৬. রাষ্ট্র সংগঠনের উপাদান
অধ্যায় : ৬ [৩৬৮–৩৭২]
রাষ্ট্র সংগঠনের উপাদান
কাজেই সক্রেটিসের দায়িত্ব হচ্ছে ন্যায়কে তার স্বরূপে দেখানো। ব্যক্তির আত্মায় ফলাফল নির্বিশেষে তার অবস্থা কীরূপ তা স্থির করা। এ অবশ্যই কঠিন কাজ। এ-দায়িত্বপালনের একটি নূতন উপায় সক্রেটিস উদ্ভাবন করলেন। তাঁর মতে ব্যক্তি হচ্ছে ক্ষুদ্র একক। সরাসরি তার মধ্যে ন্যায়কে প্রত্যক্ষ করা কঠিন। রাষ্ট্র হচ্ছে ব্যক্তিরই বৃহত্তর প্রতিরূপ। সেই বৃহত্তর প্রতিরূপের মধ্যে ন্যায়কে অন্বেষণ করা এবং খুঁজে পাওয়া সহজতর হবে। তাঁর মতে, চোখের ডাক্তার রুগির চোখের শক্তি বড় হরফ দিয়েই পরীক্ষা করতে শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে তিনি ছোট হরফে যান। তেমনি যদি আমরা স্থির করতে পারি কোন্ নীতিতে একটি রাষ্ট্র ন্যায়পরায়ণ রাস্ট্রে পরিণত হয়, তা হলে পরবর্তী পর্যায়ে বক্তির মধ্যে সে-নীতির প্রতিফলন এবং তার প্রতিফল স্থির করা সহজ হবে। কিন্তু তৈরি রাষ্ট্রে ন্যায়ের সাক্ষাৎ মিলতে পারে না। প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ন্যায়পরায়ন বা উত্তম রাষ্ট্র হলে আজকে এই ন্যায়ের সংকট সৃষ্টি হত না। ন্যায়কে অন্বেষণ করার আবশ্যক হত না। রাষ্ট্রকে অবিকৃত এবং স্বাভাবিকভাবে তৈরি করেই তার মধ্যে ন্যায়ের রূপটিকে দেখতে পারা যাবে। তাই রাষ্ট্রকে তৈরি করা আবশ্যক। এ-কারণেই সক্রেটিস গোড়া থেকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় উপাদান দিয়ে রাষ্ট্র রচনা করতে এবার শুরু করলেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। সক্রেটিসের এই রাষ্ট্ররচনা রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বিকাশের কোনো প্রতিফলন নয়। ঐতিহাসিক কোনো পর্যায়ক্রম প্লেটো এখানে অনুসরণ করছেন না। সমসাময়িক গ্রীসীয় নগররাষ্ট্র আদিতে যেমন করে গঠিত হয়ে থাকতে পারে তারই একটি কল্পনা এখানে উপস্থিত করা হচ্ছে। এরূপ রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিশ্লেষণ করে তার মূল উপাদানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে গঠন করা হচ্ছে। উপাদানগুলি সক্রেটিসের নিজস্ব যুক্তির পর্যায়ক্রম অনুসরণ করছে; সক্রেটিস ঐতিহাসিক উপাদানের বাস্তব কোনো বিকাশক্রম অনুসরণ করছেন না।
