বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১২
।। বারো।।
লাঞ্চের পর অ্যাডভোকেট বসাক ঢুকলেন নমিতার অফিসে।
‘গুড আফটারনুন,’ সম্ভাষণ করে মিস বসাকের মুখের দিকে তাকিয়ে নমিতার মনে হলো মিস বসাক যেন একদম বিধ্বস্ত। ‘কলকাতায় গরম পড়েছে খুব। আপনার চোখ-মুখ একদম শুকিয়ে গেছে। বসুন বসুন।’ নমিতা ফ্রিজ খুলে ঠাণ্ডা জলের বোতল বের করে গ্লাসে জল ঢেলে মিস বসাকের সামনে রাখল। ‘থ্যাঙ্কস, মিস বসাক ঢকঢক করে জলটা খেয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন। ‘আপনার জন্য একটা গুড নিউজ আছে, মিস বসাক। বিদ্যাদির কাছে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনের ফাইলটার কপিটা আছে। ওটা বিদ্যাদি নিয়ে আসছে।’ মিস বসাকের মুখের দিকে তাকাল নমিতা—এত বড় সুখবরেও মিস বসাকের মুখে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ নেই? নিশ্চয়ই কিছু গোলমাল হয়েছে, নমিতা ভাবল। ‘মেয়ের শরীর ভালো তো?’
‘হ্যাঁ শরীর নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, কিন্তু চিন্তা অন্য জায়গায়,’ মিস বসাক পার্স থেকে একটা তোয়ালে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন।
নমিতা কৌতূহলী চোখে তাকাল।
‘আরুষি আমার সঙ্গে দেখা করল না।’
‘মানে?’
‘ওর দাদু ফোন করে জানালেন কিছুক্ষণ আগে। বললেন– আরুষি তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে একদম রাজি না।’
‘সেকি? তাহলে আপনি কেসটা লড়বেন কীভাবে?’
‘ও শ্বশুরকে বলেছে আমি কোর্টে এই কেসে গো-হারা হারলেও মায়ের থেকে একরত্তি সাহায্য নেব না,’ মিস বসাক হতাশ।
‘একটু ধৈর্য ধরুন, ধীরে ধীরে সব ঠিক
মিস বসাক বিষাদে মাথা নাড়লেন। ‘নাঃ! আমি জানি ও কিছুতেই আমার সাহায্য নেবে না, মিস বসাক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘বড্ড জেদি মেয়ে। আমার চেয়েও জেদি। ও বলেছে আমি যেন এক্ষুনি রিটার্ন টিকিট কেটে দিল্লি ফিরে যাই। ও আমার মুখদর্শন করতে চায় না।’
‘তাহলে?’
‘আমি অনেক অনুনয় করে ওর দাদুকে বললাম ঠিক আছে আমার সঙ্গে অন্তত একবার ফোনে কথা বলুক। শুনে আরুষি বলেছে আমি যদি ওকে একটাও কল করি তবে ও পুলিশকে বলবে যে ও ড্রাঙ্কেন ড্রাইভিং করছিল।’
‘তাহলে?’
‘আমি কাল ফিরে যাব, দিল্লি। ভোরের ফ্লাইটের টিকিট কেটে ফেললাম, ‘ মিস বসাকের দু’চোখের দৃষ্টিতে কাতর বিষণ্ণতা।
নমিতার মন খারাপ হয়ে গেল। এই কেসটাকে ও অ্যামফার্মা বনাম সুশ্রুত বলে ভাবেনি, ও ভেবেছে নিজের প্রায়শ্চিত্তের একটা পথ হিসেবে, ভেবেছে বিদ্যাদির ওপর পৃথুযশ যে অন্যায় করেছে এটা তার উপযুক্ত জবাব হবে। মিস বসাক চলে গেলে এত উদ্যোগ উদ্দীপনা সব এক নিমেষে ফুৎকারে উড়ে যাবে। ‘ওকে আর দুটো দিন সময় দিন, মিস বসাক। আরো চেষ্টা করতে হবে।’
‘আমি তো আর কোনো উপায় দেখছি না, ড. স্যান্যাল, মিস বসাক বললেন। ‘একজন আইনজীবী হয়ে আমি জানি যে আমিই ওর শেষ ভরসা। ওকে ট্রায়ালে আহুজা নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে। অ্যামফার্মা আট কোটি টাকার ড্যামেজ ক্লেইম করেছে। আহুজা জিতে গেলে অত টাকার ড্যামেজ আরুষি কীভাবে দেবে? ও কোথায় পাবে অত টাকা?’
