৪. লালু
লোকটা বেঁটে, মাথায় টাক। সামান্য কুঁজো। পরনে একটা নীল কাপড়ের আর গোলাপি রংচটা হাফ-শার্ট। লোকটা বসে রয়েছে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ের কাছে তৈরি হওয়া ঢাউস মার্কেটটায় ঢোকার সিঁড়ির এক পাশে। লোকটার সামনে একটা গামছা পাতা।
লোকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর কেউ নেই! কেউ থাকবে না! মেসোপটেমিয়া, ব্যাবিলন, মহেঞ্জোদারো, নাইল এ সব জায়গার মানুষ থাকেনি। সবাই শেষ হয়ে গিয়েছে। বাকিরাও থাকবে না। শেষ হয়ে যাবে। তাও তুই ভাবিস যে, তুই অমর। তুই বেঁচে থাকবি সারা জীবন। বুকের কাছে আঁকড়ে রাখবি সোনাদানা, টাকাপয়সা। ভাবিস এমন ভাবেই চলবে সব! কিন্তু গাছের পাতায় বাদামি তো লাগবেই। ফুল তো ঝরবেই একদিন। ধুলোয় তো মিশে যেতে হবেই সবাইকে। তা হলে কিসের এত লোভ? কিসের এত আমিত্ব? আকাশ নীল দেখায়, তার মানে কি আকাশ সত্যিই নীল?”
লোকটা কে? ভিক্ষুক? কিন্তু এমন ভিক্ষুক তো বাপের জন্মে দেখেনি লালু! ও রাস্তা পার করেও ঘুরে দেখল লোকটাকে। মানুষজন সামনে দিয়ে আসছে, যাচ্ছে। দুটো কুকুর কমা চিহ্নের মতো পাশে কুণ্ডলী মেরে শুয়ে আছে। কেউ সে ভাবে পাত্তা দিচ্ছে না লোকটাকে। আর লোকটাও যেন পাত্তা দিচ্ছে না কাউকে। একা একা কী সব বকে চলেছে!
লালু ভাবল ওর কাছে বাড়তি টাকা থাকলে ও দিত। কিন্তু এখন ওর কাছে না আছে বাড়তি টাকা, না আছে বাড়তি সময়। পাখিদা অপেক্ষা করছে ওর জন্য। ওকে যেতে হবে।
বড় রাস্তা থেকে গলিতে ঢুকে গেল লালু। পাখিদার বাড়িটা ও চেনে। পাখিদা বিয়ে করেনি। কলেজ স্ট্রিটের কাছে একটা পাড়ায় একা থাকে। কয়েকবার পাখিদার বাড়িতে গিয়েছে লালু।
বিশাল বড় পুরনো দিনের বাড়ি। ঢোকার মুখেই ভারী জোড়া পাল্লার চার কাঠের ফ্রেমের দরজা। তাতে আবার ঢালাই লোহার কারুকাজ করা, লোহার গুল বসানো। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে সরু করিডোরের মতো। করিডোর গিয়ে শেষ হয়েছে একটা বারান্দায়। সেই বারান্দা চারিদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে একটা চৌকো উঠোনকে। আর এই উঠোন ঘিরেই উঠেছে তিনতলা দালান! সেই তিনতলার একটা ঘরে থাকে পাখিদা। পাখিদা বলে, এই বাড়িকেই নাকি বলে চকমেলানো বাড়ি। কে জানে সত্যি কি না! পাখিদার সব কথা ঠিক বিশ্বাস হয় না লালুর।
পাখিদার ভাল নাম অমূল্যরতন মল্লিক। লোকটার পাখিদের প্রতি ভালবাসার জন্য পাড়ার লোকেরা এই নামে ওকে ডাকে।
ওই বাড়ির ছাদে বিশাল বড় একটা খাঁচা তৈরি করেছে পাখিদা। সেখানে নানান রকম পাখি পোষে লোকটা। লালু অত পাখি-ফাখি বোঝে না। কিন্তু পাখিদা যখন এই নিয়ে কিছু বলে, তখন ও মন দিয়ে পাখিদের কথা শোনার অভিনয় করে। কোন পাখির কী নাম। তারা কী খায়। কেমন করে ডাকে। তাদের লাইফ সাইকেল কেমন, সব বলে পাখিদা। লালু আগ্রহ ভরে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু মনে মনে অঞ্জনার কথা ভাবে।
লালু গ্রামের ছেলে হলেও ফুল, পাখি, গাছ এ সব চেনে না। লোকে ভাবে যারা গ্রামে থাকে, তারা বোধহয় প্রাকৃতিক এই সব জিনিসের নামধাম ঠিকুজি কুলজি সবটা জানে। সব ফালতু কথা। বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমায় যেমন ভাবে গ্রাম আর তার লোকজনকে দেখানো হয়, সেটা যে পুরো বানানো, অধিকাংশ মানুষই সেটা বোঝে না। তারা ভাবে গ্রামের লোক মানেই তারা এই সব প্রাকৃতিক ব্যাপারগুলোয় পটু হবে!
তবে একটা ব্যাপার। গ্রামের কথা ও কাউকে বলে না। এক কৌশানি ম্যাডাম আর বিন্দি ছাড়া অন্য কেউ জানে না যে, ওর গ্রাম কোনটা। এমনকি, কবিকেও ও বলেনি। বলেনি, কিন্তু আশ্চর্য সমাপতন এটাই যে, কবির গ্রামটাও ওদের গ্রামের পাশেই!
কেন যে বলেনি, সেটা নিজেই জানে না লালু। কিন্তু বলেনি। আর বলবেও না চট করে। ওর যে অতীত আছে, সেটা খুব কিছু সুখের নয়। তাই ওই সব কথা মনে আনতে চায় না ও। অতীত মানে ভূত। সেটাকে কাঁধে চাপতে দিলেই মুশকিল! কারণ, লালু জানে, এই ভূতটা সাংঘাতিক ভাবে ওলটপালট করে দিতে পারে সব কিছু!
