Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    সরদার ফজলুল করিম এক পাতা গল্প669 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ২৪. কে সুখী? ন্যায়বান, না অন্যায়কারী?

    অধ্যায় : ২৪ [৫৭১–৫৯১]

    কে সুখী? ন্যায়বান, না অন্যায়কারী?

    ‘রিপাবলিক’-এর আলোচনা বহুদূর অগ্রসর হয়েছে। এই অগ্রগতির ধারাটি সংক্ষেপে উল্লেখ করে আমরা বলতে পারি, সক্রেটিসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল : ন্যায় কী? এর জবাবের জন্য ন্যায়কে বৃহৎ আকারে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র রচনা করা হয়েছে। এবং সেই ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রে শাসনের যে-নীতি তা-ই হচ্ছে ন্যায়। সে হচ্ছে সঙ্গতির নীতি। সঙ্গতিসম্পন্ন সেই রাষ্ট্র হচ্ছে আদর্শ রাষ্ট্র। দার্শনিক বা জ্ঞানীর শাসনে শাসিত রাষ্ট্র। এই সঙ্গতির নীতির লংঘনে সকল ব্যত্যয় বা বিচ্যুতির সৃষ্টি। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আদর্শ রাষ্ট্র থেকে এই বিচ্যুতিরও বর্ণনা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই বিচ্যুতির প্রকাশ ঘটে উচ্চাভিলাষতন্ত্রে, কতিপয়তন্ত্রে, গণতন্ত্রে এবং স্বৈরতন্ত্রে। এদের প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্যের ধারক-চরিত্রও সক্রেটিস বর্ণনা করেছেন।

    সক্রেটিস মনে করছেন তাঁর কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। একমাত্র অবশিষ্ট রয়েছে গ্র্যাসিমেকাসের সেই দাবির একটি জবাব, যে-দাবিতে থ্র্যাসিমেকাস বলেছিলেন : ‘অন্যায়কারী হচ্ছে সুখী।’ সক্রেটিস এ-অভিমত অস্বীকার করেছেন। কিন্তু কেবল অস্বীকার করা যথেষ্ট নয়। তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, অন্যায়কারী যত শক্তিমান কিংবা যথেচ্ছাচারী এবং স্বাধীন হোক-না কেন, অন্যায়কারী সুখী নয়। সুখী হচ্ছে ন্যায়বান।

    রাষ্ট্র-অনুরূপ চরিত্রচিত্রণের উদ্দেশ্যও ছিল সক্রেটিসের এটি। অর্থাৎ জ্ঞান, বিক্রম এবং প্রবৃত্তি—এদের প্রাধান্যের ভিত্তিতে এক-একটি চরিত্র কী হতে পারে, তা সক্রেটিস বর্ণনা করেছেন। যে-ধারাক্রমে প্লেটো অসম্পূর্ণ রাষ্ট্রগুলিকে বর্ননা করেছেন সে-ধারাক্রম কোনো ঐতিহাসিক ক্রম নয়। এটি প্লেটোর কাছে একটি যুক্তিগত এবং নিকৃষ্টতার দিক থেকে বলা চলে, পরিমাণগত ক্রম। প্লেটোর মতে উচ্চাভিলাষতন্ত্র (ইংরেজি অনুবাদে ‘টিমোক্রাসি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়) হচ্ছে আদর্শ রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিকটবর্তী। কাজেই নিকৃষ্টতার দিক থেকে এই ধরনের রাষ্ট্র সবচেয়ে কম নিকৃষ্ট। তার পরে আসে কতিপয়তন্ত্র। তার চেয়েও নিকৃষ্ট গণতন্ত্র। এবং নিকৃষ্টতম হচ্ছে স্বৈরতন্ত্র। সুখের ক্ষেত্রেও এই ক্রমটি অনুসরণ করেই সক্রেটিস প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের প্রতিভূ-চরিত্রকেও সৃষ্টি করেছেন। সক্রেটিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রত্যেকটি চরিত্রকে তার পূর্ণ বিকাশের ভিত্তিতে রূপায়িত করা। তা হলেই মাত্রা কে কী পরিমাণ সুখী কিংবা অসুখী তা স্থির করা সহজ হবে।

    সুখ-অসুখের দুই প্রান্তে দুটি চরিত্র। এক প্রান্তে রয়েছে দার্শনিক-শাসকের চরিত্র। অপর প্রান্তে রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিকের চরিত্র। একটির বিপরীত অপরটি। একজন সুখী, অপরজন অসুখী। একথা প্রমাণের জন্য প্লেটো তিনটি যুক্তির অবতারণা করেছেন।

    ১. স্বাধীনতার সম্পদ এবং সাহস—যেদিক থেকেই দেখা যাক, যে-চরিত্র প্রবৃত্তির দাস সে-চরিত্রই সর্বাধিক অসুখী। তার যথেচ্ছাচারকে অপাতদৃষ্টিতে স্বাধীনতা বলে বোধ হলেও স্বেচ্ছাচারী যথার্থভাবে স্বাধীন নয়। কারণ, যথার্থ স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে মানুষের মঙ্গলের জন্য আত্মা যা করা সঙ্গত বোধ করবে তা করার স্বাধীনতা। কিন্তু স্বৈরাচারীর এই স্বাধীনতা নেই। সে যা করে, তা সে করতে বাধ্য। তা না করার তার স্বাধীনতা নেই। রাষ্ট্রের সকল জ্ঞানীগুণীকে সে হত্যা করে। হত্যা করতে সে বাধ্য। কারণ, নিষ্পেষিত দাস-পরিবেষ্টিত প্রভুর ন্যায় সর্বদা শাসিতের বিদ্রোহের আশঙ্কায় সে ভীত। সে তার জনক, অর্থাৎ জনতাকে হত্যা করে। তাকে হত্যা করতে সে বাধ্য। কারণ, জনক পুত্রের বর্বরতার প্রতিরোধ করে বলতে পারে : ‘তুমি আমার কুপুত্র।’ তা-ই জনকের ভয়ে সে ভীত আপাতদৃষ্টিতে স্বৈরশাসক যেমন ইচ্ছা তেমন করতে পারে। তার অবাধ স্বাধীনতা। আসলে সে যা করে, গত্যন্তরহীন বলেই সে তা করে। “যে-আত্মা স্বৈরাচারের দাস সে তা-ই উন্মত্ততা, বিভ্রান্তি এবং অনুতাপের হাতে অসহায়।” এবং যার আকাঙ্ক্ষার কোনো শেষ নেই, তার পক্ষে কোনো সম্পদই যথেষ্ট নয়। কাজেই স্বৈরাচারীকে সম্পদেও সম্পদবান বলা চলে না।

    ২. অভিজ্ঞতার সুখের পরিমাণের ক্ষেত্রে দার্শনিক এবং স্বৈরাচারী অর্থাৎ ন্যায় এবং অন্যায়কে তুলনা করলে আমাদের বলতে হয়, দার্শনিকই অধিক সুখী। কারণ, আত্মার যে-তিনটি উপাদানের উল্লেখ করা হয়েছে—অর্থাৎ সম্পদ, সম্মান এবং জ্ঞান তার সবটারই অভিজ্ঞতা দার্শনিকের আছে। দার্শনিকের স্বাভাবিক সম্পদের অভিজ্ঞতা আছে——যেমন অপর দশজনার থাকে। দার্শনিকের সম্মানের অভিজ্ঞতা আছে—যেমন কৃতী ব্যক্তিমাত্রেরই থাকে। এবং তার জ্ঞানের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু আত্মার সকল উপাদানের অভিজ্ঞতা অপর কারও থাকা সম্ভব নয়।

    ৩. দার্শনিকমাত্রই জানে, সত্যকার সুখ এবং অসুখের মধ্যে পার্থক্য কী। অপরদিকে, দার্শনিক ব্যতীত অপর সকলে সুখকে মনে করে অসুখের অভাব এবং অসুখ হচ্ছে সুখের অভাব। আমরা আহার গ্রহণ করে তীব্র সুখ বোধ করি, কারণ ক্ষুধাজনিত যন্ত্রণার তখন আর অস্তিত্ব নেই। কাজেই বলা চলে ক্ষুধার অভাবেই ভুক্তের সুখ। কিন্তু এ হচ্ছে সুখের আপেক্ষিক বোধ। একের ভিত্তিতে অপরের অস্তিত্ব। এ অবশ্যই অলীক। কারণ, যথার্থ সুখ হবে অনন্যনির্ভর এবং দার্শনিকের আত্মার সুখই হচ্ছে অনন্যনির্ভর। স্বৈরাচারীর অনন্যনির্ভর বলে কিছু নেই। স্বৈরাচারী নিজেই নিজের প্রভু নয়। প্রবৃত্তিই হচ্ছে তার প্রভু। প্রবৃত্তিনির্ভর তার অস্তিত্ব। এ-কারণে যথার্থ সুখ থেকে স্বৈরাচারীর দূরত্ব সর্বাধিক। প্লেটোর ভাষায় : “যথার্থ সুখ থেকে স্বৈরতন্ত্রীর সুখের দূরত্ব অঙ্কের হিসাবে দাঁড়াচ্ছে তিনের তিন বা ৩ × ৩।” অথবা বলা চলে “দার্শনিক-শাসক স্বৈরতন্ত্রীর চেয়ে সাত শত ঊনত্রিশ গুণ অধিক সুখী এবং স্বৈরতন্ত্রী দার্শনিক-শাসকের চেয়ে সাত শত ঊনত্রিশ গুণ অধিক অসুখী।” [৫৮৭ ]

    *

    কিন্তু স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রের বর্ণনা আমাদের এখনও অবশিষ্ট আছে। গণতান্ত্রিক ব্যক্তি থেকে তার বিকাশ কেমন করে ঘটল এবং তার রূপটি কী এবং এমন ব্যক্তি সুখী না অসুখী তাও আমাদের জানা আবশ্যক।

    হ্যাঁ, এ-বিষয়টি এখনও বাকি আছে।

    এ ছাড়া অপর একটি বিষয়ও আমার করণীয় আছে।

    কী সে বিষয়?

    আমার মনে হয় না, প্রবৃত্তির শ্রেণীবিভাগটি আমরা সম্পূর্ণ করেছি। কিন্তু এ-কাজটি অসম্পূর্ণ রাখলে আমাদের অনুসন্ধানের লক্ষ্যটি অষ্পষ্ট রয়ে যাবে।

    কিন্তু এখন তুমি সে-কাজটি সমাধা করতে পার।

    হ্যাঁ, সে-কাজটি সমাধা করার কথাই আমি ভাবছি। আমার মনে হয় আমাদের এমন কতগুলি কামনা-বাসনা আছে যেগুলি অবৈধ। হয়ত এগুলি আমাদের সহজাত। এগুলি নিয়েই আমরা জন্মগ্রহণ করি। কিন্তু সামাজিক আইনকানুন, যুক্তি এবং উত্তম ইচ্ছা এগুলিকে ক্রমান্বয় এরূপ বাধ্য করে তোলে যে অনেকের চরিত্র থেকে এরা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় কিংবা থাকলেও বেশ দুর্বল হয়ে থাকে। কিন্তু অনেকের চরিত্রে এগুলির সংখ্যা এবং শক্তি অব্যাহতই থাকে।

    কিন্তু সক্রেটিস, কোন্ ইচ্ছার কথা বোঝাতে চাইছ?

    আমি সেই ইচ্ছাগুলির কথা বলছি, যেগুলি আমাদের স্বপ্নে দেখা দেয়। নিদ্রামগ্ন অবস্থায় আমাদের যুক্তি যখন সুপ্ত এবং মনুষ্যোচিত শক্তির নিয়ন্ত্রণ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে তখন আমাদের ভিতরের পশুশক্তি খাদ্য এবং পানীয়ে পূর্ণ হয়ে আমাদের দেহের মধ্যে জেগে ওঠে এবং ইচ্ছামত নিজেদের কামনাকে তৃপ্ত করার চেষ্টা করে। আমরা জানি, আমাদের এমন কামনার পক্ষে কোনোকিছুই অসম্ভব নয়। এদের মধ্যে সঙ্কোচ কিংবা লজ্জার কোনো অস্তিত্ব নেই। আর তা-ই এমন অবস্থায় এই কামনা জননী কিংবা অনুরূপ কারোর সঙ্গে, পুরুষ কিংবা পশু কিংবা দেবতা কারোর সঙ্গে দৈহিক মিলনে সঙ্কোচ বোধ করে না কিংবা নরহত্যা বা অপবিত্র কোনো কর্ম থেকে বিরত থাকার আবশ্যকতা বোধ করে না।

    এ-সম্পর্কে তোমার কথা খুবই সত্য, সক্রেটিস।

    কিন্তু যে-লোক চরিত্রবান, যার বিবেচনা সুস্থ এবং সুনিয়ন্ত্রিত, সে নিদ্রাগমনের পূর্বে তার যুক্তিকে জাগরিত করে। যুক্তিকে সে বুদ্ধি এবং সংলাপের অস্ত্রে সজ্জিত করে। তার কামনাকে সে যেমন প্রশ্রয় দেয়নি, তেমনি সে তাকে বুভুক্ষুও রাখেনি। কাজেই তার কামনা তার আত্মাকে অতৃপ্তি কিংবা ভোগ—কোনোকিছু দিয়েই আর উদ্ব্যস্ত করে তোলে না। তার কামনাও নিদ্রার সঙ্গে শান্ত এবং নিদ্রিত হয়ে পড়ে। আত্মা তখন নিরুদ্বেগে ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানের জ্ঞানের অন্বেষণে বহির্গত হতে পারে। তার চরিত্রের তৃতীয় শক্তিকেও সে শান্ত করতে সক্ষম হয়। আর তা-ই সে চরিত্রবান। সে যখন তার ক্ষুধা এবং প্রবৃত্তিকে শান্ত করে নিদ্রায় গমন করে তখন তার অন্তর-বোধ কোনো দুষ্কর্মের দুঃস্বপ্নে বিব্রত না হয়ে সত্য-অনুধাবনে ব্যাপৃত থাকতে সক্ষম হয়।

    হ্যাঁ, চরিত্রবানের ক্ষেত্রে এরূপই ঘটে।

    আমি জানি, আমরা প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছি। তবু যে-কথাটি আমি বলতে চাচ্ছি সে হচ্ছে এই, আমরা যে যতই সম্মানীয় বলে বোধ হই না কেন, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে ভয়ংকর পাশব এবং অর্থনৈতিক ইচ্ছার অস্তিত্ব রয়েছে। এগুলির প্রকাশ ঘটে প্রধানত স্বপ্নে। তোমার কী মনে হয় এ্যাডিম্যান্টাস? তুমি কি আমার সঙ্গে একমত?

