২. বীরেন্দ্র
পাখিটা ডাকে। রোজ সকালবেলায় বড় জামগাছের আড়ালে বসে ডাকে পাখিটা। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে শুধু বলে, ‘খোকা হোক!’ ‘খোকা হোক!” অন্য কিছু হয়তো ডাকে, কিন্তু সেই শব্দ শুনে খোকা হোক-ই মনে বীরেন্দ্রর। আর সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যেটা কেমন যেন করে ওর। যেন হয় দেখতে পায় অনেক অনেক দূরে কে যেন বসে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওকে! কুয়াশায় আবছা হয়ে আছে চারিদিক। তার মধ্যে কোন এক দূরের বাড়ির বারান্দায় বসে ছোট্ট ছোট্ট হাত নেড়ে কে যেন ডাকছে বীরেন্দ্রকে । চোখ জ্বালা করে বীরেন্দ্রর। নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে ওর। মনে হয় কোনও দিন যদি কুয়াশাটা পার করে ওই দিকে যেতে পারত! নিজের হাতের মুঠোয় ধরতে পারত ওই ছোট্ট দুটো হাতের মুঠোকে ।
কেন যে এমন মনে হয় ওর, বীরেন্দ্র জানে না। সামান্য একটা পাখির ডাকের মধ্যে কী এমন লুকিয়ে আছে যে, তা শুনলে মনটা এমন হয়ে যায়!
বীরেন্দ্র রোজ সকালে নিজের বিছানায় শুয়ে ডাকটা শোনে। তার পর এক সময় পাখিটা থেমে যায়। কিন্তু তাও ওর কানের মধ্যে রণিত হতে থাকে সেই ডাক। মনের মধ্যে ভেসে থাকে কুয়াশায় ঢাকা সেই বারান্দা। ছোট্ট দুটো হাতের মুঠো।
এই গ্রামে চারিদিকে কত পাখি! কত রকমের ডাক তাদের! শুনতে কী যে ভাল লাগে বীরেন্দ্রর! আর কাক-চড়াই দেখতেও! কলকাতায় বা ইষ্টিকুটুম বলেও নাকি ডাকা হয়। কলকাতায় যে সাদা কালো পাখি দেখা যায়, সেগুলো দোয়েল। আর ওই মাথায় ঝুটিওয়ালাগুলো হল সিপাই বুলবুল ।
শিউলি ওকে কত কী যে শেখায়! কী করে এত সব জানল শিউলি! জিজ্ঞেস করে বীরেন্দ্র। শিউলি উত্তর দেয় না । লাজুক মুখ করে হাসে । শিউলি এই গেস্ট হাউসে আসে রান্না করতে। গেস্ট হাউসের চৌকিদার, বংশীর কাছ থেকে শুনেছে বীরেন্দ্র যে, শিউলি বড় বাড়ির মেয়ে, কিন্তু অবস্থার গতিকে ওকে এই কাজ করতে হচ্ছে! শিউলির বরের একটা ছোট্ট দোকান আছে। সেটা খুব একটা চলে না। লোকটা ভোলেভালা ধরনের। বয়সে শিউলির চেয়ে বেশ কিছুটা বড়। আর মানুষ হিসেবে নাকি খুব ভাল। আবার কবিতাও লেখে! শিউলির কাছ থেকেও ওর বরের ব্যাপারে শুনেছে বীরেন্দ্র। লোকটার হার্টে কী একটা যেন দোষ আছে। তা ছাড়াও আরও নানান শারীরিক সমস্যায় ভোগে মানুষটা।
শিউলির জন্য কষ্ট হয় বীরেন্দ্রর।
