২৫. দর্শন এবং কাব্যের বিরোধ
অধ্যায় : ২৫ [৫৯৫-৬২১]
দর্শন এবং কাব্যের বিরোধ
দশম অর্থাৎ শেষ পুস্তকের বক্তব্যের সঙ্গে নবম পুস্তকের বক্তব্যের কোনো যোগ দেখা যায় না। বস্তুত ‘রিপাবলিক’-এর প্রতিপাদ্য বক্তব্য নবম পুস্তকেই সমাপ্ত হয়েছে, বলা চলে। দশম পুস্তক সে হিসাবে একটি সংযোজন বা পরিশিষ্ট। এর মূল বিষয় হচ্ছে জীবনের ক্ষেত্রে কাব্যের সর্বময় প্রভাবের দাবিকে অস্বীকার করা এবং তাকে হ্রাস করা। পরিশেষে সক্রেটিস এরের কাহিনী দ্বারা আত্মার অমরতা এবং আত্মার পুনর্জন্মের তত্ত্বটি উপস্থিত করেছেন। কাব্যের বিরুদ্ধে প্লেটোর যুক্তি অবশ্য দশম পুস্তকে আকস্মিক নয়। আদর্শ রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি কাব্যের এবং বিশেষ করে নাটক এবং নাট্যকারের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন (৩৯২-৩৯৮)। সেখানে সক্রেটিস বলেছেন, কাব্যকে আদর্শ রাষ্ট্রে অবাধ হতে দেওয়া চলবে না। কাব্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কাব্যের বিরুদ্ধে প্লেটোর এই নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাবের কারণ বোধহয় এই যে, কাব্যকে তিনি দর্শনের প্রতিশক্তি হিসাবে দেখেছেন। এ-মনোভাবের একটি কারণ এই যে, দর্শন যেখানে যুক্তিনির্ভর, কাব্য সেখানে আবেগ এবং কল্পনানির্ভর। কাজেই যিনি তাত্ত্বিক নির্ভেজাল যুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র তৈরিতে সংকল্পবদ্ধ, তিনি আবেগের প্রভাবকে তাঁর রাজ্যে স্বাগত জানাবেন না। কিন্তু কাব্যকলার উপর প্লেটোর এরূপ তীব্র আক্রমণের কারণ কী? শুধু যে তিনি যুক্তির ভিত্তিতে আবেগকে অস্বীকার করছেন তা-ই নয়, কাব্যের বিরুদ্ধে তাঁর যুক্তির তীব্রতা অপর এক আবেগের রূপ ধারণ করেছে, বলা চলে। এর কারণ হিসাবে প্রাচীন গ্রীসে কাব্যের সর্বময় প্রভাবের উল্লেখ করা চলে। আধুনিক জীবনে, আমরা মনে করি, কাব্যের প্রভাব বিলীয়মান। কবির কথা গুরুত্বহীন। এমনকি বিদ্যালয়েও কবিদের হাজার হাজার ছত্র মুখস্থ করা বাধ্যতামূলক নয়। গবেষকরা বলেন, প্লেটোর কাল পর্যন্ত গ্রীসে কোনো ধর্মগ্রন্থের উদ্ভব হয়নি। কিন্তু তবু ধর্মগ্রন্থের মতো যদি কিছু সর্বদা আবৃত্ত হত, যদি কোনো গ্রন্থের শ্লোককে জীবনের যে-কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য উদ্ধৃত করা হত এবং শিক্ষাজীবনে যদি বাধ্যতামূলকভাবে কোনো পাঠ্য বিষয়কে মুখস্থ করতে হত, তা হোমারের কাব্য শ্লোক। জীবনের সর্বত্র কাব্যের এই ‘ধর্মীয়’ প্রভাবকে প্লেটো যুক্তির প্রতিশক্তি হিসাবে মনে করেছেন। দশম পুস্তকে কাব্যের ক্ষতিকর প্রভাবের পুনর্বার অধিকতর বিস্তারিত আলোচনার কারণ হয়তো এই যে, সংলাপের গোড়ার দিকে তাঁর কাব্যের সমালোচনা এথেন্সের বিদ্বজ্জন মহলে প্রতি-সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল। তাই সংলাপের শেষে অধিকতর জোর এবং যুক্তির সঙ্গে প্লেটো তাঁর পূর্ব অভিমতকে যথার্থ বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন।* এবং এই প্রসঙ্গে তিনি মূল সত্তা এবং তার প্রকাশের পার্থক্যটি উপস্থিত করেছেন। জগতের যা-কিছু সৃষ্টি সব হচ্ছে মূলের প্রকাশ, মূল নয়। শয্যা আছে তিন রকম। ঈশ্বরের রচিত শয্যা। সূত্রধরের তৈরি শয্যা। এবং শিল্পীর অঙ্কিত শয্যা। বিধাতার তৈরি শয্যাই হচ্ছে মূল শয্যা। অপর সব শয্যা হচ্ছে এই শয্যারই কমবেশি প্রকাশ। তাই তারা অ-সত্য। অবশ্য তাদের অ-সত্যতার পরিমাণ নির্ভর করে মূল সত্তা থেকে তার কোন্ প্রকাশ কত দূরে অবস্থিত, তার ওপর। সূত্রধর, চিত্রশিল্পী, কবি বা নাট্যকার : অর্থাৎ যেরূপ শিল্পীই হোক-না কেন—এরা সকলেই সত্তার প্রতিরূপ মাত্র সৃষ্টি করতে পারে, মূল সত্তাকে নয়। “তা হলে আমাদের এই কথাই মনে করতে হয় যে, হোমার থেকে শুরু করে কবিকুলের কারোরই সত্যের যথার্থ কোনো জ্ঞান নেই। যে-বিষয়ের তারা আলোচনা করে, তার অগভীর প্রতিরূপই মাত্র তারা সৃষ্টি করতে সক্ষম” [৬০০]। তাই “বিষাদাত্মক কবি, যার শিল্পকৌশল হচ্ছে সত্যের প্রতিরূপ সৃষ্টি, তার অবস্থান ও সত্য তেকে তিন প্রস্ত দূরত্বে। অপর সকল শিল্পী সম্পর্কেও একথা সত্য” [৫৯৭] দশম পুস্তকে উপস্থাপিত কাব্যকলা সম্পর্কে আলোচনাটিকে কোনো বিশেষ শিল্পতত্ত্ব হিসাবে বিবেচনা করা সঙ্গত হবে না। শিল্পের তত্ত্বপ্রতিষ্ঠা নয়, দর্শনের আসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং প্লেটোর মূলতত্ত্ব, ভাববাদকে সুদৃঢ় করার জন্যই কাব্য এবং শিল্পের এই নাকচমূলক আলোচনা।
[* কর্নফোর্ডকৃত রিপাবলিকের ইংরেজি অনুবাদ, পঃ ৩১৪।]
.
আমি বললাম : গ্লকন, তুমি নিশ্চয়ই জান আমাদের আদর্শ রাষ্ট্রের উত্তম গুণের মধ্যে যাকে আমি সর্বোত্তম বলে গণ্য করি, সে হচ্ছে তার কাব্যের নীতি।
কিন্তু কেন সক্রেটিস?
কারণ, আমাদের রাষ্ট্রের বিধান এখানে সুস্পষ্ট। সকল নাটকীয় সৃষ্টিকে আমাদের রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আত্মার বিভিন্ন ভাগকে আমরা চিহ্নিত করেছি। এবার আমরা পূর্বের চেয়েও স্পষ্টরূপে এই বিধানের উপযোগিতাটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হব।
তুমি কী বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস।
তোমাকে একান্তে একটি কথা বলছি। তুমি বিষাদাত্মক এবং অন্য প্রকৃতির নাট্যকারদেরকে কথাটি বোলো না। আসলে আমরা যদি শ্রোতাদের মনে এই নাট্যকারদের সৃষ্টির যথার্থ প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধশক্তি তৈরি না করি তা হলে এদের সৃষ্টি শ্রোতাদের মনকে নিশ্চিতই বিভ্রান্ত করবে।
কিন্তু তুমি সঠিকভাবে কী বলতে চাচ্ছ?
অবশ্য তোমাকে আমার আর-একটি কথা বলতে হয়। কিন্তু আমার শৈশবকাল হতে হোমারের প্রতি যে-ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা আমি পোষণ করে এসেছি তাতে কথাটি প্রকাশ করতে আমি দ্বিধা বোধ করছি। কারণ, আমার মতে সকল বিষাদাত্মক কবির গুরু হচ্ছেন হোমার। তিনি হচ্ছেন অপর সকলের শিক্ষাদাতা পথপ্রদর্শক। কিন্তু সত্যের চেয়ে কি ব্যক্তি বড়? সত্যের চেয়ে ব্যক্তিকে আমরা অধিক সম্মান দেখাতে পারিনে। কাজেই তোমার কাছে কথাটি আমার বলতেই হবে।
কথাটি তুমি বলো, সক্রেটিস।
বেশ, তা হলে তুমি শ্রবণ করো। না, বরঞ্চ তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও।
জিজ্ঞেস করতে শুরু করো।
আচ্ছা গ্লকন, প্রতি-সৃষ্টির কোনো সংজ্ঞা দিতে পার? আমি নিজে জানিনে প্রতিসৃষ্টি যথার্থই কী।
তুমি না জানলে আমারও জানার আশা কম।
না, যথার্থই আমি জানিনে। বস্তুত, নিকটদৃষ্টি অনেক সময়ে দূরদৃষ্টির চেয়ে তীক্ষ্ণ হয়। ঠিক নয় কি?
গ্লকন বললেন : তা হয় বইকী। কিন্তু তুমি উপস্থিত থাকতে আমার কিছু বলা সঙ্গত নয়। সক্রেটিস, তোমার নিজের দৃষ্টির উপরই তোমার নির্ভর করতে হবে।
তা হলে, এসো আমরা শুরু করি। কিন্তু অন্য বিষয়ে যেখান থেকে আমরা সর্বদা শুরু করি এ-বিষয়েও কি আমরা সেখান থেকে শুরু করব? তুমি তো জান, আমরা সর্বদা একটি সত্যকে ধরে নিয়েছি যে, প্রত্যেক প্রকার বস্তুর পেছনে তার অনুরূপ একটি মূল সত্তার অস্তিত্ব আছে। এই বস্তুর যা নাম সেই একই নামে আমরা তার সত্তাকেও অভিহিত করি। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, একথা আমি জানি।
বেশ, একটি দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। যেমন শয্যা এবং টেবিল; জগতে বিশেষ শয্যা এবং বিশেষ টেবিলের সংখ্যা অনেক আছে।
তা আছে।
কিন্তু এদের মূল সত্তা দুটি। একটি হচ্ছে ‘শয্যা’, অপরটি হচ্ছে ‘টেবিল’।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
তা ছাড়া একথাও আমরা সাধারণত বলি যে, কোনো সূত্রধর অর্থাৎ এই সকল গৃহসামগ্রীর যে তৈরিকারক, তৈরির ক্ষেত্রে তার দৃষ্টি থাকে, যে-দ্রব্যটি সে তৈরি করবে তার মূল সত্তার দিকে। সকল দ্রব্যের ক্ষেত্রেই একথা সত্য। কারণ, কোনো দ্রব্যের মূল সত্তাকে কেউ তৈরি করতে পারে না। তুমি কী বল? কেউ কি তা পারে?
না, তা পারে না।
বেশ ধরো, এমন একজন মানুষ আছে, সে সকলরকম কারিগরের তৈরি দ্রব্যই তৈরি করতে পারে। একে তুমি কী বলবে?
তাকে আমরা বিস্ময়কররূপে দক্ষ লোক বলব।
বেশ, এবার একটু থামো। তোমার জন্য অধিকতর বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে। কারণ, যে-কারিগরের কথা বললাম, তার দক্ষতা কেবল কৃত্রিম দ্রব্যসামগ্রী সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সে উদ্ভিদজগতের সকল উদ্ভিদ, পশু এবং নিজেকেও যে সৃষ্টি করতে পারে তা-ই নয়, অধিকন্তু এই পৃথিবী, আকাশ, দেবতাকুল, ঊর্ধ্ব এবং অধঃলোকের বস্তুপুঞ্জ—সব সৃষ্টিরই সে কারিগর।
এ-দক্ষতা অবশ্যই বিস্ময়ের বিস্ময়!
আমি জানি তুমি আমায় বিশ্বাস করছ না গ্লকন। কিন্তু তুমি বলো, তুমি কি সত্যই বিশ্বাস কর না, এরূপ শিল্পী একজন থাকতে পারে? এবং সে উল্লিখিতভাবে কিংবা অন্যভাবে এই সবকিছুর সৃষ্টি করতে সক্ষম? এক অর্থে কিন্তু তুমি নিজেও এই সবকিছুকে সৃষ্টি করতে পারে।
কী অর্থে?
খুব যে কঠিন, এমন নয়। বস্তুত বিভিন্ন উপায়ে দ্রুতই করা যায়। এবং দ্রুততম উপায়টি হচ্ছে একটি আরশি নিয়ে তোমার চারদিকে একবার ঘুরিয়ে আনা। মুহূর্তমধ্যে তুমি দেখতে পাবে সূর্য, তারকারাজি, পৃথিবী, তোমার নিজেকে, সকল পশু, উদ্ভিদাদি— এবং আর যা-কিছুর আমরা উল্লেখ করেছি তার সবকিছু তুমি সষ্টি করে ফেলেছ।
হ্যাঁ, তা আমি পারব বটে। কিন্তু সেগুলি তো প্রতিচ্ছবি মাত্র। সেগুলি তো যথার্থ বস্তু নয়।
আমি বললাম : খুবই ঠিক কথা। তুমি ধরেছ ঠিকই। আমি বলব, একজন চিত্রশিল্পী ঠিক এই ধরনেরই একজন কারিগর। তুমি কি একথা স্বীকার কর?
হ্যাঁ, আমি একথা স্বীকার করি।
তোমার আপত্তি হবে, শিল্পী যে-বস্তু তৈরি করবে তা সত্যকার বস্তু নয়। তবু একটা অর্থে শিল্পী একটি শয্যা অবশ্যই তৈরি করে। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, সে তৈরি করে—কিন্তু তার সে-শয্যা তো যথার্থ শয্যার একটি দৃশ্য বা প্রকাশমাত্র।
হ্যাঁ, কিন্তু সূত্রধর সম্পর্কেও কি তুমি বলনি যে সূত্রধর যা তৈরি করে তা শয্যার মূল সত্তা নয়, তার অন্তরসত্তা নয়, একটি বিশেষ শয্যাকেই সে তৈরি করে?
হ্যাঁ, একথা আমি বলেছিলাম।
তা হলে যা সে তৈরি করে তা মূল সত্তা নয়। সে সৃষ্টি করে এমন কিছু, মূল সত্তার সঙ্গে যার সাদৃশ্য আছে। কাজেই কেউ যদি বলে, সূত্রধর কিংবা অপর কোনো কারিগর যা তৈরি করে তা হচ্ছে মূল সত্তা বা চরম সত্তা, তা হলে সে নিশ্চয়ই সত্য কথা বলবে না। তুমি কী বল?
যে আমাদের যুক্তির সঙ্গে পরিচিত সে নিশ্চয়ই এরূপ কথা বলতে পারবে না।
কাজেই সূত্রধরের শয্যায় মূল সত্তার যদি কিছু ঘাটতি পড়ে, তাতে আমাদের বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
তা হলে এই দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে আমরা কি এবার প্রতিসৃষ্টির সংজ্ঞাদানের চেষ্টা করব?
হ্যাঁ, এবার তুমি সংজ্ঞাটি দাও।
আমরা দেখেছি, শয্যা তিন প্রকারের হতে পারে। প্রথম হচ্ছে মূল শয্যা। এ হচ্ছে সকল শয্যার মূল সত্তা। একে কেউ যদি তৈরি করে থাকে সে একমাত্র বিধাতা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে সূত্রধরের তৈরি শয্যা। এবং তৃতীয়টি হচ্ছে চিত্রশিল্পীর ‘শয্যা’।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
তা হলে আমরা বলতে পারি একই শয্যার পেছনে তিনজন স্রষ্টা রয়েছে : সূত্রধর, বিধাতা এবং শিল্পী।
হ্যাঁ, তা-ই তো রয়েছে দেখছি।
এর মধ্যে বিধাতা শয্যার কেবল মূল সত্ত তৈরি করে দিয়েছেন। এর কারণ হয়তো এই যে, তিনি শয্যার এই সত্যটিই তৈরি করতে চেয়েছেন কিংবা কর্মব্যস্ততার জন্য তিনি শয্যার অপর কোনো সত্তা তৈরির সময় পাননি। মোট কথা বিধাতা শয্যার একটি সত্তাই তৈরি করেছেন, এর একাধিক রূপ তিনি তৈরি করতে পারেননি।
কিন্তু কেন তিনি পারলেন না?
