১৪. জিনি
নিধি একটা নতুন স্কুটি কিনেছে! বেশ সুন্দর হলুদ রঙের স্কুটি। আজকাল সেটা নিয়েই ইউনিভার্সিটিতে আসে ও। আজও এসেছে। স্কুটির সঙ্গে ম্যাচ করে একটা হেলমেটও আছে। কিন্তু সেটা যেখানে-সেখানে ফেলে রাখে ও।
জিনিকে স্কুটিতে বসিয়ে একদিন ঘোরাতেও নিয়ে গিয়েছিল নিধি। কিন্তু সে যা অভিজ্ঞতা হয়েছে জিনির! তার পর থেকে আর রিস্ক নিচ্ছে না। মেয়েটা কোনও ট্র্যাফিক মানে না। লাল, সবুজ কোনও রং বোঝে না। যেখান দিয়ে ইউ টার্ন নেওয়ার নয়, সেখান দিয়ে ইউ টার্ন নেয়। যেখান দিয়ে ডান দিকে বেঁকতে বারণ করা হয়েছে, সেখান দিয়েই ও ডান দিকে বেঁকবে। নো পার্কিং-এ পার্ক করবে। পুলিশে ধরলে সরকারি নানা বড় অফিসারকে কাকু, দাদা বলে ফোন করে ব্যাপারটা সামলাবে। যে-মেয়ে সারা পৃথিবীর চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘোরে, সে কী করে এমন করতে পারে! জিনি অবাক হয়ে যায়।
নিধিকে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল জিনি। জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কী শুরু করেছিস বল তো! এ ভাবে কেউ গাড়ি চালায়!”
নিধি হেসে বলেছিল, “সবাই তো নিয়ম মানে মোটামুটি। তার মধ্যে আমি একা নিয়ম না মানলে কী হয়েছে। আমি আর আমার ওই ছোট্ট হলুদ স্কুটি কী এমন ক্ষতি করতে পারে বল!”
জিনি এর কী যে উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারেনি। ও মাথা নেড়ে বলেছিল, “আবার তুই সারা পৃথিবীর জন্য চিন্তা করিস! কী অদ্ভুত কন্ট্রাডিকশন!”
“সে তো বিনিদির জন্য,” নিধি কথাটা বলে হেসেছিল খুব, “জানিস জিনি, আমায় একজন দিদি পড়াত। বিনিদি। এইচএস-এ তো সায়েন্স ছিল আমার। তখন পড়াতে আসত। ফিজিক্স। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত। ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে। গরিব বাড়ির মেয়ে, কিন্তু স্টাইপেন্ড পেত। আমার ঠাকুমা খুব ভালবাসত বিনিদিকে। বলত জলপানি পাওয়া মেয়ে। আমার ঠাকুমা কিন্তু বাঙালি, জানিস তো! বলত জলপানি! স্কলারশিপকে কেন জলপানি বলে রে?”
“আঃ” বিরক্ত হয়েছিল জিনি, “একটা কথা স্বাভাবিক ভাবে বলে শেষ করতে পারিস না! তার পর, সেই বিনিদির কী হল?”
“কী আবার হবে! এখন হায়দরাবাদে আছে। শুনছি কয়েক মাসের মধ্যে সিলিকন ভ্যালিতে চলে যাবে। তা সেই বিনিদি একটা এনজিও-তে যুক্ত ছিল। দুঃস্থ মানুষের জন্য খুব করত দিদিটা। আমার দেখে এত ভাল লাগত! দিদিই আমার চোখ খুলে দিয়েছিল, জানিস! আমি যেটুকু যা করি তা দিদির থেকেই শেখা।”
জিনি জানে এটা পুরোটা সত্যি নয়। এ সব কারও মধ্যে থাকলে এমনিই থাকে। আর যার থাকে না, তার কোনও অবস্থাতেই থাকে না! এই যে জিনি, ওর কি ইচ্ছে করে না লোকের জন্য করতে? কিন্তু পারে না খুব একটা। কোথায় যেন আটকায়। ও দেখেছে মানুষকে সাহায্য করতে গেলেও সমাজের নানা স্তর থেকে নানা রকম বাধাবিপত্তি আসে। ধমক চমক আসে। কারও জন্য কিছু করলে, সেটাকে ব্যবহার করে মাইলেজ নেওয়ার জন্য ঝান্ডা কাঁধে নানা দল এসে উপস্থিত হয়।
