বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬০
।। ষাট।।
ডিঙাডুবির কিছু গ্রামবাসী কলকাতা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। শহরে নিজেদের ভাগ্য গড়বে। কিন্তু, কিছু মানুষের কলকাতার দিকে যাওয়ার উপায় নেই। চন্দ্ৰ ডাকাত বলল, ‘আমাকে ইংরেজরা ধরতে পারলে বিনা বিচারেই ফাঁসি দিয়ে দেবে। আমরা কলকাতা যাব না। আমরা দক্ষিণে যাব।’
‘কোথায়?’ ডেভিড বলল।
‘জানি না, কপাল যেখানে নিয়ে যায়। তবে মোগল আর ইংরেজরা যেখানে আমাদের ছুঁতে পারবে না, সেখানে।’
‘ফরাসডাঙায় ফরাসীদের থেকে শুনেছিলাম ওদের জাহাজ কলকাতায় আসার কথা ছিল,’ বুধন বলল। ‘আমি ভেবেছিলাম ওদের জাহাজ ধরে পালাব। কিন্তু জাহাজ ঝড়ের জন্য আসতে পারেনি। আমার মনে হয় ওদের জাহাজ ব-দ্বীপের মুখেই রয়ে গেছে। জাহাজঘাটায় আমি শুনছিলাম অনেক ফরাসী দেশে ফিরে যাবে। আমরা যদি বিদ্যাধরীর সাগরদ্বীপে ওই জাহাজ ধরতে পারি তবে বেঁচে যাব।’
‘আমরাও তাহলে ওই জাহাজ ধরব,’ চন্দ্র সর্দার বলল।
চন্দ্র ডাকাতের দলবল সবাই সর্দারের সঙ্গে রাজি হল।
‘তাহলে সবাই মিলে কয়েকটা নৌকা খুঁজে সারিয়ে বিদ্যেধরীতে ভেসে যাওয়া যাক,’ চন্দ্র সর্দার ওর দলের লোকেদের আদেশ দিল।
শান্তিপিসিদের যাওয়ার সময় হলো। যাওয়ার আগে শান্তিপিসি বেহুলার কাছে এসে একটা বটুয়া দিয়ে বলল, ‘দামুর শহরের রোজগার। এটা তুই রাখ।
‘না না, এ আমি কেন নেব?’ বেহুলা তীব্র আপত্তি করল।
‘যখন আমার কোষ্ঠী বানিয়েছিলি তখন তাহলে তুই আমার থেকে কড়ি নিসনি কেন?’
‘ঋণ শোধ করছো?’
‘বোকা মেয়ে। আমার দামুর তো একটা রোজগার আছে, মাথা গুঁজবার জায়গা আছে, আমি ছেলের বাড়ি যাচ্ছি। আর তোর তো এখন এই কড়িগুলোর খুব দরকার হবে রে। এটা তুই রাখ। আমি তো তোর মায়ের মতোই।’
বেহুলা বটুয়াটা হাতে নিয়ে মাথায় ঠেকালো।
সকলে গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে কম ক্ষতিগ্রস্ত নৌকা খুঁজতে লাগল। বেহুলা বাকি লোকেদের জিভকাটির মন্দিরে সেবা শুশ্রূষা করতে লাগল। বিশ্বনাথ এসে পৌঁছাল বিকেলে। ভয়ানক এই ঝড়ের কথা শুনে বেচারা গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল কৃষ্ণনগর থেকে। নদীর পাড়ে এসে বুধনের সঙ্গে দেখা। বুধনই খবরটা দিয়ে বিশ্বনাথকে পাঠালো জিভকাটির মন্দিরে। বিশ্বনাথকে দেখে বচনপিসি হাউমাউ করে উঠল—বিশে রে, আমাদের ঘরবাড়ি সব ধুয়ে গেছে। খুব বিপদে পড়েছিলাম আমরা।’
‘ভগবানের অশেষ করুণা যে তোমরা প্রাণে বেঁচে গেছ,’ বিশে বলল।
‘বেহুলা না থাকলে আমাদের কেউ বাঁচাতে পারত না,’ পাখমারা গণক বলল।
‘এবার আমরা কোথায় যাব?’
