বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬৪
।। চৌষট্টি।।
২০ আগস্ট, ২০১৯
আজ থেকে ট্রায়াল শুরু। কলকাতা হাইকোর্টের পেটেন্ট ট্রায়াল বিল্ডিঙয়ের সদ্য বানানো কোর্টরুমগুলো দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস সংক্রান্ত মামলায় গত কয়েক বছরে বিদেশী সংস্থার সংখ্যা প্রচুর পরিমানে বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্ভবত কলকাতা হাইকোর্টের এই নতুন স্টেট অব দ্য আর্ট কোর্টরুমগুলো তৈরি করা হয়েছে।
ফিফটি-ফিট বাই ফিফটি-ফিটের বর্গাকৃতি ওয়াল-টু-ওয়াল কার্পেটে মোড়া এয়ার-কণ্ডিশনড কোর্টরুম ফলস সিলিং থেকে নেমে আসা উজ্জ্বল আলোর ঝর্ণায় আলোকস্নাত। দোতলা সমান উঁচু পিছনের হার্ডউড মেহগনি কাঠের দেওয়ালের সামনে জাজের বিশাল ডেস্ক, ব্ল্যাক লেদার সিট। একটু নীচের ধাপে কম্পিউটার ওয়ার্কস্টেশনে দুটো মনিটরের পিছনে অ্যাপল ল্যাপ-টপ ও ফ্ল্যাট স্ক্রিন মনিটরের সামনে বসে কোর্ট ক্লার্ক। তার ঠিক পাশেই কোর্ট রিপোর্টার ট্রান্সক্রিপ্ট লিখতে ব্যস্ত। তার আরো নীচের ধাপে কোমর উঁচু কাঠের দেওয়ালে ঘেরা লিটিগেশন এরিয়া। সেই দেওয়াল ঘেরা চত্বরের এক ধারে উইটনেস ডেস্ক। আর দু’দিকে অ্যাটর্নির আসন। একপাশে একটা পোডিয়ামে ল্যাপটপ রেখে স্ক্রিনে প্রোজেকশন করার ব্যবস্থা। ইন্টারন্যাশনাল পেটেন্ট ট্রায়ালের জন্য বিশাল হাই-টেক ব্যাপার। লিটিগেশন এরিয়ায় ঢোকার জন্য দুটো সুইং ডোর আর দেওয়ালে লেখা ফর অ্যাটর্নি এণ্ড কোর্ট অফিসিয়ালস ওনলি। তারপর চার সারি প্যাডেড দর্শকাসন, অনেকটা চার্চের আসনের আদলে। সরু টেবিল- মাইক্রোফোন লাগানো অ্যাটর্নিদের আসন, উইটনেস ডেস্ক, জাজের বিশাল ডেস্ক, দুপাশে দেওয়ালে সাঁটা বিগ স্ক্রিন মনিটর, দর্শকদের বসার জায়গা, বাইরে সাক্ষীদের অপেক্ষার জায়গা ইত্যাদি একদম পশ্চিম দুনিয়ার কোর্টরুমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এই স্পেশাল কোর্টরুমে আজ সুশ্রুত বনাম অ্যামফার্মার পেটেন্ট ট্রায়াল শুরু হল।
দর্শকের বেঞ্চে বসে নমিতা চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। লিটিগেশন এরিয়ায় একদম সামনে ডানদিকে অ্যামফার্মার অ্যাটর্নি সমীর আহুজা সাদা শার্ট, টাই, কালো কোর্ট আর উকিলের গাউন পরে একজন বিদেশির সঙ্গে পিটিশনারের দিকের আসনে বসে। আর বাঁদিকে ধবধবে সাদা শাড়ি সাদা ব্লাউজের ওপর কলারওয়ালা ফুলহাতা কালো ফুল-স্লিভ জ্যাকেট আর উকিলের গাউন পরে মাধবী বসাক রেসপন্ডেন্টের দিকের আসনে। মাধবী বসাকের পাশে একটা হুইল চেয়ারে বসে ডিফেন্ডেন্ট আরুষি। দর্শকের আসনে নমিতার পাশে ধম্বস্তরি কবিরাজ, আর তাঁর পাশে সুব্রত মিশ্র। পিটিশনারের দিকের দর্শকের আসনে দু’জন শ্বেতচর্মের সাহেব, সম্ভবত অ্যামফার্মার এমপ্লয়ি হবে।
এই মামলার ‘উইটনেস এক্সক্লুশন’ অনুযায়ী বিচার চলাকালীন সাক্ষীদের যথারীতি বিচারের দর্শক হিসেবে কোর্টরুমের ভিতরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই পৃথুযশ ভৌমিক, তথাগত, বিদ্যাদিরা বাইরে অপেক্ষা করছে কখন তাদের সাক্ষী হিসেবে ডাক পড়ে তার জন্য।
কিছুক্ষণ আগে কোর্ট-হাউসে মেটাল ডিটেক্টরের স্ক্রিনিং করিয়ে ভিতরে ঢুকে নমিতা দেখেছিল যে বিদ্যাদি আর ধন্বন্তরি কবিরাজ কোর্ট-হাউসে ঢুকছেন। নমিতা ওদের জন্য দাঁড়িয়ে গেছিল। তারপর টোকেন নিয়ে তিনজনে একসঙ্গে এসেছে। কোর্টরুমের বাইরের ওয়েটিং এলাকায় হলওয়েতে বিপরীত দিকের বেঞ্চে বসে আকাশি নীল স্যুট পরে পৃথুযশ ভৌমিক আর তার পাশে একটা ফুলশার্ট টাই পরে তথাগত। পৃথুযশকে দেখেই বিদ্যাদি একদম স্টিফ হয়ে গেছিল। বিদ্যাদির দু’হাতের আঙুল শক্ত মুঠো হয়ে গেছিল। জিভ বের করে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল বিদ্যাদি। নমিতার মনে হয়েছিল পৃথুযশের উপস্থিতি বিদ্যাদিকে তার পুরোনো ট্রমা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। নমিতা ফিসফিস করে বলেছিল—‘জল খাবে বিদ্যাদি?’
‘না আমি ঠিক আছি। পৃথুযশকে অনেক বছর পর দেখছি। কেমন বুড়ো হয়ে গেছে তাই না?’ বিদ্যাদি পৃথু্যুশের দিকে আড়চোখে দেখে বলল। তারপর নমিতাকে ফিসফিস করে বলল, ‘বাবলুটা দাদাকে বড় দুঃখ দিল। বাড়িতে তো এলই না দেখা করতে। এখনও ওর বাবার দিকে একবার চেয়েও দেখল না। একবার চোখাচোখি হল, কিন্তু তারপর থেকে ও মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। তুই দাদাকে ভিতরে নিয়ে যা।’
‘তুমি এখানে একলা বসতে পারবে? তোমার নাম উইটনেস লিস্টে। তোমার নাম ডাকলে তবে তুমি ভিতরে যেতে পারবে।’
‘হ্যাঁ পারব,’ বিদ্যাদি দু’হাতের তালু ঘষে বলল। ‘ওই যে গগন আসছে।’
‘ঠিক আছে, বিদ্যাদি। গগনকে ভিতরে পাঠিও যদি কিছু দরকার লাগে, নমিতা কবিরাজকে সঙ্গে নিয়ে কোর্টরুমের ভিতরে ঢুকেছিল।
.
বিচার শুরু হল। বিচারক অনিমেষ মিত্র কিছু কাগজপত্র উলটে দেখে নিয়ে সামনে মাধবী বসাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মিস বসাক, আপনি রেসপন্ডেন্টের অ্যাটর্নি?’
