বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫৪
।। চুয়ান্ন।।
১৬ আগস্ট, ২০১৯
সকালবেলা বিদ্যাদির সঙ্গে কলকাতা ইউনিভার্সিটির আশুতোষ মিউজিয়ামে ঢুকল নমিতা। রিসেপশনে ভিজিটারের খাতায় নাম ঠিকানা ফোন নম্বর লিখতে লিখতে বিদ্যাদি বলল, ‘একবার দেখতে হবে এদের মিউজিয়ামে খনার কোনো প্রত্নমূর্তি আছে কিনা।’
নমিতা বুঝতে পারছে বিদ্যাদি দেখতে চায় যে আর্কিওলজিস্টরা খনার সম্বন্ধে কী প্রত্নবস্তু এই মিউজিয়ামে রেখেছে। একতলায় একঝাঁক উজ্জ্বল আলোর নীচে সারা গ্যালারি জুড়ে বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা অনেক প্রত্নবস্তু। চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নবস্তুগুলি দেওয়ালে কাঁচের শো-কেসে, ঢুকেই বাঁদিকে, একসময় দেখেছিল নমিতা। বাঁদিকে গিয়ে এবার আবার ভালোভাবে দেখল। ছোটো-ছোটো সব প্রত্নবস্তু দেওয়াল সংলগ্ন কাঁচের শো-কেসে সাজানো। লেখা আছে সেকেণ্ড সেঞ্চুরি থেকে সিক্সথ সেঞ্চুরি। পাঁচশো বছর অনেকটা সময় কিন্তু কোনটা যে কোন সেঞ্চুরির তা উল্লেখ করা নেই। খনার সম্বন্ধে তো কিছুই লেখা নেই গ্যালারিতে কোথাও।
‘কিউরেটরের কাছে যাবে?’ নমিতা বলল। ‘আমার আলাপ আছে ড. রায়ের সঙ্গে। উনি হয়তো আরো কিছু বলতে পারবেন।’
‘চল,’ বিদ্যাদি সহমত
নমিতা বেরিয়ে এসে দোতলায় উঠে এল। কিউরেটরের অফিস হলওয়ে পেরিয়ে। কামরার বাইরে নেমপ্লেট। ড. মুরারীমোহন রায়। দরজায় নক করতেই ভিতর থেকে সাড়া এল। নমিতা ভিতরে পা রেখে হেসে বলল, ‘খুব ব্যস্ত থাকলে বিরক্ত করব না।’
‘আরে না না আসুন, আসুন। ব্যস্ততা তো সব সময়ই থাকে। বসুন।’
নমিতা বসল আর বিদ্যাদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
‘বলুন, কী মনে করে আপনার মতো হাই প্রোফাইল মানুষ আমার এই গরীবের অফিসে?’ হেসে বললেন ড. রায়। ‘স্টুডেন্টদের ফিল্ড ট্রিপ?’
হাই প্রোফাইল? মনে মনে হাসল নমিতা। এই ভদ্রলোকের কাছে এখনও তার রেজিগনেশনের খবর নিশ্চয়ই এসে পৌঁছায় নি। ‘আপনাদের মিউজিয়ামে চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নবস্তুগুলোতে ডেট দেওয়া নেই কেন?’
‘কেন আছে তো! সেকেণ্ড সেঞ্চুরি থেকে সিক্সথ সেঞ্চুরি,’ তারপর হেসে ফেললেন ড. রায়। ‘আমি জানি আপনি কী বলতে চাইছেন। আমাদের মিউজিয়ামটা এখনো তৈরি হচ্ছে। আমি জানি অনেক কাজ বাকি। তবু ধন্যবাদ আপনি এটা উল্লেখ করলেন। আপনাদের ফিডব্যাক পেলে খুবই সুবিধা হয়। কফি খাবেন?’
‘না না, থ্যাঙ্কস। একটু আগেই খেয়েছি দু’জনে।
‘তাহলে বলুন হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?’