পাত্র সম্বন্ধে সে ভাবে খবরাখবর না নিয়েই বিয়েটা দেওয়া হয়েছিল ওর। বাবা-মা নেই শিউলির। তাই হয়তো এমন অবহেলা করা হয়েছিল। বাড়ির লোকেরা মাঝে মাঝে যে কী দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কাজ করে ফেলে! তার জন্য মানুষকে ভুগতে হয় সারা জীবন ।
শিউলি নানান রকমের পাখি চেনে। গাছ চেনে। ফুল চেনে ৷ রান্না করতে করতে গুনগুন করে গানও গায়। গেস্ট হাউসের টানা বারান্দায় বসে বীরেন্দ্র শুনতে পায় সেই সুর। ওর মনে হয় শিমুল তুলোর বীজের মতো হাওয়ায় উড়ছে গান। ভেসে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আলোয়। যেন প্রকৃতির জিনিস মিলিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির মধ্যেই।
আজ সকালে পাখির ডাকটা শুনে শিউলির মুখটাই মনে পড়েছে বীরেন্দ্রর। নিরুপায় একটা কষ্ট কেমন যেন কাঁটার মতো ফুটে আছে বুকের গোপনতম কোণে।
পাখিটা আর ডাকছে না। উড়ে গেছে নিশ্চয়ই। বীরেন্দ্র উঠে বসল বিছানায়। তার পর দু’হাত দিয়ে মুখটা ঘষল ভাল করে। এটা রোজ করে বীরেন্দ্র। ঘুম থেকে ওঠার পরে ওর মনটা কেমন যেন শান্ত আর নরম হয়ে থাকে। সেই ভাবটাকে ঘষে ঘষে মন থেকে তুলে ফেলে ও ।
এমন শান্ত আর নরম হয়ে থাকলে জীবন খুব কষ্ট দেয়। এটা ভাল করেই জানে বীরেন্দ্র। পৃথিবী চিরকাল লাঠির জোরের কাছে নত হয়ে থাকে। অসভ্য, মারকুটে, খারাপ লোকেদের সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। তুমি নরম হয়েছ কী, এই পৃথিবী তোমায় গিলে নেবে! তাই সকালের নরম মনকেমন করা বীরেন্দ্রকে ঘষে তুলে দেওয়াটাই ঠিক কাজ মনে হয় ওর ।
বিছানা থেকে নেমে এবার চটি পরল বীরেন্দ্র। চেয়ারের ওপর রাখা একটা পাতলা উলের চাদর তুলে নিয়ে গায়ে জড়াল। তার পর দরজা খুলে বেরোল ঘর থেকে। কাজ আছে। সাড়ে সাতটায় সুন্দরকে নিয়ে আসবে বীরেন্দ্রর লোকজন । ডিসেম্বরের শেষ এখন। হাওয়ায়, ভিতু বিড়ালের মতো জড়িয়ে আছে ঠান্ডা। রাতে ঘড়ি পরেই ঘুমোয় ও। দীর্ঘদিনের অভ্যেস। খুব দামি ঘড়ি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বীরেন্দ্র কব্জি উলটে সময় দেখল। সকাল সাতটা বাজে। চুনজলের মতো কুয়াশার পাতলা একটা সর পড়ে আছে চারিদিকে। কোথায় যেন টুপ করে শিশির পড়ার শব্দ হচ্ছে। বীরেন্দ্র বুঝল ওর মনটা আবার নরম হতে চাইছে। মনের মধ্যে ফিরে আসছে সেই পাখির ডাক।
কুয়াশার বারান্দা। নাঃ, নিজেকে আর আশকারা দেবে না। কাজের ক্ষতি হবে এতে।
বীরেন্দ্র বারান্দা থেকে আবার ঘরের মধ্যে ফিরে এল। তার পর ঘরের অন্য দিকের একটা দরজা ঠেলে বাথরুমে ঢুকল ।
