৫. ঝিরিকুমার
“জোরে মারবে না কিন্তু। ওই দিকের বাগানে বল ঢুকে গেলে বুড়োটা হেব্বি খিটখিট করে। গত সপ্তাহে আমাদের বলটা কেটে দিয়েছিল জানো!” গাবলু ভুরু কুঁচকে, মাথা ঝাঁকিয়ে কথাটা বলল।
ঝিরি বলল, “না না, আস্তে মারব। ব্লক করব জাস্ট। তুই ভয় পাচ্ছিস কেন?”
“অ্যাঁ, ব্লক করবে! ব্লকের প্রেসিডেন্ট না রাহুল দ্রাবিড় তুমি! মারো তো আনতাবড়ি! তাই বলে দিলাম আগে থেকে!” গাবলু একই।
ঝিরি হাসল, “আরে, বলছি তো ব্লক করব! আর বাই চান্স বলটা ওই দিকে চলে গেলে কোনও টেনশন নেই। ঠিক নিয়ে আসব!”
এবার উইকেটের পিছন থেকে মিন্টু বলল, “টেনশন খুব আছে। একটা ক্যাম্বিস বলের দাম জানো এখন! শয়তান বুড়োটা প্রতি মাসে একটা করে বল কেটে দেয় রুটিন করে। দাঁড়াও না, ওর গাছে আম আসতে দাও, তার পর দেখাচ্ছি মজা। যত টাকার বল কেটেছে, তার পাঁচ গুণ আম যদি উসুল না করি, তা হলে আমার নাম মিন্টু নয়!”
ঝিরি কাঁধের ওপর ব্যাট তুলে হাসল। মিন্টু, গাবলু, টোম্যাটো, কুকি, বুকুরা বিকেল করে বাড়ির সামনের মাঠটায় খেলতে আসে। মফস্সল শহরের এই দিকটা বেশ নির্জন। যেখানে ঝিরি ভাড়া থাকে, সেটা বাড়ি জমি-সহ বেশ বড়। নিচু পাঁচিল ঘেরা কম্পাউন্ড। এক দিকে নানা ফুলের গাছ আর অন্য দিকে বিভিন্ন রকমের ফল। এখন শীতের শেষ। বাগানে বেশ সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটে আছে। ওর বাড়িওলা প্রতুলবাবু এই গাছপালা নিয়ে সারাক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকেন। লোকটার ধারণা সবাই ওঁর সব কিছু নষ্ট করতে চায়। কেড়ে নিতে চায়। এমন কেন যে ভাবেন, কিছুতেই বুঝতে পারে না ঝিরি।
ঝিরি, প্রতুলবাবুর বাড়ির দোতলার ছাদের দুটো ঘর নিয়ে ভাড়া থাকে। ঝিরি একদম নিজের মনে থাকে। বাড়িতে কেউ বুঝতেও পারে না যে, ওপরে কোনও মানুষ রয়েছে। তা সত্ত্বেও সুযোগ পেলেই ঝিরিকে সাবধান করতে থাকেন ভদ্রলোক! বলেন, “শোনো ঝিরি, কখনও রান্না করলে গ্যাস খুলে রাখবে না। জলের কল বন্ধ রাখবে সব সময়। কল খুলে রেখে ব্রাশ করবে না বা হাতে সাবান দেবে না। কাচের জানলাগুলো আস্তে আস্তে বন্ধ করবে, হুটহাট করে বন্ধ করবে না। কিছু খেয়ে তার র্যাপার জমাবে না ঘরে। বাইরে যাওয়ার সময় সব আলো পাখার সুইচ বন্ধ করবে, প্লাগ খুলে রাখবে। দেওয়ালে ক্যালেন্ডার টাঙাবে না। পেরেক পুঁতবে না। মেঝেতে কিছু জিনিস ঘষটে সরাবে না। এসি চালালেও ঠিক মতো বন্ধ করবে। কাজের মেয়েটি মেঝে ঝাঁট দেওয়ার আর মোছার সময় মন দিয়ে লক্ষ রাখবে, যাতে ঠিক মতো মোছে। ফিনাইল দিয়ে বাথরুম কমোড একদম চকচকে করে পরিষ্কার রাখবে। সব সময় সাবধান থাকবে। জানবে, এই বাড়ি আমার পাঁজরের মতো। আমি আমার পাঁজর তোমার হাতে তুলে দিয়েছি।”
ঝিরি শোনে আর মনে মনে হাসে। ভাবে, এত ফিরিস্তি দেওয়ার কী আছে! ও কি বাড়ির দোতলার দুটো ঘর আছাড় মেরে ভেঙে ফেলবে নাকি!