কারণ, তিনি যদি দুটি সত্তাও তৈরি করতেন, তা হলেও সে-দুটির মধ্যে চারিত্রিক মিল থাকত এবং এই দুটি সদৃশ সত্তাই মূল হিসাবে পরিগণিত হত।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
আমার মনে হয় বিধাতা এ কথাটি জানতেন। এবং তিনি সূত্রধরের ন্যায় একটি বিশেষ শয্যা তৈরি না করে সত্যকার মূল শয্যা তৈরি করতে চেয়েছিলেন বলেই তাকে তিনি দ্বিতীয় কোনো মূল শয্যার সদৃশ না করে একটিমাত্র অনন্য মূল শয্যা তৈরি করেছেন।
তা-ই হবে, সক্রেটিস।
তা হলে আমরা কি তাকে বস্তুর সত্তার স্রষ্টা কিংবা অনুরূপ অপর কোনো নামে অভিহিত করতে পারিনে?
আমরা সঙ্গতভাবেই তাঁকে এই বলে অভিহিত করতে পারি। কারণ তাঁর সকল সৃষ্টিই হচ্ছে সকল মূল সত্তার সৃষ্টি।
বেশ। তা হলে সূত্রধরের বিষয়ে আমরা কী বলব? সূত্রধরও তো শয্যা তৈরি করে?
হ্যাঁ, সেও শয্যা তৈরি করে।
এবং শিল্পী সম্পর্কে আমরা কী বলব? সেও কি শয্যা তৈরি করে?
না, সে তৈরি করে না।
তা হলে সে কী করে?
আমরা বলতে পারি অপর দুজন যে-শয্যা তৈরি করে শিল্পী তাকে প্ৰকাশ করে।
উত্তম কথা। তা হলে শিল্পীর প্রকাশ, সত্য থেকে তিন প্ৰস্ত তফাতে অবস্থিত?
হ্যাঁ, তিন প্রস্ত তফাতে তার অবস্থান।
তা হলে বিষাদাত্মক কবি, যার কৌশল হচ্ছে সত্যের প্রতিসৃষ্টি রচনা করা, তার অবস্থানও সত্য থেকে তিন প্রস্ত দূরত্বে। অপর সকল শিল্পী সম্পর্কেও একথা সত্য। ঠিক নয় কি?
তা-ই তো মনে হচ্ছে, সক্রেটিস।
তা হলে প্রতিসৃষ্টি সম্পর্কে আমরা একমত। কিন্তু গ্লকন তুমি বলো, শিল্পী কোন্ সৃষ্টিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করে? সে কি বস্তুর মূল সত্তাকে প্রকাশ করে কিংবা কারিগর যা সৃষ্টি করে তারই প্রতিরূপ সে তৈরি করে?
কারিগর যা তৈরি করে তারই প্রতিরূপ সে সৃষ্টি করে।
কিন্তু শিল্পী কারিগরের সৃষ্টি যেমন আছে তেমন তৈরি করে কিংবা সে সৃষ্টির বহিঃরূপটিকে প্রকাশ করে? এ-পার্থক্যটি স্থির করা আমাদের এখনও বাকি রয়েছে।
তোমার কথা আমি বুঝতে পারছিনে, সক্রেটিস।
আমি বলতে চাচ্ছি : তুমি যদি একটি শয্যা কিংবা অপর কোনো বস্তুকে তার পার্শ্বদেশ, প্রান্তদেশ কিংবা কোনো কৌণিক অবস্থান থেকে দেখ তাতে কি শয্যাটির চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটবে? না, বিভিন্ন অবস্থান থেকে বস্তুটি কেবল বিভিন্ন রূপে দৃষ্ট হবে?
হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস। একই শয্যা কিন্তু সে বিভিন্ন রূপে দৃষ্ট
তা হলে শিল্পীর সম্পর্কে কী বলবে? শিল্পী কি শয্যাটি কিংবা অপর কোনো বস্তু যেমন আছে তেমন তাকে প্রকাশ করার চেষ্টা করে? না, এ-সকল বস্তু যেমন দৃষ্ট হয় তেমন তাকে সে প্রকাশ করে? না যেমন সে দেখায় তেমন তাকে প্রকাশ করে?
বস্তুটি যেমন দেখায়, তেমন প্রকাশ করে।
তা হলে শিল্পীর প্রকাশ সত্য থেকে বহুদূরে অবস্থিত। এবং শিল্পী যে যে-কোনো বস্তুরই প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে, তার কারণ তার দৃষ্টি বস্তুর বাহ্যরূপকে ভেদ করে কখনো তার অন্তসত্তায় পৌঁছে না। যেমন ধরো, একজন শিল্পী, একজন পাদুকা প্রস্তুতকারক,একজন সূত্রধর কিংবা অপর যে-কোনো কারিগরেরই প্রতিকৃতি এদের শিল্প-নৈপুণ্যের কোনো জ্ঞান ব্যতিরেকেই অঙ্কন করতে পারে। কিন্তু তবু এই চিত্রশিল্পী যদি দক্ষ হয় তা হলে কিছুটা দূরত্ব থেকে শিশুদের নিকট কিংবা সকল মানুষের কাছে তার অঙ্কিত প্রতিকৃতি যথার্থ সূত্রধর বলেই বোধ হবে। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, প্রতিকৃতিটি যথার্থ সূত্রধর বলে বোধ হতে পারে।
তা হলে এরূপ ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক হওয়া সঙ্গত। তাই, যদি কেউ আমাদের বলে যে, সর্বক্ষেত্রে নিপুণ কারিগরের সে সাক্ষাৎ পেয়েছে, সকল জ্ঞানীর চেয়েই এর জ্ঞান অধিক, তা হলে আমরা তাকে বলব মূর্খের মত আচরণ করা তার পক্ষে সঙ্গত নয়। হাতুড়ের হাতে প্রতারিত হওয়া তার উচিত নয়। হাতুড়ে তার কাছে সর্বজ্ঞ বলে বোধহচ্ছে, কারণ সে নিজে জ্ঞান এবং অজ্ঞতা, এবং প্রতিরূপের মধ্যকার পার্থক্য অনুধাবনে অক্ষম।
খুবই যথার্থ।
এবার তা হলে আমাদের বিষাদাত্মক কবি এবং তাদের গুরু হোমারের দাবি পরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক। তাঁদের সম্পর্কে বলা হয়, তাঁরা নাকি সকল নৈপুণ্যে দক্ষ। তাঁরা ধর্ম এবং নীতির ক্ষেত্রেও সর্বজ্ঞ। কারণ কবিদের সমর্থকরা বলেন, একজন উৎকৃষ্ট কবিকে কোনো বিষয়ে উত্তম রচনার জন্য তাকে সে-বিষয়ের সবকিছুই জানতে হয়। যাঁরা এই কবিদের সাক্ষাৎ পেয়েছেন, যাঁরা এঁদের রচনা পাঠ করেছেন আমরা তাঁদের জিজ্ঞেস করব তাঁরা কি একটি বিষয় লক্ষ করেননি যে, কবিদের এই সৃষ্টি সত্য থেকে তিন প্রস্ত দূরে অবস্থিত : এরা সত্যের ছায়ামাত্র, সত্য নয় এবং এ-কারণে সত্যের জ্ঞান ব্যতীত এদের সৃষ্টি করা কবিদের পক্ষে সহজ হয়েছে? অথবা আমরা বলব যে, তাদের কথাই সত্য এবং জনসাধারণ যেমন তাদের উত্তম কথক মনে করে তেমনি উত্তম কবিগণ তাদের রচনার বিষয় সম্পর্কে যথার্থই জ্ঞানী?
সক্রেটিস, বিষয়টি আমাদের অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক।
আচ্ছা বেশ, ধরো কেউ কোনো সৃষ্টির মূল এবং তার প্রতিরূপ—উভয়কে জানে। তা হলেও কি সে প্রতিরূপ সৃষ্টিতেই নিজেকে নিয়োজিত করবে এবং জীবনের চরম লক্ষ্যে পরিণত করবে?
না, আমি তা মনে করিনে।
ঠিক, তা সে অবশ্যই করবে না। যে-বস্তুর প্রতিরূপ সে সৃষ্টি করছে, তাকে যদি সে যথার্থই জানে তা হলে মূল বস্তুর প্রতিই সে দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে, তার প্রতিরূপের উপর নয়। তার উত্তম রচনার প্রশংসার স্মৃতির বদলে সে কাজের জন্য প্রশংসিত হওয়ারই অধিক কামনা করবে। অপরের বৃহৎ কর্মের প্রশংসায় কাব্যকলা রচনার পরিবর্তে নিজেই সে বৃহৎ কর্মের নায়ক হওয়ার কামনা করবে।
গ্লকন বললেন, হ্যাঁ, একথা ঠিক। অপরের প্রশংসায় রচিত কাব্যের চেয়ে নিজের কর্মের প্রশংসা এবং পুরস্কার—উভয়ই অধিক হবে।
তা হলে আমরা এরূপ আশা করব না যে, হোমার কিংবা অপর কোনো কবি আমাদের নিকট নিরাময়বিদ্যা কিংবা অপর কোনো দক্ষতার ব্যাখ্যা পেশ করবেন। যেমন ধরো, কবিদের কেউ যদি যথার্থই চিকিৎসাবিদ বলে নিজেকে দাবি করেন এবং যদি তিনি চিকিৎসকের আলাপের কেবল অনুকারী না হন তা হলে চিকিৎসাবিদ এসক্যুলাপিয়াসের ন্যায় কোন্ প্রাচীন কিংবা আধুনিক কবি চিকিৎসায় পারদর্শী হয়েছেন কিংবা তাঁর কোন্ কবি চিকিৎসা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছেন তাঁর নাম তাঁকে বলতে হবে—এমন দাবি নিশ্চয়ই তাঁর কাছে আমরা করব না। কিন্তু হোমার যখন রণনীতি, রাষ্ট্রীয় শাসন এবং শিক্ষার ন্যায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন তখন তাঁকে পালটা প্রশ্ন করার আমাদের অবশ্যই অধিকার আছে। আমরা বলব : “কবিবর হোমার, আমরা যদি আমাদের সংজ্ঞায় ভ্রান্ত হয়ে থাকি এবং আপনি যদি সত্য থেকে তিন প্রস্ত দূর থেকে সত্যের ছায়া সৃষ্টি করে না থাকেন, যদি আপনি মানুষের উৎকৃষ্টতা সম্পর্কে সত্যের এক প্রস্ত নিকটবর্তী হয়ে থাকেন এবং আপনি যদি যথার্থই বলতে পারেন কোন্ আচরণ ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রকে উত্তম কিংবা অধম করে, তা হলে আপনি দয়া করে বলুন লাইকারগাস* যেমন স্পার্টার কিংবা অপরে যেমন অন্যত্র রাষ্ট্রীয় সংবিধানের সংস্কার কম কিংবা অধিক পরিমাণে সাধন করেছেন, তেমনি আপনি কোন্ রাষ্ট্রের সংবিধানের সংস্কারসাধন করেছেন। কোন্ নগরীর বিধানাবলী আপনার জ্ঞানের নিকট ঋণী? ইতালী এবং সিসিলি তাদের সংবিধানের জন্য চারোন্দাজের নিকট ঋণী, আমরা ঋণী সলোনের** নিকট। আপনি বলুন কোন্ রাষ্ট্রের মানুষ অনুরূপভাবে আপনার নিকট ঋণী?”
[* লাইকারগাস (খ্রিঃ পূঃ ৯ম শতাব্দী) প্রাচীন স্পার্টার সংবিধানের প্রতিষ্ঠাতা।
** সলোন : প্রাচীন এথেন্সের রাষ্ট্রনীতিবিদ। পৃঃ ৩৭০ দ্রষ্টব্য।]
গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, আমার তো মনে হয় না, হোমারের যে সর্বাধিক অনুরক্ত সেও তাঁর জন্য এমন কোনো কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে।
বেশ। কিন্তু হোমারের কালের এমন কোনো যুদ্ধের কথা কি আমরা জানি যে-যুদ্ধের সাফল্য তাঁর অধিনায়কত্বে কিংবা তাঁর উপদেশে অর্জিত হয়েছে?
না, তা আমরা জানিনে।
তা হলে মাইলেটাসের থেলিস* কিংবা সিদের আনাকারসিসের ন্যায় কোনো বাস্তব কৌশলকে কি তিনি আবিষ্কার করেছেন? এরূপ বাস্তব কোনো দক্ষতা কি তাঁর ছিল?
[থেলিস (৬২৪-৫৪৭ খ্রিঃ পূঃ) প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক। থেলিস মনে করতেন বস্তুজগতের মূল উপাদান হচ্ছে পানি।]
না, এরূপ কোনো দক্ষতাও হোমার প্রদর্শন করেননি।
বেশ, তিনি যদি জনসেবামূলক কিছু নাও করে থাকেন, তবু নিজের শিক্ষাকেন্দ্র কি তিনি স্থাপিত করেছিলেন, এমন শিক্ষালয় যেখানে তাঁর জীবনকালে সাগ্রহী শিক্ষার্থীগণ তাঁর উপদেশ শ্রবণের জন্য সমাগত হত এবং তিনি তাঁর উত্তরপুরুষদের জন্য একটা বিশিষ্ট হোমারীয় জীবনপদ্ধতি দান করে গেছেন? পাইথাগোরাসের* খ্যাতি তো এ-কারণেই। তাঁর অনুসারীগণ আজও পাইথাগোরীয় জীবনধারার কথা বলেন এবং এই জীবনধারা তাঁদের অপর সকল থেকে বিশিষ্ট বলে চিহ্নিত করে।
[* পাইথাগোরাস বা পিথাগোরাস প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক। তাঁর অনুসারীগণ পাইথাগোরীয় নামে পরিচিত। সংখ্যাকে পাইথাগোরাস সব সৃষ্টি এবং শক্তির মূল বলে মনে করতেন। পূঃ ৩৬১ দ্রষ্টব্য।]
না সক্রেটিস, হোমার সম্পর্কে আমরা এরূপ কোনো খ্যাতির কথা শুনিনে। বস্তুতঃ হোমার সম্পর্কে প্রচলিত সব কাহিনী যদি সত্য হয় তা হলে তাঁর সুহৃদ ক্রিওফাইলাস অধম শিক্ষার একটি অধমতর দৃষ্টান্ত। কারণ হোমার যখন জীবিত ছিলেন তখন তাঁর সুহৃদ তাঁর প্রতি অতি সামান্য সম্মানই প্রদর্শন করেছেন।
গ্লকনের কথায় আমি বললাম : হ্যাঁ, এরূপ কাহিনীই প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু গ্লকন, হোমারের যদি যথার্থই মানুষকে শিক্ষার উপকারে উপকৃত করার ন্যায় জ্ঞান থাকত, কোনো বস্তুর অলীক প্রতিরূপ তৈরি করার ক্ষমতা ব্যতীত তাঁর যদি সত্যিকার জ্ঞান থাকত, তা হলে তাঁর কি বহুসংখ্যক অনুসারী এবং অনুরাগী না থেকে পারত? আবডেরার প্রোটাগোরাস* এবং সিওস-এর প্রডিকাস** এবং তাঁদের অনুরূপ বহু শিক্ষক তাঁদের সমকালীনদের বুঝিয়েছেন যে, তাঁদের অধীনে শিক্ষা গ্রহণ না করে তাদের পক্ষে ব্যক্তিগত কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্বপালনই সম্ভব হবে না। এবং এঁদের অনুসারীগণ এই শিক্ষকদের জ্ঞানের দক্ষতার প্রশংসায় এরূপ উচ্ছ্বসিত হত যে, তারা তাদের শিক্ষকদের নিজেদের স্কন্ধে তুলে সম্মান জানাতেও দ্বিধা করত না। হোমার এবং হিসিয়ডের যদি যথার্থই মানুষকে উত্তম করার ক্ষমতা থাকত, তা হলে তাঁদের সমকালীন লোক কি তাদের চারণ কবি হিসাবে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে দিত? তারা কি সকলে খাঁটি স্বর্ণের ন্যায় তাঁদের দেহে সংলগ্ন হয়ে গৃহের মধ্যে অবস্থানে তাঁদের সম্মত করতে সচেষ্ট হত না? তথাপি তাঁরা যদি গৃহে অবস্থান না করতেন, তা হলে অনুরাগীগণ কি তাদের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য তাঁদের অনুগমন করে, তাঁরা যেখানে যেতেন সেখানেই যেত না?