কিছু পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে মুখচোখ ভাল করে তোয়ালে দিয়ে মুছে, একটা সোয়েটার গায়ে দিল বীরেন্দ্র। চুলটা আঁচড়াল। তার পর আবার খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মনটা এখন অনেক পোক্ত লাগছে। পাখির ডাকটাকে সরিয়ে দিতে পেরেছে ও। বুক ভরে শ্বাস নিল সে।
সারা দিনের জন্য এবার ও তৈরি।
বারান্দার সামনেই লন । সেই লনে নামার জন্য তিন ধাপ সিঁড়ি রয়েছে। ধীর পায়ে লনে নামল বীরেন্দ্র। গোটা গেস্ট হাউসটাই ভাড়া করে নিয়েছে ও। এখান থেকেই আপাতত পার্টির কাজকর্ম দেখাশোনা করছে।
আসলে কলকাতা থেকে এখানে মানে মুক্তদহে বীরেন্দ্রকে পাঠানো হয়েছে একটা বিশেষ কাজে। এই গ্রামটা বর্ডারের কাছে। তাই কিছুটা হলেও উপদ্রুত । চোরাচালান এখানকার একটা নিত্যদিনের ঘটনা।
সেই নিয়ে ঝামেলা লেগেই আছে । সে সব পুলিশ আর বিএসএফ দেখে। কিন্তু এখন সমস্যা অন্য জায়গায়। সেটা হল, ওদের পার্টির নাম জড়িয়ে যাচ্ছে এই ঝামেলায়। এমনকি, পার্টির নিজেদের মধ্যেকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও সবার সামনে প্রকট হয়ে পড়ছে। সুন্দর মাইতি নামে পার্টির এখানকার একজন উঠতি লিডার খুব ঝামেলা করছে।
ছেলেটা আসলে পাশের গ্রাম মুড়াপোঁতার। ওখানেই বিরোধী দলে ছিল। জগন্নাথ ঘোষ নামে ওদের যে- লিডারটা আছে, তার কাছের মানুষ ছিল। কিন্তু একটা চুরির কেসে সুন্দর ফেঁসে যায়। জগন্নাথ ওকে ছাড়াতে চাইলেও ওদের পার্টির মাথারা চায়নি সুন্দরকে ছাড়া হোক । কে জানে পার্টির অনেককেই হয়তো চটিয়ে দিয়েছিল! মানুষের স্বভাব তো সহজে পাল্টায় না ।
ছ’মাসের জেল হয়েছিল সুন্দরের।
তার পর বেরিয়ে এসেই বীরেন্দ্রদের পার্টিতে জয়েন করে। বীরেন্দ্রই ওকে এখান থেকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে রেখেছিল। ওকে পার্টির কাজে লাগিয়েছিল।
কিন্তু বছর দুয়েক আগে পার্টিই ওকে এখানে পাঠিয়েছিল এই অঞ্চলের কয়েকটা গ্রামের কাজ দেখাশোনা করার জন্য। আর এই দু’বছরেই ছেলেটা এমন বাড় বেড়েছে যে, ওকে সামলানো যাচ্ছে না।
এদিকে বিরোধী পক্ষ এই নিয়ে হল্লা শুরু করেছে খুব। পাশের মুড়াপোঁতা গ্রামটা বিরোধী পক্ষের দখলে। ওখানেই বিরোধী পক্ষের নেতা জগন্নাথ ঘোষ থাকে। জগন্নাথ খুবই ইনফ্লুয়েনশিয়াল নেতা এই অঞ্চলের। সে তো রীতিমতো কালঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছে বীরেন্দ্রদের!
