বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫৮
।। আটান্ন।।
জমিদারের রক্তাক্ত শরীর দেখে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রবিন সাহেবকে বলল, ‘সাহেব, এ তো অনর্থ হয়ে গেল! এখন আমরা কী করব?’
‘ভালো করে দেখ লোকটা বেঁচে আছে কিনা?’ রবিন সাহেব একজন লেঠেলকে হুকুম দিল।
পাইক নীচে খাতে নেমে রক্তে লাল জলের ভিতর থেকে জমিদারের শরীরটা তুলে দেখাল। জমিদারকে কুপিয়ে দিয়েছে জটা পাগলা। লেঠেল আর্তনাদ করে উঠল—‘সাহেব, জমিদারবাবু মারা গেছে!’
‘তোরা নীচে যা,’ রবিন সাহেব অন্য লেঠেলদের হুকুম দিল। ‘জমিদারের দেহটা তুলে নিয়ে আয়। পাগলটার দেহও তুলে আন।’
‘সাহেব, আমরা মেয়েটাকে ধরে আনতে জঙ্গলে লোক পাঠাই?’ সত্যঠাকুর বলল।
আমার এখানে থাকাটা একদম নিরাপদ নয়, রবিন মনে মনে ভাবল। ফোর্ট উইলিয়ামে অফিসাররা এসব জানতে পারলে আমাকে এক্ষুনি ডিপোর্ট করে লন্ডনে ফেরত পাঠিয়ে ওখানে বিচার করবে। এক্ষুনি ফোর্ট উইলিয়ামে ফেরত যেতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো, রবিন ভাবল। কিন্তু ডেভিড অনেক কিছু জেনে ফেলেছে আমার সম্বন্ধে। ওর বেঁচে থাকাটা আমার পক্ষে বিপজ্জনক। ওকে খুন করিয়ে ওর ডেডবডি সঙ্গে নিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামে ফিরতে হবে। কিন্তু রাত না হলে এসব কাজ করা সম্ভব না। রাতে ডেভিডের মৃতদেহ নিয়ে তবেই কলকাতার জন্য রওনা দিতে হবে। ‘ডেভিডকে গুমঘরে মেরে ফেলে চন্দ্র ডাকাতের ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দিতে হবে,’ রবিন সাহেব দারোগাকে আদেশের স্বরে বলল।
‘সাহেব, আমাকে মাফ করবেন,’ দারোগা এবার হাত জোড় করে বলল। ‘আমি সাহেব হত্যা করতে পারব না। সাহেব হত্যা মারাত্মক অপরাধ।’
এবার সত্যাচার্য বলল, ‘এর দায়িত্ব আমাদের ওপর ছেড়ে দিন সাহেব। আমাদের কাউকে হত্যাকারী হতে হবে না। চন্দ্র ডাকাতই একে হত্যা করবে।’
‘চন্দ্ৰ ডাকাত কিছুতেই আমাদের বিশ্বাস করে আমাদের গুমঘরে আসবে না,’ দেওয়ান বলল।
‘বেশ তাহলে আমার জ্যোতিষ-মন্দিরেই ডেভিড বিশ্বাসঘাতকের বলি দেওয়া হোক। আমি চন্দ্ৰ ডাকাতকে খবর পাঠিয়ে ওখানে ডেকে আনব। আজ রাতে ডেভিডের মৃতদেহ আমি সাহেবের নৌকায় এনে দেব,’ সত্যাচার্য বলল।
‘মৃতদেহগুলোকে এক্ষুনি নৌকায় তোল,’ দুর্লভচাঁদ ওর লেঠেলদের বলল। তারপর পাইকদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডেভিড সাহেবকে গুমঘর থেকে তুলে বস্তায় মুড়ে সাঁঝের বেলা সত্যঠাকুরের আশ্রমে নিয়ে যাবি। কেউ যেন টেরটি না পায় ভিতরে কে আছে।’
খুব সত্বর কাজ হল। কিছুক্ষণের মধ্যে নদীর ধারে জমিদার গোপীচরণ মল্লিকের আর জটার মৃতদেহ নিয়ে রবিন সাহেব আর দুর্লভচাঁদ বজরায় ফিরে গেল। শুধু খাতের জলে রক্তের লালিমা ছড়িয়ে গেল। তা দেখে জমিদারের নৌকার আবদুল মাঝি ফিসফিস করে মিজান মাঝিকে বলল, ‘মিজানচাচা, পীর বসির আলি বলেছিল বিদ্যেধরীর খাতে যেদিন রক্ত ছড়িয়ে যাবে সেদিনই এই গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে কি আজই কয়ামৎ আসবে?’
