বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫৭
।। সাতান্ন।।
গোটা দিনটা উদ্বেগে কাটল বেহুলার। ডেভিড সাহেব ফিরে না আসা পর্যন্ত উদ্বেগ কাটবে না। বুধন ঠিকমতো পৌঁছাতে পারল তো? রাতে বেহুলার ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছিল। সাহেব ঠিক আছে তো?
পরদিন ভোরবেলা থেকে বেহুলার মনে কেমন যেন কু ডাকছে। মনে হচ্ছে সে যেন এক বিপদের ছায়া দেখতে পাচ্ছে। কুঁড়ের দাওয়ায় এসে বসল বেহুলা। পাশের বকুল গাছে ধলাভ্রূ খঞ্জনের বাসায় মা পাখিটা সারাক্ষণ ডিম আগলে বসে থাকে আজ পাখিটা নেই! বেহুলা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। পাশের জলাগুলোতে এসময় উত্তর থেকে উড়ে আসা পাখিগুলো রাতে ভেসে থাকে, আজ জলে কোনো পাখি নেই! একদম খালি। কালও অতগুলো পাখি ছিল জলে? আজ হলো টা কী?
আঙিনার মেঝেতে তাকাল বেহুলা। লম্বা এক সারি পিঁপড়ে মুখে খাবার নিয়ে তুলসীতলার মঞ্চের ফাটল দিয়ে ভিতরে ঢুকছে। তার মানে প্রবল ঝড় বৃষ্টি হবে? কীভাবে যেন পিঁপড়েরা আগাম টের পেয়ে যায়।
এবার আকাশের দিকে তাকাল বেহুলা। মাঝিমাল্লারা কিংবা গ্রামের চাষীরা আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদরে আষাঢ়ে কোণ, শাউনে বা ভাদুরে মেঘ দেখে ঝড় তুফানের পূর্বলক্ষণ বুঝতে পারে। কিন্তু এই শীতে অকালবর্ষণ!
আকাশের দিকে তাকিয়ে এবার সত্যিই অবাক বেহুলা। পরিযায়ী হাঁসগুলো আকাশে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বে উড়ে চলেছে! পিছনে উড়ে আসছে আরো এক ঝাঁক! ওদের পাখসাটে আতঙ্ক! যেন প্রাণের ভয়ে মরিয়া হয়ে যত দ্রুত সম্ভব উড়ে চলেছে!
কেন এমন হচ্ছে? শীত আসার সময় প্রতি বছর ওরা উত্তর থেকে দক্ষিণ- পশ্চিমে আকাশে অনেক উঁচু দিয়ে উড়ে যায়। কিন্তু আজ যেন অদ্ভুত না? ওরা শীতের আগে উড়ে চলেছে উত্তর দিকে! কেন? বেহুলার মনে শান্তি আসছিল না। ওর খালি মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন ওদের গ্রামের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। লখা যেদিন মারা গেছিল তার আগের রাতেও ওর মন এরকম কু-ডেকেছিল। লখাকে বলেছিল, কিন্তু লখা জ্যোতিষ বিশ্বাস করে না। ও হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ বেহুলা দেখল কাপাসডাঙার মাঠের দিক থেকে ডেভিড সাহেব দৌড়োতে দৌড়োতে আসছে।
কিছু খারাপ খবর? বেহুলার বুক ধুকপুক করে উঠল।
ডেভিড সাহেব চারদিক দেখে বেহুলাদের উঠোনে ঢুকে পড়ল—‘খুব খারাপ খবর আছে বেহুলা।’
‘বুধন ধরা পড়ে গেছে?’ বেহুলার বুকটা ধড়াস করে উঠল।
‘না বুধনকে কাল রাতে আমি ফরাসডাঙায় পৌঁছে দিয়েছি ঠিকমতো। ফরাসিদের জাহাজ কাল ছাড়বে। বুধন পন্ডিচেরি পৌঁছে গেলে বাংলার নবাবের কানুন ওখানে চলবে না।’
‘তাহলে কী খারাপ খবর?’