‘আপনি এই মামলা থেকে কিছুতেই সরে যাবেন না। কিছু একটা উপায় বের করতেই হবে,’ নমিতা ঘড়ি দেখল।
‘কোনো লাভ নেই,’ মিস বসাক বললেন। ‘ওর দাদু ওকে অনেক বুঝিয়ে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। আরুষি আরো বলেছে আমি আর এক পা এগোলে ও আমাকে সোস্যাল মিডিয়াতে পাবলিকলি এমন ডিফেম করবে যে আমি লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারব না। ওর দাদু বললেন আরুষি বলেছে আমি আরুষির কাছে গেলে ও আমার মুখে থুথু ছিটাবে।’
‘এত রাগ?’ নমিতা উঠে দাঁড়াল। ‘কেন?’
‘আপনি বৌবাজার যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘চলুন ফিরে যাবার আগে আমি মিস দাসকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে আসি।’
‘চলুন,’ দু’জনে নমিতার অফিস থেকে বেরিয়ে এল। নীচে পার্কিং এলাকা থেকে গাড়ি বের করে গাড়িটা রাস্তায় তুলে গিয়ার পালটে নমিতা বলল, ‘যদি কিছু মনে না করেন, মিস বসাক, আপনাকে একটা পার্সোনাল কথা জিজ্ঞাসা করব?’
‘বলুন।’
‘আরুষি কেন তার মাকে এত ঘেন্না করে?’
মিস বসাক একটা বড় শ্বাস নিলেন। এক মুহূর্ত ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘শমীকের প্রচণ্ড উচ্চাকাঙ্খা ছিল যে ও আমেরিকার ল’ স্কুলে পড়বে। শমীক আমাকে স্ত্রী হিসেবে খুবই ভালোবাসত, স্ত্রীর মর্যাদা পুরোপুরি দিত, কিন্তু প্রফেশনালি উকিল হিসেবে আমাকে মোটেই সিরিয়াসলি নিত না। অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবার। ওর বাবার আর ওর নিজের মনোভাব ছিল যে মেয়েরা ঘর সামলাবে, আর হ্যাঁ বাইরে কাজে বেরোলে আপত্তি নেই, কিন্তু তাদের প্রাইমারি ফোকাস হবে সংসার সামলানো, বাচ্চা বড় করা। যখন এসবের সঙ্গে প্রফেশনের টাইম কনফ্লিক্ট হবে তখন মেয়েদের উচিত প্রফেশন ছেড়ে সংসারকে প্রায়োরিটি দেওয়া। বাড়ির বৌয়ের থেকে কেরিয়ারের উচ্চাশা করা বোকামি।’
‘টিপিক্যাল শিক্ষিত অথচ গোঁড়া পরিবার,’ নমিতা বলল।
‘আমার ইচ্ছা ছিল না আমার স্বামী তার বৌ-মেয়েকে এদেশে ছেড়ে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করে। আমার আপত্তি শুনে শমীক বলতো তুমিও আমার সঙ্গে যাবে, আমি তোমায় ডিপেন্ডেন্ট ভিসায় সঙ্গে নিয়ে যাব। আমি একদিন বললাম শমীক আমিও চেষ্টা করি? শমীক হেসে বলল তুমি? তারপর অবহেলা দেখিয়ে বলল –ঠিক আছে। চেষ্টা করতে তো ক্ষতি নেই। আমি কাঠখড় পুড়িয়ে টয়ফেল, এলস্যাট দিলাম। কয়েকটা ল’ স্কুলে অ্যাপ্লাইও করলাম। আর আশ্চর্যের কথা এই যে কলম্বিয়া ল’ স্কুল আমার অ্যাপ্লিকেশন অ্যাকসেপ্ট করল।’
‘আর আপনার স্বামী?’