অসহায় বৃদ্ধাকে স্টেশনে ছেড়ে রেখে চলে গিয়েছে তার সন্তান, এমন খবর করার জন্য ও ভি ভ্যান নিয়ে নানা সংবাদমাধ্যম আসে, কিন্তু কাজ হয়ে গেলে বৃদ্ধাকে অমন একা রেখে দিয়েই তারা ‘দারুণ নিউজ হয়েছে’ ভেবে অফিসে ফিরে যায়! এমন কত ঘটনা আছে। সবটাই যেন প্রোডাক্ট! সবাইকে যেন সব কিছু বিক্রি করতেই হবে! সে কর্পোরেটের টপ অফিশিয়াল থেকে পাড়ার বিস্তির ছোটদি বা সেজকা। সবাইকে, কোম্পানির প্রোডাক্ট থেকে শুরু করে নিজের রান্না করা পায়েস, পুজোয় কম্বল বিতরণ থেকে রাস্তার অবলা কুকুরকে বিস্কিট খাওয়ানো অবধি সব কিছুর যেন বিজ্ঞাপন করতেই হবে! বুকনি আর বাতেলা দিয়েই সবাই নিজেকে জাহির করতে ব্যস্ত। ক্যাশ বা কাইন্ড। যেখানে যা রেকগনিশন পাওয়া যায়, তাই তালু থেকে কনুই অবধি গড়িয়ে পড়া আমের রসের মতো জিভ দিয়ে চেটে খেয়ে নিতে হবে! এমন হ্যাংলামো চলছে চারিদিকে যে, ভাবা যায় না!
এর মধ্যে কাউকে সাহায্য করতেও জিনির কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকে। ওর মনে হয় লোকজন বোঝে না যে, কাউকে সাহায্য করে সেটা নিজেই ফলাও করে প্রচার করার মধ্যে মহত্ত্ব তো নেই-ই, উপরন্তু এর মতো অশিক্ষার প্রকাশ ও ছোটলোকপনা আর কোনও কিছুতে হয় না। মানুষের পাশে দাঁড়ানো তখনই মহৎ, যখন তা নিভৃতে হয়, সেটা নিয়ে প্রচার করা আর বিষ্ঠা ছড়ানো একই বস্তু।
“কী নায়িকা, একা একা বসে কি নায়কের কথা ভাবা হচ্ছে?” নিধি এসে বসল জিনির পাশে।
ক্লাসঘরটা প্রায় ফাঁকা। গ্যালারির মতো থাক থাক পাতা বেঞ্চ। সামনে কয়েকজন বসে আছে। আর পিছনের দিকে একা বসে নোট টুকছিল জিনি। আর টুকতে টুকতে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কী সব যে চিন্তা করছিল!
জিনি হেসে খাতা আর লাইব্রেরি থেকে আনা বইটা গুটিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। তার পর ওর পাশে রাখা নিধির হলুদ হেলমেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এটা ধর। যেখানে-সেখানে ফেলে রাখিস! আমি কি তোর জিনিস গুছিয়ে বেড়াব নাকি?”
নিধি হেলমেটটা নিয়ে পাশে রেখে বলল, “না হলে আর তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাম কেন!”
জিনি ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে মারল নিধির হাতে। তার পর বলল, “আমি একটু বেনেটোলার মুখে যাব। আনন্দ র বইয়ের দোকান থেকে আমায় টিনটিনের কমিকস কিনতে হবে।”
“কার জন্য? নায়কের জন্য?” নিধি ভুরু তুলে নাচাল।
“খালি বাজে কথা!” জিনি হাসল।
নিধি ভুরু তুলে ঘাড়টা একটু কাত করে বলল, “তোর কি খুব খারাপ লাগল? সত্যি করে বল তো!”
