বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৭১
।। একাত্তর।।
২৩ আগস্ট, ২০১৯
আজ সকাল থেকে নমিতার মনে উত্তেজনা। আজ বিচারের ফলাফল। কোর্টে লিটিগেশন এরিয়ায় সামনে বসে অ্যাডভোকেট মাধবী বসাক। একটা ফাইল পড়ছেন। পাশে সুব্রত মিশ্রকে দেখে নমিতা বেশ বুঝতে পারছে বৃদ্ধের মনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অদম্য টেনশন। আরুষিকে আজ দেখা যাচ্ছে না। বিদ্যাদি এসে নমিতার পাশে বেঞ্চে বসল। ফিসফিস করে বলল, ‘বাবলু আসবে ভেবে দাদাকে ইচ্ছা করেই আজ আনলাম না।’ নমিতা বলল, ‘ভালো করেছ।’
নমিতার বুকের ভিতর দামামা বাজছে। আহুজা তার দলবল নিয়ে বসে আছে। আজ কিন্তু পৃথুযশ আর তথাগতকে দেখা গেল না। বিদ্যাদির চোখ দেখে মনে হলো ওরা না আসায় বিদ্যাদি স্বস্তি পেয়েছে। গগন এসে বসল নমিতার পিছনের আসনে। গগনের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সেও খুব নার্ভাস।
বিচারপতি এবার প্রবেশ করলেন, সকলে উঠে দাঁড়ালো। বিচারপতি আসন গ্রহণ করার পর সকলে আসন গ্রহণ করল। নমিতার বুক দুরুদুরু করছে।
এবার জাজ বিচারের ফল ঘোষণা করলেন। জাজ বললেন, এটা সত্যি ইনকর্পোরেশন অব পেটেন্ট অ্যাক্ট ইজ টু প্রোমোট ইনভেনশন অ্যান্ড সেফগার্ড দ্য ক্রিয়েটর ফ্রম ইনফ্রিঞ্জমেন্ট। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী এটা আদালত দেখতে পাচ্ছে যে অ্যামফার্মা তাদের পেটেন্ট শুধু লাইসেন্স বিক্রি করে বিজনেস রেভিনিউ বাড়াবার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। অ্যামফার্মার ওষুধ ভারতের বাজারে গত তিন বছর ধরে অনুপস্থিত এবং তাদের পেটেন্টের শিল্ড থাকায় ভারতীয় কোম্পানিগুলি সেই ওষুধ বিক্রি করতে পারছে না। ওষুধের আসল উদ্দেশ্য হল জনস্বার্থ। পাবলিক ইন্টারেস্ট স্যাল অলওয়েজ বি প্রায়োরিটাইজড। গ্রামের জনগণ সাপের কামড়ে ওষুধের অভাবে মারা যাবে এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এই কেসটা একটা উদাহরণ যে বিদেশি কোম্পানিগুলো কিভাবে লার্জ সাম অব রয়্যালটিজ এবং লাইসেন্স ফিজের ব্যবসার জন্য তাদের পেটেন্টকে ব্যবহার করে। সেকশন ১৫৬ অব পেটেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের ক্ষমতার বলে ড্রাগ কন্ট্রোলার অব ইন্ডিয়ার অধিকার আছে সুশ্রুতকে ওষুধ তৈরি ও বিক্রির লাইসেন্স দেবার এবং পেটেন্ট অ্যাক্টের সেকশন ৯০ অনুযায়ী ড্রাগ কন্ট্রোলার ক্যান রিজনেরি অ্যালাউ দ্য কমার্শিয়ালাইজেশন অব জেনেরিক ড্রাগস ইন পাবলিক ইন্টারেস্ট ইভন ইফ দে আর অলরেডি পেটেন্টেড। কোর্ট মনে করে না যে অ্যামফার্মা যে দাবি করেছে যে তাদের আট কোটি টাকা লস হয়েছে এটা সত্যি। কোর্ট মনে করে যে সুশ্রুতের জেনেরিক ড্রাগ অ্যামফার্মার পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট করে না। অতএব সুশ্রুত সম্পূৰ্ণ মুক্ত। দ্য কেস ইজ ডিসমিসড।’ বিচারক গ্যাভেল ঠুকলেন।
মিস বসাক দু’হাত জোড় করে কোর্ট রুমের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে বসে রইল। নমিতা নিশ্চিত উনি ওঁর মা সারদাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। একজন মায়ের লড়াই তার মেয়ের জন্য শেষ হল। নমিতা পাশে বসা বিদ্যাদিকে জড়িয়ে ধরল। বিদ্যাদির চোখে জল। সুব্রত মিশ্র আনন্দে পাগল হয়ে কোর্টরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে বাইরে করিডরে এসে মোবাইলে ফোন করলেন আরুষিকে। উত্তেজিত কণ্ঠে নাতনিকে সুসংবাদ দিতে দিতে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলেন বৃদ্ধ। এই জয় যে সম্ভব তা তিনি ভাবতেই পারেননি।
