বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫৬
।। ছাপ্পান্ন।।
তিন দিন পর শুভদিন ছিল। আজ সকালে ‘পাকা দেখা’ অনুষ্ঠানের জন্য ডেভিড সাহেব পাখমারা গণকের বাড়ি এল। বচনপিসি তার দাদাকে বেহুলা ও সাহেবের বাগদানের কথা সেদিন জানাতে পাখমারা গণক বলেছিল এটা অনুষ্ঠান করে পালন করতে। তাই আজ অনুষ্ঠান। বচনপিসি কাল থেকে অনেক কিছু রান্না করে চলেছে—নারকোল কুরিয়ে নারকোলের সন্দেশ, দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে পিঠেপুলি, পায়েস, কাল জেলেকে বলে রেখেছিল আজ সকালে দিয়ে গেছে রুই মাছ। সাহেবের কাঁটা বেছে খেতে অসুবিধা হবে তাই মাছের মুইঠঠা, খেজুরের চাটনি, আর পায়েস।
ডেভিড সাহেব সদর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে সুঘ্রাণ পেয়ে একটা জোৱে শ্বাস নিয়ে বলল, ‘আজ তাহলে তোমাদের বাড়িতে উত্সব?’
বেহুলা আর বচনপিসি হেসে ফেলল। ‘কই গো তোমার চূড়োবাঁশী, আমরা সবাই উপবাসী। এসো সাহেব ভিতরে এসো,’ বচনপিসি আপ্যায়ন করল।
‘নো,’ সাহেব তর্জনী নাড়ালো। ‘নো সাহেব। বলতে হবে—বাছা। ইন্ডিয়ান মায়েরা যেভাবে তাদের ছেলেদের ডাকে।’
বচনপিসি আনন্দে গদগদ হয়ে বলল–‘এসো বাছা।’
ডেভিড সাহেব ভিতরে ঢুকল। ‘আমি আপনাদের জন্য কিছু উপহার আনিয়াছি।’ সাহেব তার ঝোলা ব্যাগ থেকে পাখমারা গণকের জন্য একটা ধুতি বের করে দিল। বচনপিসিকে দিল একটা গরদের শাড়ি। ‘পছন্দ হইয়াছে?’ সাহেব কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।
‘খুব পছন্দ বাছা,’ পাখমারা গণক বলল। ‘তোমাদের মঙ্গল হোক।’
‘আর বেহুলার জন্য কী এনেছ?’ বচনপিসি উৎসুক।
‘বেহুলার জন্য আমি শাড়ি আনি নাই। আমি চাই বেহুলা ওর পূর্বের স্বামীর উপহার ময়ূর আঁকা মলবুস খাস শাড়িটি আজ পরুক। আমাদের নতুন জীবনের জন্য ওর পূর্বের স্বামীর আশীর্বাদ সর্বদা ওর সঙ্গে থাকুক।’
বচনপিসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তবে এখন ওর দুঃখের দিন কেটে সুখের দিন আসতে চলেছে। ‘যা মা, তুই শাড়িটা পরে আয়। তোর ডেভিড সাহেব ঠিকই বলেছে। এতে তোর মৃত স্বামীর আশীর্বাদ আছে, তোকে বর্মের মতো ঘিরে রাখবে।’
বেহুলা ভিতরে গেল। ভিতর থেকে সে বাইরের ঘরে ডেভিড সাহেবের গলা শুনতে পাচ্ছে, ‘পিসি তোমাদের বাঙালিদের ধুতি আমি কিছুতেই পরিতে পারি না। প্লিজ হেল্প। আমাকে সাহায্য কর।’ বচনপিসির খিলখিল করে হাসির আওয়াজ আসছে। বোঝা যাচ্ছে বচনপিসি সাহেবকে ধুতি পরিয়ে দিচ্ছে। এ বাড়িতে অনেকদিন পর এত আনন্দ জেগে উঠেছে।
মলবুস খাস শাড়িটা বের করে প্রথমেই যার কথা মনে হলো বেহুলার সে তার স্বামী নয়, তার শ্বশুর ভুবন জ্যোতিষী। বেহুলা জানে না তাদের কী হয়েছে। বেহুলা শাড়ি কপালে ঠেকিয়ে শ্বশুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে বলল, ‘বাবা আশীর্বাদ করুন।’ তারপর মলবুস খাসের ময়ূর বেহুলার শরীরে পেখম মেলল।
বাইরের ঘরে বেরিয়ে এসে বেহুলা সাহেবকে দেখে অবাক সাহেবের পরনে পিরান আর ধুতি। অসম্ভব সুন্দর লাগছে। সাহেব বেহুলাকে দেখে একদম ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে ওর দিকে মন্ত্রমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বচনপিসি আর পাখমারা গণকও অবাক। ওরা জানতো না যে বেহুলা এত সুন্দরী!
