বিদ্বান বনাম বিদুষী – ২০
।। কুড়ি।।
বাইরে কে এত জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে!
বেহুলার ঘুম ভেঙে গেল। ও ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। দ্রুত মনে পড়ে গেল দুঃস্বপ্নের মতো কেটে যাওয়া গত দু’দিন। এত জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে! বেহুলার হৃৎকম্প হচ্ছে। বংশী লেঠেল না তো? ভয়ে আতঙ্কে বেহুলার শরীর টানটান হয়ে গেল। ঘরের মেঝের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে পাশের মাদুরে বচনপিসি কাঁথা গায়ে মুড়ে কুঁকড়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে।
বেহুলা ঘুমন্ত পিসির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘পিসি, ও পিসি!’
‘উঁ।’
‘বাইরে কেউ জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে।’
‘রাখাল এসেছে দাদার জন্য দুধ নিয়ে, বচনপিসি চোখ না খুলে নিদ্রাচ্ছন্ন কণ্ঠে বলল। ‘মেনিমুখোটা আর সময় পায় না। সকালের মোরগ ডাকার আগেই দুধ দিতে চলে আসে।’
‘আমি দুধটা নিয়ে নিই?’
বচনপিসির ঘুম কেটে গেল। ‘না না, তুমি যেও না বাছা। আমি যাচ্ছি।’ বচনপিসি দরজায় গিয়ে ঘটি হাতে দাঁড়াল। ‘এতক্ষণ ধরে ধাক্কিয়েই চলেছি খোলার নামই নেই। ফিরে যাচ্ছিলাম।’ রাখাল ওড়োং দিয়ে মেপে মেপে বচনপিসির ঘটিতে দুধ দেওয়ার সময় মুখ ঝামটা দিল।
কথা না বাড়িয়ে দুধটা নিয়ে বচনপিসি দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর বেহুলাকে বলল, ‘এখন শরীর কেমন?’
‘ভালো,’ বেহুলা কাঁথাটা জড়িয়ে দরমার দেওয়ালের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসল।
বচনপিসি হাতের তালু বেহুলার কপালে রাখল, ‘এখনো জ্বর আছে। তবে ওষুধে কাজ দিচ্ছে।’
‘ওষুধ?’
‘রাতে তোমার জ্বরটা খুব বেড়েছিল। তুমি বিছানায় ঘুমের মধ্যে খুব ছটফট করছিলে। ঘুমটা ভেঙে গেল, তোমার গায়ে হাত দিয়ে দেখি গা পুড়ে যাচ্ছে। দাদার কাছে দশমূল পাঁচন ছিল। পিদীম জ্বেলে একটু গরম জল করে পাচনসিদ্ধ কোনোরকমে তোমাকে খাইয়ে দিয়েছিলাম। তারপর মাথায় জলপটি দিতে তুমি আরামে ঘুমোলে ‘
‘আমাকে ঘুমের মধ্যে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছ?’ বেহুলার কান্না পেয়ে গেল। এত কোমলহৃদয়া! এরা তো তার সম্পূর্ণ অপরিচিত। অথচ অতদিনের পরিচিত মানুষগুলো ওকে জ্বালিয়ে দিতে গেছিল।
‘খিদে পেয়েছে?’ বচনপিসির সহানুভূতির গলা।
‘বারবার পিপাসা পাচ্ছে খুব।’
‘আজ তোমায় নিমছাল আর মিছরির গুঁড়োর জল বারবার খাওয়াব, পিপাসা কেটে যাবে। দাঁড়াও তোমাকে একটু দুধ গরম করে খৈ দিয়ে দিই। খেলে শরীরে বল পাবে।’
‘কিন্তু ওটা তো গণককাকার জন্য ‘
‘সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন তোমার শরীরে শক্তি দরকার।’
বিশ্বনাথদের বাড়িতে দুটো ঘর আর হাঁড়িশাল। হেঁশেলের একপাশে ধান কুটবার জন্য একটা ঢেঁকি আর সেই ধান সিদ্ধ করার একটা উনান। ঢেঁকির পাশে একটা বড় বেতের ধামা ভর্তি কাপাস তুলো, তার ওপর একটা বোয়াল মাছের চোয়ালের দাঁতের চিরুনি। পাশে একটা তুলো ভর্তি ছালা, ভিতরে মাটি, পাতা মেশানো নোংরা-তুলো।
বচনপিসি উনান জ্বালাল, ঘর ধোঁয়ায় ভরে গেল। গরম দুধ গলা দিয়ে নামার সময় খুব আরাম পেল বেহুলা। খৈ-দুধ একবাটি খেতেই দু’চোখ আবার ঘুমে জুড়ে এল।
‘তুমি ঘুমোও। যতক্ষণ শরীর ঘুম চায় ঘুমোও।’
‘ভয় লাগছে।’
‘একদম ভয় পেয়ো না,’ বচনপিসি মেঝেতে শোয়ানো আঁশবটিটা তুলল। ‘কেউ তোমাকে এখানে ছুঁতে পারবে না।’
বেহুলার মনে হলো সে এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে এসেছে। বেহুলা ঘরে এসে আবার কাঁথা মুড়ে শুয়ে পড়ল। ভেবেছিল আবার ঘুম নেমে আসবে দু’চোখে, কিন্তু তা এল না। ভয় একটু কেটেছে, এবার স্বামীর মৃত্যুর দুর্বিসহ শোক বেহুলাকে কাতর করে তুলল। বেহুলা কাঁথা মুড়ি দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বচনপিসি এগিয়ে এসে কাঁথার উপর দিয়ে বেহুলার কাঁধে হাত রাখল। দুঃখ মানুষের সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা বাড়িয়ে দেয়। ‘কান্নার জন্য সমস্ত জীবন পাবি। এখন একটু ঘুমোবার চেষ্টা কর।’ বেহুলা চোখ মুছল, শরীর খুব ক্লান্ত। ধীরে ধীরে বেহুলার দু’চোখে ঘুম নেমে এল।
বেহুলার যখন ঘুম ভাঙল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। শরীরটা এখন ঝরঝরে লাগছে। সকালের দিকে মাঝে-মাঝে ওর ঘুম ভেঙেছে, কিছু কিছু কথা শ্রুতিগোচর হয়েছে, কিন্তু পরক্ষণেই ও ঘুমিয়ে পড়েছে। বেহুলা উঠে বসল। ঘরের কোণে উগারে অনেক কিছু জড়ো করে রাখা হয়েছে মালসা-পাতিল, চাল, আলু, কোরা কাপড়।
‘এসব কী, পিসি?’