‘কী ফিসফিস করছিস?’ রবিন ওদের ভাষা না বুঝে মাঝিকে দাবড়ানি দিল। ‘তাড়াতাড়ি নৌকা নিয়ে ফিরিঙ্গি কুঠির ঘাটে চল।’ মিজান মাঝি জানে কয়াম তার সামনে দাঁড়িয়ে। এর রাগ খুব তাড়াতাড়ি মাথায় চড়ে যায়। মিজান মাঝি চুপচাপ মালিকের হুকুম তামিল করল।
***
জিভকাটির ঢিপির ভিতর ঢুকে বেহুলা অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসে রইল। শরীরে ভয় জাঁকিয়ে বসেছে। বাইরে নিশ্চয়ই জমিদারের লেঠেলরা ওকে জঙ্গলে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই মন্দিরের প্রবেশ পথের সন্ধান তারা ক’জন ছাড়া বাইরের কেউই জানে না। ডেভিড সাহেব বুধনকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিল, কিন্তু বেহুলাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের চরম ক্ষতিটা করে ফেলল সাহেব! বচনপিসি আর গণককাকার কী হল কে জানে? বেহুলার মন কেঁদে উঠল। জটাকাকাও ওকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিল। লোকটা ওর থেকে আমানি পান্তা খেতে চেয়েছিল। বুকের ভিতর হাহাকার করে উঠল বেহুলার।
মন্দিরের ভিতরে অন্ধকার। বেহুলা ভাবতে লাগল কীভাবে এখান থেকে পালাবে? পাইকদের পাহারা এড়িয়ে এখন পালানো অসম্ভব। বরং অপেক্ষা করা যাক। বুধন ধৈর্য নিয়ে কত দিন এখানে শুধু সুযোগের অপেক্ষা করেছিল, তার ফল পেয়েছে। বেহুলাকে শুধু অপেক্ষা করতে হবে। আর সুযোগ খুঁজতে হবে।
সন্ধ্যা হল। এবার গুহামুখে এসে দাঁড়ালো বেহুলা। মনে দুশ্চিন্তা। বচনপিসির কী হল? দারোগার পাইক ওর সামনে বচনপিসিকে বাঁশ দিয়ে মাথায় মেরে সংজ্ঞাহীন করে দিয়েছিল। তারপর কি জ্ঞান এল? বৃদ্ধ গণককাকা কি বচনপিসিকে রক্ষা করতে পারবে? এই পরিবার বেহুলাকে বিপদের সময় বুকে আগলে রক্ষা করেছে। যতবার কেউ বেহুলাকে আঘাত করার চেষ্টা করেছে বচনপিসি তেড়ে গেছে তার দিকে। যেভাবে বাঘিনী তার বাচ্চাকে রক্ষা করে, বচনপিসি দাঁত-নখ দিয়ে আক্রমণ করেছিল ওই বংশী লেঠেলকে। বেহুলা ঠিক করল সে এই গুহার মধ্যে বসে থাকবে না। কমপক্ষে সে বচনপিসি আর গণককাকাকে ও এই জিভকাটির মন্দিরের গুহায় নিয়ে আসবে।
বাইরে আঁধার একটু ঘন হতেই বেহুলা মন্দিরের গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। কাপাসডাঙার মাঠ জনশূন্য। বেহুলা ছুট লাগাল পাখমারা গণকের বাড়ির দিকে। দূরে ফিরিঙ্গি কুঠিতে আলো জ্বলছে। রবিন সাহেব কি এখনও ওখানে? ডেভিডকে কি ওরা ওখানে বন্দী করে রেখেছে? নাকি মেরে ফেলেছে? ওদিকে যাওয়া মানে মূর্খামি। বাইরে এখন থাকাটাও ঝুঁকিবহুল। বেহুলা দ্রুতপদে বাড়ির দিকে চলতে লাগল।