বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬২
।। বাষট্টি।।
১৭ আগস্ট, ২০১৯
‘আপনার ইউনিভার্সিটিকে রেন্ট পে করা উচিত আমার,’ মিস বসাকের গলার স্বরে রসিকতা। ডিনের অফিস এখন অ্যাডভোকেটের অফিস হয়ে গেছে।’
আর ক’দিন, ভেকেশন প্রায় শেষ,’ নমিতা হাসল—‘চা খাবেন?’
‘আপনার সিকিম-টি’র ফ্যান হয়ে গেছি আমি,’ মিস বসাক বললেন।
নমিতা ইলেকট্রিক কেটলিতে জল চাপিয়ে দিল। জল গরম হতে হতে মিস বসাক অনেকগুলো ফোল্ডার খুলে খুলে ডেস্কে সাজিয়ে সাজিয়ে রাখলেন।
টি-ব্যাগ গরম জলে ডুবিয়ে মিস বসাকের সামনে ধরল নমিতা।
‘থ্যাঙ্কস, ড. স্যান্যাল,’ মিস বসাক চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে বললেন। ‘গত জন্মে আপনি আমার ছোট বোন ছিলেন।’
নমিতা নিরুত্তর, মৃদু হাসির রেখা ওর ঠোঁটে। চায়ের কাপে চুমুক দিল নমিতা। মিস বসাক বললেন, ‘কী, পছন্দ হল না এই রিলেশনশিপ?’
‘আমি মনে প্রাণে কমিউনিস্ট, মিস বসাক,’ নমিতা হেসে বলল। ‘পূর্বজন্ম- টন্মের উইয়ার্ড ফিলোজফি একদম বিশ্বাস করি না। বেহুলার ওই জন্মান্তরবাদের থিওরিগুলো আমার টোটালি অবাস্তব বলে মনে হয়েছে। তাই ওসব প্রারব্ধ- টারব্ধ বা জন্মান্তরের কথা ছাড়ুন। তবে হ্যাঁ, এ জন্মে যদি আপনি আমাকে ছোট বোন মনে করতে পারেন তবে আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করব।’
‘আপনার মিস দাসের পেপারস্ এই ফোল্ডারে যাবে। বাকি মোটামুটি তৈরি।’
‘এত কাগজ?’
‘আয়ুর্বেদিক প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এর জন্য AYUSH লাইসেন্স লাগে। এই ফোল্ডারে সুশ্রুতের লাইসেন্স, জিএসটি নাম্বার, ‘ মিস বসাক বাকি ফোল্ডারগুলো বের করে দেখালেন ‘এটাতে আছে সুশ্রুতের কাস্টমারদের রিপোর্ট, এটাতে পিটিশনারদের সমস্ত কোয়েশ্চেনের উত্তর, খনা রিলেটেড যত কোয়েশ্চেন আছে তার উত্তর এই ফোল্ডারে আসবে। মিস দাস কখন আসবেন?’ বলতে না বলতেই বিদ্যাদির ফোন এল—‘আমি নীচে এসে গেছি। নমিতা, তোর অফিস কোন দিকে? সব নতুন লাগছে।’
‘তুমি গেটে থাকো, আমি নেমে আসছি,’ নমিতা উঠে দাঁড়িয়ে মিস বসাককে বলল, ‘আপনি বসুন, আমি বিদ্যাদিকে নিয়ে আসছি।’
কিছুক্ষণ পর বিদ্যাদিকে নিয়ে ঘরে ঢুকল নমিতা
‘আরে তোর দারুণ অফিস তো!’ বিদ্যাদির চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। বিদ্যাদিকে দেখে মিস বসাকের মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল—‘আপনি রেডি?’
‘হ্যাঁ এই যে রাইট-আপ,’ বিদ্যাদি একটা ফাইল শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগ থেকে বের করল।
‘ড. স্যান্যাল বললেন আপনি সারা রাত জেগে কাজ করেছেন?’