বিশে গ্রামে গিয়ে তোর হবিষ্যির চাল, আলু, মালসা, কাপড় সব কিনে আনল। তোর বাপ মা কাছে নেই, তাই আমাদেরই তো শ্রাদ্ধ শান্তি আচার আচরণ করাতে হবে।’
বেহুলার মনে হলো এরা পূর্বজন্মে ওর কেউ বড় কাছের মানুষ ছিল। পাখমারা গণকের পরিবার বেহুলার বৈধব্যের প্রাথমিক আচারগুলি সম্পন্ন করালো। হিন্দু বিধবারা পাড় দেওয়া শাড়ি পরে না, মাথার চুল বাঁধে না, হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর রাখে না। বেহুলা সাদা থান পরল, হাত খালি হল, কিন্তু বেহুলার মাথা ভর্তি চুল কাটার ব্যাপারে বেহুলা বেঁকে বসল। বেহুলা বলল, ‘আমি মাথার চুল কেটে ফেলব না। সহমরণ যখন মানিনি তখন এটাও আমি মানি না।’
‘একশো বার,’ বচনপিসি পূর্ণ সমর্থন জানাল। ‘শাঁখা শাড়ি কেশ, তিনে নারীর বেশ। তুই বেধবা হয়ে শাঁখা শাড়ি ছেড়েছিস এটাই অনেক। লোম ছাঁটা ভেড়া হয়ে ঘুরবি না। তোকে যদি তোর গ্রামের জমিদার ধরতে আসে তখন তোকে আবার মা কালী হয়ে পালাতে গেলে চুল না থাকলে কালী সাজবি কীভাবে?’
পরদিন পাখমারা গণকের বাড়ি বেহুলা ওর স্বামীর শ্রাদ্ধ করল। পাখমারা গণক শ্রাদ্ধের মন্ত্র পড়ল। বেহুলা ওর সঙ্গে রাখা কড়ি দক্ষিণা দিল। দক্ষিণা নিয়ে গণক বলল, ‘এই কড়িগুলো তোমার কাছেই থাক। যদি কেউ তোমার আসল পরিচয় জানতে পেরে যায় আর তোমার পালাবার দরকার পড়ে তখন এই কড়ি অনেক কাজে লাগবে।’
বচনপিসির শুশ্রূষায় ক’দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে বেহুলার শরীরে শক্তি ফিরে এল। পিসি দু’বেলা ঘৃতকুমারী পাতার শাঁস বেটে বেহুলার হাতের তালুতে লাগিয়ে লাগিয়ে তালুর ক্ষত শুকিয়ে তুলল। পিসি বলল, ‘দ্যাখ বেহুলা, তুই ক’টা দিন একদম ঘরের ভিতর লুকিয়ে থাক। ভোরে পগার পেরিয়ে যাবি না, অনেক সময় বাঘ-ফেউ চলে আসে। বাড়ির পাতকুয়োতে চান সারবি, পুকুর ঘাটে একদম যাসনে। ওখানে বৌ-ঝিরা অনেক রকম প্রশ্ন করে নাভির থেকে কথা বের করে আনে। আর একটা কথা। এখানে খুব বড় হাট বসে। হাটে ভালো-মন্দ লোকজন আসে। এ বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করে। একদম বাইরে উঁকিঝুকি দিবি না।’
উকিঝুঁকি! বেহুলার মনের মধ্যে ভয় এমন জাঁকিয়ে বসে আছে যে বেহুলা সারাক্ষণ সম্রস্ত হয়ে আছে। বেহুলার শরীরের কথা ভেবে বিশ্বনাথ কয়েকদিন বাড়িতে থেকে গেল। কাল ও কৃষ্ণনগরের খেয়া ধরবে। লোকসান হল অনেক, তবু এখনো যা উপার্জন হয়। বেহুলাকে বিশ্বনাথ বোঝাল যে কাপাসডাঙার মাঠ পেরিয়ে এদিকটাতে গ্রামের লোকজন কদাচিৎ আসে, সুতরাং এ বাড়িতে অজ্ঞাতবাসে থাকলে বেহুলার ভয়ের কিছু নেই। তবু বেহুলার মন থেকে আতঙ্ক যায় না। রাতে হঠাৎ বেহুলা ঘুমের মধ্যে গোঁ-গোঁ করে চিৎকার করে উঠল বচনপিসি তাড়াতাড়ি জেগে উঠে বেহুলার বুক থেকে হাত সরিয়ে দিল। বেহুলা মাদুরের ওপর উঠে বসল।
‘বোবায় ধরেছে। ভয়ের স্বপ্ন দেখছিলি?’
‘আমি দেখলাম বংশী লেঠেল আমায় তুলে নিয়ে চিতায় ছুঁড়ে মারল। আর চিতার আগুনে আমার শরীর দাউ দাউ করে জ্বলছে। আমি আর্তনাদ করছি।’
বচনপিসি উঠে পিদিম জ্বালাল। তারপর ঘরের কোণে গিয়ে জালা থেকে জল নিয়ে এসে দিল—‘খা।’
বেহুলা ঢকঢক করে জল শেষ করল। তারপর কাপড় দিয়ে মুখ মুছে বলল– ‘ওরা যদি খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে আসে তবে? আমি কোথায় লুকোবো?’