‘ও অনেক জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছিল—হার্ভার্ড ল স্কুল, স্ট্যানফোর্ড, এন ওয়াই ইউ—কোত্থাও ওর অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্সেপ্টেড হল না।’
‘কলম্বিয়া?’
‘কলম্বিয়া ওকে রিজেক্ট করল অথচ আমাকে অ্যাকসেপ্ট করেছে এটা শমীকের ইগোকে বড় ধাক্কা দিল।’
‘তারপর?’
‘শমীক কথাটা শ্লেষের সঙ্গে আমাদের সিনিয়র, অ্যাডভোকেট বিশ্বাসকে একদিন বলল। অ্যাডভোকেট বিশ্বাস কোনো উত্তর দিলেন না। কিন্তু পরে আমাকে একান্তে বললেন, এরকম সুযোগ জীবনে বারবার আসবে না। একে অবহেলা কোরো না। আমি বললাম না না, আমি এখানেই বেশ আছি। উনি বললেন, আর ক’দিন পর তুমি হাঁফিয়ে উঠবে। তিমি মাছকে সুইমিং পুলে রেখে দিলে সে বেঁচে থাকে, কিন্তু তাকে বেঁচে থাকা বলে না। তার প্রাপ্য বিশাল সমুদ্র। কলম্বিয়া ল’ স্কুলের অ্যাকসেপ্টেন্স রেট ওনলি টেন পার্সেন্ট। সারা পৃথিবীর লোক ওখানে পড়তে চায়। তুমি বোকামি করো না। মূলত অ্যাডভোকেট বিশ্বাসই আমাকে রাজি করালেন। আমি রাতে খাবার টেবিলে ঘোষণা করলাম আমি কলম্বিয়া ল-স্কুলে জয়েন করব। শমীকের দৃষ্টিতে বিস্ময়। শমীক বলল, আরুষি ছোট, তুমি এটা ভাবতে পারলে কীভাবে? আমি বললাম, শমীক, তুমি আমার ডিপেন্ডেন্ট হয়ে আমেরিকা চল। আরুষি আমাদের সঙ্গেই থাকবে। আমি এমন একটা কথা বলতে পারি শমীক বিশ্বাসই করতে পারল না। একজন পুরুষ হবে এক নারীর ডিপেন্ডেন্ট! শমীক খুব রেগে গেল। ওর বাবাও। আমার শ্বশুর বললেন তুমি আমার ছেলেকে অপমান করছ। তোমাদের কাউকে বিদেশ যেতে হবে না। আমার জেদ চেপে গেল। আমি বললাম আরুষিকে আমার মা বাবার কাছে রেখে আমি আমেরিকা যাব পড়াশোনা করতে।’
‘তারপর?’
‘বাড়িতে তুমুল অশান্তি। তারপর একদিন শমীক শান্তভাবে বলল, ‘বেশ তুমি যাও। আরুষি আমার কাছেই থাকবে। ওকে আমিই দেখাশোনা করতে পারব। শমীক রাজি হয়েছে, আমি খুব খুশি হলাম। একা একা যাওয়ার টেনশন ছিল। কলকাতা এয়ারপোর্টে শমীক আমায় ছাড়তে এল। এয়ারপোর্টে আমাকে ডিভোর্সের নোটিশটা দিল।
‘নার্সিসিস্ট। মিসোজিনিস্ট লুজার!’ নমিতার মুখ থেকে শব্দগুলো বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এল।
‘বিশ্বাস করুন, আমি ঠিক একই শব্দ বিড়বিড় করে বলেছিলাম। তারপর ট্রলি ঠেলে এয়ারপোর্টের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেছিলাম। ওর বৌ ওকে ছাপিয়ে যাবে এটা ও কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি।’
‘তারপর?’
