বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬১
।। একষট্টি।।
কুঁজো শাস্তিপিসি বলেছিল, ভাগীরথীর পশ্চিমকূল, বারাণসী সমতুল। বারাণসী থেকে যে বরাহমিহিরের অনুগত ব্রাহ্মণ গ্রহবিপ্র বাংলায় খনাকে মুছে দিতে এসেছিল সে আর বারাণসী ফিরে যেতে পারল না, আর ডিঙাডুবির দেহাতি মানুষগুলি বারাণসী সম ভাগীরথীর পশ্চিমকূলের বিভিন্ন জায়গায় বাসা বাঁধতে রওনা দিল।
নদীর পাড়ে কয়েকটা নৌকা সারিয়ে ফেলা হয়েছে। চন্দ্র সর্দার বলল, ‘আর দেরি করা উচিত হবে না। আমরা আজই সন্ধ্যাবেলা দক্ষিণে রওনা দেব।’
সূর্য অস্ত যাওয়ার মুখে তিনটে নৌকা জলে ভাসার জন্য তৈরি। একটা যাবে উত্তরে, দুটো যাবে দক্ষিণে। বচনপিসি আর পাখমারা গণককে নিয়ে বিশ্বনাথ উত্তরে যাবে। ওদের সঙ্গে কিছু গ্রামবাসী যাবে। বেহুলা, ডেভিড সাহেব, ৰুধন, চন্দ্র ডাকাতের দলের সঙ্গে যাবে দক্ষিণে। বেহুলা বুঝতে পারছে যে বচনপিসির বুকের ভিতর কষ্ট মোচড় দিচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই। বেহুলা, বুধন, ডেভিড সাহেব, চন্দ্র সর্দার এরা সকলে আইনের চোখে অপরাধী। আর এদের সঙ্গে না থাকাটাই বচনপিসিদের জন্য মঙ্গল।
নৌকায় ওঠার আগে ভিজে চোখে বেহুলা প্রণাম করল পাখমারা গণককে। পাখমারা গণক বেহুলার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল—
‘বিত্তেশ্বরীমবিধবাং গুরুশুক্রসৌম্যাঃ
কন্যাং প্রসূততনয়াং কুরুতে শশাঙ্কঃ।’
এর অর্থ বেহুলা জানে। দ্বিতীয়স্থ বৃহস্পতি, শুক্র এবং বুধ জাতাঙ্গনাকে ধনবতী, সধবা এবং দ্বিতীয়স্থ চন্দ্র জাতাঙ্গনাকে কন্যা প্রসবিনী করে থাকে। বেহুলার দ্বিতীয়ায় বুধ এবং চন্দ্র অবস্থিত। বেহুলা জানে তার বৈধব্যদশা শেষ হয়ে গেছে। পাখমারা গণক বেহুলাকে বলল, ‘আশীর্বাদ করি তোর মেয়ে খনার মত বিদুষী হোক। নাম রাখিস বিদ্যাধরী। আমরা চলে যাব, কিন্তু ভবিষ্যতে এই নদীই থেকে যাবে এই ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে।’
ডেভিড সাহেব এবার পাখমারা গণককে আর বচনপিসিকে বেহুলার মতো পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। বচনপিসি ডেভিড সাহেবকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বেহুলাকে তোমাদের দেশে নিয়ে যেও বাবা। ও হল গোবরে ধুতুরা ফুল, হাটে নে’ গেলে তিন কড়া মূল।’ বচনপিসি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। সাহেব বলল, ‘পিসি কেঁদ না।’ বচনপিসি মাথা নাড়লো, ‘মেয়েকে শ্বশুরঘরে এবার বিদায় দিচ্ছি। কাঁদব না?’
বেহুলা এবার প্রণাম করল বচনপিসিকে। বচনপিসি বেহুলাকে জড়িয়ে ধরল। চোখের জল চেপে বলল, ‘আমাদের আর কখনো দেখা হবে না রে?’
বেহুলা এর উত্তর জানে। মিথ্যা আশ্বাস না দিয়ে চুপ করে রইল। বচনপিসি বুঝল। চোখ মুছে বলল, ‘এ জন্মে না হলে, পরের জন্মে?’
