১৯. রাজু
গুরানের দোকানে হালকা স্বরে রেডিয়ো বাজছে! মহম্মদ রফি গাইছেন, ‘ম্যায় জিন্দেগি কা সাথ নিভাতা চলা গয়া / হর ফিক্র কো ধুঁয়ে মে উড়াতা চলা গয়া’! বিকেল পাঁচটার টালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের জট পাকানো শব্দের মধ্যেও গানটা শুনে মাথার ভেতর কেমন একটা ঠান্ডা ভাপ লাগার মতো আরাম হল রাজুর।
ওরানের দোকানে সারাক্ষণ রেডিয়ো চলে। রেডিয়োটা ছোট। চামড়ার খাপে ঢাকা। পেছনে একটা এরিয়াল আছে। সেটা টেলিস্কোপিক। তবে ওঠানোর দরকার পড়ে না। তাও রাজু এসেই আগে এরিয়ালটা তুলে দেয়। ব্যাপারটা আড়চোখে দেখে গুরান। কিন্তু কিছু বলে না। রেডিয়োর এই এরিয়াল তুলে দেওয়ার মধ্যে কেন কে জানে একটা ছোটবেলার মতো আনন্দ পায় রাজু। ওদের বাড়িতেও সেই ছোটবেলায় একটা এরিয়াল দেওয়া পুরনো রেডিয়ো ছিল। সেটা ধরেও ও টানাটানি করত। মাঝে মাঝে রেডিয়োটা কানের কাছে ধরে, “হ্যালো হ্যালো” বলে কাল্পনিক কোনও যুদ্ধের সময় কাল্পনিক সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলত! বাবা হাসত। বলত, “বড় হয়ে আর্মিতে যাবি?” বাবাকে মনে পড়লে এত ভাল লাগে রাজুর! ও বোঝে সে সব সোনার দিন আর ফিরবে না।
গুরানের বাবা-মা নেই। জেঠুর কাছে মানুষ। রেডিয়োটা জেঠুর। দোকানটাও। জেঠুর পরে ওর ভাগে এসেছে দুটোই। এখন বাড়িতে জেঠিমা আর গুরান থাকে। খুব সুন্দর গান করে জেঠিমা। পাড়ার অনেক বাচ্চা আসে গান শিখতে। কিছুটা রোজগারও হয়, আবার সময়ও কাটে জেঠিমার।
জেঠু খুব অরণ্যদেব কমিকসের ভক্ত ছিল। আর গুরানকে নাকি ওই কমিকসের গুরানের মতো দেখতে! তাই এমন ডাকনাম।
গুরানের এটা একদম পছন্দ নয়। ওর অরণ্যদেবের কমিকস ভাল লাগে না। বলে, “হোয়াইট ডমিনেশনের গল্প সব! একটা ইউরোপিয়ান লোক সব ব্ল্যাকদের মসিহা হয়ে গিয়েছে। সাদা মানে যেন ভাল আর কালো মানে যেন খারাপ। এখানেও এক! আমার এ সব দেখলে রাগ হয় খুব। দিনে আলো থাকে, কিন্তু তাই বলে রাত কি কম সুন্দর! বরং বেশি সুন্দর। পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে দেখবি সবাই হোয়াইটওয়াশ করা মেয়ে চাইছে! আমার গায়ের রং কালো বলে সেই ছোট থেকে কত লোকে খারাপ কথা বলে! এ দিকে মাথার চুল সাদা হতে শুরু করুক, দেখবি কালো প্যাস্টেল থেকে শুরু করে কয়লার গুঁড়ো সব মাখতে শুরু করবে! এর কোনও মানে হয়! অশিক্ষিত সব।”
গুরান সচরাচর এত কথা বলে না। কিন্তু কখনও-সখনও রেগে গেলে এমন একটু বলে ফেলে।
আজ গুরান রেগে নেই। তাই চুপচাপ আছে। মাথা নামিয়ে একটা মোবাইল খুলে কী সব খুটুর- খাটুর করছে!
