২. উর্জা
ছেলেটা চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছে। কোনও দিকে তাকাচ্ছে না। কোনও কথা বলছে না। উর্জা পিছনের সিটের বাঁ দিকের কোনায় বসেছে। কোনাকুনি ছেলেটার মুখের বাঁ দিকটা দেখতে পাচ্ছে। গালে সামান্য দাড়ি। হাল্কা গোঁফও আছে। রোগা, ফর্সা। দেখতে বেশ সুন্দর। ছেলেটাকে যে বাবা নতুন কাজে রেখেছে সেটা বুঝতে পারছে ও।
এয়ারপোর্টে ঠিক সময় পৌঁছে গিয়েছিল ছেলেটা। উর্জা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতেই নিজে এগিয়ে এসেছিল। বীরেন্দ্র পাঠিয়েছে বলে, নিজেই হাত বাড়িয়ে দুটো ব্যাগ নিয়ে ডিকিতে তুলে দিয়েছিল, তার পর এগিয়ে এসে খুলে দিয়েছিল পিছনের দরজা। উর্জা চুপচাপ উঠে বসেছিল গাড়িতে।
একদম প্রথমে ওইটুকু কথা আর “হ্যালো ম্যাডাম, গুডমর্নিং” ছাড়া ছেলেটা আর কিছু বলেনি।
উর্জা মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখ তুলে কয়েকবার দেখেছে ছেলেটাকে। সচরাচর এত সুন্দর ছেলে দেখা যায় না! বাবার কাছে কী কাজ করে ও? গাড়ি চালায়? নতুন ড্রাইভার?
ছোট থেকেই উর্জা জানে যে, ও প্রিভিলেজড ক্লাস। ওরকম একটা রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। সুইমিং পুল। দামি গাড়ির লাইন। বিদেশে ছুটি কাটানো । সব মিলিয়ে চিরটা কাল আরামে কেটেছে ওর। কিন্তু মনে মনে এ সব যে খুব একটা মানতে পেরেছে বা এখনও পারে উর্জা, তা নয়।
কলেজে ওর এক বান্ধবী ছিল। বিনতা। ওরা বিনি বলে ডাকত। পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল বিনি । মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। খুব ভাল র্যাঙ্ক করেছিল জয়েন্টে। আর্থিক ভাবে মেয়েটা ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ির। একটা সাধারণ সালোয়ার পরে, বিনুনি করে আসত কলেজে। এইট বি-র কাছে পিজি হিসেবে থাকত কোথায় যেন একটা। কোনও দিন ওকে সাজতে দেখেনি উর্জা। গলা তুলে কথা বলতে দেখেনি। সারাক্ষণ হাসতে দেখেছে কেবল। আর খালি গলায় কী দারুণ গান গাইত বিনি! খুব জোরজার করায় কয়েকবার শুনিয়েছিল মাত্র।
অন্য ছেলেমেয়েরা সুযোগ পেলেই উর্জাকে, একটু হলেও, টাকা নিয়ে খোঁচা দিয়ে কথা বলত। কিন্তু বিনি কোনও দিন ওরকম করত না।