[* প্রোটাগোরাস (৪৮৬-৪১৫ খ্রিঃ পূঃ) প্রাচীন গ্রীসের বিশিষ্ট শিক্ষকসম্প্রদায় সফিস্টদের অন্যতম। সফিস্ট শিক্ষকগণ প্রচলিত নীতি, বিশ্বাস, ধারণা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করেন। প্রাচীনপন্থী প্লেটো এ-কারণে তাঁদের বিরুদ্ধতা করেন। ‘মানুষই সত্যের নিয়ামক’—এ-উক্তি প্রোটাগোরাসের।
** প্রডিকাস (৪৮০-৪০০ খ্রিঃ পূঃ) একজন সফিস্ট।]
সক্রেটিস, তোমার একথা যথার্থ বলেই আমার মনে হয়।
তা হলে আমাদের এ কথাই মনে করতে হয় যে, হোমার থেকে শুরু করে কবিকুলের কারোরই সত্যের যথার্থ কোনো জ্ঞান নেই। যে-বিষয়ে তারা আলোচনা করে তার অগভীর প্রতিরূপই মাত্র তারা সৃষ্টি করতে সক্ষম। মানুষের কিসে মঙ্গল সে-সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। যেমন আমরা খানিক পূর্বেই উল্লেখ করেছি, অঙ্কনশিল্পী পাদুকা প্রস্তুতকারক বলে যা মনে হয় তার চিত্রই সে অঙ্কন করে। অথচ সে কিংবা তার চিত্রের দর্শকবৃন্দ কেউই পাদুকা প্রস্তুতের বিষয়ে কোনো জ্ঞান রাখে না। তারা বস্তুর বর্ণ এবং আকার দ্বারাই তাকে বিচার করে।
এ কথা সত্য।
অনুরূপভাবেই একজন কবি শব্দের মাধ্যমে যে-কোনো কারিগরের একটি চিত্র তৈরি করতে পারে। অথচ সে তার ছবি তৈরি করা ব্যতীত তার সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু তার শব্দের মাত্রা এবং ছন্দ এবং তার সঙ্গীত মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। সাধারণ মানুষ যারা নিজেরা কবির মতোই অজ্ঞ, যারা কেবল শব্দের ভিত্তিতেই কোনো বিষয়কে বিচার করে তারা মনে করবে, এ-কবির পাদুকা প্রস্তুতকারক কিংবা যুদ্ধ পরিচালনা কিংবা ইত্যাকার সব বিষয় সম্পর্কেই গুরুতর বক্তব্য একটা-কিছু রয়েছে। এরূপ প্রবল হচ্ছে কাব্যের স্বভাবগত জাদুর ক্ষমতা। কবির এই বক্তব্যকে তুমি তার কাব্যিক বর্ণলেপ থেকে মুক্ত করে ফ্যালো, সাধারণ গদ্যে তাকে পরিণত করো, তা হলেই তুমি দেখবে সে বক্তব্য কত মূল্যহীন।
হ্যাঁ, এটি আমি লক্ষ করেছি। তখন এরূপই হয়।
এ হচ্ছে সেই মূর্খের মতো যার যথার্থ কোনো সৌন্দর্য নেই; যৌবনের ফুটন্ত কুসুমই যার সৌন্দর্যের একমাত্র নির্ভর।
হ্যাঁ, এ কথাও সত্য।
আর-একটি বিষয় লক্ষ করা। যে-শিল্পী কোনো বস্তুর প্রতিরূপ তৈরি করে সে বস্তুর সত্তাকে জানে না, তার প্রকাশকেই মাত্র জানে। আমরা এই কথাটি বলেছিলাম, ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, আমরা এ কথা বলেছি।
কিন্তু তার মারফত আমরা অর্ধপথই অগ্রসর হতে পারি, অধিক নয়।
বেশ, তা হলে আরও অগ্রসর হও।
শিল্পী অশ্বের লাগাম এবং বল্গার ছবিও তৈরি করতে পারে?
হ্যাঁ, তা পারে।
কিন্তু আসলে এ-বস্তুগুলি তৈরি করে কর্মকার এবং অশ্বের সাজ প্রস্তুতকারক। ঠিক নয় কি?
ঠিক কথা।
কিন্তু শিল্পী কি জানে বল্গা এবং লাগাম কীরূপ হওয়া আবশ্যক? বস্তুতঃ কর্মকার কিংবা প্রস্তুতকারকও এ-বিষয়টি জানে না। বল্গা এবং লাগাম কীরূপ হওয়া আবশ্যক, সেকথা জানে কেবলমাত্র অশ্বচালক, যে এদের ব্যবহারের জ্ঞান রাখে। তুমি কী বল?
অবশ্যই। অশ্বচালকই মাত্র জানে।
একথা কি সব সময়ের জন্য সত্য নয়? যে-কোনো বস্তুর ক্ষেত্রেই তিনটি প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব রয়েছে; তার ব্যবহার, তার সৃষ্টি এবং তার প্রতিসৃষ্টি।
ঠিক কথা।
এবং কোনো হাতিয়ার কিংবা কোনো প্রাণী বা কোনো কার্য— তার গুণ, সৌন্দর্য এবং উপযোগিতা কী তাকে মানুষ কিংবা প্রকৃতি যে-ব্যবহারের জন্য তৈরি করেছে তার ভিত্তিতেই বিচার করা হয় না?
হ্যাঁ, তা-ই করা হয়।
তা হলে এ থেকে বোঝা যায় যে, বস্তুর ব্যবহারকারীকে বস্তুটিকে জানতে হবে; তার প্রস্তুতকারীকে সে বলে দেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বস্তুটি তার উপযোগিতার পরিচয় কতখানি দিতে সক্ষম হয়েছে। যেমন ধরো, বাঁশি যে বাজায়, সে বাঁশি যে বানায় তাকে বলে দেয়, তার বানানো বাঁশিটি কেমন করে বেজেছে। এবং তার কী ধরনের বাঁশি আবশ্যক সে কথাও বাঁশি প্রস্তুতকারককে সে বলে দেবে।
হ্যাঁ, তা-ই তাকে বলতে হবে।
তা হলে বস্তুর ব্যবহারকারীই বস্তুর জ্ঞান রাখে। বস্তুর যে তৈরিকারক তাকে ব্যবহারকারীর নির্দেশ গ্রহণ করতে হয়। তার জ্ঞানের উপর তাকে নির্ভর করতে হয়। ব্যবহারকারীর মাধ্যমেই মাত্র প্রস্তুতকারক বস্তু সম্পর্কে, তার গুণ এবং দোষ সম্পর্কে একটি সঠিক ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়।
এ কথা সত্য।
তা হলে শিল্পী এবং তার সৃষ্ট প্রতিরূপ সম্পর্কে আমরা কী বলব? যে-বস্তুর সে ছবি অঙ্কন করে, তার যথার্থতা কিংবা অযথার্থতা সম্পর্কে তার কি প্রত্যক্ষ কোনো অভিজ্ঞতা আছে? অথবা এমন কি আমরা বলতে পারি যে, যারা জানে তার কী অঙ্কন করা উচিত তাদের নির্দেশের উপর নির্ভরজনিত সঠিক ধারণা অন্তত তার রয়েছে?
না, এর কোনোটিই শিল্পীর নেই।
তা হলে, শিল্পী যে-বস্তুর ছবি আঁকে তার ‘উত্তমতা’ কিংবা ‘অধমতা’ সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান কিংবা ধারণা থাকে না।
না, তার এরূপ জ্ঞান কিংবা ধারণা থাকে না।
ঠিক শিল্পীর মতো, কবিও তার কাব্যের বিষয় সম্পর্কে সমভাবেই অজ্ঞ?
হ্যাঁ, সে সম্পূর্ণরূপেই অজ্ঞ।
তথাপি, যে-বিষয়ে সে কাব্য রচনা করছে সে-সম্পর্কে তার অজ্ঞতা সত্ত্বেও সে কাব্যসৃষ্টি করতে থাকবে। এবং অজ্ঞ জনতার যাতে মনস্তুষ্টি ঘটে তারই প্রতিরূপ সে সৃষ্টি করে চলবে।
এছাড়া সে আর কী করতে পারে?
তা হলে আমরা বেশ পরিমাণেই একমত যে, শিল্পী তার সৃষ্টির বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ কিংবা সে-সম্পর্কে তার জ্ঞান অতি নগণ্য এবং তার এরূপ শিল্পের যথার্থ কোনো মূল্য নেই। একথা শুধু শিল্পীর ক্ষেত্রে নেয়, বিষাদাত্মক কবি, মহাকাব্য বা নাট্যকাব্য : কাব্যের সকল ক্ষেত্রেই একথা সত্য?
হ্যাঁ, আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, সক্রেটিস।
একটা বিষয়ে আবার একটু স্মরণ করা আবশ্যক, গ্লকন। আমরা বলেছি প্রতি-রূপের এই সৃষ্টি সত্য থেকে তিন প্রস্ত দূরত্বে অবস্থিত। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, আমরা একথা বলেছি।
তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের কোন্ অংশকে এই প্রতিরূপ প্রভাবান্বিত করে? সক্রেটিস, মানুষের অংশ বলতে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ?
বলছি। তুমি তো জান, কোনো বস্তুর দৃশ্য, আকার তোমার চোখ থেকে তার দূরত্বের উপর নির্ভরশীল?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
তেমনি একটি কাঠি যদি তুমি পানিতে নিমজ্জিত কর, তা হলে সেটি তোমার চোখে বাঁকা ঠেকবে। এবং তুমি যখন তাকে পানির বাইরে নিয়ে আস তখন সেটি সোজা বোধ হয়। আবার আবরণের ব্যতিক্রমে একই তল তোমার চোখে অবতল কিংবা উত্তল বলে বোধ হতে পারে। এগুলো সবই হচ্ছে আমাদের আত্মার বিভ্রান্তি। আমাদের এই স্বাভাবিক দুর্বলতার উপরই দৃশ্যশিল্পী, জাদুকর এবং তাদের অনুরূপ লোকেরা নির্ভর করে এবং তাদের কৌশল দ্বারা আমাদের বিভ্রান্ত করে।
একথা যথার্থ।
পরিমাপ, হিসাব এবং ওজনের উপায় মানুষ আবিষ্কার করেছে এই বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির জন্য, এই নিশ্চয়তার জন্য যে, কোনোকিছুর বাহ্য আকার, কিংবা পরিমাণ দ্বারা যেন আমরা পরিচালিত না হই, যেন আমরা নির্ভর করতে পারি সংখ্যা, পরিমাপ এবং ওজনের সঠিক হিসাবের ওপর। এবং আমরা জানি এরূপ সঠিক হিসাবের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে আত্মার বুদ্ধি এবং যুক্তির।
হ্যাঁ, একথা ঠিক
অথচ দ্যাখো, বারংবার হিসাবের ভিত্তিতে যুক্তি যদি আমাদের বলে যে, একটা বিশেষ বস্তু’ অপর একটা বিশেষ বস্তু থেকে বৃহত্তর কিংবা ক্ষুদ্রতর কিংবা পরস্পর সমান, তবু তাদের বাহ্যদৃর্শ এ-সিদ্ধান্তের বিরোধী বলে বোধ হতে পারে।
হ্যাঁ, এরূপ হতে পারে।
কিন্তু আমরা বলেছি যে আমাদের একই অংশ একই বস্তু সম্পর্কে একই সময়ে পরস্পরবিরোধী ধারণা পোষণ করতে পারে না?
হ্যাঁ, একথা আমরা বলেছি এবং একথা যথার্থ।
তা হলে আত্মার যে-অংশ যুক্তির হিসাবকে অস্বীকার করছে, সেই একই অংশ যুক্তির হিসাবকে স্বীকার করতে পারে না?
না, তা পারে না।
কিন্তু আত্মার যে-অংশ অঙ্কের পরিমাপ এবং হিসাবের উপর নির্ভর করে সে-অংশই উত্তম এবং যে-হিসাবকে অস্বীকার করে সে-অংশ অধম?
অবশ্যই।
গ্লকন, আমি যখন বলেছিলাম, চিত্রশিল্পী কিংবা অপর শিল্পীদের সৃষ্টির অবস্থান সত্য থেকে বহু দূরে এবং এ-সৃষ্টির আবেদন আমাদের সত্তার এমন উপাদানের নিকট যে যুক্তি থেকে ভ্রষ্ট এবং আমাদের সত্তার সঙ্গে যার যোগটি অসুস্থ—তখন এই সিদ্ধান্তের কথাই আমি ভাবছিলাম।
হ্যাঁ, আমাদের সত্তার সঙ্গে তার যোগটি সম্পূর্ণ অসুস্থ।
তা হলে আমরা বলতে পারি, প্রতিরূপ শিল্প হচ্ছে এমন একটি অধম চরিত্র যে আর একটি অধম চরিত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি অধম সন্তানের জন্ম দিয়েছে।*
[* বি. জোয়েট দ্রষ্টব্য।]
আমারও তা-ই বোধ হয়।
এবং একথা কি কেবল দৃশ্যশিল্পের ক্ষেত্রেই সত্য? একথা কি যে-শিল্পের লক্ষ্য আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয় —অর্থাৎ কাব্য তার ক্ষেত্রেও সত্য নয়?
হ্যাঁ, আমার তো মনে হয় কাব্যের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।
কিন্তু চিত্রশিল্প থেকে সম্ভাব্যতাকে গ্রহণ করে তার ওপর নির্ভর করা আমাদের উচিত হবে না। আমাদের দেখতে হবে আমাদের আত্মার কোন্ অংশের উপর নাট্যকারের আবেদন সর্বাধিক এবং তার প্রভাব আত্মার জন্য মঙ্গলকর কিংবা অমঙ্গলকর?
হ্যাঁ, আমাদের সেটি দেখা আবশ্যক।
তা হলে গ্লকন, এসো বিষয়টিকে আমরা এভাবে প্রকাশ করি : নাটক মানুষের ইচ্ছুক কিংবা অনিচ্ছুক, কর্মরত জীবনকে রূপায়িত করে। সেই কর্মে মানুষ যেরূপ মনে করে সেরূপ উত্তম কিংবা অধম বলে নিজেকে প্রকাশ করে এবং সে তার আনন্দ বা দুঃখকে ভোগ করে। কথাটি কি ঠিক বলা হল?
হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস।
কিন্তু যে-ব্যক্তিসত্তার মধ্যে অভিজ্ঞতার এত বৈচিত্র্য সে-সত্তাকে কি আমরা সংঘাতহীন বলে গণ্য করতে পারি? আমরা দেখেছি, দৃশ্যজগতে পরস্পরবিরোধিতার উদ্ভব ঘটতে পারে। তা হলে কর্মের ক্ষেত্রেও অনুরূপ দ্বন্দ্ব এবং বিরোধিতার অস্তিত্ব কি অসম্ভব? বস্তুত, প্রশ্নটি জিজ্ঞাসার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, আমরা একথা স্বীকার করেছি যে, আত্মার মধ্যে এরূপ দ্বন্দ্বের অবকাশ আছে এবং একই সময়ে আত্মার মধ্যে দশ সহস্র পরস্পরবিরোধী উপাদানের অস্তিত্ব থাকতে পারে।
হ্যাঁ, আমরা সঠিকভাবেই একথা বলেছিলাম।
হ্যাঁ, আমরা ঠিকই বলেছিলাম। কিন্তু একটি বিষয়ের তখন উল্লেখ করা হয়নি। সেটি এবার উল্লেখ করা আবশ্যক।
সেটি কী?
আমরা কি একথা বলিনি যে, একজন উত্তম মানুষ যখন তার পুত্রসন্তান কিংবা অপর কোনো প্রিয়জনকে হারায়, তখন সে অপর সকলের চেয়ে অধিক অবিচলভাবে তার এই দুর্ভাগ্যকে বহন করতে সক্ষম?
হ্যাঁ, একথা আমরা বলেছিলাম।
কিন্তু এবার বিবেচনা করে বলো : তার কারণ কী? এ কি এই কারণে যে, সে কোনো দুঃখ বোধ করে না? তা যদি অসম্ভব হয়, তা হলে কারণ কি এই যে, সে তার দুঃখকে সহনীয় করে তোলে?
দ্বিতীয় কারণই সত্যের নিকটতর বলে বোধ হয়।
তা হলে বল, শোকাচ্ছন্ন অবস্থায় তাকে অপর সকলে যখন দেখবে তখন কি সে তার শোকের প্রকাশকে অধিকতরভাবে বাধাদানের চেষ্টা করবে, কিংবা সে যখন একাকী থাকবে তখন নিজের শোককে অধিকতরভাবে প্রতিরোধ করবে?
সকলের মধ্যেই তার প্রতিরোধ-ইচ্ছা অধিকতর হবে।
অর্থাৎ অপরের সম্মুখে যে-আচরণে সে লজ্জিত হত, একাকী সে-আচরণে বা সে-বাক্য উচ্চারণে তার দ্বিধা হবে না?
হ্যাঁ, একথা সত্য।
কারণ দুঃখবোধ তাকে শোকের দিকে নিয়ে গেলেও তার নীতি এবং যুক্তি তার চরিত্রের নিকট সংযম দাবি করবে।
যথার্থ।
তা হলে একই সময়ে পরস্পরবিরোধী ইচ্ছার অস্তিত্বের অর্থ তার চরিত্রে দুটি ভিন্ন প্রকৃতির উপাদানের অস্তিত্ব রয়েছে?
অবশ্যই।
এ-দুটি উপাদানের একটি হচ্ছে আইনের অনুগত এবং আচরণের সঙ্গত নীতিকে স্বীকারে আগ্রহী। এই উপাদান বলে—শোকে এবং দুর্ভাগ্যকে যতদূর সম্ভব আমাদের ধৈর্যের সঙ্গে এবং তিক্ততা ব্যতিরেকে বহন করা উচিত। কারণ, এ-দুর্ভাগ্য ছদ্ম আবরণে আমাদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপও হতে পারে। তা ছাড়া, ধৈর্যহীনতা আমাদের কোনো মঙ্গল সাধন করে না এবং মানুষের জীবনে মহামূল্যবান বলেও কিছু নেই এবং শোকাচ্ছন্নতা, যে-সাহায্য আমাদের প্রয়োজন, সে-সাহায্যলাভকেও অসম্ভব করে তোলে।
কী সাহায্য আমাদের প্রয়োজন?
