বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১৫
।। পনেরো।।
১১ আগস্ট, ২০১৯
মিস বসাকের দৃষ্টিতে অস্থিরতা। মুখ ফ্যাকাশে। ফুসফুসযন্ত্র যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেছে। পেশিগুলো শক্ত। বোঝা যাচ্ছে ভদ্রমহিলা খুবই নার্ভাস।
‘চিন্তা করবেন না,’ নমিতা পাশে বসে ফিসফিস করে আশ্বাস দিল। ‘ঠিক হয়ে যাবে সব।’
‘দেওয়ালে ওই মাতিজের কিং’স স্যাডনেসের জায়গায় আমার আর শমীকের একটা ফটো টাঙানো থাকতো,’ মিস বসাক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
নমিতা বুঝতে পারছে সাতাশ বছর আগেকার শ্বশুরবাড়ির স্মৃতি হুড়মুড়িয়ে মিস বসাকের মাথায় ঢুকে একটা প্রাণঘাতী সুনামির মত ওঁর চেতনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সপ্তাহে শুধু রোববার বিদ্যাদির প্ল্যাটফর্মের স্কুল বন্ধ থাকে। নমিতা আর বিদ্যাদিও এসেছে মিস বসাকের সঙ্গে আরুষির কাছে। তিনজনে আরুষিদের বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করছে সুব্রত মিশ্রের জন্য।
সুব্রত মিশ্র ভিতরে ঢুকলেন। মাধবী বসাক দাঁড়িয়ে উঠলেন ‘আরুষি কেমন আছে?’
‘ভাল। তবে একটু বুঝে কথা বলতে হবে,’ সুব্রত মিশ্র বললেন। ‘চলো ভিতরে।’
‘আমরাও আসি?’ নমিতা বলল।
‘হ্যাঁ, সেটাই ভাল হবে।’ বৃদ্ধ বললেন।
.
আরুষির ঘরে ঢোকার সময় নমিতার বুক দুরুদুরু করছিল। মাকে দেখে মেয়ের কেমন রিঅ্যাকশন হবে কে জানে! আরুষি ওর বেডরুমে বিছানায় শুয়ে ছিল। বিছানার পাশে কয়েকটা চেয়ার পাতা। মিস বসাক ঢুকতেই আরুষি দু’চোখ বন্ধ করল। মিস বসাক দেওয়ালে শমিক মিশ্রের ফটোটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সুব্রত মিশ্র চেয়ার দেখিয়ে দিলেন—‘বসুন। যা প্রশ্ন করার তাড়াতাড়ি করলেই ভাল হয়।’
মিস বসাক সৌজন্য এড়িয়ে ডায়েরির পাতা খুলে সোজা পয়েন্টে চলে এলেন, ‘আমি শুরু করতে চাই একটা প্রশ্ন দিয়ে—মেহেতাকে কেন ফায়ার করেছ?’
যার উদ্দেশ্যে এই প্রশ্নটা করা হল সে তার দৃষ্টিকে কড়িকাঠে চুম্বকের মতো আটকে রেখেছে। মায়ের দিকে তাকাচ্ছেও না। সে চোখের দৃষ্টিতে অভিমানের থেকে ঘৃণা বেশি।
সুব্রত মিশ্র গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘অ্যাকচুয়ালি
‘ওকে বলতে দিন প্লিজ, মাধবী বসাক বললেন।
আরুষি একটা বড় শ্বাস নিল, তারপর বলল, ‘আমার সন্দেহ হয়েছে যে মেহেতাকে ওরা কিনে নিয়েছে। আদিত্য মেহেতা এই ট্রায়াল জেতার জন্য লড়ছে না।’
‘কেন এমন সন্দেহ হল?’