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু পাখমারা গণকের বাড়িতে আজ তুলসীতলায় সাঁঝবাতি জ্বলেনি, শঙ্খধ্বনি হয়নি। বচনপিসি দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিতে পিঠ ঠেকিয়ে অবসন্নের মতো বসে আছে। মনে বিষাদ, শরীরে যন্ত্রণা। মাথায় অনেক রক্তক্ষরণে শরীর খুব দুর্বল। পাখমারা গণক বোনের সেবায় কবিরাজি চিকিৎসা করে মাথায় পট্টি বেঁধে দিয়েছে, কিন্তু এখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। পাখমারা গণক কম্পিত হাতে চকমকি ঘষে প্রদীপ জ্বালাবার চেষ্টা করছে এমন সময় সদরের দরমার আগড় ঠেলে বেহুলা বাড়ির উঠোনে ঢুকল।
‘বেহুলা!’ বচনপিসির দু’চোখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সারা শরীরে যেন শক্তি সঞ্চারিত হল। বচনপিসি উঠে দাঁড়াল। ‘তুই বেঁচে আছিস! হে ভগবান! তোমার অশেষ করুণা।’
বেহুলা ছুটে এসে বচনপিসিকে জড়িয়ে ধরল। ‘তুই কোথায় ছিলি?’ বচনপিসির কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ। বেহুলা এক নিশ্বাসে বলে চলল জটা কীভাবে আত্মবিসর্জন দিয়ে তাকে বাঁচিয়েছে। ‘আমাকে ধরতে রবিন সাহেব আবার পাইক পাঠাবে। এই মুহূর্তে তোমরা আমার সঙ্গে চল,’ বেহুলা বলল।
‘কোথায়?’
‘জিভকাটির মন্দিরে,’ বেহুলা বলল। ‘ওখানেই বুধন লুকিয়ে ছিল। আমরা কয়েকটা দিন ওখানে লুকিয়ে থাকতে পারব, এরা টেরটিও পাবে না। এখানে ওরা আমাকে না পাওয়ার রাগে তোমাদের মেরে ফেলবে। কিছু খাবার দাবার, পাঠকাঠির মশাল আর পিদিমের তেল সঙ্গে নিয়ে নাও। পিদিম জ্বালিও না এখন। আলো দেখলে ওরা সন্দেহ করবে।
ঘরে আমানি পাস্তা ছিল। অন্ধকারে বচনপিসি ক্ষিপ্রহস্তে পাস্তাভাত একটা গামছায় বেঁধে নিল। রাতের খাবার। সেটা দেখে বেহুলার জটা পাগলার কথা মনে পড়ল। বেহুলার শরীর আড়ষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই আড়ষ্টতা ঝেড়ে ফেলতে চাইল বেহুলা। শরীরে শক্তি চাই, কতটা লড়তে হবে কে জানে। কিন্তু বেহুলার মনে হচ্ছে অন্ধকারে হঠাৎ যেন মেদিনী দুলে উঠল। বেহুলা ভাবল ওর শারীরিক অবসাদের জন্য মাথা ঘুরছে। কিন্তু থালাগুলো ছিটকে ঘরে কোণে গিয়ে ধাক্কা মারল, জলের ঘটি উলটে গেল—বচনপিসি বেহুলাকে জাপটে ধরে বলল, ‘ভূমিকম্প। শিগগির উঠোনে চল।’
ভূমিকম্প থামল বটে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর শুরু হলো প্রচণ্ড ঝড়। ঝড়ের তাণ্ডব ক্রমশ বাড়তে লাগল, তার সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। সারা পৃথিবী কাঁপিয়ে বাজ পড়তে লাগল, তার চোখ-ঝলসানি আলোতে ভয়ে বচনপিসি বেহুলাকে জড়িয়ে দুর্গানাম জপ করতে করতে আবার কুঁড়েতে গিয়ে ঢুকল। ঝড়ের বেগ ক্রমশ বেড়েই চলল, গোটা বাড়ি যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। পাখমারা গণকের বাড়ির একটা খুঁটিও কাঠের না, সবকটা খুঁটিই বাঁশের, চাটাই এর বেড়াগুলোও তিন-চার বছর পুরোনো হয়ে জীর্ণ, তার জায়গায় জায়গায় বেতের বাঁধন খুলে গেছে। অর্থাভাবে মেরামত হয়নি। কুঁড়ের দেওয়াল দুলে দুলে উঠতে লাগল।