এ সব এখনই না সামলাতে পারলে মুশকিল হবে খুব। সামনের বছরই লোকসভা নির্বাচন। সেখানে পার্টিকে ঠিক জায়গায় আনতে হলে সুন্দরের মতো এই সব গুন্ডাকে আপাতত দমিয়ে রাখা দরকার। না হলে বদনামের আর শেষ থাকবে না ।
কলকাতায় বীরেন্দ্রর অধীনেই পার্টির হয়ে কাজ করত সুন্দর। কিন্তু এখানে এসে মাতব্বর হয়ে গিয়েছে। এই সব জায়গায় কাঁচা পয়সা ওড়ে। পার্টির কিছু পান্ডা গোছের লোকও সুন্দরের কাছ থেকে টাকার ভাগ পায়। কিন্তু ভোট বড় বালাই। তাই ভোটের মুখে এখন পার্টির সেই লোকগুলোই বুঝতে পারছে পারছে যে, সুন্দরকে এবার থামানো দরকার। না হলে ভোটে ল্যাজেগোবরে হবে সবাই। তাই নিজেদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতেই বীরেন্দ্রকে এখানে পাঠানো হয়েছে সুন্দরকে সামলানোর জন্য । এই মুক্তদহে মাস তিনেক আছে বীরেন্দ্র । সুন্দরের সঙ্গে কথাও বলেছে কয়েকবার। সুন্দর নামেও যেমন, কথাতেও তেমনই ৷ অন্তত বীরেন্দ্রর সামনে তো বটেই।
সুন্দর বলেছে, “দাদা, আমি তো তোমার দাস, যা বলবে হয়ে যাবে। তুমি জাস্ট এখানে এসেছ। ভাল করে ছুটি কাটাও। আমি তো আছি। যখন যা লাগবে জাস্ট হাঁক দেবে একটা। সব পৌঁছে যাবে।”
না, ছুটি কাটাতে এই গ্রামে এসে পড়ে নেই বীরেন্দ্র। এটা ওর ছুটি কাটানোর জায়গা নয়। ও এখানে এসেছে পার্টির কাজে। আর এবার সেটা সুন্দরকে বোঝাতে হবে। আসলে এতদিন ভাল কথায় কিছু করা যায়নি। কারণ, সুন্দর ভাল কথা শোনার মানুষ নয়। তাই আজ অন্য ব্যবস্থা করা হবে!
“স্যর, চেয়ার এনে দেব?” বংশী এসে দাঁড়িয়েছে পাশে ।
“না,” মাথা নাড়ল বীরেন্দ্র।
“তা হলে চা এনে দেব?” বংশী আবার জিজ্ঞেস করল।
“পরে। কাজ সেরে আমি ভেতরেই যাব। তখন খাব যা খাওয়ার! তুই যা এখন ৷
“স্যর, আসলে জনাদারা এসে গিয়েছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে,” বংশী আমতা আমতা করে বলল ।
ঘড়ি দেখল দেখল বীরেন্দ্র আরে, সময়ের আগেই এসে গিয়েছে ওরা!
ও বলল, “আগে বলবি তো! পাঠিয়ে দে ওদের।”
বংশী দ্রুত চলে গেল ।
লনটা গেস্ট হাউসের পেছনের দিকে। সমান করে ছাঁটা, নরম ঘাসে মোড়া। বেশ সুন্দর গাছ দিয়ে ঘেরা। এখানে থাকলে বীরেন্দ্রর মনে হয় পৃথিবীর কোথাও কোনও সমস্যা নেই। কোনও মনখারাপ, কষ্ট বা অত্যাচার নেই।
পায়ের শব্দ শুনে এবার ঘুরে তাকাল বীরেন্দ্র। জনা আসছে। সঙ্গে আরও চারজন সঙ্গী রয়েছে। বীরেন্দ্র দেখল, জনা সুন্দরকে একরকম ঘাড় ধরে টানতে টানতেই নিয়ে আসছে। সুন্দরের মুখচোখ ফোলা । নীলচে, কালো ছোপ পড়েছে মুখে। ও বুঝল, ভালই মারধোর দেওয়া হয়েছে ছেলেটাকে।
জনা, সুন্দরকে নিয়ে এসে প্রায় ছুড়ে ফেলল লনের ঘাসে! সুন্দর শব্দ করে উপুড় হয়ে পড়ল মাটিতে। তার পর কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। সুন্দরের বুকটা হাপরের মতো উঠছে আর নামছে।
জনা, বীরেন্দ্রর সঙ্গেই থাকে সারাক্ষণ। কুড়ি-একুশ বছর বয়স। তবে দুর্দান্ত ছেলে! ভয়ডর বলে কিছু নেই। নিজের ছায়াময় যা কিছু কাজ সে সব জনাকে দিয়েই করায় বীরেন্দ্র ।
বীরেন্দ্র তাকাল জনার দিকে। জিজ্ঞেস করল, “খুব মেরেছিস নাকি?”
