গ. লীলা (বড় দিনের আট দিন আগে)
রাবণের চিতা কি সত্যি মানুষের বুকের মধ্যে জ্বলে! ছোট থেকে এমনটাই শুনে আসছে লীলা। ঠাকুরমা বলত, “মনের মধ্যে হিংসে আনবি না। মনের মধ্যে অসুরক্ষার ভাব আনবি না। অপমান নিয়ে মাথা ঘামাবি না। কারণ, এগুলো এলেই দেখবি বুকের পাঁজরে কে যেন রাবণের চিতা জ্বালিয়ে দিয়েছে! আর, একবার সেই চিতা যদি জ্বলে ওঠে, তা হলে আর রক্ষে নেই! নিজে যেমন পুড়বে, তেমন তোকেও পোড়াবে সারা জীবন।”
এ সব এতকাল বোঝেনি লীলা। কিন্তু এখন বোঝে। সারাক্ষণ বুকের মধ্যে গনগনে একটা আঁচ জ্বলে যাচ্ছে যেন। ক্রমশ পুড়ে যাচ্ছে ও! ঠাকুরমা যে কতটা ঠিক বলেছিল বুঝতে পারছে এখন!
লীলা জানলা দিয়ে দেখল, বড় গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে এখনও। সাদা বড় গাড়ি। কলকাতা থেকে এসেছে লোকটা। বীরেন্দ্র ত্রিবেদী নাম। অনেক টাকা আছে। সঙ্গে পলিটিকাল কানেকশনও নাকি দারুণ। এখন অবশ্য কারও টাকা থাকলেই রাজনীতির মাছিরা তাকে খোলা আম মনে করে এসে তার চারপাশে ভনভন করে।
হারু অবশ্য বলে লোকটা পার্টি করে অনেক দিন ধরে। বৃহৎ রাজনীতির অনেক কিছুই নাকি নিয়ন্ত্রণ করে।
এই বীরেন্দ্র ত্রিবেদী মুড়াপোতায় একটা বড় কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি খুলতে চায়। সেই কেমিক্যাল শুধু দেশে নয় বাংলাদেশেও সাপ্লাই করা হবে ।
কিন্তু ফ্যাক্টরি খুলতে চাইলেই যে খুলতে পারবে তা নয়। কারণ, সেখানে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জগন্নাথ। জগন্নাথের কথা হল, এই গ্রাম কৃষিপ্রধান। ওর মতে এখানকার জমিতে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি খোলা খুব বিপজ্জনক। কারণ, মাটিতে কেমিক্যাল মিশে চারিদিকে ছড়িয়ে যাবে আর কাছের জলাশয় থেকে শুরু করে চাষের জমি, সব কিছুকে বিষিয়ে দেবে।
বীরেন্দ্র নাকি জগন্নাথের সঙ্গে কথাও বলতে চেয়েছে। কিন্তু জগন্নাথ পাত্তাই দেয়নি বীরেন্দ্রর কথাকে। দেখা করা তো দূরে থাক, ফোনও ধরেনি। তাই আজ বীরেন্দ্র এসেছে হারুর কাছে। কারণ, জমিটা যে শুধু হারু বিক্রিই করবে তা নয়, বীরেন্দ্রর ইচ্ছে হারু কথা বলুক জগন্নাথের সঙ্গেও।
চেষ্টা করেছে হারু, জগন্নাথের সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। জগন্নাথ সোজা জানিয়ে দিয়েছে ও থাকতে এ সব হতে দেবে না ।
লীলা এ সবের মধ্যে থাকে না। সংসার নিয়ে ও দিব্যি আছে। এক ছেলে কলেজে পড়ে আর এক মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক দেবে। তাদের খাওয়াদাওয়া, এত বড় বাড়ির চাকরবাকরদের সামলানো। বাড়ির বাগানে 39 মালিদের কাজের তদারকি। গোয়ালের যাতে ঠিকমতো যত্ন করা হয়, সেই দিকটা দেখা। কম কাজ আছে নাকি লীলার!
