২৬. বিন্দি
ম্যাডাম বাড়িতে নেই। কিন্তু লালু রয়েছে। ম্যাডামের কী একটা আছে। তাই বেরিয়েছে। অনেক রাত করে নাকি ফিরবে।
বাঁচা গিয়েছে। ম্যাডাম থাকা মানেই হুকুম। এটা করো, ওটা করো! এদিকে অমলা মাসি তো আছে। কিন্তু তাকে খুব কিছু বলে না। যত যেন বিন্দিকে দেখলেই মনে পড়ে!
বিন্দি মোবাইল বের করে ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছ’টা বাজে। সময় তো প্রায় হয়ে গিয়েছে। ফোনটা এলেই এখন বেরিয়ে পড়বে ও। বাড়ি থেকে যেতে মিনিট পাঁচেক মতো সময় লাগবে ।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল বিন্দি। নরম আলো জ্বলছে বাগানে। হাওয়া দিচ্ছে। এত বড় বাড়িটা কী নিঃঝুম! এটা বড়লোকদের পাড়া। এখানে এমনিতেই হই-হট্টগোল নেই। তার ওপর এত বিশাল জায়গা নিয়ে । এত গাছপালা। পাখির ডাক। সবই যেন এই নিস্তব্ধতাকে আরও তোলে।
বিন্দি উঠল। বাইরে গিয়ে বসবে এবার। মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা হচ্ছে। কখন যে আসবে! সময় তো হয়ে গিয়েছে। একবার কি ফোন করবে! সেটা ঠিক হবে না মনে হয়। কারণ, ঘণ্টাখানেক আগেই তো ফোনে কথা হয়েছিল যে, আসছে। তাই বারবার ফোন করাটা আদেখলার মতো । বিন্দির অভাব আছে, কিন্তু তাই বলে তো আর নিজেকে খেলো করা যায় না!
বিছানা থেকে নেমে পায়ে চটি গলাল ও। তার পর হাতে একটা ব্যাগ । কাপড়ের।
বিন্দি ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে বাইরের দিকে এগোল এবার। সারা বাড়ি শাস্ত। শুধু দূর থেকে টিভির শব্দ আসছে। বীরেন্দ্র আজ বাড়িতে । নিশ্চয়ই টিভি দেখছে!
বীরেন্দ্রর কথা মতো উর্জার ওপর নজর রেখেছে বিন্দি। কিন্তু কিসের জন্য যে নজর রাখছে কে জানে! উর্জা খুব শান্ত, চুপচাপ মেয়ে। ওর ওপর নজর রেখে যে কী হবে বুঝতে পারছে না। তাও সাহেব যখন বলেছে, তখন কী আর করে বিন্দি। যখনই উর্জা বাড়ি থেকে বেরোয়, বিন্দি, বীরেন্দ্রকে ফোন বা মেসেজ করে জানিয়ে দেয়। কে জানে ও উর্জার কোনও ক্ষতি করছে কি না!
মাঝে মাঝে বিন্দি ভাবে এই বাড়িতে কী যে চলছে! বীরেন্দ্রর মতো লোক ম্যাডামকে বিয়ে করেছে কেন? এ দিকে বিয়ে করলেও সম্পর্ক নেই। আর উর্জার সঙ্গে বীরেন্দ্রর সম্পর্কটা যেন কীরকম! দু’জনেই দু’জনকে এড়িয়ে থাকে। তবে ইদানীং উর্জা, বীরেন্দ্রর পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করতে আপত্তি করেছে। সেটার পরই বীরেন্দ্র রেগে গিয়েছে খুব। দু’- একবার রাগারাগি শুনেছে বিন্দি। কিন্তু ও সরে গিয়েছে দূরে। এ সব শুনতে ভাল লাগে না ওর। ও শুধু ভাবে প্রত্যেকের জীবনেই যেন অশান্তির শেষ নেই!
বিন্দি সামান্য আড়মোড়া ভাঙল। আর তখনই বাগানের কোথা থেকে যেন একটা কোকিল ডেকে উঠল। কেমন যেন শিরশির করে উঠল ওর সারা শরীর। সন্ধেবেলা কোথা থেকে ডাকছে কোকিলটা? শেষ রাতেও একদিন শুনছিল ঘুম ভেঙে। কোকিলের ডাকের মধ্যে কেমন যেন একটা গা ছমছমে ভাব আছে। ভাল লাগে না ওর। বিন্দি মাথা ঘুরিয়ে খোঁজার চেষ্টা করল পাখিটাকে। কোথায় বসে আছে ঘাপটি মেরে!
“কী রে, কোথায় যাচ্ছিস?”
বিন্দি থমকে ঘুরে তাকাল। অমলা মাসি দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সামান্য হাসি।
বিন্দি বলল, “ম্যাডাম তো নেই। তাই একটু বাগানে যাচ্ছি আর কী। ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগছে না।”
অমলা মাসি এবার হাসল বড় করে। বলল, “রাতে তো কৌশানি খাবে না। আমাদের জন্য খাবার করে নিতে বলেছে। সাহেব তো সুপ আর রুটি খাবে। আমাদের জন্য খিচুড়ি বলছি। অসুবিধে নেই তো?”
