত্ব বিস্মৃত হবে না, এবং যারা প্রতারিত হবে না তাদের আমরা বাছাই করব শাসক হওয়ার জন্য এবং যারা এ-পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে আমরা তাদের শাসক হওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করব। এটাই হবে শাসক-নির্বাচনের পদ্ধতি। তোমার কী মনে হয় গ্লকন?
তুমি ঠিক বলেছ, সক্রেটিস।
শুধু তাই নয়, তাদের জন্য পরিশ্রম, ক্লেশ এবং সংকটের কঠিনতর পরীক্ষা নির্দিষ্ট করতে হবে। এ-পরীক্ষায় অধিকতর যোগ্যতার প্রমাণ তাদের উপস্থিত করতে হবে।
ঠিক কথা, সক্রেটিস।
আকর্ষণ দিয়েও তাদের পরীক্ষা করতে হবে। এ হবে তাদের তৃতীয় স্তরের পরীক্ষা। আমাদের দেখতে হবে, আকর্ষণের মধ্যে তাদের আচরণ কীরূপ হয়। অশ্ব-শাবককে যেমন শব্দ এবং কোলাহলের মধ্য দিয়ে চালনা করে তার স্বভাব ভীরু কিংবা সাহসী তা পরীক্ষা করা হয়, তেমনি আমাদের যুবকদেরও পর্যায়ক্রমে ভীতি এবং আকর্ষণের মধ্যে স্থাপন করে তাদের স্বভাবের যথার্থতা পরীক্ষা করতে হবে। সোনাকে পুড়িয়ে যেমন তার যথার্থতা নিরূপণ করা হয় তেমনি এমনি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের শাসকদের স্বভাবের যথার্থতা নির্ধারণ করতে হবে। দেখতে হবে সকলপ্রকার আকর্ষণের তারা ঊর্ধ্বে কি না, চরিত্র তাদের মহৎ কি না এবং যে-সঙ্গীতের শিক্ষা তারা গ্রহণ করেছে সে-সঙ্গীতের সুসঙ্গতি তারা নিজেদের চরিত্রের সকলপ্রকার অবস্থা বিপর্যয়েও ব্যক্তি এবং রাষ্ট্র উভয়ের মঙ্গলকর ধারায় ধারণ করতে সক্ষম কি না। এবং যে তার তারুণ্যে, যৌবনে এবং পরিপক্ক বয়সে—সকল পরীক্ষায় বিজয়ী এবং বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেইই মাত্র রাষ্ট্রের শাসক এবং রক্ষকরূপে নিযুক্ত হবে। এমন ব্যক্তি তার জীবনে এবং মৃত্যুতে সম্মানিত হবে। তার সমাধি এবং স্মৃতিকে আমরা সর্বোত্তমভাবে সম্মানিত করব। কিন্তু পরীক্ষায় যারা বিফল হবে তাদের আমরা অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করব। আমার তো মনে হয়, আমাদের রাষ্ট্রের শাসক এবং রক্ষক-নির্বাচনের এবং নিয়োগের এটাই হবে পদ্ধতি। অবশ্য কথাটা আমি সাধারণভাবেই বলছি। সবকিছুই আমার কথানুযায়ী হবে, এমন দাবি আমি করছিনে।
গ্লকন বললেন : এবং সাধারণভাবে বলতে গেলে, আমিও তোমার সঙ্গে একমত সক্রেটিস।
এবং আমার মনে হয় ‘রাষ্ট্রের শাসক বা রক্ষক’ শব্দকে তার পরিপূর্ণ অর্থে এই উচ্চতর শ্রেণীর উপরই মাত্র প্রয়োগ করা সঙ্গত। কারণ এই শ্রেণীই রাষ্ট্রকে বৈদেশিক শত্রুর হাত থেকে যেমন রক্ষা করে, তেমনি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নাগরিকদের মধ্যে এরাই শান্তি বজায় রাখে, যেন বিদেশী কিংবা স্বদেশী কোনো শক্তির সুযোগ কিংবা সাধ্য না ঘটে রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করার। যে যুবকদের আমরা ইতিপূর্বে রাষ্ট্রের অভিভাবক বা শাসক বলেছি তাদের যথার্থভাবে আমরা শাসকদের নীতির সাহায্যকারী এবং সমর্থক বলে অভিহিত করতে পারি
আমি তোমার সঙ্গে একমত সক্রেটিস।
তা হলে যে-মিথ্যাচারের কথা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, তার কী হবে? অর্থাৎ যাকে আমরা ‘রাজকীয় মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছি, যে-মিথ্যা শাসিতের জন্য তো বটেই, শাসকের ক্ষেত্রেও সম্ভব হলে যাকে প্রয়োগ করা চলে তেমন মিথ্যা আমরা কীরূপে উদ্ভাবন করতে পারি?
