২৪. জিনি
ঘড়ি দেখল জিনি। সাড়ে চারটে বেজে গিয়েছে। এখনও তো বিধান এল না! আজকাল কারও যদি সময়ের কোনও জ্ঞান থাকে। সবাই এত ব্যস্ততা দেখায় যে, রাগ ধরে যায়। ভাবটা এমন, যেন কী না কী কাজ করছে! কিন্তু সত্যি যদি তাই হত, তা হলে তো দেশের উন্নতি হত চড়চড় করে।
আজ একটু তাড়া আছে জিনির। বাড়িতে ফিরতে হবে দ্রুত। আজ কবির জন্মদিন। ওর জন্য মাকে বলেছে পায়েস করে রাখতে। ওকে দিতে হবে গিয়ে।
কবির জন্য কয়েকটা জিনিসও কিনেছে ও। ইদানীং ইন্টারনেটে কনটেন্ট লেখার কাজ করছে জিনি। ট্র্যাভেল, ফোটোগ্রাফি, রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থেকে শুরু করে এসকর্ট সার্ভিসেস-এর সাইটের জন্য কনটেন্ট লেখে ও। নিধিই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে। টুকটাক ভালই টাকা পায়। মানে ওর পক্ষে ভাল আর কী। আসলে সবার ভালর মাপ তো একরকম নয় । এই লিখে যা হয় তাতে জিনির নিজের হাতখরচ চলে যায়। আসলে ও যে অল্পেই খুশি।
সেই টাকা জমিয়েই একটা টি-শার্ট আর একটা ডায়েরি কিনেছে জিনি।
ও মনে মনে ভেবেছিল একটা পারফিউমও দেবে। কিন্তু পিসি ওকে বলেছে, “পারফিউম দিস না। পারফিউম, রুমাল আর গোলাপ দিতে নেই। এতে রিলেশনশিপ থাকে না।”
এ সব কুসংস্কার একদম মানে না জিনি। কিন্তু কেন কে জানে পিসির কথাটা ওকে ভেতরে ভেতরে কোথায় যেন একটু আঁচড় কেটেছে। তাই আজ মলে শপিং করতে যাওয়ার সময় ও বড় দোকানটায় ঢুকে পারফিউম তুলেও আবার রেখে দিয়েছে। সুন্দর দেখতে চামড়ায় বাঁধানো একটা ডায়েরি কিনেছে। আর টি-শার্টটা তো আগেই কিনেছিল। ঘন নীল রঙের টি-শার্ট। বুকের কাছে লেখা ‘লোনলি মি’।
হ্যাঁ, এই লেখাটা দেখেই কেন কে জানে জিনির মনে হয়েছে যে, কবির জন্য এই টি-শার্টটা একদম ঠিকঠাক।
তবে মনে মনে একটা ভয়ও আছে। কবির যে জন্মদিন আজ, সেটা তো কবি ওকে বলেনি। তাই এই সব নিয়ে সারপ্রাইজ দিতে গেলে যদি জিজ্ঞেস করে কী করে জানল আজ জন্মদিন, তা হলে কী বলবে? লালু তো পইপই করে বলে দিয়েছে ওর নাম যেন না নেয় কিছুতেই!
ঘটনাটা কয়েক দিন আগের। লালু এসেছিল জিনির কাছে। ওর নেল কাটারটা নাকি খুঁজে পাচ্ছে না। মার্চ মাস। টানা গরম নেই এবারে। মাঝে মাঝে গরম পড়লেই আবার একটু বৃষ্টি হয়ে সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
বাড়ির সামনের ছোট্ট বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে বসে বই পড়ছিল জিনি। মা আর পিসি ভেতরের ঘরে টিভিতে সিরিয়াল দেখছিল। পিসির চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তাই পিসিকে কিছু দিন থাকতে হবে এখানে। এই বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের থাকার ব্যাপারে বীরেন্দ্রর অনুমতি নিতে হয়। বাবা সেই অনুমতি নিয়েই পিসিকে রাখছে।