বিনিকে দেখতেও যে ভাল ছিল তা নয়। কিন্তু বিনির হাসির মধ্যে, গানের মধ্যে, সাধারণ হয়ে থাকার মধ্যে কী যে একটা টান ছিল! সাহেবি গার্লস স্কুলের মেয়ে ছিল উর্জা। জীবনকে এসি-র মধ্যে বসে টিন্টেড গ্লাসের ভেতর থেকেই দেখেছে বরাবর। কিন্তু বিনির সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার পরেই ও কিছুটা হলেও আসল জীবনের মুখোমুখি হয়েছিল। বিনি একটা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের হয়ে নানান সামাজিক কাজে এদিক-ওদিক যেত বিনি। এই সূত্রে বিনির সঙ্গে বেশ কয়েকবার বন্যার সময় রিলিফের কাজে সুন্দরবন গিয়েছিল উর্জা। ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া ওড়িশায় গিয়েছিল। এমনকি, কেরলেও গিয়েছিল রিলিফ নিয়ে।
বাড়িতে মা মাঝে মাঝে এই নিয়ে আপত্তি করত। কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। আসলে মা নিজের জীবন নিয়ে খুবই ব্যস্ত। আর বাবা তো আরওই ব্যস্ত। নিজের ব্যবসা, রাজনৈতিক কাজকর্ম এবং সেই সূত্রে নানান লোকের সঙ্গে যোগাযোগ ইত্যাদি সব নিয়েই বাবা সারাক্ষণ অন্য জগতেই থাকে। তাই মোটামুটি নিজের ইচ্ছেমতোই জীবন কাটাতে পেরেছে উর্জা।
বিনির সঙ্গে বন্ধুত্বই ওকে প্রকৃত শিক্ষা দিয়েছে। ও বুঝেছে, সামান্য অর্থ সম্বল করে কী ভাবে মানুষ জীবন কাটায়! বুঝেছে, আমাদের মাথার ওপর বসে রয়েছে, যারা সমাজের ক্ষীরটুকু খেয়ে সাফ করে দিচ্ছে, তারা কীরকম ভাবে নিজেদের স্বার্থে, বৃহত্তর জনগণকে আক্ষরিক অর্থেই জীবন-জীবিকার সংগ্রাম করতে বাধ্য করছে। তারা তাদের শখ-আহ্লাদ, ক্ষমতা, অর্থ-সহ নানান উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্য সাধারণ মানুষকে রীতিমতো বোকা বানিয়ে খাটিয়ে নিচ্ছে।
সামনে এই যে ছেলেটা বসে গাড়ি চালাচ্ছে, তাকেও তো উচ্চতর ক্ষমতায় বসে থাকা লোকদের ইচ্ছে মেটানোর জন্যই সামান্য টাকার বিনিময়ে কাজ করতে হচ্ছে।
মোবাইল থেকে মুখ তুলে উর্জা আবার দেখল ছেলেটাকে। কী নাম ছেলেটার?
টিং করে মেসেজ ঢুকল একটা। উর্জা আবার মোবাইলের দিকে তাকাল। দেখল, পিটারের মেসেজ। ভাল লাগল ওর। পিটার বেশ কেয়ারিং।
পিটার ওর সঙ্গে চার বছর কাজ করেছে সাও পাওলো আর কোপেনহেগেন-এর প্রজেক্টে। খুব বন্ধু হয়ে গিয়েছে দু’জন। এই যে ওকে কলকাতায় ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে পিটার মনখারাপ করছিল। বলছিল, “তোমার সঙ্গে আবার যে কবে দেখা হবে!”
পিটারের পার্টনার হল পাকো। খুব মজার ছেলে এই পাকো। ও পেশায় মিউজিশিয়ান।
পাকো বলে, “পিটার গে না হলে আমার কোনও চান্স ছিল না। বুঝলে উর্জা, পিটার তোমার সঙ্গেই যে থাকত, সে ব্যাপারে আমি শিওর!”
বিদেশ থেকে ফেরার পথে দিল্লি হয়ে এসেছে উর্জা। সেখানে কথা হয়েছে পিটারের সঙ্গে। তখনই পিটার বলেছিল কলকাতায় পৌঁছেই যেন ওকে জানায় ৷ সেটা এখনও জানানো হয়নি। তাই পিটার নিজেই মেসেজ করেছে!