গ্লকন বললেন : তুমি কোন্ মিথ্যার কথা বলছ, সক্রেটিস?
আমি বললাম : এমন নূতন কোনো ব্যাপার নয়। একে আমরা ফিনিশীয় কাহিনী বলে অভিহিত করতে পারি। এ-কাহিনী আমাদের সময়ে না ঘটলেও আমাদের পূর্বে অন্যত্র এ-কাহিনী সংঘটিত হয়েছে। আজকাল অবশ্য এমন কাহিনীর সংঘটনকে বিশ্বাস্য বলে গ্রহণ করানো কষ্টকর।
কাহিনীটি বলতে তুমি যেন ইতস্তত করছ, সক্রেটিস?
আমি বললাম : কাহিনীটি শুনলে তুমি আমার ইতস্ততায় বিস্মিত হবে না, গ্লকন।
সক্রেটিস, তুমি নির্ভয়ে কাহিনীটি বর্ণনা করো।
হ্যাঁ, আমি এবার কাহিনীটি বর্ণনা করব। কিন্তু এই দুঃসাহসী কাহিনী তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কেমন করে বলব, তা-ই ভাবছি। কাহিনীটি আমি ক্রমান্বয়ে বিবৃত করব। কারণ এর প্রথম লক্ষ্য আমাদের রাষ্ট্রের শাসককূল। এর দ্বিতীয় লক্ষ্য রাষ্ট্রের সহায়ক বাহিনী বা সৈন্যগণ। সর্বশেষ এর লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিকবৃন্দ। এদেরকে বলতে হবে : এদের যৌবন স্বপ্ন বই আরকিছু ছিল না এবং যে-শিক্ষা তারা লাভ করেছে সে-শিক্ষা ভ্রমমাত্র। আসলে সমগ্র সময়টা মাটির গর্ভে তারা অতিবাহিত করেছে। মাটিই তাদের মাতা। মাটির গর্ভে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং তাদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়েছে। তাদের এই সৃষ্টি যখন সম্পূর্ণ হয়েছে জননী মৃত্তিকা তাদের ভূপৃষ্ঠে উৎক্ষেপণ করে দিয়েছে। জন্মভুমি হচ্ছে তাদের জননী, তাদের প্রতিপালনকারী। তাই তাদের কর্তব্য হচ্ছে তাদের রাষ্ট্রের মঙ্গলচিন্তা করা এবং রাষ্ট্রকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। নাগরিকগণ যেমন এই জন্মভূমির জাত, জন্মভূমির সন্তান, তেমনি শাসক এবং সহায়কদের ভ্রাতা।
গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, এবার আমি তোমার সঙ্কোচের কারণ বুঝতে পারছি। এমন মিথ্যা বলতে তোমার লজ্জিত হওয়াই স্বাভাবিক।
আমি বললাম : ঠিকই বলেছ, গ্লকন। কিন্তু কাহিনীর এখানেই শেষ নয়। আরও আছে। আমি অর্ধাংশ মাত্র বর্ণনা করেছি। আমাদের কাহিনীর ভিত্তিতে নাগরিকদের সম্বোধন করে আমরা বলব :
