৭. সমৃদ্ধ রাষ্ট্র
অধ্যায় : ৭ [৩৭২ – ৩৭৪ ]
সমৃদ্ধ রাষ্ট্র
রাষ্ট্র রচনার গোড়াতে সক্রেটিস তাঁর রাষ্ট্রকে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রাখতে চেয়েছিলেন, যেখানে কৃষক, বণিক, ব্যবসায়ী, নাবিক ও মজুর এই পাঁচটি অর্থনীতিক শ্রেণীই যথেষ্ট। “এই নাগরিকগণ নিজেদের জন্য খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, পাদুকা এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে। … গম এবং বার্লির ময়দা হবে তাদের প্রধান খাদ্য। এ দিয়ে তারা বিভিন্নপ্রকার খাদ্যবস্তু প্রস্তুত করবে। পরিচ্ছন্ন পত্রই তাদের খাদ্যদ্রব্য পরিবেশনের পাত্র হিসাবে ব্যবহৃত হবে।” মোটকথা এটি একটি সরল সমস্যাহীন রাষ্ট্র। সর্বকালের ও দেশের সমস্যাদীর্ণ মানুষই এরূপ অতীতকালের সরল সমস্যাহীন জীবনের কল্পনা করে। মানুষের মনে একটি বাসনা জাগে—যদি এরূপ সরল জীবনে ফিরে যাওয়া যেত তা হলে আর কোনো সমস্যা থাকত না। কিন্তু বহু পর্যায়ের মাধ্যমে উত্তীর্ণ এবং বিকশিত জটিল সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সংগঠনে সংগঠিত সমস্যাদীর্ণ মানুষের পক্ষে কি সেই সরল প্রকৃতির জীবনে প্রত্যাবর্তন করা সম্ভব? না, তা সম্ভব নয়। প্লেটো কল্পনাপ্রবণ বটে, কিন্তু তিনি বাস্তব গ্রীসের সমস্যার বাস্তব সমাধানেরই চেষ্টা করেছেন। সে-কারণেই তাঁর একনিষ্ঠ এই সংলাপ-প্রণয়ন-প্ৰয়াস। এমন সরল জীবনে ন্যায়-অন্যায়ের সমস্যা নেই। শাসক-শাসিতের সমস্যা নেই। তাই রাষ্ট্রকে তার বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়। গ্লকন সেই পর্যায়ান্তরে যাওয়ার সূচনা করলেন তাঁর টিপ্পনী দিয়ে : সক্রেটিস, তোমার নগরবাসীদের খাদ্যে কিছু লবণের আবশ্যক হবে। না হলে তাতে সুস্বাদ সঞ্চারিত হবে না।
“আমি বললাম যথার্থ। এ দিকটাতে আমি খেয়াল রাখতে পারি নি।…”
তাই গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র : “আমি বললাম, তোমার মনোভাবটি আমি বুঝতে পারছি। তোমার কথা হচ্ছে, কেবলমাত্র রাষ্ট্রের উদ্ভব দেখালেই চলবে না। আমাদের দেখাতে হবে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের কীভাবে উদ্ভব ঘটে। তোমার প্রস্তাবটি মন্দ নয় গ্লকন। কারণ তেমন রাষ্ট্রে ন্যায়-অন্যায়ের উদ্ভব হয়তো আমরা অধিকতর স্পষ্টভাবে লক্ষ করতে সক্ষম হব।” এ-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের যেমন কামনা অধিকতর সমৃদ্ধ হবার; তেমনি পার্শ্ববর্তী সমৃদ্ধিহীন রাষ্ট্রের চোখ এই সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের প্রতি, যদি একে দখল করে নিতে পারে। তাই সক্রেটিসের আদর্শ রাষ্ট্রেরও আবশ্যক সৈন্যবাহিনীর, একটি নূতন এবং বিশেষ শ্রেণীর, যাদের দায়িত্ব হবে দেশকে রক্ষা করা এবং সেজন্য কৌশল অনুশীলন করে যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষ হওয়া। সক্রেটিসের আদর্শ রাষ্ট্র যে আদর্শ রাষ্ট্রসমূহের কোনো কাল্পনিক দুনিয়ায় নয়, সে যে আক্রমণোদ্যত বাস্তব রাষ্ট্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত—এ-সত্যটি প্লেটোর রাষ্ট্র-পরিকল্পনার মূলের বাস্তব দিকটিকেই আবার আলোকিত করে তোলে।
.
