১৭. বিন্দি
বিন্দির কাছে একটা ছোট্ট অ্যালবাম আছে। বাড়িতে থাকার সময় ওদের চাকেরির ‘রিমঝিম’ স্টুডিয়োয় মাঝে মাঝে ফোটো তুলতে যেত ওরা। যে-ছেলেটা ছবি তুলত, সেই নগেন্দ্র পছন্দ করত বিন্দিকে। তাই দুটো বললে চারটে ছবি তুলে দিত। বাড়তি টাকা নিত না। ভাল ছেলে ছিল। কিন্তু জাতিতে মিল ছিল না ওদের। তাই নগেন্দ্র এগোয়নি বিন্দির ব্যাপারে। অবশ্য তাতে বিন্দির কিছু যায়-আসেনি। একটা মেয়ে যখন বড় হয়, কত পুরুষের মুগ্ধ আর লুব্ধ দৃষ্টি যে তাকে পার করে যেতে হয়! এ পার করার কায়দা মেয়েদের কেউ শেখায় না, তারা নিজেরাই শিখে যায়। অনেকটা গাছে ফুল আসার মতো এ সব শিক্ষাও মেয়েদের মনে নিজে থেকেই আসে।
নগেন্দ্রর দৃষ্টিও বিন্দি বুঝত। কিন্তু সেটা গায়ে মাখত না। বরং খুশি হত অতিরিক্ত ছবি পেয়ে। সেই ছবিগুলো এই অ্যালবামটায় জমিয়ে রেখেছে ও। মাঝে মাঝে এগুলো খুলে দেখে। ভাল লাগে।
চাকেরি জায়গাটা ছোট হলেও বেশ ফাঁকা আর সুন্দর। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, ওখানে আকাশ দেখা যায় অনেকটা করে। কারণ, উঁচু বাড়ি নেই একটাও। যে দু’-চারঘর ধনী আছে, তাদের বাড়ি বড়জোর দোতলা। ওদের গ্রামের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটা হল জলের ট্যাঙ্ক!
চাকেরির আকাশ খুব প্রিয় বিন্দির কাছে। দূষণ নেই। নরম নীল রঙের ভেলভেট যেন কেউ খুব ভালবেসে, যত্ন করে পেতে দিয়েছে আকাশে।
নগেন্দ্র যে ওর আর ইমলির ছবি তুলে দিত তার অনেকটাই ছিল আউটডোরে। স্টুডিয়োর মধ্যেকার ওই আঁকা দৃশ্যপটের সামনে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে তোলা ছবি নয়। নগেন্দ্রর মধ্যে একটা আর্টিস্ট ছিল। বিন্দিকে বলত, “তোমায় এত সুন্দর দেখতে, এ ভাবে স্টুডিয়োর নকল ছবির সামনে তোমায় মানায় না। তোমার জন্যই তো চাকেরিতে এত ফুল ফোটে। এমন বড় বড় গাছ মাথা তুলে দাঁড়ায়। পাখি গান গায়। তোমার জন্যই তো চাকেরির আকাশ এমন নীল। তাই তোমার ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে নেচারকে রাখতেই হবে।”
নগেন্দ্রর সেই স্টুডিয়ো এখন আর নেই। সব গুটিয়ে কানপুরে চলে গিয়েছে ও। সেখানে বড় স্টুডিয়ো খুলেছে। বিয়েও করেছে। আজকাল নাকি ভিডিয়োগ্রাফিও করে নানা অনুষ্ঠানে। একটা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কিনেছে। ফেসবুকে মাঝে মাঝে দেখে বিন্দি। না, নগেন্দ্র ফেসবুকে ওর বন্ধু নয়। তবু দেখে ও। আর ভাবে এক জাতি নয় বলে নগেন্দ্র কোনও দিন সাহস করে কিছু বলেনি বিন্দিকে। কিন্তু এখনকার দিনে সে সব না মেনে ওরা যদি বিয়ে করত! চারদিন হয়তো এলাকায় ছিছিক্কার হত, তার পর তো সব ঠান্ডা হয়ে যেত। তা হলে কি এখন এমন একটা অন্ধকূপের মধ্যে বেঁচে থাকতে হত ওকে!
অনেক সময়ে অল্প বয়সে, নিজের রূপে নিজে মুগ্ধ হয়ে নিজেকে বড্ড মহার্ঘ ভেবে নেয় মানুষ! যুক্তি বুদ্ধি কাজ করে না। নিজের লাভ-ক্ষতির বোধ তৈরি হয় না। ফলে পরের জীবনে খুব বিপদে পড়ে যায় নিজেই।
বিন্দিরও তেমন হয়েছিল। নগেন্দ্র ওকে পছন্দ করে, এটা ভেবে ভাল লাগলেও নগেন্দ্রকে ও পাত্তা দেয়নি। ওর কেবলই মনে হত কেউ না কেউ ঠিক আসবে, যাকে দেখলেই ওর মনের মধ্যে ভায়োলিন বেজে উঠবে হিন্দি সিনেমার মতো! ওর মনে হত ওর বর হবে রণবীর কপূরের মতো কেউ!
এখন এ সব ভাবলে হাসি পায়। ওর ওপর উঠে যখন মাধু হাঁসফাঁস করে, তখন সেই সব সময়ের কথা মনে পড়ে। ভাবে, নগেন্দ্র কি মাধুর চেয়ে খারাপ হত!
