১৬. লালু
এইটকু সময়ের জন্য এতটা দূর যাওয়ার কোনও মানে হল না। এই ভিড়ের মধ্যে ট্রেনে গুঁতোগুঁতি করে এতটা পথ না গেলেও পারত লালু। কিন্তু কী করবে! কেউ ফোন না ধরলে তো যেতেই হবে। পরিচিত লোকজন যদি অপরিচিতের মতো ব্যবহার করে, তা হলে খুব মুশকিল।
মাথা নামিয়ে স্টেশনের নাম দেখল লালু। আগরপাড়া। আর দুটো স্টেশন। দমদমে নেমে মেট্রো ধরে নেবে। বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। গোটা দিন ছুটি নিয়ে কোথাও গিয়ে তাড়াতাড়ি না ফিরলে ম্যাডাম খুব রেগে যান।
ম্যাডাম আজ ছুটি দিতে চাইছিলেন না। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোর কিসের এত ছুটি লাগে? রবিবার তো ছুটি পাস। সে দিন কাজটা করলে হয় না?”
লালু বলেছিল, “আসলে দাদারা তো ওখানে একটা রাইস মিলে কাজ করে, সেখানে রবিবার ছুটি থাকে না। বিষ্যুদবার করে থাকে। তাই যদি ম্যাডাম একদিন ছুটি পাওয়া যেত!”
ম্যাডাম বলেছিল, “ঠিক আছে। কী আর বলি! রোজ রোজ এমন করে ছুটি চাইলে খুব সমস্যা!
লালু কিছু বলেনি। শুধু মনে মনে খুব খারাপ একটা গালি দিয়েছিল। রাগ হচ্ছিল ওর। বলে কিনা রোজ রোজ ছুটি চায়! শেষ ছুটি নিয়েছিল দু’বছর আগে। তার পর থেকে একদিনও ছুটি নেয়নি। এমনকি, একশো দুই জ্বর নিয়েও কাজ করে গিয়েছে! সেখানে এ সব কথা বলছে! এরা আদৌ মানুষ কি না, মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় লালুর।
ম্যাডাম বলেছিল, “শুক্রবার কাজে লেট করবি না কিন্তু। আর পাখির কাছে যাবি ওই দিন, মনে থাকে যেন!”
লালু মাথা নেড়ে চলে এসেছিল। যাক, একটা দিন অন্তত ছুটি পাওয়া গেল। ভেবেছিল, কাল খুব ভোর ভোর বেরিয়ে যাবে। শিয়ালদা থেকে শান্তিপুর লাইনের ট্রেন ধরতে হবে। কত দিন পরে মুড়াপোঁতায় যাবে ও!
শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে মুড়াপোঁতায় পৌঁছে গিয়েছিল সকাল দশটার মধ্যে। আসলে মুড়াপোতায় কোনও স্টেশন নেই। কাছের স্টেশন দশ কিলোমিটার দূরে। ট্রেন থেকে নেমে ডিজেল অটো বা মোটর ভ্যান ধরতে
সে সব করে যখন বাড়িতে পৌঁছেছিল, বেলা বেড়ে গিয়েছিল বেশ। বাড়িটা কেমন যেন শুনশান! বাবার মামার বাড়ি এটা। আগে সবাই একান্নবর্তী ছিল। কিন্তু এখন নানা ভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছে। পাঁচিল উঠেছে। ওরা যেদিকটায় থাকত, সেদিকে সেজো গোয়ালঘর করে নিয়েছে!