গরিব বাড়ির মেয়ে ও। ছোট থেকে গায়েগতরে খেটে মানুষ হয়েছে। ওর বোন শিউলি ছিল খুব শান্ত আর মিষ্টি স্বভাবের। সবাই শিউলিকেই বেশি ভালবাসত । শিউলি ওর মতো দামাল নয়। শান্ত। তার ওপর রান্না করতে পারত খুব ভাল। এ ছাড়া আর কিছু তেমন করতে চাইতও না। বাড়ির লোকজনও চাপ দিত না শিউলিকে। যত চাপ ছিল লীলার ওপর।
লীলা ছোট থেকেই দস্যি। এর বাড়ির পেয়ারা পেড়ে আনছে। ওর বাড়ির কুল চুরি করছে। নিজেদের কয়েকটা ফুলগাছ থাকলেও রাত থাকতে বেরিয়ে গিয়ে এর-ওর বাড়ি থেকে টগর, শিউলি জবা গন্ধরাজ তুলে আনত লীলা। এই নিয়ে কম অশান্তি হত না। দাদারা মারতও খুব। লীলা পাত্তা দিত না । শিউলি ছিল, যাকে বলে আদর্শ মেয়ে আর লীলা ছিল জ্যাঠা-জেঠিদের ভাষায় মুখপুড়ি!
গ্রামে মুখ পোড়ানো কাকে বলে জানত না লীলা তখন ওর বয়স আঠারো। গ্রামেরই একটা ছেলে ছিল, নিতাই। পার্টি করত। তার সঙ্গে একটা দোকানও চালাত। ছুতোরের। টুকটাক ফার্নিচার তৈরি করত অর্ডার ধরে।
লীলাকে দেখতে সুন্দর। অনেক বুড়ো ছুঁড়োই পেছনে ঘুরঘুর করত। তার মধ্যে নিতাই ছিল অন্যরকম। পড়াশোনা করত। ভাল গান গাইত। নিতাইকেই একমাত্র যা একটু পাত্তা দিত লীলা।
নিতাইও আসত বিকেলবেলা ভাঙা বুরুজের ধারে। হাতটা একটু ছুঁত। একটু চুমু খেত। ব্যস, এটুকুই। নিতাই খুব ভালবাসা দেখালেও লীলার কিছু মনে হত না। ওই লুকিয়ে দেখা করার উত্তেজনাটা বাদ দিলে ওর গায়ে বা মনে সে ভাবে কিছু লাগত না তবে লেগেছিল। একবার লেগেছিল। নিতাইয়ের সঙ্গে একটা ছেলেকে দেখে কেমন যেন করে উঠেছিল বুকটা। মনে হচ্ছিল পরানদার নৌকা করে মণি নদীর ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে যেন কোথায় ভেসে যাচ্ছে ও! এত দোলা কী করে লাগল বুকে? কে লাগাল? কে ছেলেটা যে সাইকেলে নিতাইকে পেছনে বসিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?
বান্ধবী শুক্লা বলেছিল, “একে চিনিস না? মুড়াপোঁতায় থাকে। পার্টি করে। বয়স অল্প হলে কী হবে? খুব নাম। জগন্নাথ ঘোষ ।”
জগন্নাথকে সেই প্রথম দেখেছিল লীলা । তাও একটুখানি। আর কথাও হয়নি। শুধু দেখেছিল, সাইকেল করে ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে মাটির উঁচুনিচু পথ দিয়ে চলে যাচ্ছে ছেলেটা।
এক-একটা দৃশ্যের মধ্যে এক-একরকমের মৃত্যু লুকিয়ে থাকে, ইশারা লুকিয়ে থাকে। সেটা মানুষকে সারা জীবন কষ্ট দিয়ে যায়। পাগল করে রাখে মনে মনে। কাউকে বলা যায় না কেন এমন উচাটন হয় মন! কেন মনের মধ্যে পাড় ভাঙতে ভাঙতে বয়ে যায় কীর্তিনাশা! কেন একজনকে দেখামাত্র সম্পূর্ণ কোনও কারণ ছাড়াই শূন্য পথের ওপর ঝরে যায় বাগানের সমস্ত টগর, গন্ধরাজ আর মল্লিকা!