তবে জীবনের আরাম বা সিকিওরিটির জন্য এই সব এখন মনে হয়। বিন্দির। আসলে খুব গভীর ভাবে ভেবে দেখলে ওর নগেন্দ্রকে পছন্দই নয়। এখনও যেন মনে মনে ও রণবীর কপূরের জন্য বসে রয়েছে বলে মনে হয় ওর! হাসি পায় বিন্দির। মানুষ ধান্দা আর বেঁচে থাকার জন্য সেয়ানাগিরি করলেও, অনেক গভীরে সে চিরকালীন বোকা আর স্বপ্ন দেখা এক প্রাণী বই আর কিছু নয়।
অ্যালবামটা হাতে নিলেই কত কী যে মনে পড়ে যায় ওর! চাকেরির সেই সময়গুলো ওকে বড্ড মায়ায় জড়িয়ে রাখে। হাজার অভাব থাকলেও ইমলি আর ও কী আনন্দেই না ছিল!
ইমলি! ওঃ ইমলি! বোনের কথাটা মনে পড়তেই মাথার মধ্যে কট করে উঠল বিন্দির। শালা পেট বাঁধিয়ে বসে আছিস! হারামজাদি! দাঁতে দাঁত ঘষে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল একটা। বোনকে খুব ভালবাসে ও। কিন্তু আজকাল কেমন যেন একটা রাগ কাজ করে ওর। মনে হয় অন্যের নোংরা ও পরিষ্কার করবে কেন? কেন নিজের জীবনের দায়িত্ব ইমলি নিজে নেবে না! আর মা! সে-ই বা কীরকম! মেয়েকে ঠিক করে রাখতে পারে না, আর এখন ন্যাকামো করে ইমলিকে মেরে কুয়োয় ঝাঁপ দেবে বলে নাটক করছে! পাঁচ লাখ টাকা মুখের কথা! কী ভাবে সেটা রোজগার করবে ও? আচ্ছা, রূপবান কি সত্যি ওকে দেবে টাকাটা? ওকে কি শুধু লালুকে বীরেন্দ্রর বিরুদ্ধে উস্কে যেতে হবে? লালু, বীরেন্দ্রর ওপর রেগে গেলে লোকটার কী লাভ? আর লোকটা যে টাকা দেবে তার গ্যারান্টি কী?
তাও যদি টাকাটা পাওয়া যায়! সেটার জন্যই বিন্দি চেষ্টা করছে। কিন্তু কে এই রূপবান! কোথা থেকে এল লোকটা! বীরেন্দ্রর ক্ষতি করা যে উদ্দেশ্য, সেটা তো বুঝতে পারছে। কিন্তু কেন এমন করতে চায়? এর সঙ্গে কি বীরেন্দ্রকে মারার চেষ্টা জড়িয়ে আছে?
যাক গে যাক। বিন্দির টাকা পেলেই হল। কেন করতে চায়, কী করতে চায় ভেবে ও কী করবে! টাকা পাওয়া আর ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়া এই দুটোই ওর লক্ষ্য। আর এই দ্বিতীয় পয়েন্টটার ব্যাপারে ওকে নিশ্চয়তা দিয়েছে রূপবান। বলেছে যে, ওর কোনও অসুবিধে হবে না। কেউ কিচ্ছু জানবে না। এখন দেখা যাক কী হয়। শুধু সময়ে সময়ে রূপবানকে খবর দিয়ে যেতে হবে ওকে এই বাড়ির ব্যাপারে। আর তার সঙ্গে লালুকে উস্কে যেতে হবে।
অ্যালবাম বন্ধ করে উঠল বিন্দি। ও নিজের ঘরে থাকলেও দূরে আবছা ভাবে একটা গাড়ির আওয়াজ পেয়েছে। ম্যাডাম ফিরেছে। এবার ওকে যেতে হবে।
বিছানা থেকে নেমে পায়ে চটি গলাল বিন্দি। তার পর ওড়নাটা নিয়ে কাঁধে ফেলে কোমরেও জড়াল। ম্যাডামের জন্য কাজ শুরু হবে এবার।
ঘর থেকে বেরিয়েই ও দেখল, অমলা মাসি আসছে। অমলা মাসি এই বাড়ির অনেক পুরনো কাজের দিদি। ম্যাডাম নাকি বিয়ের সময় সঙ্গে করে এনেছিল। মহিলা ভাল। নির্ঝঞ্ঝাট।
ওকে দেখে হাসল। বলল, “ওই কুশি এল। যা।”
ম্যাডামকে এই নামে একমাত্র অমলা মাসিই ডাকে। ছোট থেকে নাকি মানুষ করেছে ম্যাডামকে। কিন্তু অমানুষ করেছে বলেই মনে হয় বিন্দির।
তবে ম্যাডাম অমলা মাসির দিকটা দেখে। এই যে মাসির ঘরের বিছানার ম্যাট্রেসটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে, সেটা অমলা মাসি একবার ম্যাডামকে বলা মাত্র ম্যাডাম নাকি লালুকে সেটা দেখতে বলেছে। বিন্দিরা কিছু বললে কিন্তু ম্যাডাম এমন চটপট কিছু করে না।
অমলা মাসির বয়স হয়েছে। সঙ্গে বেশ মোটাও। পায়ে একটা সমস্যা আছে। খুঁড়িয়ে হাঁটে। কাজও সে ভাবে করতে পারে না। দেখে কষ্ট হয় বিন্দির। কিন্তু তাও ম্যাডাম মাসিকে রেখে দিয়েছে।
করিডোর পেরিয়ে মূল বাড়িতে গেল বিন্দি। তার পর ম্যাডামের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলা।
“ম্যাডাম!” বিন্দি আলতো করে ডাকল। কে জানে, ম্যাডামের মুড কেমন আছে!