জিনি কিছু না বলে ঠোঁট কামড়াল।
এমনিতেই কবি খুব চুপচাপ ধরনের ছেলে। কিন্তু আজকাল আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছে যেন। কিছু দিন আগে দেখেছিল, অনেক রাত করে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে ফিরেছে। পরের দিন জেনেছিল বীরেন্দ্রর ওপর হামলা হয়েছে। বীরেন্দ্রর বডিগার্ড মারা গিয়েছে। কবিও তো সঙ্গে ছিল। ওর কিছু হয়নি এটাই অনেক। জিনির যে বুকের মধ্যে কেমন করেছিল সবটা জানার পর! কিন্তু কবির সঙ্গে এই নিয়ে কোনও কথাই বলা যায়নি। ছেলেটা কেমন যেন একদম গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। জিনি আড়াল থেকে লক্ষ করেছে, ওদের বাড়ির পিছনে যে-বাগানটা আছে, সেখানে এক রাতে একা-একা বসে কাঁদছিল ছেলেটা।
জিনি সামনে যায়নি। ওর মনে হয় কান্না খুব পার্সোনাল একটা ব্যাপার। সবার সামনে রাগারাগি, হাসাহাসি, ইয়ার্কি করা গেলেও কাঁদা যায় না। মানুষ যদি কারও সামনে কাঁদে, তা হলে বুঝতে হবে সেই মানুষটাকে সে নিজের জীবনে বিশেষ একটা জায়গা দিয়েছে।
কবির জীবনে সেই জায়গা নেই জিনির। তাই ও সামনে যায়নি। শুধু মনে হয়েছিল কী হয়েছে কবির যে, এমন করে কাঁদছে একা একা! পরের দিন লালুকে ধরেছিল জিনি।
লালু ছেলেটা অদ্ভুত। সারা দিন বীরেন্দ্রর স্ত্রীর নানা কাজকর্ম করে দেয়। তার পর সন্ধের পর থেকে একদম একা থাকে। ছেলেটাকে এই জন্য ভাল লাগে জিনির যে, প্রথম থেকেই ওকে বোনের মতো দেখে। খুব বেশি না হলেও কিছুটা জীবন তো দেখেছে জিনি। দেখেছে অধিকাংশ ছেলেই একটু কথা বলার পরেই কেমন যেন গায়ে পড়তে চায়। পার্সোনাল হতে চায়। কেউ কেউ তো সরাসরি ‘হুক আপ’ করতে চায়! কী করে তারা এমন অসভ্যের মতো ব্যবহার করে জানে না জিনি, কিন্তু দেখেছে, করে।
সেখানে লালু একদম ওরকম নয়।
লালুকে জিনি জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে গো তোমার বন্ধুর? এমন একাচোরা হয়ে আছে কেন? সে দিন দেখলাম কান্নাকাটি করছে!”
লালু তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর বলেছিল, “আসলে একটা মেয়েকে প্রোপোজ করেছিল। সে ‘না’ করে দিয়েছে। তাই কান্নাকাটি করছে আর কী।”
পঁচিশটা লাল পিঁপড়ে যেন একসঙ্গে বুকের মধ্যে কামড়েছিল জিনিকে! প্রোপোজ়! কবি! যে কথাই বলে না কারও সঙ্গে! সারাক্ষণ ভুরু কুঁচকে থাকে, সে কি না প্রোপোজ করেছে? সত্যি?
তার পরেই মাথায় আগুন লেগে গিয়েছিল। অবশ্য এরকম করতেই পারে– ওর মনে হয়েছিল! এমন চুপ করে থাকে যারা তারাই মিটমিটের ডান হয়। সবার সামনে গুরু দত্তের মতো মুখ করে থাকে, পিছনে দ্যাখো, কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে! বীরেন্দ্র নিজে লোক ভাল নয়। তার সঙ্গে যে থাকে সেও কি সাধুপুরুষ হবে নাকি!
এই যে বীরেন্দ্রকে গুলি করার চেষ্টা করা হয়েছিল, এ সব কি ভাল লোকেদের সঙ্গে হয়! আর এমন একটা লোকের সঙ্গে সারাক্ষণ লেজুড় হয়ে ঘোরে কবি। আরে, বাজে লোকেদের সঙ্গে থাকলে মানুষের উন্নতি হয় নাকি! সঙ্গদোষ বলেও তো একটা কথা আছে।
কিন্তু তার পরেই মনে হয়েছিল, লালু কি সত্যি বলল? কাকে প্রোপোজ় করেছে কবি? রোগা, ফর্সা, গালে হালকা দাড়ির আড়ালে লম্বা দুটো টোল। চোখের সামনে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল জিনি। মাথার আগুন ছাপিয়েও এবার বুকের মধ্যে প্রাণপণে বিষ ঢালছিল পিঁপড়েরা। জিনি বুঝতে পারছিল, ক্রমে এই পিঁপড়ের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে ওর জীবনে।