এই বাড়িতেই জীবনের বেশিটা কেটেছে ওর। কিন্তু আজ কেমন যেন অচেনা লাগছিল সব। মনে হচ্ছিল ও এখানে বাড়তি। তাও কত কী যে মনে পড়ছিল ওর! ওই পেয়ারা গাছে উঠে পেয়ারা পাড়ত। দূরে দত্তদের পুকুরে গরমকালের দুপুরে কতক্ষণ ধরে দাপাত। নীলকুঠির মাঠে ধান কাটার পরে এক কোণে মাটি চেঁছে পিচ তৈরি করে ক্রিকেট খেলত। দূরে ফিল্ডিং করতে সমস্যা ছিল বলে ও হত উইকেট কিপার। একবার ওখানেই তো কিপিং করতে গিয়ে ব্যাটসম্যানের ঘোরানো ব্যাটের কোনা লেগে সামনের দাঁতের কিছুটা ভেঙে গিয়েছিল।
এখানে গ্রামে কত স্মৃতি! কিন্তু তাও লালুর মনে হচ্ছিল এ সব যেন ওর নিজের স্মৃতি নয়। এ সব যেন কারও কাছ থেকে শোনা গল্প!
বাবার চার মামার দু’জনের ছেলে আছে। বাকিদের মেয়ে। তাদের একজন আবার এখানে জামাই নিয়ে থাকে।
সেই পিসির সঙ্গেই দেখা হয়েছিল লালুর।
পিসি গোমড়া মুখ করে বলেছিল, “অ তুই! তা হঠাৎ। লালু, পিসির মুখ দেখে বুঝেছিল, ওকে দেখে পিসি মোটেই খুশি হয়নি।
আসলে ভাইবোনরা মারা যাওয়ার ফলে মা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল।
আর বাবাও তো বেশি দিন বাঁচল না। তার পর থেকেই লালু সবার গলগ্রহ! তা সেই গলগ্রহ যদি কথা নেই বার্তা নেই এসে হাজির হয়, তা হলে কে খুশি হবে!
লালু জিজ্ঞেস করেছিল, “বড়দা নেই?”
পিসি বিরক্তি বজায় রেখে বলেছিল, “মালিকের বাড়ি গিয়েছে। মাগনা খাটতে।”
বড়দা মানে বড় দাদুর নাতি। হারু ঘোষের রাইস মিলে কাজ করে। এই বড়দা লোকটাই যা ভাল এখনকার সকলের মধ্যে। মেজদা খিটখিটে লোক। লালুকে সহ্য করতে পারে না। লালু দেখেছে দাদুরা সবাই খুব ভাল ছিল। কিন্তু পরের জেনারেশনের সকলে খুবই স্বার্থপর আর অশান্তি-প্রিয় হয়েছে।
পিসি বলেছিল, “তা, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আমার এখানে দুপুরে খাওয়া হবে না কিন্তু। আমার রান্না হয়ে গিয়েছে। অন্য বাড়িতে দেখ বাপু।”
লালুর তখনই খিদে পেয়ে গিয়েছিল খুব। আসলে সকালে স্টেশনে একটা কেক আর এক কাপ চা খেয়েছিল মাত্র। কিন্তু পিসির মুখ আর কথা শুনে এই নিয়ে কথা বাড়ায়নি। বরং বলেছিল, “না না, আমি স্টেশনে কচুরি খেয়ে এসেছি পেট ভরে। তুমি ভেবো না।”
“ভাবতে বয়ে গিয়েছে আমার!” পিসি মুখ বেঁকিয়েছিল, “লম্পট বাপ আর পাগলি মাগির বিয়ানো ছাগলের জন্য ভাবতে যাব আমি!”
কথাগুলো একদম থাপ্পড়ের মতো এসে লেগেছিল লালুর গালে, বুকে। কেন খামোকা পিসি ওকে গালি দিচ্ছে এ ভাবে!
লালু জানে কথায় কথা বাড়ে। আর এখানে এ সব করতে আসেনি ও। লালু আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। দাদুরা আর জীবিত নেই। তাই আর কারও সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছেও ছিল না ওর।
রাস্তায় ঘন রোদ। ভাঙাচোরা পথের পাশে ধুলো জমা খিটখিটে গাছ। ও আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। রংচটা বেড কভার দিয়ে যেন কেউ ঢেকে দিয়েছে সবটা। গরমে সারা শরীর জ্বালা করছে!