রাজুর মাথার সেলাই আজ কেটেছে। হাতে এখনও সামান্য ব্যথা। কিন্তু কাঁহাতক আর ঘরে বসে থাকা যায় এ ভাবে। মার্চের প্রথম। তবে সে ভাবে খুব গরম পড়েনি এখনও। মা বলেছিল আর ক’টা দিন ঘরে বসে থাকতে।
কিন্তু উপায় নেই। আজ একবার যেতেই হবে সেতুদার কাছে। প্লাস পড়ানোও কামাই হয়ে গিয়েছে অনেক। অনেকের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে বলে রক্ষে যে, সে ভাবে ধরে ধরে আর পড়ানোর কিছু নেই।
একটু আগে উর্জা ফোন করেছিল। সেখানে এমন কিছু কথা হয়েছে যে, তার ভিত্তিতে এখন থেকেই ওকে কাজকর্ম সব গুছিয়ে রাখতে হবে।
গুরান এবার হাতের মোবাইলটা রেখে তাকাল ওর দিকে। তার পর বলল, “শরীর তো আগের চেয়ে ভাল দেখছি। তাও ক’টা দিন রেস্ট নিলে পারতিস।”
“দূর, ভাল লাগছে না বাড়িতে বসে। তা ছাড়া সেতুদার কাছে যাব। যেতেই হবে। খুব দরকার।” রাজু আলতো করে মাথায় হাত দিল। সেলাই কাটলেও ব্যথা আছে। ওষুধ চলবে আরও কিছুদিন।
গুরান মাথা নাড়ল। বলল না কিছু।
“আচ্ছা গুরান,” রাজু জিজ্ঞেস করল, “ধর, আমি যদি কোনও কাজে বাইরে চলে যাই, তা হলে কি মাঝে মাঝে তুই আমার মা আর ভাইয়ের খোঁজ নিবি? মানে জাস্ট খবর আর কী! নিবি?”
গুরান রেডিয়োর ভলিউমটা আরও কমিয়ে দিল। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবি?”
“না, মানে ভাবছি আর কী। এখানে তো কিছু হল না! চল্লিশের কাছে বয়স হয়ে গেল। সেই কবে থেকে এই পার্টিতে আছি। ভেবেছিলাম মানুষের হয়ে কাজ করব। কিন্তু কী হল বল। খারাপ ঘটনার সাক্ষী হতে হল অনেক। মানুষের জন্য কিছু করা গেল না এই জীবনে,” রাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
গুরান হাসল, “মানুষের জন্য! মানুষ কি আদৌ চায় তাদের জন্য কেউ কিছু করুক? চাইলে এত দিনে কিছু একটা ঠিক হয়ে যেত। আসলে যে পলিটিকাল পার্টি নাড়ু, চিঁড়ের লোভ দেখায়, তাদের ভোট দিয়ে দেয়! লং টার্ম হিসেবে কেউ ভাবেই না। এতবার ঠকেও কিছু শিখল না। যুক্তি দিয়ে ঠিক মতো বিচার করতে পারল না। যারা মুহূর্তবাদী তাদের জন্য কে কী করবে।”
রাজু হাসল। গুরান পলিটিক্সের মানুষ নয়। তাই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো ওরও একটা বাইনারি ধারণা আছে সমাজ, রাজনীতি আর করাপশন নিয়ে। কিন্তু ব্যাপারটা এতটা সরল নয়। নানা প্যাঁচ আছে এর মধ্যে। নানা গিঁট, অন্ধকার গলি, ভয়ের গল্প আছে। ক্ষমতার রসায়নটা সহজ কিছু নয়।
“যাক গে, শোন না, তুই খবর নিবি কি? আমার বছর দুয়েক লাগবে। তার পর মাকে অন্তত নিয়ে যাব আমার কাছে। বুঝলি?”
গুরান অবাক হয়ে তাকাল, “নিয়ে যাব মানে? কেসটা কী বল তো?” গুরান এবার রেডিয়োটা বন্ধই করে দিল। ওই গানের পরে রফির আর-একটা গান শুরু হয়েছিল। সেটাও বন্ধ হয়ে গেল।