বিন্দি মাথা নাড়ল। না নেই। কিন্তু মনে মনে বিরক্ত হল। বাড়িতে যখন থাকত, তখন দাল-চাওল মিলিয়ে মা যেমন খিচুড়ি করত, এখানে তেমন খিচুড়ি হয় না। বাঙালিদের এই খিচুড়ি যেন একটু মিষ্টি। তবে এখানে দেখেছে, দাল চাওলের সঙ্গে এরা পাশে অনেকরকম ভাজা আর তরকারি নিয়ে এরা খায়। ওদের গ্রামে কিন্তু এরকম নয়। সেখানে লঙ্কা আর আচারই যথেষ্ট!
বাঙালিরা অনেক বেশি তরিজুত করে খায়। ওর মনে হয়, এ সব টাকা নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে ম্যাডাম বাঙালি বলেই এমন ধরনের খাওয়া এই বাড়িতে। তবে হ্যাঁ, বিন্দি এটাও মানে যে, বাঙালিদের মতো এমন খাওয়ার রেওয়াজ হয়তো খুব বেশি জাতির নেই!
অমলা মাসি বলল, “ঠিক আছে, আমি তা হলে বলে দিচ্ছি সেই ভাবে।”
বিন্দি আর না দাঁড়িয়ে বাড়ির বাইরে এল। আর সঙ্গে সঙ্গে এক রাশ হাওয়া এসে যেন ধুইয়ে দিল ওকে! যেন একটা অদৃশ্য ঢেউ এসে শাস্ত ঠান্ডা স্রোতে ভিজিয়ে দিল ওর সারা শরীর। আর তার সঙ্গে গুলমোহরের দু’-চারটে কচি পাতাও এসে জড়িয়ে গেল ওর চুলে। কী যে ভাল লাগল বিন্দির। কয়েক মুহূর্তের জন্য সব ভুলে গেল ও। মনে হল ও স্বাধীন! ও সুখী!
কিন্তু হাওয়া যেমন এল, তেমন চলেও গেল। যেন জল নেমে গেল অনেকক্ষণ জমে থাকার পর। আর তার পর জলের তলা থেকে যেন বেরিয়ে এল চাকেরির বাড়ি, মা, ইমলি, ইমলির না-হওয়া বাচ্চা, মাধু-সহ আরও নানা এলোমেলো কষ্ট!
বিন্দি তাকাল সামনে। হাওয়া দিচ্ছে এখনও। তবে সামান্য। ওই ফুলের গাছের মাথা নড়ছে একটু। গাছের পাতারা নড়ছে। কিন্তু সেই যে মাতন, সেই যে সব ভুলিয়ে দেওয়া সেটা আর নেই।
জীবনের যা কিছু ভাল, যা কিছু খুশির তা এমন ক্ষণস্থায়ী হয় কেন? বেঁচে থাকার অধিকাংশটাই এমন কষ্ট আর যন্ত্রণা দিয়ে মোড়া কেন?
ও দেখল, সামনে ছড়ানো নির্জন বাগানে হালকা আলো জ্বলে আছে। দারোয়ানদের ঘর থেকে ক্ষীণ স্বরে রেডিয়োর গান ভেসে আসছে। আর নরম আলতো হাওয়ায়, কাছের গুলমোহর থেকে ছোট ছোট পাতা ঝরেই চলেছে!
সময় চলে যাচ্ছে। জীবন ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু কিচ্ছু করা হল না। বিন্দির! নিজের একটা সেলাইয়ের ব্যবসার ইচ্ছে ছিল, সেটাও হল না! চাকরিতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, হল না। রণবীর কপূর না হলেও ভাল, নরম-সরম একটা ছেলের সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল, সেটাও হল না। শুধু সন্ধের মৃদু বাতাসে একলা গুলমোহরের পাতা ঝরে গেল নিজের খেয়ালে। সময় ফুরিয়ে এল!
মোবাইলটা বেজে উঠল হঠাৎ। চিন্তার পাতলা সুতোটা কেমন যেন ছিঁড়ে গেল সেই শব্দে!
সেই ফোনটা কি এল? দ্রুত মোবাইলটা কুর্তির পকেট থেকে বের করল বিন্দি। দেখল মা!
যাঃ! বিন্দির মনের উত্তেজনাটা কেমন যে বুদ্বুদের মতো ফেটে গেল! সেই ফোনটা এল না! তবে কি আসবে না ফোন !
ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগাল বিন্দি, “বলো।”
মায়ের গলাটা কেমন যেন শোনাল, “বিন্দি, কিছু হল? ইমলির যে এবার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মানে আশপাশে যে সবাই বুঝে যাবে। কুমারী মেয়ে… দেশগাঁয়ের ব্যাপার। কী যে করব! দুর্জয় আজকাল আসছে না। বলছে, টাকার ঠিক নেই যখন, তখন আর আসবে না। ভাব একবার কী রকম জানোয়ার! ইমলি কাল সারা রাত ঘুমোয়নি। খুব কান্নাকাটি করেছে। আজ আমায় তোকে ফোন করতে না করেছিল। কিন্তু এখন ও একটু দোকানে গিয়েছে। সেই ফাঁকে আমি তোকে ফোন করছি। মনের মধ্যে কী যে হচ্ছে তোকে কী করে বোঝাই! শেষে কি আমাদের মরতে হবে?”