‘বিদ্যাদির কিছু প্রশ্ন আছে,’ নমিতা বলল। ‘বলুন।’
‘আমি খনার সম্বন্ধে একটু পড়াশোনা করছি,’ বিদ্যাদি বলল। ‘কলকাতা মিউজিয়াম তো একসময় খনা-মিহিরের ঢিপি এক্সক্যাভেশন করেছে।’
ড. রায় ডেস্ক-টপে আউটলুক অফিসের ক্যালেন্ডারে এক নজর দেখে তারপর মুখ ফিরিয়ে নমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সরি, মিটিং নোটিশগুলো চেক করে নিলাম। ফ্রি সময় আছে।’ তারপর বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। কলকাতা ইউনিভার্সিটি চন্দ্রকেতুগড়ে খনা মিহিরের ঢিপি খোঁড়াখুড়ি করেছিল নাইনটিন সিক্সটিতে।’
‘আপনার ব্যস্ত সময় নষ্ট করছি না তো?’ নমিতা ভদ্রতা করে বলল।
‘মাই প্লেজার ম্যাডাম। আজকাল এসব কাজ ক’জন আলোচনা করে। আমার তো এসব আলোচনা খুবই ভালো লাগে।’ তারপর বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম, বলুন আপনি কী জানতে চান?’
‘আপনাদের মিউজিয়ামে খনার সম্বন্ধে কোনো প্রত্নবস্তু আছে?’
‘খনা, কিউরেটর ভাবতে লাগলেন। ‘ASI এর প্রত্নবস্তুতে খনার টেরাকোটা বা পাথরের মূর্তি বা খনার স্ক্রিপ্ট আমি দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। আমাদের মিউজিয়ামে তো নেই একথা আমি বলতে পারি। আর ওই ছোট ছোট মূর্তিগুলোর মধ্যে যদি কোনোটা খনার হয় সেটাও বলা সম্ভব না।’
‘আচ্ছা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার রেকর্ডে কি কোথাও খনার নাম মেনশন করেছে?’ বিদ্যাদি প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ, তা করেছে। ১৯০৬ খৃষ্টাব্দে ভারত সরকারের প্রত্নবিভাগের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ইংরেজ সুপারিন্টেন্ডেন্ট মিঃ লঙহার্স্ট বেড়াচাঁপার খনা-মিহিরের ঢিপি নামে একটি ঢিপি পরিদর্শন করেছিলেন। তখন বেড়াচাঁপায় একটা রেল স্টেশন ছিল। স্টেশনের উত্তর-পুব দিকে দুটো ঢিপি খনা-মিহিরের বাড়ি বলে কথিত ছিল। ওঁরা ওই দুটো ঢিপিকে খনন কার্যের পক্ষে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় স্থান বলে উল্লেখ করেছিলেন। সাহেবের এই প্রতিবেদন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ১৯২২-২৩ খ্রিস্টাব্দের বার্ষিক বিবরণীতে প্রকাশিত হয়। কিন্তু দুঃখের ও দুর্ভাগ্যের বিষয়, সে সময় খনা-মিহিরের ঢিপি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা বা বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়নি।’
‘তারপরে কি কলকাতা ইউনিভার্সিটি?’
‘হ্যাঁ। দীর্ঘদিন মাটির পিঞ্জরে বন্দী থাকার পর ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে খোঁড়াখুড়ি করা হয় খনা-মিহিরের ঢিপিটাকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়মই এর দায়িত্বে ছিল। সবটুকু খোঁড়া সম্ভব হয়নি, কিন্তু যেটুকু সম্ভব হল তাতেই অনেক কিছু আবিষ্কৃত হল। একটি মন্দির। ওখানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া কিন্তু খনার অস্তিত্বের কথা নিজেদের নোটিশ বোর্ডে লিখে রেখেছে। আপনাকে দেখাচ্ছি –, কিউরেটর উঠে পাশের র্যাক থেকে একটা ফোল্ডার নিয়ে এসে দেখাল। নোটিশ বোর্ডটা দেখে বিদ্যাদি ড. রায়কে বলল, ‘এই মন্দিরটা সম্বন্ধে একটু বলবেন ড. রায় প্লিজ?’
‘মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ৩০০ ফুট, প্রস্থে ১০০ ফুট, প্রধান মন্দিরটির চারপাশে ৬৩ ফুট করে বিস্তার।’
‘তার মানে ওখানে দরকার পড়লে শ-দুয়েক লোক শেল্টার নিতে পারে?’ বিদ্যাদি জিজ্ঞাসা করল।
‘শেল্টার? মানে?’