ভেতর থেকে ভেসে আসা টিভির আওয়াজ থেকে মন ঘুরিয়ে জিনি একটা বই পড়ছিল। বারান্দায় একা বসে থাকতে ভাল লাগছিল ওর। হাওয়া দিচ্ছিল অল্প অল্প। বাইরের পৃথিবীর কিছুই এসে পৌঁছোচ্ছিল না ওর মনে। বাগানের বড় বড় গাছ থেকে ভেসে আসছিল ঝিরিঝিরি হাওয়া। কী একটা পোকা থেকে থেকে ডেকে উঠছিল ঘাসের মধ্যে থেকে। বড় গুলঞ্চ গাছের পাতার আড়ালে ভেসে ছিল চাঁদ। আকাশে ছড়িয়ে ছিল সাদাটে নীল রঙের তারার সাম্রাজ্য। একটু দূরের আমগাছের সারি থেকে হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছিল ডালে ডালে ঝাঁপিয়ে আসা মুকুলের গন্ধ। বসন্তকাল জেগেছিল দামাল কিশোরের মতো। রবিবারের সন্ধেটা যেন তুলো বীজের মতো উড়ছিল চারিদিকে। কতদিন পরে যে এমন একটা শান্ত সন্ধেবেলার মধ্যে বসেছিল জিনি! ওর মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তটা চলুক, চলতে থাকুক। আজীবন।
ঠিক এই সময়েই লালু এসেছিল ওর কাছে।
“লালুদা তুমি?” অবাক হয়ে গিয়েছিল জিনি। আজকাল লালুকে খুব একটা দেখা যায় না। কিসের এত ব্যস্ত কে জানে! জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না।
লালু ওর পাশে একটা ছোট্ট মোড়া টেনে বসেছিল। তার পর হেঁ হেঁ করে হেসে বলেছিল, “নেল কাটার আছে রে? আমারটা খুঁজে পাচ্ছি না।” জিনি বলেছিল, “দাঁড়াও আনছি।”
ঘর থেকে নেল কাটারটা এনে লালুর হাতে দিয়ে জিনি বলেছিল, “এই ।”
জিনি ভেবেছিল লালু চলে যাবে। কিন্তু তা না গিয়ে লালু নেল টেবিলে রেখে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী পড়ছিস রে?”
জিনি চেয়ারে বসে বইটার প্রচ্ছদ দেখিয়ে বলেছিল, “এই একটা প্রবন্ধের বই।”
“ভাল ভাল,” লালু মাথা নেড়েছিল। তার পর সামান্য ইতস্তত করে বলেছিল, “জানিস তো কেসটা?”
বইটা কোলের ওপর উল্টো করে রেখে লালুর দিকে তাকিয়েছিল । বুঝেছিল, লালু সহজে যাবে না।
লালু বলেছিল, “বাড়িতে তো সকালে হেভি ফাইটিং। মা ভার্সেস মেয়ে। শুনিসনি আওয়াজ?”
জিনি মাথা নেড়েছিল। না শোনেনি। ওদের এই আউট হাউসটা বড় বাড়ির থেকে কিছুটা দূরে। এখানে আওয়াজ আসে না।
লালু গলা নামিয়ে, যেন ভীষণ গোপন কোনও কথা বলছে সে ভাবে বলেছিল, “আরে, ম্যাডামের তো বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। রেডি-ও হয়েছিল। আমি গাড়ি নিয়ে তৈরিও ছিলাম। কিন্তু তার পর কী ক্যাচাল কী ক্যাচাল! সকালে উর্জাদির জন্য দোলনা লাগানো হল। তার পর উর্জাদি বাড়ির ভেতর গিয়ে দেখে উমেশ নামে উর্জাদির সঙ্গে যার বিয়ে ঠিক হচ্ছে, সে এসেছে। ব্যস, উর্জাদি রেগে ফর্টি নাইন! কী ঝগড়া কী ঝগড়া!”
জিনি কিছু বলল না। এ সব ব্যাপারে কী বলতে পারে ও! হ্যাঁ, শুনেছে যে, বাড়ির অন্যদিকে বড় যে শিরিস গাছ আছে, সেখানে একটা খুব সুন্দর দোলনা লাগানো হয়েছে। উর্জাদির জন্যই দোলনাটা। জিনি যায়নি দেখতে। কী হবে ওর দেখে! ও সব বড়লোকদের ব্যাপার।
“আমার ভালই হল, যেতে হল না। কমিশনটা তো আর মার যায়নি! এ সব ব্যাপারে আগে থাকতে টাকা দিয়ে দিতে হয় বাবা!” লালু খানিকটা যেন অসাবধানেই বলেছিল কথাগুলো।
“মানে?” অবাক হয়ে তাকিয়েছিল জিনি।
“কিছু না, কিছু না,” কোনও মতে সামলেছিল লালু, “কী বলতে আমি কী বলি! বাদ দে। তা তোর সাহেবের খবর কী?”
“আমার সাহেব?” জিনি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল লালুর দিকে। কী যে বলে ছেলেটা। কথার কোনও ঠিক নেই। এই একটা কথা বলছে আবার পর মুহূর্তে আর-একটা কথা বলছে। বোঝা মুশকিল।
লালু হেসে চোখ নাচিয়ে বলেছিল, “আরে কবি, কবির কথা বলছি। কী কেস ওর?”
