বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫৯
।। ঊনষাট।।
এদিকে গ্রহবিপ্র সত্যাচার্যের জ্যোতিষ-মন্দিরে সন্ধ্যা থেকেই ক্রুদ্ধ চন্দ্র ডাকাতের দলবল অবস্থান করছিল। তারা দেওয়ান দুর্লভচাঁদের অনুচর মারফত খবর পেয়েছে যে ডেভিড সাহেব বুধনকে ভুলিয়ে কলকাতা নিয়ে গিয়ে নবাবের দারোগার হাতে তুলে দিয়েছে। দারোগা নাকি অকথ্য অত্যাচার করে বুধনের ফাঁসি দিয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে ডেভিড সাহেবকে দেওয়ান বন্দী করতে সক্ষম হয়েছে। চন্দ্র ডাকাত রাগে ফুঁসছে। ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই হবে। বাইরে হাওয়ার দাপটে ক্ষণে ক্ষণে ডাকাতদের মশাল আন্দোলিত হচ্ছে। মশাল নিভে গেলে আবার তৎক্ষণাৎ অন্য মশাল জ্বালানো হচ্ছে। আর হাওয়ার শব্দ ভেদ করে করে মাঝে মাঝে জেগে উঠছে ক্রুদ্ধ ডাকাতদের সমস্বরে হুঙ্কারধ্বনি।
জ্যোতিষ-মন্দিরের মাঝামাঝি একটি অস্থায়ী হাঁড়িকাঠ লাগানো হয়েছে। তাতে একজন ডাকাত তৈলাক্ত সিঁদুর মাখাচ্ছে। মন্দিরের মেঝেতে বসে আছে ডেভিড সাহেব, সাহেবের দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। সাহেবের পাশে রাখা এক বিশাল খাঁড়া।
চন্দ্র সর্দার মন্দিরে অস্থির পায়চারি করছে। সে অপেক্ষা করছে সত্যাচার্যের। সাহেবকে ডাকাতদের হাতে তুলে দিয়েছে ওই ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। সত্যাচার্য জমিদার বাড়ি থেকে এলে সাহেবের রক্তে সে নিজের খাঁড়া রাঙিয়ে তার ভাইকে হত্যার প্রতিশোধ নেবে।
কিন্তু আজ যাকে হত্যা করার জন্য এত কিছু আয়োজন চলছে সেই ডেভিড সাহেব কিন্তু স্থির। সাহেবের নির্বিকার চোখের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি, আর তার চেয়েও বেশি ক্রোধ হচ্ছে চন্দ্র সর্দারের। লোকটার মরণের ভয় নেই! পায়চারি করতে করতে অসহিষ্ণু চন্দ্র সর্দার এবার নীচু হয়ে বসে সাহেবের চিবুক আঁকড়ে নিজের অগ্নিদৃষ্টির সামনে নিয়ে এসে বলল ‘তুই মরতে ভয় পাস না?’
‘হ্যাঁ পাই,’ সাহেবের নির্বিকার দৃষ্টি।
‘তাহলে কেন তোর চোখে মরণ ভয় দেখছি না?’
‘কারণ, আমি জানি আজ আমার মৃত্যু নাই।’
‘মৃত্যু নেই!’ চন্দ্ৰ ডাকাত অবাক সাহেবের মূঢ়তায়। ‘আমার ডান হাতে যম অধিষ্ঠান করে তা শুনেছিস? কীভাবে বলছিস আজ তোর মৃত্যু নেই?’
‘আমি তো বলিনি।’
‘তবে কে বলেছে যে তোর মৃত্যু নেই?’
‘বেহুলা,’ ডেভিড বলল। ‘বেহুলা বলেছে এদেশে যমদেবতা আমার ছায়া মাড়াইবেন না। আর আমি বেহুলার ভবিষ্যৎবাণী আমার ঈশ্বরের চেয়েও সত্য বলে বিশ্বাস করি। বেহুলা যখন বলেছে আমার প্রবাসে মৃত্যু নাই তখন কিছুতেই আমার প্রবাসে মৃত্যু নাই।’
‘মিথ্যে কথা!’ চন্দ্র রাগে মন্দিরের মেঝে থেকে খড়া তুলে নিল। ‘যে আমার ভাইয়ের হত্যার জন্য দায়ী তাকে আজ কেউ রক্ষা করতে পারবে না। তুই কেন বুধনকে ধরিয়ে দিলি?’