    হ্যাঁ, সক্রেটিস, আমি তোমার সঙ্গে একমত।

    ঠিক আছে, তা হলে চলো আমরা আবার আমাদের গণতান্ত্রিক চরিত্রটির কাছে প্রত্যাবর্তন করি। তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, আমরা বলেছিলাম, গণতান্ত্রিক তরুণের জনক হচ্ছে সেই কতিপয়ী শাসক যার সমগ্র দৃষ্টি অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে নিবদ্ধ, যে হচ্ছে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃপণ এবং উপভোগ কিংবা বাহারের জন্য অপ্রয়োজনীয় ব্যায়ের ইচ্ছাকে যে প্রশ্রয় দিতে অনিচ্ছুক।

    হ্যাঁ, একথা আমার মনে আছে।

    কিন্তু পুত্র কালক্রমে যে-সঙ্গী জোটাল তাদের রুচি এবং ইচ্ছায় কোনো কার্পণ্য ছিল না। তারা যথেচ্ছাচারী। পিতার কার্পণ্য এবং নীচতা তাকে যথেচ্ছাচারের জগতে ঠেলে দেয়। কিন্তু একথা স্বীকার্য যে, গণতান্ত্রিক পুত্র তার সঙ্গীদের চেয়ে উত্তম চরিত্রের। আর এজন্যই সে উভয় দিককে রক্ষা করার চেষ্টা করে। কার্পণ্য কিংবা অমিতব্যয়—উভয়কে পরিহার করে সে উভয়ের মধ্যে একটা আপোস-স্থাপনের চেষ্টা করে। মোটকথা, কতিপয়ী থেকে গণতান্ত্রিক চরিত্রে তার রূপান্তর ঘটে

    হ্যাঁ, একথাও যথার্থ।

    আমি বললাম : বেশ, এবার মনে করো এ-পুত্রেরও কালক্রমে একটি পুত্র হল এবং তার পুত্রকে সে নিজের স্বভাবে পালন করে তুলল। মনে করো এই পুত্রের ক্ষেত্রেও তেমন ব্যাপারটি ঘটল যা তার পিতার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। তার সঙ্গীদল পুরো স্বাধীনতার নামে তাকে পুরো যথেচ্ছাচারের পথে নিয়ে গেল। তার পিতা এবং পরিবার যেখানে ছিল সংযম এবং মিতাচারের পক্ষে, তার সঙ্গীরা সেখানে তাকে নিয়ে গেল এর বিপরীত ক্ষেত্রে। কিন্তু তবু শেষ পর্যন্ত যখন তার সঙ্গী কুমন্ত্রকের দল তাকে বশে রাখা অসম্ভব বলে আশঙ্কিত হয়ে ওঠে, তখন তারা তার অলস ইচ্ছার বশকারী এক প্রভুকে তার উপর স্থাপিত করে। এই প্রভু তাকে তার অলস ইচ্ছার জগতে আবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে।

    তোমার এ-বর্ণনাটি এ-চরিত্রের সঠিক বর্ণনাই বটে।

    অলস ইচ্ছার দল মৌমাছির ন্যায় পালাক্রমে অষ্টপ্রহর পুত্রের কানের কাছে গুঞ্জন তুলতে থাকে। ইচ্ছার সুবাস, পুষ্প এবং সুরার উপঢৌকনে তাকে পূর্ণ এবং মোহিত করে তোলে এবং পরিশেষে তার অন্তরে এই ইচ্ছার হুল সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এবার তার প্রবৃত্তির প্রভু আর কোনো রাস মানে না। সে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তরুণের মনে এখনও যদি কোনো মহৎ ইচ্ছা, সঙ্কোচ বা উৎকৃষ্ট ধারণার অস্তিত্ব থেকে থাকে তবে তার সবকিছুকে এবার হত্যা করা হয় এবং তাদের স্থানে উন্মত্ততা অনধিকারীর আসন দখল করে নেয়।

    স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রের উদ্ভবের একটি পরিপূর্ণ বর্ণনাই তুমি উপস্থিত করেছ, সক্রেটিস।

    আর এ-কারণেই কামের প্রবৃত্তিকে কি আমরা এ-যাবৎ স্বৈরাচারী বলে আখ্যায়িত করিনি?

    হ্যাঁ, আমরা তা-ই করেছি।

    আর যে-মানুষ সুরাপানে মত্ত, তার চরিত্রেও কি আমরা স্বৈরাচারের লক্ষণ দেখিনে?

    হ্যাঁ।

    আর যে-উন্মাদের মন বল্গাহীন সে কল্পনা করে দেবতা এবং মানুষ সকলেরই সে সম্রাট। সকলকেই শাসনের জন্য সে উন্মুখ হয়ে ওঠে

    একথা যথার্থ।

    তা হলে সংক্ষেপে স্বৈরাচারীর সংজ্ঞা দিয়ে আমরা বলতে পারি, স্বৈরাচারী হচ্ছে সে যার চরিত্রে জন্মগত কিংবা অভ্যাসগতভাবে কিংবা উভয়ভাবে সুরার উন্মাদনা, লালসা এবং মত্ততার সংযোগ ঘটেছে।

    অবশ্যই।

    তার জন্মের কথা বলতে গেলে এ-পর্যন্তই যথেষ্ট। এবার তার জীবনযাত্রার দিকটিতে যাওয়া যাক। এ্যাডিম্যান্টাস তুমি এবার বলো, এমন চরিত্র কেমন করে জীবন ধারণ কর?ে

    বলার ভূমিকা তোমার,সক্রেটিস। তুমি বলো।

    বেশ। বস্তুত কোনো প্রবল প্রবৃত্তি যখন মানুষের মনকে সম্পূর্ণরূপে গ্ৰাস করে তখন তার জীবন পূর্ণ হয়ে ওঠে অবসর বিনোদনে, ভোজনউৎসবে, বন্ধু এবং বান্ধবী-মিলন —প্রভৃতি অনুষ্ঠানে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, তার জীবনে এসব অনিবার্য।

    শুধু তা-ই নয়, এ ছাড়াও নূতনতর প্রবল ইচ্ছার দল তার চরিত্রে জন্মলাভ করতে থাকে এবং তাদের তৃপ্তির দাবীকে অদমনীয় করে তোলে।

    হ্যাঁ, তারা তৃপ্তির দাবি তুলবে।

    ফলে তার যা-কিছু উপার্জন সবটাই ইচ্ছার তৃপ্তিতে ব্যায়িত হয়ে যাবে এবং তাকে ঋণগ্রহণ এবং মূলধন ব্যয়ের পথ অবলম্বন করতে হবে।

    হ্যাঁ, তাকে এই পথ অবলম্বন করতে হবে।

    কিন্তু ঋণ আর মূলধনেরও শেষ আছে। অর্থের সব উৎস যখন শেষ হয়ে যাবে তখন তার ইচ্ছার দল অতৃপ্তির কোলাহলে ফেটে পড়বে। তাদের কোলাহল তাকে উন্মাদ করে তুলবে। কিন্তু এই ইচ্ছার যে-উৎস, যে প্রভু, সে তাদের চেয়েও তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলবে লুণ্ঠন কিংবা প্রতারণা, যে-কোনো উপায়ে হোক অর্থ সংগ্রহের জন্য তাকে যত্রতত্র তাড়িত করতে থাকবে। তার ইচ্ছার প্রভুর হুকুম : যে-কোনো প্রকারে হোক, যেখান থেকে হোক তাকে অবশ্যই অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। অন্যথায় তার জীবন—যন্ত্রণা এবং বেদনায় বিদ্ধ হতে থাকবে।

    হ্যাঁ, তাকে অর্থ অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে।

    তার জীবনের ধারাটিই এরূপ। প্রত্যেক পরবর্তী ইচ্ছা তার পূর্ববর্তী ইচ্ছাকে অতিক্রম করে গেছে। পূর্ববর্তীর বিনিময়ে সে পরবর্তীকে গ্রহণ করেছে। আর তা-ই পিতামাতাকে এখন সে পূর্ববর্তী বলে পরিত্যাগ করেছে। পারিবারিক সম্পদে তার যে অংশ ছিল সে-অংশ সে নিঃশেষ করেছে এবং তাকে নিঃশেষ করে বাকি অংশকে ব্যয় করতে শুরু করেছে। কিন্তু পরিবারের অন্যরা যদি তাতে বাধা দান করে তবে সে তা দখলের জন্য নিশ্চয়ই প্রবঞ্চনা এবং প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করবে। ঠিক নয় কি?

    আমারও তা-ই মনে হয়।

    কিন্তু তাতেও যদি সে ব্যর্থ হয় তা হলে সে কি লুণ্ঠন এবং জোর প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকবে?

    না, আমার তা মনে হয় না।

    কিন্তু ধরো বৃদ্ধ পিতামাতা পুত্রের আক্রমণকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল। তারা তাকে বাধা দিল। তখন এই পুত্র কী করবে? তখন সে কি পিতামাতার সঙ্গেও স্বৈরাচারী ব্যবহার করবে না?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমি তো পুত্রের আক্রমণের বিরুদ্ধে বৃদ্ধ পিতামাতার এই প্রতিরোধের সাফল্যের কোনো সম্ভাবনা দেখিনে।

    তার মানে তুমি বলতে চাও, এই বর্বর পুত্র তার অসহায় মাতা এবং বৃদ্ধ পিতাকে, অর্থাৎ তার নিকটতম এবং প্রিয়তম জনকে আঘাত করতে দ্বিধা করবে না? এবং যদি সে পিতামাতার সঙ্গে একই গৃহে বাস করতে থাকে, তা হলে তার পিতামাতাকে তার সর্বশেষ উপপত্নী কিংবা তার বয়স্য প্রণয়ীর দাসদাসীতে পরিণত করবে? অথচ তার পিতামাতার উপর এসব লোকের কোনো অধিকার থাকতে পারে না।

    এ-পুত্র এরূপ ব্যবহার করবে। আমি যথার্থই তা-ই মনে করি।

    আহা, পিতার কী ভাগ্য। স্বেচ্ছাচারীকে সন্তান হিসেবে পাওয়া একটা ভাগ্যের কথা বটে!

    বলো, ভাগ্যের পরিহাস।

    কিন্তু পিতামাতার সম্পদেরও শেষ আছে। পুত্র তাকেও শেষ করেছে। অপরদিকে তার ইচ্ছার সংখ্যার বৃদ্ধি বই কমতি ঘটেনি। আর তা-ই এবার সে হয় অপরের ঘরে সিঁধ কাটতে শুরু করবে, নয়তো রাত্রে কোনো পথচারীর উপর হামলা করবে এবং মন্দিরের সম্পদ অপহরণ করবে। অপরদিকে এতদিনকার প্রতিষ্ঠিত ন্যায়-অন্যায়ের বিশ্বাস, যার ভিত্তিতে সে নিজে বর্ধিত হয়েছিল, সেসব বিশ্বাস শৃঙ্খলমুক্ত প্রবৃত্তির হাতে পরাভূত হয়ে স্থানচ্যুত হয়ে পড়বে। কারণ, যে-প্রবৃত্তি এতদিন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল তা এখন তার প্রবল প্রভুর আদেশে মুক্তি পেয়ে তার দেহরক্ষীতে পরিণত হয়েছে। যখন সে গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন এবং আইনের অনুগত এবং তার পিতার প্রভাবে ছিল, তখন এইসব কামনার পক্ষে কেবল স্বপ্নের মধ্যে জেগে ওঠাই সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রবৃত্তির প্রভুত্বে তার স্বপ্নের সত্তা পরিপূর্ণরূপে বাস্তবে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। এবার আর তার জীবনে কোনো নিয়ম-নিষেধের বালাই নেই। হত্যা, তা যতই ভয়ংকর হোক-না কেন—তা থেকেও আর সে নিবৃত্ত হবে না। তার প্রবৃত্তিই সকলরকম বিধিনিষেধহীন স্বৈরতান্ত্রিক প্রভু হয়ে তাকে শাসন করছে, যেমন করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসক একটা রাষ্ট্রকে শাসন করে। নিষিদ্ধ খাদ্যদ্রব্য, কিংবা নিষিদ্ধ ভয়ংকর কোনো কর্ম—কোনোকিছুতেই তার আর কোনো দ্বিধা নেই। দুপ্রবৃত্তির স্বার্থে যে-কোনো দুষ্কর্মে সে এবার প্রবৃত্ত হয়। এই দুষ্প্রবৃত্তির কতকগুলিকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে বাইরে থেকে। অপর যারা তার ভিতরে এতদিন বন্দি ছিল তারা এবার মুক্ত হয়েছে। এমন চরিত্রের জীবনধারণের এই বিবরণটি কি সঠিক নয়?