মিস বসাক সরু মাইক্রোফোনটা মুখের কাছে এনে বললেন, ‘ইয়েস ইয়োর অনার। আমি সাবস্টিটিউশন অব কাউন্সেল ডকুমেন্ট আদলতে জমা দিয়েছি এবং অপোজিং কাউন্সিলকে জানিয়েছি। অ্যাটর্নি আদিত্য মেহেতার বদলে আমি এই কেস রিপ্রেজেন্ট করছি।’
জাস্টিস মিত্র কাগজ দেখতে দেখতে বললেন, ‘ডিফেন্ডেন্ট ড. আরুষি মিশ্র আপনার মেয়ে?’
‘ইয়েস ইয়োর অনার।’
‘ঠিক আছে, আমি শুধু আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে আপনি খেয়াল রাখবেন এখানে একজন মা নন, আপনি ডিফেন্ডেন্টের অ্যাটর্নি। কোর্টের অফিসারের এথিকাল স্ট্যান্ডার্ড এবং কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের খেয়াল রাখবেন সব সময়।’
‘ইয়েস ইয়োর অনার।’
‘ওকে। পিটিশনার অ্যান্ড রেসপন্ডেন্ট’স অ্যাটর্নি প্রসিড উইথ ইয়োর ওপেনিং স্টেটমেন্টস। পিটিশনার ফার্স্ট।’ বিচারক এবার সমীর আহুজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মিস্টার আহুজা, প্লিজ প্রসিড।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ সমীর আহুজা গমগমে গলায় বলল। নমিতা শুনেছে লোকটা নাকি দেশের টপ ফাইভ অ্যাটর্নির লিস্টে আসে। সমীর আহুজা খুব নাটকীয় ভাবে শুরু করল—‘ইয়োর অনার, এই কেসের থিম লাইন নিয়ে আমি ভাবছিলাম। প্রেমিকের প্রতি একজন প্রেমিকার প্রতিহিংসাজনিত অপরাধ, নাকি পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট কেস। কী বলব একে? ড. তথাগত দাস তাঁর প্রেমিকা ড. আরুষি মিশ্রকে ত্যাগ করেছেন বলে সেই প্রেমিকা প্রেমিকের ওপর প্রতিশোধ নিতে প্রেমিকের আবিষ্কার করা এবং পেটেন্ট নেওয়া ওষুধকে নিজের ওষুধের কোম্পানির জন্য ব্যবহার করছে? নাকি অ্যামফার্মার পেটেন্টকে ইনফ্রিঞ্জ করে পয়সা উপার্জন করতে চাইছে? নাকি দুটোই?’ আহুজা ওর সামনে খোলা হলুদ লিগ্যাল প্যাডের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ফ্যাক্ট অব দ্য ম্যাটার হচ্ছে এই যে ড. তথাগত দাস এই ওষুধের আবিষ্কারক। উনি কলকাতায় থাকাকালীন তার প্রেমিকা ড. আরুষি মিশ্রের পৈতৃক কোম্পানিতে কিছুদিন কাজ করেন। তখন ড. আরুষি মিশ্র জানতে পারেন এই ওষুধের ফর্মুলার কথা এবং ড. তথাগত দাসকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে এই ফর্মুলা কব্জাগত করতে চান। এদিকে ড. তথাগত দাস এই সাপের বিষের প্রতিষেধক ওষুধের গ্লোবাল উপকারিতার কথা চিন্তা করে এই ওষুধের রিসার্চ, টেস্টিং, পেটেন্ট ও ম্যানুফ্যাকচারিং এর জন্য অ্যামফার্মা নামে আমেরিকান কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। তথাগত দাসের প্রেমিকা ড. আরুষি মিশ্রও তার প্রেমিকের সঙ্গে আমেরিকায় চলে যাওয়ার জন্য রাজি হয়, ঠিক হয় দু’জনে একসঙ্গে এই রিসার্চের বাকি অংশ শেষ করবে আমেরিকায়। দু’জনের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ হয়। ড. দাস তার প্রেমিকা ড. আরুষি মিশ্রকে বিশ্বাস করে এই ওষুধের ফর্মুলা তাঁর সঙ্গে শেয়ার করেন। তারপরই ড. মিশ্র ভোল পাল্টান। ড. আরুষি মিশ্র বলেন যে তিনি আমেরিকা যাবেন না, এই ওষুধ এদেশে বানাবেন। ড. আরুষি মিশ্র তার প্রেমিককে চাপ দিতে থাকেন এদেশে থেকে যাওয়ার জন্য। ড. তথাগত দাস বলেন তিনি অ্যামফার্মার সঙ্গে চুক্তিতে সই করেছেন, তিনি কথার খেলাপ করতে পারবেন না। আর তাছাড়া সুশ্রুতের পক্ষে এই ওষুধ গ্লোবালি ছড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব। তাই তিনি আমেরিকা যাবেনই। তখন ড. দাস একাই আমেরিকা যান, অ্যামফার্মার ল্যাবে এই ওষুধের টেস্টিং করা হয় এবং আমেরিকায় পেটেন্ট নেওয়া হয়। এতে ড. মিশ্র নিজেকে চূড়ান্ত অপমানিত বোধ করেন এবং তিনি ড. দাসের থেকে পাওয়া ফর্মুলা নিয়ে সুশ্রুতে এই একই ওষুধ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতে থাকেন।’
অ্যাটর্নি আহুজা একটু থামল। নমিতা আরুষিদের দিকে তাকাল। আরুষির মুখ দেখে মনে হচ্ছে রাগে ফেটে পড়ছে, কিন্তু মিস বসাকের পোকার ফেস দেখে কিছু বোঝবার উপায় নেই ওঁর মনে এখন কী চলছে। আহুজা আবার শুরু করল—
‘ইয়োর অনার, অ্যাামফার্মার কাছে এই বিষের ওষুধের রেভিনিউ অ্যামফার্মার ব্যালেন্স শিটে পি-নাটস। কোম্পানির টোটাল রেভিনিউর খুবই একটা নেগলিজিবল পার্সেন্টেজ। কিন্তু অ্যামফার্মা তবু এই লড়াইতে এত ডলার ঢালছে ওনলি ফর মর্যাল গ্রাউন্ড। পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট একটা অসৎ প্রচেষ্টা এবং প্রত্যেক সত্যনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের উচিত এগিয়ে এসে এই অন্যায় বন্ধ করা। এই ওষুধের পেটেন্ট অ্যামফার্মার নামে, সুশ্রুতের নামে কোনো পেটেন্ট নেই। অ্যামফার্মা সুশ্রুতকে নোটিফাই করে বলে অবিলম্বে এই ওষুধের প্রোডাকশন বন্ধ করতে। সুশ্রুত রাজি তো হয় না, তার ওপর একটা ঘৃণ্য পথ নেয়। সুশ্ৰুত ম্যালাফাইডি ইন্টেনশন নিয়ে ‘বেহুলার খনা’ নামে একটা বই ব্যাকডেটে ছাপিয়ে দেয়, সেখানে ‘বড় চাঁদা ছোট চাঁদা’ নামে একটা কবিতা লিখে বলল অ্যামফার্মা ল্যাকস নভেলটি। অ্যামফার্মার পেটেন্টটাই বাতিল করে দেওয়া হোক। কিন্তু সেই ‘বেহুলার খনা’ বইটা একটা সুরিয়্যাল বই, যিনি লিখেছেন তিনি একজন মানসিক রোগী। সেসব আমরা যথা সময়ে প্রমাণ করব। আমরা সেই বই একজন স্পেশালিস্টকে পড়তে দিই, তিনি বলেছেন এই বই গালগল্পে ভরা এক রূপকথা। কিন্তু ড. আরুষি মিশ্রের এই প্রতিহিংসায় অ্যামফার্মার অনেক ক্ষতি হয়েছে, অ্যামফার্মা সেজন্য আদালতের কাছে অ্যাপিল করেছে যে সুশ্রুত ইমিডিয়েটলি এই ওষুধ তৈরি বন্ধ করুক, আর সুশ্রুত অ্যামফার্মাকে আট কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিক। দ্যাটস অল ফ্রম মাই সাইড ইয়োর অনার।’