ঝিরি একা মানুষ। আটত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেলেও বিয়ে করেনি। এ জীবনে খুব দূরের দুই মামা ছাড়া ওর আর কেউ নেই। বাবা মারা গিয়েছিল সেই ধু ধু ছোটবেলায়। আর মা চোদ্দো বছর আগে। সেই যখন ওকালতি পাশ করে একটা ফার্মে জয়েন করেছিল ও, তখন। সেই থেকে ঝিরি সম্পূর্ণ একা!
আগে কলকাতায় থাকত ঝিরি। কিন্তু বছর দুয়েক হল মফসসলে শিফট করে এসেছে। আসলে কলকাতা আর ভাল লাগে না ওর। এই হই-হট্টগোল। গাড়িঘোড়া। সারাক্ষণ দৌড়। এ সব আর নিতে পারে না। হ্যাঁ, কাজের জন্য ওকে কলকাতায় যেতে হয়। কিন্তু তাও দিনের শেষে ও ফিরে আসে এই বাগানঘেরা বাড়িতে।
কলকাতা থেকে লোকাল ট্রেনে করে এক থেকে সোয়া এক ঘণ্টার মতো দূরে এই মাখনপুর। ছোট একটা নদী আছে মাখনপুরের পাশে। নাম, অভিমানী। তার কাছেই অনেকটা জায়গা নিয়ে প্রতুলবাবুর এই বাড়িটা।
বাড়ির সামনে একটা বড় মাঠ। তার এক ধারে পুরনো ভাঙা ঘণ্টাঘর। আর পোস্ট অফিস। তার পাশেই ভাঙা পিচের রাস্তা, যা দিয়ে মিনিট দশেক সাইকেলে গেলেই মাখনপুরের একমাত্র রেল স্টেশন।
গোটা জায়গাটার মধ্যে একটা দারুণ মন ভাল করা ব্যাপার আছে। শান্ত, স্নিগ্ধ, গাছ আর পাখিতে মাখামাখি এমন এক শহরতলি খুব বেশি দেখা যায় না।
বিকেলে আশপাশ থেকে ছোট ছোট ছেলেরা মাঠে খেলতে আসে। কিন্তু ব্যাপারটা হল, গোটা মাঠের বেশির ভাগটাই ইদানীং জাল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। কলকাতার একটা ক্লাব মাঠটা লিজ নিয়েছে। ঝিরি শুনেছে, তারা এখানে একটা প্র্যাকটিস স্টেডিয়াম তৈরি করবে।
তাই মাঠের বাকি এক ফালি অংশ, যেটা কিনা প্রতুলবাবুর বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষে, সেখানে বাচ্চারা খেলে। আর, একটু জোরে বল মারলেই বলটা পাঁচিল টপকে বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়ে। তখনই হয় বিপদ। কারণ, বল ঢুকলেই প্রতুলবাবু খুব রাগারাগি করেন। বল ধরে কেটেও দেন।
তাই আজ এখন গাবলু ঝিরিকে সতর্ক করে দিল।
ঝিরি গত চার দিন হল কলকাতায় যাচ্ছে না। সে ভাবে কাজ নেই এখন। আসলে এখন আর ওকালতি করে না ও। ঠিক কী যে করে, সেটা লোকজনকে গুছিয়ে বলা বেশ মুশকিল। তাই কেউ জিজ্ঞেস করলে ঝিরি বলে, “কনসালট্যান্ট আমি!” লোককে যাই বলুক ও নিজে জানে যে, ওর কাজ হল নানা সিচুয়েশনকে ‘ফিক্স’ করা। ও একজন পলিটিকাল ফিক্সার। বিভিন্ন ক্ষমতাশালী লোকের হয়ে নানারকম সোজা, বাঁকা কাজ করে দেওয়াই ওর পেশা। এমন কাজ, যা সব সময় নিয়ম বা আইনের ঘেরাটোপে থেকে করা যায় না।
বিকেলে মিন্টু গাবলুরা খেলতে আসে মাঠে। আর বাড়িতে থাকলে মাঝে মাঝে ঝিরি ওদের সঙ্গে খেলে। গল্প করে। সবাইকে নিয়ে রেল স্টেশনের ওদিকে যায়। ওখানে বান্টিদার রোল সেন্টার আছে। দারুণ রোল বানায় বান্টিদা। সেখানে সবাইকে রোল খাওয়ায় ঝিরি। চিকেন রোল।
