বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬৩
।। তেষট্টি।।
১৮ আগস্ট, ২০১৯
দিনগুলো এতদিন দ্রুতগতিতে দৌড়োচ্ছিল, আজ হঠাৎ হোঁচট খেয়ে থমকে দাঁড়াল। সকাল সকাল মিস বসাকের ফোন
‘আহুজা! অ্যামফার্মার ল’ইয়ার! কেন?’
‘আহুজা দেখা করতে চায়।’
‘সাধারণত আমরা ল’ইয়াররা এভাবে দেখা করি আউট অব দ্য কোর্ট সেটলমেন্টের কোনো প্রস্তাব থাকলে। জানি না কী চায় ও।’
‘আউট অব দ্য কোর্ট সেটলমেন্ট? আরুষিকে জানিয়েছেন?’
‘না।’
‘জানাবেন না?’
‘আগে দেখি আহুজা কী বলে। আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন?
‘আমি? আমার আপত্তি নেই,’ নমিতা বিছানা থেকে উঠে বসল। তবে বিদ্যাদিকেও সঙ্গে নিয়ে যাই? ওর মাথাটা ভালো খেলে।’
‘না। আপনার এই ব্রিলিয়ান্ট দিদিটির ওপর আমার কনফিডেন্স একটু শেক করে গেছে। উনি তথাগতের সঙ্গে মিটিংটা এখনো আমাদের কাছে গোপন রেখেছেন কেন? ওঁকে আমি আমার আস্তিনের নীচের সব কার্ড দেখাতে চাই না। আমার কেমন যেন একটা গাট ফিল হচ্ছে যে উনি অনেক কিছু জানেন, কিন্তু আমাদের বলছেন না। একটু উইয়ার্ড লাগছে। তবে আহুজা আমায় ভালোই চেনে। ও বুলশিট ফ্যাক্ট সাজিয়ে বলবে না, বা চিপ খেলা খেলবে না আমার সঙ্গে। লেটস সি ও কী বলে। আপনি আপনার দিদিকে ঘুণাক্ষরেও জানাবেন না। চুপচাপ দু’জনে দেখা করে আসি।’
‘কোথায়?’
‘সোনার বাংলা হোটেলে।’
‘আর কেউ থাকবে?’
‘জানি না। আর কিছু বলেনি। দেখা যাক।’
‘কখন যেতে হবে?’
‘এগারোটা।
‘ভালো। বিদ্যাদি তখন আহিরীটোলার স্কুলে।’
.
হোটেলের রিসেপশনে বলা ছিল, নমিতা ও মিস বসাককে ফ্রন্ট ডেস্কের একজন স্ট্যাফ একটা আলোকোজ্জ্বল কনফারেন্স রুমে নিয়ে গেল। আহুজা ভিতরে ল্যাপটপে কাজ করছিল ওদের দেখে ল্যাপটপের ঢাকনা নামিয়ে উঠে দাঁড়াল—‘আসুন মিস বসাক, হোয়াট অ্যান অনার!’
মিস বসাক নমিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। মাঝবয়সী লোকটাকে দেখে নমিতার মনে হলো একজন রিটায়ার্ড ক্রিকেটার। মেরুদণ্ড একদম সোজা, হাফ- শার্ট থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা লোকটার বাইসেপস দেখে নমিতা বুঝল মানুষটা রোজ ওয়ার্কআউট করে শরীরের ভালোই যত্ন নেয়। আহুজা হেসে চওড়া পাঞ্জা দিয়ে করমর্দন করে বলল—‘প্লিজ বসুন
নমিতা ও মিস বসাক বসলে আহুজা বলল, ‘চা—কফি?’
‘নো থ্যাঙ্কস,’ মিস বসাকের ঠোঁটে একাদশীর চাঁদের হাসি।
‘আপনাদের টাইম ওয়েস্ট করব না। আমাদের টাইম মানে হিউজ মানি ফর দ্য ক্লায়েন্ট,’ আহুজা হেসে বলল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, ‘মিস বসাক, প্রত্যেক কেসে আমাদের মতো উকিলরা নিজেরা জানতে চায় যে হোয়াট ওয়াজ দ্য ট্রুথ। অনেক সময় ক্লায়েন্টও উকিলের কাছে মিথ্যা কথা বলে। কিন্তু উকিল তার নিজস্ব বুদ্ধি খাটিয়ে সেই সত্য অনুসন্ধান করে। আমি বলছি না আমরা সব সময় সত্যের পক্ষ নিয়ে আদালতে লড়ি, কিন্তু আমরা অন্তত জানি যে আমরা সত্যকে প্রকাশ করব, নাকি সত্যকে আড়াল করব। এই কেসে সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য পেয়েছি। সেটা আমি আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই, মিস বসাক।’
‘কেন?’