এই যৌক্তিক গঠনে প্লেটো রাষ্ট্রগঠনের সামাজিক চুক্তিমূলক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। তাঁর মতে, মানুষের কোন কৃত্রিম চুক্তির ফলে রাষ্ট্র উদ্ভূত হয়েছে; কাজেই রাষ্ট্র প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক সংগঠন নয়,একথা ঠিক নয়। কিংবা রাষ্ট্র মানুষের আদিকালের যদৃচ্ছা চলার অবস্থাকে বিনষ্ট করে দিয়েছে এরূপ ধারণাও ঠিক নয়। আসলে মানুষ কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসাবে জন্মগ্রহণ করে না। কিন্তু এক মানুষ অপর মানুষ থেকে অভিন্নও নয়। তারা যেমন অসম্পূর্ণ তেমনি গুণগতভাবে বিভিন্ন। এ-কারণেই এককে অপরের উপর নির্ভর করতে হয়। রাষ্ট্র হচ্ছে একটি পরস্পরনির্ভরশীল সংগঠন। মানুষের স্বভাব এবং প্রয়োজন থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। তাই রাষ্ট্র অবশ্যই স্বাভাবিক সংগঠন; অস্বাভাবিক কিংবা কৃত্রিম নয়। এবং সে অপ্রয়োজনীয় নয়। সে অপরিহার্য।
সংলাপের এই অংশটিতে সক্রেটিস প্রধানত মানুষের অর্থনীতিক প্রয়োজন এবং এই প্রয়োজন পূরণে যে-মানুষের যেরূপ দক্ষতা সেই মানুষের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে গঠন করছেন। বর্তমানে জোর হচ্ছে মানুষে মানুষে গুণ এবং দক্ষতার ক্ষেত্রে বিভিন্নতার উপর। স্বভাবগতভাবে যার যে-গুণ আছে সেই গুণের পরিচর্যায় সে দক্ষ হয়ে উঠলে পরেই মাত্র তার কাছ থেকে সমাজ সর্বোত্তম উপকার অর্জন করতে পারে, সে-ও সমাজকে তার সর্বোত্তম দান করতে পারে। শ্রমের বিভাগ এবং বিশেষকরণের এই মূলনীতিটি প্লেটো এখানে প্রকাশ করছেন। এই মূলনীতিটিই রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাতেও প্লেটো পরবর্তীকালে প্রয়োগ করবেন।
এই প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রগঠনের জন্য প্লেটো পাঁচটি অর্থনীতিক শ্রেণীর প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করছেন। এই শ্রেণীগুলি হচ্ছে : ১. উৎপাদক : কৃষকএবং কারিগর; ২. বণিক বা আমদানিকারক; ৩. নাবিক এবং নৌযান মালিক; ৪. ব্যবসায়ী; ৫. শ্রমিক বা দৈহিক শ্রম ভাড়াদানকারী দিনমজুর।
রাষ্ট্রগঠনের ক্ষেত্রে কোন্ কোন্ শ্রেণীর লোকের আবশ্যক তার আমরা উল্লেখ পাচ্ছি। কিন্তু এদের মধ্যে দাসের কোনো উল্লেখ নেই। অথচ এথেন্স নগরীর দাসের সংখ্যা নগরীর সমগ্র জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের অধিক বই অল্প ছিল না। বিষয়টি তাই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু এর কারণ এই নয় যে প্লেটো প্রচলিত দাস ব্যবস্থাকে অন্যায় বলে বিবেচনা করছেন। দাসরা অন্যদের মতো প্লেটোর নিকটও একটি স্বীকৃত এবং অপরিহার্য উপাদান ছিল। কিন্তু দাসরা নাগরিক নয়। এবং রাষ্ট্র তো নাগরিকদের দ্বারাই গঠিত হবে। কাজেই রাষ্ট্রগঠনের বর্ণনাতেও দাসদের কোনো উল্লেখের আবশ্যকতা প্লেটো বোধ করেন না।
.
