বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১৪
।। চোদ্দ।।
গাড়িতে ফেরার সময় বিদ্যাদি অনেকক্ষণ ধরে চুপ।
‘কী ভাবছ?’ নমিতা বলল।
‘খনার জীবনের সঙ্গে আরুষির জীবনের কী মিল তাই না?’ বিদ্যাদি অন্যমনস্ক হয়ে বলল। ‘বরাহমিহির যেমন খনাকে ব্যবহার করে কাজ হাসিল করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, তেমনি বাবলুও আরুষিকে ব্যবহার করে ওকে ডাম্প করে দিয়েছে।
তথাগত যে কাজ শেষ করে আরুষিকে ডাম্প করেছে এব্যাপারে নমিতার মনে তিলমাত্র সন্দেহ নেই। নমিতা ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি অ্যাক্সিলারেট করল। ‘বরাহমিহির খনাকে ব্যবহার করেছিল?’
‘বেহুলা তাই বলে। আমিও সেটা বিশ্বাস করি, বিদ্যাদি জোর দিয়ে বলল। ‘বরাহমিহির উজ্জয়িনী থেকে বাংলায় এসেছিল তার বৃহৎসংহিতার জন্য ফলিত- জ্যোতিষের শিক্ষা নিতে। বাংলায় এসে বরাহমিহির প্রসিদ্ধ পণ্ডিত অটনাচার্য্যের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতে চায়, কিন্তু উনি বরাহমিহিরকে তাঁর ফলিত- জ্যোতিষশাস্ত্র শেখাতে রাজি হন না। অটনাচার্য্যের মেয়ে খনা। বরাহমিহির তখন প্রেমের জাল বুনে খনাকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করে। খনাও সুদর্শন মিহিরের প্রেমে মত্ত হয়ে যায় এবং বাবাকে অনুরোধ করে তার প্রেমিককে ফলিত- জ্যোতিষ শিখিয়ে দিতে।’
‘যেমনটি তথাগত আয়ুর্বেদের ওষুধগুলোর ফর্মুলা সুশ্রুত থেকে কখনোই পাবে না জেনে সে সুশ্রুতের মালিকের নাতনিকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছিল,’ নমিতা বলল। ‘তারপর যখন ফর্মুলা পাওয়া হয়ে গেল তখন উচ্চাকাঙ্খী তথাগত আরুষিকে ত্যাগ করে আমেরিকা চলে গেল। বরাহমিহিরও তাই করেছিল?’
‘হ্যাঁ। অটনাচার্য্য বরাহমিহিরকে বলেন যে তিনি ফলিত-জ্যোতিষ শেখাতে পারেন কিন্তু তাঁর মেয়ে খনাকে বিবাহ করতে হবে। বরাহমিহির খনাকে বিবাহের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বরাহমিহির খনার বাড়িতে থেকে খনার বাবার থেকে ফলিত জ্যোতিষবিদ্যা শিখে তাঁর সংকলন শেষ করে। খনা-বরাহমিহিরের প্রেমের চিহ্ন খনার গর্ভে আসে। খনার গর্ভে বরাহমিহিরের সন্তান আসাকে বরাহমিহির ভালো চোখে দেখল না। তার চোখে তখন রঙিন স্বপ্ন—উজ্জয়িনীর রাজসভার আমোদ-আহ্লাদে এই নারী আর তার ভাবী সন্তান তাঁর পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। সমাজের ভয়ে সে গর্ভবতী পত্নী খনাকে নিয়ে রওনা দিল উজ্জয়িনীর পথে। পথে এক জঙ্গলে যত্নী বুড়ির কুটিরে খনাকে ত্যাগ করে বরাহমিহির উজ্জয়িনী চলে যায়। যত্নী বুড়ির কুটিরে খনা এক পুত্র সন্তান প্রসব করল। বরাহমিহির খবর পেয়ে ফিরে এসে সেই পুত্র সন্তানকে কলসির মধ্যে পুরে নদীর জলে ভাসিয়ে দিল। এতে খনা উন্মাদ হয়ে বরাহমিহিরকে বলল কেন আপনি আমার সন্তানকে হত্যা করলেন? বরাহমিহির বলল আমি গণনা করে দেখেছি যে