    হ্যাঁ, আমি তা-ই মনে করি।

    অবশ্য এমন চরিত্রের সংখ্যা যদি রাষ্ট্রে কম হয় এবং রাষ্ট্রের অধিকসংখ্যক লোক যদি আইনের অনুগত হয়, তা হলে এই দুষ্প্রবৃত্তির দলগুলিকে দেশত্যাগ করে অপর কোনো স্বৈরশাসকের কাঁধে ভর করতে হবে কিংবা যুদ্ধে ভাড়াটে সৈন্যের ভূমিকা পালন করতে হবে। আর রাষ্ট্রে যখন পূর্ণ শান্তি বিরাজ করে তখন এরা কতকগুলি ছোটখাটো দুষ্কর্মের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

    কীরকম দুষ্কর্মের কথা বলছ?

    এরা তখন চোর, পকেটমার, অপহরক, মন্দির-লুণ্ঠক ইত্যাদিতে পরিণত হয়। আবার মিথ্যাভাষণে পটু হলে এরা গুপ্তচর, মিথ্যাসাক্ষী এবং উৎকোচ গ্রহণকারীর বৃত্তি গ্রহণ করে।

    সক্রেটিস, তুমি এই দুষ্কর্মকে নগণ্য বলছ কি এই কারণে যে, এই দুষ্কৃতিকারীর সংখ্যা নগণ্য?

    আমি বললাম : এ্যাডিম্যান্টাস, ‘নগণ্য’ কথাটি অবশ্যই আপেক্ষিক। তবে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ কিংবা অকল্যাণের দিক থেকে এই অপরাধকে স্বৈরাচারের সীমানাভুক্ত বলতে পারিনে। বস্তুত এগুলি স্বৈরাচারীর দুষ্কর্ম থেকে বিরাটভাবে পৃথক। কিন্তু এই দুষ্কর্মকারী এবং তাদের অনুসারীদের সংখ্যা যখন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং যখন তারা নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, তখন জনতার অজ্ঞতাই স্বৈরাচারীকে সৃষ্টি করে। জনতা তাদের অজ্ঞতার মাধ্যমে এমন নেতাকে গ্রহণ করে, যার অন্তরে প্রবৃত্তির শাসন স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করেছে।

    হ্যাঁ, এরূপ লোকই স্বৈরতান্ত্রিক শাসক হওয়ার উপযুক্ত লোক।

    এবং জনতার প্রতি এর দৃষ্টিভঙ্গি কীরূপ হয়? জনতা যদি তার কাছে আত্মসমর্পণ করে, তা হলে তো ভালো কথা। কিন্তু যদি জনতা আত্মসমৰ্পণ না করে, তা হলে তার সাধ্য হলে সে সমগ্র রাষ্ট্রকে দণ্ডিত করবে—যেমন সে দণ্ডিত করেছিল তার পিতা এবং মাতাকে; এবং ক্রীটবাসীদের ভাষায়, তার যে, জন্মভুমি তাকে লালনপালন করেছে তাকেই এবার তার ভুঁইফোঁড় অনুসারীর দলের দাসত্ব করে তাদের পোষণ করতে হবে। এভাবেই এই স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রের সকল কামনা, বাসনা, ইচ্ছার পরিতৃপ্তি ঘটে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    এরূপ চরিত্র শাসনক্ষমতা লাভ করার পূর্বে ব্যক্তিগত জীবনে একইরূপ আচরণ করে থাকে। তার সঙ্গী হচ্ছে অন্ধ স্তাবকের দল যারা তার নিকট আত্মসমর্পণে সদাব্যগ্র। এদের স্বার্থসাধন হলে, স্বৈরাচারীর প্রতি বন্ধুত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে তারা দ্বিধা করে না। কিন্তু নিজেদের স্বার্থ সাধিত হওয়ার পরে তাদের পরিবর্তন ঘটে যায়।

    হ্যাঁ, তখন তাদের সুরের পরিবর্তন ঘটে।

    ফলে স্বৈরাচারীর জীবন অতিবাহিত হয় যথার্থ সুহৃদ ব্যতীত। কারণ যে স্বৈরাচারী সে হয় প্রভু হবে, নয় সে দাস হবে। সত্যিকার সৌহৃদ্য কিংবা স্বাধীনতা কাকে বলে তা সে জানে না।

    তোমার একথা যথার্থ।

    তা হলে এমন চরিত্রকে আমরা সঠিকভাবেই বিশ্বাসের অযোগ্য বলে অভিহিত করতে পারি। এবং আমাদের ন্যায়ের সংজ্ঞা যদি যথার্থ হয়ে থাকে তবে বলব, এই চরিত্রই হচ্ছে অন্যায়ের যথার্থ প্রতিমূর্তি।

    হ্যাঁ, এ অবশ্যই অন্যায়ের প্রতিমূর্তি।

    আমাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ হিসাবে বলতে পারি : নিকৃষ্টতম যে-চরিত্র সে বাস্তব জীবনেও সেরূপ আচরণই করে যেরূপ আচরণ কোনো কোনো মানুষ তাদের স্বপ্নের মধ্যে করে থাকে। স্বভাবগতভাবে যে স্বৈরতান্ত্রিক সে যখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতাদখলে সক্ষম হয় তখন এই ব্যাপারটিই ঘটে। এবং যত দীর্ঘদিন সে ক্ষমতায় আসীন থাকে, তার চরিত্র তত বেশি স্বৈরতান্ত্রিক হতে থাকে।

    এবার গ্লকন জবাব দিলেন : নিঃসন্দেহে একথা সত্য।

    তা হলে একথাও কি আমরা বলতে পারিনে যে, সর্ব-অধম যারা তারাই সবচেয়ে অসুখী? তা যদি হয়, তা হলে স্বৈরাচারীর ক্ষমতা যত অধিক দীর্ঘ এবং ব্যাপক হবে স্বৈরাচারী তত অধিক অসুখী হবে? লোকে যা-ই বলুক, আমরা তো একথাই বলব। ঠিক নয় কি?

    আমরা তা-ই বলব। স্বৈরাচারী তত অসুখী হবে।

    আর একথাও সত্য, স্বৈরাচারী-চরিত্র হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রতিভূ, গণতান্ত্রিক-চরিত্র গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতিভূ। শাসন এবং শাসনের অনুরূপ চরিত্র সম্পর্কে আমরা একথাই বলেছি।

    হ্যাঁ, একথা আমরা বলেছি।

    কাজেই উত্তমতা এবং সুখের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চরিত্রের সম্পর্ক বিভিন্ন প্রকার রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের অনুরূপই হবে?

    কে সুখী? স্বেরতান্ত্রিক রাষ্ট্র, না দার্শনিক-শাসকের রাষ্ট্র?

    হ্যাঁ, তা-ই হবে।

    তা হলে এসো, আমরা দেখি স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের রাষ্ট্র এবং দার্শনিক-শাসকের রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কটি কী!

    গ্লকন বললেন : এদের সম্পর্ক তো পরস্পরবিরোধী। একটি যেখানে সর্বোত্তম, অপরটি সেখানে সবচেয়ে অধম।

    হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই নয় যে, এদের কোটি কী! তাদের এ চরিত্র পরিষ্কার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সুখ এবং অসুখের ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্ত কী হবে? তুমি যে-কথা বলেছ, সে কথা কি এদের সুখ এবং অসুখ সম্পর্কেও সত্য? এ-প্রশ্নের জবাব স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের বর্তমান শক্তি এবং তার অনুসারীদের সংখ্যার প্রাবল্যে আতঙ্কিত হয়ে দেবার প্রয়োজন নেই। এ-প্রশ্নের জবাবে বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে বিচার করতে হবে। সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিচার করে প্রশ্নটির জবাব দিতে হবে।

    তোমার এ কথা যথার্থ। আর এটা তো পরিষ্কার যে, স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের রাষ্ট্রের চেয়ে অসুখী রাষ্ট্র আর হতে পারে না এবং দার্শনিক-শাসকের রাষ্ট্রের চেয়ে সুখী রাষ্ট্রও আর হতে পারে না।

    রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যেমন আমরা একথা বলেছি, রাষ্ট্রানুরূপ চরিত্রের ক্ষেত্রেও আমরা সেকথা বলব। যে সঠিক বিচারক, তাকে আপাতদৃশ্যকে অতিক্রম করে ব্যক্তির চরিত্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হবে। আর এ-কর্তব্যে স্বৈরতান্ত্রিকের জীবনের জাঁকজমক এবং তার পরিবেশের ঠাট দেখে ছোট শিশুর ন্যায় অভিভূত হলে তার চলবে না। এই পরিবেশকে বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে তাকে ভেদ করতে হবে। তা হলেই মাত্র সে প্রশ্নটির সম্যক বিচারে সক্ষম হবে এবং তখন তার মতামতকে আমরা অবশ্যই শ্রবণ করব। বিশেষ করে, সে যদি স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের সঙ্গে বাস করে থাকে, যদি সে স্বৈরতান্ত্রিকের নিজের গৃহে এবং পরিবারের মধ্যে তার আচরণকে প্রত্যক্ষভাবে দেখে থাকে, তবে তার অভিমতকে মূল্যবান বিবেচনা করব। কারণ, গৃহের মধ্যেই আমরা একটি চরিত্রকে তার সকল নাটকীয়তাশূন্য অবস্থায়, বলা চলে একেবারে নিঃব অবস্থায় অবলোকন করতে পারি। রাষ্ট্রীয় জীবনের সংকটের মোকাবেলাতেও এই চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্যটি প্রকট হয়ে আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। তা হলে আমরা কি আমাদের সন্ধানীকে অনুরোধ করব, যেন সে এই বিচারের ভিত্তিতে অপর সকলের সঙ্গে তুলনা করে স্বৈরতান্ত্রিকের জীবনের সুখ এবং অসুখের বিষয়টি স্থির করে?

    হ্যাঁ, এটি তার কাছে আমাদের সঙ্গত অনুরোধ।

    তা হলে এখন আমরা কী করব? আমরা কি ধরে নেব আমাদের মধ্যেই এমন লোক আছেন স্বৈরতান্ত্রিকের জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যাঁর আছে?* তেমন হলে তাঁর কাছ থেকেই আমরা আমাদের প্রশ্নের জবাব পেতে পারব।

    [* স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্লেটোর নিজেরই ছিল। সাইরাক্যুজ দ্বীপের স্বৈরশাসক ডায়োনিসিয়াস-প্রথম-এর দরবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্লেটো তাঁর প্রথম পর্যটনকালে (৩৮৮–৩৮৭ খ্রিঃ পূঃ) অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ডায়োনিসিয়াস-এর তরুণ পুত্রকে দার্শনিক-শাসকে পরিনত করারও তিনি চেষ্টা করেছিলেন।—কর্নফোর্ড : রিপাবলিক, পৃঃ ২৯৬।]

    হ্যাঁ, আমরা সেরূপ ধরতে পারি।

    তা হলে রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির চরিত্রের যে-সাদৃশ্যের উল্লেখ আমরা পূর্বে করেছি, সেই সাদৃশ্যের আলোকে ব্যক্তির চরিত্রের সুখ-অসুখের প্রশ্নটি কি আমরা আলোচনা করতে পারি?

    কিন্তু সক্রেটিস, কোন চরিত্রের সাদৃশ্যের কথা তুমি বলছ?

    রাষ্ট্রের কথাই প্রথম ধরো। স্বৈরতান্ত্রিক শাসিত যে-রাষ্ট্র সে-রাষ্ট্রকে কি আমরা যথার্থভাবে স্বাধীন বলব, না তাকে একটি দাসরাষ্ট্র বলে অভিহিত করব?

    সে পরিপূর্ণভাবে একটি দাসরাষ্ট্র।

    হ্যাঁ, কিন্তু এ-রাষ্ট্রে স্বাধীন নাগরিকও তো আছে?

    হ্যাঁ, তারাও আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা নগণ্য। এ-রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি যারা উত্তম ছিল তারাও সকল অধিকার হারিয়ে এখন হতভাগ্য দাসে পরিণত হয়েছে।

    বেশ। এবং ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রের অনুরূপ হয়, তা হলে ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য হবে। সেও আর তার আত্মার প্রভু নয়। কারণ, তার চরিত্রে যা-কিছু মহৎ উপাদান ছিল, সে উপাদান নিকৃষ্টতর প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়েছে।

    হ্যাঁ, ব্যক্তির চরিত্রের ক্ষেত্রে একথা সত্য।

    তা হলে এমন ব্যক্তির অবস্থা কি স্বাধীনতার অবস্থা, না দাসত্বের অবস্থা?

    তার অবস্থাও দাসত্বের অবস্থা।

    এবং যে-রাষ্ট্র স্বৈরাচারী শাসকের দাসে পরিণত হয়েছে তার পক্ষে স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে কোনো কার্যসম্পাদন করার ক্ষমতাও কি খুব সামান্য নয়?

    হ্যাঁ, তার সে-ক্ষমতা খুব সামান্যই

    ঠিক তেমনি, যে-আত্মা স্বৈরাচারের দাস, তার পক্ষেও নিজের ইচ্ছামতো কোনোকিছু সম্পাদন করা সম্ভব নয়। কারণ, সে উন্মত্ততা, বিভ্রান্তি এবং অনুতাপের হাতে অসহায়।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    এবার বলো, স্বৈরতন্ত্রের কবলিত যে-রাষ্ট্র, সে কি সম্পদময়, না দরিদ্র?

    সে অবশ্যই দরিদ্র।

    তা হলে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিভূ যে-চরিত্র, সেও দরিদ্র এবং অতৃপ্ত?