এ্যাডিম্যান্টাসের একথা শুনে আমি বললাম : এ্যাডিম্যান্টাস, তোমার ধারণা যথার্থ হবে বলেই আমার বিশ্বাস। বেশ, তা হলে অনুসন্ধানের কাজটি পরিহার না করে, এসো আমরা বিচার করে দেখি ন্যায়-অন্যায়ের যথার্থ উৎপত্তি কোথায়।
আমাদের রাষ্ট্রগঠন-প্রক্রিয়াটিতে আবার ফিরে যাওয়া যাক। কোন্ কোন্ শ্রেণীর নাগরিকের আবশ্যক, তা আমরা দেখেছি। এবার তাদের জীবনধারার কথা আলোচনা করা যাক। একথা তো সত্য যে, এই নাগরিকগণ নিজেদের জন্য খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, পাদুকা এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে। বাসস্থানের নিশ্চয়তার পরে তারা অবশ্যই নিজ নিজ কার্যে লিপ্ত হবে। ঋতুর ব্যতিক্রমে গ্রীষ্মে যদি তারা নগ্নদেহে এবং নগ্নপদে আপন-আপন জীবিকায় নিযুক্ত থাকতে পারে, শীতার্ত সময়ে অবশ্যই তাদের উপযুক্ত বস্ত্রাদি এবং পাদুকার প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রোৎপত্তির শুরুতে নাগরিকগণের জীবনধারাটিও আমরা কল্পনা করতে পারি। গম এবং বার্লির ময়দা হবে তাদের প্রধান খাদ্য। এ দিয়ে তারা বিভিন্নপ্রকার খাদ্যবস্তু প্রস্তুত করবে। পরিচ্ছন্ন পত্রই তাদের খাদ্যদ্রব্য পরিবেশনের পাত্র হিসাবে ব্যবহৃত হবে।
তাদের খাদ্যগ্রহণ এবং পরিবেশনে একটা আনন্দের ভাব বিদ্যমান থাকবে। খাদ্য প্রস্তুত হলে তারা নিশ্চয়ই আরামের সঙ্গে আসন গ্রহণ করবে। পানপাত্রে মদ্য থাকবে। তাদের শিশুরা পুষ্পস্তবকে নিজেদের মস্তক আবৃত করে তাদের ঘিরে নৃত্য করবে। সবার কণ্ঠে দেবতাদের বন্দনা ধ্বনিত হবে। পারস্পরিক আনন্দ-সংলাপে এই সময়টি তাদের অতিবাহিত হবে। কিন্তু দারিদ্র্য এবং যুদ্ধের আশঙ্কার কথা তাদের বিস্মৃত হলে চলবে না। তাই তাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন পরিজনের সংখ্যা খাদ্যের পরিমাণকে অতিক্রম না করে।
এ-সময়ে গ্লকন একটু ফোড়ন কাটলেন। গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, তোমার নগরবাসীদের খাদ্যে কিছু লবণের আবশ্যক হবে। না হলে তাতে সুস্বাদ সঞ্চারিত হবে না।
আমি বললাম : যথার্থ। এদিকটাতে আমি খেয়াল রাখতে পারিনি আমাদের নগরবাসীদের খাদ্য অবশ্যই সুস্বাদের হবে। বাদাম তৈল, লবণ এবং পনিরের তাতে মিশ্রণ থাকবে। গ্রামের লোকের ন্যায় তারা তাদের খাদ্যদ্রব্য মূল এবং ওষধি সহযোগে সিদ্ধ করবে। ডুমুর, পিঁয়াজ এবং মটরশুঁটিও তারা খাদ্যদ্রব্য হিসাবে গ্রহণ করবে। এরূপ হলে তাদের ভোজনটা গুরুভোজনই হবে। ভোজনের সঙ্গে সংযম সহকারে তারা মদ্যপানও করবে। এরূপ খাদ্যব্যবস্থায় তারা নিশ্চয়ই স্বাস্থ্য-সহকারে শান্তিতে পরিণত বয়স অবধি জীবিত থাকতে পারবে। পরিণত বয়সে মৃত্যুকালে সন্তানসন্ততির জন্য অনুরূপ জীবনের উত্তরাধিকারও তারা রেখে যেতে পারবে, এরূপ আমরা কল্পনা করতে পারি।
গ্লকন আবার ফোড়ন কাটলেন : তোমার পরিকল্পনা অবশ্যই উত্তম সক্রেটিস। শুয়োরের শহরের জন্য এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আর কী হতে পারে?