“তোমার পাশের ঘরে থাকে তুমি জানো। আমি কী বলি?” জিনি ঠোঁট টিপে সামলেছিল নিজেকে। আচমকা কেউ ওর সামনে কবির কথা বললে বুকের ভেতর কেমন যেন বিদ্যুৎ চলকে ওঠে। মনে হয়, এক বাটি বিদ্যুৎ যেন রাখাই থাকে বুকের ভেতরে। আর ‘কবি’ নামটার ধাক্কায় দু’-এক ফোঁটা চলকে পড়ে বুকের মধ্যে। কষ্ট হয়।
এখন জিনি বোঝে কষ্টের সরণি বড্ড একার হয়। সেখানে নিজেকে নিজের শরীর টেনে টেনে চলতে হয়। কেউ কাউকে বোঝে না! হ্যাঁ, বোঝার ভান হয়তো করে, কিন্তু বোঝে না কেউ। তাই কাউকে কিছু বলে লাভ হয় না। নিজেকেই নিজের মনখারাপ আর পাওয়া না-পাওয়ার অদৃশ্য বোঝা মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।
একটা জিনিস ভেবে আজকাল অবাক হয় জিনি, মানুষ যেন অনেক বেশি কষ্টের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে রাখতে পারে। ভাল কিছু হোক, কেউ ভালবাসুক, সে সব কিছু দিন পরেই যেন ফিকে হতে থাকে। আর অন্যদিকে কেউ কষ্ট দিক, সে যত দিন আগেই হোক না কেন, সেটা যেন সারাক্ষণ মনের মধ্যে জেগে থাকে। আর সুযোগ পেলেই এসে নড়িয়ে দেয় জীবন। নিজেকে মনে করিয়ে দেয়, আমরা কতটা সামান্য, তুচ্ছ আর অসহায়।
লালু হেসে বলেছিল, “সে তো শালা কথাই বলে না। সারাক্ষণ যেন ভয় পায় যে, বেশি কথা বললেই বুঝি ট্যাক্স দিতে হবে!”
জিনি কিছু না বলে চুপ করে ছিল।
লালু বলেছিল, “তোর যখন ওকে ভাল লাগে, তখন গিয়ে বলিস না কেন? ল্যাঠা চুকে যায়!”
জিনি জোর করে হেসে বলেছিল, “তুমি কী যে বলো না! যা হোক একটা বললেই যেন হল!”
লালু বলেছিল, “ওর আশায় থাকলে কিন্তু তুই গেছিস! ও ছেলে কিছু বলার ছেলে নয়। এই যে আমরা খেতে বসি, তাতে রান্নার যা দেয় তাই ও খেয়ে নেয়। আমিই ওর হয়ে চেয়েচিস্তে নিই। ও মেটিরিয়াল। বুঝেছিস?”
জিনি শুনছিল। এ সব ওকে আগেও বলেছে লালু। এ সবের বাইরে কবির সম্বন্ধে ওর আরও কিছু জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু লালুকে ও আর একদম উৎসাহিত করতে চায় না।
লালু বলেছিল, “তোরা দুটোই এক। পাগল আর পাগলি। আমি শুধু মজা দেখে যাচ্ছি। ডিটেলে ওর সঙ্গে কথা বলিস না কেন?”
“জানি না,” জিনি ঠোঁট টিপে বলেছিল, “তুমি ঘটকালিটা বন্ধ করো তো! জীবনে এর বাইরে আরও অনেক কিছু আছে।”
“যাঃ শালা! আমি আবার কী করলাম! তবে অনেক কিছু থাকলেও, ভালবাসা ছাড়া সবটাই নুন ছাড়া খাবার। এটা কেউ স্বীকার না করলেও, একবার তার নিজের ভালবাসার জায়গায় হাত পড়ুক, তখন সে বুঝবে, ” লালু হেসেছিল সামান্য। তার পর বলেছিল, “ও তো পুরো মিউজিয়ম পিস! বলিহারি যাই তোকে! এমন একটা ছেলেকে তোর ভাল লাগল? তুইও তার-কাটা।”
“আমার ভাল লাগল? সব জেনে গিয়েছ না?” জিনি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
লালু বলেছিল, “আমরা তো সব অন্ধ। তাই না? যাক গে শোন, যেটা আসল খবর। চারদিন পরে সাহেবের জন্মদিন!”
“মানে?” অবাক হয়ে তাকিয়েছিল জিনি।
“তুই জন্মদিন মানে জানিস না?” লালু ছদ্ম রাগ দেখিয়েছিল, “কবির বার্থডে। জন্মদিন।”
“তুমি কী করে জানলে?” জিনি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
“আরে, ও ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলবে। তাই ফর্ম নিয়ে এসেছিল। ।
টেবিলের ওপর আধার কার্ড, প্যান কার্ড সব খুলে ফর্ম ফিল-আপ করছিলআমি পাশেই ছিলাম, তখনই দেখেছি।”
“ও!” জিনি মাথা নিচু করে নিয়েছিল।
“ও মানে?” লালু বিরক্ত হয়েছিল, “এর পর তো “পি কিউ আর এস টি’ এ সব বলবি!”