‘আমি কলকাতা গিয়ে শুনলাম রবিন সাহেব আর জমিদার কাল দুপুরে কলকাতা থেকে ডিঙাডুবি রওনা দিয়েছে। আজ ফিরে এসে শুনলাম ডিঙাডুবি এসে রবিন সাহেব জমিদারবাড়িতে উঠেছে।
‘কিন্তু এতে বিপদের কী হয়েছে?’
‘আমার বাবুর্চি হানিফ শুনে ফেলেছে ওদের গোপন পরামর্শ। আজ রাতে জমিদারের বজরায় পর্তুগিজ কেল্লার থেকে দশজন বালিকাকে নিয়ে কলকাতা চলে যাবে। জমিদারের বেলেঘাটার মহলে নবাবের সুবাদার আসবে। ওখানে নবাবের হারেমের জন্য বালিকাদের বেচাকেনা হবে।’
‘এত বদমাশ ওরা?’
‘আরো আছে। ওই বজরায় ওরা তোমাকেও জোর করে তুলবে। তোমাকেও বেচে দেবে ওরা। সোনাগাজীর কাছে বেশ্যাবাড়িতে কমলাবাঈয়ের কোঠাতে তোমায় তুলবে ওরা। তুমি আমার সঙ্গে এক্ষুনি পালিয়ে চল বেহুলা। তুমি এখানে একদম সুরক্ষিত নও।’
‘গণককাকা আর পিসির কী হবে?’
‘সকলে তৈরি হয়ে নাও এক্ষুনি। কোম্পানির বোটে আমরা পালাবো।’
এসব শুনে বচনপিসি ভয়ে কাঁপতে লাগল। সকলে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচ্ছিল, হঠাৎ চারদিকে ভারী বুটের শব্দ জেগে উঠল। চারচালার দরজা ভারি বুটের এক লাথিতে খুলে গেল। ডেভিড সাহেব পিস্তল বের করার আগেই একজন পাইক ভিতরে ঢুকে ডেভিডের ঘাড়ে বন্দুকের বাঁট দিয়ে সজোরে মারল। ডেভিড মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দরজায় দাঁড়িয়ে দারোগা। দারোগা আদেশ দিল, ‘একে বেঁধে ফেল আর মেয়েটাকে নিয়ে চল।’
দু’জন পাইক বেহুলাকে চেপে ধরল। বেহুলা নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করতেই একজন বেহুলার গালে সজোরে চড় মারল। বেহুলা চোখে অন্ধকার দেখল। একজন পাইক বেহুলার মুখে কাপড় গুঁজে দিল।
বচনপিসি ক্ষিপ্রহস্তে উঠোনের কোণা থেকে হেঁসোটা তুলে নিয়ে তেড়ে এল। কিন্তু একজন শক্তসমর্থ পাইক বড় তন্নাবাশ দিয়ে বচনপিসির মাথায় আঘাত করল। বচনপিসির হাত থেকে হেঁসো পড়ে গেল। বচনপিসি কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ঝাপসা চোখে বেহুলা দেখল দরজায় এসে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে রবিন সাহেব আর তার সঙ্গে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ আর সত্যঠাকুর।
দু’জন পাইক এবার কাছি দিয়ে জ্ঞানহীন ডেভিডকে পিছমোড়া করে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধল।
‘মেয়েটাকে আমার বজরায় নিয়ে চল,’ এবার জমিদার গোপীচরণ এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। আর এই ডেভিড বেইমানটাকে বস্তায় মুড়ে আমার পালকিতে তুলে আমাদের গুমঘরে আটকে রাখ। বাকি মেয়েগুলোর পাশে এই মেয়েকে নৌকার খোলে বেঁধে রাখ।’