পুত্রের আয়ু মাত্র এক বৎসর। খনা বলল কোথায় আপনার গণনা আমায় দেখান। বরাহমিহির তার গণনা দেখাতে খনা বলল আপনি একী অবাস্তব গণনা করেছেন? এ পুত্র দীর্ঘজীবী হওয়ার কথা। আর আপনি ভালোই জানেন যে পাঁচ বছর না হলে পুত্ররিষ্টি গণনা করা হয় না। আপনি আমার পুত্রকে হত্যা করেছেন। খনা কাঁদতে কাঁদতে বলল আমি সকলকে বলে দেব যে আপনি আমার পুত্রকে হত্যা করেছেন। বরাহমিহির স্থির করল খনাকে চিরতরে চুপ করাতে হবে। তখন সে খনাকে হত্যা করল।’
‘আর আজকের বরাহমিহির তথাগত তার প্রেমিকাকে বলল অ্যাবরশন করাতে,’ নমিতা বলল।
‘একটা শিশু হত্যা, অন্যটা ভ্রূণ হত্যা।’
‘ভাবা যায় না,’ নমিতা বলল। ‘তার মানে খনার স্বামী মিহির কখনো খনাকে ভালোবাসে নি। ও খনাকে অবজ্ঞা করত।’
‘বরাহমিহির যদি খনাকে ভালোবেসে বিয়ে করত তবে নিশ্চয়ই খনার জিভ কেটে খনাকে খুন করত না।’
‘কিন্তু বরাহমিহির যে খনার জিভ কেটে ফেলেছিল এটা কি সত্য? আমি ভেবে পাচ্ছি না এটা বাইরের মানুষ জানবে কীভাবে? খনার জিভ কাটার পর বরাহমিহির তো আর গর্ব করে বলে বেড়াবে না যে আমি খনার জিভ কেটে খনাকে মেরেছি। তবে?’
‘অন্য কেউ সেই দুষ্কর্মের সাথী ছিল। তাদেরই কেউ নিশ্চয়ই এই কথাটা ফাঁস করে দিয়েছিল। যদিও খনার উপকথা বলে মিহির খনার জিভ কেটে দিয়েছিল, কিন্তু সেটা কি সম্ভব? মানুষের জিভ থাকে মুখের ভিতর ঢোকানো। সত্যি কি মাত্র একজন মানুষের পক্ষে আরেকজনের জিভ কাটা সম্ভব?’ বিদ্যাদি বলল। ‘একবার দৃশ্যটা চিন্তা করো। জিভ কাটতে হলে একজনকে দু’হাত দিয়ে জোরে শিকারের মুখের উপরের চোয়াল আর নীচের চোয়াল টেনে ফাঁক করতে হবে। আরেকজনকে সেই ফাঁকের মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে খনার গুটিয়ে থাকা জিভটা বের করে আনতে হবে। তখন খনা কি বাধা দেবে না? জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাবেই। তাই তখন অন্ততপক্ষে আরেকজনকে দরকার যে খনার মাথাটা জোর করে শক্ত করে ধরে রাখবে যাতে সে মাথাটা নাড়াতে না পারে। কীভাবে সেই বিদুষীর ওপর অত্যাচার হয়েছিল ভাবতে পারছো? অসহায় খনা তখন তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, আর একদল পুরুষ –’ এক্সচ বিদ্যাদি হাঁফাচ্ছে। বিদ্যাদি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বলল, ‘এই খুনটা শুধু বরাহমিহির একা করেনি। ও আরো কয়েকজন হত্যাকারী নিযুক্ত করেছিল খনাকে খুনের জন্য।’
খনার জিভ কাটার যেরকম নৃশংস বর্ণনা বিদ্যাদি যেভাবে দিচ্ছিল তাতে একসময় নমিতার মনে হলো যে বিদ্যাদি যেন সত্যি নিজের চোখে সেই খুন হওয়া দেখেছে। বিদ্যাদির দৃষ্টিতে বিবমিষা। নমিতার মনে হলো বিদ্যাদি হয়তো সত্যি সত্যি বমি করে দেবে। নমিতা তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘কিন্তু আমরা তো সকলে জানি যে বরাহমিহির খনার শ্বশুর ছিল? কিন্তু বেহুলা বলছে বরাহমিহির খনার স্বামী? খনার স্বামী তো মিহির!’
