বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১৭
।। সতেরো ।।
রোববার। বিকেলে কলেজ স্ট্রীটের প্রায় সব দোকান বন্ধ। রাস্তা প্ৰায় জনশূন্য। ইউনিভার্সিটি খালি। নমিতা নিজের অফিসে ঢুকে ডেস্কটপ অন করে তাড়াতাড়ি ডিজিটাল লাইব্রেরিতে গেল। অ্যাডভান্স সার্চে পৃথুযশের নাম টাইপ করল। এক সেকেন্ডের মধ্যে কম্পিউটার ওর স্ক্রিনে হাজির করল পৃথু্যুশের পিএইচডি থিসিসের ফুল টেক্সট।
নেম অব রিসার্চার—ভৌমিক, পৃথুযশ। নেম অব গাইড –বক্সী, প্রমথেশ। নমিতার হার্টবিট বেড়ে গেল। ডকুমেন্ট ফোল্ডারে মাউস ক্লিক করল নমিতা টাইটেল, সার্টিফিকেট, ফ্রন্টম্যাটার, কনটেন্ট, তার পর পনেরোটা চ্যাপ্টার। কনটেন্টে ক্লিক করল নমিতা। ২২১ পাতা মোট। কৌতূহলে নমিতা ফাইলটা খুলল। পৃথুযশের থিসিস—
কাল্পনিক খনা ও বাস্তব ষষ্ঠীদাস।
পৃথুযশ শুরুই করেছে খনার অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে–
বাঙালির বদনাম আছে আত্মবিস্মৃত জাতি হিসেবে। ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থের ভূমিকায় শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন ‘বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা কতদূর গভীর ছিল ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপক পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় শর্ম্মা রচিত ‘রাজতরঙ্গ’ অথবা ‘রাজাবলী’ গ্রন্থ তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। বাংলার প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে বাঙ্গালী জাতির স্মৃতি ও জনশ্রুতি যে কত দূর বিকৃত হইয়াছিল, এবং পাঁচ ছয় শত বৎসরের মধ্যে বাঙ্গালী জাতির ঐতিহাসিক সূত্র কিরূপে সমূলে ছিন্ন হইয়া গিয়াছিল এই গ্রন্থখানি পড়িলেই তাহা বেশ বোঝা যায়।’ মৃত্যুঞ্জয় শৰ্ম্মা না পড়েও শুধু খনার জীবনীগুলি বিভিন্ন পুস্তকে পড়ে আমরা বাঙালি জাতির বিকৃত জনশ্রুতির পরিচয় পাই যখন দেখি যে মিহিরের জন্মের পর তার পিতা বরাহ সদ্যোজাত শিশুকে এক তামার পাত্রে পুরে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিল এবং মিহির সাগরের অত ঢেউ অতিক্রম করে সিংহলে গিয়ে পৌঁছায়। তাহলে বাঙালির ইতিহাস আধুনিক বিজ্ঞান-সম্মত ইতিহাস নয়? খনার বচন উল্লেখ করে বাঙালি শ্লাঘা বোধ করে যে খনা একজন বাঙালি বিদুষী মহিলা ছিলেন। তবু খনার সম্বন্ধে যে প্রশ্নগুলো বারবার আলোচিত হয়েছে তা হল—খনা কি বাস্তবে ছিল, নাকি খনা এক উপকথা মাত্র?
নমিতার মাথা দপদপ করতে লাগল। খুব ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু এখনো কিছুটা কাজ বাকি আছে। ডাউনলোড বাটনে গিয়ে নমিতা এক এক করে সব ক’টা চ্যাপ্টার, কনটেস্ট, টাইটেল, সার্টিফিকেট সব ডাউনলোড করে উঠে আসছিল। হঠাৎ কী মনে হলো নমিতা এবার নমিতা বিদ্যাদির ফাইলটা খুলল। ফাইলের প্রথম লাইনটা পড়তে পড়তেই ওর ক্লান্ত দু’চোখ ছানাবড়ার মতো ফুলে উঠল। বিদ্যাদির প্রথম চ্যাপ্টার শুরু হয়েছে
বাঙালির বদনাম আছে আত্মবিস্মৃত জাতি হিসেবে। ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থের ভূমিকায় শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন ‘বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা কতদূর গভীর ছিল ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপক পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় শর্ম্মা রচিত ‘রাজতরঙ্গ’ অথবা ‘রাজাবলী’ গ্রন্থ তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
‘হোলি শিট!’ নমিতা উত্তেজিত হয়ে আরো কিছুটা পড়ল। লাইন বাই লাইন মিলে যাচ্ছে। নমিতা তাড়াতাড়ি অ্যাডভোকেট বসাককে কল করল—‘মিস বসাক, হুবহু এক!’
‘রিয়্যালি!’