নিজেকে সামলাতেই জিনি চোয়াল শক্ত করে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। ওকে দেখে হিহি করে হেসে উঠেছিল লালু। যেন খুব মজা পেয়েছে। লালুর সামনের ভাঙা দাঁতটা বেরিয়ে পড়েছিল হাসির সময়ে।
লালু কোনও মতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিল, “হল তো! পুরো ধসে গেলি! আরে, আমি ইয়ার্কি করছি। ও করবে প্রোপোজ! তুই পাগল হলি! দেখিস না ও কেমন নিজের মধ্যে থাকে! কারও সঙ্গেই কোনও কথা বলে না। রাতে খেতে গিয়েও খাবার চায় না। যা দেয় চুপচাপ খেয়ে নেয়।”
“তা হলে কাল রাতে কাঁদছিল কেন?” জিনি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল। লালু বলেছিল, “তা জানি না। তবে ভালই করছিল, জানিস!” “কিসের ভাল?” জিনি বুঝতে পারেনি লালু কী বলতে চাইছে।
লালু বলেছিল, “আমার বড়দাদু বলত, মন হল ঝাঁঝরির মতো। সাদাকালো, ভাল-খারাপ, ইচ্ছে-অনিচ্ছে, মান-অপমান— কত কী আসে আমাদের মনে। কিন্তু খারাপগুলো ভেতরে আটকে রেখে আপাত ভাবে সঠিক আর ন্যায্য জিনিসটাই আমাদের প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু যা প্রকাশ করা গেল না? মনের ঝাঁঝরিতে সেই ইচ্ছেগুলো, সেই না-পাওয়াগুলো, মনখারাপগুলো, অপমানগুলো, অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলো সব বাজে কাগজ, চুলের গোল্লা, ফলের চোকলা ইত্যাদি নানা ময়লার মতো জমে থাকল যে! একা একা কান্না হল সেই ঝাঁঝরি খুলে চোখের জলে সেই সব ময়লা পরিষ্কার করে নেওয়া। দেখবি, কান্নার পরে কেমন ক্লান্ত লাগে। ময়লা পরিষ্কারের পরিশ্রম কম। তার পর দেখবি, আস্তে আস্তে কোথায় যেন একটু ভাল বোধ হয়। পজিটিভ বোধ হয়। ময়লা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাওয়া মনের ভেতরটা চকচক করে।”
জিনি তাকিয়েছিল লালুর দিকে। মানুষের মধ্যে কত কী যে থাকে! লালুকে দেখলে কে বলবে যে, ও এমন করে ভাবতে পারে। এমন করে কথা বলতে পারে।
লালু বলেছিল, “তাই কেউ একা, নির্জনে গিয়ে কাঁদলে তাকে জিজ্ঞেস করতে নেই কেন কাঁদছে। আসলে সাফাইয়ের কাজ চলছে তো! তাকে শান্তিতে সেই কাজ করতে দিতে হয়।”
জিনির আর জানা হয়নি কী হয়েছে কবির। শুধু লক্ষ করেছে, ওই ঘটনাটার পরে আজকাল যেন আরও চুপ করে গিয়েছে ছেলেটা। আরও একা, আরও গম্ভীর! এই বয়সে আর কাউকে এমন দেখেনি জিনি।
আর যে এমন করে একা থাকে তাকে নিজে থেকে কতটাই-বা বলা যায়! জিনি বোঝে না ওর কী করা উচিত। এরকম চুপ করে থাকা উচিত, নাকি এগিয়ে গিয়ে কবির ওই পাঁচিলটা নিজের হাতে ভেঙে দেওয়া উচিত।
ক্লাস থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে হাঁটা দিল জিনি। নিধি বলল, “বল না কার জন্য কিনবি ছোটদের বই?”
জিনি হাসল, “টিনটিন ছোটদের বই কে বলল? টিনটিন হল সুকুমার রায়ের বইয়ের মতো। ছোট-বড় সবার!” “তাই? কী সব বলিস।”
গলাটা পেয়ে জিনি চমকে গেল একটু। দেখল, নীচে নামার সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে বিধান।
নিধি ভুরু কুঁচকে বিধানের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর কি সিঁড়িতেই ডিউটি? নাকি জিনিকে স্টক করছিস? মানে, তোর দাবিটা কী? আমরা যখনই কথা বলি, মাটি ফুঁড়ে ঠিক এখানেই উদয় হোস কী করে? হ্যাংলা না স্পাই, কী তুই?”