ভগবানের সামনে বেহুলা দণ্ডবৎ হয়ে প্রণাম করল। বেহুলার দেখাদেখি ডেভিড সাহেবও ভগবানকে একই রকম ভাবে প্রণাম করল। তারপর বেহুলার সঙ্গে ডেভিড সাহেব পাখমারা গণককে আর বচনপিসিকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। ‘স্বামী সোহাগিনী হ। ডেভিড সাহেব তোর সিঁথিতে যে সিঁদুর পরাবে সেই সিঁদুর যেন অক্ষয় থাকে,’ বচনপিসি বেহুলার চিবুকে হাত দিয়ে আশীর্বাদ করল। সাহেবের মাথায় আশীর্বাদের হাত রাখল পাখমারা গণক।
এরপর খাওয়ার পালা। বেহুলা আর ডেভিড সাহেবের জন্য পাশাপাশি পিঁড়ি পাতা হয়েছে। পাখমারা গণকের জন্যও পাত পাড়া হয়েছে ওদের পাশে। বচনপিসি বারকোশ বের করে তাতে ভাত আর মাটির পাত্রে ডাল, শুক্তো, মাছ, চাটনি, দই, পায়েস, পিঠেপুলি সাজিয়ে দিল। ডেভিডের চক্ষু ক্রমশ গোলগোল হয়ে যাচ্ছে। ‘এত খাবার খেতে হবে?’
‘যতটা পার খাও,’ বচনপিসি দেওয়ালের কাছে দুটো মালসাতে ভাত, ডাল, মাছ, চাটনি, দই আলাদা করে সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলল।
‘ওই খাবারগুলো কার জন্য সাজিয়ে রাখছ? কে খাবে?’ ডেভিড সাহেব জিজ্ঞাসা করল।
‘বুধন,’ বচনপিসি বলল।
‘কে খাবে?’ সাহেব নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার জিজ্ঞাসা করল।
‘বুধন বেচারা কিছু—’
‘বুধন চোর?’ সাহেব বলল।
‘বুধন চোর না সাহেব,’ বচনপিসি বলল। ‘ও সৎ। ওকে অন্যায়ভাবে—’
‘তোমরা জানো বুধন চোর কোথায় লুকিয়ে?’
‘বুধন চোর না,’ এবার বেহুলা বলল। ‘মোগল আড়ংয়ের দারোগা চোর দারোগা গোপনে ইংরেজদের কাছে মলবুস খাস বিক্রি করে এখন তার দোষ বেচারা বুধনের ঘাড়ে চাপাচ্ছে। আর বুধন এই জিভকাটির মন্দিরে লুকিয়ে রয়েছে।’
‘এখনো?’
‘হ্যাঁ সাহেব,’ বচনপিসি বলল।
ডেভিড খাওয়ার পিঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়াল।
‘সাহেব তুমি খাওয়া ছেড়ে উঠলে কেন? তুমি কি বুধনকে ধরিয়ে দিতে চাও?’ বচনপিসি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘বেহুলা, ফাঁড়িদাররা খোঁজ পেয়েছে যে বুধন এই জঙ্গলেই লুকিয়ে। মোগল তাঁতঘরের দারোগা আমার কাছে গতকাল এসে বুধনের চেহারার বর্ণনা শুনিয়ে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে যে এরকম লোককে আমরা দেখেছি কিনা। দারোগা বলেছে আজ যে কোনো সময় জঙ্গলে ওর দলবল নিয়ে ঢুকবে। ওদের প্রথম নিশানা জিভকাটির মন্দির। ওরা মন্দিরের ভিতর ঢোকার রাস্তা ঠিক খুঁজে বের করবে। বুধনকে বাঁচানো অসম্ভব।’
‘সর্বনাশ!’ বেহুলা উঠে পড়ল। ‘আমি এক্ষুনি জিভকাটির মন্দিরে গিয়ে বুধনকে খবরটা দিচ্ছি।’
‘বুধনকে বাঁচাতে গেলে তুমি ধরা পড়ে যাবে বেহুলা। তোমাকে আমি দারোগার থেকে উদ্ধার করতে পারব না। তুমি প্লিজ যেও না।’
‘না, তা কিছুতেই হয় না। বুধনকে আমি কথা দিয়েছি আমি ওর পালাবার ব্যবস্থা করে দেব।’
‘কিন্তু ওকে না হয় মন্দির থেকে বের করে আনলে। তারপর? তারপর বুধন কোথায় যাবে তা কি ভেবেছ? দারোগা বিশাল পুলিশ ফৌজ নিয়ে গোটা জঙ্গল ঘিরে ধরবে।’
‘সাহেব ঠিক বলছে বেহুলা,’ পাখমারা গণক বলল। ‘আমরা কি তাহলে বুধনকে আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে রাখব?’