সেই ছিল লীলার ঝরে যাওয়ার শুরু। বয়ে যাওয়ার শুরু।
বুরুজের কাছে নিতাইয়ের সঙ্গে দেখা করে কথা কথায় ও জেনে নিয়েছিল জগন্নাথ সম্পর্কে।
জেনেছিল মুড়াপোঁতায় বড় বাড়ির ছেলে জগন্নাথ । টাকাপয়সার নাকি হিসেব নেই। কিন্তু সে সব দিকে খেয়াল নেই জগন্নাথের। ও পার্টির হোলটাইমার। বিয়ে-শাদি নাকি করবে না কোনও দিন। পার্টিই ছেলেটার কাছে সব!
নিতাই তো বোঝেনি কেন এ সব জিজ্ঞেস করছিল লীলা! ও যত শুনছিল জগন্নাথের সম্পর্কে, ততই মনের মধ্যে কেমন একটা করছিল। বুকের মধ্যে দুলছিল সব কিছু। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। কপালে ঘাড়ে ঘন হয়েছিল তাপ।
নিতাই হাত ধরতে চাইছিল। কাছে টানতে চাইছিল। কিন্তু লীলা সরে এসেছিল। মনে মনে কেমন একটা অবসাদ আসছিল। কিছু ভাল লাগছিল না। ছেলেটা বিয়ে করবে না? সারা জীবন অমন সাদা হাফ শার্ট, খাকি প্যান্ট পরে সাইকেলে বসে এই গ্রাম থেকে ওই গ্রামে ঘুরে বেড়াবে! সবার জীবন যাতে ভাল হয় সেটা দেখতে গিয়ে নিজের জীবনটাই দেখবে না!
সে দিন বাড়িতে ফিরেই একটা গোলমালে পড়েছি লীলা। বাড়ির পাশে যে-মালতীদি থাকে, তার বর নাকি ওকে আর নিতাইকে দেখে ফেলেছে বুরুজের কাছে। দেখেছে নিতাই নাকি বুকে হাত দিয়ে অসভ্যতা করছিল লীলার সঙ্গে!
বুকে হাত মোটেও দেয়নি নিতাই। লীলা কোনও দিন সেই সুযোগই দেয়নি ওকে। আসলে লোকজন এমন করে বাড়িয়ে বলা পছন্দ করে। আর মালতীদির বাবাটা হাড়বজ্জাত। ওদের একতলার বাথরুম থেকে ওরা যখন স্নান সেরে, বুকে কাপড় বেঁধে বেরোয়, বুড়োটা নিজের বাড়ির দোতলা থেকে উঁকিঝুঁকি দেয়!
কিন্তু দাদারা কিছু শোনেনি সে সব। মারধোর করে বলেছিল, “দাঁড়া, তোর বিয়ে দিচ্ছি!”
ক্লাস টুয়েলভ পাশ করে আর পড়েনি লীলা। ওর ইচ্ছে ছিল কলেজে যাওয়ার। কিন্তু দাদারা পাঠায়নি। ঠাকুরমাও বাধ সেধেছিল। কেন কে জানে! মেয়েদের কিছু করার কথা উঠলেই যেন মানুষের ঝাল লাগে! সে দিন রাতে বড়দা বলেছিল, “আর নয়। লীলাকে এবার পার করতে হবে। বড্ড বাড় বেড়েছে ও!”
ও বিড়াল নাকি যে পার করতে হবে! লীলার কষ্ট হয়েছিল খুব। কেঁদেছিল সারা রাত। শিউলি এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু লীলা পাত্তা দেয়নি। শিউলিকে ও সহ্য করতে পারত না।
শিউলি যেন নিখুঁত। শিউলির সব কিছুই যেন ভাল। শিউলি ভাল গান করে। ভাল রান্না করে । কথা শোনে। শিউলিকে দেখতে সুন্দর। মানে, এত প্ৰশংসা শিউলির যে, মনে হয় যেন ভগবানের অবতার ও!