‘আমি কাস্টডি ব্যাটেল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। আমেরিকায় একা আমার পক্ষে আরুষিকে প্রতিপালন করা সম্ভবপর হতো না। আমেরিকায় পড়াশোনা শেষ করলাম। ফিরে এসে দেখলাম আরুষি ওর বাবা, জেঠু আর দাদুর সংসারে সুন্দর মিশে গেছে। মা-মরা মেয়ে যেমন বাবার সঙ্গে বন্ধুর মতো বড় হয় সেরকম। আমি আরুষির সঙ্গে দেখা করতে এসে বুঝলাম ওরা আরুষির মনে আমার সম্বন্ধে তীব্র বিদ্বেষের বীজ বুনে দিয়েছে। আজ সেই বীজ মহীরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়ে আমাকে তীব্র ঘৃণা করে।’ কথা শেষ করে মিস বসাক চুপ হয়ে বসে রইলেন।
.
বিদ্যাদি অপেক্ষা করছিল। ওদের দেখে নীরবে হাসল। সেই হাসি, এক সময় নমিতা ভাবত বিদ্যাদি আর সুচিত্রা সেনের মধ্যে কে বেশি সুন্দরী? আর একই রকম পার্সোনালিটি যেন। আশেপাশের ক্লাসের অনেক ছেলে ক্লাস কেটে বাংলা ডিপার্টমেন্টে যে কোনো আছিলায় ঘোরাফেরা করত শুধু বিদ্যাদির সেই সুচিত্রা সেন মার্কা হাসিটা একবার দেখতে।
মিস বসাক দ্রুত শ্বাস ফেলছেন। ভদ্রমহিলার সারা মুখে হতাশার চিহ্ন। চোখের দৃষ্টি অন্যমনস্ক। চেয়ারে বসে করুণ হেসে বললেন, ‘আপনাকে আর আপনার ভাইপোর বিরুদ্ধে লড়তে হবে না, মিস দাস। আমার মেয়ে সে পথ বন্ধ করে দিল।’
‘কেন?’ বিদ্যাদি কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে মিস বসাকের দিকে তাকাল।
‘আমার মেয়ে চায় না আমি ওকে কোর্টে রিপ্রেজেন্ট করি। ও আমাকে এত ঘেন্না করে যে আমার মুখ পর্যন্ত দেখতে চায় না।’
‘তাহলে?’
‘তাহলে আর কী?’ মিস বসাক বললেন। ‘আমি কাল দিল্লি ফিরে যাচ্ছি। আপনাকে ধন্যবাদ দিতে এলাম। আপনাকে অনেক বিরক্ত করে গেলাম।’
‘কিন্তু আরুষির কেসের কী হবে তাহলে?’ বিদ্যাদি চিন্তিত।
তখন নমিতা বলল, ‘বিদ্যাদি, আমি ভাবছি আমরা একবার চেষ্টা করে দেখলে কেমন হয়? যদি আরুষিকে বোঝাতে পারি।’
বিদ্যাদি একটু ভাবল। ‘আরুষির সঙ্গে আমার আলাপ আছে। ‘কিন্তু সে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর হয়ে গেল কোনো যোগাযোগ নেই। তবে চেষ্টা করে দেখা যেতেই পারে।’
‘ঠিক আছে। তাহলে তো খুব ভালো হয়,’ মাধবী বসাকের দু’চোখে আশার আলো আবার জ্বলে উঠল। ‘আমি তাহলে সুব্রত মিশ্রের সঙ্গে কথা বলে দেখি?’
মাধবী বসাক উঠে বাইরের বড় ঘরটাতে গিয়ে ফোনে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তারপর ফিরে এসে বললেন, ‘সুব্রত মিশ্র রাজি। উনি বললেন কাল দুপুরে আরুষিকে নার্সিংহোম থেকে ডিসচার্জ করবে। আজ সন্ধ্যাবেলা আপনাদের ওঁর বাড়িতে আসতে বললেন।’ মাধবী বসাক দেওয়ালে টাঙানো মা সারদার ফটোর দিকে তাকিয়ে জোড় হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। ‘আমি কাল একবার কালীঘাটে যাব। আরুষির অ্যাকসিডেন্টের ওই দুঃসংবাদটা শুনে মা কালীর কাছে মানত করেছিলাম,’ মিস বসাক বলতে বলতে নমিতার দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন। ‘আপনি তো আবার কমিউনিস্ট। আপনার কাছে এসব অর্থহীন।’
