বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫৩
।। তিপ্পান্ন।।
১৫ আগস্ট, ২০১৯
কাল সারারাত বিছানায় শুয়ে ছটফট করেছে নমিতা। বাড়ির মর্টগেজ এক সপ্তাহ পর ডিউ। এবার কী হবে? চাকরিতে যেখানে অ্যাপ্লাই করবে সেখানে এই প্রশ্নটা তো আসবেই যে আপনি কেন ইউনিভার্সিটির চাকরিটা ছাড়লেন?
অনেক রাতে ঘুম এসেছিল নমিতার। সকালে উঠে মনে হলো মাথা ঝিম মেরে আছে। কালকের মন্ত্রীর অভদ্র ব্যবহারের তিক্ততা এখনও সমস্ত মন জুড়ে। মনে হচ্ছে কেন ঘুমটা ভাঙলো? এই অবসাদ শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলার শক্তি নেই মনে হচ্ছিল ওর। বিদ্যাদির মুখ মনে এল, আর সঙ্গে সঙ্গে অবসাদ ঠেলে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল নমিতা। বিদ্যাদির সঙ্গে কথা বললে একটু শান্তি পাবে। যে কাজের জন্য এত শাস্তি পেল, সেই কাজটা শেষ করতেই হবে। নমিতা ঠিক করল বৌবাজারে বিদ্যাদিদের ‘অনিকেত’ এর অফিসে যাবে। ওখানেও চোর এসে নাকি সব তছনছ করে গেছে। বিদ্যাদিকে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু তখনই বিদ্যাদির ফোন, ‘নমিতা, এখন একটু সাহায্য চাই।’
‘নিশ্চয়ই, এখনই আসছি। কোথায় যাব? ‘অনিকেত’?’
‘না, আহিরীটোলা প্ল্যাটফর্মে আসতে পারবে?’
‘আজ তো স্বাধীনতা দিবস, তুমি বলেছিলে তোমার স্কুল আজ ছুটি!’
‘হ্যাঁ। অন্য একটা দরকার আছে। সম্ভব হলে একটু তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ।’ নমিতা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে গাড়িতে উঠল। আজ রাস্তা খালি। ফুটপাথের জায়গায় জায়গায় উত্তোলিত ভারতের পতাকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইকে দেশাত্মবোধক গান বাজছে। আহিরীটোলা পৌঁছাতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না।
প্ল্যাটফর্মে একটা জায়গায় লোকের জটলা। ওখানেই বিদ্যাদির ইস্কুল বসে। নমিতা ভিড় ঠেলে সামনে নজর করে চমকে উঠল। বিদ্যাদির ইস্কুলের ট্রাঙ্ক হাঁ করে খোলা, আর সব বই প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে।
‘এটা কে করল!’ নমিতা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।
বিদ্যাদি মাটিতে বসে ছিল। নমিতাকে দেখে বলল, ‘বাচ্চাদের বইগুলোকে ট্রেন লাইনে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে কাল রাতে ওরা গোটা ট্রাঙ্ক খুঁজেছে। ভাবা যায়! কী নিষ্ঠুর! লাইন থেকে সব বই তোলা হয়েছে।’
ভিড়ের মধ্যে বিদ্যাদির স্কুলের ছাত্রীদের দেখা গেলেও রূপাকে দেখা যাচ্ছে না। নমিতা বিদ্যাদির পাশে বসে বিদ্যাদিকে বই গোছাতে সাহায্য করল। ‘তোমার রূপাকে দেখছি না?’
‘রূপাকে বলেছি সোজা ‘অনিকেত’-এ চলে যেতে। আমি এই বই ঠিকঠাক করে ওখানে যাব। কে জানে ওখানে কী অবস্থা!’
.
বৌবাজারে বিদ্যাদিদের এনজিওর অফিসের দরজার ওপর একসারি ছোট ছোট পতাকা দড়ি দিয়ে টাঙানো।
‘অনিকেত’-এ ঢুকে নমিতার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। চোর এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে এখানেও। রূপা একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে ফাইল খাতা এসব সাজিয়ে সাজিয়ে তুলে রাখছে। আরেকটা অল্পবয়সী মেয়ের কোলে রূপার ছেলে।
‘দ্যাখ, ওরা কী করে গেছে!’ বিদ্যাদি বলল।
নমিতার কাছে সব কিছু জট পাকিয়ে গেছে। বিদ্যাদিকে কী বলা উচিত আর কী বলা উচিত না সেটাই ও ভেবে পাচ্ছে না। বিদ্যাদি ওর কাছে অনেক কিছু গোপন করছে। কিন্তু নমিতা মনে মনে ঠিক করেছে যে ও একটা রিস্ক নেবে। ও বিদ্যাদিকে বিশ্বাস করবে। তাতে যদি ঠকতে হয় তবে ঠকবে। বিদ্যাদির হাতে মেঝে থেকে ফাইল তুলে দিতে দিতে বিদ্যাদিকে কাল পৃথুযশের আসা থেকে মন্ত্রীর খারাপ ব্যবহার, ওর পদত্যাগ সব কিছু বলল নমিতা। বিদ্যাদি নির্লিপ্ত মুখে শুনল। এই মানুষটার ওপর যে ট্রমা গেছে তার তুলনায় নমিতার এই ঘটনা কিছুই না। বিদ্যাদি শুধু বলল, ‘তুমি চাকরি থেকে রিজাইন করলে কেন? ওই বদমাশটা তোমাকে কেমন বের করত সেটাও একবার দেখতাম—’
‘আমি রিজাইন না করলে বেচারা ভিসির ওপর কোপ পড়ত। আর জয়ন্তদা খুব ভালোমানুষ। ওসব ছাড়,’ নমিতা কথা ঘোরালো। ‘জানো বিদ্যাদি, আমি যদি ঈশ্বর বিশ্বাস করতাম, তাহলে বলতাম তোমার সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার জীবনে ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তোমার ইস্কুলে আমাকে নেবে তো?’