রাজু চোয়াল শক্ত করল। গুরানকে কি বলা ঠিক হবে? তবে ভুলও কিছু হবে না। গুরান কাউকে বলে দেওয়ার ছেলে নয়। ওকে বিশ্বাস করা যায়। আর রাজু যদি চলে যায়, তা হলে কোনও একজনকে মা-ভাইয়ের খবরাখবর নেওয়ার জন্য রাখতে হবে। না হলে খুব অসুবিধে হবে।
গুরান পাশের তাক থেকে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের ডিবে বের করে তার থেকে একটু ভাজা মৌরি আর মিছরি হাতের পাতায় ঢেলে নিল। তার পর ডিবেটা বাড়িয়ে দিল রাজুর দিকে। রাজু মাথা নেড়ে ‘না’ করল।
গুরান মুখের মধ্যে মৌরি-মিছরি ঢেলে ডিবেটা বন্ধ করে, রেখে দিল তাকে। তার পর বলল, “বল।”
“উর্জার কথা তো তোকে বলেছি। তাই না? উর্জা ত্রিবেদী। ওর বাবা বীরেন্দ্র ত্রিবেদী। বলেছি তো?” রাজু জিজ্ঞেস করল।
গুরান মাথা নাড়ল, “বীরেন্দ্র ত্রিবেদীকে কে না চেনে! হ্যাঁ বলেছিস।”
“সেটাই আর কী,” রাজু বুঝতে পারল না কতটা বলবে আর কতটা বলবে না। তার পর বলল, “উর্জা চার বছর বাইরে ছিল। এখন এসেছে। কিন্তু এখানে অবস্থা ভাল নয়। তাই ও আবার বাইরে যাবে। নিউ জিল্যান্ড। ও আমাকেও নিয়ে যাবে। মানে সবারই বয়স বাড়ছে। চার বছর আলাদা ছিলাম। আর কত দিন বল! আর ওর বাড়িতে আমাদের সম্পর্ক মেনেও নেবে না। তাই আজ উর্জা ফোন করেছিল একটু আগে। বলল যে, আমি যদি যেতে চাই! আমি হ্যাঁ বলে দিলাম। ওখানে নাকি আমার কাজের একটা বন্দোবস্ত হবে। তা ছাড়া উর্জাকে ছেড়েও থাকতে পারব না। আর বাইরে গেলে কাজের স্কোপ বাড়বে। মাকে টাকাও পাঠাতে পারব। কত ছেলেই তো বিদেশে যায়, তাই না?”
গুরান ভুরু কুঁচকে তাকাল, “ওর বাবা-মা মানবে না কেন?” “আর বলিস না!” মাথা নাড়ল রাজু, “যত রাজ্যের ফিউডাল মেন্টালিটি। আমি গরিব। আমার স্টেটাস নেই। ওদের তুলনায় আমি নাকি নিচু। ওদের কাজের লোকরা নাকি আমার চেয়ে বেশি রোজগার করে। ভাব একবার, টাকা দিয়ে এরা মানুষ বিচার করে!” “সে তো ভাই টাকা দিয়ে সবাই সব কিছু বিচার করে। চারিদিকে চোখ ঘোরালে এটাই দেখবি,” গুরান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“এরা আরও বায়াসড। আমি গরিব বলে নাকি এই বিয়ে হতে পারে না। আমার পড়াশোনার যেন কোনও দাম নেই! তুই একবার ভাব। মানুষ কি শুধু টাকাপয়সা, বল? প্লাস নিজের মেয়ের খুশিটা দেখবে না? এটা কি পুরনো হিন্দি সিনেমা?” রাজু মাথা নাড়াল।
গুরান ভাবল কিছুক্ষণ। তার পর বলল, “কোথায় খাপ খুলেছিস রাজু! দেখ, কে কী মানবে, না মানবে সেটা তার ব্যাপার। আর আর্ট ইমিটেটস লাইফ। সবাই চায় টাকাওলা পাত্র। কিন্তু এ নিয়ে আমি কিছু বলব না। তবে আমায় একটা কথা বল, এক-কলকাতা মেয়ে থাকতে তুই আর মেয়ে পেলি না? এ ভাবে কেউ নিজেকে বাঁশ দেয়!”
রাজু বলল, “আমি ওকে পাইনি। ও আমায় পেয়েছিল। কী বলি বল! কাস্ট মেলে না। প্লাস আমার টাকা নেই। তাই আমি বাদ। এত রাগ হয় শুনলে! টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি নাকি এটা!”