‘এখন ঘুমো।’
‘আমার অন্ধকারে ভীষণ ভয় করছে পিসি।’
‘ঠিক আছে। পিদিমের পলতেটা ছোট করে শুয়ে পড়।’
বেহুলা প্রদীপের তেলের ভিতর সলতে টেনে দিল। প্রদীপের আলো কমে ঘরের ভিতরে আবছায়া বেড়ে গেল। বেহুলা আর বচনপিসির কথাবার্তা পাশের ঘর থেকে শুনে বিশ্বনাথ উঠে এল। বিশ্বনাথ বলল, ‘পিসি আমি তো কাল চলে যাব। কিন্তু বেহুলার জন্য এমন একখানা লুকোবার জায়গা দেখতে হবে যাতে সত্যি সত্যি যদি বিপদ আসে তবে বেহুলা যেন গা ঢাকা দিতে পারে।’
‘সেরকম জায়গা আমাদের এগাঁয়ে কোথায় আছে?’ বচনপিসি উঠে বসল। ‘পর্তুগিজ কেল্লা?’
‘না। জিভকাটির মন্দির,’ পাশের ঘর থেকে এবার পাখমারা গণকের গলা ভেসে এল। ‘ওটাই বেহুলার জন্য সুরক্ষিত স্থান। ওই মন্দিরে বেহুলার কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। বিশে, কাল সকালে বেহুলাকে একবার মন্দিরটা দেখিয়ে নিয়ে আয়।’
‘সেটা ভালো বলেছ দাদা,’ বচনপিসি সায় দিল। ‘জিভকাটির মন্দিরে কেউ ওকে খুঁজতেই যাবে না।’
‘কেন?’ বেহুলা জিজ্ঞাসা করল।
‘কাল বলব। এখন ঘুমোবার চেষ্টা কর। একটু পরেই আকাশ ফর্সা হয়ে যাবে।’
রাত পোহাতেই বিশ্বনাথ উঠে পড়ল। পাশের ঘরে আওয়াজ শুনে বেহুলাও উঠে দাওয়ায় এল।
‘চলো তোমায় জিভকাটির মন্দির দেখিয়ে আনি,’ বিশ্বনাথ আঁচঘর থেকে কাপড় জড়ানো তেল মাখানো একটা মশাল নিয়ে এল। তারপর উঠোন থেকে তার শিবের ত্রিশূল হাতে নিয়ে আগড় খুলল।
বেহুলা বিশ্বনাথের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল। সবে মাত্র রাত্রির অবসান হয়েছে, বাইরে শীতের সকালের ঠাণ্ডা, আকাশে শুকতারা জ্বলজ্বল করছে। বেহুলা আলোয়ানটা গায়ে মাথায় ভালোভাবে জড়িয়ে নিল। জ্বরের পর শরীর এখনো দুর্বল। বিশ্বনাথ লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছে। তাল রেখে হাঁটতে গিয়ে হাঁফ ধরে যাচ্ছে বেহুলার। বিশাল মাঠ চোরকাঁটায় ভরে গেছে। তার মধ্যে দিয়ে চলতে গিয়ে শাড়ির পাড়ে, নীচের দিকে ভেজা চোরকাঁটা আটকে যাচ্ছে।
‘এত বড় মাঠে ধানচাষ হয় না?’
‘আমি কখনো দেখিনি। এটা একটা খিল। চাষের অযোগ্য জমি। মৌসুমী ঘাস, আগাছা আর শুধু ছোট ছোট বুনো ঝোপে ভরা। মাঠ এমনি পড়ে থাকে। এই মাঠের ধার দিয়ে মাঠের চারদিক ঘিরে মাসে দু’দিন খুব বড় হাট বসে।’
মাঠ পেরিয়ে জঙ্গল। জঙ্গলে ঢোকার আগে নারকেল গাছের সারি, তারপর নীচু জলা পেরিয়ে ঘন গজারি গাছের জঙ্গল, তার গায়ে লতানে গাছ গজিয়ে গেছে। এত উঁচু সব গাছ যে সূর্যের আলো ঢুকতে না পেরে আবছায়া আঁধারের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বনাথ ত্রিশূল মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে জঙ্গলে ঢুকল। পায়ের নীচে স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে পচা পাতার উগ্র গন্ধ। বিদ্যাধরীর খাল গভীর জঙ্গল চিরে ঘন অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। ‘এই খালে কিন্তু কুমির রোদ পোহায়, বোঝা যায় না, কাঠের গুঁড়ির মতো লাগে, সাবধানে চলাফেরা করতে হয়, বিশ্বনাথ সাবধান করল। বেহুলা মাটিতে পড়ে থাকা একটা শিশির ভেজা এড়ো তুলে নিল। জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা উঁচু ঢিপি। ঢিপির ওপরেও বড় বড় গাছের ঘন জঙ্গল। ‘জিভকাটির জঙ্গল, তাই লোকে জিভকাটির মন্দির বলে,’ বিশ্বনাথ বলল।
‘জিভকাটি? সে কোন দেবতা?’
‘জানি না। কেউ বলে খনার জিভ নাকি এই জঙ্গলেই কাটা হয়েছিল। তাই জিভকাটি। কেউ বলে সাপেদের জিভ কাটা থাকে, একসময় হয়তো সাপেদের দেবতা মনসার পুজো হতো এখানে। আমি অবশ্য নিজের চোখে দেখেছি মনসা পুজোর দিন গ্রামের লোকেদের ঢিপির পাশে দুধ-কলা রেখে আসতে।’ বিশ্বনাথ দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ ত্রিশূল দিয়ে মাটিতে আঘাত করল।
‘ত্রিশূল ঠুকছো কেন?’