“ঘরে আয়,” ম্যাডামের গলা শুনে বিন্দি বুঝল যে, মুড ঠিকই আছে। বিন্দি ঘরে ঢুকল। সে ভাবে গরম পড়েনি এখনও। তাও এরা এসি চালিয়ে রাখে। কিসের এত গরম কে জানে এদের! টাকা থাকলে মানুষ ভূতের বিয়ে দেয়!
বিন্দি মাঝে মাঝে ভাবে, এদের কত টাকা! মানে, এত টাকা যে সারা জীবনে সেই অর্থের একটা বিরাট অংশ এমনই পড়ে থাকবে! তাতে কেউ কোনও দিন হাত দেবে না। তবু এরা অভাবী, সত্যিকারের দরকার যাদের, তাদের সাহায্য করবে না। চোখের সামনে অন্যদের কষ্ট পেতে দেখলেও এরা পুতুলের মতো মুখ ঘুরিয়ে নেবে। সত্যি, মানুষের মতো এত জঘন্য প্রাণী এই পৃথিবীতে একটাও নেই। বাঘ, সিংহ তো কখনও নিজের দরকারের বেশি কোনও কিছুতে অধিকার তৈরি করে রাখে না!
ম্যাডাম বিছানায় বসে রয়েছে। শুধু কুর্তি পরা। লেগিংস খুলে রেখেছে। ম্যাডাম জানে, এই ঘরে বিন্দি আর অমলা মাসি ছাড়া আর কেউ আসবে না এখন।
ওকে দেখে ম্যাডাম ঘুরল। বলল, “বাইরে থেকে একটু পেঁয়াজি নিয়ে আয় তো। আর সঙ্গে আলুর চপ। কত দিন খাওয়া হয় না। তোরা খেলে তোদের জন্যও আনিস।”
‘ওই বাসি মোবিলে ভাজাগুলো?” বিন্দি ভুরু কোঁচকাল, “তার চেয়ে ঠাকুরকে বলছি, বানিয়ে দেবে চট করে।”
ম্যাডাম হাসল, “খুব পেকেছিস! বাসি মোবিল! শোন, বাইরে ওদের ওই বাজে তেল, ধুলো-ময়লা আর অপরিচ্ছন্নতার জন্যই ওদের রান্নায় ওরকম টেস্ট হয়। কলেজে যখন পড়তাম, কলেজ স্ট্রিটে এরকম প্রায় রোজই খেতাম। আমার কিছু হবে না, বুঝলি? এখন যা, নিয়ে আয়। খেতে ইচ্ছে করছে। ঢোকার সময় দেখছিলাম ভাজছে। আমার জন্য দুটো পেঁয়াজি আর দুটো আলুর চপ। আর তোরা যেমন খাবি। আর ওগুলো এনে ভাল করে মুড়ি মাখবি। আম-তেল, আমচুর, পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, ঝাল চিপস আর ঝাল চানাচুর! সঙ্গে কোল্ড ড্রিঙ্কও। বুঝেছিস?”
বিন্দি মাথা নাড়ল। ম্যাডাম এমনিতে খুব নিয়মে চলে। ফিগার নিয়ে খুব সতর্ক। কিন্তু দু’-তিন মাস পর পর একদিন এরকম হাবিজাবি খায়! এই এমন সব খাবার বলল যে, শুনেই যেন বিন্দির অম্বল হয়ে গেল!
বিন্দি মাথা নাড়ল। তার পর বলল, “আচ্ছা ম্যাডাম, টাকা ধার দেয় এরকম কেউ আছে, জানেন?”
“টাকা ধার! কেন? কার লাগবে? তোর?” ম্যাডাম জিজ্ঞেস করল। “আমার লাগবে। পাঁচ লাখ। বাড়িতে পাঠাতে হবে। বাড়িতে খুব দরকার!”
ম্যাডাম ভুরু তুলল, “বাব্বা! এত টাকা! আমিই দিই। কিন্তু বাইরের লোককে। কাজের লোকদের দিই না। কত টাকা মাইনে পাস তোরা যে, শোধ দিবি?”
কথাটার মধ্যে যে তীব্র অপমান আছে সেটা এসে গায়ে বিধল বিন্দির। জ্বালা ধরাল মনে। ও চোয়াল শক্ত করল।
ম্যাডাম বলল, “থার্টিন পারসেন্ট সুদে টাকা দিই। বুঝেছিস? মানে, আমার কাছ থেকে পাঁচ লাখ নিলে তোকে আমায় সুদে-আসলে পাঁচ লাখ পঁয়ষট্টি হাজার ফেরত দিতে হবে এক বছরে। তুই মাইনে পাস ন’হাজার। মানে, বিনা মাইনেতে প্রায় সাড়ে চার বছর কাজ করলে, তবেই আসলটা শোধ হবে। সুদ তো তার পরে। বুঝেছিস? কিন্তু তত দিনে তুই যে ভেগে যাবি না, তার গ্যারান্টি কী? কো-ল্যাটারাল তো কিছু নেই তোর, তাই না!” বিন্দি অত মুখে-মুখে হিসেব বোঝে না। কিন্তু এটা বুঝল যে, ম্যাডাম টাকা দেবে না। ও দীর্ঘশ্বাসটা গোপন করল। ভেবেছিল ম্যাডাম সাহায্য করলে রূপবানকে না করে দেবে। কিন্তু ঈশ্বর চান ওকে দিয়ে এরকম কাজ করাতে। চান, ও যেন লালুকে বীরেন্দ্রর বিরুদ্ধে উস্কানি দেয় সারাক্ষণ। তাতে ও আর কী করবে! ঈশ্বরের বিরুদ্ধে তো আর ও যেতে পারে না!