বিচারপতি বললেন, ‘মিস বসাক, ইউ মে প্রসিড নাউ।’
মিস বসাক এবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর শান্তভাবে বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার। এই বর্তমান পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট স্যুটটা একটা ম্যালাফাইডি অ্যাটেম্পট অব আ ফরেন জায়ান্ট গোলিয়াথ টু কিল আওয়ার ইন্ডিয়ান পুওর ডেভিড।’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার!’ সমীর আহুজা গর্জে উঠল। ‘ব্যাড অ্যানালজি।’
‘অবজেকশন সাসটেইন্ড,’ জাজ বললেন।
‘সোজাসুজি বলতে গেলে সুশ্রুতের ব্যবসাকে ধ্বংস করে সুশ্রুতের ফর্মুলা ব্যবহার করে বিজনেসে মুনাফা করার এটা একটা নিন্দনীয় প্রচেষ্টা। আমরা অলরেডি এই স্যুটের ভ্যালিডিটি চ্যালেঞ্জ করে কাউন্টারক্লেইম কোর্টে জমা করেছি আন্ডার সেকশন সিক্সটি ফোর অব দ্য পেটেন্ট অ্যাক্ট। ইয়োর অনার, এই পেটেন্টের স্যুট ইজ ইনভ্যালিড অন মাল্টিপল স্ট্যাচুটরি গ্রাউন্ডস, যার মধ্যে প্রধান কারণ হল ইট ল্যাকস নভেলটি অ্যান্ড ইনভেনটিভ স্টেপ। এরা যে ইনভেনটিভ স্টেপ নিয়েছে সেটা বহু বছর ধরে আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অ্যামফার্মা এর আগে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাপিলেট বোর্ডের কাছে অ্যাপিল করেছিল যে ডিফেন্ডেন্টের ওপর স্টে আনা হোক যাতে এই ওষুধ বেচতে না পারে। কিন্তু আইপিএবি বোর্ড অ্যামফার্মার অ্যাপিল রিজেক্ট করে দিয়েছিল, তাই প্লেন্টিফ হাইকোর্টে এই অ্যাপিল নিয়ে এসেছে। ইয়োর অনার, দেয়ার আর প্লেথোরা অব কেসেস যেখানে পাবলিক ইন্টারেস্টকে প্রায়োরিটি দিয়ে হাইকোর্ট এই ধরনের আবেদন রিজেক্ট করেছে। তার একটা উদাহরণ হল—বেয়ার কর্পোরেশন বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া কেস নম্বর ওয়ান হানড্রেড সিক্সটি টু, ইন 2009, ইন বোম্বে হাইকোর্ট। ইয়োর অনার, ডিফেন্ডেন্ট—সুশ্রুত, একটা খুব ছোট ফ্যামিলি ওউনড বিজনেস। কিন্তু অ্যামফার্মার ইন্টারফিয়ারেন্সের জন্য ডিফেন্ডেন্ট ভীষণ ইকোনোমিক হার্ডশিপ সাফার করেছে। এই কেস লড়তে গিয়ে সুশ্রুত দেউলিয়া হতে চলেছে। দেয়ারফোর ব্যালেন্স অব কনভিনিয়েন্স লাইজ উইথ দ্য ডিফেন্ডেন্ট। আমি অডিটরদের দিয়ে ড্যামেজ অ্যাসেস করিয়েছি। তিন কোটি টাকা ড্যামেজ।’ মাধবী বসাক একটু থামলেন, ডেস্কে লাগানো মাইক্রোফোনটা সোজা করলেন। তারপর আবার শুরু করলেন, ‘ডিফেন্ডেন্ট একটা এফিডেভিট সাবমিট করেছিল—এই বইটি—ইয়োর অনার–যার টাইটেল হল ‘বেহুলার খনা’ যেখানে পরিষ্কার দেখানো আছে যে এই গন্ধনাকুলীর তৈরি সর্পদংশনের ওষুধের কথা অনেক আগে থেকেই বাংলার অনেকে জানত। কিন্তু ডিফেন্ডেন্টের এই ক্লেম মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য প্লেনটিফ নিজেরাই ড. পৃথুযশ ভৌমিক নামে একজন এক্সপার্ট অ্যাপয়েন্ট করে এফিডেভিট সাবমিট করেছে। সুতরাং একদিকে যেমন বায়াসনেস কিছুতেই রুল আউট করা যায় না, অন্যদিকে দেখা দরকার এই বিষয়ে ড. ভৌমিক কি সত্যি এক্সপার্ট? আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে ড. পৃথুযশ ভৌমিকের বিরুদ্ধে প্লেজারিজমের তদন্ত চলছে। দ্যাটস অল ফ্রম মাই সাইড ইয়োর অনার।’
মাধবী বসাক নিজের আসনে বসলেন। এবার বিচারক বললেন, ‘আমি কাউন্সিল অব ডিফেন্ডেন্ট মিস বসাক এবং প্লেনটিফের তরফে মিস্টার আহুজার কথা শুনলাম। এখন আমরা সাক্ষীদের ডাইরেক্ট এক্সামিনেশন এবং ক্রশ এক্সামিনেশন শুরু করব। মিস্টার আহুজা ইউ ক্যান স্টার্ট উইথ ইয়োর ফার্স্ট উইটনেস।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার। আমার প্রথম উইটনেস হলেন ড. টমাস জোনস।’ কোর্ট পুলিশ ড. টমাস জোনসকে ডাকতে ওয়েটিং রুমে গেল। কোর্টরুমের দরজা খুলে রূপোলি চশমা পরা এক সাহেব প্রবেশ করল। সাহেব উইটনেস ডেস্কে গিয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাত তুলে সত্যকথনের শপথ নিল। তারপর উইটনেসের চেয়ারে বসল। এবার অ্যাটর্নি আহুজা জিজ্ঞাসা করল ড. জোনস, আপনি কি প্লিজ আদালতকে বলবেন আপনি কোন কোম্পানিতে কাজ করেন?’
‘অ্যামফার্মা।’
‘আপনার ডেজিগনেশন?’
‘চিফ অপারেশনস অফিসার।’
‘অ্যামফার্মা কি এই ‘ভেনম’ নামের মেডিসিনের পেটেন্ট হোল্ডার?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘পেটেন্ট কার নামে?’
‘অ্যামফার্মা এবং ড. তথাগত দাস দু’জনে এই পেটেন্টের জয়েন্ট হোল্ডার।’
‘কে এই পেটেন্ট দিয়েছে অ্যামফার্মাকে?
‘অ্যামেরিকান পেটেন্ট এবং ট্রেডমার্ক অফিস।’
‘কবে?’
‘ফার্স্ট সেপ্টেম্বর, ২০১৫।’
‘পেটেন্টটি কিসের জন্য?’
‘সাপের বিষের প্রতিষেধক ওষুধের।’
‘শুধু সাপের বিষ?’
‘না স্করপিয়ন, পয়জনাস স্পাইডার এবং অন্যান্য ইনসেক্টসের বিষেরও প্ৰতিষেধক।’
‘এই পেটেন্ট অ্যামফার্মাকে কী ক্ষমতা দেয়?’
