বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১৯
।। উনিশ।।
বেহুলা হতভম্ব!
কী বলছে এই বুড়ো মানুষটা!
কার জন্য সে অপেক্ষা করছে!
আপাতত এটুকু স্বস্তির যে এই রাতে মাথা গোঁজার অন্তত একটা জায়গা পেয়েছে। আঙিনার কোণে একটা পাতকুয়ো। বাবাকে প্রণাম করে, বিশ্বনাথ কুয়ো থেকে জল তুলে পা ধুতে ধুতে বলল, ‘এর নাম বেহুলা। এই মেয়েকে জোর করে ওর মরা স্বামীর চিতায় তুলছিল গ্রামের জমিদার। মেয়ে ওর গ্রাম থেকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে এসেছে। আমি না থাকলে হয়তো করিমগঞ্জের খেয়াঘাটে ধরা পড়ে যেত।’ তারপর বিশ্বনাথ তুলসীতলায় এসে তুলসীগাছের সামনে রাখা সাঁঝবাতির আগুনে আরেকটা মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে মুখস্থ পড়ার মতো বলল, ‘সুবর্ণদেউটি যথা তুলসীর মূলে। তারপর শুরু করল, ‘বহুরূপীর ভেক ওকে রক্ষা করেছে বাবা। মা কালী সাজিয়ে নিয়ে এসেছি সারাটা পথ। একে কিছুদিন আমাদের এখানে লুকিয়ে রাখতে হবে।’
পা ধুতে গিয়ে বেহুলার শরীর শীতে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। দু’পা এত দুর্বল লাগছিল যে ওর মনে হচ্ছিল পড়ে যাবে। ভেজা পায়ে আঙিনায় হেঁটে এসে বেহুলা দাওয়ার খুঁটি ধরে দাঁড়াল। সেদিকে চেয়ে বচনপিসি বলল, ‘তবে তো এ মেয়ের শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে। তুমি ঘরে চলো বাছা, বচনপিসি বেহুলার হাত ধরতেই চমকে উঠল। তারপর হাতের তালু বেহুলার কপালে ঠেকাল—‘এর তো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে রে!’
বেহুলার দৃষ্টি ঘোলাটে। বচনপিসির সহানুভূতি শরীরের সব প্রতিরোধ হালকা করে দিল। বেহুলা ধপ করে দাওয়ায় বসে পড়ল আর হু হু করে কাঁপতে লাগল। বচনপিসি নিজের পরিধানের চাদরটা খুলে বেহুলার আলোয়ানের ওপর ঢেকে বলল, ‘আমি তোমাকে ধরে বিছানায় নিয়ে যাচ্ছি। তুমি শুয়ে থাক। রাতের খাবার হলে আমি তোমাকে ডেকে দেব।’ বচনপিসি বেহুলাকে ধরে ধরে ঘরের ভিতর নিয়ে গেল।
ঘরের ভিতরে ঢুকে বেহুলা তাকিয়ে দেখল দরমা-কাদা লেপা একটা ঘর, দেওয়ালের উপরের দিকে আলো আসার জন্য বাখারির জাফরি। ঘরটা ছোট, ঘরের এক কোণায় দুটো তালপাতার মাদুর গুটিয়ে দাঁড় করানো, অন্য এক কোণে একটা লাল শালু মোড়া জলচৌকির ওপর মাটির পটে আঁকা রাধাকৃষ্ণের ছবি, তার সামনে মাটির সরায় রাখা বাতাসা আর একটা ছোট গেলাসে জল। পাশে একটা চরকা আর এক ধামা তুলো। ঘরের আর আরেক কোণায় ভাঁড়ার রাখার কয়েকটা মাটির হাঁড়ি, ওড়ং, কানাভাঙা সরা, খোরা, ছোবা, ঠিলি, আর একটা জলের বড় মাটির জালা। ঘরের কোণে চারটে বাঁশ আধাআধি করে চিরে দেওয়ালে গুঁজে দেওয়া, সেই আলনায় কয়েকটা কাপড়, পিরান, ধুতি ঝুলছে, দেওয়ালে কাঠি গুঁজে তাতে ঝুলছে একটা মাথাল। দেওয়ালের একপাশে কুলুঙ্গিতে প্রদীপ রাখা আর প্রদীপের পাশে দেওয়ালে কালো দাগ। এক নজরে তাকিয়েই বোঝা যায় এ সংসার মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ মানুষের নয়।