    হ্যাঁ, সে-চরিত্র দরিদ্র এবং অতৃপ্ত।

    আর এমন রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি উভয়ই ভীতি দ্বারা আতঙ্কগ্রস্ত। এই রাষ্ট্র যেমন অভিযোগ, দুঃখ, শোক এবং বেদনায় পূর্ণ থাকে, তেমনি এ-রাষ্ট্রের ব্যক্তিও তার ইচ্ছা এবং প্রবৃত্তির উন্মত্ত স্বৈরাচারী শাসনে সর্বদাই একইরূপ যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট হতে থাকবে।

    খুবই সত্য কথা।

    অপর সকল কারণ ছাড়াও, এই সকল কারণের জন্য তুমি বলেছিলে, স্বেচ্ছাচারী-শাসিত রাষ্ট্রই হচ্ছে সবচেয়ে অসুখী রাষ্ট্র।

    গ্লকন বলেছেন : এবং আমি কি ঠিক বলিনি?

    আমি বললাম : খুবই ঠিক বলেছ। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এইসব কারণে ভিত্তিতে স্বৈরতান্ত্রিক মানুষ সম্পর্কে তুমি কী বলবে?

    স্বৈরতান্ত্রিক মানুষও সবচেয়ে অসুখী মানুষ।

    আমি বললাম : না গ্লকন, এখানে তুমি ঠিক বলনি।

    কেন?

    কারণ, তার চেয়েও অসুখী একজন আছে।

    কে সে?

    আমি বললাম : তুমি হয়তো স্বীকার করবে, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যক্তি একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনযাপন করার পরিবর্তে যদি সে ঘটনার স্রোতে শাসকের চরম ক্ষমতায় আরোহণ করতে বাধা হয়, তবে তার ন্যায় হতভাগ্য এবং অসুখী আর কেউ হতে পারে না।

    হ্যাঁ, আমরা যে-আলোচনা করেছি, তার ভিত্তিতে এ কথাই সত্য বলে বোধ হয়।

    কিন্তু শুধু ‘বোধ হওয়া’ আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ আমরা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। উত্তম এবং অধমের কোটি আমাদের কাম্য, তা এবার স্থির করতে হবে। কাজেই কার পক্ষে যুক্তি কী, তা আমাদের পুরোপুরি দেখতে হবে।

    তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস।

    আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্তের বিবেচনা থেকে আমরা শুরু করতে পারি।

    কোন্ দৃষ্টান্তের কথা বলছ?

    একজন ধনবান দাসপ্রভুর কথা চিন্তা করো যার দাসের সংখ্যা বেশ বৃহৎ। এরূপ লোকের অবস্থা থেকে আমরা স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের অবস্থাটি অনুমান করতে পারব। কারণ, এদের উভয়েরই দাস দাছে। দু’এর মধ্যে পার্থক্য এই যে, স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের দাসের সংখ্যা ধনবান নাগরিকের চেয়েও অধিক।

    হ্যাঁ, এদের মধ্যে এটাই মাত্র পার্থক্য

    আমরা জানি, এমন ধনবান নাগরিক বেশ নিশ্চিত জীবনযাপন করে। কারণ, তার ভৃত্যদের তরফ থেকে তার কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই।

    না, তার বিপদের আশঙ্কা কেন থাকবে?

    ঠিক কথা, তার বিপদের কোনো ভয় নেই। কিন্তু কেন নেই?

    কারণ, তার জীবনযাত্রার পেছনে সমগ্র রাষ্ট্রেরই সমর্থন রয়েছে। তার বিপদে অপর সকলে তাকে রক্ষা করবে। একের বিপদে অপর সকলে ছুটে আসে।

    খুবই সত্য কথা। কিন্তু গ্লকন, তুমি কল্পনা করো, এরূপ একজন দাসপ্রভু যার পঞ্চাশজন দাস আছে। তাকে এক দেবতা তার সংসার, সম্পত্তি এবং দাসদেরসহ একেবারে তুলে নিয়ে গেল এক বিজন ভূমিতে। বিজন ভূমিতে তাকে সাহায্য করার জন্য কোনো স্বাধীন নাগরিকের অস্তিত্ব নেই। এমন যদি হয়, তা হলে এই দাসপ্রভুর মনে কি বিপদের আশঙ্কা জাগবে না যে, দাসরা দলবদ্ধ হয়ে তাকে, তার স্ত্রী এবং সন্তানদের যে-কোনো সময়ে হত্যা করতে পারে?

    হ্যাঁ, তা তো বটেই। তার মনে মারাত্মক ভয়ের সৃষ্টি হবে।

    এবার সে নিজের প্রাণের ভয়ে তার দাসদের তোষামোদ করতে বাধ্য হবে। সে তাদের নানাভাবে তুষ্ট করার চেষ্টা করবে। তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে তাদের মুক্তিদানসহ নানারকম প্রতিশ্রুতি দেবে। মোটকথা, তাকে নিজের দাসদের এবার খোসামোদ করতে হবে।

    হ্যাঁ, এটাই হবে তার বাঁচার একমাত্র উপায়।

    এবার মনে করো, যে-দেবতা তাকে তার সমাজ থেকে তুলে এনেছে সে-দেবতা তার চার পাশে এমন প্রতিবেশী এনে দিল যারা কেউ কাউকে দাস করে না এবং কেউ এমন অপরাধের চেষ্টা করলে, তারা অপরাধীকে ধরতে সক্ষম হলে, জীবননাশেও কুণ্ঠিত হয় না।

    এমন হলে তার অবস্থা অধিকতর শোচনীয় হবে। কারণ, এবার সে নিজেকে চতুর্দিক থেকেই শত্রুপরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখতে পাবে।

    স্বেচ্ছাচারী-শাসকও কি এমন বন্দিশালায় নিজেকে আবদ্ধ দেখবে না? আমরা তার যে-চরিত্র বর্ণনা করেছি তাতে সকল রকম ভয় এবং লালসা দিয়ে সে পূর্ণ। তার আত্মা লোভাতুর এবং বিলাসী। নগরীর মধ্যে সে-ই সবচেয়ে সঙ্গীহীন। তবু সে একাকী ভ্রমণে বের হতে পারে না। অপর স্বাধীন নাগরিক যা দেখতে ইচ্ছা করে এবং দেখে, তা সে দেখতে পারে না। অন্তঃপুরে আবদ্ধ নারীর মতো সেও এক বিবরের মধ্যে আবদ্ধ এবং অপরে যখন স্বাধীনভাবে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে এবং তাদের যা আগ্রহ তা-ই দর্শন করে, তখন সে তাদের ভাগ্যে ঈর্ষা বোধ করে।

    তোমার বর্ণনা খুবই যথার্থ, সক্রেটিস।

    এমন অবস্থায় যে নিজের মধ্যে সুশাসিত নয়, অর্থাৎ স্বৈরতন্ত্রী যে-চরিত্র, যাকে তুমি অসুখী এবং হতভাগ্য বলেছ তেমন ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত জীবনযাপন করতে না পারে, যদি তাকে স্বৈরতন্ত্রী-শাসকও হতে হয়, তা হলে তার জীবন কি ঢের বেশি অসুখী এবং হতভাগ্য জীবন হবে না? সে নিজেরই প্রভু নয়, কিন্তু তাকে প্রভু হতে হচ্ছে অপর সকলের। একে তুমি তুলনা করতে পার সেই অসুস্থ এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোকের সঙ্গে যার অবসরযাপনের ভাগ্য জুটল না, যাকে জীবনপাত করতে হল পঙ্গু অবস্থায় এবং অপরের সঙ্গে লড়াই করে, অপরকে প্রতিরোধ করে।

    সক্রেটিস, তোমার তুলনাটি খুবই ঠিক।

    কাজেই, গ্লকন তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে, যার জীবনকে তুমি সবচেয়ে অসুখী বলেছ, তার চেয়েও অসুখী হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রী-শাসকের জীবন। যে-জীবনকে তুমি কঠিন বলেছ তার চেয়েও কঠিন হচ্ছে এই শাসকের জীবন।

    সক্রেটিস, আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।

    কাজেই লোকে যা-ই বলুক, যে যথার্থ স্বৈরতন্ত্রী সে আসলে নিজে প্রভু নয়। সে দাস, পরাশ্রয়ী এবং দুর্বৃত্তদলের উপর নির্ভরশীল। নিজের কোনো ইচ্ছার পূরণ সে স্বাধীনভাবে করতে পারে না। তার অসংখ্য চাহিদাকে ভেদ করে তুমি যদি তার আসল রূপের দিকে চাইতে পার তা হলে দেখতে পাবে, সে একটি হৃতসর্বস্ব চরিত্র। তার জীবনে ভীতির উপচ্ছায়া সর্বক্ষণ ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে-রাষ্ট্রকে সে শাসন করে তাকে যদি আমরা নির্দেশক হিসাবে গ্রহণ করি তা হলে বলতে পরি, তার রাষ্ট্রের ন্যায় তার চরিত্র সর্বদাই যন্ত্রণা এবং দুর্দশার অন্তর্ঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আমরা পূর্বে যা বলেছি তার সঙ্গে এও আমাদের বলতে হবে যে, তার ক্ষমতাই তাকে অধিকতর ঈর্ষাপরায়ণ, অবিশ্বাসী, অন্যায়ী, বন্ধুহীন, এবং ধর্মহীন করে তাকে সকল অন্যায়ের উৎসস্থলে পরিণত করো। এমন চরিত্র যেমন তার প্রতিবেশী ও পরিজনদের কাছে, তেমনি তার নিজের কাছে সীমাহীন দুর্দশার কারণস্বরূপ।

    এ কথাকে বোধসম্পন্ন কারো পক্ষেই অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

    বেশ, তা হলে এবার তুমি শেষ বিচারকের দায়িত্বটি পালন করো। তোমার সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করে বল, সুখের মাপকাঠিতে দার্শনিক-শাসক, উচ্চাভিলাষী, কতিপয়ী, গণতন্ত্রী এবং স্বৈরতন্ত্রী—এই পাঁচ প্রকার চরিত্রের কার অবস্থান কোথায়?

    গ্লকন বললেন : এ-রায়দান সোজা। আমি বলব, উদ্ভবের ক্ষেত্রে এদের যে-পর্যায়ক্রম, সুখের ক্ষেত্রেও তাদের সেই একই পর্যায়ক্রম। এবং কেবল সুখের ক্ষেত্রে নয়, নৈতিক মূল্যের ক্ষেত্রেও এরা সেই ধারাক্রমই বহন করে।

    তা হলে এবার আমাদের একজন ঘোষকের আবশ্যক। কিংবা আরিস্টনের পুত্র বিচারক গ্লকনের রায়টি আমি নিজেও ঘোষণা করে বলতে পারি : যে পরম ন্যায়বান, যে সবার চেয়ে উত্তম সে-ই সবচেয়ে সুখী। অন্য কথায়, যে-দার্শনিক-রাজা নিজেকে শাসন করতে সক্ষম, সে-ই সবচেয়ে সুখী। এবং যে সবচেয়ে অন্যায়ী, যে সবার চেয়ে অধম, সে-ই সবার চেয়ে অসুখী, সে-ই সবার চেয়ে হতভাগ্য। অন্য কথায়, যে-মানুষ নিজের আত্মার ক্ষেত্রে স্বৈরতন্ত্রী এবং যে নিজের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে স্বৈরতন্ত্রী-শাসক, সে-ই সবচেয়ে অসুখী।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, তুমি এ-ঘোষণাটি করতে পার সক্রেটিস।

    এবং এর সঙ্গে আর-একটি কথা যোগ করে বলব : এ-রায় শাশ্বত সত্য। মানুষ কিংবা দেবতাদের জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাত যা-ই হোক-না কেন তাতে আমাদের রায়ের সত্যতার কোনো ক্ষতি কিংবা বৃদ্ধি ঘটবে না। একথাও কি আমি বলতে পারিনে?

    হ্যাঁ সক্রেটিস, একথাও তুমি বলতে পার।

    তা হলে, এটা আমাদের প্রথম প্রমাণ। আমাদের দ্বিতীয় প্রমাণও কিছু গুরুত্বপূর্ণ।

    দ্বিতীয় প্রমাণ কী?

    আত্মার স্বভাবের উপর আমাদের দ্বিতীয় প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত। কারণ, রাষ্ট্রের ন্যায় ব্যক্তির আত্মাকেও আমরা তিনটি উপাদানে বিভক্ত করেছিলাম। আমাদের দ্বিতীয় প্রমাণের শুরু এখান থেকেই।

    কেমন করে?

    বলছি : আত্মার প্রত্যেকটি উপাদানেরই নিজ নিজ আনন্দ, ইচ্ছা এবং নিয়ামক নীতি রয়েছে।

    তোমার এ কথার কী অর্থ, সক্রেটিস?