উর্জা দেখল পিটার জিজ্ঞেস করেছে, ঠিকমতো ও পৌঁছল কি না। আর এ-ও লিখেছে যে, সামনের শীতে ছুটি নিয়ে পিটার আর পাকো দু’জনেই কলকাতায় আসবে ।
সামনের শীত! উর্জার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। কী জানি কী করবে! ইউরোপে যে ভাবে করোনাভাইরাস ছড়াতে শুরু করেছে! কী যে হচ্ছে! সেই উনিশশো আঠারো সালে স্প্যানিশ ফ্ল প্যান্ডেমিকের আকার ধারণ করেছিল আর তার একশো বছর পরে করল এই ভাইরাসটা! এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গেলে সব সময় মানুষকে যুদ্ধ করতে হয়। তবে একটাই রক্ষে, কলকাতায় এখনও এর আঁচ লাগেনি ।
ভাল ভাবে যে এখানে এসে পৌঁছেছে, সেই খবরটা মেসেজ করে পিটারকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের মনেই হাসল উর্জা। যদিও এ হাসি খুব কিছু সুখের হাসি নয়। বরং কিছুটা অসহায়তার হাসি ।
উর্জা ফোনটা হাত-ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে হেলান দিয়ে বসল। জানলা দিয়ে দেখল, নতুন কলকাতা শহর যেন উপচে পড়ছে সকালের ঘষা কাচের মতো রোদে। এরই ভেতর মেলে রাখা ফিতের মতো ফ্লাইওভার। বিশাল বাক্স-বাড়ির মতো হোটেল। আলো-পিছলানো বিদেশি গাড়ি। মেঘ-ছোঁয়া হাইরাইজ়ার। সব কেমন যেন ছবির মতো লাগছে! চার বছরে অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে চারদিক।
ওর তো এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে, নানা বাধা কাটিয়ে শেষমেশ ও ফিরতে পেরেছে দেশে। আসলে গত একবছর ধরে খুব চেষ্টা করছিল ফেরার। শেষে, এই যে পারল সেটাই অনেক।
দিল্লি থেকে কলকাতা আসার ফ্লাইটে একটা স্যান্ডউইচ খেয়েছে উর্জা। খিদে পাওয়ার কথা তো নয়। কিন্তু তাও কেন কে জানে ‘চকোলেট চকোলেট’ করছে মনটা। ও জানে এই ভাবে খেলেই ওজন বেড়ে যায়। মা বলত চোখের খিদে। একা থাকতে থাকতে উর্জা নিজেকে অনেকটা কন্ট্রোল করতে শিখে গিয়েছে। কিন্তু সব সময় অত কন্ট্রোল করে থাকতে ইচ্ছে করে না।
উর্জা পাশের আর-একটা ব্যাগ খুলল এবার। তার ভেতর থেকে একটা ছোট্ট প্যাকেট বের করল। সেখান থেকে চারটে কাগজে মোড়া চকোলেট নিয়ে থমকাল একটু। তার পর সামান্য ঝুঁকে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। বলল, “এই নাও।”
ছেলেটা সামান্য চমকে উঠল যেন। তার পর আ করে মাথা ঘুরিয়ে হাসল। উর্জা দেখল, হাসলে ছেলেটিকে আরও সুন্দর দেখায়।
ছেলেটা বলল, “না ম্যাডাম। থ্যাঙ্কস!”
ছেলেটার ইংরেজি অপটু। হাসি পেল উর্জার। ও বিদেশ থেকে এসেছে বলেই কি এ ভাবে বলছে?
উর্জা বলল, “আরে নাও না। চকোলেট তো। আর আমি বাংলা জানি। আমি বাঙালি!”
ছেলেটা সামান্য ইতস্তত করে হাত বাড়াল। চকোলেটগুলো দিয়ে আবার পিছিয়ে বসল উজা। দেখল, ছেলেটা চকোলেটগুলো জামার বুক-পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।
উর্জা জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”
“আমার?” ছেলেটা সামনের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ! আর কে আছে গাড়িতে?”
“কবি,” ছেলেটা ছোট্ট করে বলল।
“কবি?” উর্জা অবাক হল সামান্য। অদ্ভুত নাম তো! “হ্যাঁ ম্যাডাম। কবি।”
উর্জা মাথা নাড়ল। দেখল, ছেলেটা পুরো নাম বলল না। আজকাল অবশ্য এটা অনেকেই বলে না। একসময় এরকম না বলতে বলতে হয়তো পদবি, উপাধি এ সব উঠেই যাবে। অনেক অনেক আগেও মানুষের নামের দ্বিতীয় অংশ থাকত না। উর্জার মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে পাণ্ডবদের পদবি কিছু ছিল কি!
উর্জা দেখল, কবি এক মনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে! ও খানিকটা জোর করেই বলল, “আমি চার বছর পরে ফিরলাম কলকাতায়। তোমায় তো আগে দেখিনি। ক’দিন হল জয়েন করেছ?”