তবে একদম মনে না করতে চাইলেও সবটা কি আর ওর নিজের হাতে থাকে! ওই একটা মুখ যে মাঝে মাঝেই এসে হানা দেয় স্মৃতিতে! আর তখন কী যে কষ্ট হয় ওর! সেই ছোট বয়সের সব কিছু আবছা হয়ে গেলেও বাবার সেই মুখটা কেন এখনও এমন স্পষ্ট হয়ে আছে মনের মধ্যে কে জানে! ওর কত অল্প বয়সেই তো বাবা খুন হয়ে গিয়েছিল। ওদের বাড়িতে বাবার মরদেহ আনার পরে লালু দেখেছিল মর্গ থেকে কেমন ব্যান্ডেজ করে কাপড় দিয়ে মুড়ে দিয়েছে দেহটা। শুধু মুখটা বেরিয়ে আছে। সেই মুখ! নিথর! ফ্যাকাসে!
লালু ভাবে এত দিনে মুখটা তো স্মৃতিতে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা! কিন্তু তা আর হল কই! মৃত বাবার ওই নীলচে কালো ঠোঁট। বন্ধ চোখ। ভুরুর ওপর উড়ে উড়ে এসে বসা মাছি। গালের কাটা দাগ, সব যেন এখনও তাড়া করে ফেরে ওকে!
পাখিদাদের বাড়ির দরজাটা আজ খোলা রয়েছে। ভেতর থেকে চিল চিৎকার শোনা যাচ্ছে! লালু একটু থমকে গেল। এই রে ঝামেলা হচ্ছে নাকি!
শরিকি বাড়িতে থাকে পাখিদা। মোট ঊনচল্লিশ জন মেম্বার! ভাবা যায়! পাখিদা বলেছে, ওদের কোনও এক পূর্বপুরুষ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে দালালি করে প্রচুর টাকা রোজগার করেছিল। সেই টাকা দিয়েই কলেজ স্ট্রিটের কাছে নবীন কুণ্ডু লেনের এই বাড়িটা তৈরি করেছিল সেই মানুষটি। তার পর যা হয়, আস্তে আস্তে সেই সব ঐশ্বর্য অপদার্থ বংশধরদের হাতে পড়ে নষ্ট হয়েছে। এখন এই বিশাল বাড়িটা যেন বুড়ো বটগাছের মতো হয়ে গিয়েছে। ফাটল-ধরা, ধূলিধূসর এক আবাসস্থল! যার ডালে ডালে অনেক মানুষের বাসা!
পাখিদা লালুকে বলেছে, “জানিস লালু, আমি পাখি ভালবাসি বলে কিন্তু আমায় লোকে পাখি বলে ডাকে না। পাখি বলে ডাকে কারণ, এই বুড়ো বটের মতো বাড়িতে ছোট ছোট পাখির বাসা তৈরি করে আমরা থাকি বলে। তা ছাড়া সারাক্ষণ এখানে পাখিদের মতোই কিচিরমিচির লেগে আছে। তাই পাখি।”
কিন্তু তা হলে তো বাড়ির সবাইকে পাখি বলা যেত! কেন পাখিদাকেই শুধু এই নামে ডাকা হয়?
না, লালু আর এ সব জানতে চায়নি। পাখিদা মাঝে মাঝে এমন ফিলোসফার হয়ে যায়! আর হাবিজাবি বকে! তাই তো লালু ওর সব কথা বিশ্বাস করে না। ও জানে পাখি পোষা থেকেই অমূল্যরতন আজ পাখিদা।
কিন্তু আজ বাড়িতে ঢুকেই এমন ঝগড়ার মধ্যে পড়ল যে, পাখিদার বলা সেই কিচিরমিচির কথাটা মনে পড়ে গেল!
উঠোনের মাঝে একদল মানুষ জড়ো হয়ে আছে। তার মধ্যে দু’জোড়া নারী-পুরুষের মধ্যে চূড়ান্ত ঝগড়া হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে যে-দু’জন পুরুষ, তারা তুতো সম্পর্কের ভাই। আর মহিলা দু’জন তাদের স্ত্রী। লালু দেখল, একজন মহিলা বেশ মুখখারাপ করে কথা বলছে। আর তার পাশে একটা সবুজ রঙের প্লাস্টিকের কল থেকে ছড়ছড় শব্দে জল পড়ে নীচে পেতে রাখা বড় চৌকো মুঙ্গেরি পাথরখানা ভেসে যাচ্ছে!
লালু দেখল, এদের মধ্যে একজন মহিলা অর্ধেক ভিজে অবস্থায়। তার হাতে একটা হলুদ রঙের মগ। বুকের কাছে উঁচু করে শায়া বাঁধা।
লালুর অস্বস্তি হল। এমন অবস্থায় এত লোকের মাঝে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাবতেই কেমন একটা লাগল ওর। কিন্তু আশপাশের কারও যেন হুঁশ নেই!
লালুর এই সব ঝগড়াঝাঁটি ভাল লাগে না একদম। ও ধীরে ধীরে উঠোনের পাশ দিয়ে গিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়িতে পা রাখল। সিঁড়ির পাশে একটা খাঁচা ঝুলছে। সেখানে একটা টিয়াপাখি বসে ঝিমোচ্ছে এখন। এই যে ঝামেলা হচ্ছে, সেই দিকে মন নেই পাখিটার। সে গুটিসুটি মেরে দাঁড়ে বসে আছে চোখ বন্ধ করে! দেখলেই বোঝা যায় বয়স্ক পাখি। গায়ে পালকের রংটাও কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। যেন পুরনো রংচটা টিনের খেলনা!
পাখিটাকে দেখে গ্রামের বাড়ির বড়দাদুর কথা মনে পড়ে গেল লালুর। শেষের দিকে এমন করেই বাড়ির জামগাছটার নীচে একটা কাঠের টুলে বসে থাকত দাদু। কথা বলত কম। খাওয়াদাওয়া করত আরও কম। শুধু মাঝে মাঝে বাড়ির তালগাছের ডগাটার দিকে তাকিয়ে সেখানে বাসা বাঁধা শকুনদের দেখত। কখনও আবার অস্ফুটে বলত, ‘হয়ে এল… হয়ে এল… মৃত্যুর আগে কি মানুষ এরকম চুপ করে যায়! সে কি বোঝে তার এবার এই পৃথিবীর মায়া কাটানোর সময় হয়ে এসেছে! সবাইকে একদিন ওই দিনটায় পৌঁছোতে হবে! ভাবলেই লালুর গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ওদের গ্রামের এক পাশে ছড়িয়ে থাকা ফাঁকা গা-ছমছমে নীলকর মাঠের শূন্যতার কথা মনে পড়ে!