“নাগরিকবৃন্দ, আপনারা আমাদের ভাই। কিন্তু বিধাতা আপনাদের ভিন্নভাবে গঠন করেছে। আপনাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আছে যাদের আদেশদানের ক্ষমতা আছে। এদের গঠনে স্বর্ণের মিশ্রণ আছে। এ-কারণেই তারা সর্বাধিক সম্মানের অধিকারী। কিন্তু অন্যদের গঠনে আছে রৌপ্যের মিশ্রণ। এরা হচ্ছে রাষ্ট্রের সহায়ক বা সৈন্যবাহিনী। আর যারা কৃষক বা উৎপাদক এবং কারিগর তাদের গঠনে আছে পিতল এবং লৌহের মিশ্রণ। গঠনে পার্থক্যের ভিত্তিতে এই শ্রেণীর ধারাবাহিকতা সন্তানের মধ্যে রক্ষিত হয়। তবে মূল যখন এক তখন কোনো কোনো সময়ে স্বর্ণগৃহে রৌপ্যসন্তানের যেমন জন্ম হতে পারে, তেমনি রৌপ্যগৃহে স্বর্ণসন্তানের উদ্ভবও অসম্ভব নয়। কিন্তু শাসকদের জন্য বিধাতার প্রথম বিধান হচ্ছে উত্তম শাসক হিসাবে সতর্কভাবে তার জাতির বিশুদ্ধতা রক্ষা করা। তাদের দৃষ্টি রাখতে হবে তাদের সন্তানদের চরিত্রে কোন্ বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ ঘটেছে। কারণ স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য জনক জননীর সন্তানে যদি পিতল এবং লৌহের মিশ্রণ ঘটে থাকে তা হলে প্রকৃতির বিধানমতো এমন সন্তানের শ্রেণী-রূপান্তর অবশ্যই ঘটাতে হবে। কিন্তু শাসকের সন্তানের শ্রেণীগতভাবে অধঃস্তরে প্রেরিত হয়ে জমির কৃষক বা শিল্পের কারিগরে পরিণত হওয়ার দৃশ্য দেখে শাসকের চোখ বেদনার বাষ্পে আবিষ্ট হলে চলবে না। আবার কারিগর বা কৃষকের সন্তানদের মধ্যেও স্বর্ণ এবং রৌপ্যের মিশ্রণ ঘটলে এমন সন্তানও উচ্চতর শ্রেণীতে স্থাপিত হয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবক অর্থাৎ শাসক কিংবা তার সহায়ক হওয়ার সম্মানে সম্মানিত হবে। কারণ দেবতার বাণীর নির্দেশ হচ্ছে : পিতল বা লৌহের মিশ্রণে উৎপাদিত সন্তান যদি রাষ্ট্রের প্রহরাদানের দায়িত্বে নিযুক্ত হয় তা হলে সে-রাষ্ট্রের ধ্বংস অনিবার্য। গ্লকন, এই হচ্ছে কাহিনী। আমাদের রাষ্ট্রের নাগরিকদের এ-কাহিনী বিশ্বাস করাবার কোনো উপায় আছে বলে কি তুমি মনে কর?
গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, বর্তমান যুগে তোমার এ-কাহিনী বিশ্বাসযোগ্য করার কোনো উপায় আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে বর্তমানের যারা উত্তরপুরুষ, তারা এবং তাদের সন্তানসন্ততি এবং সেই সন্তানসন্ততির যারা বংশধর সেই দূর ভবিষ্য-মানুষ তোমার এ-কাহিনী বিশ্বাস করতে পারে।
আমি বললাম : কাজটি যে কঠিন তা আমি বুঝতে পারছি। অথচ এই বিশ্বাস নাগরিকদের যেমন তাদের রাষ্ট্রের অধিকতর সযত্ন রক্ষাকারীতে পরিণত করবে, তেমনি তাদের মধ্যে অধিকতর সৌভ্রাতৃত্ববোধেরও সৃষ্টি করবে। সে যাহোক, আমাদের কাহিনীকে আমরা ছেড়ে দিই। সে গুজবের ডানা বিস্তার করে অন্যত্র উড়ে যাক, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। এসো আমরা বরঞ্চ শাসকদের অধিনায়কত্বে আমাদের মাটির সন্তানদের আমাদের রাষ্ট্রের জন্য উপযুক্তরূপে সজ্জিত করে তুলি। শাসকদের কী করণীয়? তাদের চারিপাশের ভূমি পর্যবেক্ষণ করে এমন একটি উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে, যেখান থেকে তারা কোনো অবাধ্যতার উদ্ভব ঘটলে তাকে দমন করতে পারবে এবং বৈদেশিক কোনো শক্তি
নেকড়ের ন্যায় আক্রমণ করলে তাকে পরাভূত করতে সক্ষম হবে। আমাদের রক্ষিবাহিনী এই নির্বাচিত স্থানে তাদের শিবির স্থাপন করবে, তাদের অবস্থানের ব্যবস্থা করবে এবং উপযুক্ত দেবতাদের উদ্দেশে বলি উৎসর্গ করবে।
গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, এরূপ করাই সঙ্গত।
আমাদের বাহিনীর বাস-ব্যবস্থাটি এরূপ হতে হবে যাতে শীতের শৈত্য এবং গ্রীষ্মের তাপ থেকে তা সুরক্ষিত থাকে।
বাসব্যবস্থা বলতে, সক্রেটিস, তুমি কি এদের বাসগৃহের কথা বলছ?
আমি বললাম : হ্যাঁ, কিন্তু এ-গৃহ হবে সৈন্যদের গৃহ, দোকানিদের গৃহ নয়।
কিন্তু দু-এর মধ্যে পার্থক্য কি?
সেটি আমি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করব। মেষপালকের প্রহরী-কুকুর যদি শিক্ষার অভাবে কিংবা ক্ষুধার কারণে বা অসৎস্বভাব কিংবা অপর কোনো কারণে মেষশাবকদের উপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রহরারত কুকুরের ন্যায় আচরণ না করে নেকড়ের ন্যায় আচরণ করে, তা হলে মেষপালকের জন্য ব্যাপারটি কি ভয়ানক রকমে অবাঞ্ছিত হবে না?
অবশ্যই অবাঞ্ছিত।
কাজেই আমাদেরও সর্বপ্রকার সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যেন রাষ্ট্রের নাগরিকদের চেয়ে সশস্ত্র এবং শক্তিশালী যে-রক্ষিবাহিনী, তারা যেন নাগরিকদের সূহৃদ এবং মিত্রের পরিবর্তে বর্বর স্বেচ্ছাচারী বাহিনীতে পরিণত হয়ে নাগরিকদের জন্য ভীতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
হ্যাঁ, এ-সম্পর্কে বিশেষ সতর্কতা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।
কিন্তু এজন্য কি যথার্থ উত্তম শিক্ষাই সর্বোত্তম নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করবে না?
হ্যাঁ, তা করবে। কিন্তু তারা তো উত্তমভাবে শিক্ষিত হয়েই আছে, নয় কি?
প্রিয় গ্লকন, এ-বিষয়ে আমি তত নিশ্চিত হতে পারছিনে। তবে এই রক্ষকবাহিনীর যে উত্তমরূপে শিক্ষিত হওয়া আবশ্যক, এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কারণ, যথার্থ শিক্ষাই মানুষকে সভ্য করতে পারে, মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং তার অধীনস্থ মানুষের প্রতি তার আচরণকে সত্যকারভাবে মানবিক করে তুলতে পারে।
গ্লকন বললেন, এ তো খুবই সত্য কথা।