বিধান পাত্তা দিল না নিধিকে। জিনির দিকে তাকিয়ে বলল, “টিনটিনও ফ্যান্টমের মতো হোয়াইট মেগালোম্যানিয়ার প্রোপাগান্ডা! অ্যার্জে মানে, জর্জ রেমির জানিস তো নাৎসি লিঙ্ক পাওয়া গিয়েছে। নাৎসিরা যখন বেলজিয়াম অকুপাই করেছিল, সেখানকার সব ইলাস্ট্রেটর আর আর্টিস্টরা কিন্তু তাদের হয়ে কাজ করেনি। কিন্তু রেমি করেছিলেন। নাৎসিদের সঙ্গে লিঙ্ক ছিল এমন নিউজ পেপারে নিজের কার্টুন ছাপিয়েছিলেন।”
জিনি বিরক্ত হল এবার। বলল, “তার আগে কিন্তু জাপানিজ ইমপেরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে ও ইউরোপে নাৎসি এক্সপ্যানশনের বিরুদ্ধেও উনি লিখেছেন। নাৎসিরা বেলজিয়াম অকুপাই করার পর সেখানকার কী দশা হয়েছিল কেউ জানে? পরে উনি এ সব থেকে সরে এসেছিলেন। আর নিজের গল্পের কয়েকটি চরিত্রকে মডিফাইও করেছিলেন। রিগ্রেটও করেছেন। খুব সামান্য কিছু কাজই করেছিলেন ওই সময়ে। গোটা ছবিটা দেখ। পারশিয়াল নয়, বুঝেছিস! পারশিয়াল ইনফরমেশন নিয়ে সেটাকে নিজের ইচ্ছে মতো মোল্ড করে ফেক নিউজ় তৈরি করাটা বন্ধ কর।” বিধান গোঁ ধরা গলায় বলল, “সামান্য হলেও করেছিলেন তো! সেটাই-বা কেন!”
“আরে মোলো যা! কবে কী হয়েছে, তুই এখানে হাঁপিয়ে মরছিস কেন? আর মানুষ বলেই সে ভুল করে। পরে আবার সে শুধরেও নেয়। তোদের এই হার্ড লাইনড পলিটিক্সের নেতারা ভুল করে না? তাদের পায়ে পড়ে থাকিস কেন? রেমি না হয় কয়েকটা কমিকস ছাপিয়েছেন? আর সেই সময় ইউরোপের বড় বড় নেতা, হিটলারের সঙ্গে সন্ধি করেনি? পোলান্ড ভাগ করে নেয়নি? পরে আবার যুদ্ধও করেছে। আশি-নব্বই বছর পরের পৃথিবীতে বসে এ সব বলা যায়। সবাই জানে নাৎসিরা অমানুষ। কেউ তাদের সমর্থন করছে না। রেমিও করেননি। টিনটিন একটা আর্ট, বুঝেছিস? প্রো ক্যাপিটালিজম, নিও কলোনিয়ালিজম এ সব বলে লাভ নেই। যে-কোনও গ্রেট আর্ট ফর্ম সেই সময়ের সোসাইটি, মেন্টালিটি, পলিটিক্স ইত্যাদিকে রিফ্লেক্ট করে। আর তোদের মতো কিছু আমোদগেঁড়ে সারা জীবন যা পপুলার আর যার মাস কানেকশন আছে, তাদের খিস্তি করে নিজেদের অক্ষমতা থেকে উদ্ভূত কমপ্লেক্স মেটাস। এ দিকে শেক্সপিয়র পপুলার হলে কিন্তু তোদের অসুবিধে নেই। ডাবল স্ট্যান্ডার্ড সোয়াইন!” নিধি রীতিমতো ফুঁসছে।
বিধান বাঁকা হেসে মাথা নাড়ল, “শেক্সপিয়র আর টিনটিন! তুলনা হল?”