‘কতবার এক কথা বলব? আমি বুধনকে ধরিয়ে দিইনি। এরা মিথ্যা কথা বলছে। তোমার ভাই সুরক্ষিত আছে।’
এবার কাপাসডাঙার মাঠে কয়েকটা মশালের আলো জেগে উঠল। ধীরে ধীরে আলো কাছে এলে দেখা গেল একটা পালকি এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পালকি এসে জ্যোতিষ-মন্দিরের সামনে এসে থামল। পালকি থেকে নামল সত্যাচার্য, দৃষ্টিতে তার অস্থিরতা।
‘আসুন ঠাকুর, চন্দ্র ডাকাত বলল। ‘আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’
‘এই সাহেবকে বলি দিয়ে তোমরা খনা মন্দির ভেঙে ফেলার কাজ শীঘ্র শুরু কর, সত্যাচার্য বলল। ‘আঘাত হানো এর শরীরে। তারপর ধুলোয় মিশিয়ে দাও ওই অলক্ষুণে মন্দির।’
সত্যাচার্যের কথা শেষ হওয়ার আগেই মেদিনী জোরে জোরে দুলে উঠল, আর জ্যোতিষ-মন্দিরের চারচালার একচালা হুড়মুড় করে ভেঙে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল। ডাকাতরা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল—‘ভূমিকম্প!’
এবার এত জোরে মাটি কেঁপে উঠল যে ডাকাতরা ভয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
‘না ঠাকুর, খনার মন্দির ভাঙতে পারব না।’ চন্দ্র ডাকাত এবার বলে উঠল। ‘নিজের চোখেই দেখছেন প্রকৃতি আপনার এই আদেশ পছন্দ করছে না।’
‘এ অন্যায়। কথার খেলাপ!’ সত্যাচার্য চেঁচিয়ে উঠল। তোমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তোমার ভাইয়ের ঘাতককে আমি তোমার হাতে তুলে দিয়েছি—’
‘ঠাকুর, তুমি বাড়ি ফিরে যাও।’ দৃঢ়কণ্ঠে বলল চন্দ্র ডাকাত। ‘আমার ভাইয়ের হত্যাকারীকে আমি হত্যা করবই, কিন্তু খনার মন্দির আমি ভাঙবো না।’
‘অসম্ভব! এই মন্দির আজ রাতে ধ্বংস হবেই। তোমরা না গেলে আমি জমিদারের লেঠেলদের নিয়ে গিয়ে জঙ্গলের মন্দির ধ্বংস করে আসব।’
‘ঠাকুর!’ এবার চন্দ্র ডাকাত এমন জোরে চেঁচিয়ে উঠল যে সত্যাচার্য ভয়ে কেঁপে উঠল। ক্রোধে চন্দ্র ডাকাতের হাতে বল্লম উঠে এসেছে—‘জিভকাটির মন্দিরে যে আঘাত হানবে তাকে আমি বাড়ি ফিরে যেতে দেব না।
সত্যাচার্য গুটি গুটি পায়ে পালকিতে গিয়ে বসল। বেহারারা পালকি তুলে নদীর দিকে চলতে লাগল।
হঠাৎই দেখতে দেখতে বাতাসের বেগ প্রচণ্ড বেড়ে গেল আর তার সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি শুরু হল। ডাকাতরা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আবার জ্যোতিষ-মন্দিরের টিঁকে থাকা চালার নীচে দাঁড়াল, কিন্তু বাতাসের বেগ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। বিদ্যাধরী নদী আক্রমণোদ্যত কালীয়নাগের মতো ফুঁসে বিশাল আক্রোশে গর্জন করতে করতে আছড়ে পড়ল ডিঙাডুবি গ্রামে।
হঠাৎ অন্ধকারে জিভকাটির ঢিপির জঙ্গলের দিক থেকে একসঙ্গে অনেক শাঁখের আওয়াজ ভেসে এল।
‘মহাপ্রলয়ের শঙ্খ!’ চন্দ্র ডাকাতের দলের একজন ডাকাত ভয়ার্ত কণ্ঠে
বলল। ‘তার মানে ধ্বংসের সময় এসে গেছে।’
‘প্রলয় এসে গেছে। যদি বাঁচতে চাও তো সবাই শাঁখের আওয়াজের দিকে দৌড়াও। এটাই তোমাদের একমাত্র বাঁচবার পথ, ডেভিড সাহেব উচ্চৈঃস্বরে বলল।