স্টেশন থেকে আসার আগে ফিরতি ট্রেন ক’টায়, দেখে এসেছে লালু। ও ঠিক করেছিল, বড়দার সঙ্গে দেখা করে সেখান থেকেই সরাসরি স্টেশনে চলে যাবে।
ওদের বাড়ি থেকে হারু ঘোষের বাড়ি কিছুটা দূরে। একে খিদে পেয়েছিল খুব, তার পর এই রোদে অতটা দূর হাঁটা ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বাড়ি থেকে সামান্য হেঁটে গেলেই বড়রাস্তা। সেখান দিয়ে টোটো, ডিজেল অটো, বাস, সব চলে। কিন্তু কোনওটাই সরাসরি হারু ঘোষের বাড়ি অবধি যায় না।
ও দেখেছিল, একটা মোটর লাগানো ভ্যান আসছে। পুরনো বা চোরাই মোটরবাইকের ইঞ্জিন খুলে সেগুলো লাগিয়ে এই ভ্যানগুলো তৈরি করা হয়। এই সব জায়গায় একে ‘ভ্যানো’ বলে।
সেই ভ্যানোকেই হাত তুলে দাঁড় করিয়েছিল লালু। দেখেছিল, ভ্যানোর পিছনে একজন বাউল বসে আছে। আরে, গোবিন্দ বাউল না! কত দিন পরে দেখল!
লালু এগিয়ে গিয়েছিল ভ্যানোর দিকে। চালককে বলেছিল, “হারু ঘোষের বাড়ি যাব, যাবেন?”
চালক লোকটি গামছা দিয়ে মুখ মুছে হেসে বলেছিল, “পনেরো টাকা লাগবে বাবু।”
আর কথা না বাড়িয়ে লালু উঠে পড়েছিল পিছনে। পা ঝুলিয়ে বসেছিল গোবিন্দ বাউলের পাশে।
ভ্যানো চলছিল বড় রাস্তা দিয়ে। আস্তে আস্তে দুলছিল লালু। পাশ দিয়ে লং রুটের বাস একদিকে কাত হয়ে ঝিকিমিকি হর্ন বাজিয়ে নিমেষে হারিয়ে যাচ্ছিল দূরের রোদে!
“বাউল ভাল আছ?” মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করেছিল লালু। গোবিন্দ হেসে মাথা নাড়িয়েছিল। তার পর বলেছিল, “আজ শরীরটা ভাল নেই। তাই পাশের গ্রামে গিয়েছিলাম বিমল ডাক্তারের কাছে। বলছে স্পন্দ না কী রোগ হয়েছে! মাথা ঘুরায়। গা পাঁক দেয়। ব্যথা করে শিরদাঁড়া। শরীরের ওপর কম অত্যাচার করেছি? এখন সে প্রতিশোধ নেবে না, বলেন?”
লালু হেসেছিল।
গোবিন্দ জিজ্ঞেস করেছিল, “তা বাবুসাহেব, আপনাকে তো চিনলাম না!”
লালু বলল, “আমি লালকুমার বর্ধন। আগে এখানে থাকতাম। এখন কলকাতায় চাকরি করি।”
“বর্ধন?” গোবিন্দ মাথার কাঁচা-পাকা চুলে হাত দিয়ে কী যেন চিন্তা করেছিল। তার পর বলেছিল, “বর্ধন তো এখানে একজন হল, বাস স্ট্যান্ডের পাশের মানিক বর্ধন, যার মুদির দোকান আর গমকল আছে। আর অন্যজন তো… মানে এখন তো আর নেই!”