আমাদের বুদ্ধি বা যুক্তির সাহায্য। যে-বুদ্ধি দ্বারা আমরা ঘটনাকে বিচার করি এবং অনিবার্যতার মধ্যেও যে-উদ্যোগ নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব, সেই উদ্যোগ গ্রহণে আমরা অক্ষম হয়ে পড়ি। অথচ, শিশুদের ন্যায়, যে-আঘাত আমরা পেয়েছি তাকে চেপে ধরে ক্রন্দন করে সময়ক্ষেপণ করা আমাদের উচিত নয়। আঘাতকে নিরাময় করে শোককে দূর করা এবং যথাশীঘ্ৰ ভ্ৰান্তি সংশোধনের শিক্ষায় আত্মাকে শিক্ষিত করে তোলা আমাদের কর্তব্য।
হ্যাঁ, দুর্ভাগ্যের ক্ষেত্রে এরূপ আচরণই আমাদের পক্ষে সঙ্গত আচরণ। এবং আমাদের সত্তার যে-উত্তম অংশ সে এরূপ আচরণেই আগ্রহী?
অবশ্যই।
কিন্তু আমাদের সত্তার অপর যে-অংশ আমাদের কোনো দুর্ভাগ্যকে বিস্মৃত হয় না এবং তা নিয়ে বিলাপেরও তার বিরাম নেই, তাকে আমরা অযৌক্তিক, অলস এবং কাপুরুষ বলে অভিহিত করতে পারি?
হ্যাঁ, তাকে আমরা এরূপই অভিহিত করব।
এবং আমাদের আত্মার এই অবাধ্য উপাদানই নাটকীয় প্রতিসৃষ্টির কাঁচামালের যোগান দেয়। কিন্তু যে-কারোর পক্ষে আমাদের আত্মার যৌক্তিক এবং অবিচল প্রশান্ত অংশকে প্রতিসৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। কিন্তু কেউ যদি এভাবে প্রকাশ করেও তবুও তাকে অনুধাবন করা, বিশেষ করে রঙ্গালয়ের সেই বিচিত্র দর্শকদের পক্ষে অনুধাবন করা বিশেষভাবে কঠিন কারণ আত্মার এই বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
খুবই সত্য কথা।
নাট্যকাব্যের স্রষ্টা অর্থাৎ নাটকীয় কবি তাই স্বাভাবিকভাবে আত্মার এই উপাদানের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে না। তার কৌশল দ্বারা আত্মার এই অংশকে সন্তুষ্ট করারও সে প্রয়াস পাবে না। কারণ, এমন প্রয়াস তার জন্য কোনো জনপ্রিয়তা বহন করে আনবে না। কাজেই সে তার নাটকের বিষয়কে অন্বেষণ করবে আত্মার অস্থির এবং আঘাতপ্রবণ অংশের মধ্যে।
এ কথা স্পষ্ট।
তা হলে কবিকে আমরা সঙ্গতভাবেই চিত্রশিল্পীর পার্শ্বেই স্থাপন করতে পারি। কবিও চিত্রশিল্পীর সদৃশ। কারণ, তার সৃষ্টিরও সত্য মূল্য নগণ্য। তার আবেদনও আমাদের আত্মার অধম অংশেরই নিকট। এবং এ-কারণে আমাদের সুশাসিত রাষ্ট্রে কবির প্রবেশ নিষিদ্ধ করলে আমরা সঠিক কাজই করব। কারণ, যুক্তির বিনিময়ে কবি আমাদের আত্মার অধম উপাদানগুলিকে উত্তেজিত করে তোলে। এগুলিকে সে উৎসাহিত এবং শক্তিশালী করে তোলে। আত্মার অধম অংশকে প্রবল করার অর্থ, রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং পরিচালনার ভার নিকৃষ্টতম চরিত্রের হাতে তুলে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের উত্তম চরিত্রের ধ্বংস সাধন করা। নাট্যকাব্যের কবিও অযৌক্তিক অংশকে উৎসাহিত করে ব্যক্তির চরিত্রে অনুরূপ অবস্থা সৃষ্টি করে। কারণ, আত্মার অযৌক্তিক অংশ আকারের পার্থক্য-অনুধাবনে অক্ষম। ক্ষুদ্র এবং বৃহতের পার্থক্য স্থির করতে সে বিভ্রান্ত হয়। কবি আত্মার এই অযৌক্তিক অংশকে উৎসাহিত করে এবং সত্য থেকে বহু দূরে অবস্থিত এর প্রতিরূপের সৃষ্টি করে।
আমি এক্ষেত্রে তোমার সঙ্গে একমত, সক্রেটিস।
কিন্তু কাব্যের বিরুদ্ধে এর চেয়েও গুরুতর অভিযোগ আছে। খুব উত্তম যে-চরিত্র, তাকে কলুষিত করতেও এ-কৌশলের ক্ষমতা মারাত্মক। এই মারাত্মক প্রভাব থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে খুব কম চরিত্রই।
এরূপ হলে, এর ক্ষমতা মারাত্মকই বটে।
তাই আমরা যখন হোমার কিংবা অপর কোনো বিষাদাত্মক কবির কাব্যে দেখি, কবি কোনো মহৎ নায়কের দুঃখকে বর্ণনা করতে যেয়ে সেই চরিত্রের মুখে শোকের বিলাপধ্বনি দুঃখের সকল ব্যঞ্জনাসহকারে স্থাপন করছেন, তখন তাঁর সে দক্ষ-কৌশলে আমাদের মধ্যে যারা মহৎ তারা পর্যন্ত বিমোহিত হয়ে আবেগের বন্যায় ভেসে যাই। এবং আমাদের ওপর কবির এরূপ প্রভাবের দক্ষতায় কবির প্রশংসায় আমরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি।
হ্যাঁ, এ আমাদের পরিচিত অভিজ্ঞতা।
অথচ আমাদের ব্যক্তিগত শোকে আমরা বিপরীত আচরণ করি। শোককে নীরবে বহন করার ক্ষমতায় আমরা গর্ব বোধ করি এবং নাট্যমঞ্চে যে-আচরণকে আমরা প্রশংসা করেছি, ব্যক্তিগত জীবনে সেরূপ আচরণকে আমরা স্ত্রীজনোচিত বলে আখ্যায়িত করি।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
তা হলে, যার সদৃশ হতে আমি নিজে লজ্জা বোধ করি, মঞ্চে তার আচরণকে প্রশংসা করা কি আমার পক্ষে সঙ্গত? এরূপ আচরণে ঘৃণার বদলে আনন্দ এবং বিমুগ্ধতা বোধ করা কি অযৌক্তিক নয়?
হ্যাঁ, এরূপ মনোভাব নিতান্তই অযৌক্তিক।
বিশেষ করে বিষয়টিকে যদি আমরা এভাবে দেখি।
কীভাবে?
যেমন ধরো, তুমি যদি মনে কর ব্যক্তিগত জীবনে শোকের যে-প্রকাশ আমরা দমন করি, কবি মঞ্চে তাকে রূপায়িত করে আমাদের অশ্রুপাত এবং শোক প্রকাশের স্বভাবগত প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করছে। কারণ, আমাদের চরিত্রের যেটি উত্তম অংশ সে-অংশ নৈতিক এবং যৌক্তিক শিক্ষার অভাবে মঞ্চে রূপায়িত শোকের দৃশ্যে তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণকে এই অজুহাতে শিথিল করে দেয় যে, আমরা অপরের শোকের দৃশ্য দেখছি, নিজে শোকাহত হচ্ছিনে এবং এর শোকের প্রকাশটির মধ্যে যদিও আতিশয্য রয়েছে তবু তার প্রশংসায় কোনো ক্ষতি নেই। তা ছাড়া শোক দেখে আমাদের চরিত্রের এই অংশ একটা আনন্দও বোধ করে। এ-আনন্দকে সে লাভজনক বলে গণ্য করে এবং এর বিনিময়ে কবির সমগ্র সৃষ্টিটিকে নাকচ করে দিতে সে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। কারণ, এ সত্য খুব কম লোকই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, অপরের প্রতি আমাদের মনোভাব আমাদের নিজেদেরও অনিবার্যরূপে প্রভাবিত করে। এবং অপরের শোকের প্রকাশে আবেগে আপ্লুত হলে আমাদের নিজেদের শোকের আবেগকে দমন করাও আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে।
একথা খুবই যথার্থ।
হাস্যধ্বনির ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। কারণ, যে-পরিহাস প্রকাশে তুমি নিজে লজ্জা বোধ কর, অপরের ক্ষেত্রে মঞ্চে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে সেই পরিহাসের স্থূলতাকে ঘৃণা না করে তাতে আনন্দবোধ করার প্রভাব তোমার চরিত্রের ক্ষেত্রে একই। কারণ, তোমার যে-পরিহাস-প্রবৃত্তি নিজে নির্বোধ বলে প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় দমিত ছিল, সেই পরিহাস-প্রবৃত্তিকে তুমি বল্গাহীন করে দিচ্ছ। ফলে মঞ্চের কুরুচি অচেতনভাবে তোমার মধ্যে সংক্রমিত হয়ে তোমাকে হাস্যাস্পদ জীবে পর্যবসিত করে দেবে।
হ্যাঁ, এ-আশঙ্কা অমূলক নয়।
কাব্য যখন দেহের লালসায় এবং ক্রোধের আবেগে এবং আমাদের কর্মের সঙ্গে জড়িত সুখ এবং দুঃখের কামনা ও বোধে পূর্ণ থাকে তখন আমাদের চরিত্রের উপর কাব্যের প্রভাবও একই। এই সকল প্রবৃত্তিকে যখন অভুক্ত রাখা আবশ্যক, তখন কাব্য এগুলিকে উৎসাহিত করে তোলে এবং যখন আমাদের মঙ্গল এবং সুখের স্বার্থে এগুলির নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক, তখন এই প্রবৃত্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
হ্যাঁ, তোমার একথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তা হলে গ্লকন, তুমি যদি এমন লোকের সাক্ষাৎ পাও যারা গ্রীসের শিক্ষাদাতা হিসাবে হোমারের প্রশংসা করে এবং বলে যে, আমাদের রাষ্ট্রীয় এবং শিক্ষার বিষয়ে হোমারকে আমাদের অধ্যয়ন করা আবশ্যক এবং তাঁর নির্দেশের ভিত্তিতে আমাদের জীবনকে গঠিত করা উচিত, তা হলে তাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের মধ্যে তুমি তাদের সৎ মানুষ বলে বিবেচনা করতে পার এবং তাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে বলতে পার, হোমার কবিদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং বিষাদাত্মক নাট্যকারের পথিকৃৎ। কিন্তু এ-বিষয়েও তোমার খেয়াল রাখা আবশ্যক যে, রাষ্ট্রে যদি তুমি কোনো কাব্যকলাকে অনুমোদিত কর, তবে তা অবশ্যই দেবতা এবং উত্তম মানুষের প্রশংসায় রচিত স্তোত্র ব্যতীত অপর কিছু হতে পারবে না। করণ, একবার যদি তুমি এই সীমানাকে অতিক্রম কর এবং সুমিষ্ট গীতিকবিতা বা মহাকাব্যকে অর্গলমুক্ত করে দাও তা হলে সর্বোত্তম বলে বিবেচিত নীতি এবং বিধানের বদলে আনন্দ এবং বেদনাই তোমার আত্মার শাসক হয়ে দাঁড়াবে।
তুমি যথার্থ বলেছ, সক্রেটিস।
তাই আমাদের রাষ্ট্র থেকে কাব্যকে নির্বাসিত করার অভিযোগের যদি জবাব দিতে হয় তা হলে আমরা বলব : এ-নির্বাসনের দাবি যুক্তির দাবি। কিন্তু যদি বলা হয় যে,কাব্য বাদে আমরা অচেতন এবং বর্বরে পরিণত হয়ে যাব, তবে আমাদের জবাব হবে : দর্শনের সঙ্গে কাব্যের বিরোধ একটি পুরাতন বিরোধ। এই প্রাচীন বিরোধের দৃষ্টান্তের অভাব নেই। ‘জন্তুটি প্রভুর দিকে মুখব্যাদান করল’ ‘শূন্যমস্তিষ্ক নির্বোধের মধ্যে সে সম্মানের পাত্র’ অথবা ‘বুদ্ধিতে অতিশয় স্ফীত মস্তিষ্কওয়ালাদের দল’ এবং বুদ্ধিতে ভারী বটে কিন্তু সম্পদে সর্বহারা ভিক্ষুক ইত্যাকার উক্তি আমাদের অপরিচিত নয়।* কিন্তু তবু কেউ যদি প্ৰমাণ করতে পারে যে, একটি সুশাসিত রাষ্ট্রে তৃপ্তির জন্য রচিত নাটক এবং কবিতা মঙ্গলকর, তা হলে আমরা আনন্দের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রে তাদের সংবর্ধনা জানাব। কারণ এদের প্রতি মানুষের আকর্ষণকে আমরা ভালোভাবেই জানি। কিন্তু তাই বলে যাকে আমরা সত্য বলে জানি তাকে কোনো কারণে পরিত্যাগ করা আমাদের চরিত্রের সততার সাক্ষ্য বহন করবে না। আমি জানি, গ্লকন, তোমার মধ্যেও কাব্যের আকর্ষণ, বিশেষ করে হোমারের কাব্যের আকর্ষণ কম নয়। ঠিক নয় কি?
[* এ-সমস্ত উক্তির উৎস কী, তা জানা যায় না।—লীর অনুবাদ, পৃঃ ৩৮৫।]
তুমি ঠিকই বলেছ, কাব্যের প্রতি আমার মধ্যেও আকর্ষণ রয়ে গেছে।
তা হলে সঙ্গতভাবে আমরা বলতে পারি, কাব্য যদি গীতিকাব্য কিংবা ভিন্নতর ছন্দের যথার্থতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় তবে তার প্রত্যাবর্তনের অনুমতিদানেও আমাদের আপত্তি হবে না।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
কাব্যের পক্ষে কৌশলী নিয়োগের যদি আবশ্যক হয় তা হলে আমরা এমন কাউকে নিযুক্ত করব, যে নিজে কবি নয় কিন্তু কাব্যকে যে ভালোবাসে। কাব্যের পক্ষে সে গদ্যে যুক্তি প্রদর্শন করবে এবং তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, কাব্যদেবী কেবল আমাদের মধ্যে উপভোগের প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে না, সে মানুষের জীবন এবং রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী মঙ্গলও বহন করে নিয়ে আসে। এমন যুক্তিকে আমরা স্বাগতঃ জানাব। কারণ, কাব্য যদি আমাদের আনন্দ এবং উপকার—উভয়েরই উৎস হয় তা হলে তার কাছ থেকে আমাদের লাভ ব্যতীত লোকসানের কোনো আশঙ্কা থাকবে না।
হ্যাঁ, তেমন হলে কাব্য থেকে আমরা অবশ্যই লাভবান হব।
কিন্তু কৌশলী যদি তার দাবিকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তা হলে প্রেমিক যেমন যতই কষ্ট হোক-না কেন তার অপদার্থ প্রেমাস্পদ বা প্রবৃত্তিকে পরিত্যাগ করে, তেমনি আমরাও প্রেমিককে অনুসরণ করে কাব্যকে পরিত্যাগ করব। যেভাবে অমরা বর্ধিত হয়েছি তাতে কাব্যকে ভালোবাসতে আমরা বাধ্য। এবং কাব্য যদি আমাদের মঙ্গলের উৎস বলে প্রমাণিত হয়, তা হলে আমরা যথার্থই আনন্দিত হব। কিন্তু এই চরিত্রের প্রমাণ যদি আমরা না পাই, তা হলে সাধারণ মানুষের উপর তার যে দুরারোধ্য প্রভাব, তার মোহে আমরাও যেন আবদ্ধ না হই—তার জন্য মন্ত্রপাঠের ন্যায় এই যুক্তিকে কাব্যের প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের কাছেই আমরা আবৃত্তি করতে থাকব। আমাদের মূল কথাটি হবে : এরূপ কাব্যের কোনো যাথার্থ্য কিংবা সত্য-মূল্য নেই। অপর মানুষকেও আমরা তাদের চরিত্রের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করে দেব এবং তাদের বলব তারা যেন কাব্য সম্পর্কে আমাদের এই নীতিকেই গ্রহণ করে।
আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, সক্রেটিস।
হ্যাঁ প্রিয় গ্লকন, এই নীতিই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। কারণ, প্রশ্নটি গুরুতর। উত্তম এবং অধমের মধ্যে কোনটি আমাদের জন্য মঙ্গলকর, তাকে স্থির করতে হবে। এ-প্রশ্নের গুরুত্ব আপাতভাবে যেরূপ বোধ হয় তার চেয়েও গুরুতর। এবং সম্মান বল, সম্পদ বল, শক্তি কিংবা কাব্য বল—কোনোকিছুর আকর্ষণেই আমরা ন্যায় এবং উত্তমের দাবিকে অবজ্ঞা করতে পারিনে।
গ্লকন বললেন : তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস। আমি মনে করি কেবল আমি নই, তোমার যুক্তির যথার্থতা অপর যে-কেউ স্বীকার করতে বাধ্য হবে।
কিন্তু আমরা এখনও ন্যায়ের সম্মান এবং পুরস্কারের কথা উল্লেখ করিনি।
যা আমরা উল্লেখ করেছি সে-পুরস্কার এবং সম্মান যদি তার চেয়েও শ্রেষ্ঠ হয়, তবে তার শ্রেষ্ঠত্বকে তো অকল্পনীয় বলতে হয়।
হ্যাঁ, তা বটে। কারণ, মাত্র ক্ষণকালের মধ্যে কার্ পক্ষে বৃহৎ কিংবা শ্রেষ্ঠ হওয়া সম্ভব? এবং তিন কুড়ি এবং দশ বৎসরের যে-পরিধি মহাকালের তুলনায় তুমি নিশ্চয়ই তাকে ক্ষণকালের অধিক বলবে না?