ভয়ার্ত ডাকাতরা একে অপরের দিকে চাইল। তারপর তারা ঊর্ধ্বশ্বাসে জিভকাটির জঙ্গলের দিকে ছুটতে লাগল। মারাত্মক হাওয়ার বেগ আর সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি। চন্দ্র সর্দারও জঙ্গলের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল, ছুটতে ছুটতে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল জ্যোতিষ মন্দিরের বাকি চালাও ঝড়ের তাণ্ডবের কাছে আত্মসমর্পণ করে উড়ে বেরিয়ে গেল, আর চালাঘরের খুঁটি, দেওয়াল মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। থেমে গেল চন্দ্র সর্দার। পিছন ফিরে সত্যাচার্যের জ্যোতিষ-মন্দিরের দিকে ছুটে এসে ঝাঁপের বেড়া সরিয়ে সরিয়ে চাপা পড়া ডেভিড সাহেবের কাছে এগিয়ে গেল। কোঁচড় থেকে চাবি বের করে সাহেবের হাতকড়া ও পায়ের শিকল খুলে দিয়ে বলল ‘তোমাকে বিশ্বাস করলাম সাহেব। পালাও। যদি পার নিজেকে বাঁচাও।’
ডেভিড সাহেব আর চন্দ্র সর্দার প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল জিভকাটির ঢিপির দিকে। দু’জনে বাকি ডাকাতদের সঙ্গে এসে পৌঁছাল জিভকাটির মন্দিরে। মন্দিরের দরজায় দাঁড়িয়ে শান্তিপিসির ছেলে দামু চিৎকার করে পথ প্রদর্শকের কাজ করছে। প্রবেশ পথে একটা বিশাল গাছ উপড়ে গেছে। ডেভিড সাহেব আর চন্দ্র ডাকাত কোনোমতে মন্দিরের ভিতরে ঢুকল।
ভিতরে কেউ মশাল জ্বালিয়েছে। বেহুলা একে একে সকলকে পাথরের সিঁড়ি দিয়ে একটা বড় চাতালে বসাচ্ছে।
‘বেহুলা!’ ডেভিড সাহেব বেহুলাকে দেখে খুশিতে চিৎকার করে ডাকল।
বেহুলা পিছন ফিরল। ওর দৃষ্টি নিবদ্ধ হল সাহেবের ওপর। দু’চোখ বন্ধ করে দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালো। বেহুলার দু’চোখে ঝরে চলেছে অশ্রু খুশি আর ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতায় মাখামাখি হয়ে। বেহুলা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল সাহেবের কাছে।
‘তোমার জ্যোতিষ গণনা নির্ভুল, বেহুলা,’ ডেভিড সাহেব গ্রামের সমাজের চোখ রাঙানি ভুলে আনন্দে বেহুলাকে জড়িয়ে ধরল। ‘আমি জানতাম আমাদের দেখা হবেই।’
.
মন্দিরের ভিতর ইটের সোপান উঁচুতে একটা বিশাল চাতালে শেষ হয়েছে। ন্যূনাধিক একশো গ্রামবাসী ঠাসাঠাসি করে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। এত অধিক লোকসমাগমে ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের কোলাহল দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক অদ্ভুত আওয়াজ সৃষ্টি করছে। বাইরে প্রকৃতি ফুঁসছে। মন্দিরের ভিতর কয়েকটা মশাল জ্বলছিল। চন্দ্র সর্দার বলল, ‘আমাদের কাছে বেশি মশাল নেই। অল্প ক’টা মাত্র মশাল জ্বলুক। সেই মশাল নিভে যাওয়ার আগে অন্য মশাল জ্বালানো হবে। রাত গভীর হতে ধীরে ধীরে এক এক করে সব ক’টা মশাল নিভে গেল। মন্দির অন্ধকারে ডুবে গেল। অন্ধকারে ডেভিড সাহেব এবার সকলকে শান্ত হতে বলল, কিন্তু কে কার কথা শোনে।
বিপদের রাত সব সময় লম্বা হয়ে যায়। অন্ধকারে কত দণ্ড সময় যে কেটে গেল তার হিসেব নেই, কিন্তু সকাল হওয়ার নাম নেই। এক সময় মনে হলো হয়তো ঝড় থেমে গেছে। বেহুলা ডেভিড সাহেবকে বলল একবার বাইরেটা দেখা যাক? উঁচু চাতাল থেকে কম্পিত পদক্ষেপে সোপান দিয়ে কিছুটা নীচে নামতেই বেহুলা টের পেল যে নীচে থই-থই করছে জল। বেহুলা আবার পাথরের ওপর উঠে এল। ডেভিড সাহেব বলল, ‘আমাদের সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বেহুলা। যদি জল নামে।’
‘কিন্তু এই মন্দির গ্রামের থেকে অনেক উঁচু ঢিপির ভিতর অবস্থিত। এখানে যদি এত জল তাহলে ডিঙাডুবি গ্রাম তো জলের তলায়!’ বেহুলা বলল।
‘অসম্ভব কিছু নয়,’ ডেভিড বলল। ‘সকাল হোক তারপর দেখা যাবে।’ দুর্যোগের রাত এক সময় কেটে গেল। বাইরের থেকে সকালের আলোর আভা গুহামুখে দেখা গেল। বেহুলা এবার জলের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল—একটা কুমির প্রাণ বাঁচাতে গুহামুখে ঢুকে রয়েছে।