ধীরে ধীরে কোর্টরুম খালি হয়ে গেল। মাধবী বসাক নমিতাদের কাছে এগিয়ে গেলেন। স্মিত হেসে বললেন, ‘আমি আপনাদের দু’জনের কাছে কৃতজ্ঞ।’
‘এভাবে বলবেন না,’ নমিতা লজ্জিত গলায় বলল। ‘দেশের জন্য এটুকু করতে পারলাম, এটাই পরম ভাগ্য।’
মিস বসাক এবার বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোন ইউনিভার্সিটি আপনাকে কবে পিএইচডি দেবে তা আমি জানি না। আপনি যতটা গবেষণা এই কেসে জমা করলেন, তার জন্য আমার কাছে আপনি ডক্টর অব লিটারেচার। আর বিদুষী খনা সম্বন্ধে এত তথ্য প্রতিটি বাঙালি মেয়ের বুকের পাটা চওড়া করে দেবে। কোর্টে আপনি যখন কথা বলছিলেন তখন যদি আয়নায় দেখতেন, আপনি মা সরস্বতীকে দেখতে পেতেন। ইটস অ্যান অনার যে আমি কিছুদিন আপনার পাশে থাকার সুযোগ পেয়েছি।’
নমিতারা তিনজনে বেরিয়ে এল। মাধবী বসাক সুশ্রুত মিশ্রের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আরুষি খুশি তো?’
সুশ্রুত মিশ্র কথা বলবেন কী, বাঁ হাতে চোখের জল মুছতে মুছতে ডান হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে আশীর্বাদ করলেন।
‘আরুষিকে বলবেন ওর লড়াই দেখে আমি খুব প্রাউড ফিল করছি ওর জন্য। প্লিজ বলবেন ওর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মত ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি অপরাধী।’ মিস বসাক আর কথা বলার মত অবস্থায় ছিলেন না। উনি এখন উকিল আর মা’র মাঝামাঝি নো-ম্যানস ল্যান্ডে। তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে হলওয়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। নমিতা আর বিদ্যাদি মিস বসাকের সঙ্গে। দময়ন্তী তার বসের হাত থেকে কেসের ফাইল ঠাসা ট্রলি সুটকেসটা নিজের হাতে নিয়ে নিল। ‘থ্যাঙ্কস, মাধবী বসাক দময়ন্তীকে বললেন। তারপর উনি নমিতাকে বললেন, ‘আমার মস্ত লাভ হল, এ জন্মে একটা বোন পেলাম। এমন বোন যার ওপর আমি ভরসা করতে পারি। অলওয়েজ।’
‘বোন পেলেন, মেয়েকেও ঠিক পাবেন,’ নমিতা জোর দিয়ে বলল। ‘শুধু সময়ের অপেক্ষা।’
‘মা সারদা জানেন। তাঁর ইচ্ছাই পূর্ণ হোক,’ মাধবী বসাক দীর্ঘশ্বাস ফেলার সময় মুখের হাসিটা মিলিয়ে যেতে দিলেন না।
‘এখন কী করবেন?’ নমিতা বলল।
‘কালীঘাটে মা কালীর দর্শন করব। কাল ভোরের ফ্লাইটে দিল্লি ফিরে যাচ্ছি।’
‘মেয়ের সঙ্গে দেখা করবেন না?’ নমিতা বলল।
‘সেই যোগ্যতা আমি হারিয়েছি ড. স্যান্যাল,’ মাধবী বসাক মলিন হাসলেন। ‘মেয়ে যদি কখনো ডাকে তবেই ওর সঙ্গে দেখা করতে পারব।’ তারপর চোখের কোণে চলে আসা এক অণু অশ্রুকণা তর্জনী দিয়ে দ্রুত মুছে ফেললেন মাধবী বসাক। এবার তার কংক্রিটের চোয়াল কথা বলল, ‘কাল-পরশু একটু জিরিয়ে নিয়ে সোমবার সকাল এগারটায় আরেকটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দিল্লি হাইকোর্টে জাজের সামনে দাঁড়াতে হবে।’
বিদ্যাদি হেসে বলল, ‘অনেক বছর তো প্রবাসে ওকালতি করলেন, এবার পাকাপাকি ভাবে বাড়ি ফিরে আসুন। মেয়ের কাছাকাছি।’
মাধবী বসাক হাসলেন—‘সেই যে রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন না, নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিয়ে সমুদ্রে নেমে আর ফিরে এল না, আমার হয়েছে অনেকটা সেই অবস্থা। জানি না, আর এজন্মে ফেরা হবে কিনা। তবে মেয়ে যদি আমাকে কাছে না ডাকে তবু আমি বারবার কলকাতা আসব বিদ্যাধরী। শুধু আপনাদের টানে আসব। তবে প্রমিস, আপনার প্ল্যাটফর্মের স্কুলে কক্ষনো গিয়ে আপনাকে বিরক্ত করব না। আর এটা আমার তরফ থেকে আপনার স্কুলের জন্য,’ মিস বসাক একটা সাদা খাম বিদ্যাদির হাতে দিলেন।
‘এটা কি?’ বিদ্যাদি খামটা খুলল। একটা চেক। ‘পাঁচ লাখ!’