বারো-তেরো বছর বয়স ছেলেগুলোর। তবে ওদের সঙ্গে বন্ধুর মতোই মেশে ঝিরি। আসলে ও বোঝে, মানুষজন বাইরে বড় হলেও মনে মনে তারা চিরকিশোর।
আজও কথা আছে খেলার পরে সবাই যাবে স্টেশনে। সেখানে নাকি বান্টিদা মোমোর নতুন কাউন্টার খুলেছে। ওদের মাখনপুরে এই প্রথম মোমোর দোকান। বুকু খবরটা এনেছে। না, মোমো খেতে একদম ভাল লাগে না ঝিরির। নোনতা ঘামের মতো জল দিয়ে সিদ্ধ শিঙাড়া খাবে কোন দুঃখে? কিন্তু ওর ভাল লাগাটা তো এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে আসল হল বাচ্চাদের ইচ্ছে। ওদের আনন্দ।
দুপুরে আজ একটু ঘুমিয়েছে ঝিরি। তার পর বিকেলে উঠে এক কাপ চা করে এসে দাঁড়িয়েছিল ছাদে। ওর ঘরের সামনে অনেকটা খোলা ছাদ আছে। তখনই গাবলু মিন্টুরা এসে ওকে ডাকাডাকি করে নামিয়েছে খেলতে। আর সেই সঙ্গে বুকু বলেছে বান্টিদার নতুন মোমো কাউন্টারের কথা।
ঝিরি মিন্টুকে বলল, “আবার আমগাছে আক্রমণ! কেন বেকার ঝামেলা করবি! জানিস তো প্রতুলবাবু কেমন লোক! বাদ দে না!”
মিন্টু ফোঁস করে উঠল, “কেন বাদ দেব? আমাকে কেউ টাইট দিলে আমিও তাকে টাইট দিয়ে ছাড়ব। টিট ফর ট্যাট! বুঝেছ? তুমি এমন ভিতু কেন গো! যেন পৃথিবীর সমস্ত ভদ্রতার ভার তোমাকেই একা দেওয়া হয়েছে! বাবা বলে, এই পৃথিবীতে মার খেলে পাল্টা মারও দিতে হয়। বুঝেছ! ভদ্রলোকদের এখানে সবাই বোকা আর ভিতু ভাবে।”
ঝিরি ব্যাটটা মাটিতে নামিয়ে খুব হাসল। মিন্টুর বয়স বারো কি তেরো হবে। কিন্তু এমন করে গুছিয়ে কথাগুলো বলল, যেন বয়সে আর অভিজ্ঞতায় ও ঝিরির বাবা!
মিন্টু ফোঁস করে উঠল, “কেন বাদ দেব? আমাকে কেউ টাইট দিলে আমিও তাকে টাইট দিয়ে ছাড়ব। টিট ফর ট্যাট! বুঝেছ? তুমি এমন ভীতু কেন গো!”
ঝিরির মনে পড়ে গেল ওর সেই কিশোর বয়সের কথা। তখন ওরা শান্তিপুরে থাকত। মা আর ও। সেই সময় একটা লোক আসত ওদের বাড়িতে। মায়ের প্রায় সমবয়সি ছিল লোকটা। তাও মাকে ‘দিদি দিদি বলেই ডাকত। আর ঝিরি লোকটাকে ডাকত মামা বলে, জগন্নাথমামা।
লোকটা পলিটিক্স করত। গ্রামের মানুষ বলত, পার্টি করে। নিজের অঞ্চলে বেশ নাম ছিল লোকটার।
জগন্নাথমামা মাঝে মাঝে এসে ওদের খোঁজখবর নিত। এটা-ওটা কিনে আনত ঝিরির জন্য। ঝিরির বাবার সঙ্গে আসলে পরিচয় ছিল জগন্নাথমামার। এক সঙ্গে ওরা পার্টি করত। সেই সূত্রেই ওদের বাড়িতে আসত মানুষটা। কেন কে জানে ঝিরির বাবাকে জগন্নাথমামা জামাইবাবু বলে ডাকত।
লোকটাকে এখনও মনে আছে ঝিরির। কৃষ্ণবর্ণ, পেটানো চেহারা। খুব বিড়ি খেত! আর হাসত খুব। গরিব মানুষজনের কথা বলত। বলত, কী ভাবে অনেক মানুষ খেতে না পেয়ে ধীরে ধীরে অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে। লোকে ফ্যান খাচ্ছে, শাক-পাতা ফুটিয়ে খাচ্ছে! অখাদ্য কুখাদ্য খাচ্ছে খিদের জ্বালায়!