‘একটা খুনের ঘটনাকে চাপা দেওয়ার জন্য এসব আমাদের শেখানো হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছে মিহির ছিলেন খনার স্বামী এবং বরাহমিহিরের পুত্র। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে।’
‘কী বলে ইতিহাস?’
‘ইতিহাস বলে যে বরাহমিহির নিজেই মিহির।’
‘সে কী সাংঘাতিক কথা! মিহির তাহলে বরাহমিহিরের সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া ছেলে না?’
‘না,’ বিদ্যাদি বলল। বরাহমিহির সম্বন্ধে আমরা যেটুকু জানতে পারি তা ওঁর ভাষ্যকার কাশ্মীরী পণ্ডিত উৎপল এবং ইরানের পর্যটক ও পণ্ডিত আল বিরুনীর ভাষ্য থেকে। কিন্তু বরাহমিহিরের লেখা দৈবজ্ঞবল্লভ গ্রন্থের ৪১তম আর ৪৩ তম শ্লোকগুলোতে ইতিহাস লেখা আছে—’
দৃষ্টাহদৃষ্টফলাপ্ত্যৈ শাস্ত্ৰং হৃদয়ে নিধায় মিহিরস্য।
দৈবজ্ঞবল্লভাখ্যং দৃষ্টা প্রশ্নং বদেত্তজ্ঞঃ।। ৪১।।
আদিত্যদাসতনয়স্তদবাপ্তবোধঃ কাপিখলঃ সবিতৃলব্ধবরপ্রসাদঃ।
আবন্তিকো মুনিমতান্যবলোক্য যত্নাদেতাং বরাহমিহিরো রচয়াংচকার।। ৪৩।।
৪১তম শ্লোকে লিখছেন—দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য ফলাফলগুলি নির্ধারণ করার জন্য জ্যোতিষীদের ‘মিহির’ রচিত ‘দৈবজ্ঞবল্লভ’ শাস্ত্র বুঝে প্রশ্নের ব্যাখ্যা করা উচিত। আবার দৈবজ্ঞবল্লভ-এর ৪৩তম শ্লোকে লিখছেন অবন্তি দেশের অধিবাসী বরাহমিহির যিনি কাপিণ্ডুল আদিত্যদাসের পুত্র তিনি সূর্যের কাছ থেকে আশীর্বাদ পেয়েছিলেন, তিনি বিভিন্ন ঋষিদের মতামতকে যত্নসহকারে যাচাই- বাছাই করে এটি রচনা করেছিলেন। অতএব প্রমাণিত হয় এই মিহির আর বরাহমিহির একই মানুষ।’
‘তাহলে এত গল্পকথা যে মিহির সমুদ্রে কলসীতে ভেসে ভেসে সিংহলে গেল আর সেখানে খনার সঙ্গে দেখা হল! মিহির তাহলে বরাহমিহিরের পুত্র না?’
‘না। বরাহমিহিরের পুত্র ছিলেন সুপণ্ডিত হোরাশাস্ত্রকার পৃথুযশ, মিহির নয়।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। পৃথুযশ ষটপঞ্চাশিকা নামক যে হোরাশাস্ত্র লিখেছেন তার প্রথম স্ট্যাঞ্জাতে আছে প্রশ্নজ্ঞানবিধৌ বরাহমিহিরাপত্যস্য স্বদুস্তনো। তার অর্থ বরাহমিহিরের পুত্রের রচিত। সুতরাং পৃথুযশই বরাহমিহিরের পুত্র, মিহির নন। মিহির ছিলেন স্বয়ং বরাহমিহির। যদি বরাহ এবং মিহির বাপ-বেটা দু’জন স্বতন্ত্র মানুষ হতো এবং নবরত্ন সভায় বরাহমিহির থাকত, তবে তাতে গণনায় গণ্ডগোল হচ্ছে না কি? কালিদাস, বররুচি, অমরসিংহ, বেতালভট্ট, ঘটকর্পর, ক্ষপণক, ধন্বন্তরি, শঙ্কু, বরাহ আর মিহির—দশ হয়ে যাচ্ছে। বরাহ এবং মিহির আলাদা মানুষ হলে রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাটি দশরত্ন হয়ে যায়। যদি আমরা নবরত্ন মানি তবে বরাহমিহির পরিচয়ে একজন মানুষ ছিলেন।’
‘তাহলে বরাহ নামটা কীভাবে মিহিরের সঙ্গে জুড়ল?’