আমি বললাম : গ্লকন, তোমার ইচ্ছাটি কী?
গ্লকন বললেন : আমার তো মনে হয়, নাগরিকদের জন্য তোমার আধুনিক স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। তোমার নাগরিকগণ যদি আয়েশি হয় তা হলে তাদের জন্য বৃক্ষপত্রের বদলে অবশ্যই তুমি নরম গদির ব্যবস্থা করবে। কারণ তারা আহার করবে আহার গ্রহণের উচ্চ টেবিল থেকে। এবং আধুনিক রীতি অনুযায়ী তাদের খাদ্যতালিকায় থাকবে কিছু ঝাল-টক-চাটনি এবং মিষ্টি।
আমি বললাম : তোমার মনোভাবটি আমি বুঝতে পারছি। তোমার কথা হচ্ছে, কেবলমাত্র রাষ্ট্রের উদ্ভব দেখালেই আমাদের চলবে না। আমাদের দেখাতে হবে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের কীভাবে উদ্ভব ঘটে। তোমার প্রস্তাবটি মন্দ নয়, গ্লকন। কারণ তেমন রাষ্ট্রে ন্যায়-অন্যায়ের উদ্ভব হয়তো আমরা অধিকতর স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করতে সক্ষম হব। আমার মতে অবশ্য আমি যেরূপ রাষ্ট্রের বর্ণনা করেছি তেমন রাষ্ট্রই সুস্থ-সংগঠনসম্পন্ন হতে পারে। বিলাস-ব্যসনের চরম প্রকাশও যদি কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থায় তুমি দেখতে চাও, তবে তার বর্ণনাও আমি করতে পারি। এমন রাষ্ট্রের নাগরিক অবশ্যই সহজ জীবনে সন্তুষ্ট হবে না। বিলাস-উপকরণকে তারা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করার আগ্রহ পোষণ করবে। গদি, টেবিল এবং অন্যান্য আসবাবই যথেষ্ট হবে না। তাদের প্রয়োজন হবে সুগন্ধিদ্রব্যাদির এবং পরিচর্যাকারী পরিচারক ও পরিচারিকার। খাদ্যদ্রব্যাদিও কেবল একপ্রকারের হলে চলবে না। বিভিন্নপ্রকার সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্যের আবশ্যক হবে। মোটকথা, একটি সহজ জীবনের অত্যাবশ্যক হিসাবে যে-বাসস্থান, পরিচ্ছদ এবং পাদুকার কথা আমি প্রথমে উল্লেখ করেছিলাম তা এরূপ নাগরিকদের নিকট আদৌ যথেষ্ট বিবেচিত হবে না। বাসস্থানকেও সুশোভিত করতে হবে। এবং সেজন্য প্রয়োজন হবে চিত্রঅঙ্কনের এবং শোভন বস্ত্রের সূচিশিল্পীর। অঙ্গাভরণের জন্য আবশ্যক হবে স্বর্ণ, জগমতি এবং অন্যান্য মহার্ঘ দ্রব্য।
গ্লকন বললেন : তা তো বটেই।
তা হলে সমৃদ্ধির সীমানা আমাদের বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। কারণ গোড়াতে আমি যে-সুস্থ রাষ্ট্রের কল্পনা করেছিলাম সে-রাষ্ট্রের পক্ষে এরূপ সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এবার তা হলে এমন জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে যার প্রয়োজন কেবল স্বাভাবিক অভাব-পূরণেই নিহিত নয়। নতুনতর শ্রেণীর এবার উদ্ভব ঘটবে। বাদক, কবি এবং নর্তকের আবশ্যক হবে। স্ত্রীলোকের বিশেষ পোশাকসহ বিভিন্নপ্রকার বস্ত্রের জন্য হরেক রকম বস্ত্র বয়নকারীরও প্রয়োজন হবে। এবং কেবল পরিচারক নয়, ধাত্রী, সেবিকা, ক্ষৌরকার, রন্ধনকারী, শূকর পালক ইত্যাকার অপরাপর শ্রেণীর লোক, যাদের আবশ্যকতা আমাদের প্রাথমিক রাষ্ট্রকল্পনাতে ছিল না, তাদের উদ্ভব ঘটবে। আর কেবল শুয়োরেই শেষ হবে না, লোকের খাদ্য হিসাবে জন্তু-জানোয়ারেরও প্রকারভেদের প্রয়োজন হবে। কী বল তুমি?