বচনপিসি মেঝেতে মাদুর পেতে তার ওপর কাঁথা পেতে দিয়ে বেহুলাকে বলল, ‘তুমি একটু তাপ নিয়ে তারপর শুয়ে পড়।’ বেহুলা কথা না বলে বিছানায় বসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে কুঁকড়ে কাঁপতে লাগল। বচনপিসি আঁচঘরের উনান থেকে একটা পাতিলে আগুন নিয়ে এল। বেহুলা ওর পা-হাত সেঁকতে সেঁকতে খুব আরাম পেল। ঘুমে চোখ বুজে এল। বেহুলা কাঁথা মুড়িসুড়ি দিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
গা হাত পায়ে খুব ব্যথা, কতক্ষণ একদম অচেতন হয়ে ঘুমিয়েছে বেহুলা জানে না। ঘুমটা ভাঙল কড়া ধুনোর গন্ধে। চোখের ভারি পাতার নীচ দিয়ে বেহুলা দেখল মশা তাড়াবার জন্য বচনপিসি পাতিলে নারকোলের ছোবড়ায় ধুনো জ্বালিয়ে এক হাতে সেই মাটির পাতিল ধরে অন্য হাতে তালপাতার পাখার হাওয়া করে করে ঘরের এমাথা ওমাথা করছে। ঘর ধুনোর ধোঁয়ায় সাদা। কিন্তু বেহুলার চোখে সারা পৃথিবীর ঘুম। আবার ঘুমিয়ে পড়ল বেহুলা।
পরের বার ঘুম ভাঙল মানুষের কথাবার্তায় আর গরম ভাতের গন্ধে। চোখ খুলে দেখল বচনপিসি খেতে দিয়েছে বিশ্বনাথ বহুরূপী আর ওর বৃদ্ধ বাবাকে। একটা গাছপিড়িতে বসে বচনপিসি হাঁড়ি থেকে কলাপাতায় ভাত তুলে তুলে দিচ্ছে। খেতে খেতে বিশ্বনাথ বহুরূপী কথা বলছে পিসির সঙ্গে।
‘লোকে যদি শুধায় এ আনখা ছুঁড়ি কে, কী বলব?’ বচনপিসি বলল।
‘বাবা, তোমার এক দাদা ছিল না রাঢ়ে? লোককে বলবে সেই দাদার বেধবা মেয়ে। দাদা মারা যাওয়ায় মেয়ে অনাথ হয়ে যাওয়ায় আমি গিয়ে ওকে নিয়ে এসেছি।’
‘মিছে কথা বলব?’
‘মেয়েটাকে বাঁচাবার জন্য মিছে কথা বললে তোমার নরকবাস হবে না,’ বিশ্বনাথ গরাস মুখে তুলতে তুলতে বলল।
‘তুই একটা হপ্তা থেকে যা না বাবা,’ পিসি বলল। ‘মেয়েটার ধুম জ্বর। তোর বাবাকে সামলাতেই আমি নিজে শেষ হয়ে গেছি। যদি বদ্যি-কবিরাজের কাছে যেতে হয়—তুই থাকলে সুবিধা হবে।’
‘নদীয়ার মেলায় গেলে ভালো রোজগার হয়। আমাদের সুদিন তো জমিদারের দাক্ষিণ্যে শেষ হয়ে গেছে পিসি, এখন আমার রোজগারই ভরসা। ঠিক আছে, আমি দুটো দিন থেকে যাই। আমি রোববার খেয়া ধরব।’
‘কিন্তু আমাদের এখানে এর খুবই কষ্ট হবে,’ পাখমারা গণক বলল। ‘জমিদারবাবুর আদেশে জানিসই তো আমার জ্যোতিষ-মন্দির বন্ধ। যজমানেরা সকলে সত্যাচার্য জ্যোতিষীর কাছে চলে গেছে। যজমানদের বিদায় আদায়ে আমাদের সংসারের গ্রাসাচ্ছাদন হয়ে যেত, কিন্তু এখন তা প্রায় বন্ধ। আঁচঘরে সঁদুরীকাঠ ডাঁই হয়ে আছে, হাতে কড়ির জোর নেই যে লোক ডেকে কুডুল দিয়ে কাঠ চেলা করে কাটিয়ে রাখব। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখ, আটন সরে সরে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। এবার ছাদ ছাইতেই হবে। তোর উপার্জন তো কখনো হয়, কখনো একদম হয় না। আমার সঞ্চয় দিন দিন তলানিতে এসে ঠেকেছে। আর ক’দিন পর এক কপদকও অবশিষ্ট থাকবে না। এখন আকাশবৃত্তির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছি। আমাদের নিজেদের এই দু’জনেরই অন্ন সংস্থান করতে পারি না। এ মেয়েকে যত্নে না রাখতে পারলে আমার অধর্ম হবে। কিন্তু আমি যে কী ভাবে একে খেতে পরতে দেব ভেবেই চিন্তা হচ্ছে।’