‘কৃষ্ণনগরে আমি গাহনার দলে কাজ পেয়েছি বাবা, বিশে বলল। ‘তোমরা আমার সঙ্গে চল।’
মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো ওরা। হঠাৎ দেখল বুধন হাত নেড়ে চেঁচাতে চেঁচাতে আসছে। কাছে এসে বুধন হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘নৌকা খুঁজতে গিয়ে আমরা কিছু পেয়েছি, আমি বেহুলাকে কিছু দেখাতে চাই। বচনপিসি তোমরাও আমার সঙ্গে এসো।’
বুধন ওদের নদীর কাছে নিয়ে এল। নদীর পারে কয়েকটা নৌকা সারাবার কাজ চলছে। একটা নৌকায় পাটাতনের ওপর সাদা চাদরে ঢাকা একটা দেহ। বেহুলার চোখে কৌতূহলের দৃষ্টি। ওর শরীর জুড়ে অস্বস্তি জেগে উঠল। বহুজন্মের অস্বস্তি। বুধন সাদা চাদরটা সরিয়ে দিল। নৌকার পাটাতনে শুয়ে আছে সত্যাচার্যের নিথর দেহ, চোখে তার মৃত্যুর আতঙ্ক। আর আশ্চর্যের কথা সত্যাচার্যের জিভ একপাশে বেরিয়ে রয়েছে। বেহুলা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
‘জমিদারের ভাঙা পালকির ভিতর এই দেহটা ঘাড় গুঁজে আটকে ছিল। ঝড়ে পালকি সমেত হয়তো এই পণ্ডিতকে উড়িয়ে নিয়ে গেছিল। গ্রামের লোকেরা চিনতে পেরে ওকে তুলে এখানে এনে রেখেছে,’ বুধন বলল।
‘নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে, পাখমারা গণক শান্তস্বরে বলল। ‘ওর জিভটা ভয়ানক,’ বচনপিসি বলল। ‘তাকানো যায় না।
পাখমারা গণক বলল, ‘বেহুলা, খনার জিভ কেটে যে অত্যাচার করা হয়েছিল, তার প্রতিশোধ নেওয়ার একটা ইঙ্গিত প্রকৃতি দিচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’
বেহুলার মনে হলো সত্যিই প্রকৃতি এবার সুযোগ করে দিল। নৌকার পাটাতনে কাটা বাঁশের টুকরো, পাশে একটা কাটারি। বেহুলা সত্যাচার্যের পাশে হাঁটু মুড়ে বসল। এক হাতে কাটারিটা তুলে নিল, অন্য হাতে সত্যাচার্যের জিভটা ধরল বেহুলা। চোখ বুজে এক বড় শ্বাস নিল বেহুলা। তারপর কাটারি রেখে সত্যাচার্যের মুখের ভিতর জিভটা ঠেলে ঢুকিয়ে গ্রহবিপ্রের মুখ বন্ধ করে দিল। ‘প্রারন্ধের প্রতিশোধের খেলা এবার বন্ধ হোক,’ বেহুলা বলল। ‘সত্যঠাকুরের মৃতদেহের সৎকারও জিতকাটির মন্দিরের ভিতরেই করা হোক। তোমরা সতাঠাকুরের মৃতদেহ নিয়ে জিভকাটির মন্দিরে নিয়ে এস।’
পাখমারা গণক করজোড়ে চোখ বন্ধ করে গ্রহবিপ্রের উদ্দেশ্যে প্রণাম করল। তাঠাকুরের মৃতদেহ সাদা চাদরে মুড়িয়ে জিতকাটির মন্দিরে আনা হল। বেহুলা পথ দেখিয়ে সকলকে নিয়ে এল সেই চৌকো কুঁয়োর পাশে। তারপর বলল, সত্যঠাকুরের মৃতদেহ এখানে চির বিশ্রাম করুক।
সত্যঠাকুরের মৃতদেহকে সাদা চাদরে বেঁধে দুটো বাঁশের ওপর শুইয়ে বেঁধে ইঁদারার প্রান্তে নিয়ে এসে সেই চাদরে মশাল দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হল। সত্যঠাকুরের মৃতদেহকে ঘিরে লেলিহান অগ্নিশিখা নেচে উঠল। এবার বেহুলা এগিয়ে গিয়ে সত্যঠাকুরের জ্বলন্ত দেহের দিকে নতমস্তকে প্রণাম করে বলল, ‘ঠাকুর, আপনার প্রেমিকা বহুকাল ধরে আপনার অপেক্ষা করছে। বেহুলার ইশারায় বিশ্বনাথ আর বুধন জ্বলন্ত বাঁশের দু’দিক ধরে বাঁশ সমেত সত্যঠাকুরের জ্বলন্ত দেহ ইঁদারায় নিক্ষেপ করল। অগ্নিদগ্ধ শরীর অন্ধকার ইঁদারাকে আলোকিত করতে করতে নীচে নামতে নামতে ইঁদারার জলে গিয়ে পড়ল। বেহুলার মনে হলো সেই অগ্নিদৃশ্য ওর সর্বাঙ্গে যেন শান্তিবারির শীতলতা এনে দিল।