হ্যাঁ, তাকে তো কোনো কালের হিসাবে আনা যায় না। ক্ষণকালের চেয়েও অল্প।
যে অমর তার পক্ষে সমগ্র কালকে উপেক্ষা করে এই ক্ষণকালের উপর গুরুত্ব আরোপ করা কি সম্ভব?
না, সে অবশ্যই সমগ্র কালকে গুরুত্ব দেবে। কিন্তু তোমার এমন প্রশ্নের কী তাৎপর্য?
গ্লকন, তুমি নিশ্চয়ই জান, মানুষের আত্মা হচ্ছে অমর, সে হচ্ছে অক্ষয়।
আমার এমন উক্তিতে গ্লকনের দৃষ্টিতে বিস্ময় সৃষ্টি হল। গ্লকন আমার পানে তাকিয়ে বললেন : একথা কি যথার্থ? এবং তুমি এখনও কি এই অভিমত পোষণ করতে চাও?
আমি বললাম : হ্যাঁ, আমার এবং তোমারও এই অভিমতই পোষণ করা উচিত। আর একথা প্রমাণ করা খুব কঠিন ব্যাপার কিছু নয়।
আমার যেন কঠিন বলেই বোধ হচ্ছে। তুমি যদি তাকে এত সহজ মনে কর, তা হলে একটু ব্যাখ্যা করে বলো, প্রমাণটি কীরূপে সহজ।
তা হলে শ্রবণ করো, গ্লকন।
আমি প্রস্তুত, সক্রেটিস।
তুমি নিশ্চয়ই উত্তম এবং অধমের মধ্যে পার্থক্য স্বীকার কর। কোনো জিনিসকে তুমি উত্তম বল, এবং কোনোকিছুকে তুমি অধম বল?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
তুমি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবে, যা-কিছু অপরকিছুকে দূষিত করে কিংবা ধ্বংস করে তা-ই হচ্ছে অধম এবং যা-কিছু অপরকিছুকে রক্ষা করে এবং তাকে উন্নত করে, তাই হচ্ছে উত্তম?
হ্যাঁ, এ-ব্যাপারে আমি একমত।
আর একথাও নিশ্চয়ই তুমি স্বীকার করবে, প্রত্যেক সত্তার মধ্যে উত্তম এবং অধমের অস্তিত্ব আছে। চোখের কথা যদি ধর তা হলে চক্ষুর প্রদাহ হচ্ছে তার অধম অবস্থা। সমগ্র দেহের কথা ধরলে, রোগ হচ্ছে দেহের অধম অবস্থা। তেমনি শস্যের অধম অবস্থা হচ্ছে উদ্ভিদ-রোগ,কাষ্ঠের হচ্ছে তার পচন, তাম্র এবং লৌহের হচ্ছে তার মরচে পড়া। মোটকথা, প্রায় প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই তার ক্ষয় কিংবা অধমের একটা দিক আছে।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
এবং কোনোকিছু যদি এই ক্ষয় দ্বারা আক্রান্ত বা সংক্রমিত হয়, তা হলে পরিণামে তার ধ্বংস অনিবার্য। পরিণামে সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। সে সম্পূর্ণরূপে অস্তিত্বহীন হয়ে যায়।
যথার্থ।
তা হলে, যে-বস্তুকে কোনো ক্ষয় আক্রমণ করে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও যাকে ধ্বংস করতে পারে না, তাকে আমরা অক্ষয় বলতে পারি?
হ্যাঁ, তাকে আমরা অক্ষয় বলতে পারি।
বেশ। কিন্তু আত্মার ক্ষেত্রে কোটি সত্য? এমন কোন ক্ষয় কি আছে, যে আত্মার ক্ষতিসাধন করতে পারে?
হ্যাঁ, তার ক্ষতিসাধন করার মতো ক্ষয় অবশ্যই আছে। অন্যায়, অরাজকতা, কাপুরুষতা এবং অজ্ঞতা—অর্থাৎ যে-সমস্ত দুষ্টশক্তির আমরা উল্লেখ করেছি, আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার নিশ্চয়ই তাদের ক্ষমতা আছে।
কিন্তু এদের কেউ কি আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিতে পারে? একটা বিষয়ে আমাদের ভুল করা উচিত নয়, গ্লকন। আত্মা দুষ্ট হয়ে যেতে পারে। দুষ্ট আত্মা অন্যায় কর্মসাধনকালে ধরা পড়তে পারে। কিন্তু এই দুষ্টশক্তির কারণে সে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়, এরূপ চিন্তা করা আমাদের পক্ষে ঠিক হবে না। আমাদের বরঞ্চ বিষয়টি অন্যদিক থেকে দেখা আবশ্যক। আমরা বলব : দেহের দুষ্টশক্তি হচ্ছে তার রোগ। রোগ তাকে ক্ষয়গ্রস্ত করে। তার ধ্বংস সাধন করে। পরিণামে দেহের অস্তিত্ব বিনষ্ট হয়ে যায়। দেহ হিসাবে তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। অন্য যে-সমস্ত দৃষ্টান্ত আমরা দিয়েছি, তাদের সব ক্ষেত্রেই এরূপ দুষ্টশক্তি তাদের ধ্বংসসাধন করে। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
এসো, আমরা আত্মাকেও সেভাবে বিচার করে দেখি। আত্মার মধ্যে অন্যায় এবং অপর দুষ্টশক্তির অস্তিত্ব কি আত্মাকে এরূপভাবে দুর্বল এবং বিনষ্ট করতে পারে, যাতে আত্মা আর আত্মা হিসাবে অস্তিত্বশীল থাকতে পারে না, আত্মার মৃত্যু ঘটে যায় এবং সে দেহ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়?
না, তার এরূপ ধ্বংসসাধন সম্ভব নয়।
কিন্তু আবার এমন কথা ভাবাও অযৌক্তিক যে, নিজের ক্ষয়তে কেউ বিনষ্ট হয় না, বিনষ্ট হয় সে অপরের ক্ষয়তে।
হ্যাঁ, এরূপ ভাবা খুবই অযৌক্তিক।
আমি বললাম : তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে গ্লকন, দেহের মৃত্যু ঘটে পুরনো এবং দূষিত খাদ্যের কারণে কিংবা খাদ্যের অপর কোনো ত্রুটির কারণে—এমন অভিমত পোষণ করাও আমাদের উচিত নয়। খাদ্যের এমন কোনো ত্রুটির কারণে দেহের মধ্যে যদি ক্ষয়ের ধারা শুরু হয়, তা হলে বরঞ্চ আমাদের বলা উচিত যে, দেহের মৃত্যু ঘটেছে তার নিজের স্বভাবের কারণে। নিকৃষ্ট খাদ্য তার একটি উপলক্ষ মাত্র। কারণ দেহ এবং নিকৃষ্ট খাদ্য স্বভাবগতভাবে পৃথক। এদের যোগ এখানে মাত্র যে, নিকৃষ্ট খাদ্য দেহের নিকৃষ্ট স্বভাবকে ক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে। ঠিক নয় কি?
একথা অবশ্যই ঠিক, সক্রেটিস।
এই একই যুক্তিতে আমরা বলব, দেহের রোগ যদি আত্মার স্বভাবের নিজস্ব রোগকে ক্রিয়াশীল করে তুলতে না পারে তা হলে আমরা বলতে পারিনে যে, দেহের রোগে আত্মার মৃত্যু ঘটতে পারে। সেরূপ বলার অর্থ হবে, স্বভাবগতভাবে যারা একেবারে পৃথক তাদের একের রোগ অপরকে ধ্বংস করতে সক্ষম।
হ্যাঁ, এরূপ বলার অর্থ তা-ই দাঁড়ায়।
এই যুক্তি না খণ্ডানো পর্যন্ত আমাদের এই অভিমতই পোষণ করতে হবে যে, দেহের জরা কিংবা তার অপর কোনো রোগ কিংবা কোনো আঘাত—এমনকি দেহ যদি ছিন্নভিন্ন হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্তও হয়, তবু দেহের এরূপ কোনো অবস্থা আত্মাকে প্রভাবিত বা ধ্বংস করতে পারে না। আত্মা আপন স্বভাবে যা ছিল, দেহের এরূপ কোনো বিকার বা অবস্থা তাকে অধিকতর অন্যায়ে বা অধমে পর্যবসিত করতে পারে—একথা কেউ প্রমাণ না করা পর্যন্ত আমাদের অভিমতের কোনো পরিবর্তন ঘটতে পারে না। আমরা বলতে পারিনে, আত্মা কি অপর কোনোকিছুই নিজস্ব স্বভাবের কোনো বিকার ব্যতীত, ভিন্নতর অস্তিত্বের স্বভাবগত বিকারে ধ্বংস হতে পারে।
গ্লকন বললেন : মোটকথা কারোর পক্ষেই এরূপ প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, মৃত্যু আত্মাকে নৈতিকভাবে কোনো অধম সত্তায় পর্যবসিত করে।
কিন্তু সাহসী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী যদি আমাদের যুক্তির মোকাবেলায় অগ্রসর হয়ে আত্মার অমরতাকে অস্বীকার করার জন্য বলে, মানুষ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অধমতর অস্তিত্বে পর্যবসিত হয়, তবু আমরা বলব, তার অভিমত সত্য হলেও মানুষের নিজের স্বভাবের দুষ্টশক্তির কারণেই মানুষ অধমতর অস্তিত্বে পরিণত হয়। আইনের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের জন্য তার মৃত্যু নয়; তার মৃত্যু ঘটে তার স্বভাবের মধ্যকার মারাত্মক রোগের কারণে।
এবার গ্লকন কিন্তু জোরের সঙ্গে বলে উঠলেন : ভিতর থেকে তার নিজের দুষ্টশক্তি যদি তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষয়গ্রস্ত করে থাকে, তা হলে সেটা ভয়ানক কিছু নয়। এবার যে-কোনো আঘাতেই তার মৃত্যু ঘটতে পারে।
এবার তার যন্ত্রণার শেষ হবে। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে একেবারে বিপরীত। দুষ্টশক্তি নিজের মৃত্যু ঘটায় না। দুস্টশক্তি অপরের মৃত্যু ঘটায়। অপরদিকে, যার স্বভাবের মধ্যে এই দুষ্টশক্তির অবস্থান সে মৃত্যুর বদলে অধিকতর উদ্দীপনার সঙ্গে জীবনকে ভোগ করতে থাকে।
আমি তোমার সঙ্গে একমত গ্লকন। আত্মার নিজের স্বভাবের বিকার যদি আত্মাকে ধ্বংস করতে না পারে তা হলে সাধারণ নিয়মের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না। তা হলে সাধারণভাবেই আমরা বলব, কোনোকিছুই এমন কোনো শক্তির দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পারে না, যে-শক্তির ধ্বংসের লক্ষ্য ভিন্নতর কোনো অস্তিত্ব, তার নিজের অস্তিত্ব নয়। বস্তুত নিজের ধ্বংস কেবল নিজেই সাধন করতে পারে, অপরে নয়।
একথা অবশ্য স্বীকার্য।
তা হলে আত্মার ক্ষেত্রে সত্যটি যদি এই হয় যে, নিজের স্বভাব কিংবা অপরের বিকার, কোনোকিছুই তাকে ধ্বংস করতে পারে না, তা হলে আত্মা অবিনশ্বর, আত্মার অস্তিত্ব চিরন্তন। অন্য কথায় বলতে পারি : আত্মা হচ্ছে অমর।
হ্যাঁ, আত্মা অবশ্যই অমর।
তা হলে ‘আত্মা অমর’–এ প্রতিপাদ্য প্রমাণিত হল বলেই আমরা সিদ্ধান্ত করব। আর একথা যদি সত্য হয়, তা হলে একথাও সত্য যে, একই আত্মা চিরকাল অস্তিত্বশীল। কারণ, আত্মার সংখ্যার কোনো হ্রাস ঘটতে পারে না। কোনো আত্মারই মৃত্যু ঘটে না। আত্মার সংখ্যার বৃদ্ধিও ঘটতে পারে না। কারণ অমরতার বৃদ্ধি মরণশীলের বিনিময়েই মাত্র ঘটতে পারে। তা যদি ঘটতে পারত, তা হলে সবকিছুই পরিণামে অমর হয়ে যেত।
তুমি যথার্থ বলেছ সক্রেটিস।
কিন্তু আমাদের যুক্তির ভিত্তিতে তেমন কথা আমরা বলতে পারিনে। এবং একথাও আমরা বলতে পারিনে, আত্মা তার স্বভাবের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তনীয় কিংবা অস্থির কিংবা অন্তর্দ্বন্দ্বপূর্ণ হতে পারে।
গ্লকন বললেন : একথা তুমি কেন বলছ, সক্রেটিস?
কারণ, পরস্পরবিরোধী বহু উপাদানে যে গঠিত, তার পক্ষে অবিনশ্বর হওয়া কঠিন। কিন্তু আমরা বলেছি, আত্মা অবিনশ্বর।
হ্যাঁ, আমারও তা-ই মনে হয়।
তা হলে, যে-যুক্তি আমরা এইমাত্র দিয়েছি এবং অপর যেসব যুক্তি পূর্বে দেওয়া হয়েছে সবকিছুই প্রমাণ করে, আত্মা হচ্ছে অমর। কিন্তু আত্মার বিশুদ্ধ স্বভাবে আমরা যদি তাকে দেখতে চাই তা হলে আমরা বর্তমানে যেমন দেহের বিকার এবং অন্য দুষ্টশক্তির সঙ্গে যুক্ত করে তাকে বিকৃতভাবে দেখি, সেরূপ না দেখে যুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাসিত তার মূল বিশুদ্ধ সত্তায় তাকে আমাদের দেখতে হবে। তা হলে আমরা তখন দেখব, আত্মা কত অধিক সুন্দর। এবং তখনই মাত্র আমাদের পক্ষে ন্যায় এবং অন্যায়, এবং এরূপ অন্য যে-গুণের আলাপ আমরা করেছি, তাদের মধ্যে স্পষ্টতর পার্থক্য স্থির করা সম্ভব হবে। আমরা এতকাল আত্মাকে এখন যেরূপ দেখি সেরূপেই তার বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু আত্মার এ-অবস্থা পুরানের সমুদ্রে নিমজ্জিত সমুদ্র-দেবতা গ্লকাসেরই অনুরূপ। দীর্ঘকাল নিমজ্জিত থেকে ভগ্ন এবং ক্ষতবিক্ষত এবং বিকৃত হওয়ার কারণে দেবতা গ্লকাসের মূল আকারটি যেমন পরিচয়ের অতীত হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তেমন দশাই হয়েছে আত্মার। দেবতা গ্লকাসকে সমুদ্রতলের শঙ্খ এবং সমুদ্রজ উদ্ভিদ এবং সমুদ্র-দেশের পাথর এমনভাবে আচ্ছাদিত করে দিয়েছিল যে, আকারে সে দেবতার বদলে একটি দানবে পরিণত হয়েছিল। বিচিত্র বিরূপ শক্তির আচ্ছাদনে সেই অবস্থা। কাজেই সত্যকে আমাদের অপর কোথাও অন্বেষণ করতে হবে।
গ্লকন জিজ্ঞেস করলেন : কোথায় আমরা তাকে অন্বেষণ করব?