কবি সময় নিল একটু। সামনের সিগনাল খোলা পেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল জোরে। একটা ফ্লাইওভারের দিকে এগিয়ে গেল ওদের গাড়িটা।
কবি বলল, “মাস দুয়েক ম্যাডাম।”
“তার আগে কোথায় ছিলে?” উর্জা জিজ্ঞেস করল।
কবি সময় নিল আবার। তার পর বলল, “নদিয়ার একপাশে মুক্তদহ বলে একটা গ্রামে আমাদের বাড়ি। আগে আমি সার্কাসে চাকরি করতাম। সেটা বন্ধ হয়ে যায়। তার পর এখানে এসেছি।”
“সার্কাস! হাউ ইন্টারেস্টিং!” উর্জা সামান্য উত্তেজিত হল।
সেরকম বড় কিছু নয়। ছোট সার্কাস। ওই কয়েকটা খেলা দেখানো হত!”
“তুমি কী খেলা দেখাতে?” উর্জা সামনে ঝুঁকে বসল।
কবি হাসল আবার। বলল, “আমি ওই গ্লোবের মধ্যে বাইক চালাতাম। আর চোখ বন্ধ করে শব্দ শুনে শুটিং করতাম!”
“বাপ রে!” উর্জা সামান্য জোরেই বলে ফেলল, “শব্দভেদী বান! তুমি তো ট্যালেন্টেড ছেলে! তা এই ট্যালেন্ট নিয়ে এখানে গাড়ি চালাচ্ছ কেন? না মানে, গাড়ি চালানো খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সবার নিজের নিজের স্কিল অনুযায়ী কাজের একটা ন্যায্য ব্যাপার তো থাকবে।”
কবি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তার পর বলল, “আসলে স্যর আমাকে ওঁর সঙ্গে কাল থেকে বেরোতে বলেছেন। আর শব্দ শুনে গুলি চালানো ম্যাডাম আজকের দুনিয়ায় কী কাজে লাগবে, আমি ঠিক জানি না আর কী!”
এই কথাটা শুনে উর্জা চুপ করে গেল। বাবা ওকে নিজের সঙ্গে বেরোতে বলেছে! গেল, এই ছেলেটাও গেল এবার। আর কিছু করার উপায় নেই।
বীরেন্দ্র ত্রিবেদী খুব নামী মানুষ। টাকার অভাব নেই তার। কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, রিয়েল এস্টেট থেকে শুরু করে আরও নানা ব্যবসা আছে। আর তার সঙ্গে পার্টি পলিটিক্স তো আছেই। আর আছে ক্ষমতার ব্যবহার ও অপব্যবহার!
উর্জা এ সব মানতে পারে না। কিন্তু কিছু বলতেও পারে না। তাই এ সব থেকে দূরে থাকবে বলে ও কলকাতা ছেড়ে বাইরে চলে গিয়েছিল। চোখের সামনে একটা লোক দিনের পর দিন আইন ভাঙছে। যা ইচ্ছে তাই করছে। এ সব দেখতে পারে না ও ।
উর্জা, বীরেন্দ্রকে দেখলেই বোঝে যে, লোকটা সারাক্ষণ টেনসড হয়ে আছে। যেন দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে। স্বাভাবিক। রাজনীতিতে তো নানান স বজায় রেখে চলতে হয়। ব্যালেন্স করতে হয় সব দিকে। তার সঙ্গে শত্রুও তো আছে।
টাকা আর ক্ষমতার জন্য এমন অশান্তি পালন করার কী মানে হয় কে জানে!
বীরেন্দ্রকে একবার এই নিয়ে বলেছিল উর্জা। এমনিতে বাবা খুব রাগী আর মিতভাষী। তাই সেরকম কিছু বলাও যায় না। আর বললেও খুব একটা লাভ হয় না ।
কিন্তু সেবার কোনও একটা জনসভায় গিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে ঝামেলার মাঝে পড়ে, বীরেন্দ্রর পায়ের হাড় ভেঙেছিল। ফলে বাড়িতে শুয়ে ছিল কিছুদিন ।
সেই অবস্থায় একদিন সমস্ত সাহস জুটিয়ে বীরেন্দ্রর কাছে গিয়ে বসেছিল উর্জা। তার পর বলেছিল, “এ সব ছেড়ে দিলে হয় না? এমন করে চোট পেলে! এ ভাবে থেকে কী লাভ?”