‘ভাগ্যিস কাল রাতে বাইরে যাইনি,’ বেহুলা ডেভিডকে দেখাল।
‘আমার পিস্তলটাও কেড়ে রেখেছে ওরা। এরকম কত সাপ, কুমির এই জলে আছে কে জানে? কেউ যেন নীচে না নামে।’
আরো কিছুক্ষণ সময় কাটল। কুমিরটা নিথর কাঠের গুঁড়ির মতো গুহামুখে শুয়ে আছে। কুমির এরকম অনেক ঘন্টা চুপচাপ শুয়ে শুয়ে শিকারের জন্য অপেক্ষা করে। গুহার জল ধীরে ধীরে নামতে লাগল। এক সময় কুমিরটা গুহা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
গুহার ভিতর সকলেই কুমিরটাকে দেখেছে। কেউ আর সাহস করে বাইরে যেতে চাইছে না। এদিকে জল, খাদ্যের অভাবে শিশুরা কাঁদতে শুরু করল। বেহুলা ভাবছে বাইরে দিনের আলো থাকতে থাকতে খাবার আর পানীয় জল জোগাড় করে আনতেই হবে। কিন্তু তারা জলবন্দী। কোথায় পাবে সেসব? গোটা গ্রাম তো নিশ্চয়ই বানের জলের নীচে।
দুপুর গড়িয়ে গেল। হঠাৎ বেহুলার মনে হলো কেউ বাইরে তার নাম ধরে ডাকছে। বেহুলার মনে হলো ভুল শুনছে? পাশের পাথরে চন্দ্র সর্দার হাঁটুতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল। সারা রাতের অবসাদের পর শরীর ঝিমোচ্ছে। হঠাৎ সে মাথা তুলে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকাল। বেহুলার দিকে তাকিয়ে বলল ‘বুধনের গলা না?’
বাইরের আওয়াজ এত ক্ষীণ যে বেহুলা বুঝতে পারছে না কার গলা। কিন্তু চন্দ্র সর্দার ধড়মড় করে উঠে লাঠি হাতে তুলে নিল—‘হ্যাঁ, ওটা আমার ভাইয়ের গলার আওয়াজ। বুধন তাহলে বেঁচে আছে!’ চন্দ্র সর্দার পাথরের ওপর দিয়ে গুহার দরজার কাছে ছুটে গিয়ে চেঁচিয়ে ডাকল—‘বুধন?’
বাইরে থেকে উত্তর এল—‘দাদা?’
‘হ্যাঁ, এখানে আমরা গ্রামের অনেকে আছি,’ চন্দ্র সর্দারের চোখ ছলছল করছে। ডাকাত তার ভাইয়ের গলা ঠিক চিনেছে।
‘ওখানে বেহুলা আছে?’
‘হ্যাঁ। বেহুলা, ডেভিড সাহেব সবাই আছে এখানে।’
‘তোমরা ওখানে থাকো, আমরা আসছি,’ বুধনের গলা সকলকে আশ্বাস দিল।
চন্দ্র সর্দার এবার ডেভিড সাহেবের দিকে এসে দু’হাত দিয়ে ডেভিডের দু’হাত নিজের মুঠোর মধ্যে ঢুকিয়ে নিজের ঝোঁকানো কপালে বারবার ঠেকিয়ে বলতে লাগল—‘ঈশ্বর রক্ষা করেছেন, তোমায় মারলে আমি মহাপাতক হতাম সাহেব। তুমি আমার ভাইকে রক্ষা করেছ। আমায় ক্ষমা করো সাহেব।’
এবার গুহামুখে মশালের আলো দেখা গেল। কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সকলকে বাঁচাতে ডিঙাডুবিতে ফিরে এসেছে বুধন।
‘বুধনদা,’ বেহুলা পাথরের ওপর থেকে চেঁচিয়ে ডাকল।
বুধন বেহুলাকে দেখতে পেয়েছে। বুধন চেঁচিয়ে বলল, ‘গোটা গ্রাম জলের নীচে। কত নৌকা ছিন্নভিন্ন অবস্থায় সারা গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেন মনে হচ্ছে ডিঙির বৃষ্টি হয়ে গেছে এই গ্রামে। তোমাদের ভয় নেই, আমরা এসে গেছি তোমাদের সকলকে উদ্ধার করব।’
‘তুমি এত ঝুঁকি নিলে? দারোগা তোমায় ধরে ফেলবে যে,’ ডেভিড বলল। ‘সে সম্ভাবনা নেই,’ বুধন বলল। ‘এই ধ্বংসস্তুপে দারোগা কাউকে খুঁজতে আসবে না। সারা গ্রামে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।’
বুধন ওর সালতিতে ছালাভর্তি মুড়ি, মুড়কি, জালায় জল এনেছিল। গ্রামবাসীদের সেসব দিল, অনেকগুলো মশাল দিল। বুধন বলল, ‘আমি কাল আরো অনেক নৌকা লোকলস্কর নিয়ে ফিরে আসব। তখন তোমাদের সকলকে উদ্ধার করতে পারব। আজকের রাতটা তোমরা কষ্ট করে এখানে কাটাও।’
.