‘সাপ থাকলে সরে যাবে,’ বিশ্বনাথ ঢিপিটাতে চড়া আরম্ভ করল। টিপিতে অজস্র ঝোপঝাড় গাছপালার ঠাসবুনোট, বিশ্বনাথ ঝুঁকে পড়া ডালপালা ত্রিশূল দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে ঢিপিতে কিছুটা চড়ে একটা জায়গায় কয়েকটা ঘন গাছপাতা সরাতেই একটা ভগ্ন ইঁটের দেওয়াল আত্মপ্রকাশ করল। দেওয়ালের জায়গায় জায়গায় ফাটল।
‘গ্রামের লোকেরা এদিক ভুলেও মাড়ায় না।’
‘কেন?’
‘প্রথমত সাপের ভয় আর দ্বিতীয়ত গ্রামের লোকেরা ভাবে জায়গাটা অভিশপ্ত।’
‘অভিশপ্ত!’
‘হ্যাঁ। একবার বারাণসী থেকে কিছু গ্রহবিপ্র এসে এই মন্দির ভাঙবার চেষ্টা করেছিল। প্রায় সকলেই নাকি সাপের কামড়ে মারা গেছিল। গাঁয়ের আরো কয়েকজনকে এখানে সাপে কেটেছে। তারপর থেকে গ্রামের লোকেরা জিভকাটির ঢিপির ধারে কাছে আসে না। এদিকে,’ বিশ্বনাথ ফাটলের একদিকে দেখাল। ‘দাঁড়াও, এগুলো ধরো তো। মশালটা জ্বালি। ভিতরে একদম অন্ধকার।’ বিশ্বনাথ চকমকি ঘষে মশাল জ্বালাবার চেষ্টা করছিল, তখন বেহুলা বলল ‘ঢিপির ওদিকটা দেখি?’
‘না না! খবরদার! এই ঢিপির ওই পিছনের দিকে কক্ষনো পা রেখো না। ওখানে ঢিপির ফাটা মাটিতে গর্তে অনেক গোখরোর বাসা। সাপগুলো এদিকে ও চলে আসে। এটা গ্রামের অনেকেই জানে। সেজন্য ওই ঢিপির কাছাকাছি কেউ আসে না। ওদিকে কক্ষনো যাবে না। বুঝেছ?’
বেহুলা মাথা নাড়লো। বিশ্বনাথ মশাল জ্বালালো ‘চল, তোমায় ভিতরটা তাড়াতাড়ি দেখিয়ে আনি। কেউ দেখে ফেলার আগে আমরা ফিরে যাবো।’ বিশ্বনাথ জ্বলন্ত মশাল নিয়ে দেওয়ালের ফাটলের ফাঁক দিয়ে মন্দিরের ভিতর ঢুকল। মশালের আলোয় ভিতরে অন্ধকার কিছুটা কেটে একটা আলো-আঁধারি পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বেহুলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। অন্ধকারের গর্ভে একটা বিশাল মন্দির! বেহুলা ঘাড় ঘুরিয়ে বিস্ময়ে দেখতে লাগল। ছাদ ভেঙে ইট-পাথর ছড়িয়ে রয়েছে এদিক ওদিক। সামনে একটা বিশাল উঁচু চাতাল। চারপাশে দেওয়াল অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দেওয়ালের চাঙড় খসে খসে পড়েছে। যেটুকু দেওয়াল এখনও অক্ষত সেদিকে তাকিয়ে বেহুলা স্তম্ভিত … ‘অবিশ্বাস্য!’ বিশ্বনাথের হাত থেকে মশালটা নিয়ে বেহুলা দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেল।
বিশ্বনাথ বেহুলার পিছন পিছন এসে বলল, ‘দেওয়ালে কেউ নানা দেবতার চিত্র এঁকেছিল। এদের আমি চিনি না। বাবা চেনে।’
বেহুলার মনে হলো এই স্থান তার খুব চেনা। এক সময়ে সে এখানে রোজ আসতো। ‘আমি চিনি এঁদের, বেহুলা মশাল নিয়ে দেওয়ালের পাশে এসে দাঁড়াল। ‘ইনি পদ্মাসনে সূর্যদেব বা রবি। এঁর বর্ণ পদ্মগর্ভতুল্য। ইনি দ্বিভুজ এক হাতে পদ্ম, অন্য হাতে সপ্ত অশ্বের রাশ টেনে রেখেছেন সপ্ত রজ্জু দিয়ে।’ বেহুলা পাশের মূর্তির দিকে এগিয়ে গেল—‘ইনি চন্দ্র, এঁর শ্বেত বৰ্ণ, শুভ্ৰ বস্ত্ৰ পরে ইনি শ্বেত অশ্বারূঢ়। এঁর এক হাতে গদা, অন্য হাতে বরদান করছেন। গদাটা দেওয়াল থেকে খসে গেছে, শুধু গদার হাতলটা ধরে আছেন চন্দ্ৰ।’ বেহুলা মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাশের দেওয়াল চিত্রের দিকে এগিয়ে গেল। মশাল উঁচু করে ধরে বলল, ‘ইনি মঙ্গল। লালখড়ি দিয়ে এঁর রক্তমালা আর রক্তবস্ত্র রঙ করা হয়েছিল। এই রক্তবর্ণ জায়াগায় জায়গায় খসে গেছে। ইনি চতুর্ভূজ। এঁর তিন হাতে শক্তি, শূল, গদা, আর চতুর্থ হাতে বরাভয় ভঙ্গি।’
বিশ্বনাথের দৃষ্টিতে বিস্ময়। একটা সাধারণ গ্রাম্য মেয়ে এমন পণ্ডিতের মতো দেওয়াল চিত্রে ঈশ্বরমূর্তি সনাক্ত করতে পারে, এ বিশ্বনাথের বিশ্বাসের বাইরে। বিশ্বনাথ সম্ভ্রমের সঙ্গে বলল, ‘তুমি তো প্রচুর পড়াশোনা জানো দেখছি। আমি তো এঁদের কাউকেই চিনি না।’