বিন্দির মনের ভেতরটা তেতো হয়ে উঠল। মা কি ভেবেছে কলকাতায় টাকার গাছ আছে! পেড়ে নিলেই হল! পাঁচ লাখ টাকা কি মুখের কথা !
বিন্দি তাও নিজেকে সামলাল। মায়ের শরীর ভাল নেই মোটেই। ওখানে খুব চাপে আছে। তার ওপর যদি ও আবার রাগ করে কিছু বলে দেয়, তা হলে মায়ের আরও কষ্ট হবে। মায়ের প্রেশার বেড়ে গেলে খুব সমস্যা হবে। সব ফেলে ওকে তখন দেশে ছুটতে হবে। টাকাটা জোগাড় করতে হলে বিন্দিকে এখন কলকাতাতে থাকতেই হবে। এখান থেকে নড়লে আর টাকার মুখ দেখতে হবে না।
বিন্দি রাগটাকে গিলে নিল কষ্ট করে। তার পর শান্ত আর ভরসা জোগানো গলায় বলল, “মা, একদম চিন্তা কোরো না। টাকার জোগাড় হয়ে যাবে। কথা হয়ে গিয়েছে। পেয়ে যাব। তুমি ছেলের বাড়িকে বলো এক লাখ আগে দেবে। তবে টাকা দেওয়ার সময় কিন্তু সাক্ষী রেখে দেবে। পরে যেন টাকা দেয়নি বলতে না পারে। বুঝেছ? এটা মাথায় রাখবে কিন্তু।”
মা সময় নিল একটু। তার পর বলল, “বিন্দি, এত টাকা তুই পাবি কী করে?”
“সে আমি জোগাড় করছি। তুমি অত ভেবো না তো!” বিন্দি জোর করে হাসার চেষ্টা করল। ও জানে যে, মাকে তো বলছে। কিন্তু ওই রূপবান না কে সে যদি টাকা না দেয়? তা হলে? তা হলে কোন পথে টাকা জোগাড় করবে ও? শেষমেশ কি চুরিচামারি করতে হবে? ম্যাডামের গয়না কোথায় থাকে ও জানে। সেখান থেকে কি তা হলে জিনিস সরাতে হবে? না হলে তো আর কোনও উপায় দেখছে না!
মা বলল, “আচ্ছা, টাকা জোগাড়ের চক্করে আবার কোনও খারাপ কাজ করে বসিস না। আমি ঠিক করে রেখেছি, তেমন হলে ইমলিকে নিয়ে আমি কলকাতায় চলে যাব। মাধু আমায় বলেছে, ও আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। অত বড় শহর কে কাকে মনে রাখে ওখানে! তাই না?”
“মাধু বলেছে?” বিন্দির গলায় বিরক্তি, “তুমি ওর সঙ্গে এ সব নিয়ে পরামর্শ করো কেন? ও কে? কলকাতায় আসবে? আর বাড়ি? বাড়িটা কার ভরসায় ছাড়বে?”
“সে না-হয় বন্ধ থাকবে,” মা বলল, “আর খুব খারাপ অবস্থা হলে বাড়ি বিক্রি করে ইমলির বিয়ে দেব। তার পর না-হয় এখানে ঘর ভাড়া করে থেকে যাব!”
“না, বাড়ি বিক্রি করবে না!” বিন্দি জোরের সঙ্গে বলল, “কেন করবে বাড়ি বিক্রি? আর কী আছে আমাদের ওইটুকু ছাড়া? সব বেচে খাব?”
মা বলল, “কিন্তু অত টাকা! তোকে যদি খারাপ কিছু করতে হয়?”
বিন্দি বলল, “আঃ মা! কী সব বলো তুমি? কিচ্ছু হবে না। আমি বলছি তো টাকা জোগাড় হয়ে যাবে। এমন ভাবে জোগাড় করব, যাতে করে কাউকে দেনা শোধ করতে না হয়। বুঝেছ?”
“কিন্তু…” মা আবার বলতে গেল কিছু, কিন্তু তখনই ফোনের মধ্যে বিপ বিপ করে উঠল। মানে, কেউ একটা ফোন করছে!
কে ফোন করতে পারে এখন? বিন্দি দ্রুত ফোনটা কান থেকে সরিয়ে দেখল কে ফোন করছে। রূপবান!
বিন্দি মাকে বলল, “জরুরি ফোন আসছে মা। আমি রাখছি। তুমি ভেবো না। আমি দেখছি যাতে সব ঠিক থাকে। রাখলাম!”