সেদিন রাতে ও শিউলিকে সরিয়ে দিয়েছিল নিজের কাছ থেকে। মনে হয়েছিল এই শিউলির জন্যই ওর এত দুর্দশা। শিউলির সঙ্গে সারাক্ষণ ওকে মিলিয়ে দেখা হয় বলেই সবাই ওকে অপছন্দ করে। লীলা ভেবেছিল, একবার যদি এই জীবন থেকে বেরোতে পারে ও, তা হলে আর কোনও দিন এ বাড়ির কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না। কারও মুখ দর্শন পর্যন্ত করবে না।
দিন দশেকের মধ্যেই সম্বন্ধ এসে গিয়েছিল। এক সঙ্গে প্রায় পাঁচটা সম্বন্ধ। কিন্তু বাড়ির দাদারা পছ 39 করেছিল হারু ঘোষকে। মোটাসোটা। প্রচুর পয়সা পণ চায় না। শুধু সুন্দরী বউ চায়। লীলার ছবি যেঘটক নিয়ে গিয়েছিল, তাকে নাকি হারু বলেছে, এই মেয়েকেই বিয়ে করবে ও।
হারু এসেছিল চারদিন পরে। মোটা, মাখনের মতো ফর্সা। দাড়ি-গোঁফ কম। চোখটা কুতকুতে আর বাদামি। মুখে একটা কেমন যেন আরোপিত গাম্ভীর্য।
লীলাকে বসানো হয়েছিল ওর সামনে। লীলার বিরক্ত লাগছিল। শুধু সুন্দর বলে বিয়ে করবে? ওর বুঝি অন্য কিছু দাম নেই! একদিন তো চলে যাবে সৌন্দর্য! তখন? তখন কি তা হলে পাপোশ করে রাখবে?
লীলা কথাবার্তা শুনছিল সবার। হারু বলছিল যে, ওর কোনও পণ লাগবে না। লীলাকেই শুধু চায়। আর বাড়ি, চালকল, প্রচুর জমিজমা সবটাই তো ওরই হবে। থাকার মধ্যে একটাই ভাই। সে-ও আবার বিয়ে করবে না। পার্টি করে সারা দিন। বাড়িতে থাকে কম।
“কে আপনার ভাই?” দাদা জিজ্ঞেস করেছিল।
হারু বলেছিল, “আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন ওর নাম। জগন্নাথ।”
বিদ্যুতের ছ্যাঁকা খেয়েছিল যেন লীলা! বুকের মধ্যে কেন যে এমন জোরে ঘোরা নাগরদোলা নেমে আসার মতো দুলুনি হয়েছিল! কেন যে এমন শ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছিল! হারু জগন্নাথের দাদা! মানে এখানে বিয়ে হলে ও জগন্নাথের কাছে থাকতে পারবে। ও যেন দেখতে পেয়েছিল সাদা শার্ট আর খাকি রঙের প্যান্ট পরে এক যুবক আনমনা ভাবে সাইকেল চালিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে ওর মনের মধ্যেকার গ্রাম। মণি নদীর পাড়। বুড়ো শিবের থান।
হারুর তর সয়নি। বিয়ে হয়ে গিয়েছিল খুব দ্রুত। হ্যাজাক আর ব্যান্ড পার্টি নিয়ে হারু এসেছিল বিয়ে করতে। লীলা মাথা নিচু করেই ছিল। শুধু বুকের মধ্যে ছোট্ট একটা টুনটুনি কাঁপছিল তিরতির করে। শুধু মনে হচ্ছিল, জগন্নাথ কি এসেছে?
এসেছিল জগন্নাথ। সেই একই জামাকাপড় । মাথা নিচু। আনমনা দৃষ্টি। লীলার দিকে তাকিয়ে সামার 39 হেসে সরে গিয়েছিল। লীলার যে কী হয়েছিল আর কাকেই-বা বলবে!
হারু একটা ঢেড়স! ওর দ্বারা যে কিছু হবে না সেটা ফুলশয্যাতেই বুঝে গিয়েছিল। তা ছাড়া হারুর গায়ে কেমন যেন একটা গন্ধ। যেন সারা গায়ে ঘি মেখে এসেছে! বমি আসছিল লীলার। কিন্তু সহ্য করছিল, যে ভাবে মেয়েদের অনেক কিছু সহ্য করে থাকতে হয়। ,
ফুলশয্যার রাতে হারু জল থেকে তুলে রাখা মাছের মতো খাবি খাচ্ছিল ওর ওপর। তার পর কোনও মতে নিজেকে শেষ করে নেমে বলেছিল, “তুমি খুশি তো?”