বীরেন্দ্র ওর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “যা বুঝিস না, তা নিয়ে কথা বলিস না। এই সব ঠাট চলে কী করে জানিস? টাকায় চলে। জানবি, টাকা কেউ দিয়ে না, তাকে আনতে হয়। আর আনতে গেলে নোকঝোক হবেই। কারণ, অনেকেই সেখানে থাকে। তাদের থেকে ছিনিয়ে আনতে গেলে তাই মাঝে মাঝে এমন হয়। ফিলোসফি ভাল, কিন্তু টাকার ব্যাক আপ থাকলেই একমাত্র সেটা করা যায়। বাঘের পিঠে সওয়ার হই আমরা। তাই লোকে মানে। ভয়-ভক্তি করে। বাঘের পিঠ থেকে নামলে বাঘ খেয়ে নেবে! এখন যা। আর কোনও দিন এই সব নিয়ে কিছু বলবি না। যেটা তোর কাজ নয়, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবি না! বুঝেছিস?”
বীরেন্দ্র আসলে সামন্তপ্রভু। সবাইকে দাবড়ে দমিয়ে রাখতে চায়। চায় পৃথিবীর সব কিছু ওর ইচ্ছে অনুযায়ী হবে। ওর কথাতেই পারলে চন্দ্র সূর্য উদয় হবে আর অস্ত যাবে! এরকম সব মানুষের জন্যই পৃথিবীতে যত অশান্তি আর ক্ষয়ক্ষতি! কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার এই যে, লোকগুলো এতটাই লোভী ও ক্ষমতার লিপ্সায় অন্ধ যে, পৃথিবীতে নানান অশান্তি বা ক্ষয়ক্ষতির বোধটাই তাদের নেই!
এখানে একটা ব্যাপার আছে। বাবা বলে ডাকলেও, বীরেন্দ্র ত্রিবেদী উর্জার সৎ বাবা। ওর মা, উর্জার নিজের বায়োলজিকাল বাবা মারা যাওয়ার পরে বিয়ে করেছিল বীরেন্দ্রকে। উর্জার তখন চার বছর বয়স। খুব অস্পষ্ট, ছায়া ছায়া মনে আছে ওর সেই বিয়ের স্মৃতি। মনে আছে ওর গভর্নেস ওকে নিয়ে বড় একটা ঘরের এক কোনায় পুতুল দিয়ে বসিয়ে রেখেছিল সে দিন!
মায়ের বাবা মানে উর্জার দাদু খুব বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ছিলেন। উর্জা বোঝে বীরেন্দ্র ত্রিবেদীর সঙ্গে উর্জার মায়ের বিয়েটা ছিল অনেকটা পুরনো দিনের রাজাদের রাজনৈতিক কারণে বিয়ের মতো। স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্স! দাদু মারা যাওয়ার পরে দাদুর বিশাল কারখানা, টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ় সবটাই বীরেন্দ্র পেয়েছে। তবে সেগুলোতে মা-ও সমান অংশীদার।
উর্জা, বীরেন্দ্রকে বাবা বলেই ডাকে। কিন্তু বীরেন্দ্র একটা দূরত্ব রেখে চলে সব সময়। গায়ে পড়ে কটু কথা যেমন বলে না, তেমন আবার কোলে তুলে আদরও করে না কোনও দিন। উর্জার যা দরকার, জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে করে দেয়। বাবা হিসেবে যেটুকু না করলে নয়, সেটাই করে শুধু।
মায়ের সঙ্গে বাবার কোনও দিনই বনিবনা নেই। তাই বলে ঝগড়াঝাঁটিও নেই। উর্জা বোঝে, টাকা আর কাজ ছাড়া বাবার জীবনে আর কিছু নেই। কেউ নেই। অবাক লাগে উর্জার! একটা জীবন লোকটা এমন করে কাটিয়ে দিল!
