বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১৬
।। ষোলো।।
ফেরার পথে গাড়িতে নমিতার পাশে বসে সারাটা রাস্তা মিস বসাক একদম চুপ। মহিলার চোখে সানগ্লাসেস থাকায় বোঝা যাচ্ছে না মহিলার ফেসিয়াল রিঅ্যাকশন। মহিলা বাইরের ছুটন্ত শহরের দিকে তাকিয়ে। পিছনে বসে বিদ্যাদিও কোনো কথা বলছে না। নমিতার মনে হচ্ছিল আরুষির মনে কতদিনের দুঃখ বারুদ হয়ে জমে আছে। একটু স্ফুলিঙ্গেই কত বড় বিস্ফোরণ!
বৌবাজার এসে গেছে। এবার বিদ্যাদি নামবে। বিদ্যাদির প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনটা নমিতাকে দেবে বিদ্যাদি। তারপর নমিতা মিস বসাককে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে নামিয়ে দেবে। নমিতা আর মিস বসাকও গাড়ি থেকে নামল।
‘আরুষি ঠিকই বলেছে,’ মিস বসাক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘আমি নিজের প্রফেশনাল জব রেসপন্সিবিলিটির লক্ষণরেখা ক্রশ করে গেছিলাম। ভুলে গেছিলাম আমি এখানে ওর উকিল, ওর মা নয়।’
‘আপনাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম। ব্যাপারটা খুব ফ্র্যাজাইল। একটু মিস- হ্যান্ডেল হলে কাচের মতো ভেঙে যাবে। সামনের স্টেপগুলো খুব সাবধানে ফেলবেন,’ বিদ্যাদি এতক্ষণে কথা বলল।
‘ঠিক,’ মিস বসাক বললেন। ‘মিস দাস, আমি বুঝতে পারছি এদিকটা সামলানো মোটেই সহজ হবে না। কিন্তু তার থেকেও অনেক বড় অবস্ট্যাকল হল ‘বেহুলার খনা’ বইটার কনটেন্ট। পুঁথিটা যে বিশ্বাসযোগ্য না, সেই চিন্তাটা আমার গলায় সব সময় কাঁটার মত বিধছে।’
‘কোন জায়গাটা বিশ্বাসযোগ্য লাগছে না বলুন?’ বিদ্যাদি সিঁড়িতে উঠতে উঠতে থেমে গেল।
‘ওই যে বেহুলা লিখেছে যে ডিঙিবাদল গ্রামে ডিঙি বৃষ্টি হয়েছিল। আমি উকিল মানুষ, সব সময় এভিডেন্স খুঁজি। ডিঙিবাদল নামে তো কোনো গ্রামই পাচ্ছি না। নদীয়ায় প্রাচীন কালে একটা ডিঙিপোঁতা পেয়েছি, কিন্তু নো ডিঙিবাদল। আদালত কিন্তু এভিডেন্স চাইবেই। গ্রামটার নাম মুছে গেল?’
‘হয়তো গ্রামের নামটাই বদলে গেছে,’ বিদ্যাদি অন্ধকার ইস্কুলঘরে ঢুকে আলোর সুইচ টিপল।
‘গ্রামের নাম আবার বদলে যায় নাকি?’ অ্যাডভোকেট বসাক বললেন। ‘অবশ্যই যায়,’ বিদ্যাদি ওর অফিসে ঢুকল। ‘ভুবন ডাকাতের নামের কুখ্যাত ভুবনডাঙা হয়ে গেল শান্তিনিকেতন, ম্যাড্রাস হয়ে গেল চেন্নাই, পিকিং বেজিং এতো হরদম হয়ে চলেছে।’
‘আমাদের কলকাতার কথাই ধরুন না,’ নমিতা মোড়ায় বসল। ‘হারিংটন স্ট্রিট হয়ে গেল হো-চি-মিন সরণী, হ্যারিসন রোড হয়ে গেল মহাত্মা গান্ধী রোড। লেখা-টেখা না থাকলে লোকে তো পুরোনো নাম ভুলেই যাবে তাই না? এরকমই কিছু হয়েছিল এই গ্রামটার সঙ্গেও।’
বিদ্যাদি অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘কিন্তু কেউ জানে না কোথায় সেই গ্রাম আর কোথায় সেই জিভকাটির মন্দির। তবে লোককথা বলে যে এই গ্রামের আগেকার নাম ছিল ডিঙাডুবি। গ্রামে পাশ দিয়ে বইত বিদ্যাধরী নদী।’
ডিঙাডুবি নামটার তবু একটা অর্থ আছে, অ্যাডভোকেট বসাক চেয়ারে বসতে বসতে বললেন। কিন্তু ডিঙিবাদল নামটা অর্থহীন!’