‘আমি একটা আউট অব দ্য কোর্ট সেটলমেন্ট করার জন্য হার্ট টু হার্ট কথা বলতে চাই।’
‘তাহলে তো কথা বলাই যাবে না মিস্টার আহুজা, কারণ আমাদের সার্কিটে জনান্তিকে আমায় লোকে হার্টলেস অ্যাটর্নি বলে,’ মিস বসাক ঠোঁটে সামান্য হাসির রেখা এনে বললেন।
‘তাহলে মিস বসাক, এটা আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমাদের সার্কিটে আমার বদনাম আছে আমি নাকি দুঃশাসন। যাক, যা বলছিলাম, আমি একটা আউট অব কোর্ট সেটলমেন্ট চাই।
‘বেশ, আপনার অফারটা আগে বলুন।’
‘ফার্স্ট, অ্যামফার্মা আট কোটি টাকা ড্যামেজ ক্লেইম উইথড্র করে নেবে। সেকেণ্ড, অ্যামফার্মা সুশ্রুতকে এই ওষুধের ইন্ডিয়াতে ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেলস এর পারমিশন দেবে অ্যামফার্মার লাইসেন্স ইউজ করে। এজন্য সুশ্রুতকে কোনো লাইসেন্স ফিজ দিতে হবে না। থার্ড, আমি চেষ্টা করব, আই ক্যান নট প্রমিস, যে অ্যামফার্মা সুশ্রুতের লিটিগেশন কস্টের ফিফটি পার্সেন্ট পে করে দেবে। আর এর বিনিময়ে আপনাদের এগ্রি করতে হবে যে অ্যামফার্মা এই পেটেন্টের মালিক।
‘তার মানে এটা প্রমাণ করতে চান যে সুশ্রুত অ্যামফার্মার ফর্মুলা চুরি করে ওষুধ বানিয়ে বিক্রি করেছে?’
‘মানেটা তাই দাঁড়ায়।’
‘রিডিকিউলাস!’ মিস বসাকের কণ্ঠে বিদ্রূপ।
‘এটা ঠিক সুশ্ৰুত অ্যামফার্মার ফর্মুলা চুরি করেনি, কিন্তু এটাও সত্যি যে সুশ্রুত অন্য কারোর ফর্মুলা চুরি করেছে।’
‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’
সুশ্রুত ‘বিষহরি’ ওষুধের ফর্মুলার আবিষ্কারক নয়।’
‘সে আমি জানি। সুশ্রুতের মালিক সুব্রত মিশ্র গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে প্রাচীন আয়ুর্বেদের ওষুধ কিনত বেদেদের থেকে।’
‘এই ফর্মুলা সুব্রত মিশ্র কিনেছিল তথাগতের বাবা ধন্বন্তরি কবিরাজের থেকে। তথাগতের বাবার আয়ুর্বেদের পুরোনো ডায়েরীতে লেখা ছিল সেই ওষুধের ফর্মুলা।’
‘তাতে অন্যায়টা কোথায়?’