পাখমারা গণক বলল, ‘নিশ্চয়ই হবে। এত গভীর ভালোবাসা তোর।’
‘আমি পরজন্মে ওকে কোথায় খুঁজে বেড়াব দাদা?’
‘তোকে খুঁজতে হবে না বচন। প্রকৃতিই তোদের কাছাকাছি নিয়ে আসবে।’
‘ওকে চিনব কীভাবে?’
‘তা তো জানি না। হয়তো এজন্মে আমরা ওকে যে চিহ্ন দেখে চিনলাম সেভাবেই।’
বচনপিসি বেহুলার কপালে চুমু খেল। আদর করে বলল, ‘তুই তখন চিনতে পারবি তো মেয়ে? তোর এই বচনপিসিকে?’
‘পারবো। তোমার বচন মুখে রেখো পিসি, আমার দরকারে আমি তোমার কাছেই ছুটে যাব।’
রাতের আঁধারে দক্ষিণের নৌকা ভাসল বিদ্যাধরীতে। মাঠের জল দ্রুত খালে, নদীতে নামছে, জলে খুব টান। দক্ষিণে খরস্রোতে ছুটে চলেছে মাথাল, পানা, পানসির ভাঙা গলুই, নৌকা-বজরার খণ্ড, মৃৎপাত্র, মরা কুকুর, ছাগল। আট ছেঁড়ে নৌকায় পাটনীরা দাঁড় বেয়ে এদের মধ্য দিয়ে পথ করে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণে।
গত দু’দিনের অবসাদ শরীরে। বেহুলা পানসির পাটাতনে মাজুরির ওপর ঘুমিয়ে ছিল, একটু দূরে ডেভিড সাহেব, বুধন। অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল বেহুলা। হঠাৎ বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসে শীত শীত করতে লাগল ওর। বেহুলা উঠে বসল। চাদর জড়িয়ে ছইয়ের বাইরে এল। আকাশে রাতের অন্ধকার কাটছে। আধো অন্ধকারে জায়গাটা চেনা চেনা লাগছে। মাঝিরা সারা রাত দাঁড় বেয়ে ক্লান্ত। কোথায় এলাম আমরা?’ বেহুলা একজন মাঝিকে জিজ্ঞাসা করল।
‘করিমগঞ্জ অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছি,’ পাটনী বলল। ‘আর কিছুক্ষণ পরেই ধুলসা গ্রাম।’
‘ধুলসা!’ বেহুলা ছইয়ে ফিরে এল। ডেভিড সাহেবকে অল্প ধাক্কা দিয়ে জাগাল।
‘কোনো বিপদ হয়েছে?’ ডেভিড সাহেব ঘাবড়ে গিয়ে এমন ধড়মড় করে জেগে উঠল যে বাকি সকলের ঘুম ভেঙে গেল।
‘ধুলসা গ্রাম সামনে,’ বেহুলা বলল। ‘আমি একবার আমার শ্বশুরের সঙ্গে দেখা করতে চাই। নদীর পাড়েই ভিটে। যাব আর আসব।’
সকলে উঠে বসল। ধীরে ধীরে সামনে আবছায়াতে দেখা গেল নদীর পাড়ে পাশাপাশি মন্দির। সতী মন্দির, বেহুলা গুণল। কুড়ি। তার মানে এর মধ্যে আর কোনো সতীদাহ হয়নি।
ধুলসার ঘাটে মাঝিরা নৌকা বাঁধল। চন্দ্র ডাকাত বল্লম হাতে নিজে চলল বেহুলার সঙ্গে। পাশে ডেভিড সাহেব।
লখার তাঁতঘর মাটিতে মিশে গেছে। সম্ভবত জমিদারের ক্রোধের ফল। ভুবন জ্যোতিষীর কুঁড়ে এখনও টিকে আছে। বেহুলা খুব সন্তর্পণে দরজায় ধাক্কা মারল। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ ভিতর থেকে সাড়া দিয়ে বেরিয়ে এল—ভুবন জ্যোতিষী।
‘বাবা,’ বেহুলার গলার ভিতর শব্দ দলা পাকিয়ে গেল। বেহুলা ভুবন জ্যোতিষীর পা জড়িয়ে ধরল ‘আমায় ক্ষমা করবেন বাবা। আমি আমার স্বামীকে ফেলে পালিয়েছিলাম। আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম বাবা।’
ভুবন জ্যোতিষীর মুখ থেকে গোঙানি বেরিয়ে এল। বলল, ‘লখার তাঁতঘর জমিদার জ্বালিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি এটা তোর জন্য আগে থেকে বাঁচিয়ে রেখেছি মা। তুই দাঁড়া।’ ভুবন জ্যোতিষী হাতড়ে হাতড়ে কুঁড়ের ভিতরে ঢুকল। বেরিয়ে এল হাতে একটা লাল শালুতে মোড়ানো কিছু। ‘তোর খনা আমি তোর জন্য বাঁচিয়ে রেখেছি। মন বলছিল তুই একদিন আসবি।’
‘মা কোথায়?’