‘চেকে নামটা বসিয়ে দেবেন। তবে আমি আপনার পাশে পাশে আছি। আর এবার থেকে বৌবাজারের ইস্কুল-ঘরে প্লিজ লাইট জ্বালিয়ে কাজ করবেন।’
বিদ্যাদি মিস বসাকের দু-হাত জড়িয়ে ধরল।
কথা বলতে বলতে ওরা বাইরে এসে পড়েছে। পার্কিং এরিয়ায় পার্ক করে রাখা কাতারে কাতারে গাড়ির ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মাস্টারদার স্ট্যাচুটাকে ট্রাফিক পুলিশের মতো লাগছে। ‘দিল্লি এলে অবশ্যই জানাবেন, এবার অনুমতি দিন আমি আসি।’ মিস বসাক মিষ্টি হাসলেন।
যেতে নাহি দিব কথাটা মনে আসছিল, তবু নমিতা মিস বসাককে বিদায় দিল। মিস বসাক আর দময়ন্তী হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির ভিড়ে হারিয়ে গেল।
‘দিদি, আমি তাহলে আসি, গগন হকার বইয়ের ঝুলিটা কাঁধে ঠিকমত তুলে বিদ্যাদিকে বলল। ‘সকালের বজবজ লাইনের অফিসের কাস্টমাররা বেরিয়ে গেছে, আমি কাছেই ব্যান্ডস্ট্যান্ডে দেখি যতটা কাস্টমার ধরা যায়।’
‘এসো ভাই,’ বিদ্যাদি বলল। ‘তুমিই এই যজ্ঞের ঋত্বিক ছিলে।’
‘মানে কী?’ কঠিন কঠিন শব্দ গগনের উপার্জন বাড়ায়।
‘প্রধান হোতা,’ বিদ্যাদি হাসল।
নমিতাও গগনের দিকে তাকিয়ে হাসল। ছেলেটা বেশ। তবে এত বড় কাজ যে করল, তাকে এই ক’টা বইতে মানায় না। এর চারদিকে অজস্র বই হওয়া উচিত। নমিতা ভাবল বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে এত বড় এক্সপ্যানশন হয়েছে, জয়ন্তদার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
গগন মাস্টারদা থেকে ক্ষুদিরামের দিকে হাঁটা লাগাল। নমিতা বলল, ‘যাক, নিশ্চিন্ত যে আমাদের কাজ শেষ।’
‘না একটা কাজ বাকি আছে,’ বিদ্যাদি শান্তস্বরে বলল।
‘আমি ভুলিনি, নমিতা বুকে অনেকটা বাতাস টেনে শ্বাস ছাড়ল। ‘উই উইল নেল দ্য কফিন অফ পৃথুযশ ভৌমিক। আমার গাড়ি বাঁদিকে।’
দু’জনে হাঁটতে লাগল। নমিতা একটু ইতস্তত করে বলল; ‘তোমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করব বিদ্যাদি?’
‘বল।’
‘বিদ্যাদি, এখন যখন বিচার শেষ হয়ে গেছে। তোমার কী মনে হয়, বেহুলা কি সত্যি ছিল?’
বিদ্যাদি স্মিত হেসে বলল, ‘তোর কী মনে হয়?
‘আমি তো জন্মান্তর একদম বিশ্বাস করি না। তার ওপর বেহুলার জিভে ওরকম কাটা জন্মদাগ, সেটা কি কখনো সম্ভব? তাই জিজ্ঞাসা করলাম।’
বিদ্যাদির ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি খেলে গেল। বিদ্যাদি বলল, ‘জানিস আমার মনে হতো বেহুলার যে কাজটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে তা যেন সম্পূর্ণ করার জন্যই আমার জন্ম হয়েছে। ছোটবেলায় আমার মা বেহুলার গল্প বলতে বলতে আমায় কী বলে ডাকতো জানিস?’
‘কী?’
‘জিভকাটি।’
‘কেন?’ নমিতা হেসে জিজ্ঞাসা করল।
বিদ্যাদি নমিতাকে জিভ বের করে দেখাল।
নমিতা শিউরে উঠল।
বিদ্যাদির জিভের অনেক ভিতর দিকে আড়াআড়ি একটা আবছা কাটা দাগ।