বিন্দি মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে, আমি অন্য ব্যবস্থা করে নেব ম্যাডাম।”
“দেখিস, আবার চুরি-ছ্যাঁচড়ামি করিস না,” ম্যাডাম হাসল, “মজা করলাম কিন্তু। টাকা খুব খারাপ জিনিস রে বিন্দি। বাইরের লোকের সঙ্গে ব্যবসার সম্পর্ক, তাই তাদের টাকা দিই। কিন্তু ঘরের লোকরা যদি টাকা ফেরত না দেয়, তা হলে তো লোক দিয়ে তাদের ঠ্যাঙানো যায় না, না! তাই এ সবে ঢুকি না। তুই তাড়াতাড়ি চপ নিয়ে আয়। আমার খিদে পাচ্ছে। যা!”
বিন্দি জোর করে হাসল। তার পর বেরিয়ে এল ঘর থেকে। কান লাল হয়ে আছে ওর। বলে কিনা যেন চুরি না করে। এটা যে ইয়ার্কি নয়, সেটা কি আর ও বোঝে না! জানোয়ার! জানোয়ার সব! চোয়াল শক্ত করে বিন্দি চাপা গলায় গালি দিল, “রান্ডি!” বলেই থমকাল। কেউ শুনে ফেলল না তো! ও এদিক-ওদিক দেখল। না, কেউ নেই। দূরে রান্নাঘর থেকে ঠাকুরের রান্নার আওয়াজ আসছে। রাতের জন্য রুটি হচ্ছে।
মাসের শুরুতে ম্যাডাম ওকে কিছু টাকা দিয়ে রাখে। সেখান থেকেই এমন ধরনের খরচগুলো করে ও। কুর্তির পকেটে হাত দিয়ে দেখল। দুশো টাকার নোট আছে একটা। চপ হয়ে যাবে আরামসে। বাকি সব জিনিসপত্র বাড়িতে আছে। ও মনে মনে হিসেব করল, ম্যাডাম ছাড়াও অমলা মাসি-সহ কাজের পাঁচজন রয়েছে। সবার জন্য দুটো করে আনবে। ও নিজে খাবে না। চপ জিনিসটা ভাল লাগে না ওর।
ও দ্রুতপায়ে বাড়ির বাইরে এল। বাইরে সন্ধে নেমেছে বেশ কিছুক্ষণ। সাজানো বাগানের মধ্য দিয়ে পেতে রাখা পথের দু’পাশে নরম আলো জ্বলছে। কোকিল ডাকছে একটা। আর কী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে! বসন্তের হাওয়া। এই হাওয়া নাকি খারাপ। মা বলত। বলত যে, এই হাওয়ায় রোগ হয়।
এত সুন্দর হাওয়ায় রোগ! কে জানে! হবেও-বা।
বিন্দি দেখল আশপাশে কেউ নেই। ও বড় গেটের দিকে হাঁটা দিল। চপের দোকানটার সেল খুব। তবে আটটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। কে জানে পেঁয়াজি আর আলুর চপ পাবে কি না এখন।
ছ’জন দারোয়ান নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। ওকে দেখে হাসল। বিন্দি পাত্তা দিল না। সব ভুসো মাল।
ও রাস্তা পার করে অন্যদিকে গেল। ওই একটু দূরে চপের দোকান দেখা যাচ্ছে। একটা ছোট্ট ঘরের সামনে স্বামী-স্ত্রী মিলে দোকান চালায়। সকালে লুচি, কচুরিও করে। আর বিকেলে নানা রকমের চপ। সঙ্গে লাল লাল করে ভাজা মুড়ি।
বিন্দি দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। দোকানের সামনে বেশ ভিড়। অধিকাংশই কাজ থেকে ফেরা মানুষ। বাড়িতে ফেরার আগে খাবার কিনতে এসেছে!
বিন্দির বিরক্ত লাগল। এ সব চপ ও সহ্য করতে পারে না। ওর বাবা এমন হাবিজাবি খাবার আর তার সঙ্গে সস্তার মদ খেয়েই তো হঠাৎ করে চলে গেল। পেটের যে কী সাংঘাতিক অবস্থা হয়েছিল!
বিন্দি এগিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকল এবার। ওই যে মহিলা বসে রয়েছে। সামনে একটা ঝুড়ি। তাতে চপ ভেজে রাখছে পাশে বসে থাকা লোকটি। আর ঝুড়ি থেকে সেই চপ তুলে সামনের অ্যালুমিনিয়ামের ট্রে-তে ভাগ ভাগ করে রাখছে মহিলা।
বিন্দি গলা তুলে বলল, “ও দিদি, আমায় চপ দিন। পেঁয়াজ…” “আরে তুই!” ভিড়ের মধ্য থেকে লালুর গলা পেল বিন্দি।
ও দেখল, লালু ভিড়ের মধ্য থেকে মাথা বের করে ওকে দেখে হাসল। তার পর চার-পাঁচজনকে ঠেলেঠুলে লালু এসে দাঁড়াল ওর সামনে। ?” বিন্দি বলল।
“কী রে, তুই কী কিনতে এসেছিস“ক’টা করে বল। আমি কিনে দিচ্ছি। এখানে হেব্বি ভিড়। তুই পাশে দাঁড়া। এ ভাবে চাইলে আধ ঘণ্টা লেগে যাবে!”
বিন্দি বলল ক’টা করে কী কী কিনতে হবে। তার পর জিজ্ঞেস করল, “তুমিও কিনতে এসেছ?”
লালু হাসল, “হ্যাঁ। ম্যাডামের সঙ্গে গাড়ি করে ফেরার পথে দেখছিলাম। খেতে ইচ্ছে হল। তুই দাঁড়া, আমি নিয়ে আসি। মাসির সঙ্গে আমার হেভি দোস্তি। নিজেই তুলে নেব। টাকাটা দে!”