লালু বলেছিল, “বাচ্চু বর্ধন। মারা গিয়েছিল কুড়ি বছর আগে।”
“ঠিক ঠিক। জগন্নাথ ঘোষের সঙ্গে। কী সাংঘাতিক! নীলকুঠির মাঠে সেদিন কত্ত লোক! ওই মাঠটা খুব খারাপ। কালাচাঁদকেও নিয়েছিল ওই মাঠ। আরও কতজনকে যে নেবে কে জানে।”
“আমার বাবা। বাচ্চু বর্ধন আমার বাবা,” লালু ছোট্ট করে বলেছিল। গোবিন্দ কী বলবে বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়েছিল।
সামনে থেকে চালক বলেছিল, “ও গোবিন্দবাবা, তোমায় আগে ছেড়ে দিয়ে আসব না বাবুকে নামিয়ে দেব?”
গোবিন্দ বলেছিল, “বাবুসাহেবকেই দাও। অত দূর থেকে এসেছেন!” বড় রাস্তা থেকে ডান দিকে বেঁকে এবড়োখেবড়ো পথ ধরেছিল ভ্যানোচালক। নির্জন দুপুরে ফটফট শব্দ করতে করতে হেলেদুলে যাচ্ছিল ভ্যানো। হাওয়ায় পোড়া ডিজেলের গন্ধ ভাসছিল। কালো ধোঁয়া পাক খাচ্ছিল গরম বাতাসে। লালুর ঠোঁট টানছিল খুব।
গোবিন্দ বলেছিল, “আপনি বাবুসাহেব, বাচ্চুর ছেলে?”
“আমায় আপনি বলছ কেন? আমি তোমার গান কত শুনেছি!” লালু হেসেছিল। স্কুলের মাঠে। গুহবাড়ির বাগানে। মণি নদীর পাশে। কত শুনেছি।
গোবিন্দ হাসছিল। বলছিল, “তখন খুব ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম। এখন এই মুড়াপোঁতা, মুক্তদহ, আলমপুর আর নৃসিংবাগ ছাড়া বিশেষ কোথাও যাই না। তা, বাবুসাহেব আপনি ভাল আছেন তো?”
“আবার আপনি!” লালু অবাক হয়েছিল।
গোবিন্দ মাথা তুলে হো হো করে হেসেছিল। এলোমেলো হাওয়ায় ওর কাঁচাপাকা চুল আর দাড়ি উড়ছিল। তামাটে কপালে গভীর রেখায় কত দিনের ভাঁজ! চোখের পাশে বয়স আর কষ্টের আঁচড়! তাও এরকম রোদে পোড়া মানুষটাকে দেখে কেন কে জানে ভাল লাগছিল লালুর। তারিমারা জামা। হাতে একতারা। দু’পায়ে দুটো আলাদা রঙের স্ট্র্যাপের হাওয়াই চটি! এই রুক্ষ প্রকৃতির মাঝে এই লোকটাকে কেমন যেন প্রকৃতির অংশ বলেই মনে হচ্ছিল লালুর।
গোবিন্দ বলেছিল, “একটা বয়স পরে সবাই ‘আপনি’ হয়ে যাওয়াই ভাল বাবুসাহেব! ‘তুমি’ আর ‘তুই’-তে বড় মায়া। ওতে না জড়ানোই ভাল।”
বড় একটা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ভ্যানোটা। চালক বলেছিল, “বাবু, এসে গিয়েছে।”
গাড়ি থেকে নেমে টাকা মিটিয়ে দিয়েছিল লালু। দেখেছিল, বড় বাড়ির গেট থেকে একজন মাঝবয়সি লোক বেরিয়ে এল বাইক চেপে। নীল জিনস আর সাদা হাফ-শার্ট। চোখে সোনালি ফ্রেমের দামি সানগ্লাস। লোকটির চেহারা খুব ভাল। ছোট করে ছাঁটা চুল। গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ!
লালু শুনেছিল, গোবিন্দ বাউল চালককে বলছে, “মনোহর দেখ, হারু ঘোষের ছেলে। দেখতে একদম জগন্নাথের মতো, না?”