‘দেখো ভগবান ঠিক একটা গতি করে দেবেন। কৃষ্ণনগরে গিয়ে দেখি কী উপার্জন হয়। এখনই রোজগারের সময়। শীতকালের সব মেলা মচ্ছবে যা একটু রোজগারপাতি হয়। তারপর সেই আবার চড়ক, গাজন, ধর্মদেবতার পুজোয়। তারপর বর্ষা এলে তো আমাদের বহুরূপীদের একদম উপার্জন নেই, রং-টং সব বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়।’
বেহুলা এবার উঠে বসল, আর ক্ষীণকণ্ঠে বলল, ‘আমার জন্য তোমাদের চিন্তা করতে হবে না, পিসি। আজ রাতটা কেটে যাক, আমি কাল সকালেই চলে যাব।’
ছিঃ ছিঃ, তোমার এই শরীরের অবস্থায় আমরা তোমায় বের করে দেব?’ বচনপিসি বলল। ‘আমরা আলাল না, কিন্তু আমাদের পাতে যদি দু’মুঠো শালুক বিচির ঢেপের খই থাকে, তবে তার থেকে একমুঠো তোমায় দেব। বিশে, তুই একটা প্রাণ বাঁচিয়েছিস। ঈশ্বর তোর মঙ্গল করুক। আমরা আছি বাবা।’ তারপর বেহুলার দিকে তাকিয়ে পিসি বলল, ‘তোমায় একটু গরম ভাত দিই, বাছা?’
বেহুলার মুখে একদম স্বাদ নেই, খেতে ইচ্ছা করছিল না। ও আবার কাঁথা জড়িয়ে মুখ বের করে শুল। চোখ বন্ধ করে শুনতে পেল বচনপিসির গলা ‘বেহুলা আমাদের বাড়িতে ভাইঝির পরিচয়ে থাকবে।’
বেহুলা তাকিয়ে থাকতে পারছিল না, আবার কাঁথা মুড়ি দিয়ে চোখ বন্ধ করল। তারপর এক সময় ঘুমে অচেতন হয়ে গেল। রাতে বেহুলার শরীরে আবার কাঁপুনি দিতে লাগল। খুব শীত করছে। বেহুলা মা-মা বলে জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে ভুল বকতে লাগল। হঠাৎ বেহুলার মনে হলো তার শিয়রে কেউ বসে। এক প্রসন্নময়ী নারী ওর কপালে স্নেহের হাত রেখেছে। নিদ্রাবিষ্ট চোখ স্বল্প খুলে বেহুলা দেখল যে সেই হাত অতীব যত্নে তার কপালের জলপটি পালটে দিচ্ছে। বেহুলা পরম নিশ্চিন্তে আবার চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ পর বেহুলার তন্দ্রার ঘোর কাটল—বচনপিসি ওকে ধীরে ধীরে ধাক্কা দিয়ে জাগাচ্ছে ‘বেহুলা, বেহুলা, মুখটা একবার একটু খোলো বাবা। লক্ষ্মী মা, এই পাচনটা চেটে নাও। জ্বরটা তালে কমবে।’
বেহুলা ঘুমের মধ্যে হাঁ করল।
‘জিভটা বের কর একটু, বচনপিসি বলল।
ঘুমের মধ্যে বেহুলা অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে জিভটা বের করল। আর সঙ্গে সঙ্গে মহিলা বিস্ময়ে অভিভূত—‘দাদা, এ মেয়ের জিভের ভিতর দিকে এত বড় কাটা দাগ!’
বেহুলা তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে শুনল বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর—‘জিভকাটি! তাহলে কি এই সেই মেয়ে যার অপেক্ষায় না জানি আমি কতগুলো জন্ম পার করে এসেছি!’