“সেঞ্চুরি দিয়ে মানসিকতা মাপতে যাস না। বোল্ড হয়ে যাবি,” গুরান হাসল। তার পর আবার একটা মোবাইল বের করল কাচের শোকেস থেকে। সেটার পেছনের ঢাকনাটা খুলে হাতে সূক্ষ্ম একটা স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে বলল, “যাই করবি ভেবে করিস। বেশি কাউকে জানাস না।”
রাজু দেখল গুরান আবার ডুবে গিয়েছে কাজে। আর বসে থেকে কী হবে! ও উঠল। বাস ধরতে হবে। সেতুদা পার্টি অফিসে থাকতে থাকতে পৌঁছোতে হবে ওকে। সেতুদা ফিরে এসেছে বাইরে থেকে। কাল একটা টেক্সট করেছিল। কেমন আছে জানার জন্য। আজ দেখা করতে বলেছে। তখনও এত সব কিছু ঠিক হয়নি। কিন্তু আজ উর্জার ফোনটা আসার পরে বুঝেছে যে, সেতুদাকে গিয়ে এটা অন্তত বলে দিতে হবে যে, পার্টিতে ও আর নেই। সব ছেড়ে দেবে এবার।
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় সেতুদাকে ফোন করেছিল রাজু। সেতুদা বলেছে অফিসে আসতে ছ’টা নাগাদ।
এখন বাজে সওয়া পাঁচটা। বাস ধরলে ছ’টায় পৌঁছে যাবে সহজেই।
সূর্য নেমে গিয়েছে অনেকটা। আকাশে একটা ধূসর ভাব। টালিগঞ্জ সার্কুলার রোড খুব যে চওড়া তা নয়। তার ওপর আবার বাস, অটো, গাড়ি সাইকেলে হিজিবিজি হয়ে আছে। চারিপাশে দোকান। মানুষের থিকথিকে ভিড়। সামনেই টালি নালার ওপর দিয়ে একটা ব্রিজ। সেটা পার করে একটু গেলেই টালিগঞ্জ ফাঁড়ির মোড়। রাজু ঠিক করল সেখান থেকে বাস ধরে নেবে।
গুরানকে “আসছি” বলে ও বেরিয়ে পড়ল। এখানে ফুটপাথ খুব সরু। আর আশপাশের দোকান এমন করে সেই ফুটপাথ দখল নিয়ে রেখেছে যে, সেখানে ঠিক মতো হাঁটার উপায় নেই। ছুটন্ত গাড়ি, বাস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাস্তার ধার ঘেঁষে খুব সাবধানে হাঁটতে হয়।
বেশ অনেক দিন পরে রাস্তায় বেরোল রাজু। এত গাড়ি, বাসের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গিয়ে একটু যেন ভয় ভয় করছে। রাজু যতটা সম্ভব রাস্তার পাশ ঘেঁষে হাঁটছে। সময় লাগলে লাগুক। তাড়াহুড়ো করে যাবে না।
ও আকাশের দিকে তাকাল। ধূসর আকাশ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। কলকাতার আকাশ ধূসর বিড়ালের মতো হয়ে থাকে সারাক্ষণ। সেই পার্টিতে জয়েন করার সময় যখন মুড়াপোঁতা বলে গ্রামে ছিল, সেখানে থাকতে দারুণ লাগত ওর। কী সুন্দর মণি নদী। ছড়ানো নীল আকাশ।
উর্জার থেকে ইউরোপের ছবি দেখেছে রাজু। সেখানেও আকাশ যেন নীলকান্ত মণির মতো। আর এখানে! পলিউশন না কমলে কিছু করার নেই, এটা বোঝে সবাই। কিন্তু তার জন্য কিছু যে কেউ করবে তার উপায় নেই।
রাস্তার বাঁ দিক থেকে এবার ডান দিকে যেতে হবে। রাজু দাঁড়াল। কাছেই বড় সিগনাল। সবুজ হয়ে আছে। তাই গাড়িগুলো সব জীবন বাজি রেখে হন বাজাতে বাজাতে সিগনালটা ধরবে বলে গোঁত্তা খেয়ে আসছে এই দিকে। উর্জা বলে, উন্নত দেশের রাস্তায় এ ভাবে গাড়ি চলে না। একটা দেশের মানুষের মনের অস্থিরতা আর ধৈর্যহীনতা বোঝা যায় তাদের গাড়ি চালানোর ভঙ্গি দেখে।
“এই রাজু! রাজু! এই শালা রাজু!”
পরিচিত গলার ডাক শুনে রাজু এদিক-ওদিক তাকাল। কে ডাকছে ওকে এ ভাবে!
ও দেখল মোটরবাইকে বসে চিৎকার করতে করতে ওর দিকে এগিয়ে আসছে জহরদা।
জহরদা কাছে এসে বাইকটা দাঁড় করাল কোনও মতে। তার পর গাঁকগাঁক করে বলল, “আরে শালা, তোর বাড়ি গিয়েছিলাম। পেলাম না। কাকিমা বললেন তুই বেরিয়েছিস। ক্যালানি খেয়ে ফ্ল্যাট হয়ে গিয়েছিলিস শুনলাম। শালা, কী যে করিস না! সারাক্ষণ আন্টুবান্টু কাজে ঘুরলে এটাই হবে।”
রাজু বলল, “তুমি এমন চিৎকার করছ কেন? আশপাশের লোকজন দেখছে। আস্তে কথা বলো, প্লিজ।”
জহরদার যেন খেয়াল হল। বলল, “আরে, কে শুনবে আর! ঠিক আছে, ঠিক আছে। তা, তুই যাচ্ছিস কোথায়?”
রাজু বলল, “আমি পার্টি অফিসে যাচ্ছি। খুব তাড়া আছে। সেতুদার কাছে যাব। কেন?”
“ও আচ্ছা। চল তোকে পৌঁছে দিই। এমন বিলা অবস্থায় অফিস টাইমের বাসে উঠলে আর দেখতে হবে না। পেটাই পরোটা হয়ে যাবি পুরো। উঠে বোস,” জহরদা ওকে বাইকের পেছনের দিকে ইঙ্গিত করল।
রাজু ভাবল ভালই হল। কেন ফালতু হাঁটতে যাবে।
বাইকে সাবধানে উঠে বসল রাজু। তার পর জহরকে বলল, “ঠিক আছে, চলো। কিন্তু আমার হেলমেট নেই যে। কিছু হবে না তো?”
জহর হাসল। বলল, “কে কী করবে? বাইকে পার্টির স্টিকার আছে না! দেখিস না আজকাল বড় বড় গাড়ির সামনে কেমন দলের উত্তরীয়, ব্যাজ এ সব রেখে দেয় সবাই! এগুলো হল সাইন। পুলিশ বোঝে ভাই। নো চিন্তা। চেপে বোস তুই।”
জহরদার বাইক চালানো দেখে রাজুর মনে হল লোকটা ট্রাফিক আইনটাইন জানে না একটুও।
রাজু বাধ্য হয়ে বলল, “জহরদা, মাইরি মারবে নাকি! আস্তে চালাও। সের মাথায় বাইক উঠিয়ে দেবে মনে হচ্ছে।”
জহরদা শব্দ করে হাসল। পেছন ঘুরে বলল, “আরে ডরপোক আদমি। তোর মরার থাকলে এমনিই মরবি। ভয় কিসের এত? ভয়কে জয় করো। এ ভাবে গুটিয়ে থাকলে চলবে? ভয় পেলে বাঙালির বিজয় সূর্য উদিত হবে?”
রাজু বলল, “তাও তুমি আস্তে চালাও। সূর্য ওঠাতে গিয়ে অস্ত করিয়ে দেবে মনে হচ্ছে।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে…” জহরদা হাসল। তার পর আলতো করে আবার মাথাটা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এই যে কী একটা কেস হচ্ছে না… বাইরের দেশে! কী একটা ভাইরাস। লোকজনের নাকি খারাপ অবস্থা। সত্যি!“হ্যাঁ, তাই তো পেপারে পড়ছি,” রাজু বলল।
“এখানেও আসবে নাকি রে?”
“তা আসবে বোধহয়। সারা পৃথিবীতে যখন ছড়াচ্ছে, তখন এখানে আসতে আর কত সময় লাগবে। কলকাতা তো আর পৃথিবীর বাইরে নয়,” রাজু বলল।
“যাঃ শালা! ক্যাচাল করেছে!” জহরদা বলল, “ওষুধ নেই নাকি শুনলাম। সত্যি?”
“আপাতত নেই,” রাজু ছোট্ট করে জবাব দিল, “মানে, যেটুকু পড়লাম আর কী।”
“তা হলে এই স্পেসে রকেট-ফকেট পাঠিয়ে কী লাভ হল! এই রোগের একটা ওষুধই যদি কেউ বের না করতে পারে? ঢপের সায়েন্স সব। টুকে পাশ করেছে শিয়োর,” জহরদা সামনে রাস্তা ফাঁকা পেয়ে আবার গাড়ির গতি বাড়াল।
রাজু কিছু বলল না। পার্টি অফিস প্রায় চলে এসেছে। এখন বাইক থেকে নামতে পারলে ও বাঁচে! জহরদা যে ভাবে বাইক চালাচ্ছে, মনে হচ্ছে পেছনে পুলিশ তাড়া করেছে!
মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করল রাজু। ভাবল, জহরদা ওর বাড়িতে গিয়েছিল কেন? ওকেই বা নিজের বাইকে করে নিয়ে এল কেন এখানে?
পার্টি অফিসের সামনে বাইক থেকে নেমে জহরদা হাসল। বলল, “এই এসে গিয়েছি। ইন ওয়ান পিস!”