‘২০০৪ সালে তথাগতের মায়ের এক কঠিন অসুখ হয়। তখন স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা জোগাড় করার জন্য তথাগতের বাবা সুশ্রুতকে এই আয়ুর্বেদ ওষুধের ফর্মুলা বিক্রি করেছিল। তথাগতের বাবা চল্লিশ হাজার টাকা চেয়েছিল। কিন্তু ওর বাবার বিপন্ন অবস্থার সুযোগ নিয়ে ড. আরুষি মিশ্রের বাবা শমীক মিশ্র আর ওর জ্যাঠা প্রমিত মিশ্র সেই গরীব কবিরাজের সঙ্গে বারগেনিং করে মাত্র দশ হাজার টাকায় সেই ওষুধের ফর্মুলা কিনে নিয়েছিল! ভাবতে পারেন সেই গরীব কবিরাজের মনের অবস্থা! তিনি ভাবছেন টাকাটা না পেলে তার মরণাপন্ন স্ত্রীর ওষুধ কিনতে পারবেন না। কিছুদিন পর কবিরাজের স্ত্রী অর্থাভাবে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলেন। মায়ের মৃত্যু ড. তথাগত দাসের মনে একটা নাইন রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছিল।’ সমীর আহুজা একটু চুপ করে রইল। ‘শমীক মিশ্র আর প্রমিত মিশ্রের সম্বন্ধে আমি কোনো কমেন্ট করছি না কারণ তারা আপনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। ড. তথাগত দাস ক’দিন আগে ওর পিসি বিদ্যাধরী দাসের সঙ্গে দেখা করেন। ও পিসিকে বলে এই লোকগুলো আমার বাবাকে ঠকিয়েছে, এরা অর্থ সাহায্য করলে মা হয়তো আরো কিছুদিন বাঁচত। আর পিসি তুমি তাদের দলে?’ সমীর আহুজা একটা বড় শ্বাস নিল তারপর চোখ কুঁচকে বলল, ‘মিস বসাক, বলুন কী পার্থক্য বিদেশি কোম্পানিগুলির সঙ্গে আমাদের দেশের বড়লোক বিজনেস মালিকদের? বিদেশিরা আমাদের নিংড়ায়, আর আমাদের দেশের বড়লোকেরা নিংড়ায় গরীবদের। তথাগত ওর পিসিকে বলেছিল তুমি বল পিসি, বাবার চরম অসহায়তার সুযোগ নিয়েছিল কিনা এই সুশ্রুতের মতো কোম্পানি? বাবাকে নিংড়ে নিয়েছিল কিনা? এটাও কি বায়োপাইরেসি নয়? নাকি এদেশের বড় লোকেরা গরীব মেধাকে ঠকিয়ে ফর্মুলা হাতালে সেটা পাইরেসি হয় না।’
‘কিন্তু আমার মেয়ে আরুষি কী দোষ করেছিল? তথাগত আরুষির সঙ্গে প্রতারণা করেছিল,’ মিস বসাক ধীর কণ্ঠে বললেন।
‘শুধু ফর্মুলা দিয়ে তো আর ওষুধ হয় না। ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেসটা কী তা জানার দরকার ছিল। তথাগত সুশ্রুতের ল্যাবে অ্যাক্সেস পেত না যদি আরুষি না ওর দাদুকে রাজি করাত। সেজন্য আরুষির সাহায্য দরকার ছিল। কিন্তু এই ফর্মুলার উত্তরাধিকার যদি কেউ হয় তবে সে হল তথাগত দাস। আমি তার পক্ষ নিয়েই এই কেস লড়ছি।’
‘আমি ধরে নিলাম আপনি যা যা বললেন, তার সবটাই সত্যি, মিস্টার আহুজা। কিন্তু আপনি এটা তো স্বীকার করবেন যে এই ফর্মুলা তথাগতের বাবা ধন্বন্তরি কবিরাজেরও নয়। এই ফর্মুলা বহুকাল ধরে এদেশে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। ইয়োর পেটেন্টেড ফর্মুলা ল্যাকস নভেলটি। ‘বেহুলার খনা’ তে খনার বচনে ক্লিয়ারলি লেখা আছে যে—’
‘মিস বসাক, ‘বেহুলার খনা’তে লেখা থাকলেই যে ল্যাকস নভেলটি প্রুফ হয়ে গেল তা নয়। কারণ—’
‘কারণ?’
‘কারণ, ‘বেহুলার খনা’ বলে কোনো প্রাচীন পুঁথি ছিল না। সেই ট্রুথটাই আমি আপনাকে জানাতে চাই। অ্যাকচুয়ালি, বেহুলা বলেই কেউ ছিল না।’
‘একথা কীভাবে আপনি জোর দিয়ে বলছেন?’