‘এই নাও,’ বিদ্যাদি তাক থেকে নামিয়ে নমিতার হাতে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলারশিপের ডিসার্টেশনের ফাইলটা দিল।
বেশ পুরোনো ফাইল, সরকারি অফিসের মতো দড়ি বাঁধা ফাইল। নমিতা ফাইলটা খুলল। সাবমিশনের তারিখ বত্রিশ বছর আগেকার। ডিসার্টেশন সাবমিশন অ্যাকনলেজমেন্টের নীচে অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের সই। মিস বসাক ঝুঁকে তারিখ দেখল আর সঙ্গে সঙ্গে চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘বত্রিশ বছর আগেকার তারিখ। ফ্যান্টাসটিক!’ মিস বসাক উচ্ছ্বসিত। ‘এটা খুব কাজে দেবে,’ নমিতা বলল। ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছি আমরা, জয় আমাদের হবেই।’
‘আমিও তো অন্যায়ের বিরুদ্ধেই লড়ছিলাম সেদিন,’ বিদ্যাদির চোখে শূন্য দৃষ্টি।
‘ঠিক। কিন্তু তুমি হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট ড. বক্সীর গালে চড় মেরে সকলের সহানুভূতি হারিয়ে ফেলেছিলে—’
‘ওয়েট, ওয়েট,’ অ্যাডভোকেট বসাক নমিতাকে থামিয়ে দিলেন। তারপর বিদ্যাদির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির বাংলা ডিপার্টমেন্ট হেডের গালে চড় মেরেছিলেন?’ মিস বসাক হতভম্ব।
বিদ্যাদি মাথা নাড়লো।
‘বাপরে! কেন? উনি কি আপনার সঙ্গে মিসবিহেভ করেছিলেন?’ বিদ্যাদি ক্লান্ত গলায় বলল, ‘ছাড়ুন ওসব।’
মিস বসাক এবার নমিতার দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকালেন।
‘আমি ইউনিভার্সিটির ভার্সনটা বলছি,’ নমিতা বলল। ‘বিদ্যাদি নাকি পৃথুযশ ভৌমিকের সাবমিট করা পিএইচডি থিসিসের প্রসপেক্টাসের ফাইলটা লাইব্রেরির জার্নাল রুম থেকে চুরি করে আনতে গিয়ে ড. বক্সীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়। ড. বক্সী এজন্য খুব তিরস্কার করে আর ইমিডিয়েট ফাইলটা ফেরত চায়। বিদ্যাদি ফাইলটা দিতে অস্বীকার করে। তখন ড. বক্সী বিদ্যাদির থেকে ফাইলটা কেড়ে নেন আর বিদ্যাদি রেগে গিয়ে ড. বক্সীর গালে ঠাস করে এক চড় মারে। লাইব্রেরিয়ান আর পৃথুযশ এই ঘটনার সাক্ষী ছিল।’
বিদ্যাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল ‘দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না।’
‘কিন্তু কেন ওরা এরকম করল, মিস দাস?’ মিস বসাক হতভম্ব।
‘স্বার্থ। আমি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন সাবমিট করেছিলাম। খনা যে কাল্পনিক চরিত্র নয় সে সম্বন্ধে আশি পাতার থিসিস। ড. বক্সীকে বললাম আমার পিএইচডি থিসিসের প্রসপেক্টাস হিসেবে আমি এই ডকুমেন্টসই সাবমিট করব। উনি রাজি হলেন। তখন পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু জটিলতা শুরু হল তার কিছুদিন পর যখন হার্ভার্ড থেকে সংস্কৃত ও প্রাচীন বাংলা ভাষার পণ্ডিত প্রফেসর ড. হেনরি গ্যালাগার বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে এলেন ডিস্টিংগুইশড ভিজিটিং প্রফেসর হয়ে।’
‘আমার মনে আছে। খুব নার্সিসিস্ট ছিল প্রফেসর গ্যালাগার,’ নমিতা মন্তব্য করল। ‘এত নাক উঁচু যে আমাদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনত না।
‘ড. বক্সী ওঁর অফিসে আমার আর পৃথু্যুশের সঙ্গে ড. গ্যালাগারের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। তখন জানলাম যে ড. গ্যালাগার আসলে বরাহমিহির ও খনার ওপর একটা বই লিখেছেন, উনি এর শেষ অংশটা লিখবেন বলে কলকাতায় এসেছেন। উনি চন্দ্রকেতুগড় থেকে কয়েকটা ইনফরমেশন সংগ্রহ করবেন।’
‘ড. গ্যালাগারের বইটা বুকার প্রাইজের জন্য নমিনেটেড হয়েছিল,’ নমিতা বলল।
‘ড. গ্যালাগার আমাদের বললেন যে ওঁর বইয়ের সেন্ট্রাল থিয়োরি এই যে অ্যাকচুয়ালি বরাহমিহির ও খনার কখনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। ইন ফ্যাক্ট, বরাহমিহির কখনোই বঙ্গে আসেননি। আমাদের চন্দ্রকেতুগড়ের খনা-মিহিরের ঢিপিটার সঙ্গে যে বরাহমিহির একদমই জড়িত নন সেই থিওরি প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে কয়েকবার ওঁকে চন্দ্রকেতুগড় যেতে হবে, উনি আমাদের সাহায্য চান। এদিকে আমার থিসিসের থিয়োরিটা ড. গ্যালাগারের থিয়োরির সম্পূর্ণ উলটো। যাই হোক, ড. বক্সীর সঙ্গে ড. গ্যালাগারের খুবই ভালো আলাপ পরিচয় জমে গেল। দু’জনে মিলে চন্দ্রকেতুগড়ে অনেকবার যাওয়া আসা করলেন। তারপর হঠাৎ একদিন ড. বক্সী আমায় বললেন এই খনার টপিকে পিএইচডি না করতে। আমার থিসিসে আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে বরাহমিহির বাংলায় এসেছিলেন। ড. বক্সী বললেন ওটা নাকি ঠিক না। আমি রাজি হলাম না। ড. বক্সী আমাকে অনেক বোঝালেন, কিন্তু আমিও নাছোড়। তখন উনি বললেন, ‘হার্ভার্ডের প্রফেসর ড. হেনরি গ্যালাগার একজন সুপণ্ডিত মানুষ। উনি ঠিক এর বিপরীত মত পোষণ করেন। আমি ভালোভাবে ভেবে দেখলাম তোমার লজিক দিয়ে তুমি পিএইচডি ডিফেন্ড করতে পারবে না।’ আমি বরাবরই জেদি টাইপের মেয়ে। আমি বললাম আমি ওই বিষয়েই রিসার্চ করব।’
‘কেন তুমি এত বড় ঝুঁকি নিলে বিদ্যাদি? তোমার ডক্টরেট ডিগ্রী –?’
‘আরে ডক্টরেট ডিগ্রী প্রতি বছর কত্ত ছাত্র-ছাত্রী পায়, আমার খালি মনে হচ্ছিল শুধু ডক্টরেট ডিগ্রীর সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য একটা সহজ পথ নিয়ে নেব? তাহলে কঠিন গবেষণাটা কারা করবে? খনার ওপর তখনও পর্যন্ত বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে একটাও পিএইচডি থিসিস ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল যে খনা ডিসার্ভস আ রিসার্চ। আর সেটা আমি করব। তাই আমি আমার টপিক চেঞ্জ করতে রাজি হলাম না।’
‘তারপর?’