‘হ্যাঁ, মিস বসাক। আমি মিলিয়ে দেখেছি। আমি শিওর যে ড্রিলবিট বা টার্নিটিন প্লেজারিজম ডিটেক্টর রিপোর্ট রান করালে এই প্লেজারিজম এক্সপোজড হয়ে যাবে।’
‘এটা এই কেসে অ্যামফার্মার ওপর একটা বড় আঘাত হানবে। ওদের এক্সপার্টই যদি প্লেজারিজমের দোষে দোষী হয়, তবে ওর ক্রেডিবিলিটিই লুজ করবে,’ মিস বসাকের কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা।
‘তবে শিওর হওয়ার জন্য বিদ্যাদিকে একবার দেখাতে হবে। আমি ভাবছি আজই চলে যাই বিদ্যাদির বাড়ি।’
‘আজ?’
‘বিদ্যাদিকে সকালে তো পাওয়া যায় না, ও আহিরীটোলার স্কুলে থাকবে। এই ফাইলটা আজ দিলেই ভালো হতো। বিদ্যাদি রাতে দেখে রাখতে পারে। এখন সাড়ে চারটে বেজেছে। আমি দেখছি, বিদ্যাদি যদি খুব টায়ার্ড না থাকে তবে –’ নমিতা বলল। ‘আমি আপনাকে একটু পরে কল করে জানাচ্ছি।’
নমিতা বিদ্যাদিকে কল করল। বিদ্যাদি বলল, ‘আমি ট্রেনে, বাড়ি ফিরছি।’
‘বিদ্যাদি, যা সন্দেহ করেছিলাম। তুমি রাইট। পৃথু্যুশের পিএইচডি থিসিস তোমার প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। প্রথম প্যারাটা তো হুবহু এক। তোমাকে একটু তাড়াতাড়ি দেখাতে চাইছিলাম। আমি কি তোমার বাড়িতে আসতে পারি?’
‘তোমার অসুবিধা না হলে চলে এস।’
‘আমি চটপট একটা প্রিন্ট আউট নিয়ে আসছি,’ নমিতা ফোন রেখে মিস বসাককে আবার কল করল। ‘বিদ্যাদির কাছে যাচ্ছি। আমি ফিরে এসে আপনাকে সব জানাব।’
ফোন বন্ধ করে নমিতা পৃথু্যুশের ফাইলটা আবার খুলল আর প্রিন্ট কম্যান্ড দিল। লেসার প্রিন্টার প্রায় নিঃশব্দে দুশ একুশ পাতার পৃথু্যুশের পতনের অস্ত্র প্রিন্ট করে দিল। কাগজগুলোকে একটা খামে ভরে, গাড়ির চাবি নিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড়াল নমিতা।
এক ঘন্টা পর নমিতা বিদ্যাদির বাড়ি পৌঁছাল। বিদ্যাদিই দরজা খুলল।
‘বিদ্যাদি, কী ডেঞ্জারাস এই পৃথুযশ! তোমার পি আর ডিসার্টেশন থেকে হুবহু টুকে দিয়েছে?’ ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল নমিতা। ‘তোমাদের দু’জনের ডকুমেন্টই ডেটেড ডকুমেন্ট। তোমার তারিখ পৃথুযশের তারিখের থেকে ছয় মাস আগেকার। এই দেখ পৃথু্যুশের থিসিসের কপি। তোমাদের দু’জনের প্রথম প্যারা একদম এক।’
বিদ্যাদি ফাইলটা খুলল। নমিতাও হুমড়ি খেয়ে পড়ল ফাইলে। ‘একদম টুকে দিয়েছে,’ বিদ্যাদি ফাইলটা বন্ধ করে কিছু ভাবতে লাগল।
‘কী ভাবছ বিদ্যাদি? তুমি দেখ আমি পৃথুযশকে এক্সপোজ করে দেব।’
‘না আমি ভাবছি অন্য কথা।’
‘কী অন্য কথা?’