আমি বললাম : আমাদের অন্বেষণের স্থান হবে আত্মার সত্য-প্ৰেম। গ্লকন, তুমি চিন্তা করে দ্যাখো ঐশ্বরিক, অমর এবং অবিনশ্বর সত্যের সঙ্গে আত্মার আত্মীয়তা এদের জন্য আত্মাকে কীরূপ আকাঙ্ক্ষী করে তোলে এবং আত্মা এদের উপলব্ধির জন্য কীরূপ সচেষ্ট হয়ে ওঠে। ভেবে দ্যাখো, সে যদি তার এই আবেগকে পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করত এবং সত্যের কামনা দ্বারা সে যদি তার নিমজ্জিত অবস্থা থেকে উদ্ধার পেয়ে উপরে উঠে আসতে পারত এবং তার গাত্রের শ্যাওলা এবং পাথর—যাকে মানুষ সুখের আকর মনে করে—অথচ যা তাকে ক্ষয়গ্রস্ত করে, তাকে যদি সে ঝেড়ে ফেলতে পারত, তা হলে আত্মার কী বিস্ময়কর পরিবর্তন-না ঘটে যেতে পারত। তেমন অবস্থাতেই মাত্র তুমি আত্মাকে তার যথার্থ সত্তায় অবলোকন করতে পার। তখন তার সত্তা হবে সুসংগঠিত এবং অবিভাজ্য। সে যাহোক, এই মরজগতেও তার কী বৈশিষ্ট্য এবং অভিজ্ঞতা হতে পারে তার বর্ণনা যথেষ্টরূপে নিশ্চয়ই আমরা করেছি।
হ্যাঁ, সে-বর্ণনা আমরা যথেষ্টরূপেই করেছি।
এরপর আমি বললাম : গ্লকন, তা হলে আমরা বলতে পারি, তুমি যে-শর্ত আমাদের সামনে উপস্থিত করেছিলে সে-শর্ত আমাদের যুক্তি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে তুমি হোমার এবং হিসিয়ড সম্পর্কে যেরূপ বলেছ আমরা সেরূপ করিনি। আমরা কোনো সম্মান বা পারিতোষিকের কথা উল্লেখ করিনি। আমরা প্রমাণ করেছি, উত্তমতাই উত্তমের পুরস্কার এবং মেষপালক গাইজেস-এর* অঙ্গুরি এবং অদৃশ্য হওয়ার ঐন্দ্রজালিক টুপি আমাদের থাকুক কিংবা না-থাকুক, ন্যায়কর্ম আমাদের অবশ্যই উপকার সাধন করে।
[* গাইজেস-এর উপাখ্যান। ৩৬০ দ্রষ্টব্য।]
হ্যাঁ, একথা সত্য।
আমি বললাম : গ্লকন, তা-ই যদি হয় তা হলে এবার আমরা ন্যায় এবং উত্তমতা মানুষ এবং দেবতার জন্য এই লোকে এবং পরলোকে যে আশীর্বাদ বা পুরস্কার বহন করে আনে, তাকে যদি বর্ণনা করি তবে তাতে কি আপত্তির কোনো কারণ থাকতে পারে?
না, এবার কোনো আপত্তি থাকতে পারে না।
তা হলে তোমার সঙ্গে যে-আপোসটি আমি করেছিলাম, সেটি তোমাকে এবার পরিত্যাগ করতে হবে।
কী আপোস করেছিলে?
আমি তখন যুক্তির খাতিরে তোমার নিকট স্বীকার করেছিলাম, উত্তমের অসৎ বলে পরিচিত হওয়া আবশ্যক এবং যে অসৎ তার উত্তম বলে পরিচিত হওয়া আবশ্যক। মানুষ কিংবা দেবতার পক্ষে যদিও এরূপ বিপরীতভাবে পরিচিত হওয়া অসম্ভব, তবু ন্যায় এবং অন্যায়কে তাদের পরিফল ব্যতিরেকে আপন সত্তায় বিচার করার জন্য তুমি আমার নিকট এই স্বীকৃতিরই দাবি করেছিলে। তুমি নিশ্চয়ই একথা বিস্মৃত হওনি।
না সক্রেটিস, একথা অস্বীকার করা আমার পক্ষে কঠিন।
তা হলে সে-বিচার যখন আমাদের সম্পন্ন হয়েছে, এবার আমাদের মানুষ এবং দেবতার কাছে ন্যায়কে তার স্বনামে প্রতিষ্ঠিত করা কর্তব্য। কারণ ন্যায় কাউকে প্রতারিত করেনি। ন্যায়কে যারা বরণ করেছে, ন্যায় তাদের মঙ্গলসাধন করেছে। প্রতিদানে আমাদেরও কর্তব্য হচ্ছে ন্যায়ের নিকট থেকে আমরা যা নিয়েছিলাম তাকে তা প্রত্যর্পণ করা। তা হলেই তার নিজস্বরূপে সে আবার দৃশ্যমান হতে সক্ষম হবে।
হ্যাঁ, ন্যায়ের এ দাবি অবশ্য ন্যায়সঙ্গত।
প্রথমতঃ এবার তোমাকে স্বীকার করতে হবে, আর এই স্বীকৃতিটিই হচ্ছে তোমার প্রত্যর্পণ যে, দেবতার নিকট ন্যায় এবং অন্যায়ের যথার্থ চরিত্র অপরিজ্ঞাত নয়। দেবতা ন্যায় এবং অন্যায়ের যথার্থ চরিত্রকে জানে।
হ্যাঁ, একথা আমি এবার স্বীকার করি।
এবং এরা উভয় যদি দেবতার পরিচিত হয় তবে এদের একজন দেবতাদের মিত্র এবং অপরজন দেবতাদের শত্রু বলে বিবেচিত হবে। একথা আমরা গোড়া থেকেই বলে এসেছি।
হ্যাঁ, একথা আমরা বলেছি।
এবং দেবতাদের নিকট থেকে তাদের মিত্র যা-কিছু উত্তম তা-ই লাভ করবে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে অতীতে কৃত কোনো অপরাধের দণ্ডের ক্ষেত্রে।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
তা হলে আমরা এরূপই মনে করব যে, ন্যায়বান যদি দরিদ্র হয়, যদি সে অসুস্থ হয় কিংবা অনুরূপ অপর কোনো দুর্ভাগ্য দ্বারা যদি সে আক্রান্ত হয়, তা হলে এরূপ দুর্ভাগ্য তার এই জীবন কিংবা পরজীবনের মঙ্গলের উৎস। কারণ, যে-মানুষ ন্যায়কে বরণ করেছে এবং ন্যায়ের অনুসরণে যে মানুষ মানুষের সাধ্যমতো দেবতায় পরিণত হওয়ার চেষ্টা করেছে, সে-মানুষকে দেবতা কোনোক্রমেই অবজ্ঞা করতে পারে না।
না, এমন লোক যদি দেবতার মতো হয়, তবে দেবতা তাকে অবজ্ঞা করতে পারে না।
অপরদিকে আমরা মনে করব, যে অন্যায়ী তার ক্ষেত্রে এর বিপরীতটাই সত্য।
হ্যাঁ, যে অন্যায়কারী তার ক্ষেত্রে অবশ্যই এর বিপরীতটা সত্য।
তা হলে ন্যায়বান দেবতার কাছ থেকে এই পুরস্কারই লাভ করে?
হ্যাঁ, সে এই পুরস্কারই লাভ করে।
এবং মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটে? ব্যাপারটি কি তখন এরূপ দাঁড়ায় না যে, সত্য যদি প্রকাশিত হয় তা হলে কূটকৌশলে দক্ষ অসৎ, দৌড়ের ক্ষেত্রে প্রথমদিকে কিছুটা অগ্রগামী থাকলেও পরিণামকে সে ঠেকাতে পারে না? দৌড়ের দ্বিতীয় ধাপে তাকে অবশ্যই পিছিয়ে পড়তে হয়। প্রতিযোগিতার সারি থেকে শীঘ্রই তার পতন ঘটে এবং পরিণামে তার অসম্মান ঘটে। ধিকৃত পশুর ন্যায় তাকে পুরস্কারহীনভাবে লেজ গুটিয়ে সরে পড়তে হয়। আর যে সত্যকারের ধাবমান প্রতিযোগী সে তার দৌড় সম্পন্ন করে এবং বিজয়ীর পুরস্কার নিয়েই সে প্রত্যাবর্তন করে। ন্যায়বানের ক্ষেত্রেও কি একথা সত্য নয়? কোনো কর্ম সম্পাদনে, কিংবা অপরের সঙ্গে আচরণে কিংবা জীবনের ক্ষেত্রে ন্যায়বান কি পরিণামে তার সহযাত্রীদের মধ্যে পুরস্কার এবং সুনাম উভয়েরই অধিকারী হয় না?
অবশ্যই।
তা হলে তুমি একসময়ে অন্যায়কারীর প্রশংসায় যা বলেছিলে এবার আমি ন্যায়বানের প্রশংসায় তোমার সে কথাই কি উচ্চারণ করতে পারিনে? অর্থাৎ যে ন্যায়পরায়ণ সে যখন বার্ধক্যে উপনীত হবে, তখন সে ইচ্ছা করলে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আরোহণ করতে পারবে; তেমনি নিজে ইচ্ছামতো অপর কোনো রমণীকে যেমন সে বিবাহ করতে পারবে, তেমনি নিজের ইচ্ছামতো সন্তানদের বিবাহকার্য সম্পন্ন করতেও সে সক্ষম হবে। তুমি একথা যেমন অন্যায়কারী সম্পর্কে বলেছিলে, আমি তেমনি তা ন্যায়বান সম্পর্কে বললাম। অপরদিকে, যে অন্যায়কারী, সে যদিবা তার যুবাবয়সে পরিত্রাণ পেয়ে থাকে, পরিণামে সে অবশ্যই ধৃত হবে এবং অসম্মানিত হবে। অন্যায়কারীর বার্ধক্য হবে দুর্দশাগ্রস্ত। নগরের নাগরিক কিংবা বৈদেশিক সকলেই তাকে করুণার চোখে দেখবে। এবং তুমি যে-সমস্ত বর্বর নিগ্রহের উল্লেখ করেছ, বেত্রাঘাত, নির্যাতন এবং শলাকাদষ্ট হওয়া—সকল দণ্ডেই সে দণ্ডিত হবে। আমার পক্ষে এ গুলির পুনরাবৃত্তির কোনো আবশ্যকতা আছে বলে আমি মনে করিনে। কিন্তু যা আমি বলেছি, এ-সবই তো আমি ন্যায়সঙ্গতভাবে বলতে পারি। কী বল গ্লকন?
হ্যাঁ সক্রেটিস, এসব তুমি যথার্থই বলতে পার।
তা হলে, যে ন্যায়বান সে নিজের ন্যায়পরায়ণতার উপকার ব্যতীত তার জীবনকালে দেবতা এবং মানুষের নিকট থেকে এই সকল পুরস্কার লাভ করে।
গ্লকন বললেন : এবং এরূপ পুরস্কার অবশ্যই অতি উত্তম পুরস্কার।
তবু মৃত্যুর পরে ন্যায়বান এবং অন্যায়কারীর জন্য যে-প্রাপ্য অপেক্ষা করে আছে, তার তুলনায় তাদের ইহজগতের এই প্রাপ্য সংখ্যা এবং গুণের ক্ষেত্রে আদৌ তুলনীয় নয়। সেই প্রাপ্যের কথাও তোমার শোনা আবশ্যক। তা হলেই মাত্র ন্যায় এবং অন্যায়ের প্রাপ্যের বর্ণনা পূর্ণ হবে।
তুমি বলো সক্রেটিস। একথা শোনার চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে?
আমি বললাম : গ্লকন, আমি তোমাকে একটি গল্প বলব। এ-গল্প এলসিনাসের কাছে অডিসিউসের বলা কাহিনী নয়। তবু আমার এ-কাহিনীও এক বীরের কাহিনী। এ-কাহিনী হচ্ছে প্যামফিলিয়তে জাত আর্মেনিয়াসের পুত্র এরের কাহিনী। যুদ্ধক্ষেত্রে এরের মৃত্যু ঘটল। বীরের মৃত্যু। দশদিন অতিবাহিত হওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতদের মৃতদেহগুলিকে সংগ্রহ করে তাদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হল। সব দেহই তখন পচনক্রিয়া থেকে বিকৃত। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এরের দেহ অবিকৃত ছিল। তার দেহকে তার গৃহে এনে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে লাগল। কিন্তু দ্বাদশ দিবসে এর যখন শবশয্যায় শায়িত, তখন তার দেহে জীবন ফিরে এল। জীবন ফিরে পেয়ে তার চারদিকে সমবেত সকলকে তার পরলোকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে লাগল। এর বলল, তার আত্মা যখন দেহ থেকে মুক্ত হল, তখন সে আরও বহু বীরের সঙ্গে পরলোকের উদ্দেশে যাত্রা করল। সে-যাত্রায় অগ্রসর হতে হতে তারা একটি রহস্যময় স্থানে এসে উপনীত হল। পরলোকের যাত্রীগণ দেখতে পেল, পৃথিবীর এই স্থানটিতে দুটি প্রস্থানপথ রয়েছে। এ-দুটি প্রস্থানপথ পরস্পরসংলগ্নই ছিল। কিন্তু নিচের এ-দুটি পথের উপরে আকাশের দিকে আরও দুটি নিষ্ক্রমণপথকে দেখা গেল। উপরের এবং নিচের এই নিষ্ক্রমণপথের মধ্যবর্তী স্থানে দেখা গেল একদল বিচারক উপবিষ্ট রয়েছেন। বিচারকগণ ন্যায়বানদের বিচার করলেন। ন্যায়বান সম্পর্কে তাঁদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন এবং তাঁদের সেই সিদ্ধান্তকে গ্রন্থিবদ্ধ করে ন্যায়বানদের সম্মুখে রেখে তাদের আদেশ দিলেন : ন্যায়বানরা আকাশের নিষ্ক্রমণপথের ডানদিকের পথ ধরে স্বর্গে আরোহণ করুক। অনুরূপভাবে বিচারকগণ অন্যায়কারীদের বিচার করলেন। এবং তাদের আদেশ করলেন অধঃদেশের নিষ্ক্রমণপথ ধরে পাতাললোকে নেমে যেতে। অন্যায়কারীগণও তাদের দণ্ড বহন করে চলছিল। কিন্তু তাদের দণ্ড তাদের পৃষ্ঠদেশে আবদ্ধ ছিল। এরের বিচার যখন সন্নিকট হল, তখন সে বিচারকদের সম্মুখে উপস্থিত হল। কিন্তু বিচারকগণ তার প্রতি আদেশ দিলেন যে, এর পরলোকের অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য বহন করে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করে পৃথিবীর মানুষের কাছে পরলোকের কথা বর্ণনা করবে। এবং এ-কারণে এরের উপর আদেশ হল, পরলোকের সবকিছু সে দেখবে এবং শুনবে। এই আদেশ নিয়ে এর পরলোকের সবকিছু দেখতে লাগল। সে দেখল, যার যেমন বিচার তা হবার পর কেউ ঊর্ধ্বদেশের নিষ্ক্রমণপথে, কেউ নিম্নদেশের প্রস্থানপথে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এর আরও দেখতে পেল, পরলোকে গমনাগমনের অপর যে-দুটি পথ রয়েছে তার একটির মধ্য থেকে কেউ হয়তো পৃথিবীর ধুলাবালিসমাচ্ছন্ন হয়ে যাত্রার ক্লান্তি নিয়ে পৃথিবীর গহ্বর থেকে উপরে উঠে আসছে। আবার কেউ হয়তো স্বর্গ থেকে পরিচ্ছন্ন এবং উজ্জ্বল বেশে নেমে আসছে। স্বর্গ থেকে যারা আসছে তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারা দীর্ঘপথ অতিক্রম করে এসেছে। কিন্তু তাদের অবয়বে কোনো ক্লান্তির চিহ্ন নেই। তাদের দেখা গেল, সানন্দ মনে তারা একটি প্রান্তরে পৌঁছে যেন কোনো উৎসবের আয়োজন করছে। এদের মধ্যে যারা পরস্পর পরিচিত তারা একে অপরকে আনন্দে আলিঙ্গন করছে। এবং বাক্যালাপে মশগুল হচ্ছে। পৃথিবী থেকে সদ্য আগত আত্মার দল এদের কাছে স্বর্গের বিষয়াদি সম্পর্কে আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করছে। স্বর্গ হতে আগত আত্মার দলও পৃথিবীর আত্মার কাছে পৃথিবীর খবর জিজ্ঞেস করছে। এমনিভাবে তারা পরস্পরকে আপন অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছে। যারা পাতাললোক থেকে এসেছে, হাজার বছর ধরে যারা পথ চলতে চলতে এসেছে, তারা তাদের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার অভিজ্ঞতার করুণ বর্ণনা দিতে লাগল। তাদের চোখ দিয়ে দুঃখের অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। অপরদিকে যারা স্বর্গলোক থেকে এসেছে তারা সুখে এবং আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে স্বর্গের অবর্ণনীয় সুখ এবং সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে লাগল। গ্লকন, এ-গল্প অবশ্যই দীর্ঘ। এ কাহিনী শেষ করতে আমাদের দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। সংক্ষেপে