‘এর কিছুদিন পর থেকেই ড. বক্সী আমাকে অবহেলা করতে লাগলেন। পিএইচডি গাইড অবহেলা করলে ছাত্রীর মনের অবস্থা কেমন হয় তা বুঝতেই পারছ নমিতা। দেখা করতে চাইলে সময় দিতেন না। কোনো রকমে যেন আমাকে তাড়াতে পারলে বাঁচেন। অথচ স্যার কিন্তু পৃথু্যুশের সঙ্গে হেসে হেসে একটু যেন বেশি সদয় হয় কথাবার্তা বলতেন। এদিকে ড. গ্যালাগারও আমাকে খুব একটা পাত্তা দিতেন না। কিন্তু পৃথু্যুশের সঙ্গে ওঁর বেশ জমে গেল। ড. গ্যালাগারের সঙ্গে এবার পৃথুযশও চন্দ্রকেতুগড় যাওয়া আসা শুরু করল।’
‘সেটা আমার মনে আছে,’ নমিতা বলল।
‘আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না আমার দোষটা কোথায়। তারপর হঠাৎ একদিন ড. বক্সী আমায় ডেকে বললেন তুমি ড. গ্যালাগারের সঙ্গে কাল চন্দ্রকেতুগড় যেতে পারবে কিনা। আমি তো খুব খুশিই হলাম। একটু নার্ভাসও ফিল করলাম।’
‘কেন?’ মিস বসাক বললেন।
‘ড. গ্যালাগার সব সময় মেয়েদের সম্বন্ধে একটু শ্লেষ মিশিয়ে কথা বলতেন। এমন কি আমাদের দেশের বঙ্কিমচন্দ্র কোথায় কমলাকান্ত হয়ে মেয়েদের বুদ্ধির সঙ্গে নারকোলের আধখানা মালার সঙ্গে তুলনা করেছেন এসবও তাঁর উদাহরণে চলে আসত। সকালে যখন রওনা দিলাম তখন গাড়িতে উনি বেশ হাসিখুশি ছিলেন। পকেট থেকে একটা এক ডলারের নোট বের করে আমাকে দিয়ে বললেন এটা তোমাকে দিলাম। গিফট। আমি জীবনে প্রথম ডলার দেখলাম। আমি বললাম, না না, এ তো অনেক টাকা। এ আমি নিতে পারবো না, স্যার। উনি তখন বুক পকেট থেকে পেন বের করে ডলারের এক পিঠে সই করে হেসে বললেন এটার দাম এখন এক ডলার, কিন্তু আমি নোবেল প্রাইজ-টাইজ পেয়ে গেলে এর দাম কিন্তু তখন অনেক হয়ে যাবে। এই বলে উনি রসিকতা করে হাসতে লাগলেন। আমি ডলারের এ-পিঠ ও-পিঠ উল্টেপাল্টে ভালোভাবে দেখলাম। কিন্তু তখন বুঝিনি ওঁর সঙ্গে চন্দ্রকেতুগড়ে যাওয়াটাই আমার জীবনে এক অভিশাপ হয়ে নেমে আসবে।’
‘কী হয়েছিল চন্দ্রকেতুগড়ে?’ মিস বসাক বললেন।
‘চন্দ্রকেতুগড় পৌঁছে আমরা দেখলাম ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের আর্কিওলজিকাল ডিপার্টেমেন্ট ওখানে একটা সাইনবোর্ড পুঁতছে যাতে লেখা ‘এই স্থান খনা- মিহিরের ঢিপি বা বরাহমিহিরের ঢিপি নামেও পরিচিত।’ ব্যাস, নোটিশ বোর্ডটা দেখেই ড. গ্যালাগারের মাথায় রাগ চড়ে গেল। তার কারণ এই নোটিশ বোর্ড ওঁর থিওরির সম্পূর্ণ বিপরীত কথা লিখেছে, আর এতে ওঁর থিসিস একটা বড় রকমের ধাক্কা খাবে।’
‘স্বাভাবিক,’ মিস বসাক বললেন।
‘ড. গ্যালাগার রেগে গিয়ে বললেন খনা-মিহিরের গুজবটাকে কীভাবে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের আর্কিওলজিকাল ডিপার্টমেন্ট অফিসিয়ালি ‘খনা-মিহিরের ঢিপি’ নামে স্বীকৃতি দিচ্ছে? আমি বললাম এটা গুজব না এটা বাংলার মানুষের বহুকালের বিশ্বাস।’
‘উনি বললেন কোনো বিশ্বাসকে প্রমাণ ছাড়া কোনো সভ্য দেশের গভর্নমেন্ট অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দিতে পারে না।’ বিদ্যাদি নমিতার দিকে তাকাল। আমি তখন হঠাৎই বললাম যে এই এক ডলারের নোটে আপনাদের সভ্য দেশের গভর্নমেন্টও আপনার দেশের মানুষের বিশ্বাসকে প্রমাণ ছাড়াই তো অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দিয়েছে।
‘কী করেছে ওরা এক ডলারের নোটে?’ নমিতা কৌতূহলী।
‘তোমার স্মার্ট-ফোনে গুগল করে একটা ডলারের ছবি বের করো, নিজেই দেখতে পাবে,’ বিদ্যাদির ঠোঁটে হাসির রেখা।
নমিতা আই ফোনে গুগল করে একটা ডলারের ছবি বের করল। ‘কী আছে এখানে?’
‘ওপিঠের ছবিটা দেখ,’ বিদ্যাদি বলল।
নমিতা ডলারের অন্য পিঠের ইমেজে বুড়ো আঙুলের চাপ দিল। নমিতা দেখল–
বিদ্যাদি বলল, ‘আমি প্রফেসর গ্যালাগারকে বললাম—আপনাদের দেশ যে ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’ ডলারে লিখেছে, আপনাদের সভ্য দেশের গভর্নমেন্টের কাছে কি ঈশ্বর আছেন এর প্রমাণ আছে?’ উনি চুপ। আমি বললাম আপনাদের গভর্নমেন্ট প্রমাণ ছাড়াই কি গডকে অফিসিয়ালি অ্যাকনলেজ করছে না ড. গ্যালাগার?’