ঘি যে অসহ্য লাগে লীলার, সেটা আর বলেনি। কী হবে? এত বড় বাড়ি, সম্পত্তি এ সব তো পেল। একটা জীবনে সব কি আর পাওয়া যায়? যায় না। তা ছাড়া মুক্তদহর ওই বাড়ি, ওই জ্যাঠা-জেঠিমা, দাদাবৌদি, শিউলি, ওদের থেকে তো দূরে যেতে পেরেছে! সেটা কি কম শান্তি!
এই বাড়িতে মানিয়ে নিতে সময় লাগেনি লীলার এক বুড়ি পিসি আর জগন্নাথ ছাড়া কেউ নেই। পিপি খুব শান্ত, ভাল মানুষ। কারও সাতে-পাঁচে থাকে না। সারা দিন গোপালের সেবায় পড়ে থাকে। আর জগন্নাথ তো সে ভাবে থাকেই না!
তবে যেটুকু থাকত সেটুকুই ভাল লাগত লীলার। লীলার সঙ্গে টুকটাক কথা হত। জগন্নাথ ইয়ার্কি করত অল্পসল্প। গান গাইত। লীলার যে কী ভাল লাগত। জগন্নাথের গা থেকে পোড়া তামাক আর ঘাম মেশানো একটা গন্ধ পেত লীলা। সেটা যেন সারা দিন ঘুরত ওর সঙ্গে। দালানে বসে সেলাই করার সময়, ছাদে ঘোরার সময়, বাগানে মালিদের কাজ দেখার সময় আচমকা কোথা থেকে যে ভেসে আসত সেই গন্ধ! লীলা ভাবত কত কী যে মানুষের সঙ্গে মানুষকে গেঁথে রাখে!
এ ভাবেই কেটে যাবে সব। আর কিছু হবে না জীবনে। এটাই ভেবেছিল লীলা। ভেবেছিল ওকেও হয়তো পিসিমার মতো গোপালের আশ্রয়ে যেতে হবে। নির্জন দুপুরে, বৃষ্টির সন্ধেবেলা আর নিস্তব্ধ রাতে মাঝে মাঝে এত কষ্ট হত শরীরে। বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদত ও। কিন্তু হারুর নাক ডাকার প্রচ আওয়াজে সেই কান্নার শব্দ নিজেও শুনতে পেত না।
তার পর হারু একদিন বর্ধমানে গেল। নতুন চালকল করবে। মানে, একটা চাল কল আছেই। আর-একটা কিনতে যাবে। বলে গেল সপ্তাহখানেক লাগবে ফিরতে।
সেটা ছিল বর্ষাকাল। সারা দিন, সারা রাত ধরে বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। তারই মধ্যে ভিজে একদিন জ্বর এল জগন্নাথের। দেখার কেউ নেই। চাকরবাকরদের দ্বারা তো আর ও সব হয় না। আর সত্যি বলতে কী, লীলার ইচ্ছে করছিল ওর কাছে যেতে। মাথার পাশে বসতে। ওই ঘন কোঁকড়া চুলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে দিতে।
তাই সন্ধেবেলা পাউরুটি আর দুধ নিয়ে জগন্নাথের ঘরে গিয়েছিল লীলা ।
জগন্নাথ চেয়ারে বসে কী যেন একটা বই পড়ছিল গায়ে হাতকাটা গেঞ্জি আর পাজামা। ওকে দেখে মুখ তুলে হেসেছিল। এমনিতে ঘরে আলো বন্ধ থাকলেও টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছিল শুধু।
টেবিলের কাছে খাবারটা রেখেছিল লীলা । জিজ্ঞেস করেছিল, “জ্বর আছে আর?”