বাড়ির সামনে গাড়িটা আস্তে হল এবার। দারোয়ানরা গেট খুলে দেওয়ার পরে কবি গাড়িটা বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল।
উর্জা দেখল, গেটে দারোয়ানের সংখ্যা বেড়েছে। বাড়িটাকে আরও সাজানো হয়েছে, রং করা হয়েছে।
উর্জার কেমন একটা লাগল! মনে হল বুকের ভেতরে যেন সুইস আল্পসের মতো হাওয়া বইছে! কতদিন পরে বাড়ি এল ও!
নিজের দুটো হাত-ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে নামল উর্জা। মা দাঁড়িয়ে আছে বড় দরজার সামনে। মুখে হাসি। পাশে বহু দিনের কাজের লোক অমলা মাসি। আর তার পাশে বাড়িরই আর-একজন কাজের লোক বিন্দি! এখনও বিন্দি আছে!
উর্জা দেখল, বিন্দির মুখে চওড়া হাসি। ফর্সা মেয়েটা একটু মোটা হয়েছে। গাল দুটোও ভারী হয়েছে বেশ। ঈষৎ চাপা নাকের মাথাটা যেন একটু লাল। দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিন্দি এখানে খারাপ নেই।
অন্য কাজের লোকজন এগিয়ে এসে গাড়ি থেকে সুটকেস নামাচ্ছে এবার। উর্জা এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে।
যেতে যেতে উর্জা একবার থমকাল। পিছন দিকে তাকাল। দেখল, কবি ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়াতে যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত সরিয়ে নিল চোখ। উর্জা হাসল। তার পর বাড়ির দিকে এগোল।
বিন্দি এসে উর্জার হাত থেকে ব্যাগগুলো নিল এবার। তার পর উর্জার হাতটা ধরে নিজের গালে লাগাল। উর্জা বড় করে হেসে বলল, “এখনও পাগলি আছিস!”
উর্জার ঘরটা দোতলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের ঘরে ঢুকেই কেমন যেন একটা লাগল ওর। মনে হল আচমকাই যেন বুকের মধ্যে ভেঙে পড়ল বহু দিনের আটকে থাকা একটা ঝর্না। ওর ছোটবেলাটা এই ঘরেই কেটেছে। ওই বড় বড় জানলা। মাটি অবধি লুটোনো পর্দা। নরম বড় বিছানা। টেবিল-চেয়ার। আলমারি। সব একই রকম আছে আজও। শুধু ও-ই পালটে গিয়েছে! চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিল উর্জা। রুম ফ্রেশনারের হাল্কা গন্ধ পার করে ছোটবেলার গন্ধটাও যেন ফিরে এল কয়েক মুহূর্তের জন্য!
পায়ের জুতোটা এক পাশে খুলে বড় সোফায় পা গুটিয়ে বসল উর্জা। দেখল, মা-ও এসে দাঁড়িয়েছে। নীচে দরজার কাছে মা শুধু জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। তার পর আর কথা হয়নি।
মাকে বেশ চকচকে দেখাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, নিয়মিত চর্চার মধ্যে রাখে নিজেকে। বয়স যে পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গিয়েছে, দেখলে বোঝার উপায় নেই।
মা বসল ওর পাশে। তার পর বলল, “কী চেহারা হয়েছে তোর? খাওয়া-দাওয়া করিস না ঠিক করে আর, সানস্ক্রিন ইউজ় করিস না, না? এমন ট্যান হয়ে গিয়েছিস কেন?”
উর্জা বলল, “তুমি না! বাবা কই?”
“আর কই! কাজে!” মা কোনও মতে কথাটা বলেই যেন পাল্টাতে চাইল প্রসঙ্গ। বলল, “এখন থাকবি তো এখানে?”