এখনও লালুর গা-টা ছমছম করে উঠল। ও এই সব চিন্তা থেকে জোর করে মন ঘোরাল, তার পর পাখিটাকে দেখল আবার। ওর মনে হল পাখিটা যেন ধ্যান করছে! যেন এই জাগতিক সব ওঠাপড়া থেকে সে অনেক দূরে চলে গিয়েছে। পাখিটাও কি বড়দাদুর মতো বুঝতে পারছে কিছু? মৃত্যুর আগে পাখিরাও কি এমন চুপ করে যায়?
পাখিদার ছাদে এত পাখি থাকে, কিন্তু এই পাখিটাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে রাখে না কেন কে জানে! ঝগড়াঝাঁটি পিছনে ফেলে তপস্যারত পাখিটাকে পাশে রেখে লালু সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল। কেউ ওকে কিছু জিজ্ঞেস করল না। লালু ভাবল ঝগড়াঝাঁটি দেখার টানই অন্যরকম!
তিনতলায় উঠে একটু হাঁপাল লালু। আসলে এতটা সিঁড়ি বেয়ে ওঠা অভ্যেস নেই ওর। তার ওপর পায়ে একটা অসুবিধে আছে। তার জন্য খুঁড়িয়ে হাঁটে ও। ফলে একটু বেশি এফর্ট দিতে হয় সিঁড়ি ভাঙতে গেলে। তিনতলায় উঠে গেলেও নীচ থেকে ঝগড়ার ফোয়ারা ওপর অবধি উঠে পাখিদা হাতের কাগজটা মুড়িয়ে রেখে খামটা নিল। তার পর মন দিয়ে গুনে দেখল তিরিশটা পাঁচশো টাকা আছে কি না। গোনা হয়ে গেলে, পাখিদা হেসে খামটা গুঁজে রাখল বালিশের তলায়।
আসছে। কথাবার্তা শুনে লালু বুঝতে পারছে যে, বাড়ির নীচের বাথরুমে সিলিং খসে পড়েছে। সেটা মেরামত করতে কার কত টাকা লাগবে, সেটা ঠিক করতে গিয়েই ঝগড়াটা বেঁধেছে!
শরিকি বাড়ির অনেক ঝামেলা। লালু জানে। ওর ছোটবেলাটা কেটেছে যেখানে, সেটা ছিল ওর বাবার মামার বাড়ি। এখন সেই বাড়ি চার দাদুর ছেলেদের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছে। বছর দুয়েক আগে শেষবার যখন গ্রামে গিয়েছিল, তখনই দেখেছিল সেই বাড়ির উঠোনটায় কেমন বড় পাঁচিল উঠেছে! গাছপালাও ভাগ করা হয়েছে। তাও দাদুদের ছেলেদের মধ্যে, বৌদের মধ্যে কী ঝগড়াই না হয়! আগে সবাই যখন একসঙ্গে ছিল, তখন কিন্তু এমন হত না। একবার ভাগাভাগির পাঁচিল ওঠা শুরু হলেই মানুষের মনেও পাঁচিল ওঠে।
টাকাপয়সা খুব খারাপ জিনিস। লালু বোঝে। আবার এর চেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিছু নেই সেটাও বোঝে। তবে লালু এ সব নিয়ে মাথা ঘামায় না। ওর আগে বা পরে কেউ নেই। একা মানুষ। যেখানে কাজ করে সেখানেই থাকে। খাবার পায়। যা মাইনে পায়, সেটা বিশাল কিছু না হলেও নিজের মতো চলে যায়। তার সঙ্গে উপরি তো আছেই। ম্যাডামের যতবার ছেলে দরকার হয়, পাখিদার কাছ থেকে কমিশনের টু পারসেন্ট পায় লালু! সেটা বিশাল না হলেও মাসে ছ’-সাত বার এ সব দরকার পড়ে ম্যাডামের। হাজার দুয়েকের মতো উপরি হয়েই যায়!
সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে একটু হাঁপাল লালু। তার পর ধীরে ধীরে লম্বা টানা বারান্দা ধরে এগোতে লাগল। এই বাড়ির বারান্দার মেঝে মার্বেলের। চারিদিকে কালো বর্ডার দেওয়া। কী সুন্দর যে লাগে! অযত্নে যদিও তাতে এখন অনেক ফাটল। তাও নেই নেই করে এখনও যা আছে, তাতেই বোঝা যায়, এই বাড়ির যৌবন কেমন ছিল।
টানা বারান্দার এক পাশে ডাঁই করে রাখা আছে পুরনো ভাঙাচোরা আসবাব। তাতে পুরু করে ধুলো পড়ে আছে। লালু সে সবের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।
বারান্দার শেষে ডান দিকে একটা দরজা। ওটাই পাখিদার ঘর।
দরজার সামনে গিয়ে পা থেকে জুতোটা খুলল লালু। তার পর মোটা পাপোশে পা মুছে ঘরে ঢুকল। দরজা খোলাই ছিল, তাই আর টোকা দিল না।
ঘরটা বেশ বড়। ঘরের এক পাশে জানলা ঘেঁষে একটা কালো কাঠের পালঙ্ক রাখা। যদিও তার একটা দিকের ছত্রি ভাঙা। সেই পালঙ্কেই শুয়ে আছে পাখিদা।
লালু ঘরে ঢুকতে পাখিদা ওর দিকে তাকিয়ে হাসল। তার পর চোখের ইশারায় একটা মোড়ায় বসতে বলল।
মোড়াটা বড়। পুরনো। বেশ অভিজাত দেখতে। কী একটা ঘাস দিয়ে নাকি বোনা। আর বসেও বেশ আরাম হয়। গোটা বাড়িটা ভাঙাচোরা ধুলোমলিন হলেও একটা অভিমানী আভিজাত্য মেঘের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো নীল আকাশের মতো মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ে।
পাখিদার চোখ লাল। চুল উস্কোখুস্কো! হাতে একটা খবরের কাগজ ধরা আছে।
লালু মোড়ায় বসে কাঁধের ব্যাগ থেকে খামটা বের করল। এতে পনেরো হাজার টাকা আছে। ও খামটা এগিয়ে দিল পাখিদার দিকে।
পাখিদা হাতের কাগজটা মুড়িয়ে রেখে খামটা নিল। তার পর মন দিয়ে গুনে দেখল তিরিশটা পাঁচশো টাকা আছে কি না। গোনা হয়ে গেলে, পাখিদা হেসে খামটা গুঁজে রাখল বালিশের তলায়। এবার মাথার বালিশের পাশে রাখা কচ্ছপের পিঠের মতো মানিব্যাগটা হাতে নিল পাখিদা। সেখান থেকে তিনটে একশো টাকার নোট বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিল। বলল, “ধর।”
পনেরো হাজারের টু পারসেন্ট। ওর কাট। দালালি বলা যায় কি একে? প্রথমে এমন করে টাকা নিতে খারাপ লাগত লালুর। ওর মনে আছে, পাখিদার সঙ্গে আলাপ হওয়ার দ্বিতীয় দিনে ওকে টাকা দিতে চেয়েছিল পাখিদা। বলেছিল, “প্রথম দিন কী বলেছিলাম মনে আছে? আজ থেকে কাট পাবি তুই!”