‘এই যে বড় চাতাল, আমার মনে হচ্ছে এই স্থানে এক সময় জ্যোতিষচর্চা হতো।’
‘এখানে কত বছর ধরে মানুষ আসে না। তুমি জানলে কীভাবে যে এখানে জ্যোতিষচর্চা হতো?’ বিশ্বনাথ বলল।
বেহুলা বিশ্বনাথের কথায় আমল না দিয়ে দেওয়ালের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘ইনি বুধ দেবতা। পীতমাল্য ও পীতবস্ত্রধারী, সিংহবাহন, কর্ণিকার তুল্য এঁর বর্ণ। ইনি চতুর্ভূজ—খড়্গা, চর্ম, গদা এর তিন হাতে, চতুর্থ হাতে বরাভয় মুদ্রা। ইনি পীতবর্ণ চতুর্ভূজ বৃহস্পতি। চার হাতে দণ্ড, বর, জপমালা ও কমণ্ডলু। ইনি শ্বেতবর্ণ শুক্র, ইনি ইন্দ্রনীলবর্ণ গৃধবাহন শনি।’
বিশ্বনাথ পাশের চিত্র দেখিয়ে বলল, ‘এনার শরীর বোধহয় দেওয়াল থেকে খসে গেছে। শুধু মাথা আছে।’
‘ইনি রাহু। এঁর মস্তক ছাড়া অন্য কোনো অঙ্গ নেই। আর ইনি ধূম্রবর্ণ কেতু,’ বেহুলা গোটা দেওয়াল প্রদক্ষিণ করে আবার দরজার কাছে ফিরে এল। ‘এটা প্রাচীনকালের এক জ্যোতিষ-মন্দির ছিল।’ বেহুলা মন্দিরের ছাদের দিকে তাকাল। ছাদ ধসে গেছে জায়গায় জায়গায়। ‘এই মন্দিরের ছাদে রাশি—নক্ষত্র আঁকা ছিল।’
বিশ্বনাথের দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ওকে খেয়া ধরতে হবে, একটু গোছগাছ বাকি আছে। তাই বিশ্বনাথ তাড়া লাগাল। দু’জনে দ্রুতপায়ে বাড়ি ফিরে এল। পাখমারা গণক দাওয়ায় বসে মুড়ি খাচ্ছিল, বিশ্বনাথকে বলল মন্দিরের ভিতরটা একে দেখিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ। বেহুলা তো দেওয়ালের ছবি দেখে শনি, রবি, সোম, মঙ্গল সব এক এক করে চিনিয়ে দিল।’
পাখমারা গণকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গণক বেহুলাকে বলল, ‘তোমার জিভ ছোটবেলা কেটে গেছিল?’
বেহুলা বলল, ‘না ওটা আমার জন্ম দাগ।’
বিশ্বনাথ তাড়া দিল পিসিকে–‘পিসি তাড়াতাড়ি খেতে দাও, খেয়ার সময় হয়ে এল প্রায়।’
খেয়ে উঠে বিশ্বনাথ ওর তল্পি দেখে নিল। সঙ্গে আছে বহুরূপীর নানা মুখোশ—হনুমান, শিব, বাঘ, কৃষ্ণঠাকুর, তারকা রাক্ষসী। কী ভেবে এবার ও মাকালীর জিভ, খাঁড়া, রক্তবর্ণা শাড়ি বেহুলাকে দিয়ে বলল, ‘এটা যত্ন করে রেখো। আবার যদি পালাতে হয় তখন কাজে লাগবে।’
গণকঠাকুর আর বচনপিসিকে প্রণাম করে বিশ্বনাথ তল্পি কাঁধে তুলল। বিশ্বনাথের কাঁধে একটা বাঁশের দু’দিকে দুটো কাপড়ের ঝোলা। হাতে টিনের বাক্স তাতে মুখোশ, খুনরং, হরিতাল, আঠা, টিপ, গুঁড়ো রঙ, ভুষো কালি, খড়ি, নীল, নকল জটা, আর শিবের ডুগডুগি।
তুলসীতলায় প্রণাম করে বেরোবার সময় বিশ্বনাথ দরজায় দাঁড়িয়ে একবার পিছন ফিরে তাকাল। মুখে করুণ হাসি। বেহুলার মনে হচ্ছে লোকটা কেউ নয় তার, কিন্তু কেমন আত্মীয়তা জন্মে গেছে। বিশ্বনাথ যখন ‘আসি। সাবধানে থেকো,’ বলে বেরোচ্ছিল তখন বেহুলার চোখ ছলছল করছিল। ‘তুমি গত জন্মে নিশ্চয়ই আমার আপন দাদা ছিলে,’ বেহুলা বলল।
‘গত জন্মের হিসেব বাবা ভালো বোঝে,’ বিশ্বনাথ হাসল। ‘আমার এজন্মের বাবাকে দেখো। আর চিন্তা কোরো না।’
বচনপিসি ওর সঙ্গে নদীর পাড় পর্যন্ত গেল। বেহুলার ইচ্ছা করলেও উপায় ছিল না। কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। বচনপিসি অনেকক্ষণ পাড়ে দাঁড়িয়ে রইল। নৌকা ক্রমশ ছোট হতে হতে নদীর বাঁকে হারিয়ে গেল। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরে এসে বচনপিসি বেহুলার কাছে দরজার চৌকাঠে এসে বসল। ‘নদীর দিকে যেতে ইচ্ছা করে না। তাঁতিপাড়াটা একদম শ্মশান! বচনপিসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
পাখমারা গণক কাশতে কাশতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল—‘খেয়া ছেড়েছে?’