‘এটা শুনে উনি কী বললেন?’ নমিতা বলল।
‘উনি থতমত খেয়ে গেলেন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে হাতের কাছে কোনো জুতসই উত্তর পেলেন না। আমি তখন বললাম, আপনাদের গভর্নমেন্টের মতো আমাদের গভর্নমেন্টও দেশের মানুষের বিশ্বাসকে অফিসিয়ালি অ্যাকনলেজ করেছে। আমাদের বাংলার মানুষ বিশ্বাস করে এটা খনা-মিহিরের ঢিপি বা বরাহমিহিরের ঢিপি। এখানে সভ্য দেশ বা অসভ্য দেশ কথাটা অবান্তর।’
‘ওঁর তখন মুখের কী অবস্থা সেটা ভাবতে পারছি না।’ নমিতার দৃষ্টিতে বিস্ময়। ‘তবে আমেরিকায় এই ডলারে এটা নিশ্চয়ই অনেক কাল আগে লেখা হয়েছে, এখন হলে সম্ভব হতো না।’
‘ঠিক উল্টোটা হয়েছে আমেরিকায়,’ মিস বসাক বললেন।
‘উল্টো?’ নমিতা বুঝতে পারল না।
‘আমেরিকার একটা ঈশ্বর-অবিশ্বাসী গ্রুপ সুপ্রীম কোর্টে অ্যাপিল করেছিল যে এই কথাটা ওদের এক ডলারের নোট থেকে উঠিয়ে নেওয়া হোক। কিন্তু আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট এবছর জুন মাসে একটা ঐতিহাসিক রায় দিয়ে সেই অ্যাপিল খারিজ করে দিয়েছে। গড় ডলারে রয়ে গেছে। তাছাড়া আমাদের দেশের বিচারালয়ের দেওয়ালে যেমন ‘সত্যমেব জয়তে’ লেখা থাকে সেরকম আমেরিকার অনেক কোর্টে বিচারকের আসনের পিছনে এটা লেখা থাকে …
মিস বসাক এবার ওঁর আই ফোনে সার্চ করে দেখালেন—‘এটা দেখুন—’
IN GOD WE TRUST
‘ভগবান আছে তার কোনো প্রমাণ আমেরিকানদের কাছে নেই কিন্তু আমেরিকান গভর্নমেন্ট প্রমাণ ছাড়াই অফিসিয়ালি তাদের অনেক বিচারালয়ে এই কথা বড় বড় করে লিখে রাখে,’ মিস বসাক বললেন।
নমিতা চমৎকৃত। কত কিছু সে জানে না। ওর চোখে ভাসছে ড. গ্যালাগারের চাপা অহংকারী মুখ। ‘বিদ্যাদি, তোমার কথা শুনে ড. গ্যালাগার কী বললেন?’
‘উনি ভাঙবেন তবু মচকাবেন না,’ বিদ্যাদি বলল। ওঁর দেশকে পরোক্ষভাবে অসভ্য বলাটা উনি হজম করতে পারলেন না। এবার সভ্য অসভ্য দেশ নিয়ে তর্ক করতে লাগলেন। চন্দ্রকেতুগড় থেকে ফেরার সময় গাড়িতে আমাকে বকবক করে বোঝাতে চাইলেন যে তাদের দেশ সভ্য। তাদের দেশের মেয়েরা কত ফ্রি, আমাদের ভারতবর্ষের মেয়েদের মতো নিপীড়িত নয়। সুতরাং সভ্য অসভ্যের তুলনা করাই উচিত না। আমি বললাম আপনার কথা মানি আমি, কিন্তু মেয়েরা বোধহয় সারা পৃথিবীতেই কমবেশি নিপীড়িত। উনি তর্ক জুড়ে বললেন আমাদের আমেরিকায় নয়। আমি বললাম আমি তো জানতাম ১৯২০
পর্যন্ত আপনাদের দেশেও মেয়েদের ভোটিং রাইট ছিল না। উনি বললেন সেসব অনেক পুরোনো কথা। আমি হাসলাম। উনি রেগে গিয়ে বললেন হাসছ কেন? আমি বললাম আপনার স্ত্রী এখন নিজে একলা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন? শুনেছি আপনাদের দেশে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত অনেক ব্যাঙ্কে মেয়েদের একলা
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা অ্যালাউড ছিল না। আমাদের দেশে এরকম কোনো সমস্যা ছিল না। ব্যাস। তারপর সারাটা পথ ড. গ্যালাগার গুম হয়ে বসে রইলেন। ফেরার সময় গাড়িতে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। উনি অনেকক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আজ সন্ধ্যায় আমার অফিসে আসতে পারবে? আমি রাজি হলাম। ওঁর অফিসে উনি আমার সঙ্গে খুব ভদ্র ব্যবহার করলেন। ওঁকে তখন অনেক শান্ত লাগছিল। আমি ভাবলাম উনি বুঝি ওঁর ব্যবহারের জন্য অনুতপ্ত। আমাকে বসতে বললেন। উনি বললেন—বিদ্যাধরী, তুমি সত্যি বিশ্বাস কর যে বরাহমিহির বাংলায় এসেছিলেন?’
আমি বললাম, ‘অবশ্যই।’
উনি বললেন—‘কিন্তু উনি কেন উজ্জয়িনীর বিক্রমাদিত্যের রাজসভার খ্যাতি
ছেড়ে গ্রাম বাংলায় আসতে যাবেন? আমি রিসার্চ করে দেখেছি যে সে সময় পথঘাট দুর্গম ছিল, তোমাদের ভারতবর্ষে তখন এক রাজ্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের লড়াই লেগেই থাকত। তখনকার দিনে উজ্জয়িনীর রাজার সঙ্গে বাংলার রাজার সদ্ভাব ছিল কিনা তাও জানি না। যদি শত্রু দেশ হয় তাহলে বরাহমিহির কীভাবে সাহস করবেন উজ্জয়িনী ছেড়ে বাংলায় আসার?’
আমি বুঝলাম এটা ওঁর থিয়োরি। আমি বললাম, ‘যদিও বলা হয় বরাহমিহির বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্ন ছিলেন, কিন্তু তিনি একবারও বিক্রমাদিত্যের নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রশস্তি গাননি। বরং বরাহমিহির অন্য এক রাজার প্রশস্তি গেয়েছেন। তিনি ছিলেন মহারাজাধিরাজ দ্রব্যবর্ধন। রাজা দ্রব্যবর্ধন সম্ভবত বরাহমিহিরের রাজ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা যশোধর্মনের পরবর্তী এক অলিকার বংশের রাজা ছিলেন এই দ্রব্যবর্ধন। বরাহমিহির সম্ভবতঃ কোনো সময় অলিকারদের সভাকবি ছিলেন। অলিকারদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। মন্দাসর পিলার শিলালিপির পঞ্চম লাইনে লেখা আছে—’
লৌহিত্যোপকণ্ঠত তালাবনগাহনোপত্যকাদ
মহেন্দ্ৰদাগঙ্গাশলিস্তসানোস তুহিনাশিখারিণফপশ্চিমাদ
পরোধেঃ সামন্তইর যস্য বহুদ্রবিংহৃতমদিহ পাদ্যরানমদভিক্ষুদারত্নাৎসুরাজিব্যতিকরশবলা ভুমিভাগঃ ক্রিয়ন্তে।।
বিশাল রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্বিদ্রোহ এবং হুনদের ক্রমাগত আক্রমণের ফলে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমদিকে গুপ্ত সম্রাটগণ যখন শক্তিহীন হয়ে পড়েন তখন দুর্ধর্ষ বীর যশোধর্মনের আবির্ভাব ঘটে। রাজা যশোধর্মন পূর্বে লৌহিত্য নদীর তীর পর্যন্ত, পশ্চিমে সাগর, উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে মহেন্দ্ৰ পর্বত পর্যন্ত তাঁর রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। যশোধর্মন হুনদের পরাজিত করেছিলেন এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের অনেকাংশ জয় করেছিলেন। যদিও তাঁর রাজত্বকাল স্বল্পস্থায়ী ছিল এবং ৫৩০-৫৪০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পতন হয়। মহেন্দ্র পর্বত উড়িষ্যায়। তাহলে হিমালয় থেকে উড়িষ্যা সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলে, চন্দ্রকেতুগড় সেই সাম্রাজ্যের মধ্যে পড়ে। সুতরাং অলিকারদের সভাকবি বরাহমিহিরের পক্ষে এইসব স্থান ভ্রমণ করা একদম অসম্ভব ছিল কি?’