এরের কাহিনী হচ্ছে এরূপ : এর বলল, সে দেখতে পেল, বিচারকগণ যার যেমন অন্যায় তার তেমন বিচার করে প্রতি অন্যায়ের জন্য দশগুণ দণ্ডের ব্যবস্থা করছেন এবং একটি জীবনকে শত বছরের পরিধিতে পরিমাপ করে তার দণ্ডভোগকে একশত বছরে একবার কিংবা সহস্র বছরে দশবারের ভিত্তিতে বিভক্ত করে দিচ্ছেন। যেমন ধরো, কেউ যদি বহু হত্যার কারণ হয়ে থাকে কিংবা যদি সে বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে কিংবা কোনো নগরীকে এবং তার সেনাবাহিনীকে দাসে পরিণত করে থাকে কিংবা অনুরূপ কোনো দুষ্কর্মের যদি সে নায়ক হয়ে থাকে, তা হলে তার প্রতিটি অন্যায়ের জন্য সে দশগুণ দণ্ড ভোগ করবে। এবং যারা ন্যায়বান তারাও তাদের প্রতিটি ন্যায়কর্ম, তাদের মহানুভবতা এবং পবিত্রতার জন্য অনুরূপ হারে পুরস্কৃত হবে। যে-শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছে তাদের বিচারের ব্যাপারে এরের বিবরণী উল্লেখ না করলেও চলবে। কিন্তু দেবতাদের প্রতি এবং পিতামাতার প্রতি অসম্মানকারীর এবং মানুষের হত্যাকারীর দণ্ড উল্লিখিত দণ্ডের চেয়েও বহুগুণ অধিক এবং ভয়ানক। এর একটি ঘটনার কথা বলেছিল। এর বলেছিল, সে শুনতে পেল একটি আত্মা অপর একটি আত্মাকে প্রশ্ন করছে : ভাই, মহান আরডিউস কোথায়? গ্লকন, এই আরডিউস কিন্তু এরের হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবীতে জীবনধারণ করেছিল। সে প্যামফিলিয়ার কোনো নগরীর স্বৈরশাসক ছিল। সে তার বৃদ্ধ পিতা এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে হত্যা করেছিল। এ ছাড়াও তার ঘৃণ্য দুষ্কর্মের সীমা ছিল না। সে যাহোক, এর শুনতে পেল, অপর আত্মাটি বলছে : “আরডিউসের আত্মা কখনো এখানে আসেনি এবং কখনোই সে এখানে আসতে সক্ষম হবে না। কারণ, আমরা নিজেদের চোখেই এক ভয়ানক দৃশ্য দেখেছি। আমরা তখন গুহার মুখে। সমস্ত অভিজ্ঞতা শেষ করে আমরা পুনরায় আরোহণের উদ্যোগ করছি। এমন সময়ে আমরা দেখলাম, আকস্মিকভাবে আরডিউস এবং তার সঙ্গে আরও একদল আত্মা এসে হাজির হল। এরা সকলেই ছিল স্বৈরশাসক। তা ছাড়া তাদের সঙ্গে এমন আত্মার দলও ছিল, যারা ব্যক্তিগতভাবে বৃহৎ দুষ্কর্মের নায়ক ছিল। তারাও গহ্বরের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারাও ভেবেছিল তারা স্বর্গে আরোহণ করবে। কিন্তু আমরা দেখলাম, গহ্বরের মুখ তাদের গ্রহণ না করে আচম্বিতে গর্জন করে উঠল। বস্তুত, এই দুরারোগ্য পাপীর দল কিংবা তাদের সঙ্গীদের মধ্যে যাদের দণ্ডভোগ সমাপ্ত হয়নি তাদের কেউ যখন গুহার মুখ দিয়ে উপরে আরোহণের চেষ্টা করছিল তখনি গুহা গর্জন করে উঠছিল। এবং যে সব ভীমাকার প্রহরী দণ্ডায়মান ছিল তারা সেই গর্জন ধ্বনি শ্রবণ করে অগ্রসর হয়ে তাদের ধরে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিল। আরডিউস এবং তার সঙ্গীদের প্রহরীর দল হাত-পা বেঁধে নিচে ফেলে দিচ্ছিল, তাদের চাবুক মারছিল এবং রাস্তার উপর দিয়ে তাদের টেনে নিতে নিতে পথিকদের নিকট তাদের অপরাধের বর্ণনা দিচ্ছিল এবং বলছিল, এদের তারা নরকে নিক্ষেপ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। এবং অপরাধী ছাড়া অপর যারা সেই গুহার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল, পাছে তারাও গুহার সেই গর্জনধ্বনি শুনতে পায়। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে গুহা যখন নীরব হয়ে রইল, তখন তারা একে একে অসীম আনন্দে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে।” আরডিউসের দর্শনকারীর এই ছিল বর্ণনা। এর পৃথিবীর সমবেত মানুষকে বলল : এই হচ্ছে অন্যায়কারীর দণ্ড। আবার যারা ন্যায়বান তাদের পুরস্কারের পরিমাণও এর চেয়ে কম নয়।
এরের বর্ণনাতে আরও ছিল। আত্মারা সাতদিন প্রান্তরে কাটাল। সাতদিনের অবশেষে তারা আবার যাত্রা শুরু করল। চতুর্থ দিনে তারা এমন একটি স্থানে এসে উপস্থিত হল যেখান থেকে স্বর্গ এবং মর্ত্য ভেদকারী একটি আলোর দণ্ডকে তারা দেখতে পেল। স্তম্ভের মতো আলোর এই দণ্ডটি বর্ণসমারোহে রামধনুপ্রায়। বরঞ্চ বলা চলে, রামধনুর চেয়েও সে উজ্জ্বল এবং স্পষ্ট। আরও একদিন অতিবাহিত হল। অভিযাত্রী আত্মার দল এবার সেই আলোকস্তম্ভে প্রবেশ করল। তাদের এই অবস্থান থেকে আলোকস্তম্ভের মেরুদণ্ডের উপর দৃষ্টিপাত করে এবার তারা স্বর্গ থেকে প্রলম্বিত দণ্ডের উভয় প্রান্তকে দেখতে পেল। কারণ, আলোর এই স্তম্ভটি হচ্ছে স্বর্গ বা জ্যোতির্মণ্ডলের বন্ধনদণ্ড। এই দণ্ডই জাহাজের দাঁড়ের সারির বন্ধনসূত্রের ন্যায় জ্যোতির্মণ্ডলের সমগ্র পরিধিকে ধারণ করে রাখে। এই দণ্ডের প্রান্তদেশদ্বয়ে আবদ্ধ হচ্ছে অনিবার্যতার চক্রটি। অনিবার্যতার এই চক্রের কারণেই সকল নক্ষত্রপুঞ্জের আবর্তন। অনিবার্যতার চক্রের দণ্ড এবং বক্রপ্রান্ত কঠিন প্রস্তর এবং অন্য বস্তুর মিশ্রণে গঠিত। এবং এর গতির নিয়ামক অংশটির প্রস্তুতপ্রণালীর যে-বর্ণনা এর দিয়েছে তাতে মনে হয় চক্রের একটি অংশকে খোদাই করে তাকে তৈরি করা হয়েছে। এই খোদিত অংশটিতে আবার একটি দ্বিতীয় নিয়ামক স্থাপিত হয়েছে। আবার দ্বিতীয়টি খোদাই করে বসানো হয়েছে একটি তৃতীয় নিয়ামক। এবং তৃতীয় নিয়ামককে খোদাই করে স্থাপিত হয়েছে চতুর্থ নিয়ামক। এমনি করে তৈরি হতে হতে অষ্টম নিয়ামকে যেয়ে তা সম্পূর্ণ হয়েছে। এ যেন কতকগুলি কুম্ভের স্তরস্তূপ। কারণ সেখানে সর্বমোট আটটি নিয়ামক খোদিত ছিল। একটির মধ্যে ঘটেছিল অপরটির স্থাপন। ঊর্ধ্বদেশ থেকে দেখলে এ নিয়ামকের বাহুকে একটি বৃত্তের মতোই তোমার কাছে মনে হবে। দণ্ডকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এই নিয়ামকের তল। অষ্টম নিয়ামকের কেন্দ্রবিন্দু দিয়ে প্রবিষ্ট হয়েছিল এই দণ্ড। সবচেয়ে বাইরের দিকের নিয়ামকটির বাহু ছিল প্রশস্ততম। পরিধিতে হ্রস্বতর ছিল ষষ্ঠ। এবং তার চেয়ে চতুর্থ, চতুর্থের পরে অষ্টম। অষ্টমের পরে সপ্তম। সপ্তমের পরে পঞ্চম। তার পরে তৃতীয়। এবং সর্বশেষে দ্বিতীয়। বহির্দিগস্থ বৃহত্তম বাহুটি বর্ণে ছিল বিচিত্র। কিন্তু সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল সপ্তমটি। অষ্টমটির আলো আসছিল সপ্তম থেকে। কারণ, সপ্তমের বর্ণেই অষ্টমের বর্ণ। দ্বিতীয় এবং পঞ্চম নিয়ামকের বৃত্তকে বলা চলে পরস্পর সদৃশ। এদের বর্ণ ছিল অপর বৃত্তের চেয়ে অধিকতর পীত। কিন্তু তৃতীয়টি ছিল শুভ্রতম। চতুর্থটির বর্ণ লোহিত এবং ষষ্ঠটি শুভ্রতার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়। সমগ্ৰ চক্ৰ একটি বেগেই আবর্তিত হত। কিন্তু সমগ্রের গতির অন্তরে অন্তর্ভুক্ত অপর সাতটি নিয়ামকের গতি ছিল ধীরতর এবং সমগ্রের বিপরীতমুখী। কিন্তু এদের মধ্যেও অষ্টমটির গতি ছিল সর্বাধিক। গতিতে অষ্টমের নিকটবর্তী ছিল যথাক্রমে সপ্তম, ষষ্ঠ এবং পঞ্চম। এদের সকলের গতি ছিল সমাহারের। গতির ক্রমে তৃতীয় স্থান ছিল চতুর্থের। এর গতি ছিল বিপরীত আবর্তের গতি। চতুর্থ অবস্থান ছিল তৃতীয়ের এবং পঞ্চম ছিল দ্বিতীয়ের। আবার সমগ্র চক্রের আবর্তই সংঘটিত হচ্ছে অনিবার্যতার ক্রোড়দেশে। এবং প্রত্যেক বৃত্তের উপরিভাগে একটি করে সংকেত-সিঙা স্থাপিত রয়েছে। আবর্তের সঙ্গে সঙ্গে এই সিঙাটি যেমন আবর্তিত হতে থাকে, তেমনি এ-সিঙা থেকে একটি নির্দিষ্ট খাতের শব্দ সর্বদা ধ্বনিত হতে থাকে। প্রত্যেক বৃত্তের সিঙা একই খাতের ধ্বনি সৃষ্টি করে। ফলে আটটি বৃত্তের ধ্বনিতে একটি শব্দরাগের সৃষ্টি হয়। বৃত্তের পরিক্রমপথে প্রায় সম-দূরত্বে আসীন রয়েছে তিনটি মূর্তি। প্রত্যেকেই তারা একটি করে সিংহাসনে উপবিষ্ট। এরা তিনজন হচ্ছেন তিন ভাগ্যদেবী। অনিবার্যতার তিন কন্যা : ল্যাচেসিস, ক্লথো এবং এ্যারোপস। শুভ্র বসনে তাঁরা ভূষিত। শিরে তাঁদের পুষ্পমাল্য। সিঙার ধ্বনির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে তাঁরা সঙ্গীত সৃষ্টি করে চলেছেন। ল্যাচেসিসের সঙ্গীতের ধুয়া হচ্ছে অতীত, ক্লথোর বর্তমান, এ্যারোপসের ভবিষ্যৎ। অভিযাত্রী আত্মার দল দেখতে পেল, মাঝে মাঝে ক্লথো চক্রের সবচেয়ে বাইরের বাহুটি আকর্ষণ করে তাতে গতির সঞ্চার করে দিচ্ছেন। এ্যারোপও তাঁর বাম হাত দিয়ে অন্তর্বাহুটি ঘুরিয়ে দিচ্ছেন এবং ল্যাচেসিস পর্যায়ক্রমে তাঁর বাম এবং ডান হাত দ্বারা অন্তঃ এবং বহির্বাহুগুলিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন।
এই স্থানটিতে পৌঁছে আত্মার দল সোজা ল্যাচেসিসের সম্মুখে হাজির হল। এবার একজন দোভাষী তাদের সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে দিল এবং ল্যাচেসিসের ক্রোড় থেকে কতগুলি ভাগ্যের সংখ্যা এবং জীবনের প্রকার তুলে নিয়ে একটি উচ্চ মঞ্চে আরোহণ করে ঘোষণা করতে শুরু করল : “হে আত্মার দল! তোমরা অনিবার্যতার কন্যা ল্যাচেসিসের আদেশ শ্রবণ করো। মর্ত্যের মরণশীল জীবনের দ্বিতীয় পরিক্রম তোমাদের এবার শুরু করতে হবে। তোমাদের জন্য পথপ্রদর্শক কোনো ভাগ্যদূতকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে না। তোমাদের ভাগ্য তোমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। জীবনের সংখ্যা ছুড়ে দেওয়া হবে। যে-আত্মা ভাগ্যের যে-সংখ্যা তুলে নেবে, সেই সংখ্যার জীবনই তার গ্রহণ করতে হবে। উত্তম বা ধর্মের জন্য খবরদারির আবশ্যকতা নেই। তোমরা তাকে যে যেমনভাবে গণ্য করবে, সে তাকে তেমনভাবে লাভ করবে। এজন্য বিধাতাকে দায়ী করার কোনো অধিকার তোমাদের থাকবে না। আপন ভাগ্যনির্ধারণের দায়িত্ব আত্মার নিজের।” এই ঘোষণা পাঠ করে অনিবার্যতার কন্যা ল্যাচেসিসের ভাষ্যকার জীবনের সংখ্যার কড়ি ছুড়ে দিল এবং আত্মার দলের যার নিকটে যে-সংখ্যা এসে পড়ল সে তাকে তুলে নিল। এদের একমাত্র ব্যতিক্রম হিসাবে রইল এর। এর কোনো জীবনের সংখ্যা কুড়িয়ে নিল না। কারণ, তার জন্য সংখ্যাগ্রহণ ছিল নিষিদ্ধ। জীবনের সংখ্যা কুড়ানো হলে আত্মারা বুঝতে পারল, কার ভাগ্যে কোন্ জীবন নির্দিষ্ট হয়েছে। এবার ভাষ্যকার সমবেত আত্মাদের যা সংখ্যা তার চেয়ে অধিক জীবনের প্রকার তাদের সম্মুখে রেখে দিল। কল্পনীয় সমস্ত প্রকার জীবনই এদের মধ্যে ছিল। পশুর জীবন এবং মানুষের জীবন—কোনো জীবনই এই জীবন-সম্মেলনের বাইরে ছিল না। সমস্ত আয়ুষ্কালব্যাপী যে-জীবন স্বৈরতান্ত্রিক, তাও যেমন এখানে ছিল, তেমনি ছিল স্বৈরতান্ত্রিক সে-জীবনও যার মধ্যপথে পতন ঘটে এবং যার সমাপ্তি ঘটে দারিদ্র্যে, নির্বাসনে কিংবা ভিক্ষাবৃত্তিতে। দেহের শোভায় মনোহর কিংবা শারীরক্রীড়ায় পারদর্শী কিংবা সুজাত বা অভিজাত পরিবারের সম্পর্কে সম্পর্কিত জীবনের নমুনারও অভাব ছিল না। এবং এরূপ কোনো সুনামের অধিকারী নয়, তেমন জীবনও ছিল। বাজির সংখ্যায় কোন্ আত্মার কী জীবন তা চিহ্নিত ছিল। তাই জীবনের এই বৈচিত্র্যের সমাবেশ থেকে নির্বাচন করার কোনো স্বাধীনতা কোনো আত্মারই ছিল না। বাজির সংখ্যাতে চিহ্নিত জীবনই প্রত্যেককে স্বীকার করে নিতে হবে। জীবনের সমাবেশ থেকে যার যে-জীবন, সেই জীবনই তাকে বরণ করে নিতে হবে। কিন্তু দারিদ্র্য এবং সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রত্যেক জীবনেই মিশ্রিত ছিল।