“দ্যাখো লালুদা, পৃথিবীতে রোজ কারও না কারও জন্মদিন হয়। তাতে আমি কী করব বলতে পারো?” জিনি তাকিয়েছিল লালুর দিকে।
“ন্যাকামো দেখে মনে হয় হজমি খেয়ে সুইসাইড করি! তোকে এটা বলতে এলাম এমনি এমনি? ঠিক আছে, কিছু করতে হবে না তোকে। তুই থাক বই নিয়ে। আর যদি ওকে বলেছিস যে, আমি তোকে কিছু জানিয়েছি, তা হলে দেখিস কী করি!”
লালু আর কথা না বলে পা দাপিয়ে চলে গিয়েছিল। জিনি দেখেছিল সামনের ছোট্ট টেবিলটার ওপর নেল কাটারটা পড়েই রয়েছে!
কী হয়েছে জন্মদিন তো? ও কী করতে পারে? যে ওকে দেখলেই পালায়, তার জন্য কী করতে পারে? কিন্তু শুধুই কি পালায়! পাল্টা কি কিছু করে না? ওকে যে মাঝে মাঝে চকোলেট এনে দেয়! সে দিন রিপোর্ট আনতে যেতে বলায় সঙ্গে সঙ্গে যে রাজি হয়ে গেল, সে সব! সে সব কিছু নয়, না?
এক অদ্ভুত দোলাচলে পড়েছিল জিনি। মনের ভেতরের ইচ্ছের সঙ্গে আত্মসম্মানের লড়াই শুরু হয়েছিল। কেমন যেন একটা অস্বস্তি। ভাতের মধ্যে কাঁকড়, চোখের মধ্যে বালি, জুতোর মধ্যে পেরেক ফুটে উঠেছিল যেন! বসন্তকে আর অতটাও ভাল লাগছিল না। আমের মুকুলের গন্ধে গা গুলোচ্ছিল।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে পিসিকে ধরেছিল জিনি। বলেছিল, “আচ্ছা পিসি, কাউকে গিফট দিতে গেলে কী দেওয়া যায় বলো তো? জন্মদিনের গিফট আর কী!”
পিসি হেসে তাকিয়েছিল, “ছেলে না মেয়ে?”
সামান্য ইতস্তত করে জিনি বলেছিল, “ইয়ে… ছেলে।”
পিসি হেসে বলেছিল, “ও বুঝেছি। ওই ছেলেটা। লম্বা, সামান্য দাড়ি, দেখতে ভাল, চুপচাপ। তা যাই দিবি পারফিউম, গোলাপ। তবে রুমাল দিস না। তা হলে সম্পর্ক টেকে না। আমি জানি।”
জিনি তাকিয়েছিল পিসির দিকে। দেখেছিল, পিসি মিটিমিটি হাসছে। জিনি ভুরু কুঁচকে বলেছিল, “তুমি হাসছ কেন?”
“কিছু না। এমনি। আমি বৌদিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ছেলেটার সম্পর্কে। বৌদি বলল গ্রামের ছেলে। ক্লাস টুয়েলভ পাস। আগে নাকি সার্কাসে চাকরি করত। মানে, খুব একটা যে লুক্রেটিভ তা কিন্তু নয়। যা করবি ভেবে করবি কিন্তু।”
“আমি কি করতে গিয়েছি!” জিনি তাকিয়েছিল, “ওর জন্মদিন… এখানে ওর কেউ নেই, তাই…
পিসি হেসে গাল টিপে দিয়েছিল জিনির। বলেছিল, “আমার যেন অল্প বয়স ছিল না!”
“ছিল, কিন্তু তুমি তো বিয়েই করলে না। কেন গো?”
জিনির প্রশ্নে একটু যেন থমকে গিয়েছিল পিসি। তার পর বলেছিল, “সে আর কী বলি! একজনকে বিয়ে করব ভেবেছিলাম! কিন্তু….”
“কিন্তু কী গো?” জিনি তাকিয়েছিল।
পিসি বলেছিল, “খুন হয়ে গিয়েছিল সে। পলিটিকাল মার্ডার। কে করেছিল, কেন করেছিল কিছুই ধরা যায়নি। তাই আর… যাক গে। বাদ দে।”
জিনি চুপ করেছিল। এ সব তো ও জানত না! জানলে এমন প্রশ্ন করতই না!
ও কথা ঘোরাতে বলেছিল, “আমি এমনি গিফটের কথা জিজ্ঞেস করলাম। আমি দেব না কিছু। ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগ আর কতটুকু?”