‘হ্যাঁ, আঙুলগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্লো হয়ে গেছে। অনেকদিন এত বড় কাজ করি না তো,’ বিদ্যাদি ম্যানুস্ক্রিপ্টটা মিস বসাকের হাতে দিল।
‘থ্যাঙ্ক ইউ, মিস দাস। আই অ্যাপ্রিশিয়েট ইয়োর হেল্প। জীবনে ভুলব না।’
‘আগে দেখুন আপনার কাজে লাগে কিনা,’ বিদ্যাদি বলল। ‘আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি যে খনা বাস্তবে ছিলেন। পৃথুযশ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে খনা কাল্পনিক চরিত্র। পৃথুযশ লিখেছে বাঙালির উপকথা অনুযায়ী খনা বরাহমিহিরের পুত্র মিহিরের পত্নী। আর তারপর মিহিরের জন্মবৃত্তান্তকে অবাস্তব গল্প প্রমাণ করে বলেছে মিহির অবাস্তব, অতএব মিহিরের পত্নী খনাও অবাস্তব। আমি লিখেছি যে অ্যাকচুয়ালি মিহির চরিত্রটাই কাল্পনিক। বরাহমিহিরের মিহির নামে কোনো পুত্র ছিল না।’
‘তাই?’ মিস বসাক বিস্মিত।
‘হ্যাঁ। বরাহমিহিরের পুত্রের নাম ছিল পৃথুযশ।’
‘পৃথুযশ! আচ্ছা! ইন্টারেস্টিং কোয়েন্সিডেন্স তো! এর ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে?’ মিস বসাক উকিলি প্রশ্ন করলেন।
‘আছে,’ বিদ্যাদি বলল। ‘ঐতিহাসিক গ্রন্থ ষটপঞ্চাশিকার প্রথম শ্লোকে পৃথযশ তার পরিচয় দিচ্ছেন
‘প্রণিপত্য রবিং মূর্রা বরাহমিহিরাত্মজেন পৃথুযশসা।
প্রশ্নে কৃতার্থগহনা পরার্থমুদ্দিশ্য সদ্যশসা।।
অর্থাৎ, তিনি বরাহমিহিরের আত্মজ অর্থাৎ পুত্র।’
‘দারুণ!’ মিস বসাক উত্তেজিত।
‘একজন প্রাচীন গ্রন্থকারের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর লিখিত গ্রন্থ এবং অন্যান্য প্রাচীন মানুষের লেখায় সেই গ্রন্থকারের সম্বন্ধে উল্লেখ। উদাহরণ হিসেবে, বরাহমিহির যে ছিলেন তার প্রমাণ হলো বরাহমিহিরের লিখিত বৃহৎজাতক, বৃহৎসংহিতা। আর বরাহমিহির সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন পরবর্তীকালে কাশ্মীরি পণ্ডিত ভট্টোৎপল এবং পারসিক পণ্ডিত অল-বিরুনী। ঠিক একইরকম খনার ক্ষেত্রেও আমরা বাংলায় অজস্র খনাবাক্য এবং খনার বচন দেখতে পাই। খনার বিষয়ভিত্তিক শ্লোকগুলো আমাদের পাঠকদের কাছে উপলব্ধ যেমন, নষ্টকোষ্ঠী, পিতৃরিষ্ট, মাতৃরিষ্ট, তুঙ্গফলং ইত্যাদি। এবার দেখা যাক কোথায় খনার অস্তিত্ব অন্য পণ্ডিতদের দ্বারা উল্লিখিত। জাতকচন্দ্রিকা নামে একটি গ্রন্থ শ্রীনীলকমল ভট্টাচার্য্য দ্বারা অনুদিত হয়েছিল। উনি লিখেছিলেন—’
অগ্নিভূবসুচন্দ্রে মে শাকে জাতকচন্দ্রিকা।
সংবৰ্দ্ধিতানূদিতা চ শ্ৰীনীলকমলেন হি।।