‘হ্যাঁ,’ বচনপিসি বলল। মনটা বড় খালি খালি লাগে গো দাদা।’
‘সব কপাল,’ পাখমারা গণক আবার ঘরে চলে গেল। ‘তোকে তোর কপাল আমাদের সঙ্গে এই কষ্টে আটকে রেখেছে,’ ঘরের ভিতর থেকে বাকি কথাটা বলল গণক।
বেহুলা বচনপিসির পাশে এসে বসল—‘বিশেদাদা বড় ভালোমানুষ। তোমার মতই ভালো, পিসি।’
‘ওর মাও খুব ভালো ছিল,’ বচনপিসি বলল। ‘আমি ওর মায়ের আঁতুড়ের দাই ছিলাম। বিশেকে জন্ম দিতে গিয়ে ওর মা মারা গেল। ছেলেটাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হল। কী মায়াবী চোখের দৃষ্টি! আমার কোল থেকে নামলেই কাঁদতে থাকত, কোলে তুলে নিলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতো। ও ভাবতো আমিই ওর মা। আমি জানিস আর ওকে কোল থেকে নামাতে পারলাম না। ওর বাবাকে দেখাশোনারও কেউ নেই, আমিও একটা থাকবার স্থায়ী জায়গা খুঁজছিলাম। আমি তোর গণককাকাকে আমার ধর্ম ভাই পাতালাম। সেই থেকে এ বাড়িতেই থেকে গেলাম। প্রবচনী দাই থেকে বিশের বচনপিসি হয়ে। বিশেকে আমিই কোলেপিঠে করে বড় করেছি।’
‘গণককাকার শরীর খুব ভেঙে গেছে পিসি।’
‘জমিদারবাবু দাদার জ্যোতিষচর্চা বন্ধ করার আদেশ দিলেন, তাতেই দাদার শরীর আর মন ভেঙে গেল,’ বচনপিসি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘জমিদার কেন এরকম আদেশ দিলেন?’
‘ডিঙাডুবিতে সত্যাচার্য নামে এক জ্যোতিষী এল। ও এসে জমিদারকে এমন বশ করে নিলো যে জমিদার ওর কথায় ওঠে বসে।’
‘এ তো ভারি অন্যায়। খুব বড় জ্যোতিষী বুঝি?’
‘শুনেছি তো তাই। এখন ডিঙাডুবিতে ওর খুব প্রতিপত্তি। বয়স কালে কী যে বিপত্তি এসে জুটল দাদার কপালে!’ বচনপিসি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল। ‘অদৃষ্টে করলা ভাতে, পড়ল বীচি বুড়োর পাতে।’
.
দিন এগিয়ে চলল। গোটা সপ্তাহ ভয়ে ভয়ে কাটিয়ে দিল বেহুলা। সারাদিন ঘরে। সকালে বেহুলা বচনপিসির হেঁসেলে ব্যাঞ্জন কাটা, পাক করা, নানা গৃহকর্মে সাহায্য করত। বেড়ার গায়ে লাউমাচাতে লাউ ঝুলছে। বচনপিসি বলল, ‘বেহুলা একটা কচি দেখে লাউ কেটে আন তো,’ বেহুলা কাটারি দিয়ে লাউ কাটতে গিয়ে লাউফুলে সোনাপোকা দেখে দাঁড়িয়ে গেল। এক নিমেষে মনটা বিদ্যাধরীর ভাটার টানে ধুলসাতে গিয়ে ঠেকল। লখা লাউফুলের বড়া খেতে খুব ভালোবাসত। আর ওদের লাউ-মাচানে এরকম অনেক সোনাপোকা উড়ত। দীর্ঘশ্বাস বেরোবার সময় বেহুলার বুকটা খালি করে দিল। বেহুলা লাউ-মাচানে ঝুলন্ত কচি লাউ কেটে বটিতে কুটে বচনপিসিকে দিল। বচনপিসি লাউ দিয়ে মুগের ডাল বানাল। কখনো বেহুলা নিজেও চড়চড়ি রেঁধে দিল। সোনামুখ ডাল রাঁধছে বচনপিসি, বেহুলা হলুদ বাটা এগিয়ে দিল। বচনপিসি হেসে বলল, সোনামুগ ডালে হলুদের দরকার নেই রে মেয়ে, সোনামুগ ডালে একটু দুধ দিতে হয়। এভাবেই হাঁড়িশালে কাঠের উনান, মাটির হাঁড়ি, মাটির খুরি, কাঠের হাতায় ব্যঞ্জন রাঁধতে রাঁধতে বচনপিসি যে গল্প করত তা শুনতে শুনতে বেহুলার দিন কাটত। এভাবে পাখমারা গণকের পরিবারে বচনপিসির মাতৃস্নেহে বেহুলার দৈনন্দিন জীবন প্রবাহ বয়ে চলল।
পাখমারা গণকের বাড়ি গ্রামের বাইরে হওয়ার দরুন কেউই আসত না। কিন্তু তবু এক একদিন কেউ কেউ আসত। সেদিন বাইরে পুরুষের গলা শুনে বেহুলার বুক ধড়াস করে উঠল। ভয়ে মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল—বংশী লেঠেল না তো? বেহুলা ঘরের দুয়ারের পিছনে লুকিয়ে রইল, হাতে দরজার ভারি খিল।
বচনপিসি দরজা খুলল।
বাইরে গামছার কৌপীন আঁটা একজন কৈবর্ত জেলে—‘বিদ্যেধরীতে পাঙাস উঠেছে। চাই কিনা? একটা কড়ি পেলেই দিয়ে যাব।’
‘দাঁড়াও আসছি,’ বচনপিসি ঘরে ফিরে এসে কুলুঙ্গি থেকে কড়ি হাতে নিয়ে বেহুলাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে দরজা খুলে জেলেকে বলল—‘না, আজ নেব না।’