“কেন নয়?” নিধি কোমরে হাত দিয়ে এগিয়ে গেল। জিনি দেখল ঝগড়া দেখতে চারিদিকে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গিয়েছে। নিধি বলল, “কেন নয় বল! যে যার ফিল্ডে বেস্ট। ক্লাসিক। অসাধারণ। দুটো আলাদা আর্ট ফর্ম। আলাদা এক্সপ্রেশন। আমার ‘ম্যাকবেথ’ পড়ে যেমন ভাল লাগে তেমন ‘কিং অটোকার্স সেপটার’ পড়েও লাগে। আবার ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ়’ দেখে যেমন ভাল লাগে, তেমন। খেলা দেখেও ভাল লাগে। এ সব কিছু মানুষের ভাল লাগার জন্য। সব ব্যাপারে পণ্ডিতি না করলেই নয়, না! জানিস তো এই যে বাজে সমালোচনা করে তুই প্রমাণ করতে চাইছিস যে, অনেক জানিস, তুই বিজ্ঞের বাটখারা, আসলে কিন্তু এটাই প্রমাণ করছিস যে, তুই একটা অর্ধশিক্ষিত। যেটা অশিক্ষিতের চেয়েও খারাপ। কারণ, যার মন খোলা নয়, যে একবগ্গা একটা ধারণা ধরে থাকে, যে কিছুতেই অন্যের যুক্তি বুঝতে চায় না, সে আসলে নিজে মনে মনে একজন নাৎসি। শুধু বুলেট নয়, জানবি আইডিয়া অলসো কিলস। আর তোদের মতো হাফ উইটেড, সব ভাল জিনিসের খুঁত ধরে অন্যকে ছোট করে নিজে বড় হতে চাওয়া গান্ডুগুলো আসলে আ কাইন্ড অফ নাৎসি। কিন্তু মজা হল, সেটা তোরা নিজেরাও বুঝিস না। মানে এতটাই বোধবুদ্ধিহীন তোরা। টিনটিনকে খিস্তি না করে নিজে বড় কিছু করার চেষ্টা কর। অন্যকে ছোট করে দেখার চেষ্টার মধ্যে দিয়ে নিজের কুচুটেপনা আর অক্ষমতাই দেখাচ্ছিস। তার তো কোনও লোমও ছেঁড়া যাচ্ছে না। আসলে ক্রিয়েটিভলি তুই যে একটা বিগ জিরো, সেটাই প্রমাণ করছিস এ সব বলে। ওয়েক আপ ফাকার! দেয়ার ইজ্ স্টিল টাইম। ওয়াক আওয়ে ফ্রম ইওর সিটি লাইফ।”
বিধান আর কিছু না বলে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জিনি অবাক হয়ে দেখল, নিধি রীতিমতো ফুঁসছে। মুখ-চোখ লাল। কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। জিনি ওকে আর কিছু বলতে না দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে নীচে নিয়ে গেল।
বিধানও পিছন পিছন এল সিঁড়ি বেয়ে। বলল, “এই নিধি, আমি এমনি ক্যাজুয়ালি বলছিলাম। এত রেগে গেলি কেন? কী হয়েছে তোর? এই নিধি…
নিধি ঘুরে তাকাল বিধানের দিকে। তার পর কঠিন গলায় বলল, “তুই বুঝলে মানুষ হয়ে যেতিস। সারাক্ষণ ঘুরঘুর… সারাক্ষণ জিনির পিছনে…”
আনন্দ-র দোকান থেকে দুটো টিনটিনের বই কিনে আর দাঁড়াল না জিনি। বাস ধরে নিল। নিধিও বিশেষ কিছু বলল না আর।
ওই ঝগড়ার পরে নিধিও কেমন চুপ করে গিয়েছে। দরকারের চেয়ে বেশি রেগে গিয়েছিল যে, সেটা কি নিজেও বুঝতে পেরেছে!
কে জানে বাবা! জিনি আর জিজ্ঞেস করেনি। নিধির কী যে হয় মাঝে মাঝে। বিশেষ করে বিধানকে দেখলেই আজকাল কেমন যেন রেগে যায়।
বিধান ছেলেটা খারাপ নয়। কিন্তু সব বিষয়েই বেশি জানে দেখাতে যায়। একটা শ্যালো পণ্ডিতি আছে। অনার্সে একসঙ্গে পড়ত কিছু পাশের পেপার। একবার জিনিকে প্রোপোজও করেছিল। জিনি ‘না’ করে দিয়েছিল। তার পর আর কোনও দিন সে সব নিয়ে কিছু বলেনি। কিন্তু জিনি বোঝে যে, তার কাছাকাছি কেন ঘোরাঘুরি করে ছেলেটা।
বাসে ভিড় নেই। বেলা সাড়ে তিনটে বাজে। এখনও অফিসের সেই ভিড়টা শুরু হয়নি। তবে রাস্তায় ভিড় আছে। জানলার ধারে জায়গা পেয়ে গিয়েছে জিনি। গাড়ি-বাস ছুটছে হু হু করে। মানুষ ছুটছে তার চেয়েও বেশি জোরে। বড় বড় বাড়ির ছায়া, শুকোনো কাপড়ের মতো পড়ে আছে রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা। কেমন যেন মনমরা তাদের রং! এত ব্যস্ততাতেও যেন কোনও হেলদোল নেই। ওর আবার কবির কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল রাতের বেলা ছোট্ট বেঞ্চে বসে একলা একটা ছেলে ফুলে ফুলে কাঁদছে!