জগন্নাথমামা কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যেত এ সব বলার সময়। হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত বিড়ি ধরে বলত, “বুঝলি ঝিরি, একটা দেশ তো মানুষ দিয়েই তৈরি। সেই মানুষই যদি খেতে না পায়, যদি অপুষ্টিতে ভোগে, তা হলে দেশও অপুষ্ট হবে। গুটি কয়েক লোকের হাতে ক্ষমতা আর টাকা গিয়ে জমছে। আর তারা সেই ক্ষমতার বলে আমাদের মারছে, পেষাই করছে! শোন ঝিরি, কেউ তোকে মারলে চুপচাপ সহ্য করবি না। তাকে পাল্টা মার দিবি। কারণ, তাকেও বোঝাতে হবে মার খেতে কেমন লাগে। এই দুষ্টের পৃথিবী এখন লজিক আর লজ্জার অনেক বাইরে চলে গিয়েছে। সবাই গ্লোবাল টেররিজমের কথা বলে। কিন্তু এটা বলে না যে, মাইক্রো লেভেলে সাধারণের ওপরে ক্ষমতাবানরা কেমন প্রচ্ছন্ন টেররিজম চালায়। তাই নো কম্প্রোমাইজ। বুঝেছিস?”
এই লোকটাই এক দিন কী ভাবে যেন হঠাৎ খুন হয়ে গেল! ভাবলে আজও অবাক লাগে ঝিরির। মা খুব কেঁদেছিল খবর পেয়ে। নিজের ভাইয়ের মতোই দেখত মা জগন্নাথমামাকে। আর ঝিরিরও কষ্ট হয়েছিল খুব। সেই কিশোর বয়সে ওর মনে হয়েছিল, যারা জগন্নাথমামাকে মেরেছে, তাদের ও একদিন কঠিন শাস্তি দেবে। জগন্নাথমামার কথায়, পাল্টা মার দেবে!
আজ এত বছর পরে এ সব ভাবলে কেমন যেন লাগে ঝিরির। বোঝে, সেই কষ্ট আর অবশিষ্ট নেই। সবটাই কেমন যেন দূরের স্মৃতি হয়ে গিয়েছে। যেন ঝিরির সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ নেই সে সবের। আচ্ছা, সব অনুভূতিই কি সময়ের সঙ্গে হালকা আর নির্বিষ হয়ে যায়!
গাবলু বলল, “তুমি ক্রিকেট খেলতে এসেছ, না দাবা! এত চিন্তা করার কী আছে!”
ঝিরি হেসে এবার ব্যাটটা মাটিতে ঠুকে স্টান্স নিল। তার পর ইশারা করল বল করার জন্য।
গাবলু সামান্য মোটা! চোখের চশমাটা ঠিক করে একটু দৌড়ে এসে বলটা করল। ফ্লুরোসেন্ট রঙের ক্যাম্বিস বল বাতাসে সামান্য বাঁক খেয়ে একদম ব্যাটের ওপরে এসে পড়ল। ফুলটস।
ঝিরি বলটাকে জোরে মারতে চাইল না। বরং হালকা করেই ঠেকাল, যাতে কাছেই ড্রপ পড়ে। কিন্তু বলটা ছিটকে উঁচু হয়ে পাঁচিল টপকে গিয়ে পড়ল প্রতুলবাবুর বাগানে। আর সঙ্গে সঙ্গে ঠং করে শব্দও হল একটা!
গাবলু মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, “নাও, হল তো! শিয়োর কিছু ভেঙেছে! এই বলটাও গেল। বাবা কিনে দিয়েছিল। জানলে আমার পিঠের ছাল তুলে দেবে। তুমি যে কী করো না ঝিরিকাকা! এতবার বললাম! সেই মারলে এ ভাবে! জানো না এটা স্বার্থপর দৈত্যের বাগান!”