মাকে কিছু বলতে না দিয়েই ফোনটা কেটে দিল বিন্দি। তার পর রূপবানের নাম্বার ডায়াল করল।
চারবার রিং হওয়ার পরে ফোনটা ধরল রূপবান।
বিন্দি বলল, “আমি অপেক্ষা করছিলাম আপনার জন্য। আমার তো কাজ থাকে! হুটহাট করে বেরোতে পারি না।”
রূপবান বলল, “আমি প্রায় এসে গিয়েছি। আপনি ওই চপের দোকানের কাছে আসুন। আমি জিনিসটা দিয়ে যাই!” “ঠিক আছে। আমি আসছি,” বিন্দি কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কাটল।
বিন্দি এদিক-ওদিক তাকাল। বাগানটা নিঃঝুম হয়ে আছে। সামনের গেটের কাছে দারোয়ানরা রয়েছে। তাদের অবশ্য খুব কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে যে, ওরা যেন মূল বাড়ির লোকেদের সঙ্গে দরকার ছাড়া একদম কথা না বলে।
তাই দারোয়ানদের মধ্যে অল্পবয়সি দুটো ছেলের চোখে মুগ্ধতা দেখলেও, ওরা কাজ হারানোর ভয়ে বিন্দির সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু বিন্দি রাস্তায় বেরোলে গেটে দাঁড়িয়ে যতটা দূর চোখ যায়, ততটা ওরা চোখ দিয়ে অনুসরণ করে ওকে।
বিন্দি দ্রুতপায়ে গেট দিয়ে বেরোল। চপের দোকানটা এখান থেকে একটু দূরে, গেট থেকে ভাগ্যিস দেখা যায় না। তার ওপর আবার গেটের কাছে সিসি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। তাই ওই দূরে চপের দোকানটাই ঠিক আছে। যদিও এই যে বিন্দি গেটের বাইরে যাচ্ছে, এটাও নোট করে রাখবে দারোয়ানরা। তার জন্য অবশ্য একটা উপায় ভেবে রেখেছে ও। ফেরার পথে দুটো চপ কিনে আনবে। পরে কেউ প্রশ্ন করলে বলবে যে, চপ কিনতে গিয়েছিল।
আজ রাস্তায় যেন একটু কম গাড়ি চলছে। সন্ধের পর এখানে গাড়ি কমে যায়। কিন্তু আজ যেন একটু বেশিই সব ফাঁকা! আর এখনও হাওয়া দিচ্ছে সামান্য। স্ট্রিট লাইটগুলো কেমন যেন কমলা-হলদে আলোর গুঁড়ো ছড়িয়ে দিচ্ছে শহরের মাথায়। ওদের কাচের ঢাকনার মধ্যে মৌরির মতো মৃত পোকারা জমে আছে। ফলে যতটা আলো আসার কথা, ততটা আসছে না। এখানে গাছপালা আছে ভালই। ফলে আলোর জোর অতটা বেশি পৌঁছোয় না মাটিতে।
এই আলোছায়ার মধ্যে কিছুটা যেন লুকিয়েই ওই চপের দোকানের দিকে এগিয়ে গেল বিন্দি। ও যত দোকানের দিকে যাচ্ছে, ততই ওর অদ্ভুত লাগছে। এ সব কি ঠিক করছে ও! এমন টাকার গায়ে কি অন্ধকার লেগে থাকে না!
বীরেন্দ্র আর কৌশানির কাছে ও চাকরি করে। ওদের সঙ্গে মাইনে নিয়ে কথা হওয়ার পরেই ও কাজ শুরু করেছে। ওকে কেউ বেঁধে রাখেনি। ও ইচ্ছে করলে আজই কাজ ছেড়ে চলে যেতে পারে। কেউ ওকে আটকাবে না। ওর বোন যা করেছে, তার ফলে যে অবস্থাটা তৈরি হয়েছে, তাতে তো বীরেন্দ্র বা কৌশানি দায়ী নয়। তা হলে ও কি বিশ্বাসঘাতকতা করছে না!
কিন্তু আর উপায় কী? যে-ঝামেলায় পড়েছে তাতে কী করবে ও!
এখান থেকে কাজ ছেড়ে গেলে কে এক্ষুনি কাজ দেবে ওকে? আর ওই টাকাটাই-বা দেবে কে? সেখানে এই রূপবান না কে, তাকে যেন ঈশ্বর পাঠিয়ে দিয়েছেন!
ওর কাজ শুধু লালুর মনে বীরেন্দ্রর জন্য বিদ্বেষ জাগানো। কেন এটা করতে বলছে কে জানে! আর সত্যি বলতে কী, জানতেও চায় না বিন্দি। ও ওইটুকুই করতে চায় শুধু। ওই কাজের পরিবর্তে টাকাটা পেলেই হবে। আর অন্য একটা দিক ভেবে ও নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করছে। এখানে বাবা হয়ে বীরেন্দ্র নিজেই ওকে উর্জার পেছনে নজরদারি করতে লাগিয়েছে, সেখানে ওর এ সব উচিত-অনুচিত আর ভাল খারাপ ভেবে কী হবে! মাঝে মাঝে জীবনে সমস্যা থেকে বেরোনোর জন্য যে-কাজগুলো করতে হয়, তা নিয়ে বেশি ঠিক-ভুল ভাবতে নেই।
চপের দোকানে আজও বেশ ভিড়। কিন্তু সে দিকে বেশি তাকাল না বিন্দি। কাজ সেরে ফেরার পথে না-হয় দুটো চপ কিনবে।
রূপবানকে দেখতে পেল বিন্দি। চপের দোকান থেকে একটু দূরে একটা ভুজিয়াওলার দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে চপ খাচ্ছে লোকটা!