‘সে বিষয়ে মনে কোনো সন্দেহ রেখো না। কিন্তু তোমার কথা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে।’
নমিতা উঠে গিয়ে বিদ্যাদির অফিস-ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে টুলের ওপর রাখা কুঁজো থেকে কাগজের কাপে জল ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে বলল—‘আঃ! এর কাছে কোথায় লাগে ফ্রিজ!’ তারপর দেওয়ালে বাচ্চাদের আঁকা ছবিগুলো দেখতে দেখতে বলল, ‘বাচ্চাগুলো কী দারুণ ছবি আঁকে বিদ্যাদি!’
‘একটা মেয়ে এখানে আসে, রমলা নাম।’ বিদ্যাদি কাচঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল। ‘ও বাচ্চাদের ছবির সঙ্গে কবিতা লিখে দেয়।
নমিতা মুগ্ধ হয়ে ছবি দেখতে দেখতে এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে গেল। ছবিতে একটা কুঁড়েঘরের সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। তার নীচে রঙ পেন্সিলে বাচ্চার টলমলে কাকের ছা বকের ছা হাতের লেখা—তিতলি। নমিতা দেখল কুঁড়েঘরের ছাদটা অদ্ভুত, যেন একটা উল্টো নৌকা ছাদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তার নীচে একটা কবিতা লেখা–
নদীর নৌকো উড়ে আমার
নামল বাড়ির মাথায়
এই যে দিলাম ছবি তার
রঙ বেরঙে খাতায়।
‘এটা ভারি মজার ছবি তো? নামটাও কি সুন্দর—তিতলি, নমিতা বলল। বিদ্যাদি ম্লান হাসি হাসল, ‘এটা আসলে একটা দুঃখের ছবি। আর এই তিতলি প্রজাপতি নয়, এ সেই গতবছরের উড়িষ্যায় আছড়ে পড়া বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। এক বাঙালি পরিবার উড়িষ্যায় তিতলিতে গৃহহারা হয়ে কলকাতায় চলে এসেছিল। তাদের একটা বাচ্চা মেয়ে এঁকেছে ঝড়ে নদী থেকে নৌকা উড়িয়ে নিয়ে এসে ওদের বাড়ির ওপর ফেলেছে। ওদের কাঁচা বাড়িটা তার আঘাতে আর বাসযোগ্য ছিল না। পরিবারটা গৃহহারা হয়ে যায়। দাঁড়া দাঁড়া। তাহলে কী?’ বিদ্যাদি দু’হাত দিয়ে কপালের দু’পাশ চেপে ধরল।
‘কী হল?’
বিদ্যাদি বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল, ‘এটাই কি তাহলে ডিঙিবৃষ্টি? বেহুলা কি এর কথাই লিখেছিল?’
‘একটা-দুটো নৌকা উড়ে আসতে পারে, কিন্তু আকাশ থেকে অজস্র ডিঙির বৃষ্টির জন্য মহাপ্রলয় দরকার, তা কি সম্ভব?’ নমিতা বলল। ‘বেহুলা লিখেছে ডিঙিবৃষ্টিতে একটা গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছিল। তার ওপর একটা গোটা গ্রামের লোককে কোথায় আশ্রয় দেবে? প্রায় একশো-দু’শো লোক তো হবেই।’
‘কাল সকালে আমার আহিরীটোলার স্কুল শেষ হয়ে গেলে একবার আশুতোষ মিউজিয়ামে যাব। তুই সাড়ে এগারটা নাগাদ আসতে পারবি?’
নমিতা দেখল বিদ্যাদি ওকে আবার আগের মতো তুই বলা শুরু করেছে। মনে মনে খুশি হয়ে নমিতা বলল, এবার তোমার জন্য আগুনের ওপর দিয়েও হেঁটে যাব বিদ্যাদি। মুখে বলল—‘হ্যাঁ। কিন্তু আশুতোষ মিউজিয়ামে কেন?’
‘সমীকরণগুলো আমার চোখের সামনে খুবই সহজ হয়ে আসছে নমিতা। চন্দ্রকেতুগড়ের পাশে খনা-মিহিরের ঢিপি একসময় আশুতোষ মিউজিয়াম অনেক খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল। কাল ওখানে একবার যেতে হবে।’