পিসি দরজা বন্ধ করে উঠোনে এল। বেহুলা বুঝল। বচনপিসিকে বলল, ‘গণককাকার শরীরে রক্ত হওয়া দরকার, পিসি। আর তুমিও তো বিধবা না। আমার জন্য তোমরা মাছ খাওয়া বন্ধ করে দিলে আমি খুব রাগ করব।’
বচনপিসি বেহুলার চোখের দিকে তাকাল, বেহুলার দৃষ্টিতে কাতর অনুরোধ। বচনপিসি দরজার হুড়কো খুলে জেলেকে চেঁচিয়ে ডাকল।
এভাবে ঘরের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রেখে বেহুলা দিন কাটাতে লাগল। সারাদিন ঘরের কাজ করে মনটাকে ব্যস্ত রাখত। বেহুলার শুশ্রূষায় পাখমারা গণকের শরীর একটু একটু করে সারতে লাগল। গণক-ঠাকুরের হাড়সর্বস্ব আদুল গায়ের চামড়া ফেটে ফেটে গেছে, সেদিকে তাকিয়ে বেহুলা বচনপিসিকে ফিসফিস করে বলল, ‘কাকাকে ভালো করে সর্ষের তেল মাখিয়ে দেব?’ গণক- ঠাকুর না না করেও বচনপিসির ধমকে রাজি হল। বেহুলা তারপর থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ গণককাকাকে তেল মাখিয়ে দিয়ে, রোদ্দুর খাইয়ে, কুয়োর পাড়ে জলচৌকিতে বসিয়ে স্নান করিয়ে দিত। তারপর খাইয়ে মানুষটাকে বিছানায় পৌঁছে দিত। এভাবে ভালোবাসা পেয়ে পাখমারা গণকের চেহারায় একজন তৃপ্ত মানুষ আত্মপ্রকাশ করল। বাড়িতে অনেক পুঁথি। সকালে বৃদ্ধের প্রাতরাশ শেষ হলে বেহুলা কখনো চৈতন্যভাগবত, কখনো বিদগ্ধমাধব বা চৈতন্যচরিতামৃত পাঠ করত, আর তা শুনে মুগ্ধ বৃদ্ধের মুখমণ্ডল আনন্দে দ্যোতিত হয়ে উঠত, নিমীলিত চোখ প্রেমাশ্রুবর্ষণ করে চলত। তারপর বেলা হলে বেহুলা বচনপিসির মাথার চুলে নারকল তেল মাখিয়ে কাঁকুই দিয়ে চুল আঁচড়ে দিত। স্নানের পর দু’জনে একসঙ্গে খেতে বসত। খেতে খেতে একদিন বচনপিসি বলল—‘বেহুলা, তুই যখন চলে যাবি তখন আমরা এই বুড়ো ভাই-বোন আবার খুব একলা হয়ে যাব।’
‘আমি কোথায় যাবো পিসি? আমার তো যাবার কোনো জায়গাই নেই। আমার খুব ভয় করে পিসি। রোজ ভাবি বংশী লেঠেল আমায় ধরতে পারলে আমার ওপর কী অত্যাচার করবে।’
‘কিন্তু এভাবে আতঙ্কে আতঙ্কে কতদিন থাকবি রে তুই মেয়ে?’ বচনপিসি বলল। ‘তোকে এবার ধীরে ধীরে লোকের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করতে হবে। তাহলে ভয়টা কেটে যাবে। আজ প্রায় দু’মাস হতে চলল। তোকে ওরা ধরতে এলে এতদিনে এসে যেত।’
বেহুলা একদিন বলল, ‘পিসি, আমি ভাবছি গণককাকার জ্যোতিষ-মন্দিরটা পরিষ্কার করে দিই? কাকা ওখানে রোজ কিছুক্ষণ বসে লোকের কোষ্ঠীগুলো না হয় একা একাই নাড়াচাড়া করুক। ওতে ওঁর মন ভালো থাকবে।
‘ঠিক বলেছিস,’ প্রস্তাবটা বচনপিসির পছন্দ হল। ‘দাদা বাড়িতে কাজ না করে করে খিটখিটে হয়ে গেছে। আজকাল কথায় কথায় রেগে যায়। কথায় বলে অকেজোর তিন কাজ বড়, ভোজন ক্রোধ নিদ্রা দড়। কোষ্ঠী নাড়াচাড়া করলে সত্যি দাদা ভালো থাকবে। চল আমিও যাই তোর সঙ্গে, বচনপিসি বলল। ‘পুরোনো পুঁথিগুলো উঁইপোকায় কাটছে। তুই একটু ঝেড়ে ঝুড়ে রোদ্দুরে মেলে দে পুঁথিগুলো।’
এ-কথাটা পাখমারা গণকেরও পছন্দ হল। অনেক বছরের পরিশ্রম। কত লোক দূর-দূরান্তরের সব গ্রাম থেকে আসত কোষ্ঠী করাতে, তাদের কোষ্ঠী এখানে রাখা। কত সম্ভ্রম করত লোকে। তাদের কেউ কেউ হয়তো ইহলীলা সাঙ্গ করে পরপারে চলে গেছে। ‘বাকি সকলের কোষ্ঠী ফেরত দেবার ব্যবস্থা করব,’ গণক বলল।
‘তা কেন?’ বেহুলা বলল। ‘বরং ওদের কোষ্ঠী আরেকবার বিচার করে দেখ। যদি কারোর কোনো ফাঁড়া থাকে তবে তা গোপনে জানিয়ে দিতে পারলে লোকের উপকার হয়।
‘কথাটা মন্দ বলিসনি মা, পাখমারা গণক বলল। ‘চল দেখা তো যাক কী অবস্থায় আছে কোষ্ঠীগুলো।’