“বুঝতে পারছি না!” জগন্নাথ মুখ তুলে তাকিয়েছিল, “দ্যাখো তো।”
লীলা আবার সেই কড়া তামাকের গন্ধ পাচ্ছিল। হাত কাঁপছিল ওর। শ্বাসে যেন জ্বলন্ত কয়লার তাপ। ও কাঁপা হাত দিয়েছিল জগন্নাথের কপালে। জগন্নাথ বন্ধ করে নিয়েছিল চোখ। লীলার নিজের হাত এত গরম হয়ে গিয়েছিল যে, জগন্নাথের জ্বর ছিল কি না, বুঝতে পারছিল না।
জগন্নাথ আচমকা লীলার হাতটা চেপে ধরেছিল কপালে, তার পর কপাল থেকে নিয়ে এসে চেপে ধরেছিল গালে।
লীলা আর পারছিল না। নিশ্বাসে যেন ফুলকি বেরোচ্ছিল। মনে হচ্ছিল পা দুটো তুলোর তৈরি! প্রায় পড়ে যাচ্ছিল ও। জগন্নাথ কোমরটা বের দিয়ে ধরে ফেলেছিল ওকে। তার পর টেনে এনে বসিয়েছিল কোলে।
আর বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। অঝোরে ঝাপসা একটা শব্দ পর্দার মতো ঘিরে রেখেছিল ওদের।
কিছু পরে লীলার ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়েছিল জগন্নাথ। লীলার মাথা হাল্কা লাগছিল। জিভ অসাড়। শ্বাস পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়োচ্ছিল ফাঁকা মাঠ পেয়ে!
ও শুধু অস্ফুটে বলেছিল, “আমায় নেবে না?”
জগন্নাথ লীলাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। তার পর দ্রুত হাতে দরজা বন্ধ করে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়েছিল বিছানার কাছে। লীলা নিজেকে উন্মোচিত করতে করতে তাকিয়েছিল জগন্নাথের দিকে। জগন্নাথও দ্রুত নিজেকে মেলে ধরেছিল সম্পূর্ণ, তার পর এগিয়ে গিয়েছিল লীলার দিকে।
বেশ কিছু পরে জগন্নাথের বুকের মধ্যে মিশে থেকে লীলা বলেছিল, “আর কারও কাছে গেলে আমি তোমায় মেরে ফেলব, দেখো!”
সেই উনিশ থেকে এখন বিয়াল্লিশ! তেইশ বছর জগন্নাথ ছাড়া আর কাউকে ভালবাসেনি লীলা।
জগন্নাথ ছাড়া আর কাউকে ভালবাসেনি লীলা। বাচ্চা দুটো পর্যন্ত ওর। আর সে কিনা অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে পার্টি অফিসে শুচ্ছে!
এই ব্যাপারটা শোনার পর থেকেই লীলার বুকের মধ্যে চিতা জ্বলছে যেন! সেই আগুনে লীলার সর্বস্ব পুড়ে যাচ্ছে। কী মনে করে জগন্নাথ অন্য মেয়ের সঙ্গে শোয়! আর ও খবর নিয়েছে আরও। এই বাড়ি ছেড়ে নাকি মুক্তদহতে চলে যাবে জগন্নাথ। কত সাহস! কী বলেছিল লীলা মনে নেই? নাকি নতুন শরীরের লোভে তেইশ বছর আগের সব কথা ভুলে গিয়েছে? ও ছাড়বে না জগন্নাথকে। লীলাকে যে ভাবে ও আজকাল দূরে সরিয়ে রাখে, বিরক্তি দেখায়, সে সবের জন্য ওকে পস্তাতে হবে। দিনের পর দিন ওকে কেউ অপমান করবে আর ও মেনে নেবে? লীলা দেখল নীচের সাদা গাড়িতে উঠে চলে গেল বীরেন্দ্র। তার একটু পরেই পায়ের শব্দ পেল ও। ওই হারু আসছে। চোয়াল শক্ত করল লীলা। এটাই ওর সুযোগ।
হারু এখন আরও মোটা হয়েছে। সাধারণ ভাবে নিলেও ফুড়ফুড় করে একটা নাক ডাকার মতো পাতলা শব্দ হয় সারাক্ষণ।
ঘরে ঢুকেই বিশাল শরীরটা বিছানায় ছেড়ে দিল হারু । পুরনো দিনের মজবুত খাট। আসলে পালঙ্ক। সে-ও ওই ভারে সামান্য যন্ত্রণা পাওয়ার মতো কঁকিয়ে উঠল।
হারু বলল, “জগা শালা শুয়োরের বাচ্চা। দু’কোটি টাকা ওর জন্য হাতছাড়া হবে? বীরেন্দ্র লোকটা দু’কোটি টাকা দেবে আমায়। কিন্তু জয়েন্ট প্রপার্টি। জগার সই না হলে তো কিছু হবে না। তিন মাস ধরে বাঞ্চোত ভোগাচ্ছে! মাথা এমন খারাপ হয়ে আছে না আমার! জমিটা বেকার পড়ে আছে। কিন্তু ওই হারামিটা বেচতে দেবে না। কী, না কেমিক্যালে নাকি জল মাটি নষ্ট হবে। খুব বুঝদার এসেছে আমার । কী যে করি! কোন জন্মের শত্রুতা বের করছে ও?”