জীবনের রহস্য নিয়ে মাঝে মাঝে খুব অবাক হয় জিনি। এত অসংখ্য মানুষ এই পৃথিবীতে, কিন্তু তাদের মধ্যে কেন একজনের জন্যই এমন মনখারাপ করে অন্যজনের! কেন মাত্র একজনকে দেখলেই বুকের মধ্যে ঢেউ ভাঙে! ধুলোয় ডানা ঝাপটায় চড়াই! কেন মনে হয় তাকে না পেলে এই বেঁচে থাকা অনর্থক! নিজের অস্তিত্বকেও কেন এমন শূন্য লাগে তাকে ছাড়া! জিনি জানে না কিছু। বোঝেও না। শুধু অদ্ভুত ছমছমে একটা কষ্ট আর আনন্দ লুকোচুরি খেলে মনে। যেন পাহাড়ের ওপর খেলে যাওয়া রোদছায়ার ছবি। এক মুহূর্তে নিজেকে মনে হয় দীনেরও দীন। আবার পরমুহূর্তেই মনে হয় নিজের মতো রাজা-বাদশা আর কেউ নেই ইহজগতে।
“দিদি, টিকিট,” কন্ডাক্টর এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।
টিকিট কেটে ছোট্ট আয়তাকার কাগজের স্ক্রিপ্টটা হাতঘড়ির ব্যান্ডে গুঁজে রাখল জিনি। তার পর লাল কাপড়ের ব্যাগের মধ্য থেকে বের করল বই দুটো। ঝকঝকে ছাপা। কী সুন্দর!
জিনি ভাবল মা পেলে খুব খুশি হবে। আগামিকাল মা-বাবার পঁচিশতম বিবাহবার্ষিকী। কত দিন মানুষ একসঙ্গে থাকে, তাই না! কী ভাবে থাকে? জিনি জানে, বাবা-মায়ের কোর্ট ম্যারেজ হয়েছিল। বাড়িতে কেউ মেনে নেয়নি বিয়েটা। পরে ভাড়াবাড়িতে এসে বাবার বন্ধুরা নাকি দু’জনের হাতে হাতে রেখে সঞ্চয়িতা খুলে পাঠ করে বিয়ে দিয়েছিল।
মা, জিনিকে বলেছিল, “বিয়ের বৈদিক মন্ত্রও তো আসলে কবিতাই। তাই আমরা আমাদের পছন্দের কবিতা পাঠ করে বিয়ে করেছিলাম। দু’জন মানুষ একসঙ্গে থাকতে চায় সারা জীবন। এতে কারও তো কিছু বলার থাকতে পারে না।”
বাবাকে দেখলে এখন বিশ্বাসই হয় না জিনির যে, এই লোকটা ওরকম ছিল।
এখন বাবা কেমন যেন ভিতু আর খিটখিটে হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ কপালে ভাঁজ। মনখারাপ। মুখে কেমন যেন অন্ধকারের ছাপ। এই বাড়িতে বাজার সরকারের কাজ করতে যে বাবার ভাল লাগে না, সেটা বোঝে জিনি। কিন্তু জুট মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে বাবা যে আর কোনও চাকরি পায়নি! বীরেন্দ্র ত্রিবেদী সেই জুট মিলের পার্টনার ছিল। সে জানত বাবা খুব সৎ, তাই বাবাকে এখানে নিয়ে এসে থাকতে দিয়েছে, কাজ দিয়েছে। না হলে বাবাকে কোনও ছোটখাটো কাপড়ের দোকানে বা মুদিখানায় কাজ করে জীবন কাটাতে হত হয়তো। বাবার জন্য এত কষ্ট হয় জিনির। বাবাকে দেখলে ও স্পষ্ট বোঝে, বাবা মনে মনে হেরে গিয়েছে। এ ভাবে সারা জীবন থাকা যে কী কষ্টের! তাই ও জানে, যা করার ওকেই করতে হবে। বাবামায়ের যে ও ছাড়া আর কেউ নেই।
বাস থেকে নেমে হেঁটে বাড়িটা একটুখানি। দুপুরের দিকটা বাড়িটা একদম শান্ত থাকে। গেটের দারোয়ানরাও কেমন যেন ঝিমোয়। শুধু হাওয়ায় গাছপালা নড়ার একটা খসখসে শব্দ ভেসে বেড়ায় চারিদিকে। রোদ সরে যায় ওই বড় অশোক গাছ থেকে দূরের শিরীষ গাছের ডাল অবধি। কত রঙের যে প্রজাপতি ওড়ে! পাখিরা এসে মাটি থেকে কী যে খুঁটে খায় কে জানে। জিনি শুধু জানে আনমনা একটা দুপুর, বসন্তের রোদে যেন সোনালি চুল মেলে এসে বসে এই বাড়ির বড় বাগানে।
জিনি ঘরে ঢুকে দেখল, বাবা ফুলপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বিছানায় একটা খবরের কাগজ পেতে পড়ছে।
জিনি বুঝল বাবা এই মাত্র এসেছে। সারা দিন বাড়ির নানা কাজ লেগেই থাকে। সব বাবাকে দেখতে হয়। কোনও কিছু খারাপ হলে তা ঠিকঠাক করার লোক দিয়ে মেরামত করাতে হয়। এত বড় প্রপার্টি। মেন্টেনেন্সই তো বিশাল। বাবা সারা দিন খাবার সময়ও পায় না।
জিনি ঠিক করল মাকে এখন বই দুটো দেখাবে না। কাল দেবে একেবারে।
জিনি “মা মা” বলে ডাকল।
মা পাশের ছোট্ট রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।
ওদের দুটো ঘর, একটা রান্নাঘর আর এক ফালি বারান্দা আছে। বারান্দার একপাশে বাথরুম।
মা বলল, “আর জ্বর আসেনি তো? জোর করে তো ইউনিভার্সিটি গেলি!”