‘বেহুলা হল মিস বিদ্যাধরী দাসের মানস কন্যা। ওঁর কাল্পনিক সৃষ্টি। ইয়েস আই রিপিট, বেহুলা বলে আসলে কেউ ছিল না। বেহুলা একটা কল্পনার গল্প। যখন মিস দাসকে ইউনিভার্সিটি থেকে বের করে দেওয়া হয় তখন উনি প্রচণ্ড মানসিক শক পান। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তখন তিনি নিজে একবার সুইসাইড করতে গেছিলেন। তিনি তখন নিজেকে ভিক্টিম ভাবতে আরম্ভ করেন, আর তিনি মনে মনে একজন কাল্পনিক বিদুষী সৃষ্টি করেন। সেই বিদুষী হলেন বেহুলা। সেই বিদুষী বিদ্বানদের ভিক্টিম হয় এবং তাকে জেতাবার জন্য একটা গল্প লেখেন ‘বেহুলার খনা’। ওনার হাতের লেখায়। কোনো পুঁথি নেই। উনি তখন মানসিক ওষুধ খাচ্ছেন, অবসাদে ঢেকে রয়েছে ওঁর মন। সুরিয়ালিস্ট চিন্তাধারায় ভর্তি ওঁর এই গল্প। ডিঙিবৃষ্টি তার একটা উদাহরণ।’
‘এবার আপনি গল্প বানাচ্ছেন মিস্টার আহুজা।’
‘বেশ আপনি তাহলে মিস বিদ্যাধরী দাসকেই জিজ্ঞাসা করে দেখুন। কোথায় আছে সেই প্রাচীন পুঁথি? ‘
‘সেই পুঁথি পাওয়া যায় নি। কিন্তু উপকথাটা টিকে আছে।’
‘উপকথা? ক্যান ইউ বিলিভ দ্যাট? এরকম কোনো উপকথা থাকলে আমি আপনি আমরা কি সবাই তা জানতাম না? কেউ কখনো জানে না, শোনেনি বেহুলার এই উপকথা। আপনারাও জানতেন না, যদি মিস বিদ্যাধরী দাস এই গল্প আপনাদের না জানাতেন। মিস বসাক, আদালতের এই পেশায় দেখতে দেখতে বাইশটা বছর কাটিয়ে দিলাম আমি। মিথ্যা কথা বললে আমি তার গন্ধ পাই। বেহুলা চরিত্রটা মিস বিদ্যাধরী দাসের সৃষ্টি। অরিজিন্যাল পুঁথি ওদের বাড়িতে কেউ দেখেন নি। তথাগত বা ধন্বন্তরি কবিরাজ কেউ না। বিদ্যাধরী দেবীকে যখন ইউনিভার্সিটি থেকে অন্যায় ভাবে বের করে দিয়েছিল তখন উনি প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে ভুগতেন। তখন ওঁর দাদা ওঁর হাতে খাতা-কলম তুলে দিয়ে বলেছিল তোর মনে যা আসে তা তুই লেখ বিদ্যা। উনি তখন বেহুলার এই সুরিয়ালিস্ট গল্প লেখা শুরু করেছিলেন। তথাগত তখন ছোট। বিদ্যাধরী দেবী সেই গল্প তথাগতকে শোনাতেন। বিদ্যাধরী দেবী ওঁর সৃষ্ট বেহুলাকে সব রকম বিপদ থেকে বাঁচাতেন। বেহুলা যখন চরম বিপদে পড়ত তখন কেউ না কেউ ঠিক হাজির হতো ওর সামনে, ওকে বাঁচাতে। বিশ্বনাথ ব্যাধ, বচনপিসি, বুধন, জটা, ডেভিড সাহেব—সবাই এগিয়ে এসে এসে বেহুলাকে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর থেকে বাঁচাতো। সেই গল্পই লেখা হয়েছে এই ট্রেনের হকারের বইতে।’
‘আর আরুষি? ওকে তো মেরেই ফেলেছিল গাড়ি চাপা দিয়ে তার কী হবে?’ মিস বসাক ফুঁসে উঠলেন।
‘মিস বসাক, আমি আমার আস্তিনের নীচে কোনো তাস রাখিনি। আপনাকে সবকিছু দেখালাম। এটাই সত্যি। তবে আপনার মেয়েকে ওরা যেভাবে ভয় দেখাতে চেয়েছে এটা আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি আমার ক্লায়েন্টকে যাচ্ছেতাই ভাবে গালাগালি করেছি। একজন ইন্ডিয়ান মেয়ে সায়েন্টিস্টের ওপর এরকম আক্রমণ করার সাহস ওদের হয় কীভাবে? আমি কথা দিচ্ছি আপনার মেয়ের টোটাল ড্যামেজ ওদের বিয়ার করতে হবে। আই প্রমিস, ওদের থেকে আমি ক্ষতিপূরণ আপনাকে এনে দেব।’