‘এক্সক্লুসিভ রাইট অব ম্যানুফ্যাকচারিং এণ্ড সেল অব দ্য ড্রাগ ইন দ্য গ্লোবাল মার্কেট।’
‘ড. জোনস, আপনি পেটেন্ট নাম্বার এবং তারিখ দেখে কি বলতে পারেন এটাই কি সেই পেটেন্ট?’ আহুজা উইটনেস ডেস্কের দিকে এগিয়ে গিয়ে ড. জোনসকে একটা কাগজ দিল।
ড. জোনস কাগজটা দেখে বলল, ‘ইয়েস স্যার। এটাই সেই পেটেন্ট।’
‘ড. জোনস, এটা কি সত্যি অ্যামফার্মা সুশ্রুতকে সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট চিঠি দেয়?’ আহুজা বলল।
‘ইয়েস স্যার।’
‘কেন দেয়?’
‘সুশ্রুত অ্যামফার্মার পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট—’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার। অ্যাসাম্পশন,’ মাধবী বসাক শান্তভাবে বললেন। ‘সাসটেইন্ড,’ জাজ বললেন।
‘সুশ্রুতকে আপনারা কেন সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট চিঠি দেন?’
‘আমরা জানতে পারি যে সুশ্রুত নামে একটা ইন্ডিয়ান কোম্পানি একদম একই ওষুধ নিজেদের নামে ইন্ডিয়ার বাজারে বিক্রি করে চলেছে।’
‘তারপর?’
‘অ্যামফার্মা সুশ্রুতকে সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট নোটিশ পাঠিয়ে এই ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড সেল অব দ্য সেম মেডিসিন বন্ধ করতে বলে।’
‘অ্যামফার্মা যে সুশ্রুত আয়ুর্বেদিক প্রোডিউসারকে সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট নোটিশ পাঠিয়েছিল সেটাতে আপনার অ্যাপ্রুভাল ছিল?
‘হ্যাঁ ছিল।’
‘দেখুন তো এটাই কি সেই নোটিশ? আহুজা এগিয়ে গিয়ে একটা কাগজ ড. জোনসের হাতে দিল।
‘ইয়েস স্যার।’
‘সুশ্রুত কি এই নোটিশের কোনো উত্তর দিয়েছিল?’
‘সুশ্রুত বলেছিল যে ওরা কাস্টমারদের কাছে ওষুধ বিক্রি করা বন্ধ করবে না।’
‘আপনি কি মনে করেন এটা কি পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, ড. জোনস,’ আহুজা বলল। তারপর কোর্ট ক্লার্কের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে জাজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইয়োর অনার, আমি একজিবিট ওয়ানে পেটেন্ট অ্যাপ্রুভাল এবং একজিবিট টুতে সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট লেটার আদালতে সাবমিট করতে চাই।’
‘মিস বসাক, এনি অবজেকশন?’ জাজ বললেন।
‘নো অবজেকশন ইয়োর অনার, মিস বসাক বললেন।
‘একজিবিট ওয়ান এবং টু আদালত এভিডেন্স হিসেবে অ্যাডমিট করছে,’ জাজ বললেন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল। ‘আই হ্যাভ নো মোর কোয়েশ্চেন ফর ড. জোনস।’
এবার জাজ মিস বসাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দ্য ডিফেন্ডেন্টস কাউন্সিল ক্যান ক্রশ এক্সামিন প্লেন্টিফস উইটনেস। মিস বসাক—’
মাধবী বসাক সামনের ডেস্কে রাখা নোটপ্যাডে কিছু নোট করছিলেন। এবার জাজের কথায় মাথা তুলে বললেন, ‘ইয়েস ইয়োর অনার।’
‘ইউ মে প্রসিড।’
‘থ্যাঙ্ক ইয়ু ইয়োর অনার, ওয়েল মিঃ জোনস—’
সমীর আহুজার পাশে উপবিষ্ট সাহেবটি সোজা হয়ে বসল।
‘আই অবজেক্ট ইয়োর অনার,’ সমীর আহুজা বলল।
‘হোয়াটস ইয়োর অবজেকশন?’ জাজ বললেন।
‘হি ইজ আ পিএইচডি ফ্রম স্ট্যানফোর্ড।’
‘ওকে, ড. জোনস,’ মিস বসাক বললেন। ‘সরি, আই কারেক্ট মাইসেলফ। আপনি অ্যামফার্মার একজন ফুলটাইম এমপ্লয়ি?’
‘ইয়েস ম্যাম।’
‘আপনি কি প্লিজ বলবেন আপনার জব রেসপন্সিবিলিটির মধ্যে পেটেন্ট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড পেটেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইনক্লুডেড কিনা?’
‘ইয়েস। ইনক্লুডেড।’
‘তার মানে অ্যামফার্মা যে সুশ্রুতকে সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট নোটিশ পাঠিয়েছিল তাতে আপনার অ্যাপ্রুভাল ছিল?’
‘হ্যাঁ ছিল।’
‘আপনার কি তারিখ মনে আছে?’
‘সেকেও নভেম্বর ২০১৫।
‘আপনি একটু আগে বললেন সুশ্রুত আপনাদের প্রোডাক্টের ফর্মুলা ব্যবহার করে ওষুধ বিক্রি করছিল, তাই এই চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কারেক্ট?’
‘ইয়েস ম্যাম।’
‘কীভাবে জানলেন সেটা?’
ড. জোনস একটু ইতস্তত করলেন। এবার বিরোধী পক্ষের উকিল আহুজা ওকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসে বলল, ‘আই অবজেক্ট ইয়োর অনার। বিজনেস সিক্রেট।’
জাজ বললেন, ‘উইটনেস ক্যান আনসার, টু বি ডিসাইডেড বাই দ্য কোর্ট।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার, মিস বসাক বললেন। ‘ইয়েস ড. জোনস। আপনি কীভাবে জানলেন যে সুশ্রুত আপনাদের ফর্মুলার ওষুধ ব্যবহার করছে?’
তিন ড. জোনস বললেন, ‘আমরা সুইডেন, বেলজিয়াম এবং ইউএসএ তিনটে দেশের গভর্নমেন্ট অ্যাপ্রুভড ইন্ডিপেন্ডেন্ট ল্যাবরেটরিতে সুশ্রুতের ওষুধ আর আমাদের ওষুধের কম্পোজিশন কমপেয়ার করিয়েছি এবং কম্পোজিশন এক্সাক্টলি সেম।’
আহুজা বলল, ‘ইয়োর অনার, আমরা সেই রিপোর্ট অলরেডি কোর্টের কাছে ইনিশিয়াল হিয়ারিং এর সময় সাবমিট করেছি। আমি জানি না এই টপিক আবার কেন এনে আমার রেস্পেক্টেড অপোজিং কাউন্সিল কোর্টের মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন।’
‘হ্যাঁ আমি সেই তিনটে রিপোর্ট দেখেছি,’ মাধবী বসাক ইয়েলো স্টিকার লাগানো কয়েকটা কাগজ নিয়ে ড. জোনসের কাছে গিয়ে বললেন ‘ড. জোনস দেখুন তো এই তিনটে রিপোর্টই তো?’
ড. জোনস কাগজগুলো দেখে বললেন, ‘ইয়েস ম্যাম।’
‘ল্যাবরেটরিগুলো রিপোর্ট পাঠিয়েছে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ড. জোনস, আপনি সুশ্রুতকে ওষুধ বিক্রি বন্ধ করার চিঠি দিয়েছেন সেকেণ্ড নভেম্বর, ২০১৫। আপনি কি ল্যাবগুলোর রিপোর্ট পাওয়ার আগেই সুশ্রুতকে সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট নোটিশ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন?’