গ্লকন এবং এ্যাডিম্যান্টাসের বুদ্ধির প্রাখর্যকে আমি সব সময়েই প্রশংসা করেছি। কিন্তু এবার তাঁদের যুক্তি শুনে আমি যথার্থই চমৎকৃত হয়ে গেলাম। তাই উৎসাহের প্রাবল্যে আমি বলে উঠলাম : খ্যাতিমান পিতার বংশধরগণ! তোমাদের আমি ধন্যবাদ জানাই। মেগারার যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তোমরা যখন প্রত্যাবর্তন করেছিলে তখন গ্লকনকে উদ্দেশ করে তার স্তুতিগায়ক বলেছিল : এ্যারিস্টনের পুত্রদ্বয় দেবতাদের বরপুত্র-বিশেষ। তোমাদের যুক্তি যে এমন স্তুতির উপযুক্ত তা বলতে আমার দ্বিধা নেই। কারণ দেবতার বরপুত্র বাদে এমন অপরূপভাবে একদিকে অন্যায়ের শ্রেয়তার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন এবং অপরদিকে নিজেদের সেই দুর্বার যুক্তিতে আস্থা স্থাপন না করার কথা উচ্চারণ করা আর কোন্ মানবপুত্রের পক্ষে সম্ভব! কারণ, এ্যাডিম্যান্টাস, আমি মনে করি, তোমরা নিজেদের যুক্তিকে নিজেরাই বিশ্বাস করছ না। তোমাদের যথার্থ স্বভাবকে যদি আমি না জানতাম তা হলে হয়তো তোমাদের মুখের কথাকেই আমি অধিক মূল্য দিতাম। কিন্তু আমি তোমাদের জানি বলেই, তোমাদের উপর আমার আস্থা যত প্রবল হচ্ছে, তোমাদের মুখের কথা অনুধাবন করা আমার পক্ষে তত দুরূহ হচ্ছে। বলা চলে আমি এক উভয়সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়েছি। একদিকে আমার আশঙ্কা, আমার যুক্তির উপর তোমাদের আস্থা উৎপাদনের গুরুদায়িত্বে আমি হয়তো-বা অক্ষম। কারণ, অন্যায়ের চেয়ে ন্যায়ের শ্রেয়তার প্রশ্নে থ্র্যাসিমেকাসকে আমি যে-জবাব দিয়েছিলাম সে-জবাবে তোমরা সন্তুষ্ট হতে পারনি। অপরদিকে যুক্তির ক্ষেত্র থেকে অপসরণেরও আমি কোনো উপায় দেখছিনে। কারণ ন্যায়ের অপবাদে তার পক্ষ অবলম্বন না করে নীরব থাকার মধ্যে একটা পাপবোধের যে প্রশয় রয়েছে সে-সত্যকেও আমি অস্বীকার করতে পারিনে। তাই আমার ক্ষমতানুযায়ী আক্রান্ত ন্যায়ের সাহায্যে অগ্রসর হওয়াই আমার কর্তব্য বলে আমি বিবেচনা করছি।
গ্লকন এবং তাঁর সঙ্গীগণও আমাকে নানাভাবে অনুরোধ করতে লাগলেন যেন আলোচনাটি পরিত্যাগ না করে সত্যানুসন্ধানের কাজটি আমি চালিয়ে যাই। সত্য নির্ধারণে তাঁদের দাবি প্রধানত দুটি : প্রথমত ন্যায় এবং অন্যায়ের সঠিক চরিত্র নির্দিষ্টকরণ এবং দ্বিতীয়ত উভয়ের লাভালাভ স্থিরীকরণ। এক্ষেত্রে আমি তাঁদের নিকট আমার মনের কথাটি খুলে বললাম। আমি বললাম : সত্যানুসন্ধানের এ-কাজ বিশেষ কঠিন কাজ। কাজেই সত্যোপলব্ধির জন্য আবশ্যক হবে উপযুক্ত দৃষ্টি। এ-ব্যাপারে আমাদের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার কথা চিন্তা করে আমি বললাম, এ-কারণে সত্য নির্ধারণের একটি উপযুক্ত পদ্ধতি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় এই পদ্ধতিকে বোঝাবার জন্য আমি আমার সঙ্গীদের নিকট একটি উপমার উল্লেখ করলাম। আমি বললাম, ধর ক্ষীণদৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন কোনো লোককে দূর থেকে ক্ষুদ্র অক্ষরে লিপিবদ্ধ কোনো পত্র পাঠ করতে বলা হল। কিন্তু একথা বোঝা সহজ যে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ এবং অক্ষর ক্ষুদ্র হওয়ার কারণে এ-পত্র এই ব্যক্তি পাঠ করতে সক্ষম হবে না। এমন অবস্থায় এরূপ অসম্ভব নয় যে, বুদ্ধিমান কোনো ব্যক্তি বলে উঠবে : দেখা যাক- না বৃহৎ অক্ষরে অনুরূপ কোনো পত্র পাওয়া যায় কি না। তা হলে এই ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হলেও বৃহৎ অক্ষর সে পাঠ করতে পারবে। এবং পরে ক্ষুদ্র অক্ষর অনুধাবন করাও তার পক্ষে সম্ভব হবে। অবশ্য বৃহৎ অক্ষরে অনুরূপ পত্ৰ পাওয়াটা সহজ হবে না। পাওয়া গেলে তাকে বিশেষ সৌভাগ্যের কথাই বলতে হবে। কী বল এ্যাডিম্যান্টাস?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা যথার্থ। কিন্তু সক্রেটিস, এ-উপমা আমাদের বর্তমান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তুমি কীভাবে প্রয়াগ করবে?