প্রফেসর গ্যালাগার বললেন, ‘বরাহমিহির বাংলায় আসার স্বপক্ষে এটা কি যথেষ্ট যুক্তি?’
আমি বললাম, ‘বরাহমিহির তার বৃহৎসংহিতার উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন যেসব মহান পণ্ডিতদের থেকে তাদের কয়েকজনের নাম তিনি দিয়েছেন এবং কয়েকজনের ক্ষেত্রে যবনাচার্য, লাটাচার্য ইত্যাদি লিখেছেন যাঁদের ইতিহাসে অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সেরকম বঙ্কালকাচার্য্য নামে একজনের নাম উল্লেখ আছে। পণ্ডিতেরা বলেন বরাহমিহিরের বঙ্কালকাচার্য্য এবং বঙ্গালঋষি একই ব্যক্তি। বঙ্গালঋষি শুধু একজন জ্যোতিষী ছিলেন, নাকি এক বৃহৎ জ্যোতিষের পুস্তক রচনা করেছিলেন, সে সম্বন্ধে তথ্য হারিয়ে গেছে অতীতে। তার অর্থ বাংলায় একজন জ্যোতিষী ছিলেন যাঁর কাছে বরাহমিহিরকে আসতে হয়েছিল এবং যাঁর জ্ঞান তিনি আহরণ করে বৃহৎসংহিতাতে লিখেছিলেন। তাই হয়তো খনার বচনের অনেক শ্লোক আমরা বৃহৎসংহিতাতে পাই। আমি বললাম এই জ্যোতিষী কে ছিলেন এ নিয়ে ঐতিহাসিক এ এন উপাধ্যায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন তার নাম—বঙ্কালকাচাৰ্য্য—আ ফরগটেন অথার অন অ্যাস্ট্রোলজি। কিন্তু উনি আমার কথায় আমলই দিলেন না। প্রফেসর গ্যালাগার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কীভাবে জানলে খনার বাবা একজন বিখ্যাত বাঙালি জ্যোতিষী ছিলেন?’ আমি বললাম খনার বচনে আমরা দেখি খনা বড়াই করে বলছে যে তাঁর বাবা একজন প্রসিদ্ধ জ্যোতিষী ছিলেন—
আমি অটনাচার্য্যের বেটি।
গণতে গাঁথতে কারে বা আঁটি।।
জানি না খনার বাপের নাম কালের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে কিনা বা কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বদলে দিয়েছে কিনা, তবে এটা নিশ্চিত যে খনার বাবা একজন বিখ্যাত জ্যোতিষী ছিলেন। আগেকার দিনে বিদ্যা বিতরণ হতো গুরু পরম্পরায়। এ কথা শুনে প্রফেসর গ্যালাগার ভ্রু কুঁচকে বললেন, কিন্তু বরাহমিহির অত রমরমা উজ্জয়িনী ছেড়ে বাংলাতে আসতে যাবে কেন? বরাহমিহিরের যুবাবস্থায় মানে ৫২৫-৫৩০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতি কি খুব উন্নত ছিল?’
আমি বললাম, ‘বরাহমিহিরের সময়কালে বাংলা বলে কোনো স্বতন্ত্ৰ দেশ ছিল না। বরাহমিহির বৃহৎসংহিতার কূর্মবিভাগ-এর চতুর্দশ অধ্যায়ে পূর্বদিকের দেশসমূহের তালিকায় সুহ্ম, সমতট, ভদ্র-গৌড়ক, পৌণ্ড্র, তাম্রলিপ্তিক ও বর্ধমানের নাম উল্লেখ করেছেন। চন্দ্রকেতুগড় খনন করে যে পোড়ামাটির সামগ্রী পাওয়া গেছে তাতে নারী-পুরুষের পোশাক, গয়না, এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্যে খ্রিস্টীয় প্রথম তিন শতাব্দীর গ্রীক এবং রোমান প্রভাব লক্ষ করা যায়। চন্দ্রকেতুগড় থেকে রোমান ‘রুলেটেড’ ভাঙা মৃৎপাত্র, রোমান রমণীর আবক্ষ মূর্তি এসব অনেক প্রত্নসামগ্রী পাওয়া গেছে যা প্রমাণ করে যে রোমের সঙ্গে এই চন্দ্রকেতুগড়ের সভ্যতার যাওয়া আসা ছিল। আসলে ঐতিহাসিকরা নিশ্চিত যে চন্দ্রকেতুগড় ছিল তাম্রলিপ্ত-কৌশাম্বী-মথুরার সঙ্গে রোমের বাণিজ্যপথের প্রধান সংযোগ পথ।’
ড. গ্যালাগার বললেন, ‘কিন্তু এটা কীভাবে প্রমাণিত হয় যে বরাহমিহির বাংলা থেকে তাঁর বৃহৎসংহিতার উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন?’