    কেন গ্লকন, আমরা তো দেখেছি মানুষের চরিত্রের এই উপাদানগুলির একটি মানুষকে জ্ঞানদান করে, আর একটি তাকে বিক্রমে এবং উদ্যোগে সমৃদ্ধ করে। এবং তৃতীয়টির দান এরূপ বিচিত্র যে, তাকে এক শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তৃতীয়টিকে আমরা এ-কারণে ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি বলে অভিহিত করেছি। আমাদের খাদ্য এবং পানীয়ের ক্ষুধা, জৈবিক তাড়না এবং অনুরূপ চাহিদার প্রাবল্যের উৎস হচ্ছে এই তৃতীয় উপাদান। একে আমরা ‘অর্থ-কামনা’ বলে অভিহিত করতে পারি। কারণ অর্থ দ্বারাই মাত্র এসব প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করা চলে।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    কাজেই এই তৃতীয় উপাদানের বৈশিষ্ট্যকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে আমরা বলতে পারি, এর আনন্দ এবং ইচ্ছার লক্ষ্য হচ্ছে সংগ্রহ। অথবা বলতে পারি আত্মার এই উপাদানের লক্ষ্য হচ্ছে লাভ করা বা অর্থ উপার্জন করা।

    আমি তোমার সঙ্গে একমত, সক্রেটিস।

    তেমনি আত্মার যে-উপাদানকে আমরা বিক্রম বলেছি, তার লক্ষ্য হচ্ছে সম্মান এবং সাফল্যলাভ। কাজেই আমরা যথার্থই বলতে পারি, বিক্রম সম্মান বা উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অন্বেষণ করে।

    হ্যাঁ, আমরা তা বলতে পারি।

    আর এ কথাও স্পষ্ট যে, জ্ঞানের লক্ষ্য হচ্ছে সত্যের আবিষ্কার। অর্থ বা সম্মানের প্রতি জ্ঞানের কোনো আগ্রহ নেই।

    এ কথা সত্য।

    কাজেই আত্মার এ-ভাগকে আমরা জ্ঞানের প্রেমিক বলে অভিহিত করতে পারি। ঠিক নয় কি?

    অবশ্যই।

    এর ভিত্তিতে আমরা কি বলতে পারিনে যে, একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে আত্মার এক-একটি উপাদান প্রবল হয়ে দেখা দেয়?

    আমরা অবশ্যই তা-ই বলব।

    এ-কারণেই আমরা মানুষকে মূলত তাদের চরিত্রের নিয়ামক শক্তি : জ্ঞান, বিক্রম এবং প্রবৃত্তির ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছি। প্রত্যেক শ্রেণীর অবশ্য উপযুক্ত ইচ্ছার দিকও আছে।

    খুবই সত্য কথা।

    এবার তুমি তিন শ্রেণীর লোকের প্রত্যেক শ্রেণীকে প্রশ্ন করো, কোন্ শ্রেণীর জীবন সবচেয়ে সুখী, তা হলে দেখবে প্রত্যেক শ্রেণীই নিজেদের জীবনকে সবচেয়ে সুখী বলে প্রশংসা করছে এবং অপর শ্রেণীর জীবন অসুখী বলে তার নিন্দা করছে। দেখবে, যার জীবনের লক্ষ্য অর্থ, নগদ মূল্যের বাহক না হলে জ্ঞান বা সাফল্য তার কাছে একেবারেই মূল্যহীন।

    হ্যাঁ, জ্ঞান বা সাফল্য এদের কাছে মূল্যহীন।

    এবং যে উচ্চাভিলাষী, সে কি মনে করে? সেও কি অর্থোপার্জন কিংবা জ্ঞান যদি সম্মানের বাহক না হয় তা হলে তাকে স্থূল এবং মূল্যহীন বলে গণ্য করে না?

    হ্যাঁ, সেও অর্থোপার্জন এবং জ্ঞানকে মূল্যহীন বিবেচনা করে।

    এবং দার্শনিক, যে সর্বদা জ্ঞান এবং সত্যের অন্বেষণে রত, সে জ্ঞান এবং সত্যের তুলনায় আত্মার অপর উপাদানকে কী চোখে দেখে? সে কি মূল্যের ক্ষেত্রে এদের স্থান অনেক নিচে বলেই গণ্য করবে না? আত্মার অপর উপাদানকে ‘প্রয়োজনীয়’ বলে সে স্বীকার করবে বটে, কিন্তু অনিবার্য না হলে সে এদের বর্জন করতেও দ্বিধা করবে না। দার্শনিকের বিবেচনা কি এরূপই হবে না?

    নিঃসন্দেহে।

    তা হলে আমরা নীতির প্রশ্ন না তুলে এই তিনপ্রকার সুখকে (অর্থ, বিক্ৰম এবং জ্ঞান) যদি তিনপ্রকার জীবনের সঙ্গে তুলনা করি তা হলে সত্যের রূপটি কী হবে বলে তুমি মনে কর, গ্লকন?

    গ্লকন বললেন : আমি ঠিক জানিনে, সক্রেটিস।

    বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যাক। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য এক্ষেত্রে আমাদের কী আবশ্যক? সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি এবং যুক্তির অধিক উত্তম কোনো উপায় আছে বলে কি তুমি মনে কর?

    অবশ্যই না।

    বেশ, তা হলে চিন্তা করে দ্যাখো, যে তিনপ্রকার মানুষের কথা আমরা বলেছি তাদের মধ্যে কোন্ শ্রেণীর উল্লিখিত তিনপ্রকার সুখের সর্বাধিক অভিজ্ঞতা আছে? জ্ঞানের সুখের ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জনকারীর অভিজ্ঞতাকে কি তুমি দার্শনিকের অর্থ উপার্জনের সুখের অভিজ্ঞতার চেয়ে অধিক বলবে?

    গ্লকন বললেন, না, তা তো নয়ই। দার্শনিক তার জীবনের শুরু থেকে অর্থ লাভের সুখের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই লাভ করবে। এ-অভিজ্ঞতা লাভ না করার কোনো উপায় তার নেই। কিন্তু তা-ই বলে অর্থ উপার্জনকারী চরিত্রের এমন কোনো অনিবার্যতা নেই যাতে তাকে সত্য উপলব্ধির সুখের অভিজ্ঞতালাভ কিংবা ভোগ করতেই হবে। বস্তুত, এমন লোকের যদি সত্যোপলব্ধিগত সুখের অভিজ্ঞতালাভের ইচ্ছাও জন্মে তবু তা লাভ করা তার পক্ষে কঠিন হবে

    তা হলে আমরা বলব, জ্ঞানের সুখ এবং অর্থের সুখ—এই উভয় সুখের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে দার্শনিকের অবস্থা অর্থ উপার্জনকারীর চেয়ে উত্তম? দার্শনিকের সুবিধা অর্থোপার্জনকারীর চেয়ে অধিকতর

    হ্যাঁ, তার সুবিধা অধিকতর।

    বেশ, কিন্তু সম্মানের প্রেমিক বা উচ্চাভিলাষীর সঙ্গে তুলনায় দার্শনিকের অবস্থাটি কী? উচ্চাভিলাষীর জ্ঞানের সুখের যে-অভিজ্ঞতা তার চেয়ে সম্মানের সুখের অভিজ্ঞতা কি দার্শনিকের কম?

    না। তা হতে পারে না। কারণ, সম্মান সকলেই লাভ করে। দার্শনিক কিংবা উচ্চাভিলাষী কিংবা অর্থ উপার্জনকারী—যার যে-লক্ষ্য সে যদি তা অর্জন করে তা হলে তাদের আপন-আপন প্রশংসাকারীদের নিকট থেকে তারা সম্মান লাভ করে। কাজেই সকলেই জানে সম্মানের সুখ কী। কিন্তু সত্যকে জানার যে-সুখ তা কেবল দার্শনিকই লাভ করতে পারে।

    আমি বললাম : তা হলে অভিজ্ঞতার দিক থেকে দার্শনিকের বিচার করার অধিকার সবার চেয়ে অধিক?

    হ্যাঁ, তার ক্ষমতা সবার চেয়ে বেশি।

    এবং দার্শনিকই হচ্ছে একমাত্র লোক যার মধ্যে অভিজ্ঞতার সঙ্গে বুদ্ধির যোগ সাধিত হয়।

    এ কথাও সত্য।

    আর এ-কার্য সাধনের জন্য দার্শনিকেরই মাত্র প্রয়োজনীয় উপায়ও রয়েছে—যে-উপায় অর্থাকাঙ্ক্ষী বা সম্মানাকাঙ্ক্ষী, কারোর নেই।

    সক্রেটিস, তোমার এ কথার অর্থ কী?

    গ্লকন, আমরা কি বলিনি, কোনো সমস্যার বিচার বা সিদ্ধান্ত করতে হবে যুক্তির মাধ্যমে? আর এই যুক্তির মাধ্যম বা হাতিয়ার তো কেবলমাত্র দার্শনিকেরই বিশেষ হাতিয়ার।

    হ্যাঁ, এ কথা সত্য।

    কিন্তু সম্পদ এবং লাভ—এটাই যদি আমাদের বিচারের মাপকাঠি বা মাধ্যম হত তা হলে আমরা বলতাম যে অর্থ উপার্জনকারীর বিচারের মধ্যেই সর্বাধিক পরিমাণ সত্য নিহিত আছে।

    হ্যাঁ, তা হলে অনিবার্যভাবে তা-ই হত।

    আবার আমাদের মাপকাঠি যদি সম্মান, সাফল্য এবং সাহস হত তা হলে উচ্চাভিলাষীর ক্ষেত্রেও একথা সত্য হত।

    নিশ্চিতই।

    কিন্তু আমরা যখন বিচারের মাপকাঠি বা মাধ্যম গ্রহণ করেছি অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি এবং যুক্তিকে— ?

    তখন এটা তার অনুসিদ্ধান্ত যে, সত্যকে আমরা লাভ করতে পারব কেবল মাত্র দার্শনিকের বিচার এবং যুক্তির মাধ্যমে, অপর কোনো উপায়ে নয়।

    তা হলে যে-তিনপ্রকার সুখের কথা আমরা উল্লেখ করেছি তার মধ্যে পরম সুখ হবে সেই সুখ যা আমাদের জ্ঞানলাভে সাহায্য করে। এবং যে মানুষের নিয়ন্ত্রণশক্তি রয়েছে সুখের এই উপাদানের উপর, সে অবশ্যই পরম সুখের জীবনযাপন করবে।

    গ্লকন বললেন : নিঃসন্দেহে একথা সত্য। জ্ঞানী যখন নিজের জীবন সম্পর্কে কথা বলে, তখন সে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গেই বলে।

    কিন্তু দার্শনিক তা হলে কোন্ জীবন এবং কোন্ সুখকে দ্বিতীয় স্তরের জীবন এবং সুখ বলে চিহ্নিত করবে বলে তুম মনে কর?

    কেন, সে নিশ্চয়ই উচ্চাভিলাষীর জীবন অর্থাৎ সামরিক ধরনের জীবনকে পরবর্তী স্তরে স্থাপন করবে। কারণ অর্থাকাঙ্ক্ষীর চেয়ে উচ্চাঙ্ক্ষীকে সে নিজের জীবনের নিকটতর বলে গণ্য করে।

    তা হলে, অর্থলাভের যে-সুখ সে আসে সকলের শেষে।

    হ্যাঁ, অর্থলাভের সুখের স্থান সবার নিচে।

    বেশ, তা হলে দেখা যাচ্ছে ন্যায়বান অন্যায়ীকে প্রথম দু’কিস্তিতে ধরাশায়ী করেছে। এবার তৃতীয় কিস্তির শুরু। তৃতীয় কিস্তির পূর্বে মল্লযোদ্ধাদের অলিম্পীয় ক্রীড়ার ন্যায় অল্পিম্পাসের ত্রাণকর্তা জিউসকে নিশ্চয়ই স্মরণ করতে হবে। গ্লকন, আমার মনে হয় আমি জ্ঞানীদের এরূপ বলতে শুনেছি যে জ্ঞানের সুখই হচ্ছে একমাত্র বিশুদ্ধ সুখ। অপর সকল সুখই হচ্ছে ভ্রম বা মায়া। এ-প্রশ্নের সমাধান এই তৃতীয় কিস্তিতে হয়ে যারে।

    হ্যাঁ, এ-সমাধান এবার হয়ে যাওয়া সঙ্গত। কিন্তু সক্রেটিস, তুমি একটু ব্যাখ্যা করে বলো, তুমি কী বলতে চাচ্ছ।

    অবশ্যই আমি বলব। কিন্তু তোমাকে আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে হবে।

    অবশ্যই আমি তা করব। তুমি প্রশ্ন করলেই আমি তাতে সাড়া দিব।

    তা হলে গ্লকন, তুমি আমাকে বলো, সুখ কি দুঃখের বিপরীত নয়? হ্যাঁ, সে খুবই বিপরীত।

    কিন্তু এমন অবস্থা কি আমাদের হয় না, যেখানে আমরা সুখ কিংবা দুঃখ কোনোটাই বোধ করিনে?

    হ্যাঁ, এরূপ অবস্থা আমাদের হতে পারে।

    আমার মনে হয়, এ-অবস্থাটি সুখ এবং দুঃখের মধ্যবর্তী হবে। তাতে আমাদের মন উভয় অবস্থার উত্তেজনা থেকে বিরাম পাবে। তুমি কী বল?

    হ্যাঁ, তোমার কথা আমি স্বীকার করি।

    আমি বললাম : আচ্ছা গ্লকন, তুমি কি জান অসুস্থ অবস্থায় রোগী কী বলতে থাকে?

    না। কী সে বলতে থাকে?

    রোগী তখন কেবল বলতে থাকে : আহা! স্বাস্থ্যের চেয়ে সুখ নেই। কিন্তু অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত এই উপলব্ধিটি তার জন্মেনি।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    আবার এ কথাও কি তুমি শোননি, যে বেদনা বা যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছে, সে বলছে, যন্ত্রণা থেকে মুক্তির চেয়ে কোনো সুখ নেই?

    হ্যাঁ, যন্ত্রণাকাতরের এরূপ উক্তি আমি শুনেছি।

    এরকম আরও উদাহরণের উল্লেখ করা চলে, যেখানে আমরা দেখি, কোনো যন্ত্রণা যখন আমরা ভোগ করি তখন তা থেকে মুক্তিকেই আমরা পরম সুখ বলে গণ্য করি—অপর কোনো বস্তু বা বিষয়ের সুখভোগকে নয়।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, একথা ঠিক। এবং এর কারণ বোধহয় এই যে, এমন অবস্থায় যন্ত্রণা থেকে আরামই বড় সুখ বলে বোধ হয়।

    তা হলে সুখভোগের যেখানে বিরাম বা শেষ, সেখানেই দুঃখ বা বেদনার শুরু?