‘মেহেতা পেটেন্ট সার্চ ডিউ ডিলিজেন্টলি করেনি,’ আরুষির রাগ আর হতাশা মিশ্রিত দৃষ্টি। ‘বায়োপাইরেসি বন্ধ করার জন্য ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের ইন্ডিয়া’স ট্র্যাডিশনাল নলেজ ডিজিটাল লাইব্রেরি নামক এক ডেটাবেস আছে। এই ডেটাবেসে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ওষুধের চারটি প্রধান শাখা: আয়ুর্বেদ, সিদ্ধ, ইউনানি এবং যোগ থেকে উদ্ভূত অনুশীলন এবং ফার্মাসিউটিক্যাল সূত্র-সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ এবং ক্যাটালগ করা আছে। ভারত সরকারের ডিজিটাল লাইব্রেরিতে ৩৪ মিলিয়নেরও বেশি পৃষ্ঠা রয়েছে। মেহেতা বলেছে ডেটাবেস সার্চ করে এই হার্বসের প্রাচীন ব্যবহার সম্বন্ধে কিছু পায়নি। শেষের দিকে মেহেতার ব্যবহার আমার সন্দেহ হতে লাগল, ও যেন দায়সারা ভাবে ট্রায়াল লড়তে হবে তাই লড়ছে মনে হলো। আমি একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট এজেন্সিকে দিয়ে এই হার্বস সম্বন্ধে ডেটাবেস সার্চ করিয়েছিলাম। ওরা বলল কিছু কিছু উল্লেখ ওখানে আছে। তাছাড়া ওরাই আমাকে ‘বেহুলার খনা’ বইটা দেখায়। মেহেতা ডিলিজেন্টলি খোঁজই করেনি। আমি মেহেতাকে দেখাতে মেহেতা এই বই নিমরাজি হয়ে কোর্টে সাবমিট করে। তারপর অ্যামফার্মা সেটাকে এক্সপার্টদের দিয়ে রিভিউ করায়। তথাগতকে জেরা করা খুব দরকার। আমি মেহেতাকে বারবার বলেছি, কিন্তু মেহেতা কিছুতেই তথাগতকে কোর্টে আনার জন্য আদালতকে অনুরোধ করছিল না।’
‘এরকম একজন প্রাইম উইটনেসকে আদালতে এনে জেরা না করা আনথিংকেবল। পেটেন্টটা নাকি ওর, অতএব ওকে প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করে তোলা উচিত যাতে আদালতের সামনে সত্য প্রকাশ পেয়ে যায়। ডোন্ট ওরি, আমি তথাগতকে ট্রায়ালে লাইভ টেস্টিমোনির জন্য আদালতে হাজির করাবো। তুমি মেহেতাকে যা যা ডকুমেন্টস দিয়েছ সেগুলো কি আমাকে পাঠাতে পারবে?’
‘দাদুর কাছে পেন ড্রাইভটা আছে।’
পেন ড্রাইভ তৈরিই ছিল। সুব্রত মিশ্র পকেট থেকে বের করে মিস বসাককে দিলেন—‘একটা আগে দিয়েছি। এটাতে সব ডকুমেন্টস আছে।’
‘থ্যাঙ্কস, ‘ মিস বসাক পেন ড্রাইভটা ব্রিফকেসে ঢোকালেন। ‘তথাগত কি সত্যিই এই সাপের বিষের প্রতিষেধক ওষুধের আবিষ্কারক?’
‘না। এটা দাদুর আবিষ্কার।’
‘আপনি এই বিষের ওষুধ আবিষ্কার করেছিলেন?’ মিস বসাকের দৃষ্টি এবার সুব্রত মিশ্রের দিকে।
‘না আমি ঠিক আবিষ্কার করিনি,’ সুব্রত মিশ্র একটু ইতস্তত করে বললেন। ‘এক সময় আমরা সারা বাংলায় গ্রামে গ্রামে আয়ুর্বেদের ওষুধ খুঁজে বেড়াতাম। সেরকম ভাবেই একটা পুঁথিতে লেখা ছিল এই ওষুধটা। সেটা আমাদের নজরে আসে। আমরা তখন সেই ফর্মুলা দিয়ে আমাদের ল্যাবরেটরিতে ওষুধ বানাই।’
‘তার মানে ফর্মুলাটা আপনারা আবিষ্কার করেননি, তাই তো?’