হ্যাঁ, অবশ্যই।
আর এ-জীবনে চিকিৎসকের প্রয়োজন আগের চেয়ে অধিক বৃদ্ধি পাবে।
নিঃসন্দেহে।
শুধু তা-ই নয়, গোড়াতে যে-রাষ্ট্রের আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম সে-রাষ্ট্রের পরিধিতে এত সংখ্যক নগরবাসীর আর স্থানসঙ্কুলান হবে না।
একথা সত্য। পুরাতন সীমানা আর যথেষ্ট হবে না।
এই স্থানসঙ্কুলান, পশু পালন এবং কৃষিকার্যের জন্য আমরা তখন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একটি খণ্ডকে অধিকার করতে চাইব। প্রতিবেশী রাষ্ট্রও যদি আমাদের ন্যায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহের নীতি গ্রহণ করে তবে সেও আমাদের রাষ্ট্রের একটি খণ্ড গ্রাস করতে চাইবে। একথা ঠিক নয় কি, গ্লকন?
হ্যাঁ, সক্রেটিস, এ-অবস্থা অনিবার্য।
এবার তা হলে আমাদের যুদ্ধ শুরু করতে হবে। কী বল, গ্লকন?
অবশ্যই।
তা হলে যুদ্ধ ভালো কি মন্দ সে-সিদ্ধান্তের পূর্বে একথা আমরা বলতে পারি যে, রাষ্ট্রীয় জীবনে ব্যক্তিগত কিংবা সংগঠনগত অন্যায়ের মূলে যে-কারণ, যুদ্ধের মূলেও রয়েছে সেই একই কারণ।
হ্যাঁ, সক্রেটিস, নিঃসন্দেহে একথা সত্য।
আর যুদ্ধের প্রয়োজন যখন এসে পড়েছে তখন রাষ্ট্রের আকার আমাদের আরও বৃদ্ধি করতে হবে। এবারের বৃদ্ধি সংখ্যার দুই-একটিতে নয়, এবারের বৃদ্ধি একটা পুরো সৈন্যবাহিনী গঠন পর্যন্ত পৌঁছবে। এই সেনাবাহিনী আমাদের রাষ্ট্রীয় অধিবাসী আর সম্পদ—সব কিছুকে রক্ষার জন্যই আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
কিন্তু সক্রেটিস, অধিবাসীকে রক্ষার প্রশ্ন কেন আসছে? অধিবাসীগণ কি নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়?
গ্লকনের এ-প্রশ্নের জবাবে আমি বললাম : না। যে-নীতির ভিত্তিতে আমরা রাষ্ট্র তৈরি করতে শুরু করেছিলাম সে-নীতি ঠিক হলে রাষ্ট্রের অধিবাসীগণ নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়। গ্লকন, তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, আমাদের নীতি ছিল এই যে, এক ব্যক্তি একাধিক শিল্প সফলতার সঙ্গে সম্পাদন করতে পারে না।
হ্যাঁ, একথা আমার স্মরণ আছে সক্রেটিস।
কিন্তু যুদ্ধ কি একটি শিল্পকর্ম নয়?