ড. জোনস নিরুত্তর।
‘ড. জোনস?’ মিস বসাক বললেন। ‘ইয়েস অর নো?’
‘অ্যাকচুয়ালি এটা—’
‘ইয়েস অর নো?’ মাধবী বসাকের কণ্ঠস্বর ছুরির ফলার মতো ধারালো।
‘ইয়েস।’
‘আপনার কি মনে হয় যে ওটা লিগ্যালি কারেক্ট কাজ হয়েছিল?’
আহুজা এবার গর্জে উঠে বলল, ‘কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী এটা প্রমাণিত হয়েছে যে আপনার ক্লায়েন্ট আমাদের ফর্মুলা ইউজ করেছে।’
নমিতা দেখল মিস বসাকের কংক্রিটের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সংযত স্বরে বললেন, ‘ইয়োর অনার, লার্নেড অপোজিং কাউন্সিল যদি এভাবে আমার ক্রশ একজামিনেশনে বাধা দেন তবে ‘
‘মিস্টার আহুজা,’ বিচারক অনিমেষ মিত্র মিস বসাকের কথা শেষ হওয়ার আগে বললেন। ‘প্লিজ ক্রশ একজামিনেশনে আপনি উত্তর দেবেন না। যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে তিনি উত্তর দিন।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘কে কার থেকে টুকেছে সেটা আজই আমাদের সকলের জানা হয়ে যাবে। ইয়েস, ড. জোনস, যা বলছিলাম। আপনি কীভাবে এক্সপার্ট রিপোর্ট না দেখেই জানলেন যে সুশ্ৰুত আপনাদের ফর্মুলা ব্যবহার করছে?’
‘আমাদের সায়েন্টিস্টরা আমাদের ল্যাবরেটরিতে ইন-হাউস টেস্টিং করে জানিয়েছে।’
‘তারা কি আপনাকে লিখিত জানিয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে কে আপনাকে এই তথ্য জানিয়েছিল?’
‘ড. দাস।’
‘পুরো নামটা বলুন।’
‘ড. তথাগত দাস।’
নমিতা এবার ধন্বন্তরি কবিরাজের দিকে তাকাল। বৃদ্ধের মুখ ব্যথায় কালো। ‘থ্যাঙ্ক ইয়ু ড. জোনস। ইয়োর অনার আমার এঁর জন্য আর কোনো কোয়েশ্চেন নেই। আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ল্যাব রিপোর্টের তারিখগুলোতে হাইলাইট করে দিয়েছি। এটা আমি আমার একজিবিট ওয়ান হিসেবে আদালতে জমা করার পারমিশন চাই।’
‘মিস্টার আহুজা?’
‘নো অবজেকশন ইয়োর অনার।’
‘একজিবিট ওয়ান অ্যাডমিটেড ইন কোর্ট,’ জাজ বললেন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার।’ মাধবী বসাক সিটে বসে সামনে রাখা মিনারেল ওয়াটারের বোতলের জলে এক চুমুক দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিলেন।
‘মিস্টার আহুজা, এনি রিডাইরেক্ট কোয়েশ্চেন?’ জাজ বললেন। ‘নো ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল।
‘ড. জোনস ইউ আর এক্সকিউজড,’ জাজ অনিমেষ মিত্র বললেন।
‘ড. জোনস কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে গেলে জাজ বললেন, ‘মিস্টার আহুজা, আপনি আপনার নেক্সট উইটনেসকে ডাকতে পারেন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার। আমার নেক্সট উইটনেস হলেন ড. তথাগত দাস।’
এবার তথাগত কোর্টরুমে ঢুকল। নমিতা দেখল বৃদ্ধ কবিরাজ স্যার ছেলের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। তথাগত একবার ওর বাবার দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। ও যে প্রচণ্ড অস্বস্তিকর অবস্থায় আছে এটা নমিতা বেশ বুঝতে পারছে। মাধবী বসাকের স্পেসিফিক স্ট্র্যাটেজি ছিল বাবাকে তথাগতের সামনে কোর্টরুমে বসিয়ে রেখে তথাগতকে অস্বস্তিতে রাখা।
উইটনেস ডেস্কে গিয়ে তথাগত সত্যবাক্য বলার শপথ নিল। এবার সমীর আহুজা প্রশ্ন করল—‘ড. দাস, আপনি ‘ভেনম’ নামে সাপের বিষের প্রতিষেধক এই মেডিসিনটার আবিষ্কর্তা, কারেক্ট?’
‘এর আবিষ্কারের পেটেন্ট আমার এবং অ্যামফার্মার জয়েন্ট নামে।’
‘এটা আপনি কোথায় আবিষ্কার করেছেন?’
‘অ্যামফার্মার ল্যাবরেটরিতে আমি এই ওষুধ আবিষ্কার করেছি।’
‘কবে পেটেন্ট ফাইল করেছিলেন?’
‘ফার্স্ট নভেম্বর ২০১৩ সালে।’
‘কবে আপনার পেটেন্ট গ্র্যান্টেড হয়েছে?’
‘ফার্স্ট সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে।’
‘আপনি কবে জানলেন যে সুশ্রুত আপনার এই একই ওষুধ ব্যবহার করছে?’
‘আমার তারিখ মনে নেই। তবে পেটেন্ট পাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি এই খবরটা পাই।’
‘মিথ্যুক,’ কবিরাজ স্যার বিড়বিড় করে বলল, নমিতা স্পষ্ট শুনতে পেল। আহুজা জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি তখন কী অ্যাকশন নেন?’
‘আমি এটার কনফার্মেশনের জন্য সুশ্রুতের ওষুধের স্যাম্পল আমেরিকাতে আনিয়ে আমাদের ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করাই। এটা হুবহু এক দেখে আমি তখন ড. জোনসকে এটা জানাই, এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ল্যাবে টেস্ট করার অ্যাডভাইজ দিই।’
‘এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ল্যাব রিপোর্ট কী ছিল?’
‘সেম মেডিসিন।’
‘আপনি কি এই ওষুধের ফর্মুলা সুশ্রুতের কারোর সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘কার সঙ্গে এই ফর্মুলা শেয়ার করেছিলেন?’
ড. আরুষি মিশ্রের সঙ্গে,’ তথাগত মাইক্রোফোনটা মুখের কাছে নিয়ে এল।
নমিতা আরুষির দিকে তাকাল। আরুষি একটা বড় শ্বাস নিল।
‘কবে এই ফর্মুলা আপনি ড. আরুষি মিশ্রের সঙ্গে শেয়ার করেছেন?’
‘আমার তারিখ মনে নেই। তবে আবিষ্কারটা হওয়ার পর।’
‘আই হ্যাভ নো মোর কোয়েশ্চেন ফর ড. দাস, ইয়োর অনার।’
এবার জাজ মাধবী বসাককে বললেন, ‘মিস বসাক, আপনি উইটনেসকে ক্রশ কোয়েশ্চেন করতে পারেন।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক এবার উঠে দাঁড়ালেন। ‘ড. দাস, আপনি কবে অ্যামফার্মা জয়েন করেছেন?’
‘দোসরা জুলাই, ২০১৩ সাল।’
‘আপনি কীভাবে চাকরিটা পেলেন?’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার। পার্সোনাল ইনফরমেশন,’ আহুজা বলল। ‘অবজেকশন সাসটেইনড,’ জাজ বললেন।
‘আচ্ছা আমেরিকার কোন শহরে আপনি অ্যামফার্মাতে জয়েন করলেন? ‘সানফ্রান্সিস্কোতে।’
‘আপনি কোথায় থাকতেন তখন?’
‘ফ্রিমন্ট, বে-এরিয়াতে।’
‘অ্যামফার্মার অফিস কোথায় ছিল?’