বিন্দি বলল, “তোমারটাও এর মধ্যে ধরে নিয়ো। ম্যাডাম বলেছে কেউ খেলে তারটাও নিতে। তুমি বেকার কেন নিজে পয়সা দেবে!”
“ঠিক আছে। তুই দাঁড়া। আমি চট করে আসছি,” কথাটা বলেই লালু আবার ভিড়ের মধ্যে ডুব দিল।
বিন্দি সরে এল একটু। ভিড় ভাল লাগে না ওর। বাঁচা গিয়েছে যে, লালুকে পেল এখানে। ও আশপাশে তাকাল। আলিপুরের এই জায়গাটা এমনিতে ফাঁকাই। আশপাশে গাছপালাও আছে। কয়েকটা ফ্ল্যাট থাকলেও এখানে মূলত বড় বড় পাঁচিল ঘেরা বাড়ি সব। কলকাতার এ সব জায়গায় এমন বাড়ি থাকা মানে বিরাট ব্যাপার। কোটি কোটি টাকা না থাকলে সেটা সম্ভব নয়।
বিন্দি মাঝে মাঝে ভাবে, ও পাঁচ লাখ টাকা জোটাতেই পাগল হয়ে যাচ্ছে চিন্তায়। সেখানে কী করে মানুষজন এমন কোটি কোটি টাকা রোজগার করে? ম্যাডাম বা বীরেন্দ্রর যে-কথাবার্তা কানে উড়ে, ভেসে আসে তাতে ও বোঝে যে, পলিটিক্স করাটা নাকি এখন খুব ইমপর্ট্যান্ট। তা হলেই নাকি টাকার মুখ দেখা যাবে। তাই তো নাকি এ সব লাইনে যারা থাকে, তাদের গাড়ি-বাড়িটাকাপয়সার কোনও অভাব নেই। কথাটা শুনে কেমন যেন লাগে বিন্দির। সবটা সত্যি নয় নিশ্চয়ই। সৎ মানুষও নিশ্চয়ই আছে। না হলে পৃথিবী চলছে কী করে?
প্যাঁ করে হর্ন দিয়ে একটা আকাশি নীল আর হলুদ বাস পাশ দিয়ে চলে গেল। তার হাওয়া এসে গায়ে লাগল বিন্দির। ওর যেন হুঁশ ফিরল। বাসটা একদম গায়ের ওপর দিয়ে গেল যেন। ও ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে তাতেই এই ভুল করে রাস্তায় নেমে দাঁড়ালে কী হত!
এখন ছুটির সময়। প্যাসেঞ্জার তোলার রেষারেষি আছে। বাসে বাসে এখন খুব টক্কর লাগবে। বিন্দি ফুটপাথের ওপরই একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। আর তখনই টিং-টিং শব্দ করে ফোনটা বেজে উঠল কুর্তির পকেটে।
এখন আবার কে ফোন করল? মা? কিন্তু মা তো জানে এখন কাজের সময়। মা তো রাতে ফোন করে।
বিন্দি ফোনটা বের করল। অচেনা নাম্বার। এটা আবার কার নাম্বার? সার্ভিস প্রোভাইডার কি? ধরব না ধরব না করেও ফোনটা ধরল ও। “হ্যালো?”
“বিন্দি, আমি!” কাঁপা গলাটা চিনতে পারল ও। মাধু। “এটা কার নাম্বার?” বিন্দি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল। “পাশের দোকানের মনোজের। তুমি আমার নাম্বার তো ধরছ না। তাই…
প্লিজ, কেটে দিয়ো না… প্লিজ”
কথাটা ঠিক। মাধুর নাম্বার ক’দিন হল ধরছে না ও। রাগ থেকেই ধরছে না। সে দিন সব জানার পরও কী করে ও সব লুকিয়ে ওর সঙ্গে সেক্স করল! এমন বিপদ নিয়েও ও সব পারল ও? তার মানে বিন্দি ওর কাছে একটা মাংসের তাল মাত্র! ওর বিপদআপদের কোনও মূল্যই নেই! এই সব ভাবনা থেকেই বিরক্তি এসেছে বিন্দির।
ও বলল, “কেন ফোন করেছ?”
“আই লাভ ইউ বিন্দি!” কাতর গলায় বলল মাধু।
বিন্দি খরখরে গলায় বলল, “অনেক দিন হয়নি বলে লাগাতে ইচ্ছে করছে! তাই আবার ঢ্যামনামো শুরু করেছ?”
“কী বলছ তুমি?” ফোনের ও পারে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল মাধু। “আবার শুরু করলে!” বিন্দি বিরক্ত হল, “এমন ন্যাকামো দেখলে গা জ্বলে যায় আমার! কী, চাইটা কী, সেটা ঝেড়ে কাশো!”
“কিছু চাই না,” কান্নাটা গিলে মাধু বলল কোনও মতে, “তুমি শুধু আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। না হলে মরে যাব আমি। সেক্স তো ভালবাসার প্রকাশ। তুমি না চাইলে আমি তোমায় ধরবও না। কিন্তু নিজে থেকে দূর করে দিয়ো না। আমি মরে যাব।”
একই সঙ্গে পরপর দু’বার মরে যাওয়ার কথা। বিন্দি চোয়াল শক্ত করল। এখন প্রেম নামক এই মিথ্যের বুদ্বুদটাকে ও সহ্য করতে পারছে না। ইমলিকেও ভালবাসত না ওই দুর্জয়! কী হল! এখন মাধুর সঙ্গে সহবাসে বিন্দি যদি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে, তা হলে কী হবে? মাধু কি তখন পাশে এসে দাঁড়াবে? তখন তো লেজ গুটিয়ে পালাবে। সব বোঝে বিন্দি। সবাইকে জানা হয়ে গিয়েছে ওর।
“কেউ কারও জন্য মরে না। ও সব ঢপলিং অন্যদের দিয়ো,” বিন্দি নিজের ভাষায় নিজেই অবাক হল। কলকাতায় থাকতে থাকতে ওর ভাষা কী ভাবে যে পাল্টে গেছে!