প্রিয় গ্লকন, এবার তা হলে সেই সংকটমুহূর্তটি সমাগত। কারণ, এখানে আমাদের সবকিছুই বিপন্ন। এ-কারণেই আমাদের প্রথম চিন্তা জ্ঞানের নয়। জ্ঞানের প্রকারের প্রশ্ন পরিত্যাগ করে আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে এমন জ্ঞানের সন্ধান করা, যে-জ্ঞান আমাদের উত্তম এবং অধমের পার্থক্য-নির্ধারণে সাহায্য করবে এবং আমাদের সাধ্যমতো উত্তমের নির্বাচনে আমাদের সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে আমরা যা বলেছি সবকিছুই আমাদের বিবেচনা করা আবশ্যক। আমাদের যুক্তিকে সামগ্রিকভাবে যেমন দেখতে হবে, তেমনি তাকে বিশ্লেষণ করেও দেখতে হবে। সেই বিবেচনায় আমরা দেখতে পাব, উত্তম জীবনের উপর এর কি প্রভাব; দেখতে পাব, দেহের মনোহর দৃশ্য যখন দারিদ্র্য কিংবা সম্পদ কিংবা অন্যপ্রকার চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সে উত্তমের উপর বাঞ্ছিত কিংবা অবাঞ্ছিত কোন্ প্রভাবের সৃষ্টি করে কিংবা জন্মের ভেদ, আভিজাত্য, শক্তি, দুর্বলতা, চাতুর্য বা মূর্খতা—এবং অপর সকল সহজাত কিংবা অর্জিত গুণের কোটির প্রভাব উত্তমের জীবনে কী? এইসব বিষয়ে যদি আমরা বিবেচনা করি এবং আমরা যদি স্মরণ রাখি আত্মার গঠনটি কী, তা হলেই মাত্র আমাদের পক্ষে অধম থেকে উত্তমকে পৃথক করা সম্ভব হবে এবং তখনই আমরা যে-জীবন আমাদের অধিকতর অধম করে তোলে, যে আমাদের অধিকতর অন্যায়ী করে তোলে, তাকে অধিকতর অধম এবং যে আমাদের অধিকতর ন্যায়বান করে তোলে, তাকে অধিকতর উত্তম বলে অভিহিত করতে পারব। এর বাইরে কোনো বস্তু আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। আর সবকিছুকেই আমরা ছেড়ে দিতে পারি। কারণ, এই জ্ঞানে আমরা এবার সমৃদ্ধ যে, জীবিত কিংবা মৃত—উভয়ের জন্য সর্বোত্তম জীবন হচ্ছে এই জীবন। পরলোকে যখন আমরা প্রবশ করতে উদ্যত হব, এই বিশ্বাসে তখন আমাদের অবিচল থাকতে হবে। অবিচল থাকতে হবে, যেননা সম্পদ কিংবা অপর কোনো দুষ্টশক্তির আকর্ষণ আমাদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়; যেন স্বৈরতান্ত্রিক কিংবা অপর দুষ্কর্মের নায়কের জীবনে পতিত হয়ে আমরাও সেই দুষ্কর্মের কারক হয়ে না দাঁড়াই এবং অধিকতর দুর্ভোগের ভোগী না হই। উত্তমের বিশ্বাসে আমাদের অবিচল থাকতে হবে, যেন আমরা চরমের বদলে মধ্যমকে জীবনের সঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করতে পারি এবং ইহলোকে কিংবা পরলোকে সাধ্যমতো যেন উভয় দিকের চরমকে আমরা পরিহার করতে পারি। কারণ এই পথই মানুষের সুখের একমাত্র নিশ্চিত পথ।
সে যাহোক, এসো আমরা এরের কাহিনীতে ফিরে যাই! এর বলতে লাগল : “ভাষ্যকার এবার আত্মাদের উদ্দেশ করে বলল : যে-আত্মা সকলের শেষে এসে উপস্থিত হয়েছে তারও চিন্তার কোনো কারণ নেই। সে যদি তার বিচারে এবং জীবন নির্বাচনে বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারে তা হলে সেও এমন জীবনলাভের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে, যে-জীবনে সে সুখী হতে পারবে। কাজেই সবার প্রথমে যে নির্বাচন করেছে তার অধৈর্য হওয়ার কারণ নেই; সুচিন্তিতভাবে নির্বাচন করুক সে তার জীবনকে এবং যে নির্বাচন করছে সবার শেষে তারও হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।”* ভাষ্যকারের এ-বাণী সমাপ্ত হলে যে-আত্মা বাজির সংখ্যা সবার প্রথমে গ্রহণ করেছিল, সে এবার তার জীবনকে বাছাই করে নিল। কিন্তু কী আশ্চর্য, ত্বরিত সে বাছাই করে নিল সর্বাধিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের এক জীবনকে। নিজের মূর্খতা, লোভ এবং ব্যগ্রতায় সে পরিপূর্ণরূপে বিচার করে দেখল না, কোন্ জীবনকে সে গ্রহণ করছে। তাই সে উপলব্ধি করতে পারল না, নিয়তির নির্দেশে এই জীবনে তাকে নিজের সন্তানকে ভক্ষণ করতে হবে এবং অনুরূপ বহু অবর্ণনীয় আতঙ্ককে তার ভোগ করতে হবে। ‘কিন্তু সিদ্ধান্তের পরে অবসর-মুহূর্তে যখন সে চিন্তা করে দেখল, কী জীবনকে সে নির্বাচিত করেছে, তখন সে নিজের মূর্খতার জন্য অনুতাপে বিদ্ধ হতে লাগল। নিজের বক্ষে সে করাঘাত হানতে শুরু করল। অথচ এ-দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী অপর কেউ নয়। সে বিস্মৃত হয়েছিল ভাষ্যকারের সতর্কবাণী। ভাষ্যকার বলেছিল, প্রত্যেক আত্মাই তার নিজভাগ্যের নিয়ামক কাজেই নিজের ভাগ্যের জন্য ভাগ্যের দেবতা কিংবা স্বর্গ কিংবা অপর কাউকে দায়ী করা অর্থহীন। বস্তুত, স্বৈরতন্ত্র নির্বাচনকারী এই আত্মার আগমন ঘটেছিল স্বর্গ থেকে, বিগত জীবন যে যাপন করেছে একটি সুশাসিত রাষ্ট্রে। নির্বিঘ্ন ছিল সে-জীবন। তার যা-কিছু মহত্ত্ব, সে-মহত্ত্ব অর্জন করেছিল সে জ্ঞানের মাধ্যমে নয়, অর্জন করেছিল অভ্যাস এবং প্রথার মাধ্যমে। সে-কারণেই নূতন জীবন-নির্বাচনে তার এই অজ্ঞতা। কেবল এই আত্মাই নয়; যারাই এসেছিল স্বৰ্গ থেকে তারা দুঃখের পরীক্ষায় পরীক্ষিত না হওয়ার কারণে এই আত্মার মতোই নূতন জীবনের নির্বাচনে ভ্রান্তির দুর্ভোগে নিপতিত হল। কিন্তু যে-আত্মাদের আগমন ঘটেছিল পৃথিবী থেকে, যারা নিজেরা সকল দুর্ভোগকে ভোগ করেছে এবং অপরকে দুর্ভোগ ভোগ করতে দেখেছে এবং নূতন জীবনের নির্বাচনে যারা চিন্তার পরিচয় দিল, ব্যগ্রতার নয়, তাদের নির্বাচন তাদের জন্য মঙ্গলকর হল। এ-কারণেই স্বর্গ এবং মর্ত্যের আত্মার নির্বাচনে কেউ যেমন অমঙ্গলের বদলে মঙ্গলকে নির্বাচন করতে সক্ষম হল, তেমনি আবার কারও ভাগ্যে জুটল মঙ্গলের পরিবর্তে অমঙ্গল। তাই এরের কাহিনী সত্য হলে আমরা বলতে পারি, মর্ত্যে যে-আত্মা বিশ্বস্ততার সঙ্গে জ্ঞানকে অন্বেষণ করে এবং যার বাজির সংখ্যা সর্বশেষ সংখ্যা নয়, স্বর্গ মর্ত্যের মধ্যভূমিতে নূতন জীবনের নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার চিন্তার কোনো কারণ নেই। সে যেমন ইহলোকে সুখী জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে, তেমনি ইহলোক থেকে পরলোকের যাত্রা তার সুগম হবে এবং পুনরায় যখন সে মর্ত্যে প্রত্যাবর্তন করবে, তখনও তাকে কঙ্কর-আচ্ছাদিত পথ ধরে প্রত্যাবর্তন করতে হবে না। সে প্রত্যাবর্তন করবে স্বর্গের মসৃণ সড়ক ধরে।
[* কাহিনীটিতে কিছু পরস্পরবিরোধিতা আছে। পূর্বে বলা হয়েছে, জীবন-নির্বাচনে আত্মার কোনো স্বাধীনতা ছিল না। বাজির সংখ্যানুযায়ী জীবনগ্রহণে তারা বাধ্য। কিন্তু এখানে আবার বলা হচ্ছে, আত্মা যদি জীবন-নির্বাচনে বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারে, তা হলে সে সুখী জীবনলাভ করতে পারবে। অর্থাৎ আত্মার জীবন-নির্বাচনে স্বাধীনতা আছে।]
মর্ত্যের মানুষের কাছে পরলোকের বর্ণনা করে এর বলতে লাগল : আত্মাদের পক্ষে জীবন-নির্বাচনের পর্বটি যথার্থই দেখার মতো একটি পর্ব ছিল। এ-দৃশ্য যেমন তার মনে করুণার উদ্রেক করেছে, তেমনি তার মধ্যে হাস্য এবং বিস্ময়েরও সৃষ্টি করেছে। আত্মাদের ক্ষেত্রে দেখা গেল, আত্মারা প্রধানত তাদের পূর্বজীবনের অভ্যাসকেই অনুসরণ করল। তাই এর দেখল, যে-আত্মা তার বিগত জীবনে ছিল অরফিউস, সে বেছে নিল একটি হংসবলাকার জীবন। নারীর গর্ভ থেকে জাত হতে সে অস্বীকার করল। কারণ, এই নারীর হাতেই তার মৃত্যু ঘটেছিল। নারী এখন তার ঘৃণার পাত্র। আবার থামিরিসের আত্মা বেছে নিল একটি বুলবুল পাখির জীবন। কিন্তু এর দেখল, বলাকা এবং সঙ্গীতপ্রিয় পাখিরা বেছে নিল মানুষের জীবন। জীবনবাছাই-এর ক্ষেত্রে বিংশতি আত্মা বেছে নিল সিংহের জীবন। দেখা গেল, এ হচ্ছে টেলামনের পুত্র এ্যাজাক্সের আত্মা। এ্যাজাক্সের আত্মার অস্ত্রের ঝনঝনানির অভিজ্ঞতা কম ছিল না। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই মানুষের জীবনগ্রহণে তার অনিচ্ছা। এর পরে এল আগামেমননের আত্মা। আগামেমননের আত্মাও তার পূর্বজীবনের অভিজ্ঞতার কারণে মানুষের জীবনকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে এবং সে বাছাই করে নিল ঈগলপাখির জীবন। প্রায় মধ্যবর্তী সময়ে এল আটালান্টার আত্মার নির্বাচনপর্ব। ক্রীড়াবিদদের জীবনের বিপুল সম্মানের আকর্ষণ তার নিকট অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়াল। ফলে আটালান্টার আত্মা বেছে নিল ক্রীড়াবিদের জীবন। এর দেখল আটালান্টার পরে এল প্যানোপিউসের পুত্র এপিউসের আত্মা। এপিউসের আত্মা ইতিমধ্যেই একজন দক্ষ নারী-কারিগরে পরিণত হয়ে গেছে। এপিউসের পরে এল ভাঁড় থারসাইটিসের আত্মা। দেখা গেল, থারসাইটিসের আত্মা গ্রহণ করেছে একটি বানরের আকৃতি। সব আত্মারই যখন নির্বাচনপূর্ব সমাপ্ত হয়ে গেল, তখন সবার শেষে এল বীর অডিসিউসের আত্মা। একদিন তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার শেষ ছিল না। কিন্তু বিগত জীবনের অভিজ্ঞতা সকল উচ্চাকাঙ্ক্ষার মোহ থেকে তাকে মুক্ত করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে অডিশিউসের আত্মা চিন্তা করল : কোন্ জীবনকে সে গ্রহণ করবে। সে চারদিকে সন্ধান করতে লাগল একজন সাধারণ মানুষের জীবনকে। বহু অনুসন্ধানের পরে সে দেখতে পেল, সাধারণ মানুষের জীবন একপ্রান্তে অপর সকলের দ্বারা অবজ্ঞাত হয়ে পড়ে আছে। সেই অবজ্ঞাত সাধারণ জীবনকেই বীর অডিসিউসের আত্মা পরম আনন্দে বরণ করে নিল এবং ঘোষণা করল : তার ভাগ্যের সংখ্যা যদি সর্বপ্রথমে ও নিক্ষিপ্ত হত, তা হলেও এই জীবনকেই সে নিঃসন্দেহে বেছে নিত। এভাবে সেখানে বহু জীবনেরই পরিবর্তন ঘটে গেল : পশুর জীবন মানুষের জীবনে, এক পশুর জীবন অপর পশুর জীবনে, বিগত জীবনের অন্যায়কারীর জীবন হিংস পশুর জীবনে এবং ন্যায়বানের জীবন বাধ্য অপর একটি জীবনে পরিবর্তিত হয়ে গেল।
সকল আত্মার জীবন-নির্বাচনের পর্ব সমাপ্ত হলে আত্মার দল তাদের বাজির সংখ্যার ধারাক্রমে এবার দল বেঁধে একের পর এক ল্যাচেসিসের সম্মুখে উপস্থিত হল। ল্যাচেসিস এবার প্রত্যেক আত্মার নির্বাচিত পথপ্রদর্শক দেবদূতকে আত্মাদের জীবনের পথ প্রদর্শনের আদেশ দিলেন। সেই আদেশক্রমে দেবদূত আত্মাকে প্রথম নিয়ে চলল ক্লথোর নিকট। এভাবে দেবদূত আত্মাকে ক্লথোর পরিচালিত চক্রের আবর্তের মধ্যে আনয়ন করে তাদের নির্বাচিত ভাগ্যকে সুনির্দিষ্ট করে দিল। এই কার্য সমাধা করে দেবদূত ক্লথোকে অভিবাদন জানিয়ে আত্মাকে নিয়ে চলল চক্রের নিরলস চালনাকারী এ্যাটরোপস্-এর নিকট এ্যারোপস্ এবার নিয়তির সূত্রে আবদ্ধ করে আত্মার নির্বাচিত জীবনকে অপরবর্তনীয় করে দিলেন। এই পর্বের পরে সকল আত্মা এবার পশ্চাৎদিকে কোনো দৃষ্টিনিক্ষেপ না করে অনিবার্যতার সিংহাসনের সম্মুখে এসে সমবেত হল। অনিবার্যতার সিংহাসনের সম্মুখদিক দিয়ে পর্যায়ক্রমে সকল আত্মা অগ্রসর হয়ে সমবেত হল বৃক্ষ-লতা-গুল্মশূন্য লেথির সমতলভূমিতে। এখানে পৌঁছার পূর্বে তাদের অতিক্রম করতে হল এক দুঃসহ শ্বাসরুদ্ধকর তাপের তেজকে।
অপরাহ্ণে সকলে এসে শিবির স্থাপন করল বিস্মৃতির নদীতটে। বিস্মৃতির নদীর পানিকে কোনো পাত্রেই ধারণ করা চলে না। নিয়তির নির্দেশে সকল আত্মাকেই পান করতে হল এই বিস্মৃতির নদীর পানিকে। যারা বিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে রক্ষা করতে পারল না, তারা বিস্মৃতির নদীর পানি প্রয়োজনের চেয়ে অধিক পান করল। বিস্মৃতির নদীর পানি পান করার ফলে সকল আত্মাই পরলোকের সকল অভিজ্ঞতা বিস্মৃত হয়ে গেল। এবার সকল আত্মা নিদ্ৰামগ্ন হল। কিন্তু মধ্যরাত্রি যখন আগত, তখন ভূমির কম্পন শুরু হল এবং বজ্র নির্ঘোষিত হল এবং বিচ্ছুরিত তারকার মতো এক বিপুল উৎক্ষেপণে সকল আত্মা পরলোক থেকে উৎক্ষিপ্ত হল ইহলোকে। মর্ত্যলোকে আবার ঘটল তাদের নতুন অস্তিত্বের জন্ম। বিস্মৃতির নদীর পানি পান করা এরের জন্য ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু এরও বলতে পারেনি, কেমন করে কোন উপায়ে সে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হল তার মৃতদেহের মধ্যে। তার এ-ই মাত্র স্মরণ আছে, হঠাৎ সে জীবন ফিরে পেল। তার চক্ষু উন্মীলিত হল। এবং সে দেখতে পেল প্রত্যুষ হয়ে আসছে এবং সে শায়িত রয়েছে তার সমাধিশয্যায়।
প্রিয় গ্লকন, এভাবেই এরের অভিজ্ঞতা রক্ষা পেল বিনষ্টি এবং বিস্মৃতির হাত থেকে। এবং আমরাও যদি এ-কাহিনীকে বিস্মৃত না হই তা হলে এই কাহিনীর শিক্ষা আমাদেরও রক্ষা করবে এবং আমাদের আত্মাকে কলঙ্কিত না করে অক্লেশে আমরা অতিক্রম করতে সক্ষম হব পরলোকের পথে লেথির সেই নদীকে। কাজেই আমার কথা হচ্ছে : অমরতায় বিশ্বাস স্থাপন করাই আমাদের পক্ষে সঙ্গত। আত্মা সকল মঙ্গল এবং অমঙ্গলকে অতিক্রম করতে সক্ষম। আত্মাই আমাদের পথপ্রদর্শক। আত্মাই আমাদের দৃঢ় পদক্ষেপে নিয়ত অগ্রসর করে নিয়ে যায় সম্মুখপানে, এবং ঊর্ধ্বপানে। ন্যায় এবং জ্ঞানের সাধনায় আত্মাই আমাদের উদ্দীপিত করে। আত্মার অমরতায় বিশ্বাস ইহলোকে এবং পরলোকে আমাদের মনে শান্তিস্থাপন করবে। বিধাতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে দৃঢ় করবে। এবং ক্রীড়াশেষে বিজয়ীর ন্যায় সম্মানের শিরোপাসংগ্রহ যখন আমাদের এ-জীবনে সমাপ্ত হবে এবং পরলোকের সহস্র বর্ষের দীর্ঘ যাত্রা যখন আমাদের শুরু হবে, তখন উদ্বেগহীন চিত্তে সে-যাত্রায় পদক্ষেপ করতে আমরা সক্ষম হব।
সমাপ্ত