‘মাউন্টেনভিউ। বে-এরিয়াতে।’
‘বিখ্যাত এলাকা বে-এরিয়া। গুগল, অ্যাপল, ফেসবুক কে নেই,’ মিস বসাক মন্তব্য করলেন। ‘আপনি কি জুলাই ২০১৩ থেকে সব সময় ওয়েস্ট কোস্টেই ছিলেন?’
‘হ্যাঁ। আমি ওখানেই ল্যাবরেটরিতে কাজ করেছি।’
‘অ্যামফার্মার মাউন্টেনভিউর ল্যাবে, কারেক্ট?’
‘হ্যাঁ।’
নমিতা আহুজার চোখের দিকে তাকাল, আহুজা চোখ কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছে মাধবী বসাকের অ্যাটাকটা কোন দিক থেকে আসছে। নমিতা নিজেও বুঝতে পারছে না মাধবী বসাক কী করতে চলেছে। তবে ভদ্রমহিলাকে যতটা বুঝেছে সে যে উনি অযথা বাগাড়ম্বর করবেন না।
‘মাউন্টেনভিউর অফিসটা কি অ্যামফার্মার হেড অফিস?’
‘না। হেড অফিস বাল্টিমোরে।’
‘বাল্টিমোরে ওদের ল্যাবরেটরি আছে?’
‘হ্যাঁ। স্টেট অব দ্য আর্ট ল্যাব। পৃথিবীর অন্যান্য বায়োটেক কোম্পানিগুলোর ঈর্ষা জাগানো ল্যাবরেটরি।’
‘একটু ডেস্ক্রাইব করবেন ওখানে আপনি কী কী দেখেছেন?’
‘আমি কখনো ওখানে যাইনি।’
‘কেন?’
‘ওখানে ইউ এস ডিফেন্সের জন্য রিসার্চও হয়। তাই গভর্নমেন্ট অব আমেরিকার সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স না থাকলে ওখানকার ল্যাবরেটরির প্রেমিসেসে ঢোকা অ্যালাউড না। তার জন্য আমেরিকান সিটিজেনশিপ লাগে। আমি ইউ এস সিটিজেন নই।’
‘ইন্টারেস্টিং!’ মাধবী বসাক বললেন। ‘এই ওষুধটার ফর্মুলা আবিষ্কার করার জন্য আপনার সঙ্গে কে কে কাজ করেছে? আই মিন অ্যামফার্মার আরেকজনের নাম বলুন যিনি এই ওষুধের ডিসকভারির সঙ্গে জড়িত।’
‘এটা আমার সোলো এফর্ট। এই বিষয়ে যে টেকনিক্যাল পেপার আছে তার অথার আমি।’
‘ইন্টারেস্টিং,’ মাধবী বসাক এবার পেনটা দিয়ে মাথায় টোকা দিলেন। ‘অ্যামফার্মার পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন বলছে এই ওষুধ আমেরিকার বাল্টিমোরের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়েছে। আপনি বলছেন আপনি একাই এই ওষুধের সৃষ্টিকর্তা। আপনি কখনো বাল্টিমোরের ল্যাবরেটরিতে যাননি। তাহলে এই ওষুধ কীভাবে বাল্টিমোরের ল্যাবে সৃষ্টি হল?’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার!’ আহুজা গর্জে উঠল। বিজনেস সিক্রেট!’
‘অবজেকশন ওভাররুলড,’ জাজ বললেন। ‘আমি মনে করি এটা পেটেন্ট এক্সামিনেশনের জন্য ইমপর্ট্যান্ট কোয়েশ্চেন।’
‘থ্যাঙ্ক ইয়ু ইয়োর অনার, মাধবী বসাক মাথা ঝোঁকালেন।
তথাগতের দৃষ্টিতে প্রকাশ পেল সে এই প্রশ্নের জন্য অপ্রস্তুত। ও একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আমাদের ড্রাগ টেস্টিং এর ম্যানেজমেন্ট বাল্টিমোরের সেন্ট্রাল লোকেশন থেকে হয়। ওখান থেকে সায়েন্টিস্ট এসেছিল আমি প্যাকেজ হ্যান্ডওভার করেছিলাম সান ফ্রান্সিসকোতে।’
মিস বসাক বললেন, ‘ড. দাস, আপনার পেটেন্ট সাবমিশনের পেপার ওয়ার্ক করতে মোটামুটি কতদিন লেগেছে?’
‘চার-পাঁচ মাস।’
‘আপনি বললেন এই পেটেন্টটা ফাইল হয়েছে ১ নভেম্বর, ২০১৩, কারেক্ট?’
‘হ্যাঁ।’
‘তার মানে আপনি জয়েন করলেন দোসরা জুলাই ২০১৩, আর চার মাসের মধ্যে আপনি আবিষ্কার করে ফেললেন একটা ওষুধ, শুধু আবিষ্কার নয়, সেই ওষুধের টেস্টিং করে পেপার-টেপার রেডি করে একদম পেটেন্টের জন্য ফাইল করে দিলেন একদম লাইটের স্পিডে?’
‘আমি এটা নিয়ে অনেক আগে থেকে কাজ করছিলাম।’
‘অলরাইট! দ্যাট মেকস সেন্স। তার মানে অ্যামফার্মার ল্যাবের বাইরেও এই রিসার্চের কাজ হয়েছে। কারেক্ট?’
তথাগত একটু থতমত খেয়ে গেল।
‘ড. দাস? অ্যামফার্মার ল্যাবের বাইরেও এই ওষুধের কাজ হয়েছে, কারেক্ট?’
তথাগত নীরবে মাথা নাড়লো।
জাজ বললেন, ‘ড. দাস, আপনি ইয়েস অথবা নো বলবেন। নীরবে মাথা নাড়ালে স্টেনোগ্রাফার আপনার রিঅ্যাকশন টাইপ করতে পারবে না।’
‘ইয়েস ইয়োর অনার।’
মিস বসাক এবার বললেন, ‘আপনি অ্যামফার্মায় জয়েন করার আগে কোথায় কাজ করতেন?’
‘আমি ইন্ডিয়াতে সুশ্রুতের সায়েন্টিস্ট ছিলাম।’
‘চাকরি করতেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কবে থেকে কবে পর্যন্ত সেই কোম্পানিতে ছিলেন?’
‘২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।’
‘তারপর সেই ফেব্রুয়ারিতে আপনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করেন আর জুলাই মাসে আপনি আমেরিকা চলে গেলেন, তাই না?’
‘ইয়েস ম্যাম।’
‘সুশ্রুতের ল্যাবে কি আপনি এই সাপের বিষের ওষুধের সম্বন্ধে কাজ
করেছেন?’
‘না। আমি ওখানে হাঁপানির একটা ওষুধের ব্যাপারে রিসার্চ করছিলাম।’
‘সুশ্রুত যে সাপের বিষের প্রতিষেধক এই ওষুধ বিক্রি করে এটা কি আপনি জানতেন?’
‘না।’
‘একটু ভালো করে মনে করার চেষ্টা করুন ড. দাস, আপনি জানতেন না সুশ্রুত এই ওষুধ ওদের ল্যাবে তৈরি করে?’
‘না আমি জানতাম না,’ তথাগত খুব জোর গলায় বলল।
‘হঠাৎ আপনি তাহলে গন্ধনাকুলী থেকে যে ওষুধ তৈরি করা যায় তা টের পেলেন কীভাবে?’
‘আমি পড়েছিলাম।’
‘কোথায় পড়েছিলেন? এই ‘বেহুলার খনা’ বইতে?’