‘না কিছু না,’ বিদ্যাদি বলল। ‘তাহলে খনা-মিহিরের ঢিপি খনার বাড়ি নয়?’
‘মন্দির,’ আবার বললেন ড. রায়। ‘মণ্ডপও ছিল। উত্তর দিকের মণ্ডপে মনে হয় ধর্মালোচনা, কথকতা, নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান বসতো।’
‘কোন দেবতার মন্দির?’
‘মন্দিরে কোনো দেবতার মূর্তি পাওয়া যায়নি,’ ড. রায় বললেন।
‘মন্দির আছে অথচ দেবতা নেই, এটা খুব আশ্চর্য লাগছে,’ নমিতা বলল। ‘অনেক পণ্ডিতেরা বলেন ওটা হয়তো বরাহমিহির বা খনার জ্যোতির্বিদ্যার মানমন্দিরও হতে পারে।’
‘কবেকার ওই মন্দির? অনেক পুরোনো?’
‘অনেক পণ্ডিত বলেন গুপ্তযুগে মন্দিরটা ছিল, পরে পালযুগে সংস্কার করা হয়েছে। ওখানে কয়েকটা লেয়ার আছে। একটা লেয়ার তো অবশ্যই গুপ্তযুগের।’
‘তার মানে বরাহমিহিরের সময়কার—’
‘নিশ্চয়ই, তা না হলে আর্কিওলজিস্টরা বরাহমিহিরের নাম লিখত না। পথে ঘাটে যে যা বলবে আর্কিওলজিস্টরা তো তাদের ডকুমেন্টে সেই নামই লিখবে না। বিশ্বাসযোগ্য হওয়া চাই।’
‘বিদ্যাধরী নদীর ধারে আর কোথাও এত বড় মন্দির পাওয়া গেছে?’
‘এত বড় মন্দির কোথাও পাইনি আমরা, তবে শুধু এই চন্দ্রকেতুগড় নয় বিদ্যাধরী নদীর পাড়ে অনেক দিন ধরে মানব বসতি ছিল। তখন এই বিদ্যাধরী নদী চন্দ্রকেতুগড়, বেড়াচাঁপা এলাকার এক গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ছিল এবং এই অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে যে প্রাক-মৌর্য যুগ থেকে পাল-সেন যুগ পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন অধিবাসীর বসতি ছিল। ওদিকে আরো কিছু ঢিপি আছে, সেগুলো এখনও খোঁড়া হয়নি।’
‘আচ্ছা?’
‘হ্যাঁ, উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি চন্দ্রকেতুগড় ফোর্ট থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে দেওয়ান আটি নামে একটা গ্রাম থেকে কুষাণ যুগের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। এসব জায়গায় প্রাচীন বসতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।’
‘ড. রায়, আপনি ডিঙিবাদল বলে কোনো গ্রামের নাম শুনেছেন?’ বিদ্যাদি বলল।
‘ডিঙিবাদল!’ ড. রায় একটু ভাবলেন। ‘নাঃ, এরকম কোনো নাম তো শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। ডিঙিভাঙা লেন আছে কলকাতায়, আমাদের ক্রীক রো। কোথায় হতে পারে গ্রামটা সে সম্বন্ধে কিছু বলতে পারেন?’