লীলা তাকাল ওর দিকে। তার পর হারুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কী করতে চাও তুমি?”
“ছাড়ো তো! ছেনালি করতে হবে না,” হারু লী হাতটা সরিয়ে উঠে বসল, “ওকে শালা আমি… মেরে ফেলতে চাই। আমার টাকার ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকা? ওকে মেরে ফেললে সব ল্যাঠা চুকে যায়।”
লীলা সরে গেল হারুর দিকে। তার পর বলল, “তো, মেরে ফেলো। কে দেখতে যাচ্ছে?”
“মানে?” ফর্সা হারু যেন আরও ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
লীলা চোয়াল শক্ত করে বলল, “সাহস আনো মনে। ও তোমার চালকলের শ্রমিক খেপায়। তোমার নামে বদনাম করে। তোমায় জমি বেচতে দেয় না, আর…”
“আর?” হারু ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“তোমার বউয়ের দিকে কুনজর দেয়!” লীলা কথাটা বলে তাকাল হারুর দিকে।
“কী?” হারু ছিটকে উঠল, “তোমায় কিছু করেছে?”
“অত সাহস আছে? কিন্তু আমি মেয়েমানুষ। পুরুষের বদ দৃষ্টি আমি বুঝি না! ও বেঁচে থাকলে খুব জ্বালাবে। বলে দিলাম ।”
“কিন্তু আমি… মানে জানাজানি হয়ে গেলে….” হারু আবার নেতিয়ে পড়ল।
লীলা যেন নিজের বুকের মধ্যে আগুনের পটপট শব্দ শুনতে পেল। জ্বলন্ত চিতার শিখা বুক থেকে লকলকিয়ে উঠে এসেছে মাথা অবধি। অন্ধ একটা রাগ সাপের মতো জড়িয়ে ধরেছে মন।
“হবে না জানাজানি,” লীলা বলল, “ওর রাজনৈতিক শত্রু আছে অনেক। তোমার ভাই কি কম লোক মেরেছে নাকি? তারাও তো ওকে মারতে পারে। তাই না?”
“পারে?” হারু কুতকুতে চোখগুলো বড় করল।
“হ্যাঁ। আমি জানি কী করে করাতে হবে,” লীলা চোয়াল শক্ত করল।
আসলে হারু জানে না কিছু। এটা তো ও জানে না যে, গত দু’সপ্তাহ এমনি এমনি কাটায়নি লীলা। নিজের কাজের ছেলে ফণী খুব করিৎকর্মা। বাচ্চুর কাছ থেকে ব্যাপারটা জানার পরে ফণীকে বলেছিল লীলা। আর ফণীই সব খবর এনে দিয়েছে।
হারু তাকাল, “আমার কোনও বিপদ হবে না তো?”
লীলা বলল, “কিছু টাকা খসবে। কিন্তু তোমার নাম আসবে না।”
হারুর শ্বাস দ্রুত হল। বলল, “ছোট থেকে শুয়োরের বাচ্চাটা জ্বালাচ্ছে আমায়! ও দেখতে ভাল। পড়াশোনায় ভাল। ও সবেতে ভাল। আর আমি শালা যেন ড্রেনের জল! এখন আমার টাকার পেছনে বাঁশ দিচ্ছে! শালা, জান কয়লা করে দিল!”
লীলা বলল, “দু’কোটি হারাবে, না সরাবে ওকে? কী বলো তুমি? রাজি?”
হারু বলল, “আমার নাম যেন না আসে।”
লীলা মুখে কিছু বলল না। শুধু মনে মনে বলল, ‘জগন্নাথ, তোমায় বলেছিলাম না আর কারও কাছে গেলে মেরে ফেলব! এবার বুঝবে যে আমি কথা দিলে কথা রাখি।’