পিসি হেসে বলেছিল, “তোর যে ওকে পছন্দ সেটা আমি বুঝেছি। বৌদি এ সবে মন দেয় না তাই এখনও বোঝেনি। শোন জিনি, মানুষকে না, গাছের মতো হতে হয়। গাছ নিজের স্বভাবে ফুল ফোটায়, ফল ফলায় । মানুষেরও তেমন স্বাভাবিক হওয়া উচিত। ধর প্রচণ্ড ঝড়ে গাছের সব মুকুল নষ্ট হয়ে গেল, ফুল আর ফল পড়ে গেল, তখন কি গাছ সেই সব নিয়ে গোসা করে বসে থাকে? বলে যে ফুল ফোটাব না, ফল ফলাব না? জানবি, জীবনে স্বাভাবিক থাকাটাই আসল। তোর স্বাভাবিক ভাবে যা মনে আসছে, সেটাই কর। গিফট দে। তবে ওই যে বললাম, ওই আইটেমগুলো বাদ দিয়ে। বুঝেছিস?”
দিন বেশ বড় হয়ে গিয়েছে এখন। চারিদিকে ভালই আলো আছে। ধুলোটে রঙের আকাশ ছড়িয়ে আছে মাথার ওপর। সামনের বড় রাস্তায় গাড়ি, অটো, বাস, ট্রাম আর মানুষের জট লেগে গিয়েছে যেন। তার মধ্যে প্যাঁ পুঁ, প্যাঁ পুঁ করে নানা রকম হর্ন বেজেই চলেছে। লেক মার্কেটের এই . অঞ্চলটায় এত ভিড় হয় যে, বলার নয়! ফুটপাথগুলো হকারে ভর্তি! মানুষের হাঁটার উপায় নেই একটুও! শুধু মলের সামনেটা ফাঁকা। সেখানে ফুটপাথে দোকানপাট বসতে দেওয়া হয়নি। যদিও সার দিয়ে লোকজন বসে রয়েছে। মলের পাশ ঘেঁষে যে গলিটা গিয়েছে সেখানেও খুব ভিড়। তবে সেই গলি দিয়ে হাওয়া আসছে খুব। মলের সামনে ঢোকার লাইন। সেখানে হাতে স্যানিটাইজার দিয়ে, তার পর মলে ঢোকানো হচ্ছে।
সারা পৃথিবীতে তাণ্ডব শুরু করেছে করোনাভাইরাস! চিনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়েছে ভাইরাসটা। কেউ বলছে ওয়েট মার্কেট থেকে ছড়িয়েছে, আবার কেউ বলছে এটা নাকি আরও বড় কোনও চক্রান্ত। সে যাই হোক, ইউরোপ আর আমেরিকায় অবস্থা খুব খারাপ। আমাদের দেশেও একটু একটু করে শুরু হয়েছে। কে জানে কোন দিকে এগোবে পরিস্থিতি! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তো একে প্যানডেমিক ঘোষণা করে দিয়েছে।
জিনি আর যেন ভাবতে পারে না। চারিদিকে যেন অশান্তি লেগেই রয়েছে! এই যে ওরা সবাই পড়াশোনা করছে, কিন্তু তার পর যে কী করবে! বেসরকারি চাকরির হাল খারাপ। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় লক্ষ লক্ষ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কত পরীক্ষার এখনও রেজাল্ট বেরোচ্ছে না। গোটা ব্যাপারটা ভাবলেই এত টেনশন হয়! মনে হয় সব অন্ধকার। মনে হয় এই ভাবে ক্রমাগত চাপ নিয়ে আর কত দিন মানুষ পারবে বেঁচে থাকতে! মা বলে, বিয়ে দিয়ে দিলে নাকি ল্যাঠা চুকে যায়।
কিসের ল্যাঠা? ও কি ল্যাঠা নাকি? আর এখনকার দিনে কেউ এমন ভাবে! আর ওকে বিয়ে দেবে কেন? ওর ইচ্ছে হলে ও বিয়ে করবে। সেখানে বিয়ে দেওয়ার কথা আসছে কী করে? মা কি জানে না যে, ওকে নিজেকে কিছু করতে হবে জীবনে! বাবা-মাকে ওই বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যেতে হবে!
আবার ঘড়ি দেখল জিনি। আশ্চর্য! বিধানটা করছে কী? আর অন্যজন? সেই-বা কোথায়? না ধরছে ফোন, না করছে মেসেজের রিপ্লাই। কারও কোনও কথার দাম নেই!