বাইরে এবার মড়মড় করে বিশাল শব্দ হল। বেহুলা বুঝল বকুল গাছটা উপড়ে মাটিতে পড়ল। বাইরে কড়-কড়াৎ শব্দে একটা বাজ পড়ল, কান ফাটিয়ে দেওয়ার মতো আওয়াজ। আর হঠাৎ মড়-মড় শব্দে বাড়ির চাল বাঁশের খুঁটি থেকে আলগা হতে হতে প্রবল ঝড়ে আকাশে উড়ে গেল। ভয়ে বচনপিসি শ বাজাতে আরম্ভ করল। পাখমারা গণক অবিরাম শিবঠাকুরের মন্ত্র পড়ে চলল। ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ে ঘর জলে জলাকার। ভিজে চুবুচুবু হয়ে বেহুলা বলল ‘আর এখানে থাকা নিরাপদ না। শিগগির আমার সঙ্গে চল জিভকাটির মন্দিরের আশ্রয়ে, এই চালহীন ভিটে আর নিরাপদ নয়। এখানে থাকলে এবার আমরা ভিটে চাপা পড়ব।
পাখমারা গণক আর বচনপিসিকে নিয়ে বেহুলা উঠোনে নেমে এসে দেখল বাইরে ওদের বাড়ির একদিকের বেড়া হাওয়ায় উড়ে গেছে। কড়কড় করে বাজ পড়ল, তার আলোয় দেখা গেল জ্যোতিষ-মন্দিরের ওপর বকুল গাছটা ভেঙে পড়ে জ্যোতিষ-মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে। নিজেদের ভিটেটার অর্ধেক উড়ে গেছে। হাওয়ার বেগ আরো বাড়ছে। আকাশে ঘনঘন বিদ্যুতের শাসানি, অবিরাম বৃষ্টির ছাঁট। ওরা জিভকাটির জঙ্গলের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু একটু এগিয়ে ওরা দেখল গ্রাম থেকে কিছু মানুষ শাঁখ বাজাতে বাজাতে ওদের বাড়ির দিকে ছুটে আসছে।
মানুষগুলো কাছে এল। এরা সকলেই ডিঙাডুবির বাসিন্দা। গ্রামবাসীদের দলের একজন শক্ত সমর্থ লোক হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, ‘বেহুলা মা, মহাপ্রলয় এসেছে। পীরের সেই কয়াম। তুমি বলেছিলে আমাদের চরম বিপদের সময় তোমার কাছে আসতে। আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করে বাড়ি ঘর ছেড়ে এখানে ছুটে এসেছি। আমাদের বাঁচাও।’
‘আমি তোমাদের বাঁচাব। সকলে জিভকাটির ঢিপিতে চল। ওর ভিতরে যে খনার মন্দির আছে আমাদের সেখানে পৌঁছাতে হবে।’
গ্রামবাসীরা প্রাণের দায়ে পড়িমরি করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল জিভকাটির মন্দিরের দিকে। কেউ কখনো এত ভয়ঙ্কর ঝড় চোখে দেখেনি। সঙ্গে প্রবল বৃষ্টির ঝাপটা। দেখতে দেখতে যখন ঝড়ে তাদের ভিটের চালা, মাটি লেপা ছিটে বেড়ার দেওয়াল উড়ে যেতে শুরু করল, খড়ো-ঘরের মাথাল মড়মড় করে ভাঙতে শুরু করল তখন এরা বুঝল যে গ্রামের মহাপ্রলয়ের শেষদিন এসে গেছে, এখন তাদের প্রাণ সংশয়, বেহুলা বলেছিল বিপদে ওদের বাঁচাবে 1 বেহুলার ওপর অসীম বিশ্বাসে আজ প্রাণরক্ষার জন্য গ্রামের আতজন বেহুলার শরণাপন্ন হয়েছে।