আমি বললাম, ‘জ্যোতিষতত্ত্ববারিধিঃতে বরাহমিহিরের লেখা নবান্নশ্রাদ্ধের উল্লেখ পাই। সেখানে উল্লিখিত আছে—’
বৃশ্চিকে শুক্লপক্ষে তু নবান্নং শস্যতে বুধোইঃ।
অপরে ক্রিয়মাণং হি ধনুষ্যের কৃতং ভবেৎ।।
নবান্ন মূলত বাংলাদেশের অনুষ্ঠান। সৌর অগ্রহায়ণ মাসে বিশাখা নক্ষত্রে ও জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের শেষার্দ্ধে রবি অবস্থিত না হলে শুক্লপক্ষে নবান্নের প্রশস্ত সময়। এসময় মাঠে প্রথম ধান যখন পাকে তখন চাষীরা নিজেরা সেই ধান মুখে দেবার আগে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করে। ফসল কাটা হয় আরো কিছুদিন পর। চাষীরা নবান্নের উৎসর্গের ধান আলাদা করে বোনে। বরাহমিহির নবান্নের সম্বন্ধে এত কথা জানল কীভাবে? ইনি এমনকি নবান্নশ্রাদ্ধের বিষয়ে লিখছেন
ধনুষি যৎ কৃতং শ্রাদ্ধং মৃগনেত্রানু রাত্রিষু।
পিতরস্তন্ন গৃহন্তি নবান্নামিষকাঙ্খিণঃ।।
অর্থাৎ যে ব্যক্তি সৌরপৌষ মাসে অথবা মৃগনেত্রায় নবান্ন-শ্রাদ্ধ করে তার পিতৃলোক সেই শ্রাদ্ধের অন্ন গ্রহণ করেন না। কিন্তু এত সব বাঙালি রীতিনীতির শিক্ষা বরাহমিহির পেলেন কীভাবে? এজন্য কি তাঁকে বাংলায় এসে বাঙালি ফলিত জ্যোতিষীর থেকে শিক্ষা নিতে হয়েছিল? এসব থেকে প্রমাণিত হয় যে বরাহমিহিরের সময় এই অঞ্চল এত সমৃদ্ধ ছিল যে অবন্তীপুর থেকে বরাহমিহির নামে কোনো যুবকের জ্ঞানের সন্ধানে চন্দ্রকেতুগড়ে আসা মোটেই অবাস্তব বলা যাবে না।’
উনি তখন বললেন, ‘কিন্তু খনা কেন বাংলার ইতিহাস বইতে নেই?’
আমি বললাম, ‘ড. গ্যালাগার, আপনি একজন খ্যাতনামা ইন্ডোলজিস্ট। আপনি জানেন যে আমাদের বাংলার ইতিহাস আবহমানকাল হতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হিসেবে সংরক্ষিত হয়নি। আমাদের ইতিহাস রক্ষিত হয়েছে অত্যন্ত অসংলগ্নভাবে—কিছুটা মৌখিক আকারে এবং কিছুটা লিপিবদ্ধ আকারে কুলজি, ঢাকুর, ঘটক, ভাট, গুরু পরম্পরার বিবরণ, পুরোহিত এবং কুলজ্ঞগণের লিখিত বিবরণে এই ইতিহাস অবস্থান করে। কিন্তু এই বিবরণ হল ‘নহ্যমূলাঃ জনশ্রুতিঃ’—জনশ্রুতি কিংবা কিংবদন্তীর মূল মাটির গভীরে থাকে, কিন্তু সেই মূল অঙ্কুরিত হয়ে যখন বিশাল বৃক্ষরূপে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে তখন সেই শাখাপ্রশাখার ভিড়ে আসল শিকড় চিরতরে মাটির তলায় গোপন থেকে যায়। খনার জনশ্রুতিরও একটা মূল নিশ্চয়ই আছে কিন্তু কাহিনি বাড়তে বাড়তে তার সন, তারিখ অপর্যাপ্ত হওয়ায় এবং অনেক কাল্পনিক কাহিনি এর মধ্যে স্থান পাওয়ায় আধুনিক ঐতিহাসিকগণ একে অনাদৃত এবং ত্যাজ্য করেছে।’
‘কিন্তু এসব গল্পে যে সত্যতা আছে তা আমরা বুঝব কীভাবে?’
‘এসব কথা ও কাহিনির মধ্যে সত্যতা লুকিয়ে থাকে। একটা উদাহরণ দিই। যেমন, ছোটদের ছড়া আছে খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে? এটা কি ইতিহাস? না, এটা ইতিহাস না, কিন্তু সত্য কাহিনি বহন করা এক ছড়া। এই ছড়ায় লেখা আছে যে বর্গীর হামলা হয়েছিল এদেশে। নিরক্ষর কৃষকেরা সন তারিখ লিখে ইতিহাস লিখতে পারেনি, কিন্তু জনসাধারণের মুখে মুখে রচিত জারী, ভাসান, ধুয়া, শারি, পাঁচালি, পল্লিগাথা, ব্রত, লোকাচারের মধ্যে মধ্যে এক সূক্ষ্ণ মসলিনের অবগুণ্ঠনে ঢাকা বাংলার ইতিহাস আমরা এভাবে পরোক্ষ ভাবে দেখতে পাই।’
বিদ্যাদির বোধ হয় অনেকক্ষণ এভাবে একনাগাড়ে কথা বলার অভ্যাস চলে গেছে। বিদ্যাদি নমিতাকে বলল, ‘দাঁড়াও, একটু জল খাই।’
‘আমি আনছি, তুমি বস বিদ্যাদি,’ নমিতা উঠে কুঁজো থেকে জল গ্লাসে ঢেলে আনল। বিদ্যাদি ঢকঢক করে জল খেয়ে আবার শুরু করল, ‘আমি ভেবেছিলাম উনি অ্যাকাডেমিক ডিসকাশনে খুশি হলেন। কিন্তু অবস্থা খুব খারাপ দিকে মোড় নিল। এরপর থেকে আমি দেখলাম ড. বক্সী আমার সঙ্গে বৈমাতৃক আচরণ করা শুরু করলেন। ভীষণ রুক্ষ। আমি পিএইচডি প্রস্পেক্টাস জমা করলাম, ড. বক্সী রিজেক্ট করে দিলেন। তারপর আমাদের সম্পর্কে ভাঙন ধরে গেল।’
‘কিন্তু ড. বক্সী ওরকম ব্যবহার কেন শুরু করলেন?’