লালু সজোরে মাথা নেড়ে বলেছিল, “এ টাকা আমি নেব না গো। এ সব জিনিসের টাকা নিলে আমার পাপ হবে।”
“পাপ?” পাখিদা হেসেছিল। ওরা সে দিন বালিগঞ্জ স্টেশনের ওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
পাখিদা জোর করে টাকাটা ওর বুক পকেটে গুঁজে দিয়ে বলেছিল, “তুই কাউকে ঠকাচ্ছিস না। কাউকে খুন করছিস না। ফলে কিসের পাপ রে! তোর ম্যাডাম জানে রেট কী! সেখান থেকে কে কত টাকা পাচ্ছে, সেটা আমাদের ব্যাপার। তুই ফালতু এ সব নিয়ে ঢ্যামনানো করবি না।”
লালু বিব্রত গলায় বলেছিল, “না মানে এমন দালালি…”
পাখিদা ব্রিজের নীচ দিয়ে যাওয়া লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালের দিকে তাকিয়ে নাক দিয়ে একটা অবজ্ঞার শব্দ করে বলেছিল, “ভাটের কথা রাখ তো! দালালি! কোনও কোনও নেতা-মন্ত্রীরা এই করে গাড়ি-বাড়ি থেকে শুরু করে কী না কী কিনে ফেলল! সেখানে দু’-চারশো টাকা নিবি, সেটাও নাকি দালালি! এই যে আমার পূর্বপুরুষ। যার এত বড় বাড়িতে আমরা কৃমির মতো কিলবিল করছি, সে মাল দালাল ছাড়া আর কী ছিল রে! তার বংশধর আমি। আমিও ব্যাটাছেলে, মেয়েছেলেদের দালালি করি। বেশ করি। সেক্স চিরকালই একটা কমোডিটি। যার মার্কেট প্রাইস খুব ভাল। এমন একটা ইন্ডাস্ট্রি, যাতে লস নেই কোনও। বুঝেছিস? জানবি, মিডলম্যান হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়! এ হল কোনও ইনভেস্টমেন্ট ছাড়া, কনট্যাক্টের জোরে মাথা খাটিয়ে রোজগার ভাই। অবহেলা করিস না। দালাল কোনও গালি নয়, এটা প্রফেশন। এর নামে রাস্তাও আছে।”
লালু তার পর থেকে আর কিছু বলেনি। তবে ও একটা জিনিস দেখেছে। টাকার একটা মেডিসিনাল প্রপার্টি আছে। মলমের মতো খানিকটা। মনের ক্ষত বেশ সারিয়ে দেয়! ওরও দিয়েছে।
টাকাটা নিয়ে পকেটে রাখল লালু। এখনকার দিনে সবাই ডিজিটালি টাকাপয়সা লেনদেন করে। কিন্তু পাখিদা সে সবে নেই। বলে, “ডিজিটাল লেনদেনে একটা ট্রেল থেকে যায়। কী দরকার ভাই! ক্যাশ পয়সা জিন্দাবাদ!”
লালু বলল, “যে-ছবি আর ভিডিয়ো দেখিয়েছ, সেই ছেলেই যাবে তো? ম্যাডাম লাস্ট বার হেভি ক্ষার খেয়ে গিয়েছিল। ভিডিয়োতে মনে হয়েছিল ছেলেটা লম্বা। ও মা! কাছে গিয়ে দেখে বাঁটকুল মাল! আর ফার্নিচারও নাকি সেরকম ভাল নয়। আমায় শালা কী ঝাড়ল! এবার যেন এমন না হয়! তা হলে আমায় আবার নতুন কোনও পাখিদার খোঁজ করতে হবে!”
লালু বলল, “যে-ছবি আর ভিডিয়ো দেখিয়েছ, সেই ছেলেই যাবে তো? ম্যাডাম লাস্ট বার হেভি ক্ষার খেয়ে গিয়েছিল। ভিডিয়োতে মনে হয়েছিল ছেলেটা লম্বা। ও মা! কাছে গিয়ে দেখে বাঁটকুল মাল!”