গ্রামবাসীরা প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল জিভকাটির মন্দিরের দিকে। এবার নদীর দিক থেকে উড়ে আসতে লাগল ডিঙি, নৌকা, গোলপাতা ঘরের চালা, হাল, ভাঙা তাঁতঘরের মাকু, বাঁশ—সকলে ভয়ে চিৎকার করতে লাগল। কিন্তু হাওয়ার দাপট সেই চিৎকারকে ছাপিয়ে গর্জন করতে লাগল।
ডিঙাডুবিতে যেন দক্ষযজ্ঞ চলছে। গোটা গ্রাম যেন রণক্ষেত্র। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে একটা ক্রুদ্ধ দানব যেন আকাশে ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে আর পথে যা পাচ্ছে তা আকাশে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে যেদিকে খুশি আছড়ে ফেলছে।
ঝড়ের প্রকোপ প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেল। এমন সর্বনাশা করাল ঘাতক ঝড় বেহুলা জীবনে কখনো দেখেনি। বিদ্যাধরীর জল হঠাৎ ফুলে ফেঁপে কূলপ্লাবী ক্ষুধার্ত এক বিশাল দৈত্যের করালবদন বিস্তার করে পাড়ে বারবার এসে আছড়ে পড়তে লাগল। নদীর ঘাটে বাঁধা ছিপ, ডিঙি, ভেলা, সালতিগুলোর কাছি ছিঁড়ে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে গ্রামে, মাঠে আছড়ে ফেলতে লাগল। ঠিক যেন আকাশ থেকে ডিঙির বর্ষণ হচ্ছে। এই ডিঙির বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য মানুষ এলোপাথাড়ি ছুটতে লাগল। কারোর বাচ্চা হারিয়ে গেল, কেউ নিজে ছুটতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে প্রাণভয়ে ছুটন্ত মানুষের পদদলিত হয়ে গেল। মানুষের আর্তনাদ, ঝড়ের ক্রুদ্ধ তর্জনগর্জন, উড়ে এসে আছড়ে পড়ে ভেঙে পড়া ডিঙির আওয়াজ আর তার সঙ্গে ভীষণ ত্রাসের সঞ্চার করে কূলপ্লাবী বিদ্যাধরী আজ ভয়ঙ্কর রুদ্ররূপে ডিঙাডুবি গ্রামের ওপর দিয়ে খরস্রোতে বইতে লাগল।
গ্রামের যত ছেলে, বুড়ো, মেয়ে সকলে চেঁচাতে চেঁচাতে জিভকাটির মন্দিরের দিকে প্রাণপণে ছুটছে। কেউ কেউ পারল অতদূর পৌঁছাতে, আর যারা পারল না তারা বিদ্যাধরীর খরস্রোতে ভেসে গেল। বেহুলা ছুটে গিয়ে বচনপিসি আর গণককাকাকে জিভকাটির মন্দিরে ঢোকার ফাটল দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। দু’জনে ভিজে কাঁপছে। হুড়োহুড়ি করে গ্রামবাসীরা মন্দিরের ভিতর ঢুকতে লাগল। বেহুলা দেখল একজন বুড়িকে কাঁধে তুলে তার জোয়ান ছেলে ভিজে চুবুচুবু হয়ে ভিতরে ঢুকল। বুড়ি এই বিপদের মধ্যেও বকবক করে যাচ্ছে ‘ভগবানেরও বলিহারি ভাই, আর গাঁ পেলিনা নিজের দাপট দেখাবার জন্য? তবে ভগবান যেন আমার দামুর মতো ছেলে ঘরে ঘরে দেয়।’
বেহুলা গলাটা চিনল। কুঁজো শান্তিপিসি। তাকে নিজের কাঁধে তুলে এতটা পথ ছুটে এসে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে বাঁচালো তার ছেলে দামু।