“হ্যাঁ দাদা,” জনা দাঁতে দাঁত ঘষল, “শুয়োরের বাচ্চা আমায় মা-বোন তুলে গালি দিচ্ছিল। আপনার মা-বোন তুলে গালি দিচ্ছিল। ওর সাহায্যেই বর্ডার দিয়ে কাফ সিরাপ, হেরোইন, চরস এ সব পাচার হচ্ছে। মেয়ে পাচারেও মদত দিচ্ছে শুয়োরের বাচ্চাটা। আর সব কাট নিজে খাচ্ছে। কাল হাতেনাতে ধরেছি। সাড়ে আট লাখ টাকা নিচ্ছিল। ধরার পরে বলে বেশ করেছে। বলে পার্টি হেডকোয়ার্টারে নালিশ করবে। তার পর অকথ্য গালি দিয়েছে সব। আমিও পাল্টা দিয়েছি শালাকে ।
“নালিশ করবই তো!” সুন্দর শোওয়া অবস্থা থেকে এবার উঠে বসল, জনার দিকে তাকিয়ে বলল, “টাকা কি আমি একা খাই? পার্টির মাথারা খায় না? সব সাধু সেজে বসে থাকা, না? হারামির দল। এখন ভোট বলে শালা আমার রোজগার বন্ধ করা! কেন রে, তোদের ভোট করতে টাকা লাগবে না! সেটা পাবি কোথা থেকে?”
“তোকে আমি বলেছিলাম চুপচাপ থাকতে, শুনিসনি কেন?” বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করল, “হ্যাঁ, ভোট তো আছেই। সামনের বছর এপ্রিলে লোকসভার ভোট। পার্টির একটা ভাবমূর্তি তো আছে না কি? এ সব নিউজ় হলে কী হবে বুঝতে পারছিস?” “পার্টির ভাবমূর্তি!” সুন্দর মুখ বেঁকাল, “সবাই জানে কে কী করে! এখানে মাসে কোটি টাকার কাছাকাছি লেনদেন হয়। সে সব ছেড়ে দেব? তোমরা কেন রাজনীতি করো জানি না আমি? তুমি আর তোমার বাবা তো এত বড় ব্যবসা চালাও রাজনীতির জোরেই! শোনো, সবাই রাজনীতিতে আসে ক্ষমতা আর টাকার জন্য। সবাই এই ক্ষমতা আর টাকাটাই চায়। আমি ও তাই চাই। কারও দেশের বা দশের ভাল করার ইচ্ছে নেই। যে যেটুকু করে সেটাও নিজের ইমেজের জন্য আর ভবিষ্যতে যাতে ভোটে জিতে ক্ষমতায় থাকতে পারে সেই স্বার্থে ।
দেশের সাধারণ লোকজন কী ভাবে আছে, আর তুমি-আমি কী ভাবে আছি দ্যাখো না! আমাদের এই লাইফ স্টাইল কি বাড়তি টাকা ছাড়া হত! পাবলিককে আমরা সবাই মুরগি করছি!”
“পাবলিককে বোকা ভাবিস না!”
বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করল, “তারাই ঠিক করে কে ক্ষমতায় আসবে কে আসবে না। তেমন অসন্তোষ হলে তারা এসে অভাব অভিযোগের কথা বলে আমাদের কাছে।
“কিচ্ছু বলে না! নেতারা যখন ভোটের আগে বাড়ি বাড়ি বা পাড়ায় পাড়ায় যায় ভোট চাইতে, সঙ্গে তোমার-আমার মতো গুন্ডাগুলোকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। তাদের সামনে সাধারণ পাবলিক কিছু বলতে পারে? পারে না। ভয়ে সব গুটিয়ে থাকে। নেতার সামনে দাঁত বের করে ধন্য হয়ে গেছে ভাব করে। আমায় পাবলিক দেখাচ্ছে! আগেকার মতো সেই চন্দ্রগুপ্তের সময় আছে নাকি যে, পাবলিক কেমন আছে জানার জন্য রাতের অন্ধকারে রাজা ছদ্মবেশে বেরোবে রাস্তায়! কিচ্ছু নেই! সব লুঠতে এসেছে। তুমি তোমার মতো লুঠছ, আমিও আমার মতো লুঠব। কেস খতম। বেশি সাধুপনা মারিয়ো না তো!” সুন্দর একটানা কথাগুলো বলে দম নিল। এত মার খেয়েও ছেলের তেজ যায়নি!
“তোকে এত কথা বলতে কে বলেছে? পার্টি থেকে বলা হয়েছে তুই একদম চুপচাপ থাকবি। সেটা শুনেও তুই পাত্তা দিচ্ছিস না! এর শাস্তি জানিস?” বীরেন্দ্র বলল, “তোকে আজ থেকে সাসপেন্ড করা হল উইথ ইমিডিয়েট এফেক্ট। চিঠি আমি নিয়েই এসেছি। আর বেশি কিছু করলে সোজা ভেতরে ভরে দেব।”
“সাসপেন্ড করবি? সাসপেন্ড! মাজাকি হচ্ছে?” সুন্দর আচমকা চিৎকার করে উঠল, “আমি ছাড়ব না তোকে। শুয়োরের বাচ্চা তোকে আমি…”
কথা শেষ করা আগেই জনা সপাটে লাথি মারল সুন্দরের পেটে। সুন্দর আঁক শব্দ করে চিত হয়ে পড়ল মাটিতে।
বীরেন্দ্র জনার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “ওকে এমন ব্যবস্থা করে দে যাতে মিনিমাম ছ’মাস হসপিটাল থেকে বেরোতে না পারে! সেই সঙ্গে পুলিশকে বলে ওকে আমি আরও বড় কেস দিচ্ছি, দাঁড়া!”
সুন্দর শুয়ে শুয়েই বলল, “ঠিক করছিস না বীরেন্দ্র। তুই ঠিক করছিস না বলে দিলাম ।”
“চল, চল…” জনা আর ওর সঙ্গের লোকজন মাটি থেকে তুলে টানতে টানতে সুন্দরকে নিয়ে সামনের গেটের দিকে এগোল ।
সুন্দর ওই অবস্থার মধ্যেও চিৎকার করে বলল, “এটা এখানেই শেষ হল না কিন্তু বীরেন্দ্র। আমি মনে রাখব এটা! তোকে ছাড়ব না! আমার কিন্তু হাতির মতো মেমরি! ছাড়ব না…
আরও হয়তো কিছু বলার ইচ্ছে ছিল সুন্দরের, কিন্তু জনারা ওর মুখ চেপে নিয়ে গেল। ছটফট করলেও অতজনের চাপে কিছু করতে পারল না সুন্দর।
বীরেন্দ্র হাতের মুঠো শক্ত করে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল । মাথার ভেতরটা রাগে দপদপ করছে ওর। ওকে হুমকি দিচ্ছে! গালাগালি করছে! তুই-তোকারি করে কথা বলছে! বড্ড বাড় বেড়েছে ছেলেটার! সুন্দরকে যে এখনই মেরে ফেলছে না সেটাই ওর বাপের ভাগ্য। বলে কিনা হাতির মতো স্মরণশক্তি! সব মনে রাখবে! রাখুক মনে। যা করার করুক । বীরেন্দ্র থোড়াই কেয়ার করে এ সব পেঁচো মাস্তানদের! জানোয়ারটার জন্য এত সুন্দর সকালটাই খারাপ হয়ে বীরেন্দ্র চোখ চোখ বন্ধ করে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল । শান্ত করতে হবে, ও জানে নিজেকে শান্ত করতেই হবে। একবার ওর রাগ বাড়তে থাকলে ও নিজের লোক পরের লোক ভাবে না । সব ছারখার করে দেয়।