ঝিরি অপরাধীর মতো মুখ করে তাকাল সবার দিকে। বলল, “সরি সরি। চিন্তা করিস না। আমি এনে দিচ্ছি বলটা। তেমন হলে কিনেও দেব। রাগ করিস না তোরা।”
মিন্টু বলল, “হাতের মাপ নেই একটা! ব্লক করার কথা মুখে বললে হবে? ব্লকটা করতেও তো শিখতে হবে না কি! সব বল যেন মারতে হবে? সত্যি টি-টোয়েন্টি দেখে দেখে সবার বারোটা বেজে গিয়েছে। যাও, অনেক করেছ! এবার তুমি আউট!”
“ভাগ! আউট কিসের রে!” ঝিরি ঠোঁট কামড়ে তাকাল, “সব দোষ আমার না! আর গাবলু যে লোপ্পা ফুলটস দিল! বড় মাঠ হলে তো এটাকে ছয় নয়তে৷ বারো মারা যায়।”
“ইঃ বারো!” গাবলু কোমরে হাত দিয়ে তাকাল ওর দিকে, “আমি তো টেস্ট করছিলাম তুমি মুখে যা বলো সেরকম করো কি না। দেখলাম একদম উল্টো কাজ করলে। বাবা বলে, এমন যারা করে তাদের পলিটিক্সে জয়েন করা উচিত।”
ঝিরি কী বলবে বুঝতে না পেরে হেসে ফেলল।
“পরে হেসো, আগে বলটা আনো!” টোম্যাটো বিরক্ত হয়ে বলল,
“প্রতুলদাদু বাড়িতেই আছে আজ। যাও যাও। সবাই এত আজেবাজে কথা বলে না!”
ঝিরি ব্যাটটা রেখে বাড়ির মধ্যে ঢুকল। আর ঢুকেই দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই যা ভয় করেছিল তাই হয়েছে। দেখল, একটা ছোট্ট চিনেমাটির টব উলটে পড়ে আছে। আর টবের সামনে বল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্রতুলবাবু। মুখে সারা পৃথিবীর বিরক্তি।
ঝিরি অবস্থাটা ম্যানেজ করার জন্য হাসি হাসি মুখে গিয়ে দাঁড়াল সামনে।
প্রতুলবাবু বিরক্ত মুখে বললেন, “অমন বোকার মতো দাঁত বের করছ কেন? আমি কি ডেন্টিস্ট! নতুন কিনেছি টবটা, দিলে তো উল্টে! বুড়ো বয়সে খোকা সাজা কেন বাপু? ঘরে বসে টিভিতে নিউজ দেখতে পারো না?”
“না মানে, একটু খেলছিলাম আর কী। শরীরচর্চা তো ভাল,” ঝিরি হাসল।
“এটা একটু! আমার বাগান তছনছ করে বলছ একটু শরীরচর্চা করছ! এই বয়সে মনোহর আইচ হবে!” প্রতুলবাবু রাগে গরগর করে উঠলেন।
ঝিরি আরও কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু পারল না। দেখল, রিপা আসছে ওদের দিকে। হাতে একটা ট্রে, তাতে দুটো চায়ের কাপ। দুটো কেন? ও যে এসেছে সেটা কি বাড়ি থেকে দেখেছে?
প্রতুলবাবু মুখ ঘুরিয়ে রিপাকে দেখলেন। রিপা এগিয়ে এসে পাশের একটা সিমেন্টের বেদিতে টে-টা রেখে এক কাপ চা প্রতুলবাবুর দিকে বাড়িয়ে দিল। প্রতুলবাবু বলটা নিয়ে কী করবেন বুঝতে পারলেন না।
রিপা বলটা নিয়ে নিল নিজের হাতে। প্রতুলবাবু চায়ের কাপটা নিয়ে ফিরল ঝিরির দিকে।
রিপা অন্য কাপটা প্লেট সমেত ঝিরির দিকে বাড়িয়ে দিল এবার। “না, ওকে দিবি না!” প্রতুলবাবু রাগের গলায় বললেন, “আমার বাগান ধ্বংস করছে, আবার চা খাবে! এটা ভাড়ার বাড়ি, মামার বাড়ি নয়।”
ঝিরি মাথা নেড়ে চায়ের কাপটা ফিরিয়ে দিল। রিপা ঠোঁট টিপে তাকাল জিনি ওর দিকে। চোখে কি রাগ না বিরক্তি! এবার বলটা ওর হাতে জোর করে গুঁজে দিল রিপা। ঝিরি, রিপার কাছ থেকে ভেসে আসা খুব সুন্দর একটা গন্ধ পেল। শ্যাম্পুর গন্ধ? কী শ্যাম্পু এটা? রিপা কি এখন স্নান করেছে! এই ওয়েদারে এখন স্নান করলে তো ঠান্ডা লেগে যাবে।
প্রতুলবাবু বলটা ফেরত দেওয়া দেখে কী বলবেন বুঝতে পারলেন না প্রথমে। তার পর আবার বললেন, “একদম চা দিবি না ওকে, রিপা!” রিপা মাথা নাড়ল। তার পর আর একবার ঝিরির দিকে তাকিয়ে হেঁটে চলে গেল মূল বাড়ির দিকে।
ঝিরিও আর দাঁড়াল না। রাগে গরগর করতে থাকা প্রতুলবাবুকে পেছনে রেখে বলটা নিয়ে গেটের দিকে হাঁটা দিল। যেতে যেতে শুনল প্রতুলবাবু বলছেন, “আর-একবার বল আসুক, পেয়ারার মতো দু’খণ্ড করে দেব বলে দিলাম!”