পাখিদা উঠে বসল। মাথার এলোমেলো চুল হাত দিয়ে পাট-পাট করতে করতে বলল, “আরে ভাই, এত বছরে এই একবার মাত্র এরকম হল। এর আগে কোনও দিন হয়েছে? পরেও হবে না। এই ছেলেটা ছ’ফুট। একটা জিমের ইন্সট্রাকটার। দারুণ চেহারা! ফার্নিচারও ভাল। আমি চেক করেই মাঠে নামিয়েছি ভাই। পাখিদা গান্ডু নয়! তুই বেকার লোড নিস না তো। তার চেয়ে একটু চা কর না! জ্বর এসেছে। উঠে শালা চা করব সেটাও ইচ্ছে করছে না। আমারটা লাল কিন্তু। চিনি ছাড়া। কড়া করে করিস। মাথাটাও ধরে আছে।”
হ্যাঁ পাখিদার জ্বর বলেই ওকে বাড়িতে আসতে বলেছে আজ। না হলে পাখিদা বাইরেই এ সব মিটিয়ে নেয়।
পাখিদার এই ঘরটা বড়। এর সঙ্গে লাগোয়া একটা ছোট্ট ঘর আছে। সেখানে একটা সিঙ্গল বার্নারের গ্যাস রয়েছে। পাখিদা দুপুরে আর রাতে বাইরেই খেয়ে নেয়। শুধু খুব দরকারে টুকটাক রান্না করে। বছর দুয়েক আগে মা মারা যাওয়ার পর থেকে পাখিদা একা। এর আগেও এখানে এসে চা করেছে লালু। মোটামুটি জানে কোথায় কী আছে!
দু’কাপ চা করে এনে লালু আবার মোড়ায় বসল। একটা কাপ বাড়িয়ে দিল পাখিদার দিকে।
পাখিদা কাপটা নিয়ে সোজা হয়ে বসল এবার। তার পর শব্দ করে চায়ে চুমুক দিল একটা। চোখ বন্ধ করে যেন চায়ের স্বাদ শরীরের প্রত্যন্ত জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে দিল। তার পর বলল, “পেপারে দেখলাম, কী একটা ভাইরাস নাকি হেভি জ্বালাচ্ছে চিনে, ইউরোপে! করোনাভাইরাস না কী যেন! হেভি নাকি ছোঁয়াচে! শুনেছিস কিছু?”
লালু শুনেছে আবছা। কিন্তু এ সব জেনে ও কী করবে! কলকাতা থেকে চিন অনেক দূর। এ সব ভেবে লাভ নেই! ও তাই ‘না’ সূচক মাথা নাড়ল।
পাখিদা বলল, “এখানে এসে পড়লে শালা যা-তা অবস্থা হবে কিন্তু! আমাদের তো হাগা-মোতা-খাওয়া সব এক জায়গায়! লোকজনের বোধ কম। সবাই সব বেশি জানে, বোঝে! কাউকে ভাল কথা বললেও, সেটা ইগোয় নিয়ে উল্টো কাজ করবে! তার সঙ্গে এমন গিজগিজে ভিড়। বুঝতে পারছিস কেসটা একবার এখানে হলে কী ক্যান্টার হবে!”
লালু পাত্তা দিল না। চিন-ফিনের ভাইরাসের কথা শুনে ও কী করবে! আর কলকাতায় যদি ইনফেকশন হয়, তা হলে কী হবে সেটা ভেবেই-বা ওর কী লাভ! এ সব যদির কথা নদীতে বিসর্জন দেওয়াই ভাল। ও বলল, “ম্যাডামের মেয়ে এসেছে বিদেশ থেকে। তাই বেশি রাত করতে পারবে না। তুমি ঠিক টাইম মতো ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিয়ো কিন্তু।”
“ধুর! তোর শালা এক পোঁ! সব ঠিক হবে। তুই বেকার ঝামেলা করিস না তো! শোন, নেক্সট মান্থে দিল্লি থেকে একটা ছেলে আসবে। অভিনেতা। মুম্বইয়ে ফিল্মে সাইড রোলে টুকটাক কিছু কাজ করেছে। হিরোর বন্ধু, হিরোইনের ভাই টাইপ। চেহারায় হেভি পালোয়ান। তোকে কিছু ছবি মেসেজ করে দেব। ম্যাডামকে দেখাস। তবে রেট গুরু হাই। পার শট পঞ্চাশ হাজার! দু’ঘণ্টা টাইম,” পাখিদা চা শেষ করে পালঙ্কের পাশের একটা টেবিলে রাখল কাপটা।
“পঞ্চাশ!” লালু চমকে উঠল, “এত টাকা!”
“কোথায় এত!” পাখিদা হাসল, “লাখ লাখ টাকা চার্জ হয় কারও কারও! এ মাল নতুন এই অঞ্চলে, তাই রেট কম রেখেছে। মার্কেট ধরতে চায় আগে। ইনিশিয়াল ডিসকাউন্ট আর কী! তুই ম্যাডামকে বলিস ব্যাপারটা। বুঝেছিস? আমি ডিটেল দিয়ে দেব।”
লালু চা শেষ করে কাপটা কোথায় রাখবে ভেবে এদিক-ওদিক তাকাল। পাখিদা বলল, “আরে, এক কোণে রেখে দে। কাজের দিদি আসবে একটু পরে। যাক গে, যা বললাম সেটা মাথায় রাখিস। এখন কাট। আমার একটু কাজ আছে।”
কাজ? এই না বলল জ্বর! তা হলে! তবে হবেও-বা! ওর কী দরকার! কথা না বাড়িয়ে লালু উঠল। বসে থেকে আর কাজ নেই। ব্যাগটা ঝুলিয়ে নিল কাঁধে। ইদানীং ম্যাডাম ওকে একটা সস্তার ট্যাব কিনে দিয়েছে। তাতে নানা কাজের হিসেব লিখে রাখে ও। আর সেখানেই এই সব ছবি-টবি ওকে পাঠায় পাখিদা!
নীচে নেমে এসে লালু দেখল, ঝগড়া ভেঙে গিয়েছে। নীচের উঠোন প্রায় ফাঁকা! এক কোণে বড়ি শুকোতে দেওয়া আছে অনেকটা জুড়ে, আর একটা বাচ্চা ছেলে হাতে একটা লকপকে লাঠি নিয়ে পাহারা দিচ্ছে সেই বড়ি। তারে মেলা আছে সারি সারি কাপড়। আর উঠোনের অন্য পাশে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে কয়লা রাখা আছে! ও অবাক হল। এখনও লোকে শহরে কয়লা দিয়ে রান্না করে!