লালু চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, “আসি গো বাউল! আবার দেখা হবে কোনও দিন।”
“আনন্দে থাকবেন বাবুসাহেব,” গোবিন্দ বাউল হেসেছিল। তার পর ঝোলার ভেতর থেকে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করে হাতে দিয়েছিল লালুর। বাদামের প্যাকেট। ওই যেমন ট্রেনে-বাসে বিক্রি হয়, সেরকম।
ও তাকিয়েছিল অবাক হয়ে। কেন কে জানে ভাল লেগেছিল খুব। নিজের বাড়ির লোক ওকে দূর দূর করে তাড়িয়েছে আর কোথাকার কে এক বাউল, সে এমন করে খাবার দিল!
লালু হেসে আলতো করে হাতটা একটু ধরেছিল গোবিন্দর। গোবিন্দ আনমনা গলায় বলেছিল, “জড়াব না, জড়াব না ভাবি, তাও জড়িয়ে যাই! আসি।”
দুপুরের নির্জনতায় ফটফট শব্দের ছোট ছোট ঢেউ তুলে দূরের বাঁকে হারিয়ে গিয়েছিল ভ্যানো আর গোবিন্দ বাউল। সামনের বড় ভাঙাচোরা গেরুয়া পথের ওপর ঝরে পড়ছিল পাতা। গাছের ফাঁক দিয়ে আসা আলোর মধ্যে ভাসছিল সোনা রঙের ধুলো। মায়ার কত যে রকমফের আছে এই পৃথিবীতে!
বড় বাড়ির গেটে কেউ ছিল না। লোহার বড় গেটটা অর্ধেক খোলা ছিল। ভেতরে পেল্লায় জায়গা। সেই বাগানেই কাজ করতে দেখেছিল বড়দাকে। বড়দা মালির কাজ ভাল পারে। তাই কি হারু ঘোষ ওকে দিয়ে নিজের বাগানের কাজ করায়?
পায়ে পায়ে গেট দিয়ে ঢুকেছিল লালু। ও দেখেছিল, আশপাশে অনেকেই কাজ করছে আর তাদের মাঝে একটা বড় গার্ডেন আমব্রেলার তলায় বেতের চেয়ারে বসে রয়েছেন একজন মহিলা। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তাও এই বয়সেও কী সুন্দর দেখতে! বড় বড় চোখ। খাড়া নাক। তাতে চিকচিক করছে একটা পাথরের নাকছাবি
ওকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে মহিলা ঘুরে জিজ্ঞেস করেছিল, “কে তুমি? কাকে চাই?”
লালু বড়দার দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলেছিল, “আমার বড়দা। আমি একটা দরকারে এসেছি কলকাতা থেকে।”
বড়দাও ততক্ষণে ওকে দেখে ফেলেছিল। তাড়াতাড়ি হাতের খুরপিটা নামিয়ে রেখে গলায় ঝোলানো গামছায় হাত মুছতে মুছতে বলেছিল, “আমার ভাই হয়, মা।”
“অ!” মহিলা মুখ ঘুরিয়ে বলেছিল, “তাড়াতাড়ি কথা বলে নাও। কাজের সময় নষ্ট কোরো না। তা কেমন ভাই তোমার?”
“ওর বাবার মামা ছিল আমার দাদু।”
বড়দার কথাতেই লালু বুঝেছিল যে, বড়দার নিজেরই সম্পর্কটা গুলিয়ে গিয়েছে।
বড়দা বলেছিল, “ওর বাবা এখানেই আমাদের বাড়িতেই থাকত। পার্টি করত।”
মহিলা আগ্রহ হারিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বাকিদের কাজ দেখছিল। মাঠে সেই যে মারা গেল বড়দা তাও বলে যাচ্ছিল, “নীলকুঠি জগন্নাথকাকার সঙ্গে। সেই যে…”
মহিলা এবার দ্রুত ঘুরে তাকিয়েছিল লালুর দিকে। তার পর কেমন অস্ফুটে বলেছিল, “বাচ্চু!”