‘লোভ, বিদ্যাদি মলিন হাসি হাসল। ‘তারপর আমরা একদিন খবর পেলাম ড. বক্সী হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন পরের বছর ফল- সেমেস্টারে বাংলা বিভাগে গেস্ট লেকচারার হয়ে অধ্যাপনা করার। আমার পিএইচডি প্রস্পেক্টাস রিজেক্টেড হল, এর আগে ড. আশুতোষ মুখার্জী ডিবেট হলো। তাতে পৃথুযশের স্বপক্ষে ওরা দু’জনে মিলে রায় দিলেন। আমি দুঃখ পেয়েছিলাম, রাগ হয়েছিল, কিন্তু ভাবিনি যে অতবড় একটা চক্রান্ত চলছে। কিছুদিন পর ড. গ্যালাগার আমেরিকায় ফিরে গেলেন। ওঁর বই পাবলিশ হল ‘বরাহমিহির অ্যান্ড খনা’, সেখানে ড. গ্যালাগার তাঁর থিয়োরি পুরো পাল্টে দিয়ে দেখালেন বরাহমিহির বাংলায় এসেছিল।’
‘সাপোর্টিং লজিক?’ মিস বসাক বললেন।
‘আমার বরাহমিহিরের রিসার্চ হুবহু টুকে দিয়েছিল ড. গ্যালাগার।’
‘টুকে দিয়েছিল?’
‘হুবহু।’
‘কী বলছেন কী?’ মিস বসাক অবাক। ‘আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেননি?’
‘না। পুরোটা নিজের আবিষ্কার বলে চালিয়ে দিয়েছে।’
‘পাইরেসি,’ নমিতা বিড়বিড় করে বলল।
‘এজন্য দায়ী আমরা,’ বিদ্যাদি বলল। ‘নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে আমরাই ওদের এটা করতে দিই। সেদিন ড. বক্সী শুধুমাত্র আমেরিকায় গিয়ে পড়াবার লোভে আমার রিসার্চটা ড. গ্যালাগারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আর আজ আমার নিজের ভাইপো নিজের কেরিয়ারের জন্য আমাদের দেশের আয়ুর্বেদের রিসার্চ আমেরিকান কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছে।’
‘আপনি ছেড়ে দিলেন?’ মিস বসাকের দৃষ্টিতে ক্রোধ।
‘আমি ডক্টর বক্সীর অফিসে গিয়ে খুব চেঁচামেচি করলাম। বললাম আমি নিউ ইয়র্কের পাবলিশারকে চিঠি লিখে জানাব যে আমার গবেষণা ব্যবহার করা হয়েছে।’
‘তারপর?’
‘ড. বক্সী বললেন উনি ড. গ্যালাগারের সঙ্গে কথা বলবেন।’
‘কথা বলেছিলেন?’
‘হ্যাঁ। উনি বললেন ড. গ্যালাগার দুঃখ প্রকাশ করেছেন। উনি বলেছেন এটা অসাবধানতার দরুন হয়েছে। পরের এডিশনে কারেকশন করে বিবলিওগ্রাফিতে আমার নাম দেওয়া হবে।’
‘পরের এডিশনে দিয়েছিল আপনার নাম?’
‘না। সেন্ট্রাল থিওরিই যদি অন্যের হয় তবে পাঠক বলবে লেখক তোমার অরিজিন্যালিটি কোথায়? বইটা বুকার প্রাইজের জন্য নমিনেটেড হল। ড. গ্যালাগার হয়তো বুঝেছিল আমি ওর কাছে বিপজ্জনক। আত্মরক্ষার্থে আমার মতো আগাছাকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলা দরকার। তাই ড. বক্সীকে দিয়ে এমন ব্যবস্থা করালো যাতে আমার মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর পৃথুযশও তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর ধ্বংসপথ প্রশস্ত করতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ড. বক্সীর সঙ্গে। তার পুরস্কার পৃথুযশ পেল। পিএইচডি কমপ্লিট করতেই পৃথুযশ হার্ভার্ড চলে গেল ওই ড. গ্যালাগারের আন্ডারে পোস্টডক করতে। কিন্তু সেসব তো অনেক পরের কথা। একটা অদ্ভুত কথা আমার কানে এল। লাইব্রেরির একজন ক্লার্ক আমাকে বলল পৃথুযশ থিসিসের যে প্রস্পেক্টাস সাবমিট করেছে তার পাতার পর পাতা আমার প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন থেকে কপি করেছে। পৃথুযশ ওর পিএইচডি থিসিসের প্রস্পেক্টাস ড. বক্সীকে দিয়ে অ্যাপ্রুভ করিয়ে ফেলেছে। আমার মাথা বরাবরই গরম। আমি অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে ড. বক্সীকে গিয়ে নালিশ করলাম। উনি আমায় বললেন এটা একদম মিথ্যা। তুমি ষষ্ঠীদাসের এভিডেন্স ব্যবহার করে প্রমাণ করছ যে খনার অস্তিত্ব ছিল, আর ও ষষ্ঠীদাসের এভিডেন্স ব্যবহার করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে খনা বলে কেউ ছিল না, ষষ্ঠীদাসই খনা। তবে হ্যাঁ দু’জনের সাপোর্টিং ডকুমেন্টসে কিছু মিল আছে। আমি বুঝলাম ড. বক্সী পৃথু্যুশকে আমার প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনটা দেখিয়েছেন। ওখান থেকে পৃথুযশ ওর থিসিসের মেটিরিয়াল তুলে নিয়েছে। আর তাই ড. বক্সী আমাকে আমার থিসিস পাল্টাতে বলছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না যে কীভাবে আমি সেটা প্রমাণ করব। আমি ড. বক্সীকে বললাম যে আমি ডিনের কাছে নালিশ করব,’ বিদ্যাদি থামল। তারপর বলল, ‘জানো নমিতা, পৃথুযশ আমায় খুব হিংসা করত এটা আমি বুঝতাম। কিন্তু ও আমার এতবড় একটা ক্ষতি করে দেবে এটা আমি ভাবিনি কখনো।’
‘হিংসা করাটা অস্বাভাবিক নয়। তুমি একজন মেয়ে হয়ে ওকে বিএ, এমএ- তে হারিয়ে দিয়ে ওর পাণ্ডিত্যের অহংকারে আঘাত করেছিলে। কিন্তু ক্ষতি করার চেষ্টাটা অস্বাভাবিক মানসিকতা,’ নমিতা বলল। ‘এই মানসিকতা অবশ্য আমি অনেক বিদ্বান পুরুষের মধ্যে দেখেছি। আর বরাহমিহির খনা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এসব পুরুষের ইগো হার্ট হলে প্রতিহিংসা তাদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে গ্রাস করে।’