উর্জা মাথা নাড়ল। মনটা একটু হলেও খারাপ হয়ে গিয়েছে। এতদিন পর ও এল আর বাবা আজও বেরিয়ে গিয়েছে! বাবার কাছে ওর যে এখনও কোনও গুরুত্ব নেই, সেটা বুঝতে পারছে ভালই।
মা বলল, “তুই এখন ক্লান্ত। রেস্ট নে। স্নান সেরে লাঞ্চ করে নে। তার পর ঘুমো। আমি একটু বেরোব। বুটিকে যেতে হবে। তা ছাড়া একটা নেল পার্লার কিনব। সেখানেও কথা বলতে হবে। ফিরে এসে আবার সন্ধেবেলা দেখা হবে, কেমন? তখন একটা ব্যাপার নিয়ে বলব কথা।”
“আবার কী ব্যাপার?” উর্জা অবাক হল।
মা বলল, “সে বলব তোকে তখন।” ,
“তখন মানে?” উর্জা মায়ের হাত ধরল, “এ সব সাসপেন্স ভাল লাগে না আমার। এখনই বলো। আমি টিভি সিরিজ় দেখছি নাকি যে, গল্পের হুক দিয়ে ছেড়ে দেবে! জানো না এমন করলে আমার অস্বস্তি হয়!”
মা একটু থমকাল। কী যেন চিন্তা করল সময় নিয়ে। তার পর বলল, “আসলে তোর বাবা ব্যাপারটা দেখছে। আমি চাইছিলাম রাতে তোর বাবার সামনেই ব্যাপারটা বলতে।”
বীরেন্দ্রর সামনে! উর্জা অবাক হল। সামান্য অস্বস্তিও হল। বীরেন্দ্র আর মা ডিভোর্স নেবে নাকি! সেটাই কি বলবে? বিশ্বাস নেই। হতেই পারে। দু’জনেই এক বাড়িতে থেকেও যেন মনে হয় দুটো আলাদা দেশে থাকে।
তবে সেটা হলে ভাল। একসঙ্গে খারাপ থাকার চেয়ে আলাদা আলাদা কেউ ভাল থাকলে সে ভাবেই তাদের থাকা উচিত। কত মানুষ যে রোজ নিজেদের মেরে ফেলে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে! 46
উর্জা ছাড়ল না। জোর দিয়ে বলল, “না, ও সব শুনব না। তুমি এখনই বলো।”
মা আরও একটু সময় নিল। তার পর বলল, “তোর বিয়ের ব্যাপারে কথা আর কী। তুই আসছিস শুনে তোর বাবা পাত্র দেখেছে। উত্তর ভারতের লোক ওঁরা। অনেক টাকা। দারুণ পলিটিকাল কানেকশন। ছেলের বাবাও খুব ইনফ্লুয়েনশিয়াল। ক্ষমতাশালী মহলে খুব দহরম-মহরম। তোর বাবা তোদের হরোস্কোপও ম্যাচ করিয়েছে। সব মিলে গিয়েছে। ব্যস। তুই একবার হ্যাঁ বললেই সব হয়ে যাবে।”
উর্জা তাকাল মায়ের দিকে। ওর মনে হল, এ ভাবে বলার কোনও মানে আছে! ও চোয়াল শক্ত করল। বুঝতে পারল আবার সেই স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্স! মায়ের জীবনটা নষ্ট করেও কি বীরেন্দ্রর শান্তি হয়নি!
আচমকা বড্ড ক্লান্ত লাগল উর্জার। চোখের পাতা যেন ভারী হয়ে এল। ও ঘরের দেওয়ালে লাগানো এসিটার দিকে তাকাল একবার। গুনগুন করে যেন কিছু বলছে যন্ত্রটা! যেন বলছে, ‘নাও, শুরু হল এবার! শুরু হল এবার!’ আর উর্জা বুঝল সেই ছোটবেলার স্মৃতি ফিরে পেয়ে ভেঙে পড়া ঝর্নার ধারাটা কে যেন কলের চাবি বন্ধ করার মতো প্যাঁচ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে! বুকের ভেতরটা মনে হল এবড়োখেবড়ো শুকনো পাথরে ভর্তি হয়ে গিয়েছে! ও ভাবল, এই অবস্থায় পড়বে বলেই কি দেশে ফিরেছিল ও!