যুদ্ধ অবশ্যই একটি শিল্পকর্ম।
পাদুকা তৈরিতে যে-অধ্যবসায়ের আবশ্যক, যুদ্ধ করতেও সেই অধ্যবসায়ের আবশ্যক।
একথা সত্য।
অথচ পাদুকা প্রস্তুতকারককে একই সঙ্গে আমরা জমিকর্ষণকারী কিংবা বস্ত্রবয়নকারী অথবা গৃহনির্মানকারী বলে স্বীকার করিনি। কারণ, আমরা চেয়েছি পাদুকাশিল্পী উত্তমরূপে আমাদের পাদুকাই প্রস্তুত করবে। এজন্য প্রকৃতিগতভাবে যে-ব্যক্তি যে-কাজের উপযুক্ত আমরা তার উপর কেবলমাত্র সেই কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত করেছি, অপর কাজের নয়। যার উপর যে-দায়িত্ব ন্যস্ত সে জীবনব্যাপী সে-দায়িত্বই পালন করবে, অপর কোনো দায়িত্ব নয়। তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে কোনো সুযোগকেই সে উপেক্ষা করবে না। আর এই একাগ্র সাধনাতেই সে উত্তম শিল্পী হিসাবে উত্তীর্ণ হবে। এই নীতিতে একজন সৈনিকের দায়িত্বের কথা বিবেচনা করা যাক। সৈনিকের দায়িত্ব উত্তমরূপে সম্পন্ন করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু যুদ্ধ করার শিল্প বা দক্ষতা অর্জন কি এত সহজ যে সৈনিক কেবল সৈনিক নয়, একই সঙ্গে সে জমি-কর্ষণকারী, পাদুকা প্রস্তুতকারী এবং একজন কারিগর হওয়ার দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবে? অথচ যে-পাশা খেলোয়াড় জীবনব্যাপী সাধনার পরিবর্তে অবসর বিনোদনের উপায় হিসাবে পাশাখেলাকে গ্রহণ করে তাকে আমরা দক্ষ পাশা খেলোয়াড় বলে গণ্য করিনে। একাগ্র অধ্যবসায় ব্যতীত কেবলমাত্র হাতিয়ার হাতে নিলেই একজন শ্রমিক দক্ষ কারিগরে পরিণত হয় না। একথা যদি সত্য হয়, তা হলে যে-সৈনিক কী করে অস্ত্র ব্যবহার করতে হয় সে-কৌশল আয়ত্ত করেনি কিংবা তা আয়ত্ত করার জন্য কোনো পরিশ্রম ব্যয় করেনি তার পক্ষেও অস্ত্র হাতে নিয়েই দক্ষ সৈনিক হওয়া আদৌ সম্ভব হবে না। ঢাল কিংবা তলোয়ার অথবা ভারী অপর কোনো যুদ্ধাস্ত্র হাতে পেলেই বিনা শিক্ষায় দিনাদিন কোনো সৈনিকের পক্ষে উত্তম যোদ্ধা বলে পরিগণিত হওয়া সম্ভব নয়।
গ্লকন এই কথা স্বীকার করে বললেন : হ্যাঁ, যে-সাধনায় শিল্পী দক্ষতা অর্জন করবে সে সাধনার ক্রয়মূল্য খুব কম নয়।
দেশরক্ষাকারীর দায়িত্ব অপর সকলের চেয়ে অধিক। এ-কারণে এই দায়িত্ব-পালনের দক্ষতা অর্জনে প্রয়োজন হবে অপর যে-কোনো শিল্পের চেয়ে অধিকতর সময়, কৌশল এবং প্রয়োগনৈপুণ্যের। ঠিক নয় কি, গ্লকন?
একথা যথার্থ, সক্রেটিস।
তা ছাড়া সৈনিকের পেশার জন্য যুদ্ধের একটা স্বভাবগত প্রবণতারও আবশ্যক হবে।
অবশ্যই তার প্রয়োজন হবে।
তা হলে, গ্লকন, দেশরক্ষার জন্য যাদের আমরা নির্বাচিত করব, দেখতে হবে স্বভাবগতভাবে যেন তারা একাজের উপযুক্ত হয়।
হ্যাঁ, এদিকে লক্ষ রাখা আমাদের কর্তব্য হবে।