গতকাল আচমকা বিধান ওকে ধরেছিল ইউনিভার্সিটির সামনে। ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য হাঁটছিল জিনি। তখনই বিধান এসে ধরেছিল।
বিধানকে কেমন যেন উস্কোখুস্কো লাগছিল। দেখে মনে হচ্ছিল কত দিন স্নান করেনি, খায়নি, ঘুমোয়নি।
বিধান এসে পথ আটকে দাঁড়ানোয় মনে মনে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল ও। বলেছিল, “জিনি, আমার তোর সঙ্গে খুব দরকারি কথা আছে। একটু কলেজ স্কোয়ারে বসবি?”
জিনি তাকিয়েছিল বিধানের দিকে। বুঝতে পারছিল কী বলতে চাইছে ও। বেশ কিছু দিন ধরেই চাইছে। কিন্তু পারছে না নিধির জন্য। নিধি আজ নেই, সেই সুযোগেই চলে এসেছে বিধান।
জিনি তাড়া দেখিয়ে বলেছিল, “আজ কিছুতেই হবে না। আমার খুব কাজ আছে। মানে খুব!”
“কিন্তু আর পারছি না যে!” বিধান অসহায় ভাবে তাকিয়েছিল ওর দিকে, “জাস্ট পাঁচ মিনিট দে।”
“পাঁচ সেকেন্ডও নয়। এমন জোর করিস না। বুঝেছিস?” জিনি এবার বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল, “কাল লেক মার্কেট মলের সামনে আসতে পারবি? সাড়ে চারটে নাগাদ।”
বিধান থতমত খেয়ে বলেছিল, “বিকেল সাড়ে চারটে?”
জিনি বলেছিল, “তোর কী মনে হয়? ভোর সাড়ে চারটে! আশ্চর্য!”
বিধানকে রেখে দ্রুত সামনে দিয়ে যাওয়া একটা বাসে উঠে গিয়েছিল জিনি। তার পর মোবাইলটা বের করে ফোন করেছিল নিধিকে।
“সরি সরি,” হস্তদন্ত হয়ে ভিড়ের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে এল বিধান। জিনি দেখল, আজ যেন আরও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে বিধানকে। মুখে যেন ছোট্ট একটা কুপি জ্বলছে। এমন ছন্নছাড়া মানুষ দেখলেই বিরক্ত লাগে ওর। ও তো জানে বিধান কী বলবে এবার। কী ভাবে নাকে কাঁদতে শুরু করবে।
“এখানে কথা বলব? মানে এমন ভিড়ের মধ্যে? কোথাও বসবি?” বিধান সময় না নিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “মানে, একটু নিরিবিলি হলে সুবিধে হত।”
জিনি ভাল করে তাকিয়ে দেখল বিধানকে। ভাবল কী করে একে বলবে? কিন্তু বলতে তো হবেই। সত্যিটা জানাতেই হবে।
জিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বিধান, আমার হাতে এই যে প্যাকেটটা দেখছিস, কার জন্য জানিস?”
“কার জন্য?” বিধানের মুখে সামান্য সময়ের জন্য বড় আলো জ্বলে উঠেও আবার নিবে গিয়ে কুপির আলোটুকু বেঁচে রইল।
জিনি বলল, “আমার একটা ছেলেকে ভাল লাগে। আজ ওর জন্মদিন। কলকাতায় কেউ নেই ওর। তাই আমি ওর জন্য কয়েকটা জিনিস কিনেছি। আমার ওকে ছাড়া আর কাউকে ভাল লাগে না রে! মানে সেই প্রশ্নই নেই। বুঝেছিস? এটা তোকে দেখানোর ছিল। তাই ডেকে দেখালাম। কারণ, তুই তো বাংলা কথা বুঝিস না । ”
বিধানের মুখে যে সামান্য আলোটুকু জ্বলছিল, সেটাও দপ করে নিবে গেল। জিনি দেখল বিধানের চোয়াল ঝুলে গিয়েছে, চোখ দুটো ফ্যাকাসে !
“তুই… এত নিষ্ঠুর… এত….” বিধান কী বলবে যেন বুঝতে পারল না ।
“এখানে দুটো কথা বলি তোকে। প্রথম হল, আমাকে একবার আগেও এ সব বলেছিলিস তুই। আমি তখনও ‘না’ বলেছিলাম তোকে। তোর কি সেটা মনে নেই? নাকি ভেবেছিস সময়ের সঙ্গে সেই ‘না’-টা ‘হ্যাঁ” হয়ে গিয়েছে! আর দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, আমি নিষ্ঠুর হলে, তোকে ঝুলিয়ে রাখতাম। তোকে নাচাতাম। তোর থেকে যা সুবিধে পাওয়া যায় সেটা নিয়ে, তার পর তোকে খালি প্যাকেটের মতো ছুড়ে ফেলে দিতাম। কিন্তু সেটা কি করলাম? সত্যিটা বলে দিলাম। এখন একটা সেট ব্যাক লাগছে তোর। কিন্তু ভবিষ্যতে তুই আবার কাউকে ভালবাসবি। চিরকালীন প্রেম বলে কিছু হয় না। যখন যাকে ভাল লাগে জানবি সেটাই সেই সময়ের জন্য সত্যি। ফলে চাপ নিস না। যে তোকে পছন্দ করে তার দিকে ফোকাস কর, দেখবি ভাল লাগবে,” কথাটা বলে বিধানের মাথার পাশ দিয়ে ওর পেছন দিকে তাকাল জিনি।
“আমায় পছন্দ করে মানে?” বিধান অবাক হয়ে তাকাল। জিনি হেসে বলল, “ওই দেখ।”
বিধান পেছনে ঘুরল। দেখল, হেলমেট হাতে নিয়ে ওদের দিকে হেঁটে আসছে নিধি।
বিধান হাঁ হয়ে গেল!