‘সে সম্বন্ধে একটি উপকথা আছে। সম্রাট বিক্রমাদিত্যের এক পুত্র জন্মালে মিহির জ্যোতিষ গণনা করে বলে যে পুত্রের যখন আঠারো বৎসর বয়স হবে তখন বরাহের আক্রমণে সেই পুত্রের মৃত্যু হবে। যুবরাজকে মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচাবার জন্য সম্রাটের অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মিহিরের ভবিষ্যৎবাণী ফলে যায় এবং সম্রাটের পুত্রের মৃত্যু হয়। বিক্রমাদিত্য গুণীর কদর করতে জানতেন। তিনি পুত্রশোকে মুহ্যমান হওয়া সত্ত্বেও মিহিরকে বরাহ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তার নাম হয় বরাহমিহির।’
‘বরাহ একটা উপাধি?’
‘হ্যাঁ। বরাহ উপাধি আমরা পরবর্তীকালেও দেখতে পাই। গুর্জর-প্রতিহাররাজ দুর্ধর্ষ মিহিরভোজ যিনি অন্তত কুড়ি বার সিন্ধু অঞ্চলে আরব বাহিনীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর মুদ্রায় দেখা যায়, তিনিও ‘আদি বরাহ’ উপাধি নিয়েছিলেন।’
‘কিন্তু তাহলে উপকথা অনুযায়ী বরাহমিহিরকে কেন খনার শ্বশুর বলা হয়েছে? খনার কাহিনি অনুযায়ী খনা মিহিরকে বিবাহ করে তার সঙ্গে উজ্জয়িনীতে এসে শ্বশুর নবরত্নসভাখ্যাত বরাহমিহিরের সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ করে ও শ্বশুরকে বলে–
কিসের তিথি কিসের বার
জন্ম নক্ষত্র কর আর
কি কর শ্বশুর মতিহীন
পলকে জীবন বার দিন।
পুত্রবধুর যুক্তিতে বরাহর ভুল ভাঙে এবং পুত্র-পুত্রবধূকে সাদরে গ্রহণ করেন।’
‘ঠিক এখানেই মনে একটা খটকা লাগে। খনা এসে খ্যাতনামা বরাহমিহিরের জ্যোতিষের এতবড় একটা ভুল ধরিয়ে দিল! বরাহমিহির সম্রাট বিক্রমাদিত্যের পুত্রের আয়ু অভ্রান্ত ভাবে বলে দিল অথচ নিজের পুত্রের আয়ু গণনায় এত সাধারণ একটা ভুল করল যা কিনা খনা মাত্র চার লাইনে বলে বুঝিয়ে দিল! এটা বিশ্বাস করতে খুব অসুবিধা হয়।’
নমিতা ভাবল এভাবে সে কখনো বিশ্লেষণ করেনি।
‘একটা বড় রহস্য চাপা দেবার জন্য এসব গল্প ফাঁদা হয়েছে,’ বিদ্যাদি বলল।
‘কিন্তু কী সেই রহস্য? আর কেন খনাকে বরাহমিহিরের পত্নী নয় পুত্রবধূ হিসেবে পরিচয় দেবার চেষ্টা হয়েছে?’