‘অসম্ভব!’ ডেভিড সাহেব বলল। ‘ওরা তোমাদের বাড়িও তল্লাশি করবে নিশ্চয়ই। ওদের সন্দেহ যে বেহুলা ডাকাতদের সাহায্য করে। সামনে একটাই পথ খোলা।’
‘কী পথ?’
‘একটা মাত্র জায়গা আছে যেখানে দারোগা পুলিশ তল্লাশি করবে না।’
‘কোথায়?’
‘ইংরেজ কুঠি, ডেভিড বলল। ‘আমি জিভকাটির মন্দিরে যাচ্ছি, আমি বুধনকে নিয়ে আসছি।’
‘না সাহেব, তুমি জানো না বুধন কোথায় আছে। আমি না গেলে তুমি ওকে কিছুতেই খুঁজে পাবে না। একমাত্র আমিই জানি বুধন কোথায় লুকিয়ে আছে।’
‘তাহলে শীঘ্র চল।’
বেহুলা ভিতরের ঘরে ছুটে গিয়ে মলবুস খাস শাড়ি খুলে ফেলে আবার বৈধব্যের পোশাক শরীরে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে এল। সাহেব ততক্ষণে আবার জামা-প্যান্ট পরে পায়ে জুতো গলাচ্ছে। বেহুলা ত্রিশূল হাতে নিয়ে বলল, চল সাহেব।’ বচনপিসিকে বেহুলা বলল, ‘আমার স্বামী-সুখে সত্যি কত বাধা পিসি!’
বচনপিসি বলল, ‘দুর্গা দুর্গা।’
সাহেব এবার দ্রুতপায়ে কাপাসডাঙার মাঠে জঙ্গলের দিকে চলতে লাগল। সাহেবের গতির সঙ্গে তাল রাখতে বেহুলাকে মাঝে মাঝে ছুটতে হচ্ছে। জঙ্গলে পৌঁছে সাহেব বলল ‘এবার কোন দিকে?’
হাঁফাতে হাঁফাতে বেহুলা ত্রিশূল ঠুকতে ঠুকতে জিভকাটির জঙ্গলে ঢুকে ঢিপিতে চড়তে লাগল। ডেভিড কয়েকবার হুমড়ি খেয়ে নিজেকে সামলে বেহুলাকে অনুসরণ করতে লাগল। ঢিপির সঁড়িপথে ডালপালা সরিয়ে বেহুলা একটা অন্ধকার স্থানে এসে ‘বুধনদা বুধনদা’ বলে চিৎকার করতে লাগল। বেহুলার আওয়াজ কন্দরের অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হল। কন্দরের অন্ধকার থেকে বাইরে বেরিয়ে এল বুধন। সঙ্গে ডেভিডকে দেখে বুধন হকচকিয়ে গেল—কী হয়েছে বেহুলা? কোনো বিপদ?’
‘খুব বিপদ বুধনদা। মোগল তাঁতঘরের দারোগা খবর পেয়ে গেছে তুমি এখানে। তুমি এরপর আর এখান থেকে পালাতে পারবে না। শিগগির চল।’
‘কোথায়?’ বুধনের চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি।
‘সাহেব তোমাকে কোম্পানির কুঠিতে লুকিয়ে রাখবে। তুমি শিগগির চল।’
‘আমার সঙ্গে কোম্পানির পানসি আছে। আমার আজ ফিরে যাওয়ার কথা। নদীর ঘাটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌকা বাঁধা আছে। তোমাকে সেই নৌকায় আমি এখান থেকে বের করে নিয়ে যাব। ওরা টের পাওয়ার আগেই তোমায় আমি ডিঙাডুবি থেকে বের করে দূরে পাঠিয়ে দেব।’
‘দূরে কোথায়?’