তার অর্থ বইটি ১৮১৩ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে অনুবাদ করা হয়। আসল বইটির গ্রন্থকর্তা ছিলেন শ্রীরামশঙ্করদেবশর্ম্মা। গ্রন্থকর্তা বইটির তারিখ সম্বন্ধে লিখেছেন—’
খাকাশাব্বধরাশাকে বিদ্বদ্রঞ্জঙ্কারিণাং।
অব্যুৎপন্ন প্রবোধায় করোম্যেতাং মুদাযুতঃ।।
অর্থাৎ এই পুস্তিকা বিদ্বন্মণ্ডলীর মনোরঞ্জিনী। যাহাদিগের তাদৃশ ব্যুৎপত্তি নাই তাহাদিগের জ্ঞানোদয়ের নিমিত্তে সপ্তদশশত শকাব্দে আমি হৃষ্টচিত্তে ইহা প্ৰণয়ন করিতেছি। গ্রন্থকর্তা প্রথমে দেবতাদের নমস্কার করে লিখছেন-
নত্বা শম্ভুগণেশসূর্য্যগিরিজাবিষ্ণুন্ গুরু শম্ভুজান্।
জ্যোতির্গ্রন্থকলাপকং সুবিমলং জ্ঞাত্বা খনোক্তাদিকং।
শিষ্যাণাং দ্রুতবোধিকাং ধৃতিকরাং পুস্তীং সতাং সম্মতাং
যত্নাজ্জাতকচন্দ্রিকাং বিতনুতে শ্রীশঙ্করোবৈদিকঃ ॥
অর্থাৎ শিব, গণেশ, সূৰ্য্য, পার্বতী, বিষ্ণু, গুরুগণ ও নবগ্রহ দেবতাদের প্রণাম করে এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের গ্রন্থকলাপ ও খনার উক্তি সংকলন করে শ্রীশঙ্কর ব্রাহ্মণ সযত্নে এই জাতকচন্দ্রিকা গ্রন্থ প্রকাশ করিতেছেন। ইহা শিষ্যগণের শীঘ্র বোধগম্য হবে। ১৭০০ শক মানে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ। আর সেই বইয়ের শুরুতে খনার নামের উল্লেখ। আমি আন্ডারলাইন করে দিয়েছি সেটা। তার মানে খনা আরো কত পুরোনো! শিব, গণেশ, সূর্য, পার্বতী, বিষ্ণু, গুরুগণ এবং নবগ্রহ দেবতাদের নামের পর খনার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে নেওয়া হতো। তার থেকে বোঝা যায় যে খনা কত বিদুষী ছিলেন। সুতরাং খনা নামে যে একজন বিদুষী বাঙালি ছিলেন সেকথা প্রমাণিত। খনা কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন।’
‘অণ্ডসাম!’ মিস বসাক মুগ্ধ দৃষ্টিতে বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বললেন।
‘এবার পৃথুযশের যুক্তিগুলো খণ্ডন করি। এরপর পৃথুযশ লিখেছে যে ঐতিহাসিক প্রমাণ ব্যতীত কোনো ব্যক্তির বা ঘটনার অস্তিত্ব স্বীকার করা উচিত নয়। তার মানে খনার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, খনা হল উপকথা। অতএব খনা ছিল না। তাহলে বরাহমিহির যে বিক্রমাদিত্যের নবরত্নসভায় ছিলেন তারও কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। একমাত্র লিখিত তথ্য যা পাওয়া যায় তা হল কালিদাসের সংস্কৃত গ্রন্থ ‘জ্যোতির্বিদ্যার্বিভরণ’-এ। সেখানে মৌর্য বংশের গুপ্তসম্রাট মহারাজা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার নবরত্নদের নাম তিনি লিখে গেছেন—