নমিতা দেখল মিস বসাক নিরুত্তর কিন্তু ওঁর চোয়াল আবার দৃঢ় হয়ে উঠেছে আহুজা বলল, ‘আমি বাংলা পড়তে পারি না। কিন্তু ‘বেহুলার খনা’ বইটার ট্রান্সলেশন আমি দু’জন ট্রান্সলেটারকে দিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে করিয়েছি। বারবার পড়েছি। এগুলো পড়ে কি আপনার মনে হচ্ছে না যে এটা রিয়েল কোনো বায়োগ্রাফি না, এটা একটা কষ্টকল্পিত কাহিনি? ‘বেহুলার খনা’ কে লিখেছে সেটা আপনি মিস বিদ্যাধরী দাসের সঙ্গে ডিসকাস করে ভেরিফাই করতে পারেন। তবে বেহুলা যে কাল্পনিক চরিত্র এটা প্রমাণ করতে আমার আদালতে দশ মিনিটও লাগবে না। সেই কাল্পনিক চরিত্রের লেখা খনার বচনগুলো যে কাল্পনিক এবং সেক্ষত্রে আমাদের আবিষ্কার ডাজ নট প্যাক নভেলটি সেটাও প্রমাণ করা কঠিন হবে না। নাউ ইটস ইয়োর কল। আমি আপনার সময় আর নষ্ট করব না। আমি আপনার ফোনের অপেক্ষা করব। না হলে আমাদের আদালতে তো দেখা হচ্ছেই।’ এবার আহুজা মিস বসাকের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। হাত মিলিয়ে মিস বসাক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আহুজা ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে হেসে বলল, ‘আরেকটা কথা মিস বসাক, আপনি আমি দু’জনেই আমেরিকাতে পড়াশোনা করেছি। ওখানকার একটা কথা আমরা জানি যে হোয়াট হ্যাপেন্স ইন ভেগাস স্টেইস ইন ভেগাস।’
‘এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, মিস্টার আহুজা। এ আলোচনা আমাদের তিনজনের মধ্যেই সীমিত থাকবে। আমাদের তো ফিউচারে আরো অনেক কেসে মুখোমুখি হতে হবে, আমাদের নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস আমরা ভাঙি না।’ মিস বসাক দরজার দিকে এগোলেন।
কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে হোটেলের ঝাঁ চকচকে লবি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিস বসাক বিড়বিড় করে বললেন, ‘এই ট্রায়াল আমার জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট ট্রায়াল। এটা আমায় জিততেই হবে। আহুজা ক্লিয়ারলি ডিভাইড-অ্যাণ্ড-কংকার স্ট্র্যাটেজি বানাচ্ছে।’
‘ঠিক,’ নমিতা সহমত—‘কথায় আছে—জ্যান্তে দেয় না চালভাজার খোলা, মরলে দেবে রামায়ণের পালা। সুশ্রুতকে বাঁচতে দিচ্ছিল না, আর এখন সুশ্রুতের ডেড বডির জন্য আট কোটি টাকা খয়রাত করতে চাইছে। আমার লোকটাকে ভালো লাগেনি একদম। বিদ্যাদির নামে কত কিছু উল্টোপাল্টা—’
‘এই কেসটা বিদ্যাধরী দাসের না, আমার মেয়ের। আমার মেয়েকে যে সাপ দংশন করেছে আমি তার বিষদাত ভেঙে দেব। আই সোয়্যার,’ মিস বসাক বললেন। ‘মিস দাসকে এসব কথা বলা চলবে না।’ তারপর অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, ‘সুরিয়ালিস্ট। সুরিয়ালিস্ট শব্দটা আহুজা অনেকবার বলল। ও নিশ্চয়ই ডিঙিবৃষ্টি নিয়ে স্ট্র্যাটেজি বানাচ্ছে। আমি ভাবছি কীভাবে এই ডিঙিবৃষ্টিকে সামলানো যায়। কিন্তু মিস দাস আদালতে আহুজার প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে যাবেন। আহুজা কিন্তু সত্যি দুঃশাসন। এমন অ্যাগ্রেসিভ নৃশংস উকিল খুব কম দেখা যায়।’