“মাইরি বলছি! মা কসম!” মাধু যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য ভাবে বলল, “তোমার মায়ের কথা মেনেই সে দিন প্রথমে কিছু বলিনি। আর তুমি আমায় এমন দোষ দিচ্ছ। বেশি ভালবাসি বলেই এমন করছ, না? আমি দেখেছি কেউ কাউকে সব দিয়ে যখন ভালবাসে, সে তখন তাকে অবহেলা করে। কষ্ট দেয়, অপমান করে। ধুলোর মতো মাটিতে মিশিয়ে দেয়। যেই বোঝে তাকে ছাড়া অন্যজনের জীবন অচল, অমনি অত্যাচার শুরু করে,” এক তোড়ে কথাগুলো বলে মাধু কেমন যেন হাঁপাল।
বিন্দির বিরক্ত লাগল। ও রাগের গলায় বলল, “জ্ঞান পেলনে কে লিয়ে ফোন কিয়া হ্যায় ক্যা? ফোন রাখো!”
“তুমি আমার সঙ্গে কথা না বললে আমার খুব কষ্ট হয়। তাই ফোন করলাম। আমি তোমায় ভালবাসি, এটা জানাতেই ফোন করলাম। প্লিজ, আমায় কষ্ট দিয়ো না।”
বিন্দি দ্রুত হিসেব করল। লোকটাকে আর টাইট দেওয়া ঠিক হবে না। কলকাতায় একমাত্র মাধুই আছে যে, বিনা প্রশ্নে ওকে নানা হেল্প করে। তা ছাড়া রূপবান যে টাকা দেবে, সেটা তো মায়ের কাছে পাঠাতেও হবে। মাধু ছাড়া কে করবে সেটা? কাকেই-বা ও অত টাকা দিয়ে ভরসা করবে? না, মাধুর ব্যাপারটা আর চুইংগামের মতো টানলে হবে না। ওর মাধুকে দরকার।
বিন্দি বলল, “ঠিক আছে। আর বলতে হবে না। বুড়োধাড়ি একটা, কথায় কথায় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে! চুপ করো এবার। ঠিক আছে আমি ফোন ধরব। তবে আর যদি দেখি কোনও ভুলভাল করেছ…”
“কোনও দিন না। কভি নেহি!”
বিন্দি বুঝল, ফোনের ও পারে সবেগে মাথা নাড়ছে মাধু। হাসি পেয়ে গেল ওর। একটা জোকার! কী করে এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল বিন্দি! কোথায় ওর রণবীর কপূর!
বিন্দি বলল, “ঠিক আছে। ফোন রাখো। কথা হবে আবার।” “আই লাভ ইউ,” ভিখিরির মতো গলায় আবার বলল মাধু। বিন্দি শব্দ করে হেসে কেটে দিল ফোনটা। ‘লাভ!’ কে কত লাভ করে আর লোকসান করে খুব জানা আছে ওর! ‘লাভ’ শুনলেই গা-পিত্তি জ্বলে বিন্দির। মাধুকে নেহাত ওর দরকার, তাই রেখে দিয়েছে পুষে রাখার মতো। না হলে কবে লাথি মেরে বের করে দিত জীবন থেকে।
“কী রে, তোর কথা হল?” পাশ থেকে লালু জিজ্ঞেস করল।
বিন্দি একটু থতমত খেয়ে গেল। খেয়ালই করেনি যে, লালু এসে দাঁড়িয়েছে। ও কি শুনেছে ওর কথা? শুনলেও বুঝেছে কি কিছু? বিন্দি দ্রুত মনে করার চেষ্টা করল, ও নিজে কতটা বলেছে।
লালু বলল, “দূর থেকে দেখছিলাম কাকে যেন ঝাড়ছিস। হেব্বি র্যালা কিন্তু তোর! আমাকে একটু শিখিয়ে দিবি, কী করে এমন র্যালায় থাকতে হয়?”
“তুমি শিখে কী করবে?” বিন্দি হাসার চেষ্টা করল।
লালু বলল, “এমন র্যালা থাকলে আমি অনেক টাকা রোজগার করতাম।”
বিন্দি, লালুর হাত থেকে চপের ঠোঙাটা নিয়ে নিল। তার পর টাকাটাও ফেরত নিয়ে গুনল। ঠিক আছে। এখানে যে কোনও চপ সাত টাকা করে দাম।
আর সময় নষ্ট করা যাবে না। ম্যাডাম রেগে যাবে। বিন্দি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। লালুও পাশে পাশে এল। লালুর হাতে একটা ছোট ঠোঙা। ও সেখান থেকে একটা পেঁয়াজি বের করে খাচ্ছে।
বিন্দি কথা ঘোরাতে বলল, “তুমি গ্রামে গিয়েছিলে, না? তা কেমন আছে বাড়ির সবাই?”