‘বরাহমিহিরের গায়ে যাতে কলঙ্কলেপন না হয় সেজন্য খনার সঙ্গে তার সম্পর্কের এত জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে। বরাহমিহির তার স্ত্রী খনাকে হত্যা করে খনাকে মুছে ফেলার জন্য অনেক কিছু করেছিল। প্রথমতঃ সে খনাকে তার স্ত্রীর বদলে পুত্রবধূ বানিয়ে দিয়েছিল, দ্বিতীয়তঃ সে তার পুত্রের জন্মের সম্বন্ধে বেশ কিছু অবিশ্বাস্য গল্পকথা জুড়ে দিয়েছিল যাতে ভাবী প্রজন্ম ভাবে যে খনা একটা মিথোলজিক্যাল ক্যারেক্টার। খনাকে শুধু হত্যা করে ওরা ক্ষান্তি দেয়নি, খনার অস্তিত্বটাই মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। আর সেজন্য খনাকে প্রায় দেবী বানিয়ে দিয়েছে।’
‘তাতে লাভ?’
‘তাহলে পাপ ঢাকা সহজ হয়ে যায়।’
‘মানে?’
স্মিত হাসল বিদ্যাদি। বলল, ‘রাজস্থানে দেখেছ কি অনেক সতী মন্দির আছে? প্রতিটি মন্দির একজন সতীদাহে প্রজ্জ্বলিত মানবীকে দেবতায় রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টায় স্থাপন করা হয়েছিল। কেন হয়েছিল? যাতে যারা সেই মানবীকে আগুনে জ্বালিয়ে হত্যা করেছিল তারা সেই হত্যার শাস্তি থেকে রেহাই পায়। অগ্নিদগ্ধ নারীতে দেবত্ব আরোপিত করলে যারা সতীদাহের এই দুষ্কর্মটি করেছে তারা নিজেদের পাপবোধ থেকে রক্ষা পায়। আর সকলে সতীমা সতীমা বলে পুজো করে সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ থেকে এড়িয়ে যায়। খনার ক্ষেত্রে অনেকটা তাই হয়েছে। আজগুবি সব গল্প বানিয়ে খনাকে সুপার হিউম্যান বানিয়ে দিয়েছে। আর লজ্জার কথা এই যে আমরা তা মেনেও নিয়েছি।’
গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের পিছনে স্ট্রীট পার্কিং করল নমিতা। বিদ্যাদি খুব গম্ভীর। নমিতা মিস বসাককে ফোন করল—‘আমরা ভিজিটার্স লবিতে আসছি।’
একতলায় ভিজিটার্স লবির সোফায় বসে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না নমিতাদের। মিস বসাক নেমে এলেন।
‘ও রাজি হয়নি, তাই না?’ মিস বসাক বিষণ্ণ গলায় বললেন।
‘ও রাজি হয়েছে,’ নমিতা বলল।
‘কী বলছেন আপনি!’ যুগপৎ বিস্ময় ও আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন মিস বসাক। তারপর খেয়াল হল অন্যদিকের সোফায় আরো দু’জন মৃদুস্বরে কথা বলছে, তারা ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। এটা পাবলিক প্লেস, জোরে কথা বলা নিষেধ। ‘থ্যাঙ্ক ইউ, ড. স্যান্যাল।’
‘এই ধন্যবাদের সমস্তটা বিদ্যাদির প্রাপ্য,’ নমিতা বলল। ‘বিদ্যাদির কথায়-’
‘ওসব তুচ্ছ কথা থাক, নমিতা তুমি পারিবারিক কথাটা বল,’ বিদ্যাদি গম্ভীর গলায় বলল।
‘হ্যাঁ, একটা কথা আছে এখানে, নমিতা বলল। ‘আপনাকে এই দায়িত্বটা দিয়ে আরুষি আপনার ওপর যথেষ্ট ফেভার করছে, মিস বসাক। আপনি মনে এতটুকুও ভাববেন না যে আপনি ওকে ফেভার করছেন।’
‘আমি ঠিক বুঝলাম না,’ মিস বসাক বললেন।