    তাও হতে পারে।

    তা-ই যদি হয় তা হলে ‘বিরাম’—যাকে আমরা সুখ এবং দুঃখের মধ্যবর্তী বলেছি, সে-সুখও যেমন, দুঃখও তেমন?

    সাধারণভাবে তা-ই মনে হয়।

    কিন্তু যে-বস্তু এটাও নয়, ওটাও নয়, সে দুটোই হতে পারে?

    না, তেমন হতে পারে বলে আমি মনে করিনে।

    তা ছাড়াও যেটা সত্য সে হচ্ছে সুখ এবং দুঃখ—এ দুটোই হচ্ছে মনের ব্যাপার। আত্মার ব্যাপার। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    কিন্তু আমরা কি এইমাত্র বলিনি, সুখ কিংবা দুঃখ কোনোটা বোধ না করা হচ্ছে মনের একটা বিরামের অবস্থা?

    হ্যাঁ, আমরা তা বলেছি।

    তা হলে একথা বলা কি আমাদের ঠিক হবে যে, দুঃখের অভাব হচ্ছে সুখ কিংবা সুখের অভাব দুঃখ?

    না। এরূপ মনে করা আমাদের ঠিক হবে না।

    তা হলে অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও এরূপ হতে পারে না। বিরামের অবস্থাকে আমরা সুখ বলি, ইতিপূর্বে যে-দুঃখ আমরা ভোগ করেছি তার সঙ্গে তুলনাক্রমেই। কিংবা বিরামকে আবার দুঃখ বলি, আমাদের যে-সুখ গত হয়েছে তার সঙ্গে তুলনাক্রমে। কিন্তু যথার্থ সুখের পরিমাপে এর কোনো অভিজ্ঞতা অর্থাৎ সুখ বা দুঃখ থেকে বিরামের অভিজ্ঞতা, যথার্থ সুখ বা দুঃখের অভিজ্ঞতা বলে গণ্য হতে পারে না। এমন অবস্থা অভিজ্ঞতার একপ্রকার ভ্রম।

    আমাদের যুক্তির তাৎপর্য এইরূপ বলেই বোধ হয়।

    কিন্তু দুঃখের অভাবই সুখ এবং সুখের অভাব দুঃখ—এ-ধারণা যদি তোমার মনে এখনও থেকে থাকে তা হলে এসো, আমরা এমন কিছু সুখের বিচার করি যে-সুখের পূর্বে দুঃখ সংঘটিত হয়নি।

    এমন সুখের দৃষ্টান্ত তুমি কোথায় পাবে? কী সে-সুখ?

    এমন সুখ আছে। কিন্তু এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঘ্রাণের সুখ। এমন সুখ তীব্রভাবে আমরা বোধ করি। এ-সুখ হঠাৎ আসে কোনো দুঃখের পূর্বঅভিজ্ঞতা ছাড়াই। কিংবা এ-সুখ যখন চলে যায় তখনও পেছনে কোনো দুঃখ রেখে যায় না।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    কাজেই একথা আমাদের বিশ্বাস করা উচিত নয় যে, দুঃখের অভাবই হচ্ছে বিশুদ্ধ সুখ কিংবা বিশুদ্ধ দুঃখ হচ্ছে সুখের অভাব।

    হ্যাঁ, একথা স্বীকার্য।

    তা হলেও, যে-তীব্র সুখ আমরা দেহের মাধ্যমে বোধ করি তার বেশির ভাগই এই-ধরনের সুখ। দুঃখের অভাব থেকেই আমরা এদের অনুভব করি। যেমন, আহারের যে সুখ তা আমরা ক্ষুধার পরেই বোধ করি। ক্ষুধার অভাবেই আহারের সুখের অনুভব।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    তেমনি যে-সমস্ত সুখ এবং দুঃখ আমরা কল্পনার ভিত্তিতে অনুভব করি তাদের ক্ষেত্রেও একথা সত্য।

    হ্যাঁ, তা বটে।

    এদের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত সম্পর্কে আমি কী ভাবছি বলতে পার?

    না। তুমি বলো।

    আচ্ছা বেশ! কিন্তু তুমি কি একথা স্বীকার কর, যে-জগতের মধ্যে আমরা বাস করি তার একটা ঊর্ধ্বদেশ, অধঃদেশ এবং মধ্যদেশ আছে?

    হ্যাঁ, একথা আমি স্বীকার করি।

    তা-ই যদি হয় তা হলে, যে অধঃদেশ থেকে মধ্যদেশে উঠে আসে সে কি মনে করে না, সে ঊর্ধ্বদেশে আরোহণ করছে? আর এখান থেকে তার অধঃদেশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে কি মনে করবে না, সে যথার্থই ঊর্ধ্বদেশে অবস্থান করছে? কারণ যথার্থ ঊর্ধ্বদেশকে সে তো দেখেনি।

    এ ছাড়া তার পক্ষে অপর কিছু মনে করা সম্ভব নয়।

    এবার মনে করো, সে আবার অধঃদেশে গমন করল। এবার সে মনে করবে, সে অধঃদেশে গমন করছে। এবং এ-সিদ্ধান্ত তার যথার্থ।

    হ্যাঁ, সে যথার্থই অধঃদেশে গমন করছে।

    কিন্তু তার এই ঊর্ধ্ব, অধঃ এবং মধ্য সম্পর্কে সকল সিদ্ধান্তের ভিত্তি হচ্ছে অজ্ঞানতা। কারণ সে জানে না যথার্থ ঊর্ধ্ব, অধঃ কিংবা মধ্যদেশ কী।

    হ্যাঁ, তার সিদ্ধান্তের ভিত্তি অবশ্যই অজ্ঞানতা

    তা-ই যদি হয়, তা হলে এতে কি বিস্ময়ের কিছু আছে যে, যারা সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ তারা সুখ এবং দুঃখ এবং সুখ ও দুঃখের মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ অবস্থা সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিমত পোষণ করবে? অনুরূপ অনেক বিষয় সম্পর্কেই তাদের ধারণা ভিত্তিহীন। তা-ই যখন তাদের উপর দুঃখ আসে, তখন তারা দুঃখভোগ করে। এবং এ-দুঃখ তাদের যথার্থ দুঃখ। কিন্তু আবার দুঃখ শেষ হয়ে যখন একটা দুঃখহীন অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন সেই দুঃখের অভাবটাকে সুখ বলে তারা বিশ্বাস করে। আসলে যথার্থ সুখের অজ্ঞতাই তাদের দুঃখ এবং দুঃখের অভাবের মধ্যে তুলনার মনোভাব সৃষ্টি করে। দুঃখকে তারা দুঃখের অভাবের সঙ্গে তুলনা করে, যেমনভাবে সাদাকে যে কখনো দেখেনি সে ধূসরকে সাদা বলে কালোর সঙ্গে তুলনা করে।

    গ্লকন বললেন : এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এ ছাড়া আর কী হতে পারে?

    বেশ, তা হলে একটা বিষয় বিচার করো। ক্ষুধা, তৃষ্ণা—এগুলি কি দেহের কোনো ক্ষয় বা অভাবসূচক নয়?

    অবশ্যই।

    তেমনি অজ্ঞতা এবং অন্তঃসারশূন্যতাও কি আত্মার অভাব বা ক্ষয়ের সূচক নয়?

    নিশ্চয়ই।

    এবং এ-ক্ষয়ের পূরণ দেহের ক্ষেত্রে ঘটে খাদ্য দ্বারা এবং আত্মার ক্ষেত্রে ঘটে জ্ঞান দ্বারা। ঠিক নয় কি?

    অবশ্যই ঠিক।

    তা হলে, যে অধিকতর সত্য তার ক্ষয়ের পূরণে কি আমরা, যে কম সত্য তার ক্ষয়ের পূরণের চেয়ে অধিকতর সুখ লাভ করিনে?

    অবশ্যই।

    তা হলে অধিকতর সত্য কী? রুটি, মাংস, পানীয়—অর্থাৎ খাদ্যসামগ্রী? কিংবা বিচার, বিবেচনা, বুদ্ধি এবং জ্ঞান এবং মনের অনুরূপ গুণাবলী? প্রশ্নটি তুমি এভাবেও করতে পার : কে বেশি সত্য? যে অবিনশ্বরতার জগতে বাস করে এবং তার স্বভাব নিজের মধ্যে ধারণ করে সে, কিংবা মৃত্যু এবং পরিবর্তনের জগতে যে বাস করে এবং তার স্বভাব নিজের মধ্যে যে ধারণ করে সে?

    যে অবিনশ্বরতার জগতে বাস করে সে অবশ্যই অধিক সত্য।

    এবং সত্য এবং অবিনশ্বর সত্তা—উভয়েরই অনিবার্য স্বভাব কি জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠিত নয়?

    অবশ্যই।

    কাজেই সত্যের পরিমাণ যেখানে কম, সত্তার পরিমাণও সেখানে কম নয় কি?

    নিশ্চয়ই।

    তা হলে যা দিয়ে আমরা দেহের প্রয়োজনকে পূরণ করি তার সত্যতা এবং যথার্থতা যা দিয়ে আমরা আত্মার অভাব পূরণ করি তার সত্যতা এবং যথার্থতার চেয়ে কম। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, আত্মার সত্যতার চেয়ে অবশ্যই অনেক কম।

    আত্মার তুলনায় দেহের ক্ষেত্রে একথা কি সমভাবেই সত্য নয়?

    হ্যাঁ, সমভাবেই সত্য।

    আবার অভাবপূরণের উপায়গুলি যত অধিক সত্য হবে এবং যত অধিক সত্য হবে সেই অভাবপূরণের লক্ষ্য, তত অধিক যথার্থ হবে সেই অভাবের তৃপ্তি।

    একথা আমি স্বীকার করি, সক্রেটিস।

    এ থেকে স্বাভাবিকভাবেই একথাটি আসে, উপযুক্তভাবে অভাবের পূরণের ভিত্তিতে যদি আমরা আনন্দ বোধ করি তা হলে যত অধিক যথার্থ হবে আমাদের অভাবের পূরণ এবং তার উৎস, তত অধিক যথার্থ হবে আমাদের তৃপ্তি এবং সুখ। আবার আমাদের অভাব এবং তার পুরণ যত কম যথার্থ হবে, তত কম হবে তার ভিত্তিতে প্রাপ্ত সুখ।

    হ্যাঁ, এ তো অনিবার্য।

    তা হলে যাদের জ্ঞানের এবং উত্তমের অভিজ্ঞতা নেই, যারা কোনো কর্তব্যসাধন না করে মিথ্যা সময় ক্ষেপণ করে, তারা আমাদের এ-দৃষ্টান্তের অধঃদেশ এবং মধ্যদেশের মধ্যেই কেবল বিচরণ করতে পারে। যথার্থ ঊর্ধ্বদেশে আরোহণ করা এবং যথার্থ তৃপ্তি বা বিশুদ্ধ আনন্দ লাভ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাদের আমরা তুলনা করতে পারি চারণক্ষেত্রে মেষশাবকের সঙ্গে। তাদের মুখ খাদ্যের মধ্যে। তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ চারণভূমির দিকে। খাদ্য দ্বারা তাদের উদরকে তারা পূর্ণ করে এবং জৈবিক আবেগে প্রজননকার্য সাধন করে। তবু তারা অতৃপ্ত। অধিকতর খাদ্যের লোভে তারা পরস্পর পরস্পরকে তাদের লৌহআবৃত খুর এবং শৃঙ্গ দ্বারা আঘাত করে এবং তারা পরস্পরকে হত্যা করে। তারা অতৃপ্ত। তারা অসুখী। তাদের পক্ষে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাদের সত্তার যেটা অলীক অংশ, এবং সে-কারণেই যার তৃপ্তির কোনো শেষ নেই, তাকেই তারা তৃপ্ত করতে চাচ্ছে।

    প্রিয় সক্রেটিস, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি জনতার জীবনের উপর উপদেশবাণী বর্ষণ করছ।

    তা হোক, গ্লকন। কিন্তু এদের এই যে সুখ, এ কি অসুখের সঙ্গে মিশ্ৰিত নয়? এ কি যথার্থ সুখের ছায়ামাত্র নয়? এগুলির তীব্রতার সৃষ্টি হয় তুলনা থেকে এবং এরা মূর্খের মনে উন্মত্ত কামনার সঞ্চার করে। এদের সম্পর্কে স্টেসিকোরাসের বর্ণনা সত্য। স্টেসিকোরাস বর্ণনা করেছেন, ট্রয়ের প্রান্তরে কেমন করে ‘বীর’ যোদ্ধাগণ হেলেনের একটি প্রতিকৃতির উপর মূর্খের মতো পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল।*

    [* নাট্যকার ইউরিপাইডিস (৪৮০- ৪০৭ খ্রিঃ পূঃ) রচিত ‘হেলেন’-এর কাহিনীতে এরূপ বর্ণনা আছে যে, হেলেন আসলে অপহৃত হয়নি, দেবী হেরা ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিসকে হেলেনের একটি প্রতিকৃতি দিয়েছিল— যথার্থ হেলেনকে নয়। এই প্রতিকৃতি বা উপচ্ছায়াকে প্যারিস যথার্থ হেলেন ভেবেছে এবং গ্রীকবাসীগণ তাকে অপহৃত মনে করেছে এবং এ-ভ্রমের ভিত্তিতে পরস্পর যুদ্ধ করেছে। কিন্তু হেলেন তখন মিশরে তার স্বামী মেলেনাসের প্রতীক্ষায় দিনযাপন করছিল।– এইচ. ডি.পি লী’র অনুবাদ পৃঃ ৩৬২।