লোকটাকে দেখেই কেমন যেন লাগে বিন্দির। মানুষটা যে সহজ লোক নয়, সেটা তো বোঝাই যায়। বীরেন্দ্রর শত্রুপক্ষের লোক, সেটাও বোঝা যায়। কিন্তু লোকটা কেমন যেন অতিরিক্ত শাস্ত। নির্লিপ্ত। কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না। কেমন যেন হলে ভাল, না হলে আরও ভাল টাইপ। যখন কথা বলে কী নরম ভাবে বলে! কোনও তাড়া নেই, উদ্বেগ নেই। ভয় নেই। ভাবনা নেই। কিন্তু তাও কথার মধ্যে কেমন যেন একটা চাপা কৰ্তৃত্ব আছে। লোকটাই যেন সব কন্ট্রোল করছে।
রূপবান ওকে দেখে হাসল। তার পর ধীর পায়ে এগিয়ে এল ওর দিকে।
বিন্দি চট করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। বাড়ির কেউ দেখে ফেলবে না তো!
রূপবান কাছে এসে ঠোঙায় হাত মুছে ঠোঙাটা পাশের একটা সবুজ ড্রামে ফেলে বলল, “আপনি ইঞ্চি থাকুন। ভয়ের কিছু নেই!”
বিন্দি নার্ভাস ভাবে হাসল। বলল, “না মানে ইয়ে… আমার ইয়েটা… সাইড ব্যাগ থেকে এবার একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ বের করল রূপবান। তার পর বলল, “এই নিন।”
বিন্দি প্লাস্টিকের ব্যাগটা হাতে ধরল। তার পর মুখটা খুলে দেখল। একটা গরম ভাপ বেরিয়ে এসে নাকে লাগল ওর। আরে, এটাও যে চপ!
ও কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “এটা তো চপের ঠোঙা! আমি বলছিলাম…”
“ওতেই সব আছে!” রূপবান বলল, “বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। একটা অজুহাত তো লাগবে। তাই আমি কয়েকটা চপ কিনে দিয়েছি। তলায় আর-একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে জিনিস আছে। দুটো পাঁচশোর বান্ডিল। পুরো এক। দেখে নিতে পারেন।”
“না না,” বিন্দি বিব্রত হল। লজ্জাও পেল!
“দেখুন এটা বিজনেস। আপনি দেখে নিলে আমি খারাপ কিছু মনে করব না।”
বিন্দি ঠোট চাটল। তার পর আমতা আমতা করে বলল, “আচ্ছা, আমি যে সত্যি লালুর ওপর কোনও প্রভাব বিস্তার করছি বা করতে পারছি, সেটা আপনি জানবেন কী করে? মানে এতগুলো টাকা…. আর লালুর সঙ্গে আপনার কি….”
রূপবান মাথা নাড়ল, “প্রথমে বলি এটা কিছুই টাকা নয়। আর আপনি কী কাজ করছেন, সেটা লালুর সঙ্গে কথা বললেই আমি বুঝে যাব। প্লাস সে দিন আপনি যে সাহায্য করেছেন তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। হচ্ছেও। তবে আপনি কিন্তু আপনার কাজটা চালিয়ে যাবেন। থামবেন না।”
বিন্দি মাথা নাড়ল। সত্যি সে দিন ও লালুকে উস্কে দিয়েছিল। বলেছিল বাড়ির বাইরে যেতে। সবটাই ছিল বিন্দির পরিকল্পনা। কারণ, তার আগের দিন রূপবানের সঙ্গে ওর এই নিয়েই কথা হয়েছিল।
রাত বারোটা নাগাদ ফোন করেছিল রূপবান ।
কাজ সেরে তখন সবে ঘরে ফিরেছিল বিন্দি। ক্লান্ত ছিল খুব। মনে হচ্ছিল জামাকাপড় পাল্টে শুয়ে পড়বে। তখনই বিছানার ওপর রাখা ফোনটা বেজে উঠেছিল।
রূপবান! এত রাতে। আবার কী দরকার পড়ল! বুকের মধ্যে কেমন একটা ভয় চমকে উঠেছিল ওর।
ফোনটা ধরে যথাসম্ভব শান্ত গলায় ও বলেছিল, “বলুন।”
রূপবান বলেছিল, “টেনশন করবেন না। আমি একটা ছোট্ট দরকারে আপনাকে ফোন করলাম।”
“না না, টেনশন করছি না,” জোর করে হেসে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছিল বিন্দি।
“কাল লালুর সঙ্গে আমার দেখা করা দরকার। কিন্তু সেটা লালুর স্বাভাবিক অবস্থায় নয়। আমি চাই আপনি ওকে কাল ইমোশনালি উত্তেজিত করে, সন্ধের পরে কোনও এক সময় রাস্তায় বের করে আনবেন। আপনার সাহেব বা মেমসাহেবের বিরুদ্ধে ওকে খেপিয়ে ওকে বের করে আনবেন। তার পর আমি যা করার করব। ”
“কাল?” বিন্দি ঘাবড়ে গিয়েছিল, “কিন্তু আমি বললেই ও যাবে কেন?” “সেটা আপনি জানেন। সেটাই তো আপনার কাজ। আপনাকে করতে হবে। কাল সন্ধের পরে। মনে থাকে যেন। রাখলাম এখন।” রূপবান কেটে দিয়েছিল ফোন!