ধীরে ধীরে বানের জল গ্রামের জমি থেকে বিদ্যাধরীতে নামতে লাগল। বুধন পরের দিন আবার এল। জিভকাটির মন্দিরে আটকে পড়া সকলে একে একে বাইরে এল। ঝড় নেই, কিন্তু প্রকৃতির নৃশংস বিধ্বংসী রূপ চারদিকে ছড়িয়ে আছে। কত গাছ উপড়ে গেছে, অজস্র গাছের ডাল ভেঙে পড়ে আছে, হাজারে হাজারে পাখি, বাদুড় মরে পড়ে আছে। গোরু, ছাগল, মানুষ মরে আছে মাঠে। গ্রাম আর বসবাসের যোগ্য নয়। ফিরিঙ্গি কুঠির কোনো অস্তিত্ব নেই, পর্তুগিজ কেল্লাও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, গ্রামের একটা বাড়িও টিঁকে নেই—খড়, বাঁশ, হোগলার আচ্ছাদন, দরমার বেড়া সব উড়ে গেছে প্রবল ঝড়ের প্রকোপে, জমিদারবাড়ির ছাদ নেই, ইঁট পাথরের দেওয়াল শুধু অস্তিত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে।
বেহুলা পাখমারা গণকের ভিটের দিকে তাকাল—তাঁতিপাড়া আর গণকের ভিটে সব এক হয়ে মাটিতে মিশে গেছে। বচনপিসি আঁচলে চোখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। পাখমারা গণক বলল, ‘কাঁদিস নে। এ গ্রামে অন্যায় অত্যাচার বাড়তে বাড়তে প্রকৃতির সহ্যের সীমা পার হয়ে গেছিল। তাই প্রকৃতি শাস্তি দিল।’
‘এবার আমরা কী করব?’ শান্তিপিসি কাঁদতে কাঁদতে বলল। ‘আমাদের তো এখানে মাথা গোঁজার জায়গা পর্যন্ত নেই।
‘এ গ্রাম আর বাসের যোগ্য নয় মা,’ দামু বলল। ‘আমি তোমায় কলকাতায় নিয়ে যাব।’
আরেক জন গ্রামবাসী বলল, ‘আমাদের কী হবে বাবা? আমাদের জাল, নৌকা সবই তো ঝড়ে উড়ে গেছে। আমরা জেলেরা মাছ ধরব কীভাবে? আমরা থাকব কোথায়?’
‘তোমরাও আমার সঙ্গে শহরে চলো কাকা। কলকাতায় এখন প্রচুর রাজবাড়ি তৈরি হচ্ছে। ওখানে সকলের কোনো না কোনো কাজ জুটে যাবে। গঙ্গার পশ্চিম পারে বসাকদের পুরোনো ইটের ভাটি আছে, ওখানে মেটে মজুর, রেজা, কামলা, বাইতির কাজ প্রচুর। সকলের ওখানে আপাতত মাথা গোঁজার একটা ব্যবস্থা হোক আগে।’
তাই ঠিক হল সকলে হাওড়ায় বসাকদের ইট খোলায় গিয়ে উঠবে। শান্তি বুড়ি দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করল।
‘কোন ঠাকুরের থানে প্রণাম করলি শান্তি?’ বচনপিসি বলল।
‘মা গঙ্গাকে। তোর বেহুলা ঠিক বলেছে রে আমাদের বারাণসীতে গঙ্গাপ্রাপ্তি। কথায় বলে ভাগীরথীর পশ্চিমকূল বারাণসী সমতুল। এবার বুঝলাম তা সত্যি হতে চলেছে।’