লালু সিঁড়ির পাশে তাকাল। দেখল টিয়াটি এখনও তপস্যায় রত! শীতের শেষ এখন। এই সময়টা কলকাতায় কেমন একটা শুকনো হাওয়া দেয় মাঝে মাঝে। আজও সেই হাওয়াটা দিচ্ছে। ও বাড়ির সদর দরজা পার করে রাস্তায় এসে দাঁড়াল।
এই গলিটা তেমন চওড়া নয়। চারপাশে পুরনো বাড়ি যেন ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। ভিড় বাসে চড়লে যেমন মনে হয়, এখানে এলেও ঠিক তেমন লাগে লালুর।
গলি থেকে বড় রাস্তায় বেরোল ও। গলির স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা ছায়া থেকে রোদে বেরিয়ে বেশ ভাল লাগল লালুর। রাস্তার ওপরের একটা পানের দোকান থেকে সিগারেট কিনল। না, প্যাকেট নয়। একটা। ও গোটা প্যাকেট কেনে না। প্যাকেট কিনলে বেশি খাওয়া হয়ে যায়। তাই খুব ইচ্ছে হলে একটা করে কিনে খায়। এই আজ যেমন ইচ্ছে করছে।
পকেটে বাড়তি তিনশো টাকা এখন ওর। এই টাকাগুলো ও খরচ করে না। ওর ঘরে একটা ছোট্ট খালি চকোলেটের বাক্সে জমিয়ে রাখে।
গত দেড় বছর আগে ম্যাডাম ইউরোপে ঘুরতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ম্যাডাম ওর জন্য একটা টি শার্ট আর এক বাক্স চকোলেট এনে দিয়েছিল। সেই বাক্সটায় ও এখন এই বাড়তি টাকা জমায়।
সিগারেটটা ধরিয়ে লালু পকেট থেকে মোবাইল বের করল। তার পর ম্যাডামকে মেসেজ করল একটা। লিখল যে, কাজ হয়ে গিয়েছে, জিনিস ঠিক সময় পৌঁছে যাবে।
গ্রামে থাকার সময় পঞ্চাশোর্ধ মহিলাদের কাকিমা, মাসিমা বা কাউকে কাউকে দিদা বলেও ডাকত লালু। তারা খুব আটপৌরে জীবনযাপন করত। সেই বড় হয়ে ওঠার বয়সে লালু বুঝত, তাদের জীবনে যৌনতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই!
কলকাতা ওর যৌনতার ধারণাও পাল্টে দিয়েছে। এখানে দেখেছে যে, মহিলাদের পঞ্চাশোর্ধ বয়সটা কোনও বয়সই নয়! এই বয়সেও তাদের যৌনতা দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। লালু এখানে আসার পরে বুঝেছে যে, যৌনতাকে পাপের সঙ্গে এক করে ফেলাটা কোনও কাজের কথা নয়। জীবনে যা কিছু অমোঘ, সেই তালিকায় যৌনতাও পড়ে। আর, কে কার সঙ্গে যৌন সম্বন্ধ স্থাপন করতে চায়, সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার! দু’জনের সম্মতি থাকলেই হল। এর সঙ্গে ঠিক-ভুলের মরালিটি নিয়ে আসা অনর্থক! কারণ, যার যা করার, সুযোগ পেলে সে সেটা করবেই! আর এর সঙ্গে যুক্ত যে-আনন্দ, সেটাকেও জোর করে অস্বীকার করার মানে হয় না। এখন বরং লালুর গ্রামে ফেলে আসা সেই কাকিমা মাসিমাদের জন্য কেমন একটা কষ্ট হয়। মনে হয় আমাদের অনাবশ্যক সামাজিক খবরদারিপনা কত মানুষকেই যে বয়স হওয়ার আগেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা করে দেয়, কত মানুষকেই যে বাঁচার আগেই মেরে ফেলে, তার ইয়ত্তা নেই।
ওর এখনও মনে আছে, এখানে ম্যাডামের কাছে কাজ যোগ দেওয়ার দু’-সপ্তাহের মাথায় একদিন সালোঁর নিজের ঘরে ওকে ডেকে পাঠিয়েছিল ম্যাডাম। একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল লালু। আবার কিছু গোলমাল করে ফেলল নাকি! নতুন চাকরি। বলা তো যায় না! কী থেকে কী করে ফেলেছে!
ম্যাডামের ঘরটা মাঝারি মাপের। মাটিতে মোটা নরম কার্পেট পাতা। গুনগুন করে এসি চলছিল। তার মধ্যে দাঁড়িয়েও ঘামছিল লালু। ছোটদাদুর ছেলে ধরা-করা করে এই চাকরিটা করে দিয়েছে। কলকাতায় কাজ। এখানেই থাকা। এটা চলে যাবে নাকি? কলেজ পাশ করার পরে কয়েকটা বছর ফ্যা ফ্যা করে ঘোরার সেই সময়টা মোটেও সুখের ছিল না। আবার সেই সময়েই ফিরে যাবে নাকি? আবার সেই বাবার মামার বাড়ি! গঞ্জনা! মনখারাপ করে নদীর পাড়ে বসে থাকা!
ম্যাডাম ওর দিকে তাকিয়ে একটা কার্ড এগিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, “এইখানে একজনের নাম আর ফোন নাম্বার আছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা মাল পাঠানোর কথা বলতে হবে আমার রাজারহাটের ফ্ল্যাটে। লোকটার নাম অমূল্যরতন মল্লিক। পাখিদা বলে সবাই। কাল দুপুর দুটো নাগাদ মালটা চাই। পাখিদা জানে। তোকে শুধু যোগাযোগটা বজায় রাখতে হবে। আর এই দশ হাজার টাকা ওকে দিয়ে দিবি।”
“ওকে ম্যাডাম!” লালু মাথা নেড়ে টাকার খামটা নিয়েছিল।
ম্যাডাম বলেছিল, “লালু, তুই কার হয়ে কাজ করছিস জানিস তো?” “হ্যাঁ ম্যাডাম আপনার হয়ে,” লালু বুঝতে পারছিল না এর কী উত্তর দেবে!
“তাই আমি যা বলব তা পাঁচ কান করবি না। কেউ যেন কিছু জানতে না পারে। জানলে তোকে আবার গ্রামে ফিরে যেতে হবে, বুঝেছিস?” ম্যাডাম আর কিছু না বলে সামনে খোলা একটা বড় ম্যাগাজিনের পাতায় মুখ ডুবিয়ে দিয়েছিল। লালু বুঝতে পারেনি মাল পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে এমন প্রচ্ছন্ন হুমকির কী মানে!