লালু দেখেছিল মহিলার মুখের রং যেন সামান্য পাল্টে গেল। বড়দা সে সব খেয়াল না করে বলেছিল, “আমি একটু কথা বলে নিই মা!”
তার পর ওর দিকে তাকিয়ে গেটের বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে হাঁটা দিয়েছিল নিজেই!
বড় লোহার গেটের বাইরে এসে ওরা দাঁড়িয়েছিল। আর ওখান থেকেই লালু দেখেছিল, মহিলা চেয়ার থেকে উঠে বাড়ির ভেতরে চলে গেল ধীর পায়ে।
লালু, বড়দার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কে ইনি?”
বড়দা অপ্রয়োজনীয় ভাবে গলাটা খাদে নামিয়ে বলেছিল, “আরে, এ হল বাড়ির মালকিন। হারু ঘোষের স্ত্রী। লীলা ঘোষ।”
লালু এখানে থাকার সময় এ দিকে আসেনি বিশেষ। তাই মহিলাকে চেনে না। তবে নাম শুনেছিল।
বড়দা জিজ্ঞেস করেছিল, “তা তুই হঠাৎ। এ ভাবে খবর না দিয়ে। এত দিন কোনও পাত্তাই নেই যে!”
লালু সময় নষ্ট করেনি। সরাসরি বলেছিল, “আমি খুব বিপদে পড়ে এসেছি রে দাদা। আমার টাকার দরকার। এখানে দাদু আমার নামে যেটুকু জমি রেখেছিল, সেটা কি আছে?”
“জমি? তোর নামে?” গামছা দিয়ে মুখ মুছে অবাক হয়ে লালুর মুখের দিকে তাকিয়েছিল বড়দা।
“হ্যাঁ, বড়দাদু যে আমায় বলেছিল। বলেছিল, ‘তোর জন্য চার-পাঁচ কাঠা জমি রেখে যাব।’ সেটার কথা বলছি.” লালু তাকিয়েছিল বড়দার দিকে।
“আরে, সে তো বড়দাদু সবাইকেই এমন বলত! নিজের জমি ছিল সামান্য। সেটা আমাদের বাবা-কাকারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। ওরকম মুখের কথায় তো কিছু হয় না! লিখিত-পড়িত কিছু করে যায়নি।
“সে কী!” লালু কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়েছিল হাঁ করে।
“আরে, দাদুরা পুরনো দিনের লোক। এ সব বুঝত না। বাবা-কাকারা সেই জমি বেচেও দিয়েছে। তুই এত বছর নেই এখানে, এর মধ্যে কত কী পাল্টে গিয়েছে! বাড়ি গেলে দেখবি দাওয়া জুড়ে পাঁচিল তুলেছে। সুপুরি নারকেল গাছের ভাগ হয়েছে। তোরা যেখানে ছিলিস, সেজো সেই দিকটা দখল করে গোয়াল করেছে.” বড়দা অনেক কিছু বলে যাচ্ছিল।
লালু জিজ্ঞেস করেছিল, “তা হলে আমার নামে কিছু নেই?”
“না রে!” মাথা নেড়েছিল বড়দা। তার পর জিজ্ঞেস করেছিল, “তা কী দরকার রে? খুব দরকার? আমার কাছে জমানো পনেরো-কুড়ি হাজার আছে। লাগলে দেব।”
লালুর মাথার মাঝখানটা দপদপ করছিল। এবার কী হবে! যা ভেবেছিল তাও তো নেই। তা হলে টাকাটা পাবে কোথা থেকে!
বড়দা জিজ্ঞেস করেছিল, “আমায় বলতে পারিস লালু। তা, দুপুরে খাবি কোথায়? এই বাড়িতে আমি দুপুরে খাব আজ। ওদের বললে তোরও খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। খাবি তো?”