‘ফরাসডাঙা, চুঁচুড়া, বরানগর—কোথাও, যেখানে তুমি সুরক্ষিত থাকবে।’
বুধন সাহেবের দিকে এগিয়ে এসে সাহেবের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘সাহেব, তুমি আমাদের ঠকাবে না তো? তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি?’
‘ঈশ্বরের দিব্যি,’ ডেভিড কপাল-বুক-দু’কাঁধে ক্রশ আঁকল। ‘তাড়াতাড়ি চল, আমাদের হাতে এতটুকু সময় নেই।’
বেহুলা বলল, ‘বুধনদা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করে চলে এস। আমাদের হাতে আর একদম সময় নেই।’
‘ঠিক আছে, চল তাহলে।’
তিনজনে জিভকাটির জঙ্গল থেকে বেরোতেই দেখল একদল সশস্ত্র লোক ওদের ঘিরে ফেলেছে।
পাইক! ভয়ে বেহুলার মুখ শুকিয়ে গেল। কিন্তু ডেভিড সাহেব এবার বেহুলা আর বুধনকে আড়াল করে পিস্তল উঁচিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। ডেভিড কড়া গলায় বলল, ‘তোমরা কে? আমাদের যেতে দাও। নতুবা ফল ভালো হবে না কিন্তু।’
পাইকদের ভিতর থেকে একজন দশাসই চেহারার মানুষ এগিয়ে এসে বলল, ‘বুধন, তুই আমাদের সঙ্গে চলে আয়।’
বুধন এবার এগিয়ে এসে বলল, ‘চন্দ্রদাদা!’
‘কোথায় যাচ্ছিস এই ফিরিঙ্গির সঙ্গে?’
‘দারোগা আমাকে ধরতে আসছে। তোমরাও পালাও। আমি সাহেবের সঙ্গে যাচ্ছি। সাহেব আমাকে লুকিয়ে রাখবে।’
‘বুধন, এই ফিরিঙ্গিদের আমি বিশ্বাস করি না। এই লোকটা তোকে ধরিয়ে দেবে দারোগার কাছে!’
‘না, আমার সঙ্গে থাকলে বরং বুধন নিরাপদ,’ ডেভিড সাহেব বলল। আর কিছুক্ষণ পর দারোগার পাইক এই জঙ্গল চষে ফেলবে। ওরা বুধনকে কেন তোমাদেরও ছেড়ে দেবে না।’
‘সে খবর আমাদের কাছে আছে,’ চন্দ্র সর্দার বলল। ‘আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই এই জঙ্গল ছেড়ে পালাচ্ছি। চলে আয় বুধন আমাদের সঙ্গে।’
‘কোথায়?’ বুধন বলল।
‘যেখানে আমরা লুকিয়ে থাকব, সেখানেই আমাদের সঙ্গে তুই থাকবি।’
‘তোমরা বেশিদিন এভাবে লুকিয়ে থাকিতে পারিবে না,’ ডেভিড বলল। ‘ইংরেজ অনেক শক্তিশালী। ওদের কাছে অনেক অস্ত্র-বন্দুক আছে। আমি বুধনকে ফরাসিদের জাহাজে তুলে পন্ডিচেরি পাঠিয়ে দেব। ওখানে কেউ ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’
‘আমি তোমাদের ফিরিঙ্গিদের কথায় একদম বিশ্বাস করি না। তোমরা বজ্র সর্দারকে মেরেছো,’ চন্দ্র সর্দার বলল। ‘বুধন, ও তোকে দারোগার কাছে ধরিয়ে দেবে।’
এবার বুধন ধীর গলায় বলল, ‘আমি সাহেবকে চিনি না। কিন্তু আমি বেহুলাকে বিশ্বাস করি, দাদা। জানি না এ যা বলছে তা আমার ভাগ্যে লেখা আছে কিনা। তবে আমি জানি এই সাহেব কথা রাখবার চেষ্টা করবে। তুমি চলে যাও দাদা। আমি তোমাদের ডাকাতি, মানুষ হত্যা, লুঠের জগতে শান্তি পাব না। আমি এই সাহেবের সঙ্গে যাচ্ছি। তুমি যদি আমার মঙ্গল চাও তবে আমাকে যেতে দাও।’
চন্দ্র সর্দার এবার বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুই পাগলামি করছিস বুধন!’