তবে সেই দিন বিকেলে পাখিদার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরে সবটাই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
পাখিদার সঙ্গে ওর আলাপ হয়েছিল মেনকা সিনেমার উল্টো দিকে লেকে ঢোকার বিরাট বড় ফটকের সামনে। ও ফোন করায় পাখিদা ওকে ওখানেই আসতে বলেছিল। বলেছিল, “আমি খয়েরি রঙের একটা পাঞ্জাবি পরে থাকব।”
পাখিদাকে চিনতে একটুও অসুবিধে হয়নি লালুর। ও দেখেছিল লোকটা বাদাম খাচ্ছে দাঁড়িয়ে। রোদে পোড়া রং হলেও বোঝা যায় এক কালে লোকটা ফর্সা ছিল।
লালু নিজের নাম বলে ম্যাডামের কথা জানিয়ে দিয়েছিল। তার পর ম্যাডামের দেওয়া টাকার খামটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পাখিদা টাকাটা বের করে গুনেছিল মন দিয়ে। তার পর হেসে বলেছিল, “লালু! আরে বাওয়া! সত্যি করে লালু ছেলে নোস তো! নতুন চিড়িয়া ধরেছে দেখছি ম্যাডাম! শোন, ম্যাডামকে বলিস ছেলে ঠিক সময় পৌঁছে যাবে।”
“ছেলে! ম্যাডাম যে বললেন কী একটা মাল!” লালু অবাক হয়েছিল। “ছেলেরাই তো মাল বাবা! তোমার ম্যাডামের ছেলে লাগে। মানে সেক্স করার জন্য। বুঝেছ? সেই ছেলে সাপ্লাইয়ের দালালি করি আমি।”
লালু কী বলবে বুঝতে পারেনি। এক ধাক্কায় শরীরের সমস্ত রক্ত মুখে উঠে গিয়েছিল।
পাখিদা হেসে বলেছিল, “যা বাবা! এত লজ্জা পেলে হবে? হাগু হিসুর মতো সেক্সও দরকারি। ম্যাডাম বাড়িতে পায় না, তাই মার্কেট থেকে কিনে নেয়। বুঝেছিস? হাবা কোথাকার!”
লালু কী বলবে বুঝতে পারেনি।
পাখিদা এবার পকেট থেকে এক মুঠো বাদাম বের করে ওর হাতে দিয়ে বলেছিল, “শোন, কে কাকে লাগাবে সে সব ভাববি না। তোর কাজ যেটুকু, সেটুকু করবি। তা তোর কাট কত?”
“কাট?” লালু ঢোঁক গিলেছিল।
পাখিদা বলেছিল, “আচ্ছা আতাক্যালানে তো! ঠিক আছে টু পারসেন্ট পাবি। তবে আজ নয়। পরের বার থেকে। আজ জাস্ট বাদামেই খুশি থাক।”
লালু কী করবে বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়েছিল। কাট! এ সব আবার কী? না, ও নেবে না এই সব টাকা। ওকে কী ভেবেছে এই পাখিদা লোকটা?
পাখিদা বলেছিল, “অমন গান্ডুসোনার মতো ফ্যালফ্যালে থোবড়া কেন চাঁদ? এখনকার দিনে ভাল মানুষ আর বোকা মানুষ হল একে অন্যের জ়েরক্স কপি। ভাল হয়েছ কী লোকে মেরে খেয়ে নেবে! তাই গান্ডুপনা বাদ দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়া। এই শহর না হলে গিলে নেবে তোকে।”
সেই দিন আর আজকের দিন! ওর কাট সেই টু পারসেন্টে আটকে থাকলেও, মনে মনে অনেকটা দূর চলে এসেছে লালু। এখন আর এ সবে আশ্চর্য হয় না। জীবন তো আর কম কিছু দেখাল না! এখন ভাল মানুষ আর বোকা মানুষ দুটোকে ও আলাদা করতে শিখে গিয়েছে।
সিগারেটটা শেষ করে মোবাইলেই সময় দেখল লালু। দুপুর নামছে শহরে। আকাশে গরম বালির মতো রোদ। কলেজ স্ট্রিটের ইকিমিকির ভিড় নিয়ে কলকাতা যেন হাঁপাচ্ছে।
এখান থেকে ওকে একবার মহম্মদ আলি পার্কের কাছে যেতে হবে। ম্যাডামের সালোঁয় দিলীপ বসাক নামে একটা লোক নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের কসমেটিক্স সাপ্লাই দেয়। কিন্তু সেই দিলীপ গত দেড় সপ্তাহ হল মাল দিচ্ছে না। এদিকে অ্যাডভান্স নিয়ে বসে আছে। আর ফোন করলেও ধরছে না। ম্যাডাম বলেছে এই ব্যাপারে একটু তাগাদা করতে। তাই ওই অফিসে না গিয়ে উপায় নেই।
শুকনো হাওয়ায় ঠোঁট ফেটে যাচ্ছে। লালু পকেট থেকে ভেসলিনের একটা কৌটো বের করে ঠোঁটে ক্রিম লাগিয়ে নিল।
ওর ব্যাগে আজ অন্য একটা ক্রিমও আছে। ম্যাডামের মেয়ে উর্জা ফিরে এসেছে বিদেশ থেকে। মেয়েটা ভাল। সুন্দরী, ভদ্র। সে-ই আলাপ করার পরে এই ক্রিমটা ওকে দিয়েছে। আর দিয়েছে কিছু চকোলেট। লোকে বিদেশ থেকে এলেই চকোলেট দেয় কেন কে জানে, ভাবে লালু।
যদিও উর্জাকে এই নিয়ে কিছু বলেনি লালু। বরং বিগলিত ভাব দেখিয়ে নমস্কার করেছে।
লালু ঘরে এসে দেখেছিল, ক্রিমটার খুব সুন্দর গন্ধ! কিন্তু ও জানে এ সব ওর জন্য নয়। ওর এই পেট্রোলিয়াম জেলি-ই ঠিক আছে। লালু আজ ক্রিমটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে অঞ্জনাকে দেবে বলে। আর চকোলেটগুলো ছুটিকে।
এখান থেকে মহম্মদ আলি পার্ক যেতে হলে বাস ধরতে হবে। সেটা অবশ্য কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকেই পেয়ে যাবে।
কিন্তু মোড়ের দিকে পা বাড়ানোর আগেই ফোনটা বেজে উঠল পকেটে। এখন আবার কে! ফোনটা বের করে দেখল লালু। অঞ্জনা! এখন! “হ্যাঁ অঞ্জনা, বলো,” লালু কানে লাগাল ফোনটা।
“ছুটির শরীরটা ভাল নেই গো। জ্বর আসছে ঘুরে ঘুরে। পাড়ায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে বলল আরও বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। টেস্ট করাতে হবে অনেক। আমার খুব ভয় লাগছে। জানি, তুমি বিকেল নাগাদ আসবে বলেছিলে, কিন্তু যদি সম্ভব হয় এখন একবার আসবে?” অঞ্জনার গলাটা কান্নার ধারে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে যেন!