    হ্যাঁ, এদের ক্ষেত্রেও এটি অনিবার্য।

    তা হলে মানুষের চরিত্রের তেজ বা বিক্রম বা সাহস সম্পর্কে আমরা কী বলব? এখানেও সেই একই কথা কি অনিবার্যভাবে সত্য নয়? কারণ, কেউ যখন যুক্তিহীনভাবে সম্মান, সাফল্য বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটে চলে এবং এদের অতৃপ্তির কারণে পরস্পর পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা, ক্রোধ এবং জিঘাংসায় পূর্ণ হয়ে ওঠে তখন তার ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, এখানেও অনিবার্যভাবে সেই কথা সত্য হয়ে দাঁড়ায়।

    আমি বললাম : গ্লকন, আমরা তা হলে এবার সিদ্ধান্ত করতে পারি, আমাদের লাভের কামনা এবং উচ্চাভিলাষ যদি জ্ঞান এবং যুক্তির নির্দেশ পালন করে এবং যদি তারা এমন আনন্দ ভোগ করতে চায়, যে-আনন্দে জ্ঞানের অনুমোদন রয়েছে, তা হলে যে-আনন্দ তারা লাভে সক্ষম হবে সে-আনন্দ যথার্থ আনন্দ হবে। তাদের উপযুক্ত আনন্দ হবে। কারণ, সত্য তাদের সহায় এবং যার যা উপযুক্ত তা-ই হচ্ছে তার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট।

    হ্যাঁ, একথা অবশ্য সত্য।

    তা হলে, আত্মার মধ্যে যদি কোনো দ্বন্দ্ব না থাকে এবং যদি সে দর্শনকে অনুসরণ করে তা হলে আত্মার যে-উপাদানের যা করণীয় সে তা-ই করতে থাকবে এবং যার উপযুক্ত যে-সুখ, সে-সুখ সে লাভ করতে সক্ষম হবে। এবং তখন এ-সুখই তার জন্য উপযুক্ত এবং সর্বোত্তম বলে গণ্য হবে।

    নিঃসন্দেহে এ কথা সত্য।

    কিন্তু দর্শন বা জ্ঞান না হয়ে অপর দুটি উপাদানের কেউ যদি আত্মার শাসক হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে এই শাসক যেমন নিজের উপযুক্ত সুখকে লাভ করতে সক্ষম হবে না, তেমনি সে অপর দুটি উপাদানকে সেই সুখের অন্বেষণে ছুটতে বাধ্য করবে, যে-সুখ তাদের কারোর জন্য উপযুক্ত এবং উত্তম নয়।

    যথার্থ।

    এবং এমন অবস্থার উদ্ভব তো সেই উপাদানের কারণেই ঘটবে, যে-উপাদানের অবস্থান হচ্ছে জ্ঞান থেকে সর্বাধিক দূরত্বে?

    অবশ্যই।

    এবং যার অবস্থান জ্ঞান থেকে সর্বাধিক দূরত্বে, সে কি নিয়ম এবং শৃঙ্খলা থেকেও সর্বাধিক দূরত্বেই অবস্থিত নয়?

    নিঃসন্দেহে।

    এবং আমরা তো পূর্বেই বলেছি, উন্মত্ত এবং স্বৈরাচারী ইচ্ছার অবস্থান হচ্ছে নিয়ম এবং শৃঙ্খলা থেকে সর্বাধিক দূরত্বে এবং যুক্তিগত এবং নিয়মগত ইচ্ছার অবস্থান হচ্ছে সর্বাধিক নৈকট্যে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, আমরা তা বলেছি।

    তা হলে আমরা বলব, যে স্বৈরাচারী তার অবস্থান মানুষের যথার্থ এবং উপযুক্ত সুখ থেকে সর্বাধিক দূরত্বে এবং যে স্বৈরতান্ত্রিক শাসক, সে সবচেয়ে অসুখী জীবনযাপন করে। দার্শনিক-শাসক সবচেয়ে সুখী জীবন যাপন করে।

    অনিবার্যভাবেই এ-সিদ্ধান্ত আমাদের গ্রহণ করতে হয়।

    কিন্তু গ্লকন, তুমি কি জান, দার্শনিক-শাসকের চেয়ে স্বৈরতান্ত্রিক শাসক কত অধিক পরিমাণে অসুখী।

    না। পরিমাণের কথাটি তুমি বলো।

    আমি বললাম : আমরা তো দেখেছি, সুখের প্রকার হচ্ছে তিনটি : এক প্রকার সুখ হচ্ছে যথার্থ সুখ। অপর দুই প্রকার হচ্ছে অলীক সুখ। যে স্বৈরাচারী, সে বিধান এবং যুক্তিকে বর্জন করে এই অলীক সুখকেও অতিক্রম করে যায়। একদল দাসবৎ প্রবৃত্তির দ্বারা সে নিজেকে সর্বদা পরিবেষ্টিত রাখে। তার এই অধঃপতন বর্ণনার অতীত। তার অবস্থানটি দেখতে চেষ্টা করলে তুমি বলতে পার, কতিপয়ী থেকে শুরু করে ধারাক্রমে স্বৈরতন্ত্রীর অবস্থান হচ্ছে তৃতীয়। গণতন্ত্রীর অবস্থান হচ্ছে এদের উভয়ের মধ্যস্থলে।

    হ্যাঁ, তোমার একথা সত্য।

    এবং আমাদের যুক্তি যথার্থ হলে, স্বৈরতন্ত্রীর সুখ কতিপয়ীর সুখের চেয়ে তিনগুণ অলীক।

    ঠিক কথা।

    আবার কতিপয়ীর অবস্থান হচ্ছে দার্শনিক-শাসক থেকে শুরু করে ধারাক্রমে তৃতীয়।

    হ্যাঁ, তার অবস্থান দার্শনিক শাসক থেকে তৃতীয়।

    তা হলে যথার্থ সুখ থেকে স্বৈরতন্ত্রীর সুখের দূরত্ব অঙ্কের হিসাবে দাঁড়াচ্ছে তিনের তিন বা ৩ × ৩?

    হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে।

    তা যদি হয় তা হলে, স্বৈরতন্ত্রীর অলীক সুখের দূরত্ব সাধারণ সংখ্যার হিসাবেও একটি অখণ্ড সংখ্যা?

    অবশ্যই।

    এবার তুমি সংখ্যাটির বর্গ করো এবং তার ফলকে ঘনফলে পরিণত করো। তা হলেই তুমি বুঝতে পারবে যথার্থ সুখ থেকে স্বৈরতন্ত্রীর সুখের দূরত্বের দৈর্ঘ্য কত।

    সক্রেটিস, অঙ্কবিদের পক্ষে তোমার এ-দূরত্বের পরিমাণ বুঝতে অসুবিধে হবে না।

    আবার বিপরীত ক্রমেও তুমি যদি ঘনফলটি তৈরি কর, তা হলেও তুমি দেখবে, এই দু-এর দূরত্বের পরিমাণ হচ্ছে এরূপ যে, দার্শনিক-শাসক স্বৈরতন্ত্রীর চেয়ে সাতশত ঊনত্রিশ গুণ অধিক সুখী এবং স্বৈরতন্ত্রী দার্শনিক-শাসকের চেয়ে সাতশত ঊনত্রিশ গুণ অধিক অসুখী।

    গ্লকন বিস্ময়ের আর্তরব তুলে বললেন, ন্যায়বান আর অন্যায়ী—এদের উভয়ের জীবন এবং এদের সুখ এবং অসুখের ব্যবধান দেখাতে কী ভয়ংকর অঙ্কের হিসাবের কসরত, সক্রেটিস!

    আমি বললাম : তা বটে। কিন্তু হিসাবটি নির্ভুল। মানুষের জীবনে এটি ঠিক ঠিক মিলে যায়। কারণ মানুষের জীবনও আমরা দিন, রাত্রি, মাস এবং বর্ষের হিসাবে পরিমাপ করি।

    হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে নির্ভুল।

    এবং সুখের ক্ষেত্রে উত্তম এবং ন্যায়বান যদি অধম এবং অন্যায়ীর চেয়ে এত অধিক পরিমাণে শ্রেয়, তা হলে নীতির সৌন্দর্য এবং মূল্যের ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্ব যে সীমাহীন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, অবশ্যই সে সীমাহীনভাবে শ্রেষ্ঠ।

    আমি বললাম : এতক্ষণ তো মঙ্গলমতোই কেটেছে। এ-পর্যন্ত যখন আমরা এসেছি তখন সেই গোড়ার কথাটি, যা থেকে আমাদের শুরু—তাকে আবার স্মরণ করা যাক। আমার মনে হয় কথাটা ছিল এই : অন্যায় যদি ন্যায় বলে প্রতিভাত হতে পারে, তা হলে অন্যায়ীর সব অন্যায় হচ্ছে লাভজনক। অন্যায় কার্যেই লাভ অধিক।

    হ্যাঁ, কথাটা এরূপই ছিল।

    বেশ, এবার যখন আমরা ন্যায় এবং অন্যায়ের ফলাফল সম্পর্কে একমত হতে পেরেছি, তখন অভিমতটির প্রবক্তার সঙ্গে এখন কিছু আলাপ করা যাক। কী বল?

    তাকে আমরা কী বলব?

    আমরা মানুষের চরিত্রকে পুরনো উপাখ্যানের জন্তু যেমন, কিমেরা, সিলা, সারবিরাসের* সঙ্গে তুলনা করে তার কথার তাৎপর্যটি দেখিয়ে দেব।

    [কিমেরা (Chimaera) : ছাগ, সিংহ এবং সর্প—তিন জন্তুর দেহবিশিষ্ট বিকটাকার দানব। গ্রীক উপাখ্যানে আছে কোরিন্থের রাজপুত্র বেলারোফন এই দানবকে তার পক্ষযুক্ত অশ্ব দ্বারা হত্যা করে।
    সিলা (Scylla) : সামুদ্রিক দানব। ইংরেজিতে Scylla and Charybdis বলে একটি কথা আছে। ‘চেরিবডিস’ ছিল মেসিনা প্রণালীর একটি বিপজ্জনক আবর্ত। কথাটিতে উভয়সংকটের ভাব বিদ্যমান।
    সারবিরাস (Cerberus) : তিনটি কিংবা পঞ্চাশটি মুণ্ডুবিশিষ্ট পাতালপুীর দেবতা হেডিস- এর প্রহরী কুকুর।]

    হ্যাঁ, আমি এই কাহিনীগুলি জানি।

    গ্লকন, বেশ জটিল বহুমাথাবিশিষ্ট একটা জন্তুর তুমি কল্পনা করো। এ-জন্তুর যেমন বুনো মাথা আছে, তেমনি পোষা মাথা আছে। জন্তুটার মস্তকদেশ এইগুলি দিয়ে গঠিত। আর তার কী অদ্ভুত ক্ষমতা যে, সে ইচ্ছামতো এগুলোকে হিংস্র কিংবা বাধ্য স্বভাবে পরিণত করে ফেলতে পারে।

    গ্লকন বললেন : এমন জন্তু তৈরিতে কারিগরি আছে; যাহোক আমাদের পক্ষে কল্পনা করা, একে তৈরি করার চেয়ে সহজতর।

    এবার তুমি একটি সিংহের কল্পনা করো। সিংহের পরে একজন মানুষকে কল্পনা করো। বহুমাথা জন্তুর আকৃতি অবশ্যই প্রকাণ্ড। কিন্তু তার পরেই সিংহের আকার।

    সক্রেটিস তুমি বলে যাও, আমি কল্পনা করছি। কল্পনা করা সহজ।

    এবার এই তিন জন্তুকে মিলিয়ে তুমি একটা জন্তুতে পরিণত করো।

    করে ফেলেছি, সক্রেটিস।

    এবার গোটা জন্তুর উপর তিন জন্তুর এক জন্তুর, ধরো মানুষের বহিরাকার বসিয়ে দাও—যেন যে-দর্শকের পক্ষে বহিরাকার ভেদ করা সম্ভব হবে না সে যেন একে মানুষ বলেই গণ্য করে।

    যো হুকুম সক্রেটিস। এটিও করা হয়েছে।

    এবার তা হলে আমরা বলব, অন্যায়সাধনে লাভ এবং ন্যায়সাধনে লোকসান—এমন অভিমতের অর্থ দাঁড়ায়, এই বহুমাথা জন্তুকে যেমন ইচ্ছা তেমন করার স্বাধীনতা দেওয়া এবং এই জন্তুর এবং সিংহের চরিত্রকে শক্তিশালী করা, আর এর ভিতরের মানুষটিকে বুভুক্ষু ও অসহায় করে রাখা, যাতে পরিণামে এই জন্তুর দল দুর্বল মানুষটাকে নিয়ে যেমন খুশি তেমন করতে পারে। এ কথার অর্থ দাঁড়াবে, এই তিন শক্তির মধ্যে কোনো আপোস বা মিত্রতা স্থাপন না করা; বরঞ্চ তাদের পরস্পরকে দ্বন্দ্বমান, গর্জনকারী এবং পরস্পরকে ভক্ষণকারী অবস্থায় রেখে দেওয়া। ঠিক নয় কি?