আমি বললাম : আমি বুঝিয়ে বলছি। ন্যায়ের চরিত্র-নির্ধারণই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। আর একথা তোমরা জান যে, এই ন্যায়কে কখনো আমরা ব্যক্তির ধর্ম, কখনো তাকে রাষ্ট্রের ধর্ম বলে অভিহিত করি। একথা ঠিক নয় কি?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা ঠিক।
বেশ! কিন্তু ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র কি বৃহৎ নয়?
অবশ্যই।
তাই যদি হয় তা হলে বৃহত্তরের মধ্যেই ন্যায়ের পরিমাণ যেমন অধিক পাওয়া যাবে, তেমনি তার মধ্যেই তা সহজে আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে। এ-কারণেই আমার প্রস্তাব হচ্ছে, এসো আমরা প্রথমে বিবেচনা করে দেখি, রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায় এবং অন্যায় কীভাবে প্রতিভাত হয়। এর পরে ব্যক্তির মধ্যে বিষয়টিকে অনুধাবন করার আমরা চেষ্টা করব। এভাবেই বৃহত্তর থেকে যেমন ক্ষুদ্রতরের দিকে আমরা অগ্রসর হতে পারব, তেমনি উভয়কে তুলনাক্রমে আমরা বিচার করতেও সক্ষম হব।
এ্যাডিম্যান্টাস উৎসাহিত হলেন। তিনি বললেন : সক্রেটিস, এটি অতি উত্তম প্রস্তাব।
আমার প্রস্তাবের সুবিধা হচ্ছে এই যে, আমরা যদি রাষ্ট্রের উদ্ভব প্রক্রিয়াকে লক্ষ করি তা হলে ন্যায় এবং অন্যায়ের উদ্ভবের ধারাটিকেও আমরা উপলব্ধি করতে পারব।
নিঃসন্দেহে।
রাষ্ট্রের বিশ্লেষণ শেষ করে আমরা দেখব, আমাদের মূল লক্ষ্যটি ইতিমধ্যেই নজরের মধ্যে এসে গেছে এবং তাকে আবিষ্কার করা সহজতর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হ্যাঁ। অবশ্যই অনেক সহজ হবে।
আমি বললাম : কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস ভেবে দ্যাখো, কাজটি বেশ কঠিন হবে। এ-কাজ শুরু করা কি আমাদের উচিত হবে?
এ্যাডিম্যান্টাস দমলেন না। বললেন, আমি ভেবে দেখেছি সক্রেটিস। আমি তোমার অগ্রসর হওয়ার জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করে আছি।
আমি বললাম : বেশ, তা হলে শুরু করা যাক। রাষ্ট্রের কথা বলছিলাম। ভেবে দ্যাখো, রাষ্ট্রের উদ্ভব কেমন করে ঘটে। আমার মতে মানুষের প্রয়োজন থেকেই রাষ্ট্রের উদ্ভব। ব্যক্তি হিসাবে আমরা কেউই স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই অভাব রয়েছে। এমন ক্ষেত্রে প্রয়োজনের বাইরে রাষ্ট্রের উ ৎপত্তির অপর কোনো কারণের কথা কি আমরা চিন্তা করতে পারি?
না, অপর কোনো কারণের কথা আমরা চিন্তা করতে পারিনে।
আমাদের অভাব বা প্রয়োজনের সংখ্যা একটি নয়—অনেক। এজন্য সে অভাব পূরণের জন্য আবশ্যক হয় অনেক লোকের। কোনো বিশেষ অভাবপূরণের জন্য আমরা বিশেষ লোককে নিয়োগ করি। অপর কোনো অভাবের জন্য অপর কোনো লোক নিযুক্ত হয়। অবশেষে অভাবপূরণের ক্ষেত্রে নিয়োজিত এই সাহায্যকারীগণ এবং সঙ্গীগণ যখন একটি নির্দিষ্ট লোকালয়ে সম্মিলিত হয় তখন যে-সংস্থার উদ্ভব ঘটে, তাকে আমরা রাষ্ট্র বলে অভিহিত করি।
একথা যথার্থ।
এই সংস্থার অধিবাসীদের মধ্যে তখন বিনিময়ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। পরস্পরের পরিশ্রমের ফলের বিনিময় ঘটে। বিনিময় ঘটে, কারণ এরূপ বিনিময়কে আমরা পরস্পরের জন্য লাভজনক বলে বিবেচনা করি।
অবশ্যই।
এসো এ্যাডিম্যান্টাস, এবার মনেমনে আমরা এরূপ একটি রাষ্ট্রের পত্তন করি। অবশ্য এর উৎপত্তি মনোগত হলেও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না এর মূলে রয়েছে আমাদের অভাব বা প্রয়োজন। কেননা প্রয়োজনই হচ্ছে আবিষ্কারের প্রসূতি।
না, আমরা ভুলব না, প্রয়োজনই আবিষ্কারের প্রসূতি।
বেশ। কিন্তু কোন্ প্রয়োজন আমাদের সর্বাধিক? আমাদের সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিক প্রয়োজন হচ্ছে নিশ্চয়ই খাদ্যের। কারণ জীবন এবং অস্তিত্বের মূলে রয়েছে খাদ্য।
এতে আর সন্দেহ কী?
এর পরে আসে বাসস্থানের প্রয়োজন। এবং পরে আসে পর্যায়ক্রমে পরিধেয়-সামগ্রীর প্রয়োজন এবং অন্যান্য আবশ্যকীয় দ্রব্যাদির প্রশ্ন।
একথাও সত্য।
এবার দেখা যাক যে-নগরের কথা আমরা চিন্তা করছি সেখানে এ-সমস্ত প্রয়োজনের যোগান কেমন করে হবে? এর একটা সমাধান হচ্ছে বিশেষ রকম প্রয়োজন পূরণের জন্য বিশেষ রকম লোকের নিয়োগ। এমন হতে পারে যে, কোনো লোক আমাদের খাদ্যসামগ্রী তৈরি করবে এবং বাসস্থান তৈরির জন্য থাকবে অপর কোনো লোক। পরিধেয়র জন্য তন্তুবায়কে আমরা নিযুক্ত করতে পারি। প্রয়োজন হলে পাদুকা প্রস্তুত করার জন্যও লোক নির্দিষ্ট করা যেতে পারে এবং শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যও অপর কোনো লোককে নিয়োগ করা যায়। কী বল এ্যাডিম্যান্টাস?
অবশ্যই সক্রেটিস। তাও আমরা করতে পারি।
মোট কথা রাষ্ট্রসংস্থার যে-কোনো প্রাথমিক চিন্তায় চার-পাঁচ রকম লোকের কথা তোমাকে অবশ্যই ভাবতে হবে।
তাতে আর সন্দেহ কী, সক্রেটিস
বেশ তা-ই যদি হয়, তা হলে এবার চিন্তা করা যাক, এদের পারস্পরিক সম্পর্ক কী হবে। তাদের কাজের প্রক্রিয়া কেমন হবে? পাঁচরকম লোকের কথা আমরা বলেছি। এদের মধ্যে খাদ্য উৎপাদনকারীর কথা ধরা যাক। সে কী করবে? সে কি তার নিজের খাদ্যসংস্থান ছাড়া অপর চারজনের জন্যও খাদ্য তৈরি করবে? তেমন হলে তাকে নিজের ছাড়া আরও চারগুণ পরিশ্রম করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তার এই মোট পরিশ্রমের ফল কি সে সম্মিলিত ভাণ্ডারে এনে জমা করবে, না সে তার পরিশ্রমের এক-চতুর্থাংশ দ্বারা কেবল নিজের খাদ্যেরই সংস্থান করবে এবং অপরের খাদ্যের জন্য আদৌ কোনো পরিশ্রম করবে না? এভাবে এক-চতুর্থাংশ সময়ের খাদ্যেই তার নিজের চলে যাবে। বাকি তিন-চতুর্থাংশ সময় সে তার নিজের পরিধেয়, বাসস্থান এবং পাদুকা তৈরিতে ব্যয় করতে পারবে। মোটকথা, জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে অপরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তার নিজের যা প্রয়োজন তা সে নিজেই পূরণ করবে।
এ-সমস্যার ক্ষেত্রে আমার মনে হল এ্যাডিম্যান্টাসের মনোভাব হচ্ছে খাদ্য উৎপাদনকারী কেবল খাদ্যই উৎপাদন করবে, প্রয়োজনের সকল দ্রব্য নয়।
তাঁর মনোভাবের কথা খেয়াল রেখে আমি বললাম : হয়তো এমন পদ্ধতিই উত্তম। কিন্তু সাথে সাথে একথা তো আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, আমাদের সকলের প্রকৃতি এক নয়। আমাদের প্রকৃতিতে বিভিন্নতা আছে। কোনো বিশেষ প্রকৃতি হয়তো বিশেষ কাজের জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত।
তোমার একথা খুবই সত্য, সক্রেটিস।
আর তা ছাড়া এক ব্যক্তি যদি একাধিক রকমের কাজ করে তা হলে কি আমরা তার কাছ থেকে উত্তম ফলের আশা করতে পারব? অথবা এক ব্যক্তি কেবল একপ্রকার কাজে নিবদ্ধ থাকলেই আমরা উৎকৃষ্ট ফললাভের আশা করতে পারব?
সে যদি একপ্রকার কাজ করে তা হলেই সে উত্তমভাবে তা করতে পারবে। আবার সময়ের প্রশ্নটি রয়েছে। ঠিক সময়ে কাজ করা না হলে কাজটা আদতেই পণ্ড হয়ে যেতে পারে।
তা ঠিক।
কারণ, কেউ একটা কাজ করলে সেটা সম্পন্ন করে অবসর পেলে সে অন্য কাজ শুরু করতে পারবে, তার পূর্বে নয়। যে-কাজ সে শুরু করেছে তাকে শেষ না করা পর্যন্ত অপর কাজের অবসর পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো কাজ তো কর্মীর অবসরের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারে না।
সেকথাও ঠিক।
তাহলে আমরা এরূপ অনুমান করতে পারি যে, কাজের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ফল কেবলমাত্র তখনই আমরা লাভ করতে পারি যখন একজন লোক একপ্রকার কাজেই নিবদ্ধ থেকে উপযুক্ত সময়ে কাজটি সম্পন্ন করে। এ-পদ্ধতির মাধ্যমেই পরিমাণ এবং গুণ উভয়ের উৎকৃষ্টতাই আমরা লাভ করতে পারি।
নিঃসন্দেহে।
তা-ই যদি হয়, তা হলে কেবল চার রকম লোকেই আমাদের রাষ্ট্রের সমগ্র কাজ নিষ্পন্ন হবে না। কারণ, তখন যে খাদ্য উৎপাদন করবে নিশ্চয়ই লাঙল, জোয়াল, মই অর্থাৎ কৃষিকার্যের যন্ত্রপাতি উৎপাদন তার পক্ষে সম্ভব হবে না। সম্ভব হবে না এজন্যই যে, একাধিক কাজের জন্য তা হলে এর কোনো উৎকৃষ্টতা থাকবে না। তেমনি যে গৃহনির্মাণ করবে সেও নিশ্চয়ই গৃহনির্মাণের যন্ত্র নির্মাণ করবে না। তার জন্যও অপর লোকের প্রয়োজন হবে। তন্তুবায় কিংবা পাদুকা নির্মাণকারীর ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য।
হ্যাঁ, একথা তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তা হলে দেখা যাচ্ছে, যে-ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটির আমরা কল্পনা করেছিলাম তা খুব ক্ষুদ্র থাকছে না। সেখানে সূত্রধর, কর্মকার এবং অপরাপর অন্যান্য অনেক কারিগরেরই প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। এদের সহযোগেই আমাদের রাষ্ট্র গড়ে উঠছে।
তা-ই তো দেখা যাচ্ছে।
কেবল তন্তুবায় কিংবা পাদুকা নির্মাণকারীই নয়, এদের সঙ্গে মেষপালক, রাখাল ইত্যাদির কথাও আমাদের ভাবতে হয়। কারণ, যে হাল চাষ করবে তার তো গো-মহিষের প্রয়োজন হবে। তন্তুবায়দেরও পরিধেয় তৈরির জন্য পশমের প্রয়োজন হবে। অবশ্য এদের যোগ করলেই যে আমাদের রাষ্ট্র খুব বৃহৎ আকার ধারণ করবে, এমন নয়।
তা নয়। কিন্তু এদের সহ রাষ্ট্র আমাদের খুব ক্ষুদ্রও হবে না, সক্রেটিস।
নগরের আর-একটা দিক আছে। সে হচ্ছে নগরের বাইরে থেকে দ্রব্যাদি আমদানি করার দিক। কারণ একেবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যার কোনোকিছুই আমদানি করার আবশ্যক করে না, তেমন নগরের দৃষ্টান্ত পাওয়া ভার।
এমন নগর আদৌ দেখা যায় না।
তা হলে তোমার নগরের মধ্যে আমদানিকারক বলে আর এক শ্রেণীর লোকের কথাও ভাবতে হয়। এদের কাজ হবে অন্য নগর থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর আমদানি করা।
হ্যাঁ, এদের কথাও আমাদের ভাবতে হয়।
কিন্তু আমদানিকারক বা বণিক অন্য নগরে শূন্য হাতে গেলে তাকে সেখান থেকে শূন্য হাতেই ফিরতে হবে। অন্য নগরের যা আবশ্যক তাকে সে-সমস্ত দ্রব্য সঙ্গে করে নিতে হবে। তাই নয় কি?
হ্যাঁ নিশ্চয়ই। তা না হলে অন্য নগর তাকে তার প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেন দেবে?
তা হলে দাঁড়াচ্ছে যে, উৎপাদন কেবল নগরের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট হলেই হবে না। নগরের উৎপাদনকে অবশ্যই পরিমাণ এবং গুণের দিক থেকে অপর নগরের প্রয়োজনের অনুরূপও হতে হবে।
একথা অবশ্যই সত্য।
তা হলে পূর্বে যা ভেবেছি, তার চেয়েও অধিকসংখ্যক তন্তুবায় এবং অন্যান্য কারিগরের আবশ্যক হবে।
তা ঠিক।
বণিক বা আমদানি এবং রফতানিকারকের প্রয়োজন তো আছেই।
হ্যাঁ, তাদেরও প্রয়োজন থাকবে।
আমাদের রাষ্ট্রে ব্যবসায়ীদেরও ঠাঁই দিতে হবে?
হ্যাঁ, তাদেরও ঠাঁই দিতে হবে।
কিন্তু ব্যবসায়ের দ্রব্যসামগ্রী তুমি সমুদ্রের উপর দিয়ে বহন করবে কিসে? সেজন্য নিশ্চয়ই প্রয়োজন হবে প্রচুরসংখ্যক দক্ষ নাবিকের।
হ্যাঁ, এদের প্রচুর সংখ্যায় আবশ্যক হবে।
তারপর নগরের অভ্যন্তরে এই সমস্ত দ্রব্যসামগ্রীর বিনিময়ের প্রশ্ন রয়েছে। এদের বিনিময়ের পদ্ধতি কী হবে? বিনিময়-প্রশ্নের সমাধান আবশ্যক। কারণ, এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি, আমাদের রাষ্ট্রপত্তনের একটা মূল উদ্দেশ্য ছিল একের পরিশ্রমের ফলের সঙ্গে অপরের পরিশ্রমের ফলের বিনিময় সাধন করা।
হ্যাঁ, বিনিময়ের প্রশ্ন রয়েছে। তবে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমেই এর সমাধান হতে পারে।
তা ঠিক। তা হলে বিকিকিনির জন্য বাজারের আবশ্যক হবে আর বিনিময়ের জন্য মূল্যের পরিমাপক মুদ্রারও আবশ্যক হবে।
হ্যাঁ, মুদ্রার তো আবশ্যক হবেই।
এবার তা হলে আর-একটা সমস্যার কথা ভেবে দ্যাখো। মনে করো কৃষক কিংবা কারিগর তার উৎপন্ন দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য বাজারে নিয়ে এল। কিন্তু সে
যখন এল তখন বাজারে কোনো ক্রেতা নেই। এমন কেউ নেই যার সঙ্গে তার দ্রব্যের বিনিময় ঘটতে পারে। এখন সে কী করবে? সে কি তার জীবিকার কাজ ছেড়ে তার উৎপন্ন দ্রব্য নিয়ে বাজারে কর্মহীন হয়ে বসে থাকবে?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : না, কর্মহীন হয়ে সে আদৌ কালক্ষেপণ করবে না। বাজারে এমন লোক থাকবে যে তার কাছ থেকে তার দ্রব্য ক্রয় করবে। কারণ, যে-রাষ্ট্র সুসংগঠিত সে-রাষ্ট্রে ক্রয়কারীরও ব্যবস্থা থাকবে। সাধারণত যে-সমস্ত নাগরিক শারীরিকভাবে দুর্বল, অর্থাৎ যারা অপর কোনো পরিশ্রমের উপযুক্ত নয় তাদের দায়িত্ব হবে বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ের দপ্তর পরিচালন করা। এখানে বিক্রেতার কাছ থেকে তারা দ্রব্যাদি ক্রয় করে তার মূল্য পরিশোধ করবে এবং ক্রয়কারীকে দ্রব্যাদি সরবরাহ করে তার কাছ থেকে দ্রব্যের মূল্য গ্রহণ করবে।
তা হলে এই বিশেষ প্রয়োজনে আমাদের রাষ্ট্রে খুচরা ব্যবসায়ী নামক একটি শ্রেণীরও উদ্ভব হচ্ছে? তাই নয় কি? আমি খুচরা ব্যবসায়ী বলছি, কারণ বাজারে যারা ক্রয়-বিক্রয়ের দায়িত্ব পালন করে তাদের এই নামেই অভিহিত করা হয়। আর যারা নগর থেকে নগরে যাতায়াত করে দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় কিংবা বিক্রয় করে তাদের বণিক বলা হয়। ঠিক নয় কি, এ্যাডিম্যান্টাস?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
আর এক ধরনের লোকের কথাও বলতে হয়। এরা বুদ্ধিগতভাবে অপরের সহযোগী নয়। কিন্তু তাদের দেহের শক্তি প্রচুর। তাদের দেহের শক্তি তারা বিক্রয় করে। এ কারণে তাদের আমি বলতে পারি ভাড়াটে। ভাড়াটে এজন্য যে, তাদের পরিশ্রমের মূল্যকে লোকে ‘ভাড়া’ বলে আখ্যায়িত করে।
তা ঠিক।
তা হলে এবার ভাড়াটেরাও আমাদের রাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধি করল?
তা-ই তো দেখছি সক্রেটিস!
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ্যাডিম্যান্টাস, উদ্ভবের যে-প্রক্রিয়া আমরা দেখলাম তাতে আমাদের রাষ্ট্র পরিপূর্ণ এবং ত্রুটিশূন্য হয়েছে কিংবা হয়নি?
আমি মনে করি, রাষ্ট্র এবার ত্রুটিশূন্য এবং পরিপূর্ণ হয়েছে।
এবার তা হলে দেখা যাক, ন্যায় এবং অন্যায়ের সাক্ষাৎ আমরা কোথায় পাচ্ছি? রাষ্ট্রের, কোন বিভাগকে আমরা ন্যায়ের উৎস বলে গ্রহণ করব?
সক্রেটিস, আমার তো মনে হয় রাষ্ট্রের নাগরিকদের পারস্পরিক লেনদেনের মধ্যেই ন্যায় এবং অন্যায়ের সাক্ষাৎ আমরা লাভ করতে পারি। এ ছাড়া অপর কোথাও ন্যায়-অন্যায়ের উৎপত্তি ঘটতে পারে বলে আমার মনে হয় না।