লালু দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। এখনই সোনাগাছি যেতে হলে দিলীপ বসাকের কাজটা হবে না। সেটা না হলে ম্যাডাম আবার গালি দেবে! লালু বলল, “আমি একটু দূরে আছি। বিকেলের দিকেই যাচ্ছি। চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক যাব।”
ফোনটা কেটে পকেট ঢুকিয়ে নিজের মনে মাথা নাড়ল লালু। এই শরীর খারাপ ব্যাপারটাকে খুব ভয় পায় ও। ছোট বয়সে মাকে দেখেছে কী ভাবে মানসিক বিষাদ থেকে ক্রমশ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। তার পর থেকে কেউ অসুস্থ হয়েছে শুনলেই কেমন একটা শরীর খারাপ করে ওর। ভয় লাগে।
লালুর বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। ছুটির মুখটা মনে পড়ছে। ওর নিজের মেয়ে না হলেও, ও যাকে পছন্দ করে তার তো মেয়ে! আর ওকেও খুব ভালবাসে ঝিরিকুমার মেয়েটা। সামনে জন্মদিন আসছে ছুটির। ওকে বলেছিল কালার বক্স কিনে দিতে। দিলীপের কাছে কাজ সেরে আজই কোনও দোকান থেকে কিনত। কিন্তু তখনই এমন একটা ফোন আসতে হল!
লালুর বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। ছুটির মুখটা মনে পড়ছে। ওর নিজের মেয়ে না হলেও, ও যাকে পছন্দ করে তার তো মেয়ে! আর ওকেও খুব ভালবাসে মেয়েটা।
সামান্য অন্যমনস্ক ভাবে রাস্তায় পা দিল লালু আর সঙ্গে সঙ্গে ক্যাঁচ করে ব্রেক চেপে একদম ওর গায়ের ওপর এসে দাঁড়িয়ে পড়ল একটা অটো!
লালু থতমত খেয়ে গেল একদম। ও দেখতেই পায়নি যে অটোটা আসছে। অটোটা ব্রেক মেরে দাঁড়িয়ে গেলেও, একটা হালকা ধাক্কা লেগেছে ওর পায়ে।
অটোর পেছনে তিন জন প্যাসেঞ্জার বসে আছে। চালক ছেলেটার বয়স বাইশ-তেইশ হবে।
ভুলটা লালুর। ও তাই দু’হাত তুলে বলল, “সরি ভাই। ভেরি সরি।”
চালক ছেলেটা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলল, “ল্যাংড়া শালা, মরার জন্য আমার অটোটা পছন্দ হল? কেন, ভেতরে আলিয়া ভট্টর ছবি লাগানো আছে বলে?”
“আরে ভাই, সরি বলছি তো!” লালুর খারাপ লাগল। আশপাশের লোকজন তাকাচ্ছে।
ছেলেটা বলল, “উদ্ধার করেছ! শালা কোথা থেকে সব শহরে চলে আসে। হারামি শালা! শুয়োরের বাচ্চা। বাপের ঠিক নেই এখানে মরতে এসেছে! ভাগা”
লালু কিছু বলার আগেই ছেলেটা অটোটাকে গোত্তা খাইয়ে নিয়ে চলে গেল। লালু যেন জমে গেল একদম। ছেলেটা ওকে কী বলল? হারামি? শুয়োরের বাচ্চা! বাপের ঠিক নেই! কান, মাথা ঝনঝন করছে ওর। দৃষ্টি গুলিয়ে যাচ্ছে। কেমন একটা রাগ ধুলোঝড়ের মতো পাক খাচ্ছে মাথায়। ওর বাপের ঠিক নেই।
বাপের ঠিক নেই! বাপ! বাবা! বলতেই সেই লোকটার মুখ মনে পড়ে যায়। মায়ের অসুস্থতার সময় যে লোকটা ছোট্ট লালুকে আঁকড়ে থাকত! সেই লোকটাকে তুলে গালি দিল! ক’দিনই-বা ছিল লোকটা ওর জীবনে! সেই দূর ছোটবেলায় বোর্ডে মুছে ফেলা লেখার মতো ভালবাসার স্মৃতি। আর দৃশ্য বলতে নীলচে কালো নিথর ঠোঁট আর ভুরুর ওপর উড়ে উড়ে বসা একটা মাছি। তাও এই সবের মধ্যেও, ভালবাসাটা ভুলতে পারে না লালু। যেমন ভুলতে পারে না সেই মুখগুলো, যারা সারা জীবন ওর দিকে আঙুল তুলে বলত, “এই ছেলেটার বাবা বাচ্চু বর্ধন খুন হয়েছিল, জানিস! ছেলেটা এখন অনাথ!”
গরম ভুট্টার মতো রোদ্দুর ক্রমে কমলা রং ধরছে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আজকেও আচমকা নিজেকে সেই ছোটবেলার মতো অনাথ মনে হল লালুর। ওর চোখ জ্বালা করে উঠল। ভাবল, কারা খুন করেছিল ওর বাবাকে? তাদের একবার পেলে ছেড়ে কথা বলবে না।