পালকিবাহকরা ডেভিডের জ্ঞানহীন দেহকে পিছমোড়া করে বেঁধে পালকিতে তুলে জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। একজন পাইক বেহুলাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নদীর দিকে হাঁটা লাগাল। বেহুলার মুখ কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, দু-হাত, পা দড়ি দিয়ে বাঁধা, বেহুলা আছাড়ি পাছাড়ি করতে লাগল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। বেহুলাকে নিয়ে লেঠেলরা মাঠ পার হয়ে নদীর কাছে চলে এল। ঘাটে নোঙর করা জমিদারের বজরা তাদের লক্ষ্য। নদীর পাশে বিদ্যাধরীর খাতের মধ্যে সরু উঁচু পথ। বেহুলাকে নিয়ে পাইক সে পথে বজরার দিকে এগিয়ে চলল। পিছনে পিছনে সারি দিয়ে বল্লম হাতে অন্যান্য পাইকরা এবং দারোগা নিজে চলেছে। পিছনে চলেছে জমিদার গোপীচরণ মল্লিক, রবিন সাহেব, দেওয়ান আর সত্যঠাকুর। সবকটা দুর্বুদ্ধির মাথা এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। বেহুলা চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু কাপড় বাঁধা মুখ দিয়ে শুধু গোঙানি বের হতে লাগল। এত ভোরে এদিকে কেউ নেই যে বেহুলার অপহরণ থামায়।
শুধু একজন বাদে।
সে লোকটা খাতের নীচে আজও কিছু খোঁজার জন্য কোদাল দিয়ে মাটি কাটছিল।
জটা পাগলা।
বেহুলার গোঙানি শুনে দ্রুতপদে জটা খাত থেকে কোদাল হাতে ছুটে উপরের সরু পথে উঠে এল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই জমিদার গোপীচরণ মল্লিককে এক ধাক্কায় অন্য দিকের খাতে ফেলে নিজে জমিদারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল জটা পাগলা। পাইকদের বিস্ময় কাটতে ওরা নীচে তাকিয়ে দেখল জমিদারকে মাটিতে ফেলে জমিদারের বুকের ওপর চেপে বসে কোদালের ধারালো দিকটা জমিদারের গলায় চেপে ধরে জটা বলল—‘হারামজাদা, ছেড়ে দে বেহুলা মাকে। নাহলে তোর মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দেব।’
দারোগা দু’জন বন্দুকধারীকে বলল নিশানা করতে। কিন্তু জটা জমিদারকে মাটিতে ঠেসে কোদাল ওর গলায় এমন ভাবে চেপে ধরেছে যে জমিদার ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘মেয়েটাকে ছেড়ে দে!’
দারোগা রবিন সাহেবের দিকে তাকাল। রবিন সাহেব ইশারা করল মেয়েটাকে ছেড়ে দিতে। কতদূর পালাবে এই মেয়ে! ওকে ঠিক ধরে আনবেই। কিন্তু যদি জমিদার মরে যায় তবে ওকে রোজ রোজ সোনার ডিম কোন হাঁস দেবে?
বেহুলাকে ছেড়ে দিল পাইক। ওর হাত পায়ের দড়ি কেটে দিল।
‘পালাও মা!’ জটা বেহুলাকে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল।
ভীতা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়া বেহুলা এবার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল জিভকাটি জঙ্গলের দিকে। ছুটতে ছুটতে কাপাসডাঙার মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল।
‘এবার আমায় ছেড়ে দে,’ গোপীচরণ মল্লিক জটার কাছে মিনতি জানাল। ‘তুই জীবনে অনেক পাপ করেছিস,’ জটা হিসহিস করে বলল। ‘এর শাস্তি তোকে দেব না? তুই আর এ জীবনে কোনো নারী স্পর্শ করতে পারবি না।’ জটা কোদাল তুলে শেষ বারের মতো বিদ্যাধরীর খাতে কোদাল চালাল। এবার সজোরে জমিদারের নিম্নাঙ্গে।
‘ফায়ার!’ রবিন সাহেব চেঁচিয়ে উঠল।
উপর থেকে দু’জন পাইক জটার দিকে গুলি চালাল। জমিদারের রক্তাক্ত শরীরের পাশে জটার রক্তাক্ত শরীর ছটফট করতে করতে স্থির হয়ে গেল।
জঙ্গলে ঢোকার সময় পিছনে বন্দুকের গুলির শব্দ। বেহুলা থমকে দাঁড়াল।
আজ জটা জটায়ু হয়ে গেল।