‘লাইব্রেরির সেই ক্লার্ক আমায় বলল আমি যদি চাই তবে সে পৃথু্যুশের ফাইলটা আমায় দিতে পারে। আমি রাজি হলাম। ক্লার্ক আমায় বলল রাত্রিবেলা লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার ঠিক পরে জার্নাল সেকশনে আসতে। আমি রাত্রিবেলা গেলাম। লাইব্রেরি তখন বন্ধ। কিন্তু লোকটা একা ছিল। ও আমায় বলল ভিতরে ডেস্কে ফাইলটা রাখা আছে, ওটা নিয়ে বাড়ি চলে যেতে আর কাল সকালে ফেরত দিয়ে দিতে। আমি লাইব্রেরির ভিতর ঢুকে যখন ফাইলটা নিয়ে জার্নাল রুম থেকে বেরিয়ে আসছি, তখন ড. বক্সী আর পৃথুযশ লাইব্রেরিতে ঢুকল। আমাকে দেখে দু’জনে অবাক। ড. বক্সী বলল আমি এই অসময়ে জার্নাল রুমে কী করছি? লাইব্রেরির ক্লার্ক বেমালুম অস্বীকার করে বলল সে বাথরুমে গেছিল আমাকে ঢুকতে ও দেখেনি। ড. বক্সী বললেন দেখি তোমার হাতে ওটা কিসের ফাইল? আমার হাত থেকে ফাইলটা কেড়ে নিয়ে দায়সারাভাবে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন ছিঃ, ছিঃ! তুমি পৃথু্যুশের পিএইচডি থিসিসের প্রসপেক্টাস চুরি করছ? তোমার লজ্জা করে না? তোমায় পুলিশে দেওয়া উচিত। আমি বললাম আমার লজ্জা করবে? আমি ভিতরে গিয়ে এই ফাইলটা দেখেছি। লাইন বাই লাইন আমার প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন থেকে টোকা। এগুলো পৃথযশ কীভাবে পেল? আপনি ওকে দিয়েছেন। আমি এই ফাইল ডিনকে দেখাব। আপনারা দু’জনেই চোর! আমি ড. বক্সীর থেকে ফাইলটা কেড়ে নিতে গেলাম আর উনি তখন আমায় এক ধাক্কা মারলেন। আমি ছিটকে পড়লাম। আমার মাথায় রাগে আগুন জ্বলছে। উঠে এসে রাগে ঘেন্নায় ড. বক্সীকে এক চড় মারলাম। ড. বক্সী আরো গালাগালি করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু চড় খেয়ে ওর বাক্য মুখেই অসমাপ্ত রয়ে গেল। উনি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। পৃথু্যুশের দিকে তাকালেন। পৃথুযশ দৃষ্টি মেঝেতে নামিয়ে ফেলল। তারপর ড. বক্সী ফাইল হাতে ছুটে বেরিয়ে গেলেন। পরে শুনলাম উনি আমার বিরুদ্ধে লাইব্রেরির জার্নাল রুম থেকে পৃথু্যুশের ফাইল চুরি করার নালিশ জানিয়েছেন। উনি বলেছেন ফাইলটা ওঁর হাত থেকে ছিনিয়ে না নিতে পেরে রেগে গিয়ে আমি ওঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছি এবং থাপ্পড় মেরেছি। পৃথুয আর লাইব্রেরির ক্লার্ক ড. বক্সীর হয়ে সাক্ষী দিল।’ বিদ্যাদি হাঁফাচ্ছে।
‘জল খান,’ মিস বসাক বললেন।
বিদ্যাদি জলের গ্লাসে চুমুক দিল। গ্লাস নামিয়ে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘ওই ক্লার্ক আপনার বিরুদ্ধে বলল? স্ট্রেঞ্জ!’
‘লাইব্রেরির ক্লার্কের আর তখন কত বেতন? ড. বক্সী এও দোষারোপ করলেন যে আমার থিসিস নাকি পৃথুযশের থিসিস থেকে হুবহু টোকা আর তাই তিনি প্লেজারিজমের অপরাধে আমাকে আমার থিসিস পাল্টাতে বলেছেন। আমার অ্যাকাডেমিক রেকর্ডের কথা ভেবেই তিনি পুলিশে রিপোর্ট করতে যাননি, কিন্তু আমার এই অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য।’ বিদ্যাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘পৃথু্যুশের থিসিস আপনার থিসিসের থেকে হুবহু টোকা?’ মিস বসাক খুব সিরিয়াস মুখে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘অত অল্প সময়ে যেটুকু দেখেছি, তাই তো দেখলাম। জানি না পরে ও থিসিসের গেট আপ চেঞ্জ করে দিয়েছে কিনা।’
‘কিন্তু সাপোর্টিং ডকুমেন্টস?’
‘সব আমার জোগাড় করা ডকুমেন্টস। অবশ্য—’
‘ওয়েট, ওয়েট, ওয়ান মিনিট, অ্যাডভোকেট বসাক বিদ্যাদিকে থামিয়ে দিলেন। ‘আপনার ডকুমেন্টে যেমন তারিখ ও স্ট্যাম্প ছিল, তাহলে ড. পৃথুযশ ভৌমিকের ডকুমেন্টেও তারিখ থাকার কথা তাই না?’
‘হ্যাঁ তা থাকবে।’
‘আমি কি একবার ড. ভৌমিকের পিএইচডি থিসিসটা পেতে পারি?’
নমিতা বুঝে গেল অ্যাডভোকেট বসাক সন্দেহের গন্ধ পেয়েছে। ‘তোমার এখানে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট আছে বিদ্যাদি?’
‘এখানে কম্পিউটার-ইন্টারনেট? না ভাই, কিছুই নেই। কিন্তু কেন?’ নমিতা উঠে দাঁড়াল।
‘কোথায় চললে?’
‘আমি যাচ্ছি বিদ্যাদি। দেরি হওয়ার আগে পৃথু্যুশের থিসিসের ফাইলটা ডিজিটাল লাইব্রেরির থেকে তুলে একটা প্রিন্ট নিতে হবে। মিস বসাক আপনি একটা ট্যাক্সি বা উবার নিয়ে নেবেন?
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, শিওর,’ মিস বসাক বললেন। ‘আপনি তাড়াতাড়ি যান।’
বিদ্যাদির ফাইলটা তুলে হন্তদন্ত হয়ে নমিতা গাড়ির দিকে ছুটল। মনে উদ্বেগ, এটাও কেউ হ্যাক করে উধাও করে দেয়নি তো?