রাজু বাইক থেকে নেমে হাসল। সত্যি, ওয়ান পিসই বটে।
ও দেখল, পার্টি অফিসের সামনে সেতুদার গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাইরে বেশ কিছু লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে চায়ের দোকানটাকে ঘিরে। সবাইকেই চেনে রাজু। ভেতরেও নিশ্চয়ই আরও মানুষজন আছে। ওকে দেখে কয়েকজন হাত তুলে হাসল। রাজুও পাল্টা হাসল।
রাজু এবার তাকাল জহরের দিকে। বলল, “তুমি যাবে না ভেতরে?” “না রে,” জহরদা মাথা নাড়ল, “সেতুদা হেভি খিট খেয়ে আছে আমার ওপর।”
“কেন?” অবাক হল রাজু।
“তুই তো শালা আমায় হেল্প করলি না। তো, আমিই একদিন সেতুদাকে বলতে গিয়েছিলাম ওই গড়িয়ার মাল্টিস্টোরিডের ব্যাপারে। তাতেই হেভি খচে গেল। কেন কে জানে! খিস্তি-ফিস্তি দিয়ে দিল। তাও ইংরেজিতে। ফাকার। ব্লাডি-টাডি আরও কী সব কী সব বলল,” জহরদার মুখটা কাঁচুমাচু দেখাল, “মালটা হেভি খিস্তি জানে রে। কয়েকটার মানে তো আমিই বুঝলাম না! একটা বলল ‘আসল’। আমি নাকি একটা ‘আসল’! ‘আসল’ কী ধরনের খিস্তি রে? বাংলা তো কথাটা, না? ‘আসল’। কে জানে মাল কী!”
রাজু বুঝল কী গালি দিয়েছে সেতুদা। ও হাসি চাপল অনেক কষ্টে। কিছু বলল না। চুপচাপ তাকিয়ে থাকল জহরদার দিকে।
জহরদা বলল, “তোকে এক লাখ দেব। তুই ভাই ম্যানেজ করে দে। প্লিজ। শালা, এমন সুযোগ আসবে না আমার। সেতুদা বললেই সব জট কেটে যাবে। তুই প্লিজ একটু দেখ আমায়।”
রাজুর মনের মধ্যে কেমন একটা করছে যেন। কোনও দিন এ সব করেনি। কিন্তু এখন ওর জীবনে এমন একটা পরিস্থিতি হয়ে গিয়েছে যে, সেখানে আর মুখ বুজে, লজ্জা লজ্জা ভাব করে থাকলে হবে না। ও খুব তাড়াতাড়ি উর্জার সঙ্গে চলে যাবে বাইরে। উর্জা ওকে টাকার কথা ভাবতে বারণ করেছে। কিন্তু তা বললে হয় নাকি? ওর নিজের কি মানসম্মান বলে কিছু নেই! কিছু টাকা পেলে ও একটা ভাগ দেবে উর্জাকে আর বেশিটাই দিয়ে যাবে মাকে। ওই দেশে গিয়ে একটু দাঁড়াতে তো বছর দুয়েক লাগবেই অন্তত। তত দিন মা আর ভাইকেও তো ওকেই দেখতে হবে।
“কী রে? এই রাজু? ভাও খাচ্ছিস?” জহরদা আলতো করে ওর হাতে ঠেলা দিল, “শালা, কিছু বল। বিজনেস বলে কথা। সময় থাকতে কামিয়ে নিতে হবে। বুড়ো বয়সের জন্য গুছিয়ে রাখতে হবে। না হলে ছেলে, ছেলের বৌ লাথ মেরে বের করে দেবে বাড়ি থেকে। দেখিসই তো চারিদিকে কী হয় আজকাল।”
রাজু সময় নিল একটু। তার পর ধীরেসুস্থে বলল, “অত বড় প্রোজেক্ট আটকে আছে। সেতুদাকে বলে তার জট ছাড়িয়ে দেব। আর সেখানে মাত্র এক লাখ! এটা কোনও কথা হল?”
“তা হলে?” রাজুর দিকে তাকাল জহরদা। চোখে সতর্কতা। মাপতে চাইছে রাজুকে।
রাজু একই রকম শান্ত গলায় বলল, “দশ লাখ।”
“ভাগ শালা! পাগল নাকি তুই?” জহরদা বিরক্তিতে ছিটকে উঠল, “আমার বাঞ্চোত হারামের পয়সা নাকি! দশ লাখ! মামার বাড়ির আবদার!”
রাজু বলল, “সে তুমি যাই ভাবো। এটা নন-নেগোশিয়েবল। আর হ্যাঁ, এখনই কিছু বলতে হবে না। তুমি একটা কাজ করো। ক’দিন ভাবো। তার পর বোলো। রাজি থাকলে পাঁচ আগে নেব। কাজ হলে বাকি পাঁচ। ঠিক আছে? আচ্ছা, আমি এখন আসি। সেতুদা ওয়েট করছে।”
রাজু আর দাঁড়াল না। পার্টি অফিসের দিকে এগিয়ে গেল। ও পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারল যে, জহরদা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। হয়তো বিড়বিড় করে গালাগালিও করছে। হয়তো ওকেও বলছে ‘আসল’!