    অন্যায়কারী এবং অন্যায় কর্মকে সমর্থন করার অর্থ তা-ই দাঁড়ায়।

    অপরদিকে ন্যায় সাধনেই লাভ—একথা বলার অর্থ হচ্ছে আমাদের সকল কথা এবং কাজ এমন হওয়া উচিত যাতে আমাদের অন্তরের মানুষটি শক্তিশালী হতে পারে, যেন সে বহুমাথা জন্তুটার দিকে কৃষকের ন্যায় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারে। কৃষক দেখবে, যেন আমাদের অন্তরের পোষা স্বভাবগুলি উৎসাহিত হতে পারে, যেন বন্য স্বভাবের বৃদ্ধি না ঘটে। সিংহকে বশ করে তার শক্তিকে সে সহায় করবে এবং সকলের স্বার্থরক্ষার্থে তার নিজের সঙ্গে অপর দুই বন্য শক্তির এবং দুই বন্য শক্তির পরস্পরের মধ্যে আপোস স্থাপন করবে।

    একথাও সত্য। ন্যায়কে সমর্থন করার অর্থ তা-ই।

    তা হলে অন্যায়ের প্রশংসা সর্বপ্রকারেই অন্যায় এবং ন্যায়ের প্রশংসা ন্যায়। কারণ তুমি তৃপ্তি, সুখ, সম্মান—যার কথাই ধর-না কেন, ন্যায়ের প্রশংসার অর্থ হচ্ছে সত্যকে প্রকাশ করা। অপরদিকে ন্যায়ের নিন্দা করার অর্থ হচ্ছে অজ্ঞতার প্রকাশ করা। তার অর্থ হচ্ছে, তুমি জান না তুমি কিসের সম্পর্কে তোমার অভিমত ব্যক্ত করছ।

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    কিন্তু আমাদের প্রতিবাদীর প্রতি আমাদের সদয় আচরণ করা উচিত। কারণ, তার যে-ভ্রম সে তার ইচ্ছাকৃত ভ্রম নয়। আমরা তাকে উদ্দেশ করে বলব : “প্রিয়বর, সাধারণ নীতির লক্ষ্যটি কী? যেটাকে আমরা সঙ্গত আচরণ বলে আখ্যায়িত করি তার উদ্দেশ্য তো আমাদের অন্তরের জন্তুকে আমাদের অন্তরের মানুষের বশ করা। কিংবা বলতে পারি, ঐশ্বরিক স্বভাবের অধীনে বন্যকে বশ করা। অপরদিকে অন্যায় কর্ম করার অর্থ আমাদের অন্তরের মানুষকে বন্যের দাসে পরিণত করা।” আমাদের একথার সঙ্গে তাকে অবশ্যই একমত হতে হবে। নয় কি?

    হ্যাঁ, সক্রেটিস, সে আমার বাধ্য হলে কথাটি স্বীকার করবে।

    তা হলে এই হিসাবে আমরা কি বলতে পারি, কেউ যদি অন্যায় উপায়ে অর্থ উপার্জন করে এবং সে-উপার্জন যদি তার আত্মার উত্তমকে অধমে পরিণত করে তা হলেও সে-কর্ম তার জন্য লাভজনক? নিশ্চয়ই কেউ বলবে না যে, উচ্চ মূল্য পেলেই পুত্র কিংবা কন্যাকে দাস হিসাবে নিষ্ঠুর প্রভুর কাছে বিক্রি করে দেওয়া তার পক্ষে লাভজনক কর্ম। মূল্য যতই উচ্চ হোক, এমন কথা সে বলতে পারে না। অনুরূপভাবে কেউ যদি আপন চরিত্রের যেটি দেবোপম অংশ তাকে নিষ্ঠুর দানবের দাসে পরিণত করে, তা হলে তাকে আমরা কোনো লাভজনক কর্ম বলতে পারিনে। এ হচ্ছে এক মর্মান্তিক লেনদেন। এ ফল এরিফাইল-এর সেই কাহিনীর চেয়েও কি মারাত্মক নয়, যেখানে এরিফাইল তার একটি কণ্ঠহারের জন্য নিজের স্বামীর জীবনকে বিক্রি করে দিয়েছিল?

    আমাদের প্রতিবাদীর পক্ষ হয়ে আমি বলব, অবশ্যই এ-কাজ তার চেয়েও মারাত্মক।

    আত্ম-অসংযমকে সর্বদা নিন্দা করা হয় কেন? সে কি এই কারণে নয় যে, অসংযম আমাদের ভিতরের সেই বহুআকৃতির দানবকে বল্গাহীন করে দেয়?

    অবশ্যই।

    এবং গোঁড়ামি এবং রূঢ় মেজাজকেও নিন্দা করা হয়, কারণ, আমাদের চরিত্রের এই উপাদান আমাদের অন্তরের সিংহ এবং ড্রাগনকে অমিততেজি করে তোলে। আবার চরিত্রের বিলাসিতা এবং নারীসুলভ নমনীয়তার আধিক্য আমাদের তেজকে নির্বাপিত করে আমাদেরকে কাপুরুষে পরিণত করে। একথাও কি ঠিক নয়?

    হ্যাঁ, একথাও ঠিক।

    তেমনি, আমরা তোষামোদ এবং হীনমন্যতার নিন্দা করি, কারণ এরা আমাদের চরিত্রের সাহসকে জন্তুর হিংস্রতার অধীন করে ফেলে। পরিণামে এই হিংস্র জন্তু তার লোভ এবং অর্থগৃধু প্রবৃত্তির তৃপ্তির জন্য আমাদের অন্তরের সিংহকে সকল অমর্যাদাকে সহ্য করার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাকে অনুকারী বানরে পরিণত করে।

    যথার্থ বলেছ, সক্রেটিস।

    এবং দৈহিক শ্রমের আমরা নিন্দা করি কেন? এর কারণ কি এই নয় যে, এরূপ শ্রম আমাদের চরিত্রের উত্তমাংশের একটা দুর্বলতাকে প্রকাশ করে? আমাদের চরিত্র যখন তার পাশব অংশকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে দৈহিক শ্রমের মাধ্যমে তাকে সেবা করে তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে।

    হ্যাঁ, আমারও তা-ই মনে হয়।

    এবং যাতে এই স্বভাবের মানুষও উত্তম চরিত্রের মানুষের ন্যায় একই নিয়ন্ত্রণের অধীন থাকে সেজন্য আমরা বলেছিলাম, মানুষের পাশব দিককে উত্তম দিকের অধীন হতে হবে। এ-নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য থ্র্যাসিমেকাস যেমন মনে করেছেন তেমন নয়। কারণ, জ্ঞানের অধীন থাকা সকল মানুষের জন্যই মঙ্গলকর। কিন্তু জ্ঞান এবং নিয়ন্ত্রণ যদি ব্যক্তির আপন অন্তর থেকে আসে তবে অধিকতর মঙ্গল। কিন্তু অন্তর থেকে যদি এ-নিয়ন্ত্রণ না আসে, তবে বাইরে থেকেই ব্যক্তির উপর তাকে আরোপ করতে হবে, যেন সকল মানুষ একই নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহোদর এবং সমান জনের আচরণ করতে পারে।

    এ তো অত্যন্ত সঙ্গত কথা।

    আমাদের রাষ্ট্রে আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই। সকল নাগরিকেরই সে মঙ্গল কামনা করে। এই কারণেই আমরা শিশুদের নিয়ন্ত্রণ করি। তাদের অন্তরে স্বশাসন প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত আমরা শিশুদের অবাধ স্বাধীনতা দান অমঙ্গলকর বিবেচনা করি। তাদের মধ্যে যা উত্তম তাকে আমরা শিক্ষিত করে তুলব, যেন আমাদের মধ্যে যা উত্তম তাকে তারা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।

    একথা অবশ্যই যথার্থ।

    প্রিয় গ্লকন, তা হলে আমরা কেমন করে বলতে পারি, অন্যায়, অসংযম বা কোনো অধম আচরণ বা অধম কার্যসাধন হচ্ছে লাভজনক? এমন কার্য আমাদের সম্পদ দিতে পারে, শক্তি দিতে পারে, কিন্তু সে একই সঙ্গে আমাদের অধম মানুষে পর্যবসিত করে।

    না, এমন কার্যকে আমরা লাভজনক বলতে পারিনে।

    তা ছাড়া, যে অন্যায় কার্য সাধন করেছে, সে আইনের হাতে ধৃত না হয়ে যদি দণ্ডকে ফাঁকি দিতে পারে, তা হলে তাতে তার কি লাভ অর্জিত হতে পারে? দণ্ডকে ফাঁকি দিয়ে সে কি অধিকতর অধমে পর্যবসিত হয় না? অপরদিকে, সে যদি আইনের হাতে ধৃত হয় এবং দণ্ডিত হয়, তা হলে কি তার অন্তরের পশুই ধৃত এবং বাধ্য হয়ে ওঠে না? আর তার অন্তরের পশু যত বাধ্য হয়ে ওঠে, তার চরিত্রের উত্তম অংশ ঠিক তত মুক্তিলাভ করে না? এবং এর অর্থ কি এই নয় যে, এর মাধ্যমে তার চরিত্রের যে-স্বাভাবিক গুণ তা বিকাশলাভের সুযোগ পায়? ফলে তার এমন চরিত্র গঠিত হয়, যে-চরিত্রে ন্যায়পরায়ণতা এবং আত্মসংযমের সম্মিলন সংঘটিত হয়েছে। এটাই হচ্ছে তার যথার্থ লাভ। আত্মা যেমন দেহের চেয়ে মূল্যবান, তেমনি এই লাভ দেহের শক্তি, স্বাস্থ্য এবং মনোহর শোভার চেয়ে অধিক মূল্যবান।

    তোমার কথা নিশ্চিতই সত্য।

    বুদ্ধিমান ব্যক্তির এই হবে জীবনের লক্ষ্য। সেই অধ্যয়ন এবং শিক্ষাকেই সে মূল্যবান বিবেচনা করবে যে-অধ্যয়ন এবং শিক্ষা তার আত্মা এবং চরিত্রকে উপযুক্তরূপে গঠিত করবে। স্বাস্থ্য এবং শরীরচর্চার ক্ষেত্রেও তার চিন্তা কেবল পাশব এবং যুক্তিহীন আনন্দকে ভোগ করা হবে না। বস্তুত, স্বাস্থ্যই তার প্রধান লক্ষ্য নয়। আত্মসংযম যদি সঙ্গী না হয় তাহলে শক্তি, স্বাস্থ্য এবং মনোহারিতার কোনো মূল্য নেই। তা-ই আদর্শ চরিত্রকে সর্বদা দৈহিক সুখকে নীতি এবং যুক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থায় রক্ষা করতে হবে।

    হ্যাঁ, সত্যের সঙ্গে যদি তার সঙ্গতি রক্ষা করতে হয়, তা হলে তাকে বুদ্ধির সঙ্গে অবশ্যই দৈহিক সুখের সঙ্গতি রক্ষা করতে হবে।

    সম্পদের ক্ষেত্রেও কি তাকে এই একই সঙ্গতি রক্ষা করতে হবে না? তা-ই সুখের সাধারণ প্রচলিত ধারণা দ্বারা তার বিভ্রান্ত হলে চলবে না। জনমতে বিভ্রান্ত হয়ে সম্পদের পাহাড় তৈরি করে নিজের জন্য সীমাহীন সংকট সৃষ্টি করা তার জন্য মঙ্গলকর হবে না।

    আমিও তা-ই মনে করি, সক্রেটিস।

    কারণ, তার ব্যয় কিংবা সঞ্চয়—সবই পরিচালিত হবে তার অন্তরের স্বশাসনের নীতির ভিত্তিতে। তার একমাত্র লক্ষ্য হবে, যেন তার এই নীতি সম্পদ কিংবা দারিদ্র্যের আধিক্যে বিপর্যস্ত হয়ে না যায়।

    খুবই সত্য কথা।

    সম্মান—সে ব্যক্তিগত কিংবা রাষ্ট্রীয়—যা-ই হোক, উভয় ক্ষেত্রে উত্তমকে এই নীতিই অনুসরণ করতে হবে। যদি এরূপ সম্মান তাকে অধিকতর উত্তম করে, তবে সে তাকে গ্রহণ করবে এবং তাকে ভোগ করবে। যদি সে মনে করে এ-সম্মান তার অন্তরের শাসনকে বিনষ্ট করবে, তা হলে তাকে সে পরিহার করবে।

    গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, এই যদি তার লক্ষ্য হয় তা হলে সে অবশ্যই রাজনীতিতে প্রবেশ করবে না।

    আমি বললাম : কেন গ্লকন? অবশ্যই যে-রাষ্ট্র তার উপযুক্ত রাষ্ট্র তার রাজনীতিতে সে অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু কেবল জন্মের কারণে যে-রাষ্ট্র তার, সে-রাষ্ট্রের রাজনীতিতে সে অংশগ্রহণ করবে না। কেবল অভাবিত কোনো ঘটনাই তার এ-নীতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

    তোমার কথাটি আমি বুঝতে পারছি, সক্রেটিস। তুমি বলতে চাচ্ছ, যে-রাষ্ট্রের আমরা বর্ণনা করছি এবং তত্ত্বগতভাবে যাকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করছি তার পরিচালনায় সে অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু এমন আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তব জগতে কখনো অস্তিত্বময় হবে কি না তা-ই আমার সন্দেহ।

    আমি বললাম : তা হলেও আমাদের এই রাষ্ট্র আদর্শ হিসাবে স্বর্গে দীপ্যমান থাকবে। যারা তাকে প্রত্যক্ষ করার বাসনা পোষণ করবে, তারা তাকে অবশ্যই দেখতে পাবে এবং নিজেদের অন্তরে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। কিন্তু গ্লকন, সেটি বড় কথা নয়। আমাদের এই রাষ্ট্র কোথাও অস্তিত্বময় থাকুক, কোনোদিন সে অস্তিত্বময় হোক, কিংবা না হোক—এই হচ্ছে একমাত্র রাষ্ট্র যার রাজনীতিতে যে উত্তম সে অংশগ্রহণ করতে পারে।

    আমিও তা-ই মনে করি, সক্রেটিস।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার
    Next Article প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Our Picks

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }