বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১৩
।। তেরো ।।
ড্রয়িং রুমের লাকি ব্যাম্বুর সেরামিক পটের নুড়িগুলো শুকনো খটখটে, পাশের রক জুনিপার বনসাইয়ের হিউমিডিটি ট্রেরও একই অবস্থা, জানলার পাশে লতিয়ে ওঠা মানি-প্ল্যান্টের পাতাগুলো কুঁকড়ে গেছে, বোঝা যাচ্ছে এ বাড়ির সব কিছুই এখন আউট অফ গিয়ার।
নমিতা আর বিদ্যাদিকে বসতে বলে বুড়ি কাজের মহিলা সুইচ টিপে টিপে ঘরের সব ক’টা লাইট জ্বালিয়ে, এসি অন করে মনিবকে খবর দিতে গেল।
বৈঠকখানার একদিকের দেওয়ালে বিশাল একটা জগদীশ বসুর ছবি, অন্যদিকের দেওয়ালে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট।
‘পিকাসো?’ নমিতা বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বলল।
‘মাতিজ।’
মডার্ন আর্টে নমিতার ইন্টারেস্ট একদমই নেই। বিদ্যাদির যে এদিকেও নলেজ তা দেখে অবশ্য নমিতা অবাক হল না। ওর খুব নার্ভাস লাগছে, কীভাবে আরুষির এই ডেডলক সিচুয়েশন ব্রেক করা যায়। না পারলে মিস বসাককে ফিরে যেতে হবে। ‘বিখ্যাত?’ নমিতা আগে কখনো এঁর ছবি দেখেনি।
‘পিকাসো যেমন কিউবিস্ট ফর্মের জন্য খ্যাত তখন ফ্রান্সে মাতিজ পাশাপাশি খ্যাত রঙকে ভাষা দেওয়ার জন্য। দু’জনেই খ্যাতির শিখরে উঠেছিলেন।’
‘আমার পিকাসো পছন্দ না,’ নমিতা বলল।
‘পিকাসো স্ট্যালিনের ছবিটা ওভাবে এঁকেছিল তাই?’ বিদ্যাদি বলল। ‘অনেক কমিউনিস্টই পিকাসোর খারাপ সমালোচনা করত। পিকাসো নিজে কমিউনিস্ট ছিলেন তাও—’
‘লোকটাকে পছন্দ করি না। লোকটা মেয়েদের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছিল। আই হেট দ্যাট উমেনাইজার!’
বিদ্যাদি অল্প হাসল। ‘এজন্যই তো সৃষ্টি দেখেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত, তার স্রষ্টাকে খুঁজে দেখতে গেলে আশাহত হতে হয়। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ‘
ভিতরের দরজায় গলা খাঁকারি। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ এসে দাঁড়ালেন ‘নমস্কার, আমি সুব্রত মিশ্র। সরি, উপরে ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিচ্ছিলাম, তাই আসতে দেরি হল ‘
বিদ্যাদি উঠে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্ৰণাম করল। দেখাদেখি বাধ্য হয়ে নমিতাকেও প্রণাম করতে হল। বিদ্যাদি বলল, ‘মেসোমশাই, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি বিদ্যাধরী। আপনাদের বাড়িতে অনেক বছর আগে আরুষির কাছে—’
‘হ্যাঁ চিনতে পেরেছি। তুমি তো তথাগতের পিসি। আর তুমি?’
‘ইনি ড. নমিতা স্যান্যাল, আমার বন্ধু। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টি।’
নমিতা কথা শুরু করল আরুষির কেসের জন্য কিছু সাহায্য চাইতে। উনি আমাকে সব বলেছেন।’
‘মিস মাধবী বসাক আমার কাছে এসেছিলেন
মাধবী বসাকের নাম শুনেই বৃদ্ধের দু’চোখে যেন জ্যোতি ফিরে এল। বৃদ্ধ বিমর্ষ কণ্ঠে বললেন, ‘তোমরা তো সবই জানো। আরুষি মাকে এত ঘেন্না করে যে মা’র সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে চাইছে না।’
‘ওর মা ওর জন্য খুবই উদ্বিগ্ন,’ নমিতা বলল। ‘মেয়ের জন্য মানত করেছিলেন। আজ কালীঘাটে গেছেন। আপনাকে অতীতের তিক্ততায় না নিয়ে গিয়ে বর্তমানের আসন্ন বিপদ সম্বন্ধে সাবধান করতে আমি এসেছি,’ নমিতা শান্তভাবে বলল।
বৃদ্ধের কপালে অনেকগুলো ভাঁজ জেগে উঠল।
‘অ্যামফার্মা সুশ্রুতের বিরুদ্ধে আট কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। মিস বসাক এই কেস হিস্ট্রিটা পড়েছেন। উনি বলেছেন বিচারে ওর প্রতিপক্ষের কুখ্যাত উকিল আহুজা আপনাদের সর্বস্বান্ত করে ছাড়বে।’
‘সর্বস্বান্ত তো আমাদের করেই ফেলেছে ওরা,’ বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘আপনাদের এবার পথে নামিয়ে দেবে। আপনাদের একজন খুব বড় উকিল দরকার। কোনো উকিল এই সময়ে আপনাদের কেস নেবে না। একমাত্র মিস বসাকই আপনাদের ভরসা। ওকে আপনাদের এখন খুব দরকার মেসোমশাই। আমরাও আপনার নাতনির জন্য খুবই উদ্বিগ্ন।’
বৃদ্ধ যে শিউরে উঠলেন এটা নমিতা পরিষ্কার দেখতে পেল। ‘আমার নাতনি হল আমার বুকের সবচেয়ে দুর্বল স্থান, বৃদ্ধ বললেন ‘ওই মেয়েটার জন্য আমি বেঁচে আছি। আমার দুই ছেলে একই দিনে মারা গেছিল। সে শোক বুকে পাথর রেখে সয়েছি। কিন্তু নাতনির কিছু খারাপ আমি সহ্য করতে পারব না। শুধু আরুষির কথা ভেবেই আমি আমার ডিভোর্সী পুত্রবধূকে নিজে ডেকে পাঠিয়েছিলাম।’
‘উনি আপনাকে সম্মান করেন মেসোমশাই। আর তাছাড়া আপনাদের দু’জনেরই একই উদ্দেশ্য—আরুষির যাতে মঙ্গল হয় সেই চেষ্টা করা।’
‘মেয়েটা খুবই দুঃখী, বৃদ্ধ ধরা গলায় বললেন। নমিতা বুঝতে পারছে বৃদ্ধ বড় একা। সহানুভূতি দেখাবার মতো মানুষ ওর কাছে নেই। কিন্তু কিছুতেই ওর মা’র সঙ্গে দেখা করবে না। মা’র মুখদর্শন পর্যন্ত করতে চায় না আরুষি।’
‘আমরা সেজন্যই এসেছি আজ আপনার এখানে। আমরা আরুষিকে কাল একটু বোঝাই?’ বিদ্যাদি বলল।
‘দেখ, যদি বোঝাতে পার। তবে মানবে বলে মনে হয় না। কাল আরুষিকে বাড়ি আনবো। সন্ধ্যাবেলা তাহলে এসো তোমরা।’
নমিতা আর বিদ্যাদি উঠল। বাইরে বেরিয়ে নমিতা বলল, ‘কিপিং ফিঙ্গারস ক্রুশড।’
বিদ্যাদি বলল, ‘আরুষিকে রাজি করাতেই হবে।
***
১০ আগস্ট, ২০১৯
সন্ধ্যাবেলা নমিতা বিদ্যাদিকে সঙ্গে নিয়ে আবার আরুষিদের বাড়ি এল। একবার ভেবেছিল গোলপার্ক থেকে ফুলের তোড়া বা গেট ওয়েল সুন কার্ড কিনে নিয়ে যাবে, কিন্তু ভরসা হল না। খালি হাতেই গেল। আরুষি বেডরুমে শুয়ে ছিল। প্লাস্টার করা বাঁ পা স্লিংয়ে ঝোলানো। একজন নার্স চাদরটা টেনে আরুষির গা ঢেকে দিল।
‘আরুষি!’ বিদ্যাদি বিছানার কাছে এগিয়ে গেল।
‘তুমি আমার এনিমি ক্যাম্পের মানুষ,’ আরুষি ম্লান হাসল। ‘কিন্তু তুমি আমার ক্ষতি করবে না আমি জানি। তুমি বসো বিদ্যাপিসি। আপনি বসুন।’
‘ইনি নমিতা, ড. নমিতা স্যান্যাল। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন।’ বিদ্যাদি নমিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
‘বসুন,’ আরুষি বলল। ‘দাদু বলেছে আপনারা আসবেন।’
‘কেমন আছিস রে?’ বিদ্যাদি বলল।
‘ভালো। তবে নড়তে চড়তে পারছি না। আর মাথায় ঘুরছে কেসের চিন্তা। আমাকে স্ট্রেস ফ্রি হতে দিচ্ছে না,’ আরুষি ক্লান্ত গলায় বলল।
‘আমরা সেজন্যই এসেছি রে এখানে। তোর লড়াইতে তোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলাতে। এটা তোর একার লড়াই না, আমাদের দেশের স্বার্থ এখানে জড়িত।’ মলিন হাসি হাসল আরুষি—‘আমি এ লড়াই জিততে পারব না, বিদ্যাপিসি। তোমার বাবলুই জিতবে।’
‘এরকম কথা বলিস না। আমি তোর সঙ্গে থাকব। বাবলুর বাবা বলছে মেয়েটা আমাদের দেশের জন্য লড়ছে, আমরা সব সময় ওর পাশে থাকব। ওঁর আশীর্বাদ তোর সঙ্গে সব সময় আছে।’
‘আশীর্বাদ দিয়ে তো আর লড়াই জেতা যায় না, বিদ্যাপিসি। একজন সৎ এবং ভালো উকিল লাগে। তাই তো পাচ্ছি না।’ আরুষি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘তোর মা’র ওপর অভিমান থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু উকিল—বিদ্যাদি মাঝপথে কথা থামিয়ে দিল। বিদ্যাদির মতো নমিতাও লক্ষ করেছে মা’র কথা শুনেই আরুষির কপালের দু’পাশের শিরা বটগাছের শিকড়ের মতো জেগে উঠে দপদপ করতে লাগল।
‘মাধবী বসাক একজন লুজার,’ আরুষির দু’চোখ যেন প্রদীপশিখায় পতঙ্গ দপ করে জ্বলে উঠল। ‘আমি চাই না ওই মহিলার এতটুকু সাহায্য নিতে। ও তোমাদের ইউজ করবে কিন্তু তোমাদের কাছে নিজের সম্মানে এতটুকু ধুলো লাগতে দেবে না। আমি ওর স্বরূপটা তোমাদের কাছে পরিষ্কার করে দিই?’
নমিতা দেখল বৃদ্ধ সুব্রত মিশ্ৰ খুবই অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। ‘তুই মা, এখন বিশ্রাম নে। এসব কথা থাক।’
‘না দাদু, আমি বলব। আমরা চুপ থাকি তাই সমাজে মুখোশ পরে লোকগুলো সম্মানের সঙ্গে ঘোরে। আমার মা আমাকে ছেড়ে আমেরিকায় পড়তে চলে গেল তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। কিন্তু মা যে আমার জীবনে কত বড় ক্ষতি করে গেল তা আমি ভাবতেই পারিনি। প্রথমে তো আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে একজন মা তার পাঁচ বছরের মেয়েকে এভাবে ফেলে রেখে যেতে পারে। আমি রোজ কেঁদে বিছানা ভাসিয়ে দিতাম। আমার শরীর খারাপ হয়ে গেল। বাবা দাদু সব অসহায় হয়ে পড়ল। দিদা কবে মারা গেছে, জেঠুও বিয়ে করেনি, মাও চলে গেল। বাড়িতে মায়ের মতো একজনও কেউ নেই যে আমাকে বুকে টেনে নেবে। বাবা নিজেকে ভিক্টিম ভাবতে লাগল, কোর্ট যাওয়া বন্ধ করে দিল, দিন-রাত মদ খেতে লাগল, বাইরে বাইরে গোটা সন্ধ্যা কাটিয়ে অনেক রাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরত। সেসময় আমার জেঠুই আমার বাবা আর মা দু’জনের অভাব পূর্ণ করতে এগিয়ে এল। জেঠু সারাদিন ল্যাবে খাটাখাটুনির পর বাড়ি ফিরত আর আমায় নিজের হাতে খাইয়ে দিত, কোনোদিন কবিতা বলে, কোনোদিন গান করে, গল্প বলে ঘুম পাড়াতো। ছুটির দিন জেঠু সাইকেলে আমায় পিছন থেকে ঠেলে ঠেলে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলত, চিড়িয়াখানা, গড়ের মাঠ, গঙ্গার পাড় নিয়ে যেত। আমার সব চেয়ে বড় বন্ধু ছিল আমার জেঠু। রাতে আমি রোজ জেঠুর সঙ্গে শুয়ে ঘুমাতাম। ধীরে ধীরে মায়ের অভাবটা যেন দূর হয়ে যাচ্ছিল। তারপর একদিন আরুষি চুপ করে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘একদিন অনেক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকারে টের পেলাম একটা ছায়ামূর্তি বিছানায় বসে শ্বাপদের মতো আমার শরীর লেহন ‘ আরুষি আর বাকি কথা বলতে পারল না। ডান হাতের তালু দিয়ে দু’চোখ চেপে ধরল। শ্বাসরুদ্ধ করা পরিবেশ। নমিতার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আরুষি এবার মাথা তুলল—‘জেঠুর মনের অন্ধকারের জগৎ। আমি এত ভয় পেয়ে গেলাম যে পাথর হয়ে গেলাম। কিন্তু এ কথাটা কাকে বলব? বাবা আর জেঠুর মধ্যে এত ভালো সম্পর্ক যে আমি কখনো বাবাকে এই কথা বলতে পারিনি। মা’র ওপর তখন রাগ হতো। খুব রাগ হতো। মেয়েকে ছেড়ে চলে গেছ, এ সমাজে এত হিংস্র আত্মীয় থাকে তা কি একজন আইনজীবী হয়ে তুমি কখনো জানতে না? তাহলে কেন তুমি আমায় ছেড়ে চলে গেলে?’ আরুষি মুখ চেপে পাথরের মতো শুয়ে রইল।
নাস্তিক নমিতার হঠাৎ ঈশ্বরের ওপর তীব্র রাগ হল। মনে মনে বলল এজন্যই আমি তোমার অস্তিত্ব বিশ্বাস করি না! এ তোমার কেমন নিয়ম?
বৃদ্ধ সুব্রত মিশ্র মাথা নীচু করে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। বিদ্যাদিও পাথর। নমিতার সাহস হচ্ছে না এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার কাঁধে সহানুভূতির হাত রাখার। আরুষি আবার কথা বলল ‘যে কথাটা আমি বাবা দাদুকে কখনো বলতে পারিনি, সেকথা দীর্ঘদিন বুকের ভিতর জমিয়ে রেখে আমি বড় হয়ে তথাগতকে বলেছিলাম। উনিশ বছর বুকের ভিতর রাখা জমাট কান্নাকে বুক থেকে বের করে হালকা হয়েছিলাম। তথাগত প্রথমে খুব রেগে গেছিল। ও বলল আমার বাবাকে এবং মাকে এখবরটা জানানো দরকার। আমি ওকে অনেক কষ্টে রাজি করাই এ খবরটা পরিবারে না ছড়াতে। কিন্তু পরে তথাগত এই খবরটাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করল। তারপর দেখলাম জেঠুর সঙ্গে তথাগতের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গেল। খুব অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু তথাগতকে এত বিশ্বাস করতাম যে আমি কখনো ওকে সন্দেহ করিনি,’ এবার আরুষি ভেঙে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
বৃদ্ধ সুব্রত মিশ্র এবার ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘তথাগত আরুষিকে ব্যবহার করেছিল আমাদের আয়ুর্বেদের ওষুধের ফর্মুলাগুলোকে হাতিয়ে নেবার জন্য। দরকারে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক ভাঙতেও পিছপা হয়নি। ব্যাঙ্গালোর থেকে ফোনে শমীককে যখন এক সন্ধ্যায় সব কথা তথাগত বলে দিল তখন শমীক ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেল। এত মদ ওর পেটে ছিল যে ও গাড়ি চালাবার মতো ক্ষমতায় ছিল না। জিঞ্জিরা বাজারের ফ্যাক্টরি যাওয়ার পথে শমীকের গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। আর সেই সন্ধ্যাবেলায় ফ্যাক্টরিতে আমার বড় ছেলে প্রমিত ল্যাবরেটরিতে রাখা সাপের তীব্র বিষ শরীরে ইনজেক্ট করে আত্মহত্যা করে। সম্ভবত তথাগত ওকেও জানিয়েছিল যে ব্যাপারটা পরিবারে জানাজানি হয়ে গেছে। হাসপাতাল-পুলিশের ঝামেলা মিটলে আমি দুই ছেলেকে নিমতলার পাশাপাশি চুল্লিতে ঢুকিয়ে ভাবলাম আরুষির জন্য আমাকে বেঁচে থাকতে হবে।’ বৃদ্ধ সুব্রত মিশ্ৰ কিছুক্ষণ মৌন হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন ‘আমার জন্য আরেকটা চমক অপেক্ষা করছিল। ব্যাঙ্গালোর থেকে তথাগত ফিরে এসে বলল আমার ওষুধের ফর্মুলাগুলো নিয়ে ও বিদেশে গিয়ে রিসার্চ করতে চায়। ব্যাঙ্গালোরে অ্যামফার্মা ওর এই ওষুধগুলোর জন্য ফাইনান্স করতে রাজি হয়েছে। শুধু পেটেন্টটা নিতে হবে। আমি রাজি হইনি। তাতে আমার সঙ্গে তথাগতের কথা কাটাকাটি হল। আমি অনড়। তখন তথাগত ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করল বলল তাহলে ও আমাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। এমনকী আরুষির গর্ভের সন্তানের পিতৃত্বের সামাজিক দায়িত্ব ও নেবে না। আমি এ খবরে হতবাক। আমার কিছু করার নেই। অসহায়ের মতো ওর হাতে আমি ওষুধের ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস, ওষুধের ফর্মুলা সব তুলে দিলাম। কিন্তু আরুষি বেঁকে বসল। বলল দাদু তুমি কিছুতেই দেবে না। কিন্তু টু লেট। আমার বোকামো। তথাগত আমেরিকা চলে গেল। ওখানে গিয়ে কিছুদিন পর আরুষিকে ফোনে বলল—চাইল্ড অ্যাবর্ট করতে। আর ওদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।’
আরুষি বলল, ‘বিদ্যাপিসি, তুমি নার্সিংহোমে আমার পাশে সেদিন ছিলে, আমায় সাহস দিয়েছ, আমি একটা কাঁধ পেয়েছিলাম কান্নার জন্য। আমার মায়ের অভাবটা মেটাবার চেষ্টা করেছ। তুমি বলেছিল আরুষি তোর জীবনের সঙ্গে খনার জীবনের অনেক মিল আছে।’
‘তবে আমরা খনা না,’ বিদ্যাদি বলল। ‘খনা যেটা পারেনি আমরা সেটা পারব। আমাদের পারতেই হবে। আর মাধবী বসাককে ছাড়া সে যুদ্ধ লড়া যাবে না। তুই ওকে একটা সুযোগ দে। তথাগতকে পাল্টা জবাব দিয়ে তারপর ভাবিস তোর মা’র সঙ্গে তুই কী ব্যবহার করবি।’
আরুষি দু’চোখ বুজে একটা বড় শ্বাস নিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। ‘আরুষি প্লিজ,’ বিদ্যাদির চোখে কাতর দৃষ্টি।
‘আমি ওই মহিলাকে কখনোই ক্ষমা করতে পারব না।’
‘তোকে ক্ষমা করতে হবে না। আমি কথা দিচ্ছি মিস বসাক কখনো তোর জীবনে মায়ের স্থান পূরণ করতে ফিরে আসবে না। তোর কেস মিটে গেলে উনি চুপচাপ দিল্লি ফিরে যাবেন। প্লিজ আরুষি!’
আরুষি কিছুক্ষণ দেওয়ালে টাঙানো ওর বাবার ফটোর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, তোমরা যখন বলছ তখন তাই হোক। কিন্তু উনি শুধু উকিল, আমার মা নন।’