‘আমাদের হাতে একদম সময় নেই,’ ডেভিড বলল।
‘আমাকে যেতে দাও দাদা,’ বুধন মিনতি করল।
‘ঠিক আছে।’ তারপর আদেশের কণ্ঠে তার দলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সবাই সরে যাও। এদের যেতে দাও।’ তারপর ডেভিডের দিকে তাকিয়ে চন্দ্র সর্দার বলল, ‘আমার ভাইয়ের যদি কোনো ক্ষতি হয় সাহেব, আমি তোমার গলা কেটে ফেলব!’
অন্য ডাকাতরা সরে দাঁড়াল। বুধন, ডেভিড এবং বেহুলা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে কাপাসডাঙার মাঠে ছুটতে লাগল।
ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে তিনজনে ফিরিঙ্গি কুঠিতে গিয়ে পৌঁছাল। ‘এদিকে, কুঠিতে ঢুকে ডেভিড নির্দেশ দিল। লক্ষ্য গুদাম ঘর। ডেভিড সাহেব গুদামের তালা খুলে ভিতরে ঢুকল। গুদামে সারি সারি কাঠের বাক্স-পেটরা। ডেভিড একটা বাক্স খুলে ফেলল। বেহুলা দেখল ওখানে ইংরেজ ফৌজের পোশাক পাটপাট করে রাখা।
‘তোমার মাপ মতো একটা তাড়াতাড়ি পরে নাও,’ সাহেব বুধনকে বলল।
সাহেবের নির্দেশ মতো বুধন কয়েকটা ইউনিফর্ম বের করে মাপ মতো একটা পরে ফেলল। মাথায় লাল পাগড়ি, পায়ে জুতো বেঁধে বুধনকে একদম কোম্পানির পাইক লাগছিল।
‘এবার কী হবে?’ বেহুলা বলল।
‘তোমাদের বাড়ির উসবের খাওয়া আমার কপালে নেই বেহুলা,’ সাহেব মলিন হেসে বলল। ‘তুমি এখানে থাকলে ওদের সন্দেহ হবে। তুমি এক্ষুনি বাড়ি যাও। আমি এক্ষুনি কোম্পানির বোটে বুধনকে নিয়ে কলকাতা চলে যাব। আমি সঙ্গে থাকলে ওকে এ পোশাকে পুলিশ সন্দেহ করবে না। বুধনকে আজই আমি ফরাসডাঙায় পৌঁছে রাতেই কলকাতা থেকে রওনা দেব। ফিরতে ফিরতে কাল সকাল হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা কোরো না। তুমি বুধনকে বাঁচাবার প্রতিজ্ঞা করিয়াছ। তোমার প্রতিজ্ঞা আমি রাখবই রাখব। আরেকটা কথা –’ সাহেব এক মুহূর্ত থামল। ‘যদি আমার খারাপ কিছু হয়ে যায়, আর আমি ফিরে না আসিতে পারি, তবে স্মরণে রেখো তোমাকে আমি মনে মনে আমার স্ত্রী বলে গ্রহণ করিয়াছি।’
বেহুলা ডেভিডের কাছে এগিয়ে গিয়ে ডেভিডকে জড়িয়ে ধরল। তারপর নীচুস্বরে বলল, ‘আমার কোষ্ঠীতে আছে দু’বার বিবাহ, আর দুই স্বামীরই স্বগৃহে মৃত্যু। যদি জ্যোতিষশাস্ত্র সত্য হয়, তবে প্রবাসে তোমার মৃত্যু নেই। তুমি সাগর পার হয়ে তোমার স্বদেশের মাটিতেই মৃত্যু বরণ করবে। তুমি ভয় পেওনা। আমার গণনায় বিশ্বাস রাখ, এদেশে যমদেবতা তোমার ছায়া মাড়াবেন না।’
দেরি হয়ে যাচ্ছে। বেহুলা বাড়ি ফিরে এল। সমস্ত খাবার কলাপাতা মুড়ে একটা কলসিতে ঢুকিয়ে ভরা কলসি কুয়োতে নামিয়ে দিল বেহুলা। দারোগা নিশ্চয়ই এখানেও আসবে। ভোজের খাবার দেখলে দারোগা অনেক প্রশ্ন করবে।