কাল সন্ধেবেলা লালুকে বীরেন্দ্রদের ওপর উত্তেজিত করে বাড়ির বাইরে আনতে হবে। কেন? আর কী ভাবে?
মাথাটা আচমকা দপদপ করছিল ওর। এবার কী করবে ও? কী ভাবে করবে? বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে কেমন যেন ভয় ভয় করছিল। ও সামান্য একজন মানুষ, টাকার চক্করে কোন পাঁকে আটকে যাচ্ছে কে জানে। ওর কিছু হবে না তো!
তবে মনে মনে একটা ফন্দি এঁটেছিল। আর সেই মতো পরের দিন সন্ধেবেলা গিয়েছিল লালুর কাছে। ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছিল ওর দুর্দশার কথা। ক্রমশ ও লালুকে ঠেলছিল একটা খাদের দিকে। আর ওকে আরও সুবিধে করে দিয়েছিল লালু নিজে, ম্যাডামের কাছে টাকা চাইবে বলে।
বিন্দি ভালই জানে ম্যাডাম টাকা দেবে না। কিন্তু ও লালুকে ইচ্ছে করে আশা দিয়েছিল। ও জানত এই অবস্থা থেকে নিরাশ হলে ওর কাজ সহজ হয়ে যাবে। ও আগেও দেখেছে লালু আপসেট হলে খুব ঘেঁটে যায়। তাই ও জানে সেই অবস্থায় লালুকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেওয়া যায়।
আর যা ভেবেছিল ঠিক তাই হয়েছিল। কিছু পরে ম্যাডামের ঘর থেকে পুরো এলোমেলো হয়ে বেরিয়ে এসেছিল লালু। চোখে জল। হাত-পা কাঁপছিল। কী সব যেন বলছিল। ম্যাডাম নাকি ওকে খারাপ গালি দিয়েছে।
এই সুযোগ। বিন্দি ওকে এই বাড়ি থেকে কিছুক্ষণ দূরে থাকার কথা বলেছিল। বলেছিল রাস্তা থেকে একটু ঘুরে আসতে। আর শুধু তাই নয়, নিজেও ওর সঙ্গে যেতে চেয়েছিল।
কিন্তু লালু রাজি হয়নি। টলমল পায়ে একা-একাই বেরিয়ে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে। আর তখনই মোবাইল বের করে রূপবানকে ফোন করেছিল বিন্দি। বলেছিল, “লালু এই বেরোল। আপনি কি বাইরে আছেন?”
রূপবান শান্ত গলায় বলেছিল, “আমি দেখে নিচ্ছি। আপনাকে ধন্যবাদ!” আজ আবার সেই কথাটাই বলল রূপবান। বিন্দি বুঝল, সে দিন তা হলে রূপবানের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
বিন্দি প্লাস্টিকের প্যাকেটটা ভাল করে মুড়ে কাপড়ের ব্যাগে ভরল। তার পর বুকের কাছে আঁকড়ে ধরল। বলল, “বাকিটা কী ভাবে কোথায় দেবেন আমি বলে দেব।”
রূপবান মাথা নাড়ল। তার পর বলল, “লালুকে কিন্তু আরও পুশ করা দরকার। এই ব্যাপারটা ভুলবেন না।”
বিন্দি মাথা নাড়ল। তার পর আমতা আমতা করে বলল, “একটা কথা….. মানে…”
“হ্যাঁ বলুন!” রূপবান আগ্রহ নিয়ে তাকাল।
বিন্দি সময় নিল একটু। আশপাশে তাকাল। চপের দোকানে ভিড় বেশ বেড়েছে। ভুজিয়াওলার দোকানেও টুকটাক লোক হচ্ছে। এর মধ্যে কেউ চেনা বেরিয়ে যাবে না তো!
বিন্দি বলল, “মানে, ঠিক একটা কথা নয়, দুটো কথা….”
“হ্যাঁ, বলুন!”
বিন্দি বলল, “এই যে আমি যা করছি এতে কারও ক্ষতি হবে না তো? আসলে আমাদের সাহেবকে কারা যেন মারতে চেষ্টা করেছিল। তার পর থেকে সাহেব সিকিওরিটি ছাড়া বেরোয় না। তাই মানে… আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে… আমার জন্য যেন কারও খারাপ না হয় । ”
রূপবান হাসল না এবার। শাস্ত ভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। তার পর বলল, “দেখুন, খারাপ মানুষ যারা, তাদের খারাপ হবে। আর কারও কিছু না। আপনার সাহেব ভাল হলে তার খারাপ হবে না। ফলে এ সব নিয়ে ভাববেন না। আর অন্যটা?”