‘পৃথুযশ কেন টুকতে যাবে বলো তো? ও অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিল। আমি জানো অনেক ভেবেছি, কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর পাইনি। কিন্তু হুবহু এক। সেই আমার লেখা ষষ্ঠীদাস, বিদ্যাদি খোলা পাতায় টোকা মারল। নমিতা পড়ল
খনাবাক্যের সঙ্গে ষোড়শ’ শতকের একজন বাঙালি জ্যোতিষীর লেখার স্টাইলের খুব মিল পাওয়া যায়। তিনি হলেন মাঝিগ্রামের ষষ্ঠীদাস। ষষ্ঠীদাস তাঁর ষষ্ঠীনাম নামক গ্রন্থে লিখেছেন—ইতি মাঝিগ্রাম নিবাসিনঃ শ্রীষষ্ঠীদাসশমণঃ ষষ্ঠীনামগ্রন্থস্য প্রথমোধ্যায়ঃ। মাঝিগ্রাম বর্ধমান জেলার বর্তমান মাজিগ্রাম। ষষ্ঠীদাস বন্দ্যঘটীর শ্রীবৈদ্যনাথের বংশধর ছিলেন। ষষ্ঠীদাস মোটামুটি সপ্তদশ শতাব্দীর মানুষ বলে পণ্ডিতেরা অনুমান করেছেন। ষষ্ঠীদাসের ষষ্ঠীনাম পুঁথি পড়লে দেখা যায় যে তিনি সংস্কৃত ও বাংলায় বেশ দক্ষ ছিলেন। তিনি সংস্কৃত লিখতে লিখতে মাঝে মাঝে বাংলাতেও লিখে গেছেন, যেমন
নবাংশভাগমিত্যেবং মেষাদি কথ্যতে বুধৈঃ।।
পঁচিস আঠাইস চৈত্রিশ, দুই আটত্রিশ ছত্রিশ।।
মেষতুলা বিপর্য্যয়, নবাংশভাগ ষষ্ঠী কয়।।
ইথে যদি ধান্দা হয়, মেষে মীনে বৈসে ছয়।।
এর থেকে বোধগম্য হয় ষষ্ঠীদাস জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা করতেন। এবং ফলিত জ্যোতিষের বিধান তাঁর পুস্তকে দিয়ে গেছেন। ষষ্ঠীদাসের লেখা থেকে বোঝা যায় ওঁর তন্ত্রের সম্বন্ধে জ্ঞান ছিল। সম্ভবত উনি তন্ত্রসাধক ছিলেন। তাই অবলীলাক্রমে তন্ত্রের মন্ত্র তিনি লিখে গেছেন—’
মন্ত্রণৈতানি সংলিখ্য পূজয়েন্মন্ত্র পূর্ব্বকং।
ওঁ হ্রীং হ্রীং ফট স্বাহা ইতি মন্ত্রণ ত্রিকোণমণ্ডলোপরি।।
খনার লেখাতেও তন্ত্রের কথা পাওয়া যায়। যোগিনী ভ্রমণ সম্বন্ধে খনার বচনে লেখা—
পূ, বা, দ, ঈ, প, অ উনি।
চারি চারি দণ্ডে ফিরে যোগিনী।
ঘোড়ার পৃষ্ঠে দেবী যায়, দক্ষিণে সম্মুখে ধীরে খায়।
খনা যোগিনী সাধন জানলেন কীভাবে? এই কালিকাপুরান কবেকার? এ কি তন্ত্রসাধনের অঙ্গ? প্রসঙ্গতঃ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ষষ্ঠীদাস তন্ত্র সাধক ছিলেন।। তবে কী ষষ্ঠীদাসই খনার নাম ব্যবহার করে শ্লোকগুলো লিখেছেন?
ষষ্ঠীদাসের ভেষজবিদ্যায় জ্ঞান ছিল। উনি লিখেছেন—ঔষধং তস্য বক্ষ্যামি গুহ্যাদ্ গুহ্যতরং প্রিয়ে। যস্য গ্রহণমাত্রন মহাবন্ধ্যা প্রসূয়তে।। ২৪।। ঋতুকালে সমুৎপন্নে ঔষধং দেয়মুচ্যতে। উনি অনেক রোগের ওষুধের প্রস্তুতপ্রণালী ব্যক্ত করেছেন। এর থেকে বুঝতে পারি যে ষষ্ঠীদাস সংস্কৃত শ্লোক লিখতে পারতেন, উনি কঠিন কঠিন বিষয়কে জলের মতো সহজ করে বাংলায় অন্ত্যমিল দিয়ে দুলাইনের পদ্যে তা প্রকাশ করতে পারতেন, উনি গ্রামের মানুষ ছিলেন, তান্ত্রিক ছিলেন বা তন্ত্রসাধনা সম্বন্ধে ওঁর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল, উনি গুহ্য ভেষজ বিদ্যা জানতেন। আমাদের বাঙালি খনার লেখার মধ্যে ঠিক এই গুণগুলিই পাই।
‘তাহলে ষষ্ঠীদাসই কি খনা?’ নমিতা প্রশ্ন করল।
‘না। এখানেই পৃথুযশ তাড়াহুড়া করে ভুলটা করে গেছে। ষষ্ঠীদাস খনাবাক্যের অনুবাদে বাংলা পদ্য লিখেছেন এটা সম্ভব। কিন্তু ষষ্ঠীদাস নিজে খনার উল্লেখ করেছেন। ষষ্ঠীদাসের ঠিক এই উদাহরণগুলো আমার থিসিসে ছিল। কিন্তু পৃথুযশ সবটা নেয়নি, সুবিধামতো কিছু কিছু অংশ ব্যবহার করেছে। এই থিসিস কীভাবে ড. বক্সী পাস করালেন সেটা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি। পৃথুযশ কিছুতেই এই আটপৌরে থিসিস ওর পিএইচডির জন্য লিখবে না। ওর জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি, অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিল পৃথুযশ। হোয়াটেভার। আমি এই থিসিসের ফ্যালাসিগুলো মার্ক করে রাখতে পারি—আমাকে থিসিসটা আজ রাখতে দেবে?’