ধন্বন্তরিঃ ক্ষপনকোহমরসিংহশঙ্কু
বেতালভট্টঘটকর্পরকালিদাসাঃ।
খ্যাতো বরাহমিহিরো নৃপতেঃ সভায়াং
রত্নানি বৈ বররুচির্নব বিক্রমস্য।।
এই ‘জ্যোতির্বিদ্যার্বিভরণ’ ১২৪২-৪৩ খ্রীষ্টাব্দে লেখা হয়েছিল, লিখেছিলেন অন্য একজন কালিদাস। বরাহমিহির ৫০৫ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশের সময়ের মানুষ। অতএব সাতশো বছর পর কেউ একজন লিখে দিল যে বরাহমিহির বিক্রমাদিত্যের রাজসভার নবরত্নের একজন ছিলেন এই দাবিও তাহলে আমাদের মানা উচিত না। কেননা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। কিন্তু আজও প্রতিটি ভারতীয় বিশ্বাস করে যে মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরত্নসভার একজন ছিলেন বরাহমিহির। তাহলে কীসের ভিত্তিতে আমরা গোটা ভারতবর্ষ মেনে চলি যে বিক্রমাদিত্যের নবরত্নসভায় বরাহমিহির স্থান পেয়েছিলেন? শুধুমাত্র লোককথার ভিত্তিতে। বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের সভায় বরাহমিহির ছিলেন একথা যদি লোককথার ভিত্তিতে আমরা ইতিহাস বলে মেনে নিই, তবে খনা কী দোষ করল? খনার ক্ষেত্রে তাহলে আমরা কেন লোককথাকে অস্বীকার করব?’
‘এক্সিলেন্ট!’ মিস বসাকের চোখ গোলগোল হয়ে যাচ্ছে।
‘বরাহমিহিরের নিষ্ঠুরতার উপকথা সত্য ঘটনা কিনা জানি না, কিন্তু এটা সত্য কথা যে যুগে যুগে বিদ্বানরা বিদুষীদের ব্যবহার করে এসেছে আর যখন দেখেছে সেই বিদুষীর প্রতিভা তার থেকে বেশি তখন হিংসায় জর্জরিত হয়ে তাকে নানাভাবে দমিয়ে রেখেছে,’ বিদ্যাদি থামল। ‘আজও আমরা কর্মক্ষেত্রে সেই হিংসা দেখে চলেছি। কৃতী মেয়েদের উন্নতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় পুরুষ। সে বিখ্যাত সেতারবাদক হোক, বিখ্যাত গায়ক, লেখক, অভিনেতা, চিত্রকর, কলেজের প্রফেসর, হাসপাতালের ডাক্তার, কিংবা কর্মক্ষত্রে উপরে ওঠার জন্য লড়াই করে চলা অগণিত প্রতিভাবান নারীর উপরে থাকা পুরুষ ম্যানেজার এদের অনেকেরই মধ্যে বাস করে উপকথার নিষ্ঠুর বরাহমিহির।
‘ঠিক,’ মিস বসাককে অন্যমনস্ক দেখাল।
‘কী ভাবছেন মিস বসাক?’ নমিতা জিজ্ঞাসা করল।
‘ডিঙিবৃষ্টি!’ মিস বসাক উদ্বিগ্ন গলায় বললেন। ‘ওটা ক্র্যাক করতে পারলেন?’ বিদ্যাদি মাথা নাড়ালো—‘চেষ্টা করছি।’
‘আহুজা কিন্তু ডিঙিবৃষ্টি দিয়ে ‘বেহুলার খনার ক্রেডিবিলিটি ডেস্ট্রয় করে দেবে,’ মিস বসাক বললেন। ‘বেহুলার খনা’র ক্রেডিবিলিটি ধ্বংস হয়ে গেলে খনার ‘ছোট চাঁদা বড় চাঁদা ও মিনিংলেস হয়ে যাবে। যেভাবেই হোক আমাদের ডিঙিবৃষ্টি হয়েছিল এটা প্রমাণ করতেই হবে।