বিন্দি আবার সামান্য সঙ্কোচ করল। তার পর বলল, “আমি গরিব মানুষ। এ সব করছি টাকার জন্য। আপনি তো জানেন। তাই টাকাটা পাব তো? না হলে খুব অসুবিধে হবে।”
রূপবান বলল, “আমি কথা দিচ্ছি। আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমার কাছে কথার দামটাই শেষ কথা। আপনি কাজে মন দিন। সময় কম আমাদের হাতে।”
লোকটার কথায় এমন কিছু একটা আছে যে, বিন্দির বুক থেকে যেন ভার নামল। লোকটাকে দেখলে ভরসা হচ্ছে ওর। কোথায় একটা সূক্ষ্ম ভাললাগাও আসছে। কোনও কোনও মানুষ আছে, যাদের দেখলেই মনে হয় অনেকটা রোদের পর যেন গাছের ছায়া পাওয়া গেল। এই লোকটাকে দেখে আজ তেমনই মনে হচ্ছে।
বিন্দির মনে হয় মানুষ সুন্দর বা কুৎসিত তার রূপের দিক দিয়ে হয় না, হয় তার উপস্থিতি আর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এক-একজন মানুষ এক-এক রকমের আবহাওয়া নিয়ে আসে। এই লোকটিকে দেখলে মনে ভরসা হয় বিন্দির। মনে হয় লোকটা সব কিছু ঠিক করে দিতে পারে।
রূপবান বলল, “আপনি আসুন। আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমাকেও ফিরতে হবে।”
বিন্দি মাথা নাড়ল। আবার দেখল আশপাশটা। তার পর পায়ে পায়ে বাড়ির দিকে এগোল।
এখন আবার হাওয়া দিচ্ছে বেশ। হাওয়ায় একটা আলতো ঠান্ডা ভাব। বসন্ত এসেছে। তবে শীতও যেন গড়িমসি করছে যেতে!
এই রাস্তাটার দু’পাশে গাছ। ফুটপাথ ছোট। তাই মাঝে মাঝেই রাস্তায় নেমে যেতে হয়। পাশ দিয়ে হুশ করে গাড়ি বেরিয়ে যায়। বিন্দির ভয় লাগে। ও সাবধান হয়ে হাঁটলেও গাড়িচালক যদি অসাবধান হয়, তা হলেই কেলেঙ্কারি হবে!
আজ যেন একটু বেশিই সাবধান হয়ে হাঁটছে বিন্দি। বুকের কাছে ধরে রেখেছে টাকাটা। যক্ষের ধন ওর! ইমলির মুখটা মনে পড়ছে। কিন্তু মাথার মধ্যে সেই যে কট করে একটা কষ্ট হত, সেটা আর হচ্ছে না। তা হলে কি টাকার একটা সংস্থান হয়েছে বলেই কিছুটা ভরসা পাচ্ছে? তাও কোথাও এখনও একটু খটকা লাগছে। এই লোকটাকে দেখে ভরসা হয়। কিন্তু দুনিয়ায় কাউকেই কি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায়? আমরা নিজেরাই কি সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য? আমরা নিজেরাই কি মাঝে মাঝে এমন কাণ্ড করি না, যাতে নিজেরাই পরে চমকে যাই? নিজেরাই তো বুঝি না যে, আমাদের মধ্যেও এমন একটা মানুষ বসেছিল। এই যে বিন্দি যা করছে সেটা তো অবিশ্বাসের কাজ। তা হলে ও কি অন্যের কাজের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে? আসলে মানুষ নিজে যা কিছু করতে চায়, সেটা সব সময় অন্যের বেলায় মানতে পারে না। অধিকাংশ মানুষের কাছে নিজের জন্য এক নিয়ম আর বাকি সবার জন্য অন্য নিয়ম। বিন্দির নিজের কাছেও যে তাই, সেটা যেন ও আজ বুঝতে পারল।
গেটের কাছে দারোয়ানরা জটলা করছে। ওকে দেখে সরে দাঁড়াল ওরা। বিন্দি ওদের দিকে না তাকালেও বুঝল অল্পবয়সি একটা ছেলে ওকে দেখছে।
বাড়ির বাগানে গিয়ে থমকে দাঁড়াল বিন্দি। হাতের প্লাস্টিকের প্যাকেট ভরা ব্যাগটার দিকে তাকাল একবার। তার পর মনে পড়ল বীরেন্দ্র আজ বাড়িতে আছে। ও ঠোঁট কামড়ে একবার চিন্তা করল। তার পর মূল বাড়ির দিকে না গিয়ে লালুর ঘরের দিকে এগোল।
শাস্ত বাগানের মধ্যে দিয়ে সরু নদীর মতো বয়ে গিয়েছে পথ। পথের দু’পাশে ছোট ছোট আলো লাগানো। নরম হলুদ আলো মাটির দিক মুখ করে লাজুক ভাবে জ্বলে আছে। কী সুন্দর আভা চারিদিকে। এদের শুধু যে অর্থ আছে তা নয়, রুচিও আছে।
আজ ছোট্ট দোতলা বাড়িটার নীচের তলার বারান্দায় কেউ বসে নেই। জিনি কোথায় কে জানে! কিন্তু বিন্দি আর ও দিকে মন দিল না। ও পাশের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।
লালুর ঘরের দরজা খোলা। ভেতর থেকে হালকা গানের আওয়াজ আসছে। কী একটা বাংলা গান- “আমার ঘরে কোন এক পাখি / বসত করে যায়/ ধরতে গেলে দেয় না ধরা/ করি কী উপায়।”
বিন্দি সামান্য সময় দাঁড়িয়ে শুনল। তার পর দরজায় নক করল। “কে?” লালুর গলা।
“আমি বিন্দি।”
“আয়, ভেতরে আয়,” ঘরের ভেতর থেকে গানের আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল এবার।
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল বিন্দি। দেখল, বিছানার ওপর শুয়ে আছে লালু।
বিন্দি বিছানার এক পাশে বসে সাবধানে জিজ্ঞেস করল, “তোমার শরীর খারাপ?”