লালু হাসল, “দিব্যি আছে। তবে আমায় দেখে বিরক্ত হয়েছে খুব। তাড়াতে পারলে বাঁচে। আত্মীয়স্বজনদের মতো এমন হারামি প্রজাতি আর কিছু নেই এ পৃথিবীতে। একটা জিনিস দেখবি, রাস্তার লোকে তোকে হেল্প করবে। কিন্তু আত্মীয়রা করবে না। তারা তোর ইয়ে মেরে খাল করে সেই খালে কুমির ছেড়ে দেবে!”
বিন্দিও হাসল। এমন করে কথা বলে লালু!
লালু এদিক-ওদিক দেখে বিন্দির হাতের বাজুটা ধরে রাস্তা পার করল। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। বিন্দির কী যে ভাল লাগছে হাওয়াটা! বসন্ত এসেছে। কী যেন সেই গানটা সে দিন উর্জা গাইছিল নিজের ঘরে! হ্যাঁ মনে পড়েছে— ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। জাগ্রত মানে কী? দ্বার মানে তো সম্ভবত দরজা। কিন্তু জাগ্রত মানে? হিন্দিতে জাগ্রাতা মানে ও জানে। দেবীর পূজার জন্য সারা রাত জেগে যে অনুষ্ঠান হয়! কিন্তু জাগ্রত মানে বাংলায় ঠিক কী? বিন্দি জিজ্ঞেস করল, “জাগ্রত মানে কী গো?”
লালু অবাক হল, “ও বাবা! জাগ্রত মানে জেগে আছে। কেন?”
বিন্দি বলল, “ও কিছু না। একটা গান। সেদিন উর্জাদি গাইছিল। ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। তাই আর কী!”
“রবি ঠাকুরের গান,” একটা পেঁয়াজি শেষ করে, একটা ভেজিটেবল চপ ঠোঙা থেকে বের করল লালু। তার পর ফাঁকা ঠোঙাটা মুড়িয়ে দূরে রাখা একটা সবুজ রঙের ময়লা ফেলার ড্রামে ছুড়ে দিল।
বিন্দি বুঝল, লালু নিজের জন্য আলুর চপ নেয়নি।
লালু বলল, “রবি ঠাকুরের গান। মা-ও গাইত। জানিস, গ্রামে গিয়ে গোবিন্দ বাউলের সঙ্গে দেখা হল। গোটা যাতায়াতে এটাই একটা ভাল ঘটনা।”
“বাউল।” বিন্দি তাকাল লালুর দিকে। দেখল, লালু যেন সামান্য আনমনা হয়ে আছে।
“কত বছর পর দেখলাম। বুড়ো হয়ে গেলেও এখনও সেই হাসিখুশি আছে। বলল, মায়ায় জড়ানো খুব কষ্টের। মায়ার মতো খারাপ কিছু নেই। সত্যিই বলেছে বাউল। মায়ার মতো খারাপ সত্যি কিছু নেই। আমি হাড়ে ড়ে টের পাচ্ছি। মাঝে মাঝে ভাবি জানিস, সবাইকে তো চলে যেতেই হবে, তা-ও আমরা এ ভাবে বেঁচে থাকার জন্য আকুল কেন! কিসের মায়া সেটা! নিজের প্রাণের নাকি অন্যের সঙ্গ ছাড়া হব সেটার! বুঝতে পারি না জানিস। শুধু কষ্ট পাই। আমরা সবাই কষ্ট পাই। কষ্ট পাওয়াটাই যেন আমাদের নিয়তি।”
বিন্দি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লালুর দিকে। কী হয়েছে লালুর! এমন তো কখনও বলে না! কিসের কষ্ট ওর?
ওরা বড় গেটের কাছে চলে এসেছে।
বিন্দি বলল, “আমি যাই। ম্যাডাম না হলে রেগে যাবে আবার।”
“হ্যাঁ, চল। আমিও ঘরে যাই। দেখি, কবি এল কি না।”
বড় গেট দিয়ে ঢুকে ওরা এগোল। সামনে বড় ফাঁকা জায়গা। সেখানে বীরেন্দ্রর বড় গাড়িটা দেখল বিন্দি। মানে সাহেব এসে গিয়েছে।
লালুও দেখেছে। ও বলল, “কবিও এসেছে তা হলে। এঃ, ওর জন্য চপ আনা হল না!”
বিন্দি ঠোঙা খুলে বলল, “একটা করে পেঁয়াজি আর আলুর চপ নাও। আমি দুটো করে বেশি এনেছি। অসুবিধে হবে না।”
লালুর মুখটা খুশি খুশি হয়ে উঠল। দুটো চপ তুলে নিল, “ওরে শালা, কী গরম!”
বিন্দি কিছু বলার আগেই শুনল, “বিন্দি” বলে সাহেব ডাকছে ওকে। দূরে বড় বাড়ির সামনে সাহেব দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও দ্রুত চিন্তা করে নিল। লালু পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটাই সুযোগ।
ও চাপা গলায় লালুকে শুনিয়ে বলল, “এই জানোয়ারটা আবার ডাকছে! আমায় কী ভেবেছে!” তার পর গলা তুলে বলল, “আসছি।”
ও যাওয়ার আগে একবার তাকাল লালুর দিকে। দেখল, লালু অবাক বুঝতে পারছে না ঠিক।
হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ব্যাপারটা যেন লালুকে অমন আধখ্যাঁচড়া অবস্থায় রেখে বিন্দি দ্রুতপায়ে বড় বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
বীরেন্দ্র বাইরের জামাকাপড়েই দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিন্দি বুঝল, এইমাত্র ফিরেছে বাইরে থেকে। বীরেন্দ্র খুব একটা কথা বলে না ওর সঙ্গে। হঠাৎ আজ ডাকল কেন?