জনারা চলে যাওয়ার পরে আবার শান্ত হয়ে গিয়েছে চারিদিক! । বীরেন্দ্র চোখ মেলে দেখল এবার। দেখল এবার। ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে রোদ। পাতিলেবু রঙের আলো আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। কুয়াশা কাটছে। বীরেন্দ্র জানে ঘাসের ওপর পড়ে থাকা শিশির এবার মিলিয়ে যাবে হাওয়ায়। ও ঝুঁকে পড়ে ঘাসের গায়ে হাত বোলাল একটু। হাতে জল লাগল। নাকের কাছে এসে শিশিরের গন্ধ শুঁকল ।
কলকাতায় আলিপুরে ওদের বিশাল বড় বাড়ি। বাড়ির সামনের লনটা বেশ ছড়ানো। কিন্তু সেখানে কোনও দিন শিশির পড়ার ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি ও। মনেও আসেনি এ সব ব্যাপার! বাবার সঙ্গে ব্যবসা আর পার্টির কাজ নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে সারাক্ষণ। টাকা আর ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার জন্য ট্রাপিজের খেলা দেখিয়ে গিয়েছে নিরন্তর! ওটাই তো ওর আসল জীবন। আর সত্যি বলতে কী, ওই সবই দারুণ লাগে ওর। সারাক্ষণ ওই যে একটা উত্তেজনা, এটা না থাকলে যে ও কী করত! ক্ষমতার চেয়ে সুস্বাদু জীবনে কিছুই নেই ওর কাছে। কিন্তু এখানে এসে এই ক’মাস কেমন যেন লাগছে বীরেন্দ্রর। বুঝতে পারছে খুব ধীরে হলেও কোথাও একটা বদল ঘটছে ওর মধ্যে। আর, এটা যে শুধু গ্রামের আবহাওয়ার জন্য ঘটছে, তা নয়। এই বদলের কারণ যে আসলে শিউলি, সেটা বেশ বুঝতে পারছে ও। কিন্তু মানতে মনে মনে বেশ অসুবিধে হচ্ছে। কেবলই মনে হচ্ছে, শিউলি অন্যের স্ত্রী। এ সব ঠিক হচ্ছে না একদম ৷
কিন্তু সত্যি বলতে কী ‘অন্যের স্ত্রী’ এই যুক্তি ওর নিজের মনের কাছে টিকছে না। বিবাহ তো আসলে সামাজিক একটা নিয়ম। সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য হাজার হাজার বছর আগে মানুষ প্রচলন করেছিল। কিন্তু প্রেম তো প্রাকৃতিক ঘটনা । সমাজের শুকনো চোখরাঙানো কবে তাকে আটকাতে পেরেছে! বীরেন্দ্রও তাই আটকাতে পারেনি নিজেকে। আর শিউলিও ওকে অনুমতি দিয়েছে।
আজ পর্যন্ত কোনও মহিলার প্রতি দুর্বল হয়নি বীরেন্দ্র। এই প্রেমটেম ব্যাপারগুলো ওর ন্যাকামো লাগে । ওর ধাতে নেই ও সব। কিন্তু সেখানে কেন যে শিউলিকে দেখে ওর এমনটা হল! শিউলির সঙ্গে আগে দেখা হলে হয়তো শিউলিকে নিয়েই বাকি জীবনটা কাটাতে পারত। কে বলতে পারে! কিন্তু এই যে ভুল সময়ে শিউলির সঙ্গে ওর দেখা হল, তাতেই সব গোলমাল হয়ে গেল । মনের মধ্যে সারাক্ষণ কিসের কিসের যেন উচাটন । অস্বস্তি। কিন্তু এতে বীরেন্দ্রর দোষ কোথায়! কাউকে ভাল লাগাটা তো আর ওর নিজের হাতে নেই!