‘আমরা জানি আপনি কেন এভাবে ছুটে এসেছেন। আরুষি সব বলেছে আমাদের। তখন যদি মেয়েটাকে ফেলে রেখে না যেতেন তবে আজ আপনাকে এ দৃশ্য দেখতে হতো না। মেয়েটার মনের মধ্যে দিয়ে প্রতি নিয়ত কী ঝড় গেছে তা আপনি জানেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা ওর মহানুভবতা যে ওর জেঠুকে সকলের সামনে অপদস্থ করেনি। তথাগত অন্তত একটা ভালো কাজ অজান্তে করে গেছে সেটা হল মানুষটার মুখোশ খুলে দিয়ে গেছে। আর আপনি এখনো সেই মানুষটাকে আড়াল করেছেন, আমাদের সত্য ঘটনাটা জানাননি। কারণ এই নোংরা কাজ হতোই না যদি আপনি আপনার হাই-রাইজিং কেরিয়ারের পিছনে দৌড়াতে গিয়ে মেয়েকে অবহেলা না করতেন। জানি না এরকম কত মা তাদের মেয়েকে এরকম পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে—অসহায় মেয়েগুলো মুখ ফুটে বলতে পারেনা। ওদের বুক পাথর হয়ে যায়।’
মিস বসাক একটা বড় শ্বাস নিয়ে দু’চোখ বুজলেন।
‘আরুষি বলেছে আপনি শুধু ওর উকিল হিসেবেই ওর সঙ্গে কথা বলবেন। আপনি ওর মা নন। এই শর্তেই ও রাজি হয়েছে। সুতরাং আপনাকে এই ইমপর্টেন্ট কথাটা কক্ষনো ভুললে চলবে না,’ নমিতা বলল।
‘আমি রাজি,’ মিস বসাক বললেন।
আপনাকে এ লড়াইটা জিততেই হবে, মিস বসাক। এটা আপনার শেষ সুযোগ, বিদ্যাদি গম্ভীর গলায় বলল।
আমি কাল আরুষির সঙ্গে দেখা করে কথা বলব। আমি এখনো মনে করি যে আমি কেসটাকে হয়তো আহুজার হিংস্র দাঁতের সারির ভিতর থেকে টেনে বের করে আনতে পারব,’ মিস বসাক বললেন। কিন্তু আমাকে অনেক রিসার্চ করতে হবে। আমার হাতে সময় খুব কম। আমাকে ট্রায়ালের স্ট্র্যাটেজি আউটলাইন করতে হবে, ডাইরেক্ট আর ক্রশ একজামিনেশনের মেইন পয়েন্টগুলোকে বারবার সাজাতে হবে, ইনিশিয়াল হিয়ারিং-এর ডিপজিশনে সাক্ষী কী কী ইচ্ছা করে বাদ দিয়ে গেছে, আর কী কী না ঘটা ঘটনাকে অম্লানবদনে ঘটেছে বলে গেছে সেগুলো ছেঁকে বের করতে হবে। আমার একটা টিমকে এখানে মোবিলাইজ করতে হবে। সুনার দ্য বেটার। আপনারা যদি কাল আমার সঙ্গে আরুষির কাছে আসতে পারেন আই উইল অ্যাপ্রিশিয়েট দ্যাট।’
‘কাল রোববার, আমার স্কুল ছুটি। আমি সকালে যেতে পারব,’ বিদ্যাদি বলল। নমিতাও রাজি।
‘আমি সুব্রত মিশ্রকে কল করছি, এক্ষুনি,’ মিস বসাক বললেন।
মিস বসাক ফোন করলেন। সুব্রত মিশ্রের সঙ্গে ফোনে মৃদুস্বরে কথা হল। ফোন বন্ধ করে মিস বসাক বললেন, ‘কাল সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আসতে বললেন।’
‘ঠিক আছে, তাহলে কাল আমরা একসঙ্গেই আরুষিদের বাড়ি যাব। সকাল সাড়ে নটায় এখানে –’ নমিতা বিদ্যাদির দিকে তাকালো।।
‘আমি চলে আসবো,’ বিদ্যাদি বলল।
‘গুড,’ মিস বসাক বললেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন ‘আই মাস্ট উইন দিজ ট্রায়াল।’ মিস বসাকের চোয়াল এমন দৃঢ় হয়ে গেল যে নমিতার মনে হলো আহুজার মুখগহ্বর হাঙরের হতে পারে, কিন্তু মিস বসাকের চোয়াল কংক্রিটের তৈরি যেখানে হাঙর দাঁত বসাতে পারবে না।