‘অবজেকশন,’ আহুজা বলল। ‘অবজেকশন সাসটেইন্ড।’
‘কোথায় পড়েছিলেন?’
‘মনে পড়ছে না।’
‘তবে এটা জেনেছিলেন যে গন্ধনাকুলীর গাছের শিকড় থেকে সাপের বিষের প্রতিষেধক মেডিসিন তৈরি হয়।’
‘হ্যাঁ, তবে কীভাবে তৈরি হয় তা জানতাম না।’
‘আপনি এঁকে চেনেন?’ মিস বসাক এবার আরুষিকে দেখাল।
‘হ্যাঁ,’ তথাগত উদ্ধতভাবে তাকাল।
‘কীভাবে চেনেন এনাকে?’
‘সুশ্রুতে ইনি আমার কলিগ ছিলেন।’
‘শুধু কলিগ, একটু ভেবে দেখুন তো?’
তথাগত এবার চুপ করে রইল।
‘ড. দাস, ইউ আর আন্ডার ওথ। সত্যি কথা বলুন।’
‘উনি আমার বন্ধু ছিলেন।’
‘বন্ধু? গার্লফ্রেন্ড? প্রেমিকা?’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার, পার্সোনাল লাইফের কোয়েশ্চেন।’
‘ওভাররুলড।’
‘ড. দাস, আপনাদের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল?’
‘বন্ধু। উনি মেন্টালি খুব ডিপ্রেসড থাকতেন। সব সময়। তাই আমি ওকে হাসিখুশি রাখতে চেষ্টা করতাম। উনি ওর অনেক গোপন কথা আমায় বলতেন, যেমন –ওর জেঠু ‘
‘আমি সেসব জানতে চাইনি।’
‘আপনি সম্পর্ক জানতে চেয়েছেন, আয়্যাম নট ইয়েট ফিনিশড, তথাগত মরিয়া। ওর চোখের দৃষ্টিতে একজন আততায়ীর নিষ্ঠুরতা ঠিকরে উঠছে।
মাধবী বসাক চুপ করে গেলেন।
‘ওর জেঠু ওর ওপর ছোটবেলা ফিজিকাল মলেস্টেশন করেছিল, সেই ট্ৰমা ওকে মাঝে মাঝে ভিজিট করত। উনি আমাকে সেকথা বলেছিলেন।’
নমিতা আরুষির দিকে তাকাল। আরুষি ঠোঁট চিপে অবনত দৃষ্টিতে পাথরের মতো বসে আছে। তথাগত থামল।
‘আর ইউ নাউ ফিনিশড?’
‘ইয়েস ম্যাম।’
‘ড. দাস আপনি ২০১৩ এর জানুয়ারিতে ব্যাঙ্গালোরে একটা ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারে গেছিলেন ড. আরুষি মিশ্রের সঙ্গে এটা কি ঠিক?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমরা জানি এইসব ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারগুলোতে বিদেশি জায়েন্ট কোম্পানিগুলোর দালালরা ঘুরে ঘুরে বেড়ায় আমাদের দেশি ট্যালেন্ট ধরে বায়োপাইরেসির জন্য—’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার!’ আহুজা বলল।
‘অবজেকশন সাসটেইনড।’
‘আচ্ছা ওই সেমিনারে কি অ্যামফার্মার কোনো প্রেজেন্টেশন ছিল?’
‘আমার মনে পড়ছে না।’
‘আচ্ছা আপনার মেমারিটাকে আরো একটু নাড়াচাড়া করা যাক। সেসময় অ্যামফার্মার কোনো দালাল, অ্যাপোলজি ফর মাই ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যামফার্মার কোনো সিনিয়ার অফিসিয়ালের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?’
‘হতে পারে। আমার মনে নেই।’
‘একটু ভালোভাবে ভেবে দেখুন, ড. দাস।’
‘আমি বললাম তো আমার মনে নেই।
‘বিদেশি দালালরা ডকুমেন্টেশনের ব্যাপারে খুব হুঁশিয়ার। আমাদের ওদের থেকে শেখা উচিত।’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার। ইনি শুধু শুধু কোর্টের সময় নষ্ট করছেন।’
‘অবজেকশন সাসটেইন্ড।’
‘ড. দাস, ব্যাঙ্গালোরের হোটেল অশোকের এই ডিনারের ভাউচারে আপনার সই আছে। আপনি কি এই ডিনারটা পে করেছিলেন?’
তথাগত এবার ইতস্তত করে বলল, ‘আমার মনে নেই।’
‘দেখুন তো এই কাগজটা আপনি চিনতে পারেন কিনা?’ মাধবী বসাক একটা কাগজ নিয়ে তথাগতের দিকে এগিয়ে গেল। ‘এখানে আপনার হাতের লেখায় সুশ্রুতের ভাউচারে এক্সপেন্স রিজন লেখা আছে ডিনার উইথ ড. ফুলম্যান অব অ্যামফার্মা, ইউ এস এ। দেখুন তো এটা কি আপনার হাতের লেখা?’ মাধবী বসাক উইটনেস ডেস্কে গিয়ে একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন তথাগতের হাতে।
তথাগত কাগজটা দেখে বলল, ‘হ্যাঁ এটা আমার হাতের লেখা।’
‘এবার কি আপনার মেমারিতে কিছু মনে আসছে যে আপনার সঙ্গে অ্যামফার্মার কোনো দালাল, সরি বারবার ভুল হয়ে যায়, সিনিয়ার রিপ্রেজেন্টেটিভের সঙ্গে একান্তে কথাবার্তা হয়েছিল কিনা?’
‘হ্যাঁ মনে পড়েছে। ওটা একটা কার্টেসি ডিনার। এরকম নেটওয়ার্কিং সব সেমিনারেই হয়।’
‘ওই ডিনারে আপনার কো-অথার ড. আরুষি মিশ্রকে আপনি সঙ্গে নিয়ে গেছিলেন?’
‘না,’ তথাগত ধীরে বলল।
ডিনারে অ্যামফার্মার অফিসিয়ালের সঙ্গে আপনার এমন কী কথাবার্তা হয়েছিল যে তার জন্য আপনি আপনার কো-অথার ড. আরুষি মিশ্রের সঙ্গে
রাতে ঝগড়া করলেন?’
‘আমি কোনো ঝগড়া করিনি।’
‘এটা ঠিক আপনি ঝগড়া করেননি। আপনি কি শান্তভাবে আপনার পার্টনারকে বলেছিলেন যে অ্যামফার্মা ওদের এই সাপের বিষের ওষুধের ফর্মুলাটা কিনে নিতে চায়। ওরা ভালো দাম দেবে। এটা শুনে আপনার পার্টনার ড. আরুষি মিশ্র খুব রেগে যান। আপনার ওপর চেঁচামেচি করেন। ড. আরুষি মিশ্র আপনাকে তিরস্কার করে বলেন এটা বায়োপাইরেসি। আমাদের দেশের প্রাচীন জ্ঞানভাণ্ডার এভাবেই বিদেশে গোপন পথে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটা আনএথিক্যাল। আপনি তখন শান্তভাবে ওকে বোঝান যে এসব দেশাত্মবোধক ইমোশনাল স্পিচ দিয়ে বিজনেস হয় না। উনি রাজি হন না। তারপর আপনাদের সম্পর্ক তিক্ততার দিকে মোড় নেয়। এটা কি সত্যি?’
আহুজা এবার সার্কাস্টিক হাসি দিয়ে বলল, ‘ইয়োর অনার! এটা কি কোর্ট, নাকি বলিউড সিনেমা! কী হচ্ছে এসব?’
জাজ বললেন, ‘মিস বসাক, আপনার আর কোনো প্রশ্ন আছে?’