‘অবশ্যই!’ নমিতা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল। ‘তোমার জন্যই তো এনেছি।’
‘আমি আজ রাতে ভালো করে পড়ব। চা খাবে?’
‘না না আমি উঠব,’ নমিতা উঠল। ‘আমি ‘বেহুলার খনায়’ মজে রয়েছি।’
নমিতা গাড়িতে এসে বসল। গাড়িতে যেতে যেতে নমিতা প্ল্যানটা ছকে ফেলল। বিদ্যাদির থেকে একটা অ্যাপিল অফিসিয়ালি নেবে। তারপর ভাইস চ্যান্সেলারের সঙ্গে কথা বলে ওঁর একটা অ্যাপ্রুভাল নিয়ে একটা কমিটি তৈরি করে বিদ্যাদি আর পৃথুযশের ফাইলগুলোর কপি কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেবে।
নমিতা বাড়ি ফিরে সোফায় হাত পা ছড়িয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। খুব ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু সময় নষ্ট করলে চলবে না। ‘বেহুলার খনা’টা পড়তে হবে। খিদেও পেয়েছে। গা চ্যাটচ্যাট করছে। সন্ধ্যায় স্নান না করে নমিতা খেতে বসতে পারে না। নমিতা বাথরুমে শাওয়ার খুলে শাওয়ারের নীচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। পৃথুযশ ভৌমিক প্লেজারিজমের দোষে দোষী প্রমাণিত হলে পৃথুযশ প্রথমে ওর পিএইচডি ডিগ্রীটা হারাবে, ক্যালিফোর্নিয়ার চাকরিটাও জেনুইন খোয়াবে। কিন্তু বিদ্যাদি ঠিকই বলেছে পৃথুযশ অত মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট, ওর কী দরকার পড়েছিল বিদ্যাদির থেকে টোকার? যাক গে, এখন আর বেশি প্রশ্ন মাথায় নেওয়া যাচ্ছে না, মাথা জ্যাম হয়ে রয়েছে। ইট ওয়াজ আ লং ডে। স্নান সেরে নমিতা ফ্রিজ খুলে মটর পনির আর ভাতের ডেকচিটা বের করল। ঠাণ্ডা ভাতগুলো একে অপরকে জড়িয়ে রয়েছে। ঠাণ্ডা ভাত একটা প্লেটে ঢেলে হাত দিয়ে ভেঙে ভেঙে আলাদা করে তার ওপর ঠাণ্ডায় জমে থাকা পনির-ঝোল ঢেলে মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে দিল নমিতা। একটু পরে মাইক্রোওয়েভ বিপ-বিপ শব্দ করে জানান দিল ডান। বাধ্য যন্ত্রের দরজাটা খুলতেই পনিরের গরম ঘ্রাণ অলফ্যাকটরি লোবে ছড়িয়ে গিয়ে নমিতার খিদেটা জাগিয়ে দিল। প্লেটটা সোফায় এনে খাবারের গ্রাস মুখে তোলার আগে অভ্যাসবশতঃ টিভির রিমোটে চাপ দিল নমিতা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে টিভিটা বন্ধ করে দিল। মিস বসাকের হাতে বেশি সময় নেই। বইটা বার কয়েক পড়তে হতে পারে। ঝোল-ভাতের গ্রাস মুখে তুলল নমিতা।
কোনোমতে গিলে প্লেটটা সিঙ্কে নামিয়ে মুখ ধুয়ে নমিতা বিছানায় চলে গেল, হাতে ‘বেহুলার খনা’। আজ হঠাৎ চোখ গেল দেওয়ালে টাঙানো ওর পুরোনো ফটোতে। পিঠে রুকস্যাক নিয়ে শতদলের পাশে দাঁড়িয়ে। হানিমুনে দু’জনে সিকিমের গোচালা পাসে হাইকিং-এ গেছিল, তার ফটো। শতদল জাইগ্যান্টিক নাস্তিক ছিল। হেসে বলতো আমি মরলে ভগবান আমায় শিওর স্বর্গ থেকে লাথ মেরে নরকে পাঠাবে। আমি তখন দান্তের নাইন সার্কেলস অফ হেল-এ হাইক করবো। লোকটা পাহাড়ে যা হনহন করে হাঁটতো, কে জানে কত নম্বর সার্কেলে ওর সঙ্গে দেখা হবে! দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুম ঘুম চোখে নমিতা বইটা খুলল।