নিধি এসে ভুরু কুঁচকে তাকাল বিধানের দিকে। তার পর জিনির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এ মালটা এখানে কী করছে?”
জিনি হেসে বলল, “অনেক অভিনয় হয়েছে। আর নয়। আমি বলে দিয়েছি ওকে যে, তোর ওকে ভাল লাগে। এবার তোরা বুঝে নে বাবা ! আমায় যেতেই হবে এবার। আজ কবির জন্মদিন।”
বিধান এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ও এলোমেলো গলায় জিজ্ঞেস করল, “নিধি! ও তো আমায় সারাক্ষণ যা-তা কথা বলে! সেখানে… মানে… কী হচ্ছে এ সব!”
জিনি হাসল। বলল, “রাজকন্যা আর রাজত্ব সব দিয়ে গেলাম, তাও বুঝতে পারছিস না? এই নিধি, তোর এই পাঁঠাকে তুই ল্যাজে কাট, মুড়োয় কাট, আমায় ক্ষমা কর। আমার খুব তাড়া আছে।”
ওদের রেখে রাস্তায় নেমে এল জিনি। ওই তো হাজরার অটো। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে “হাজরা হাজরা” বলে চিৎকার করছে! জিনি দেখল, অটোর পেছনের সিট ভর্তি। কিন্তু সামনে একটা জায়গা আছে।
হাত দেখিয়ে অটোটা থামিয়ে ড্রাইভারের পাশে বসল জিনি। তার পর তাকাল ফুটপাথের দিকে। দেখল, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিধান আর নিধি। বিধানের মুখটা মাটির দিকে নামানো। যেন পড়া পারেনি টানা ছ’দিন! দেখল, নিধি হাত দিয়ে বিধানের মুখটা ধরে তুলল। তার পর… না, তার পর আর দেখতে পেল না। কলকাতার ভিড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ছোট্ট সবুজ হলুদ অটোটা!
বাড়িতে ফিরে জামাকাপড় পাল্টে, হাত-মুখ ধুয়ে আজ সামান্য একটু সাজল জিনি। আলতো করে পাউডার বুলিয়ে নিল মুখে। ছোট্ট একটা টিপ পরল। পারফিউম দিল সামান্য। তার পর রান্নাঘরের দিকে গেল।
মা আর পিসি বসে রয়েছে রান্নাঘরের সামনে। ওকে দেখে পিসি হাসল। বলল, “এসেছিস? যা, পায়েসটা দিয়ে আয়।”
জিনি এক ঝলক তাকাল মায়ের দিকে। মা এ সব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। আসলে বাড়িতে পিসিই বলেছে যে, লালুর থেকে জেনেছে আজ কবির জন্মদিন। তাই পিসি উদ্যোগ নিয়ে পায়েস করেছে!
মা বলল, “ওকে বলিস, যদি রাতে খায় আমাদের সঙ্গে।”
আবার সেই রাতের খাওয়া।
জিনি যেন একটুও আগ্রহী নয় সে ভাবে বলল, “না না, কী দরকার! পিসিরই-বা কী দরকার ছিল এ সব করার!”