‘ঠিক তাই। সর্পগন্ধা আর গন্ধনাকুলী দিয়ে সাপের বিষের ওষুধের কথা গ্রামের অনেকেই শুনেছে। কিন্তু সেখানে কী কতটা পরিমাণ দিলে কাজ হয় সেটা এই পুঁথিতে লেখা ছিল,’ সুব্রত মিশ্র বললেন।
‘তথাগত আপনাদের থেকে ফর্মুলা ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস শিখে নিয়েছিল?’
‘আমি দৃঢ় নিশ্চিত, আমাদের ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে করতে ও এই ফর্মুলা এবং ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস জেনে নিয়েছিল।’
আরুষি ধরা গলায় বলল, ‘বাবার অমত ছিল ফ্যামিলি বিজনেসে বাইরের কাউকে ল্যাবরেটরির ফর্মুলা শেয়ার করার। কিন্তু আমি কেন ওকে ভালোবেসে ছিলাম? আমি ভাবি আমি কী বোকা! ‘
‘তুমি ওকে বিশ্বাস করেছিলে। ও তোমাকে ঠকিয়েছে। এতে তোমার কোনো দোষ নেই। তবে আহুজা কিন্তু ট্রায়ালে প্রচুর নোংরা কথা বলে তোমাকে এমব্যারাস করবে। তোমার ক্যারেকটার অ্যাসাসিনেশন করবে। তোমার কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না। মেহেতাকে কি তোমার ছোটবেলার পার্সোনাল ট্রমার কথা বলেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তবে কোনো ফারাক পড়ে না কেননা তথাগত সবটা জানে।’ এবার মিস বসাক সুব্রত মিশ্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাদের কোম্পানির মালিকানা কার কাছে?’
‘এটা আমাদের ফ্যামিলি বিজনেস। আগে আমি আর আমার দুই ছেলে ছিলাম কোম্পানির পার্টনার। আমার দুই ছেলে চলে গেল। আমারও এই পার্থিব জগৎ থেকে মন সরে গেল, আমি বেলুড় মঠে গিয়েই দিন কাটাই। আমি গোটা কোম্পানি আরুষির নামে লিখে দিয়েছি। এখন আরুষিই গোটা কোম্পানির মালিক, আমি কোম্পানির বোর্ডে আছি।’
‘কোম্পানি কি এখন চলছে না বন্ধ?’
এবার সুব্রত মিশ্র কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে সংযত করলেন, তারপর বললেন, ‘কোম্পানির ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নেই কোম্পানি রান করাবার জন্য।’
‘কোর্টে লড়তে লড়তে সব শেষ হয়ে গেছে। আমি কী বোকা! সব তথাগত নিয়ে গেল –’ এবার আরুষি দু’হাতে মুখ ঢাকল।
‘আরুষি, নিজেকে সামলাও,’ মিস বসাক বললেন। ‘যা করে ফেলেছ তা নিয়ে আফশোস না করে যা যা করেছ তুমি সেই হিস্ট্রিটা মনে করতে পারলে আমাদের উপকার হবে।’
‘মানে?’
‘তুমি এই ফর্মুলা সংক্রান্ত যা যা কাগজ বা ইনফর্মেশন তথাগতকে দিয়েছ তা কি খুঁজে পাবে?’
‘মেহেতা আমার আর তথাগতের মধ্যে যত করেসপন্ডেন্স হয়েছে সব স্টাডি করেছে। ওগুলো এই পেন ড্রাইভের করেসপন্ডেন্স ফোল্ডারে আছে।’
‘আর কিছু?’
‘আর কী?’
‘তথাগত তোমাদের ল্যাবে কী কাজ করত তার কোনো লিখিত প্ৰমাণ আছে?’