লালু উঠে বসে জোর করে হাসল। তার পর বলল, “না না। ম্যাডাম নেমন্তন্নে গিয়েছে। আমার ছুটি। তুই বল।”
বিন্দি ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে চপের ঠোঙাটা বের করে ওর সামনে ধরল, “খাও। তোমার জন্য আনলাম।”
লালু ঠোঙাটা নিয়ে ভেতরে দেখল। তার পর অবাক হয়ে বলল, “আরে বাবা, এত চপ! দশটা! এত আমি খাব কী করে?”
দশটা চপ! সত্যি, লোকটা এতগুলো চপ দিয়েছে কেন! বিন্দি অবাক হলেও সেটা প্রকাশ হতে দিল না। বরং বলল, “তুমি, কবিদা, জিনি, জিনির মা, সবাই খাবে।”
“ওরে বাবা!” লালু হেসে একটা চপ বের করে কামড় দিল। তার পর জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ?”
বিন্দি দ্বিধা হচ্ছে এমন অভিনয় করে বলল, “তুমি জানো তো আমায় কী করতে হয়। জানো তো… আমায় আজ সাহেব এক লাখ টাকা দিয়েছে। বাড়িতে খুব দরকার লালুদা। উপায় নেই আমার। কী করব বলো!”
বিন্দি কথাটা শেষ করে ব্যাগ ফাঁক করে ওকে দুটো পাঁচশো টাকার বান্ডিল দেখাল।
“কী!” লালু থমকে গেল। তার পর আচমকা খোলা দরজা দিয়ে চপটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “তুই… তুই… এই কারণে চপ এনেছিস! তুই মানুষ!”
“টাকাটা যে খুব দরকার,” বিন্দি করুণ মুখ করে তাকাল ওর দিকে।
তার পর বলল, “তোমায় ওরা দেবে না আমি জানি। তোমায় দিয়ে তো ওদের কোনও লাভ হবে না। কিন্তু আমায় টাকা দিয়ে তো… মানে, ওরা লোকজনকে খুশি করিয়ে কাজ বের করে আনবে। আমায় তাই দেবে। বুঝলে?”
বিন্দি কথাটা বলে লালুর দিকে তাকাল। দেখল, লালুর মুখটা রাগে উত্তেজনায় বেগুনি হয়ে গিয়েছে। চোখ লাল। যেন ফেটে পড়বে রক্ত! “হারামি শালা, শুয়োরের বাচ্চা, বেজন্মা শালা!” লালু বিড়বিড় করে গালি দিতে লাগল।
বিন্দি আলতো করে লালুর হাতে হাত রেখে বলল, “যে দেয় না তার থেকে ছিনিয়ে নিতে হয়। তুমি পারবে না লালুদা?” লালু চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “আমি নিজে না পারলেও অন্য ব্যবস্থা নেব। যে পারে তাকে দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়াব। অনেক সহ্য করেছি বিন্দি, আর নয়! একটা দুধের শিশু… না, আমি ব্যবস্থা নেব এবার। আমরা গরিব বলে যা খুশি তাই করবে! দাঁড়া দেখ, এবার কী করি!”
লালু ফুঁসতে লাগল। বিন্দি আর দাঁড়াল না। ও জানে কখন কতটুকু বলতে বা করতে হয়।
ও ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল এবার। ও জানে লালুকে ভাল ভাবে চাবি দিয়ে দিয়েছে আজ। লালুর কেন টাকা দরকার সেটা ও জানে না।
কোনও বাচ্চার কথা বলতে গিয়েও যেন বলল না। কিন্তু সে যে কারণেই দরকার হোক না কেন, সেটা গুরুতর। না হলে লালু এমন করত না। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগল বিন্দি। হাওয়া দিচ্ছে খুব। হাওয়ার টানে গাছের পাতায় ঝমঝম আওয়াজ হচ্ছে। ছোট ছোট গাছগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে যেন। বিন্দি সিঁড়ির ওপর চোখ বন্ধ করে দাঁড়াল। তার পর ভগবানের উদ্দেশে মনে মনে বলল, “ঠাকুর, আমার জীবনটা যেন ঠিক হয়ে যায়। আমার মা-বোন যেন ভাল থাকে। ঠাকুর আমার জন্য যেন কারও কোনও ক্ষতি না হয়।”
এবার চোখ খুলে আকাশের দিকে তাকাল বিন্দি। পিট পিট করছে আলো। তারা! ওর ওই পাড়ে কি বসে আছে কেউ? সে কি মনের ডাক শুনতে পায়?
বিন্দি দেখল, তারাদের নীল আলোর মাঝখান দিয়ে ছোট্ট একটা এরোপ্লেন লাল সবুজ আলো জ্বেলে দুঃখী মানুষের মতো চলে যাচ্ছে মাথা নিচু করে। কেন কে জানে আজ এত বছর পরে ওর নিজের বাবার কথা মনে পড়ল!
চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল বিন্দি। তার পর দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বড় বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