লালু বলেছিল, “জমির কথাটা দাদু বেকার বলেছিল। আমিও গাধা, না ভেবে এত দূরে এলাম। বড়দা, খুব বিপদে পড়ে গেলাম রে!”
“তাই!” বড়দা কাঁচুমাচু মুখ করে বলেছিল, “আমার কাছে যা আছে তোকে দেব। সেজোকে বলিস না আবার। ওর গরু কেনার ছিল, আমার কাছে চেয়েছিল, দিইনি। জানলে খুব ঝামেলা করবে। তা, তোর ঠিক কত টাকার দরকার রে?”
লালু তাকিয়েছিল বড়দার দিকে। তার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “বারো লাখের মতো।”
“বা…” কথা শেষ না করে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়েছিল বড়দা। চারিদিকটা বড় নিস্তব্ধ লাগছিল লালুর। শুধু দূরে টিটি টিটি করে একটা পাখি ডেকে যাচ্ছিল একা।
“কী ভাই, নামবে?” পেছন থেকে ধাক্কা লাগল এবার।
লালু মাথা ঘুরিয়ে দেখল, একটা মোটা লোক ওর দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা কুলকুল করে ঘামছে।
ট্রেন ঢুকছে দমদম জংশনে। লালু বলল, “নামব দাদা!”
লোকটা বলল, “একটু এগিয়ে চলো ভাই। তাড়াতাড়ি না নামলে মেট্রোটা মিস করব। হেভি কেলো হয়ে যাবে।”
কেলো হতে আর কি কিছু বাকি আছে জীবনে! কোথাও যে কোনও আশার আলো দেখছে না লালু। এখন কী করবে ও!
ট্রেন থামল। আর সঙ্গে দুটো বিপরীতমুখী স্রোত যেন একে-অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেল। ট্রেনের ভেতরের লোক নামতে চাইছে আগে আর স্টেশনে দাঁড়ানো লোকজন উঠতে চাইছে একই সঙ্গে। কারও তর সয় না এখানে। সবাই খুব অস্থির। সবাই এখনই সব করে ফেলতে চায়। এই ধাক্কাধাক্কিতে যে আসলে আরও দেরি হয়ে যায়, সেই বোধ কারও নেই। সবাই যেন ধাক্কাধাক্কিতেই একটা জান্তব আনন্দ পায়।
এখন লালুও সেই খণ্ডযুদ্ধের মধ্যে পড়ে গেল। এমনিতেই পায়ের জন্য ওর একটু অসুবিধে হয়, তার মধ্যে এরকম ভিড়। স্টেশনে নেমে ধাক্কার চোটে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল লালু, কিন্তু তখনই একটা শক্ত হাত ওকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। আর শুধু তাই নয় ভিড় থেকে টেনে বেরও করে আনল ওকে।
লালু মুখ তুলে তাকাল। দেখল লোকটাকে। দোহারা চেহারা। বেশ সুন্দর দেখতে। চোখে-মুখে সৌম্যভাব। লালু হাসল লোকটার দিকে তাকিয়ে।
লোকটাও হাসল পাল্টা। তার পর নরম স্বরে বলল, “আবার দেখা হবে আপনার সঙ্গে। ভাল থাকবেন।”
লালু কিছু বলার আগেই লোকটা প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল! দেখা হবে মানে? কেন দেখা হবে? কিসের জন্য দেখা হবে ওদের? কে লোকটা? লালু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল হিজিবিজি ভিড়ের দিকে। মাঝে মাঝে জীবনে কী যে ঘটে, মাথামুণ্ডু তার কিছুই বোঝা যায় না। লালু বুঝল, লোকটার ওই আপাত সামান্য কথার ফলে ওর মাথার মধ্যেও যেন একটা শেষ বিকেলের দমদম জংশন ঢুকে পড়েছে এখন!