পিসি বড় বড় চোখ করে তাকাল ওর দিকে। ভাবটা এই যে, মেয়ে তো ডাকাত। দিনেদুপুরে এমন মিথ্যে! যেন পিসির দরকার ছিল এ সব। জিনির হাসি পেল পিসির চোখ দেখে। কিন্তু নিজেকে গম্ভীর রাখল। পিসি বলল, “সত্যি, আমার এটা ভাবা উচিত ছিল। তুই সারা দিন কলেজ করে এলি। সেখানে আবার তোকেই পায়েস দিয়ে পাঠানোটা হবে না। ঠিক আচ্ছা, তুই ঘরে যা। আমি দিয়ে আসছি ওকে।”
“আরে, না না,” জিনি ছিটকে উঠল, “তুমি পাগল নাকি! এই পা নিয়ে সিঁড়ি ভাঙবে! আমিই দিয়ে আসছি। তোমাদের কিছু বলাও মুশকিল। দাও।”
পিসি অনেক কষ্টে ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল, তার পর পায়েসের বাটিটা দিয়ে বলল, “দেখিস, ছেলেটা আর কিছু যেন না খায়।”
জিনি বড় বড় চোখ করে পিসিকে সাবধান করল। কী করছে! মা বসে আছে যে সামনে ।
পিসি হাসল। বলল, “ধীরেসুস্থে আয়। তাড়া নেই কোনও।” গিফটের প্যাকেটটা জামার মধ্যে আগেই লুকিয়ে রেখেছিল জিনি। এবার পায়েসের বাটিটা নিয়ে বেরোল।
ওদের বারান্দার পাশ দিয়েই সিঁড়ি উঠে গিয়েছে। জিনি আজ লালুর থেকে সকালেই শুনে নিয়েছিল যে, কবি বিকেলে বাড়িতেই থাকবে।
জিনি সিঁড়িতে উঠে গিফটের প্যাকেটটা বের করল জামার ভেতর থেকে, তার পর ওপরে উঠে গেল। বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে নক করল। “কে?” কবির গলা, “এক মিনিট, খুলছি।”
দরজা খুলে সামনে দাঁড়াল কবি। একটা হলদে গোল গলা টি শার্ট আর জিনস পরে আছে। জিনিকে দেখে একটু অবাকই হল যেন।
জিনির যে কী ভাল লাগল! বাইরে সন্ধে নামছে। কী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। কবির চুলগুলো এলোমেলো হয়ে সামান্য উড়ছে, পড়ছে কপালের ওপর ।
জিনি তাকাল পূর্ণ দৃষ্টিতে। বলল, “বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকব?”
“না না, প্লিজ” কবি সামান্য লজ্জা পেয়ে সরে জিনিকে ঘরে আসার জায়গা করে দিল।
জিনি দেখল ঘরটা। একটা খাট, আলমারি, টেবিল আর টিনের একটা ফোল্ডিং চেয়ার। লাগোয়া বাথরুম।
জিনি হাসল। তার পর পায়েসের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “হ্যাপি বার্থডে।”
কবি অবাক হয়ে গেল। কী বলবে যেন বুঝতে পারল না। ও পায়েসের বাটিটা ধরে টেবিলে রাখল।
জিনি এবার প্যাকেটটা বাড়িয়ে বলল, “এটা তোমার জন্য। জানি না। তোমার পছন্দ হবে কি না। তাও…”
“আমার জন্য!” কবি প্যাকেটটা ধরে আরও অবাক হল, “আর জন্মদিন, সেটা তুমি কী করে… ও বুঝেছি। লালু। সে দিন আমায় ফর্ম ফিল আপ করতে দেখেছিল। তাই না?”
জিনি হাসল, “তুমি এত কথা বলতে পারো? সত্যি?”
কবিও হাসল এবার। আর জিনি দেখল আবছা দাড়ির মধ্যে দিয়ে সেই টোল জেগে উঠেছে। জিনির বুকের মধ্যে আবার সেই বিদ্যুৎপূর্ণ বাটিটা চলকে উঠল একটু।
কবি বলল, “তোমায় কী দিই? মানে…. দাঁড়াও… মানে, প্লিজ বোসো।” কবি হাতের প্যাকেটটা নিয়ে আলমারির দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
জিনি বসল না। টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। পায়েসের বাটির পাশে বই রাখা। সঙ্গে আজকের খবরের কাগজ। তার পাশে কবির মোবাইল। সব কিছুই সুন্দর করে সাজানো।
ও এবার টেবিলের দিক থেকে ঘুরে অন্য দিকে তাকাতে গেল, আর ঠিক তখনই কবির মোবাইলটা রিনঠিন শব্দে বেজে উঠে বন্ধ হয়ে গেল। মিসড কল। ঘুরে তাকাল জিনি। আর সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেল।
জিনি দেখল, টেবিলের ওপরে পড়ে আছে মোবাইল। স্ক্রিনের আলো জ্বলে আছে। ওয়ান মিস কল দেখাচ্ছে। আর মোবাইলের ওয়াল পেপারে জ্বলজ্বল করছে ছবি। লাল কুর্তি আর হলুদ ওড়না উড়িয়ে দোলনায় দুলছে উর্জা। রোদ এসে পড়েছে মুখে। উর্জা হাসছে।
জিনির মনে হল, বুকের মধ্যে রাখা সেই বিদ্যুৎপূর্ণ বাটিটা কে যেন সম্পূর্ণ উল্টে ফেলে দিল এবার! আর জ্বলে-পুড়ে যেতে লাগল সারা শরীর!