‘এটা মেহেতাও জিজ্ঞাসা করেছিল। কিন্তু আমি অবাক যে তথাগত কোনো রিটেন ডকুমেন্ট ক্রিয়েট করেনি। আমাদের দিক থেকে কিছু ইমেইল আছে কিন্তু ও তার উত্তর না দিয়ে মুখে মুখে আলোচনা করত।’
‘কোনো ফটোগ্রাফ, সিসি ফুটেজ, এনিথিং দ্যাট ক্যান হেল্প আওয়ার কেস-’
‘একটা ডকুমেন্ট আমি পেয়েছিলাম। আমরা ব্যাঙ্গালোরে একটা সেমিনারের জন্য জয়েন্ট পেপার পাবলিশ করেছিলাম। অন্য একটা টপিকে, কিন্তু ওখানে আমাদের দু’জনের নাম আছে এমপ্লয়ি অব সুশ্রুত ফার্মাসিউটিক্যালস হিসেবে।’
‘গুড,’ মিস বসাক বললেন। ‘এইরকম আর যা যা কিছু পাওয়া যায় আমার সব দরকার। আমার একটা ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট টিম আসবে তোমাদের ল্যাবে ফরেনসিক অডিট করতে। তোমাকে কাল কাগজ পাঠিয়ে দেব পারমিশনের জন্য, তুমি সাইন করে দিও।’
‘ঠিক আছে,’ আরুষি বলল।
‘আরেকটা কথা। দিস ইজ অ্যাবাউট পার্সোনাল রিলেশনশিপ। তোমার অ্যাবরশনের পেপারস কি তোমার কাছে আছে?’
‘হ্যাঁ,’ আরুষি এবার ভেঙে পড়ল। ‘আমি কী বোকা! আমি এমন একটা ছেলেকে ভালোবেসেছিলাম!’ আরুষি ডান হাতে দু’চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
নমিতা হতভম্ব। বুঝে উঠতে পারছে না কী করা উচিত। খুব অস্বস্তিতে ঘরের ভিতরের সকলেই। মিস বসাক উঠে দাঁড়িয়ে আরুষির কাছে এসে আরুষির মাথায় হাত রাখলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে আরুষি গর্জন করে উঠে মিস বসাকের হাত ছিটকে সরিয়ে দিল—‘হাউ ডেয়ার ইউ! ডোন্ট টাচ মি!’
মিস বসাক চমকে উঠলেন। আরুষি এবার চেঁচিয়ে উঠল– ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট ইয়োর সিমপ্যাথি। মাইন্ড দ্যাট ইউ আর মাই ল-ইয়ার ওনলি, তুমি আমার মা নও। ডোন্ট টাচ মি। ডোন্ট ফরগেট এই কেস তোমায় প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ দিচ্ছে, তাই তুমি এসেছ। এজন্য আমার কাছে তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আর হ্যাঁ অফ কোর্স, আর আছে তোমার ইগো। তোমাদের সার্কিটে ছড়িয়ে যাবে যে মাধবী বসাক ওর মেয়েকে বাঁচাতে পারল না। তাই তুমি এসেছ আমার হয়ে লড়তে। ইউ আর নট ডুয়িং মি এনি ফেভার। আন্ডারস্ট্যান্ড!’
‘আরুষি—আয়্যাম সরি!’ মিস বসাক পিছিয়ে এলেন।
‘গেট আউট!’ আরুষি চিৎকার করে উঠল। আরুষি হাঁফাচ্ছে।
সুব্রত মিশ্র এবার হাত জোড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আরুষির শরীরে এই উত্তেজনা খুব ক্ষতিকর। আপনারা প্লিজ এখন আসুন।’
মাধবী বসাক বোধহয় মেয়ের থেকে এতটা ঝাঁঝাল ব্যবহার আসা করেননি। ওঁর মুখে যেন কালসিটে পড়ে গেল। একটাও কথা না বলে মাথা নীচু করে ডায়েরিটা ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে নমিতাকে ইঙ্গিত করলেন যে যেতে হবে। নমিতা আর বিদ্যাদি মাধবী বসাকের পিছন পিছন বাইরের রাস্তায় নেমে এল। নমিতা সান্ত্বনা দেবার জন্য মিস বসাককে বলল, ‘আপনি কিছু—’
‘আমি ঠিক আছি, ড. স্যান্যাল,’ মাধবী বসাক সানগ্লাসেস দিয়ে চোখ ঢাকলেন। ‘আমি শুধু একটা জিনিস জানি, তা হল আই মাস্ট উইন দিজ ট্রায়াল। মাধবী বসাক জিতবেই জিতবে, আই সোয়্যার।’