মাধবী বসাক বললেন, ‘ইয়োর অনার, এই ভাউচারটা আমি একজিবিট টু হিসেবে কোর্টে অ্যাডমিট করতে অনুমতি চাই।’
‘একজিবিট টু অ্যাডমিটেড অ্যাাজ এভিডেন্স,’ জাজ বললেন।
মাধবী বসাক কাগজটা কোর্ট ক্লার্কের ডেস্কে রাখলেন, তারপর বললেন, ‘আই হ্যাভ নো মোর কোয়েশ্চেন ফর ড. দাস। থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার।’
‘মিস্টার আহুজা, এনি রিডাইরেক্ট?’
‘নো ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল।
জাজ তথাগতকে বললেন, ‘ইউ আর এক্সকিউজড।’ তারপর আহুজাকে বললেন, ‘আপনি পরের সাক্ষী হিসেবে কাকে প্রেজেন্ট করতে চান?’
‘আমার পরের সাক্ষী কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট অনিল দে।’
ট্রাফিক পুলিশের পোশাক পরে টাক-মাথা একজন মোটা লোক কোর্টরুমে ঢুকে সত্যকথনের শপথ নিয়ে আসনে বসল। সমীর আহুজা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন শুরু করল।
‘মিস্টার দে, আপনি কোথায় কাজ করেন তা প্লিজ আদালতকে বলবেন?’
‘কলকাতা পুলিশে।’
‘আপনার ডেজিগনেশন?
‘ট্রাফিক সার্জেন্ট।’
‘কত বছর আপনি কলকাতা ট্রাফিক পুলিশে কাজ করছেন?’
‘এগারো বছর।’
‘গত পাঁচই আগস্টে আপনার ডিউটি কোন শিফটে ছিল?’
‘নাইট শিফটে।’
‘সেদিন রাতে কি ইস্টার্ন বাই-পাসে একটা অ্যাক্সিডেন্ট দেখতে পান?’
‘হ্যাঁ। আমি পেট্রোলে ছিলাম। বাইপাসে ভাঙা গাড়িটা দেখি রাস্তার ধারে।’
‘আপনি কী করলেন তখন?’
‘আমি বুঝলাম অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পুলিশের গাড়ি ওই গাড়ির কাছাকাছি নিয়ে গেলাম দেখতে যে কেউ ভিতরে আছে কিনা?’
‘কী দেখলেন?’
‘আমি দেখলাম একজন মহিলা ড্রাইভারের সিটে জ্ঞানহীন অবস্থায়। গাড়ির বাঁদিক একদম তুবড়ে গেছে। উইন্ডশিল্ডের কাচ ভেঙে গাড়িতে ছড়িয়ে গেছে, বাঁদিকের কাচও ভেঙে গেছে।’
‘আপনি তখন কী করলেন?’
‘আমার সঙ্গী ট্রাফিক কনস্টেবলকে বললাম অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করতে আর আমি গাড়ির ভিতর টর্চ মেরে দেখলাম ভিতরের ড্রাইভার বেঁচে আছেন কিনা।’
‘সে সময় গাড়ির ভিতর ড্রাইভার ছাড়া আর কেউ ছিল?’
‘না।’
‘আপনি কি ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘গাড়ির ভিতরে গিয়ে কী দেখলেন?’
‘গাড়ির ভিতরে মদের গন্ধ। ভিতরে আরোহীর সিটবেন্ট খুলে আমরা আরোহীকে বের করে আনলাম।’
‘তারপর কী করলেন?’
‘আমরা চেক করে বুঝলাম যে মহিলা বেঁচে আছেন তবে গুরুতর আহত। মহিলার গায়ে মুখে মদের গন্ধ। অ্যাম্বুলেন্স তাড়াতাড়িই চলে এল। জ্ঞানহীন ড্রাইভারকে অ্যাপেলো হসপিটালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হল।’
‘আপনি সঙ্গে গেলেন?’
‘হ্যাঁ। একজন কনস্টেবলকে অ্যাক্সিডেন্ট স্পটে গাড়িটার পাহারায় রেখে আমরা অ্যাম্বুলেন্সের পিছনে পিছনে অ্যাপেলোর ইমারজেন্সিতে গেলাম।’
‘তারপর?’
‘মহিলাকে অ্যাপেলো হসপিটালে অ্যাডমিট করার পর আমরা আবার অ্যাক্সিডেন্টের স্পটে ফিরে গেলাম। তারপর গাড়িটাকে চেক করলাম।
‘কী পেলেন?’
‘একটা খানিকটা খাওয়া মদের বোতল ড্রাইভারের সিটের সামনের পায়ের
কাছে পড়ে আছে।’
‘আপনার কী মনে হলো? ম্যাডাম মদ খেয়ে চালিয়ে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন?’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘অ্যাসামপশন। ‘অবজেকশন সাসটেইন্ড,’ জাজ বললেন।
‘আর কী দেখলেন?’
‘পিছনের সিটে একটা জিপলক ব্যাগে রাখা সাদা পাউডার।
‘কী পাউডার তা কি টেস্ট করিয়ে জেনেছেন?’
‘ইয়েস।’
‘কোর্টকে বলবেন কী পাউডার?’
‘কোকেন।’
‘নো মোর কোশ্চেন ফর মিস্টার দে, ইয়োর অনার।’
‘মিস বসাক, এনি ক্রশ কোয়েশ্চেন?’ জাজ বললেন।
‘ইয়েস ইয়োর অনার, মিস বসাক উঠে দাঁড়ালেন। ‘গুড মর্নিং মিস্টার দে।’
‘গুড মর্নিং ম্যাডাম।
‘গাড়িতে যে মদের বোতল পেলেন সেটা আস্ত ছিল না ভেঙে গেছিল?’
‘আস্ত ছিল।’
‘অতবড় দুর্ঘটনার পরেও মদের বোতল ভাঙেনি?’
‘না ম্যাডাম।’
‘আপনার এগারো বছরের ট্রাফিক পুলিশের অভিজ্ঞতায় কি মনে হয়নি অত বড় অ্যাক্সিডেন্টের পরও বোতল না ভাঙাটা অস্বাভাবিক?’
‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল। ‘অ্যাসামপশন।’
‘অবজেকশন সাসটেইন্ড,’ জাজ বললেন।
‘বোতলের ছিপি খোলা ছিল না বন্ধ ছিল?’ মাধবী বসাক বললেন।
‘বন্ধ।’
‘বোতল কি ভর্তি ছিল?’
‘না। কয়েক চুমুক মদ ম্যাডাম খেয়েছিলেন বলে আমার বিশ্বাস।’
‘গাড়িতে যার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, তিনি কি এই কোর্টরুমে উপস্থিত আছেন?’
‘ইয়েস ম্যাম।’
‘আপনি কি তাকে চিহ্নিত করতে পারেন?’
‘হ্যাঁ হুইল চেয়ারে বসা উনি,’ ইনস্পেক্টর আরুষিকে দেখাল।
‘আই হ্যাভ নো মোর কোয়েশ্চেন ইয়োর অনার।’ মাধবী বসাক বললেন। ‘মিস্টার আহুজা, এনি রিডাইরেক্ট কোয়েশ্চেন?’ জাজ বললেন।
‘নো কোয়েশ্চেন ইয়োর অনার।’
‘অল রাইট, জাজ বললেন। ‘কোর্ট ইজ ইন রিসেস ফর লাঞ্চ আনটিল ওয়ান থার্টি পিএম।’ জাজ উঠে দাঁড়ালেন। কোর্টরুমের সকলে উঠে দাঁড়াল। নমিতা এবার ধন্বন্তরি কবিরাজকে সঙ্গে নিয়ে কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে এল।