এবং কেবল শিক্ষা নয়, তাদের বাসস্থান এবং যা-কিছু তাদের নিজস্ব তার কোনোকিছুই যেন রক্ষক হিসাবে তাদের ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতে না পারে কিংবা রক্ষককে অপর নাগরিকদের ভক্ষকে পরিণত করতে না পারে। সুবিবেচনাসম্পন্ন যে-কোনো মানুষই এই প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করবে।
হ্যাঁ, একথা তাকে স্বীকার করতে হবে।
আমাদের তা হলে বিবেচনা করতে হবে, যে-আদর্শের কথা আমরা উল্লেখ করেছি তা বাস্তবায়িত করতে রাষ্ট্রের রক্ষকদের জীবনধারা কীরূপ হতে হবে। প্রথমত যা একেবারে আবশ্যক তা ব্যতীত আমাদের রাষ্ট্রের রক্ষকদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকতে পারবে না। কিংবা তাদের এমন কোনো ব্যক্তিগত গৃহ কিংবা বাসস্থান থাকতে পারবে না যেখানে অপরের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাদের খাদ্যসামগ্রীর পরিমাণও নির্দিষ্ট হবে সুশিক্ষিত সাহসী এবং সংযমী যোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পরিমাণ দ্বারা। নাগরিকদের নিকট থেকে তারা নির্দিষ্ট হারে একটি বেতন পাবে। এরও পরিমাণ তার বাৎসরিক ব্যয়ের পরিমাণ দ্বারা নির্দিষ্ট হবে, তার অধিক নয়। তারা শিবিরের ছাউনিতে সৈন্যদের ন্যায় জীবনযাপন করবে। জাগতিক স্বর্ণ কিংবা রৌপ্যের কোনো প্রয়োজন তাদের নেই। কারণ আমরা তাদের বলব, বিধাতার নিকট থেকেই তারা স্বর্ণ এবং রৌপ্য লাভ করেছে। তাই ঐশ্বরিক স্বর্ণ এবং রৌপ্যের সঙ্গে জাগতিক পদার্থের মিশ্রণ ঘটানো তাদের পক্ষে সঙ্গত হবে না। কারণ জাগতিক স্বর্ণ এবং রৌপ্য ঐশ্বরিক স্বর্ণ এবং রৌপ্যের চেয়ে অবশ্যই নিকৃষ্ট আর এই নিকৃষ্ট পদার্থ জগতে বহু অনর্থের সৃষ্টি করেছে। কাজেই এই নিকৃষ্ট পদার্থে তাদের আকৃষ্ট হবার কিছু নেই। কারণ তাদের ঐশ্বরিক ধাতু অবিকৃত রয়েছে। এজন্যই তাদের জন্য রৌপ্য এবং স্বর্ণের আকর্ষণ আমরা নিষিদ্ধ করব। তারা স্বর্ণ এবং রৌপ্যকে স্পর্শ করবে না; এ-সমস্ত দ্রব্যকে নিজেদের সঙ্গী করে একই গৃহে তারা বাস করবে না। নিজেদের অঙ্গের আভরণ হিসাবে এদের তারা ব্যবহার করবে না কিংবা স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র থেকে তারা কোনো পানীয় পান করবে না। এই হবে রক্ষকদের মুক্তির পথ এবং এরাই হবে আমাদের রাষ্ট্রের মুক্তিদাতা। কিন্তু রাষ্ট্রের রক্ষকগণ যদি কখনো নিজেদের গৃহ তৈরি করে কিংবা ব্যক্তিগত জমি বা অর্থের মালিক হয় তা হলে তারা রাষ্ট্রের অভিভাবক বা রক্ষকের পরিবর্তে গৃহীতে এবং কৃষকে পরিণত হবে। তখন তারা নাগরিকদের সুহৃদের পরিবর্তে শত্রু এবং সেচ্ছাচারীতে পরিণত হবে। তখন তারা অপরকে ঘৃণা করবে এবং অপরের দ্বারা ঘৃণিত হবে। অপরের বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে এবং অপরে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে। এমনিভাবে তারা বৈদেশিক শত্রুর চেয়ে অভ্যন্তরীণ শত্রুর ত্রাসে তাদের জীবন অতিবাহিত করবে। তাদের এই পতন তাদের নিজেদের এবং রাষ্ট্রের ধ্বংসকে আসন্ন করে তুলবে। এই সমস্ত কারণেই আমরা বলব, আমাদের রাষ্ট্রকে আমাদের নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী সংগঠিত করতে হবে এবং তার রক্ষক এবং শাসকদের জন্য ব্যক্তিগত গৃহসম্পদ এবং অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী নিষিদ্ধ করা হবে। এ-বিষয়ে তোমার কী মনে হয়, গ্লকন?
গ্লকন বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস।