গেট পেরোতে পেরোতেই এবার ফোনটা বেজে উঠল পকেটে। আবার কে! ঝিরি দাঁড়িয়ে পড়ে পকেট থেকে বের করল ফোনটা। নামটা দেখে কপাল কুঁচকে গেল ওর। সানুদা!
“হ্যাঁ বলো!” ঝিরি ফোনটা কানে লাগাল।
“ক’দিন আসছিস না কেন?” সানুদার গলায় বিরক্তি।
“ব্রেক নিচ্ছি একটু। প্লাস কাজও নেই তেমন। সব সময় ওই শহরটায় যেতে ইচ্ছে করে না সানুদা। যাক গে, আমি একটু তাড়ায় আছি। কিছু বলবে?”
“ঝিরি শোন, রাগ করিস না। যা ডিসিশন সেটা নেওয়া হয়ে গিয়েছে। উপায় নেই এখন পিছোনোর। দেখবি, ঠিক কাজ হবে,” সানুদা বলল।
ঝিরি বলল, “আর, না হলে উল্টো ফল হবে। সেটাও মনে রেখো। সব কিছুতে গায়ের জোর আর তাড়াহুড়ো করো কেন!”
“আচ্ছা দেখিস, কাজ হয় কি না এবার!” সানুদা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করল, ,“না হলে তুই তো আছিসই!”
“দ্যাখো! আমি আর কী বলি!” ঝিরি নিজের মনে মাথা নাড়ল। সেই, ও তো আছেই। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো!
“কাল আসিস। এমনিই আসিস। কেমন?” সানুদা হেসে ব্যাপারটাকে লঘু করার চেষ্টা করল।
ঝিরি আর কিছু না বলে, “রাখছি” বলল শুধু। তার পর ফোনটা কেটে পকেটে রেখে দিল! চোয়াল শক্ত করল ঝিরি। আর মনে মনে যেন দেখতে পেল সামনে একটা ঝড় পাকিয়ে উঠছে। আবার খারাপ দিন আসছে!
“কী হল, রিপাকে দেখে কি বিপাকে পড়লে!” গাবলু চশমাটা নাকের ওপর তুলে ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল। ছেলেটার মুখে একটা ফচকে হাসি!
“তবে রে! নাম ধরে ডাকছিস? বয়সে বড় হয় না?” ঝিরি ছদ্মরাগে চোখ পাকাল।
গাবলু ওকে পাত্তা না দিয়ে বলল, “তুমি আউট, যাও ফিল্ডিং করো!” “ইঃ, আউট!” ঝিরি ভুরু কুঁচকে বলল, “তোদের মোমো খাওয়ার ইচ্ছে নেই নাকি?”
মিন্টু বলল, “ঠিক আছে ব্যাটিং করতে দেব, কিন্তু মোমোর সঙ্গে আইসক্রিমও খাওয়াতে হবে। রাজি?”
ঝিরি হাসল। ভাবল, লোকে ওকে ফিক্সার বলে, কিন্তু এই খুদেগুলো ওর বাবা!
বলটা গাবলুকে দিয়ে ব্যাটটা তুলে নিল ঝিরি। বলল, “আমায় আউট করতে পারলে খাওয়াব। দেখি আউট কর!”
টোম্যাটো পাশ থেকে সামান্য তুতলে বলল, “রিপাপিসিকে ডাক তো, এসে দাঁড়ালেই ঝিরিকাকু আউট হয়ে যাবে!”