করুক গালাগালি। এই পৃথিবীতে মানুষ পেছনে বাপকেও শালা বলে। সামনে কে কী করল সেটাই আসল। আর পয়সা রোজগার করতে গেলে অত নেকুপুশুমুনু হয়ে থাকলে চলবে না। সুপার সেন্সিটিভ জাপানি প্রোডাক্ট ইলেক্ট্রনিক্সেই ভাল, মানুষের মধ্যে নয়!
পার্টি অফিসে কয়েকজন বসে আছে। ভেতরটা বিড়ির গন্ধে নরক হয়ে আছে একদম! টিভিতে নিচু ভলিউমে একটা মিউজিক চ্যানেল চলছে। অক্ষয় কুমার মাথায় কালো ফেট্টি বেঁধে নেচে চলেছে এক নাগাড়ে।
রাজুর এমন বদ গন্ধ খুব খারাপ লাগে। কিন্তু কিছু করার নেই। বাইরে গিয়ে স্মোক করো বললেও কেউ শোনে না। নিয়ম না মানার মধ্যেই যেন আনন্দ। ও ভেতরে ঢুকতেই ওই জটলার মধ্য থেকে একজন বলল, “এই রাজু, তোকে খুঁজছেন দাদা। ভেতরে যা।”
রাজু মাথা নেড়ে সেতুর চেম্বারের দিকে এগোল। দরজা বন্ধ আছে। ও সময় নিল একটু। তার পর একবার নক করে ঢুকে গেল সোজা।
এ ঘরে এসি চলছে। বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে চারিদিক। সুন্দর রুম ফ্রেশনারের গন্ধ। বাইরের তুলনায় স্বর্গ যেন। মন আর শরীর তরতাজা হয়ে যায় নিমেষে। তার কিছু পর আবার আরামে কেমন যেন নেতিয়েও পড়ে।
রাজু দেখল, সেতুর সামনে একটা ম্যাগাজিন খোলা। আর দরজার আওয়াজ পেয়ে সেতু দরজার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। রাজু সামান্য হেসে মাথা ঝোঁকাল।
সেতুর চোয়াল নড়ছে। চুইংগাম। ওকে দেখে পাল্টা হাসল সেতু। হাত দিয়ে দেখাল সামনের চেয়ারটা। বলল, “শুনলাম মার খেয়েছিস? কী যে করিস! আরে যাওয়ার আগে ওই অঞ্চলে আমাদের লোকাল ছেলেদের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করে যাবি তো। আমি নেই বলে তুইও আর কাউকে কিছু বলবি না! এটা কোনও কথা হল!”
রাজু এই সব নিয়ে কথা বলতে চায় না। ওর সেই সময় বা ইচ্ছে কোনওটাই নেই। ও সরাসরি বলল, “আমার একটা কথা আছে সেতুদা।” “কী? জহর?” সেতু হাসল।
“না না। ওকে যা বলার আমি বলেছি। এখন দেখি কী বলে। তার পর তোমায় বলব ওর ব্যাপারে। আজ অন্য একটা কথা!”
সেতু ভুরু কুঁচকে তাকাল ওর দিকে, “অন্য কথা মানে? আগে আমার কথা শোন। তোকে একটা বড় দায়িত্ব দেব আমি। তাই ডেকেছি। খুব ইমপর্ট্যান্ট।”
রাজু চুপ করে তাকাল সেতুর দিকে।
সেতু নিজেকে গুছিয়ে নিল একটু। সামনে রাখা ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে পাশে সরিয়ে টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসল। তার পর বলল, “তোকে কয়েক মাসের জন্য নর্থ বেঙ্গল যেতে হবে। ভোট আসছে। এখন থেকেই লাগতে হবে কাজে। আর ওখানে কাজও আছে অনেক। তোকে ওখানকার ক্যাম্পেনটায় একটা বড় ভূমিকা নিতে হবে। পরশু বেরিয়ে যা। বুঝেছিস? ওখানে দীনেশ বলে একটা ছেলে আছে। ও তোকে ব্রিফ করে দেবে। তুই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাবি। মাসে তোকে আট হাজার করে দেব আমি। থাকা-খাওয়া ফ্রি। তোর কোনও অসুবিধে হবে না।”
রাজু মাথা নিচু করে বসে রইল।
“কী রে? কী হল তোর?” সেতু অবাক হয়ে তাকাল, “ব্যাপারটা কী?” রাজু ঠোঁট চাটল। তার পর বলল, “সেতুদা, আমি বলতে এসেছি যে, আমি আর পার্টিতে থাকব না। তোমায় না বলে তো আর মেম্বারশিপ ছাড়তে পারি না। তাই বলতে এলাম।”
“কী?” সেতু যেন আচমকা আকাশ থেকে পড়ল। তার পর ওর ভুরু কুঁচকে গেল, “পাগল নাকি? সামনের বছর ভোট। গ্রাউন্ড এখন থেকেই তৈরি করতে হবে। তুই আমার সবচেয়ে কাছের লোক। সৎ মানুষ তুই। সৎ আর কাজের মানুষ পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আর এখন এ ভাবে হুট করে ছাড়লে আমি নতুন ছেলেপুলে এইটুকু সময়ের মধ্যে তৈরি করব কী করে? কাজটা হবে কী করে? এ সব পাগলামো বাদ দে। পার্টিতে আমার প্রেস্টিজ আছে তো না কি!”