“না মা, আসেনি,” জিনি হাসল, “জ্বর হয়েছিল। সেরে গিয়েছে। ব্যস। আর কিছু নয়। খালি টেনশন করো কেন তুমি?”
মা কিছু বলতে গেল, কিন্তু পারল না। হঠাৎ বাইরে বীরেন্দ্রর গলা শোনা গেল। বাবার নাম ধরে ডাকছে লোকটা। ডাকের মধ্যে কেমন একটা রাগ যেন।
জিনি দেখল, বাবা কোনও মতে জামাটা গায়ে গলিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। জিনিও গিয়ে দাঁড়াল দরজার কাছে। আর সঙ্গে সঙ্গে ধক করে উঠল ওর বুকটা। কবি দাঁড়িয়ে রয়েছে বীরেন্দ্রর পিছনে!
বীরেন্দ্র বাবার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “আমার বড় গাড়িটা এখনও ঠিক হয়নি কেন? তোমায় বলেছিলাম না ঠিক করিয়ে রাখতে? কেন হয়নি?”
বাবা কেঁপে উঠল। কোনও মতে বলল, “স্যর, নিয়ে গিয়েছিলাম। ওদের গ্যারাজ বন্ধ ছিল। কাল বলেছে, ওরা এখানেই লোক পাঠিয়ে করিয়ে দেবে।”
“কাল, সব কাল? আজ তা হলে কী করবে? কী করবে তুমি? কলকাতায় একটাই গ্যারাজ আছে? আর নেই!” বীরেন্দ্র দু’পা এগিয়ে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল।
বাবা আরও ঘাবড়ে গেল। বলল, “আজ তো হবে না স্যর!” “হবে না? তা হলে তুই আছিস কেন? কেন আছিস?” বীরেন্দ্র আচমকা সর্বশক্তি দিয়ে বাবার গালে একটা থাপ্পড় মারল।
জিনি দেখল বাবা টলে গিয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
বীরেন্দ্র ঝুঁকে পড়ে বাবার সামনে হিসহিসে গলায় বলল, “কাল ঠিক না হলে তোকে লাথি মেরে বের করে দেব! স্টাডির এসি ঠিক নেই। সুইমিং পুলের ফিল্টারের ব্যাকওয়াশ হচ্ছে না! পুলে পাতা পড়ে থাকছে! টাকা গাছে ফলে? গাড়ি যেন কালকের মধ্যে ঠিক হয়। হারামজাদা কোথাকার!”
বীরেন্দ্র আর কথা না বাড়িয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল নিজের বাড়ির দিকে। জিনি থরথর করে কাঁপছে ভয়ে। তা-ও এগিয়ে গিয়ে ও বাবাকে ধরতে গেল। কিন্তু তার আগেই কবি এসে ধরল বাবাকে। জিনি দেখল বাবার চোখে জল। মাথা নিচু। সন্তানের সামনে হেনস্থার চেয়ে কষ্ট আর অপমান কী হতে পারে একটি মানুষের!
জিনিও এবার ধরল বাবাকে। ওর চোখেও জল চলে এল। চোখের পাতা উপছে সেই জল ক্ষীণ ধারায় নেমে এল গালে। জিনি মোছার চেষ্টা করল না।
কবি তাকাল ওর দিকে। তার পর নরম গলায় ফিসফিস করে বলল, “কাঁদে না। মেয়েরা তো সবচেয়ে সাহসী হয়। জানো না, সাহসীদের কাঁদতে নেই!”