‘সে দেহ রেখেছে। ঈশ্বর বোধহয় তোর হাতে এই খনাকে সমর্পণ করার জন্য আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এখন আমি মুক্ত!’
‘বাবা, আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন,’ বেহুলা বলল।
‘না রে মা, আমি আমার এই ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে পারব না।’
এবার ডেভিড বলল, ‘গ্রামের লোক জেগে ওঠার আগে আমাদের চলে যেতে হবে বেহুলা।’
বেহুলা মাথা নাড়লো। চোখের জল মুছে শ্বশুরের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, ‘সেদিন চলে যাবার সময় আমার শিক্ষাগুরুকে প্রণাম করে যেতে পারিনি বাবা।’
‘আশীর্বাদ করি মা, খনার মতো বড় জ্যোতিষী হ।’ ভুবন জ্যোতিষী বেহুলার
মাথায় কম্পমান হাত রাখল।
‘এটা আপনি রাখুন বাবা,’ বেহুলা শান্তিপিসির বটুয়াটা ভুবন জ্যোতিষীর হাতে দিল। তারপর ডেভিড, চন্দ্র সর্দারের সঙ্গে বেহুলা বাইরে বেরিয়ে এল।
ঘাটের দিকে যেতে যেতে বেহুলা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। নদীর পারে অনেকটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে হাওয়ায় দুলছে গাছগুলো। গাছগুলো ঋজু এবং খাড়া, ডালপালা নেই প্রায়, গাছগুলো সম্পূর্ণ লাল, পাতার বোঁটা, ভিতরের রেখাগুলো সব লাল। গাছে ফুল ফুটে রয়েছে। ফুলের ডাঁটা লম্বা, পাপড়ির বাইরের দিকটাও লাল।
বেহুলার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল ডেভিড। বেহুলার চোখে অবাক দৃষ্টি। বেহুলা ধীরে বলল, ‘ফুটী কাপাস। মলবুস খাসের আঁতুড়ঘর!’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল বেহুলা। মলবুস খাসের শেষ তাঁতি এই জমিতেই সাপের কামড়ে মরেছে। আর তার সৃষ্টি মলবুস খাসের ময়ূর শাড়ি বাঁশের চোঙে বন্দী হয়ে বিদ্যাধরীর বানের জলে কোথায় ভেসে গেছে কে জানে!
ফুটী কাপাসের গাছের সারি হাওয়ায় দুলছে। বেহুলাকে ডেকে যেন বলছে তোমায় চিনেছি গো আমরা মেয়ে, তোমায় চিনেছি। মন খারাপ কোরো না। আমরা আবার জন্ম দেব মলবুস খাস বস্ত্রের।
লখা চলে গেছে কিন্তু লখার হাতে বোনা বীজ প্রকৃতিতে অঙ্কুরিত হয়ে কাপাস বৃক্ষ জন্ম নিয়েছে। এভাবেই প্রকৃতিতে জীবন এগিয়ে চলে। এক প্রজন্ম হারিয়ে যায় আর তাদের কর্ম বেঁচে থাকে অন্য প্রজন্মে।