“আমায় ক্ষমা করে দাও সেতুদা। আমায় নিজের জীবনটাও এবার দেখতে হবে। আমি বাইরে চলে যাব। এ সব আমার ভাল লাগছে না। এত বয়স হয়ে গিয়েছে আমার। কিছুই তো হল না লাইফে। মায়ের শরীরটাও ঠিক নেই। তা সত্ত্বেও সেলাইয়ের কাজ করে। ভাইটা এখনও পড়ছে। আমারও তো দায়িত্ব আছে। আর কত দিন এ ভাবে চলবে বলো? আমার লাইফে কি কোনও দাম নেই!” রাজু তাকাল সেতুর দিকে।
সেতু বলল, “এই ব্যাপার! আগে বলবি তো! নিজে না বললে আমি কী করে জানব তোর অসুবিধের কথা? শোন, আমি তোকে এখানেই কোথাও ঢুকিয়ে দেব। কাজ করতে হবে না। মাসে মাসে মাইনে পেয়ে যাবি। পনেরো-কুড়ি মতো হলে চলবে তো? বাড়িতেও অসুবিধে থাকবে না। এ সব মাথা থেকে বাদ দে। মোদ্দা কথা, নর্থ বেঙ্গল যেতে হবে তোকে। মনে রাখিস।”
রাজু বলল, “সরি সেতুদা। আমি পারব না। আমি পার্টি ছেড়ে দেওয়ার অফিশিয়াল চিঠি পাঠিয়ে দেব তোমায়। আমি আসছি।”
রাজু আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পেছনে ঘুরল। আর সঙ্গে সঙ্গে সেতুর চিৎকার শুনল ও।
“শুয়োরের বাচ্চা! আমি না থাকলে তো ভুখা মরতিস! বাঞ্চোত এখন ঢ্যামনামো হচ্ছে! পার্টি ছাড়ব! আসল সময়ে লেজ গুটিয়ে পালাব! রাজু, ভুলে যাস না কিন্তু আমি কে? তোকে কী করতে পারি?”
রাজুর যে কী হল! মাথার ভেতর যেন রাগের বোমা ফাটল একটা। শুয়োরের বাচ্চা! সেতু ওকে শুয়োরের বাচ্চা বলল! আচমকা মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল ওর। মনে পড়ে গেল বাবার সেই ছোটবেলার আবছা হাসি। সেতু ওর মাকে বাবাকে গালি দিল। কোন সাহসে?
রাজু আস্তে আস্তে ঘুরল সেতুর দিকে। তার পর সোজা সেতুর চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি ভুলে যাইনি তুমি কে। মুড়াপোঁতার সেই রাতটা আমার আজও মনে আছে। জগন্নাথ ঘোষকে খুন করেছিলে তুমি। আর তার পর বাচ্চুকে। বাচ্চু বর্ধন। বাচ্চুকে তো একদম কোনও কারণ ছাড়াই, জাস্ট কোনও প্রমাণ রাখবে না বলে মেরেছিলে। জানি না সেই খুনের পিছনে আর কে কে ছিল। কিন্তু তুমি যে নিজের হাতে কাজটা করেছ, তার সাক্ষী তো আমি নিজে। খুনের কেস সেতুদা, তামাদি হয় না। এ সব বাইরের লোকে জানলে কী হবে জানো তো? আর অপোজ়িশন যদি জেনে যায়? আমি তোমায় ‘প্লিজ’ বলছি। তুমি আমার দাদার মতো। আমার জীবনে বাধা দিয়ো না। যারা মারা গিয়েছে তাদের শান্তিতে থাকতে দাও। আমায় যেন তাদের ঘুম থেকে জাগাতে না হয়!”