বেহুলা বচনপিসির সঙ্গে এসে শাড়ি গাছকোমরে বেঁধে কাটারি দিয়ে ভেরেণ্ডা আর শিয়ালকাঁটার জঙ্গল সাফ করে চতুষ্পাঠীর হুড়কো খুলল। ঘরের ভিতর ভ্যাপসা গন্ধ। আধো অন্ধকারে দেখা গেল মাকড়সার বিশাল বিশাল জাল, জালে মাছি আটকে আছে। একটা ইঁদুর বিরক্ত হয়ে ছোটাছুটি করে তারপর এক লাফে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে বনতুলসীর ঝোপের দিকে ছুটল। বেহুলা জানলা খুলে দিল। ঘর আলোকিত হল, বাইরে থেকে তাজা বাতাস এল। অজস্র পুঁথি-কাগজ-কোষ্ঠীতে অব্যবহারে ধুলো জমে গেছে। ঘরের কোণায় একটা চরকা, পাশে ধামা। বেহুলা মাথায় গামছা বেঁধে বচনপিসির সহায়তায় সব পুঁথি- কাগজ চালের বাতার থেকে মাটির মেঝেতে নামিয়ে নামিয়ে রাখল। ততক্ষণে পাখমারা গণক এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়।
‘একেক গ্রামের কোষ্ঠী একেক জায়গায় জড়ো করে রাখা আছে,’ পাখমারা গণক বলল। ‘সাবধানে দেখিস, মিলেমিশে না যায়।’
‘ঠিক আছে, আমি খেয়াল রাখব,’ বেহুলা বাতার থেকে পুঁথি নামাতে নামাতে বলল।
কিছু পুঁথি বল্মীকদষ্ট, কিছু পুঁথি বদ্ধ ঘরে আলো বাতাস না খেয়ে ফুলে ফুলে উঠেছে। বেহুলা দাওয়ায় রোদ্দুরে পুঁথিগুলো ছড়িয়ে দিল।
‘আজ রোদ খাক, কাল থেকে কোষ্ঠীগুলো খুলে খুলে রাখব,’ বেহুলা রোদ্দুরে একগাদা কোষ্ঠীর ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল।
জ্যোতিষ-মন্দিরের তিন দিকে দরমার আর একদিকে মাটির দেওয়াল। দেওয়ালের গায়ে কাঠকয়লা দিয়ে কিছু রেখা অঙ্কিত। পাখমারা গণক সে দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বেহুলা বলল, ‘রেখাগুলো অনেক জায়গায় মুছে গেছে, আমি কাল কাঠকয়লা দিয়ে ভালোভাবে এঁকে দেব।’
‘এঁকে দেবে কীভাবে মা, এগুলো কি এমনি রেখা নাকি? এটা আঁকতে গেলে কতটা জ্যোতিষে দক্ষ হতে হয় তা জানো?’
‘সপ্তচত্বাবিংশদ্বিধ ললাটলিখন তো? তুমি চিন্তা কোরো না, আমি এঁকে দেব।’ বেহুলা একমনে দেওয়ালের দিকে দেখতে দেখতে বলল।
পাখমারা-গণক অবাক। এ মেয়ে এসব জানে? তবে কি সত্যিই এই সেই মেয়ে যার অপেক্ষায় সে এই কাপাসডাঙায় মাটি কামড়ে পড়ে আছে? পাখমারা গণক বলল—‘বল তো এই রেখাগুলোর অর্থ ‘
বেহুলা বলল, ‘দ্বিতীয় চিত্রের মতো বৃহস্পতি রেখায় এরকম বৃত্তাকার চিহ্ন যদি থাকে তবে সেই মানুষের ধন-সম্পত্তির অনেক ক্ষতি হয়। তৃতীয় চিত্রের মতো কারোর যদি ব্যাঁকা আর নাকের দিকে নেমে যাওয়া কপালের রেখা থাকে তবে সেই মানুষের কপাল খুব খারাপ বলতে হবে। পঞ্চম চিত্রের মতো ছোট ছোট আর বিচ্ছিন্ন যার কপালে রেখা সে মানুষ বহুবুদ্ধিসম্পন্ন, চাটুকারিতাবলম্বী আর অস্থিরভাগ্যবিশিষ্ট হয়।’
পাখমারা গণক স্তম্ভিত। এত দ্রুত কেউ বলতে পারে? তাকে নিজেকেও পুঁথি দেখে দেখে বলতে হয় এসব গণনা। ‘তুমি এসব শিখলে কোথা থেকে?’
‘আমার শ্বশুরমশাই আমাকে শিখিয়েছেন।
‘তুমি জ্যোতিষ জানো?’
‘হ্যাঁ।’
‘আচ্ছা তাহলে বলতো তুমি সহমরণ থেকে বাঁচলে কীভাবে?
‘আমার অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু নেই কাকা। আমার স্বামীর কোষ্ঠীতে যদি অগ্নিদ্রেক্কানে শুক্র থাকত এবং শুক্র যে রাশিতে আছে তার চতুর্থ এবং অষ্টম স্থানে রবিভৌমশনি অবস্থিত থাকত তবেই আমার সহমরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু নির্ণীত হতো। আমি জানতাম আমাকে জীবিত অবস্থায় ওরা অগ্নিতে ফেলতে পারবে না।’
‘তুই ভালোভাবে জানিস তোর অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু নেই, তবু আগুনে তোর এত ভয়? তোর শরীর জ্বলছে এই স্বপ্ন দেখে তুই বারবার ভয়ে জেগে উঠিস!’ পাখমারা গণক প্রথমে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বেহুলার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ওর চোখে ধীরে ধীরে জলের ধারা নেমে এল।
‘একী কাকা, তুমি কাঁদছ?’
‘এ আমার আনন্দাশ্রু মা। তোকে আমাদের ভিটেতেই আসতে হল? আমার আরো অনেক বছর বাঁচতে ইচ্ছা করছে রে। দেখি ঈশ্বরের কী ইচ্ছা।’
এরপর ডিঙাডুবি গ্রামে ঘটল সেই বিখ্যাত ঘটনা।