‘আমিও ঠিক জানি না। তবে ওই দেগঙ্গার কাছাকাছি হতে পারে,’ নমিতা বলল। ‘উপকথা বলে যে ওখানে খনার একটা মন্দির ছিল।’
‘খনার মন্দির? বেড়াচাঁপায় খনা-মন্দিরের ঢিপি খুঁড়ে যে মন্দির পাওয়া গেছে সেই মন্দির না তো? আর কাছাকাছি -’ একটু ভেবে ড. রায় বললেন, ‘কাছাকাছি ডিঙিবাদল নেই, তবে ওদিকে চন্দ্রকেতুগড়ের মতো কিছু পুরোনো ধ্বংসাবশেষ, কিছু পুরোনো মন্দির-টন্দির আছে। কিন্তু ডিঙিবাদল বলে কোনো গ্রাম নেই।’
‘ডিঙিবাদল গ্রামে নাকি ডিঙির বৃষ্টিতে অনেকে মারা গেছিল।’ কথাটা বলেই নমিতা ড. রায়ের চোখের যে দৃষ্টি দেখল তা দেখে ও লজ্জা পেয়ে গেল। তারপর বলল, ‘সব গ্রামের রূপকথা। ছাড়ুন ওসব। ওদিকে একবার গিয়ে অনেক পুরোনো লোকাল লোকেদের জিজ্ঞাসা করতে হবে।’
‘অনেক অনেক ধন্যবাদ, ড. রায়,’ বিদ্যাদি অন্যমনস্ক। নমিতার মনে হলো বিদ্যাদি কিছু ভাবছে। নমিতা হাতজোড় করে কৃতজ্ঞতা জানাল। ‘এবার আমরা আসি।’ নমিতা উঠে দাঁড়াল।
‘আসুন, কিছু দরকার পড়লে বলবেন। তবে একটা কথা,’ ড. রায়ের হঠাৎ মনে পড়ল কিছু।
নমিতা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।
‘দেগঙ্গা এলাকায় কিছুদিন আগে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জেনারেল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টির অফিসাররা ক্রেতা সেজে এক অভিযান চালিয়ে প্রায় একশো কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রত্নতাত্ত্বিক চোরাই মাল উদ্ধার করে। একটু সাবধানে ওখানে যাবেন আর কারোর থেকে কিছু কিনবেন না। আপনারা বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাইছি।’
‘একশো কোটি!’ নমিতা ঢোঁক গিলল। তারপর বলল, ‘না না, আমরা কিছু কিনব না।’ নমিতা আবার বিড়বিড় করে বলল একশো কোটি! ভাবাই যায় না।
কিউরেটরের রুম থেকে বেরিয়ে হলওয়তে আসতেই নমিতার সেলফোনটা বাজল। ভাইস চ্যান্সেলরের ফোন। জয়ন্তদা। নমিতা ফোন তুলল—‘হ্যালো!’
‘নমিতা, আমি সরি, কাল তোমার ওপর যা ব্যবহার করা হয়েছে তার জন্য। আমি এডুকেশন মিনিস্টার শাক্যদার সঙ্গে কথা বলেছি। উনি খুব বিরক্ত হয়েছেন।’
‘আর বিরক্ত হওয়ার কী আছে জয়ন্তদা, আমি তো রেজিগনেশন দিয়েই এসেছি,’ হলওয়েতে হাঁটতে হাঁটতে নমিতা বলল।
‘উনি ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্টারের ওপর খুব বিরক্ত হয়েছেন। এরকম অন্যায় হস্তক্ষেপ ওঁর একদম পছন্দ হয়নি। উনি চিফ মিনিস্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন। চিফ মিনিস্টার ইমিডিয়েটলি একটা আলোচনা চান। উনি কাল সকালের ফ্লাইটে দিল্লি যাচ্ছেন। উনি দেড়টায় টাইম দিয়েছেন। তুমি কী এখন অ্যাভেলেবল?’
‘হ্যাঁ, আমি ফ্রি আছি।’
‘আমি তোমায় পিক আপ করে নিতে পারি। আমাকেও ওই মিটিং-এ থাকতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি তোমার রেজিগনেশন অ্যাক্সেপ্টেড যাতে না হয়। শাক্যদাও থাকবেন।’
‘আমি খুব ডিস্টার্বড, জয়ন্তদা। মন্ত্রীদের এই অসভ্য ধরণের অ্যাটিচুড আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব না।’
‘শাক্যদা খুব জেন্টলম্যান। উনি নিজে আমার কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তুমি প্লিজ না বলো না।’
‘কোথায় যেতে হবে? নবান্ন?’
‘হ্যাঁ। দেড়টার সময় উনি ফ্রি হবেন।’
‘ঠিক আছে, শুধু আপনার জন্য জয়ন্তদা। তবে আমার একটা শর্ত আছে।’
‘কী শর্ত?’
‘বিদ্যাদিকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।’
‘বিদ্যাধরী! ও-কে। তোমরা এসো। দেখা হবে।’