বিন্দি দেখল, দূরে বড় একটা ঝাউগাছের পাশে দাঁড়িয়ে লালু এ দিকেই তাকিয়ে আছে। বিন্দি অল্প অল্প করে যে-বিষটা পুঁতছে, সেটা কাজ করতে শুরু করেছে বলেই ওর বিশ্বাস। লালুকে আগে বলা কথার ধাঁচ, এখন ওরকম চাপা গলায় দেওয়া গালি, সবটাই লালুকে কৌতূহলী করে তুলছে।
বিন্দি গিয়ে দাঁড়াল বীরেন্দ্রর সামনে। এই জায়গায় বিশাল বড় একটা খোলা বারান্দা আছে। সাদা মার্বেলে মোড়া। সিলিং থেকে একটা সুন্দর ঝাড় ঝুলছে। নরম আলোয় মুড়ে আছে সব।
হাওয়াটা এখনও বইছে। সুন্দর একটা হাওয়া। বসন্ত জাগ্রত দ্বারে! কিন্তু এই বাড়িতে তো সে ভাবে জাগ্রত নয়! কেমন যেন ছায়া ছায়া একটা মনখারাপ আর উদ্বেগ লেগে থাকে এ বাড়ির সর্বত্র!
বীরেন্দ্রর সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াল বিন্দি। বীরেন্দ্র সারা দিন বাইরে থাকলেও ওর জামাকাপড় একদম নিখুঁত। এমনকি, এখনও পারফিউমের গন্ধে চারিদিক থইথই করছে।
বীরেন্দ্র সময় নিল একটু। তার পর গলা নামিয়ে বলল, “তোর সঙ্গে আমার একটা গোপন দরকার আছে। কাজও বলতে পারিস। তোকে কি বিশ্বাস করতে পারি?”
বিন্দি মুখ তুলে তাকাল। বাবা! সাহেবের আবার ওর সঙ্গে কী গোপন দরকার? কিন্তু সেটা বুঝতে না দিয়ে ও নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
বীরেন্দ্র বলল, “দেখ, আমরা বাবা-মায়েরা কী চাই? আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ভাল থাকুক। তাই তো? আমিও আমার মেয়ের জন্য তা চাই। কিন্তু মেয়ে আমার বেগড়বাই করছে। তাই আমি চাই উর্জা যতক্ষণ বাড়িতে থাকবে, ততক্ষণ তুই ওকে চোখে চোখে রাখবি। ও কী করে, কখন বাইরে যায়, কার সঙ্গে যায়, কখন ফেরে সব জানাবি আমায়। বুঝেছিস!”
বিন্দি কী বলবে বুঝতে পারল না। হাত তুলে অসহায় ভঙ্গি ফুটিয়ে বলল, “কিন্তু সাহেব এটা কি…”
“তুই আমার কাছে চাকরি করিস তো! যা বলব, শুনবি। বুঝেছিস?” বীরেন্দ্রর গলায় ধার!
বিন্দি অসহায় ভাব বজায় রেখে মাথা নামিয়ে নিল। তার পর মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। ও জানে দূর থেকে ওদের কথা শুনতে না পেলেও ওর শরীরের ভঙ্গিমা দেখছে লালু!
বীরেন্দ্র বলল, “সব জানাবি আমায়। ডাইরেক্ট আমায়। আর কেউ যেন এটা জানতে না পারে। মনে থাকে যেন। না উর্জা, না তোর মেমসাহেব। আমার মেয়ের ভালমন্দটা আমাকেই দেখতে হবে।”
বিন্দি মাথা নাড়ল আবার।
বীরেন্দ্র একটা দু’হাজার টাকার নোট বাড়িয়ে দিল ওর দিকে, “এটা রাখ। মাঝে মাঝে দেব। কাজে ফাঁকি দিবি না। আমি ভরসা করছি কিন্তু তোর ওপর!”
বিন্দি দ্বিধা দেখিয়ে টাকাটা নিল।
বীরেন্দ্র আর দাঁড়াল না। “বনোয়ারি, বনোয়ারি” বলে ডাকতে ডাকতে ঘরের ভেতরে চলে গেল!
বনোয়ারি বীরেন্দ্রর খাস বেয়ারা।
ওই মৃদু মায়াবী আলোর মধ্যে বিন্দি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াল। তার পর ওড়নাটা মুখে চাপা দিয়ে কান্নার মতো ভঙ্গি করল। আড়চোখে দেখল, লালু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এই দিকে। এক পা, দু’পা করে এগিয়েও আসছে।
কিন্তু না, এখনই কিছু জানাবে না ও। আরও খেলিয়ে লালুর মনে বিষ ঢোকাতে হবে। ও আর অপেক্ষা না করে কান্নার ভঙ্গিমা করেই এক হাতে ঠোঙা আর অন্য মুঠোয় টাকা আর ওড়না ধরে এক দৌড়ে ঘরের দিকে চলে গেল। সবটার মধ্যেই এটা ফোটানোর চেষ্টা করল যে, ওকে সাংঘাতিক কিছু বলা হয়েছে আর ও নিরুপায় ভাবে সেটা মেনে নিয়েছে।
বাড়ির ভেতরে গিয়ে সামান্য দাঁড়াল বিন্দি। হাসি পাচ্ছে। আবার কষ্টও হচ্ছে। কী করছে ও! লালু ওকে বোনের মতো দেখে, তাকে এ ভাবে ঠকাচ্ছে। কিন্তু বোনের মতো আর নিজের বোন অনেক আলাদা। বিন্দি জানে নিজের বোনের জন্য ওকে সব কিছু করতে হবে।
বিন্দি ভাবল রূপবান ওর অভিনয় দেখলে নির্ঘাত টাকাটা বাড়িয়ে দিত!