আজকের পরে মুক্তদহে ওর কাজ আপাতত শেষ। বীরেন্দ্র ঠিক করল আর এখানে থাকবে না। থাকলে ও নিজেকে ঠিক রাখতে পারবে না। শিউলির কাছ থেকে ওকে দূরে চলে যেতে হবেই । ওর রাজনৈতিক কেরিয়ার, ব্যবসা, ওর জীবন— এ সব না হলে ঘেঁটে নষ্ট হয়ে যাবে ।
ভাব-ভালবাসার মতো পাতি জিনিসে জড়িয়ে পড়লে ওর হবে না। এ সবের চেয়ে অনেক ওপরে উঠতে হবে ওকে। জীবনে অনেক সাফল্য পেতে হবে। সামান্য প্রেমের জন্য এত কিছু ছাড়ার মতো বোকা ও নয়! হ্যাঁ, এর জন্য হয়তো কষ্ট হবে। কিন্তু কষ্ট তো অনেক কিছুতেই হয় মানুষের। মানুষ আবার তা কাটিয়েও ওঠে। ও নিজেও কাটিয়ে উঠবে। নিজেকে আশকারা দেবে না একদম ৷
বীরেন্দ্র ঠিক করল, কাল সকালেই বেরিয়ে পড়বে এখান থেকে। আচমকা পিছন থেকে একটা রিনঠিন শব্দ শুনল বীরেন্দ্র। আর তার পরেই কেমন একটা ফুলের গন্ধ পেল। ও জানে কে এলে এমন গন্ধ ভেসে আসে হাওয়ায়।
বীরেন্দ্র পিছন ঘুরল । দেখল, চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে শিউলি। সকালের আলোয় শিউলির মুখটা যে কী অদ্ভুত সুন্দর লাগছে! বড় বড় চোখ দুটো স্থির পদ্মের মতো যেন! বীরেন্দ্রর বুকের মধ্যে যেন বিশাল বড় এক জাহাজ ডুবে গেল নিমেষে! আর তার অভিঘাতে সারা শরীরে কেমন এক অজানা কষ্টের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল আচমকা! বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল। এমন কষ্ট নিয়েই কি সারা জীবন থাকতে হবে ওকে! কী পাপ করেছে ও! এই অদৃশ্য যন্ত্রণার বীজ, কোন পাপের শাস্তি হিসেবে ঈশ্বর পুঁতে দেন মানুষের মনে! এই কষ্ট কি তাকে সারা জীবনের মতো আচ্ছন্ন করে রাখে! ভেতরে ভেতরে সবার অলক্ষ্যে শেষ করে দেয়!
বীরেন্দ্র নিজেকে সামলানোর জন্য সময় নিল একটু। তার পর এগিয়ে গিয়ে শিউলির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিল। জোর করেই সামান্য হাসল ।
শিউলি কিন্তু হাসল না একটুও। বরং ঠোঁট টিপে দাঁড়িয়ে রইল মাথা নিচু করে ।
বীরেন্দ্রর অবাক লাগল। শিউলি কি কিছু বলবে?
ও জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? কিছু বলবে তুমি?”
শিউলি এবার মুখ তুলে তাকাল বীরেন্দ্রর দিকে। আর বীরেন্দ্র দেখল, শিউলির চোখে ভোরবেলার পাপড়ির ওপর শিশির-ফোঁটার মতো টলটল করছে জল!
বীরেন্দ্রর ইচ্ছে হল এই শিশিরটুকুও হাত দিয়ে স্পর্শ করে একবার। ঘ্রাণ নেয়। কিন্তু চারিদিকে দিনের আলো যে। সন্ধের আঁধারে ও যা পারে, দিনের আলোয় সে সব কিছু সম্ভব নয় এই জীবনে। বীরেন্দ্র বুঝতে পারল, এই শিশির বিন্দু চিরকালই অধরা থেকে যাবে ওর!
