ঘ. সত্যভাষ নাথ (বড়দিনের এক দিন আগে)
ঘ. সত্যভাষ নাথ (বড়দিনের এক দিন আগে)
কুয়াশায় আবছা হয়ে আছে চারিদিক। ঝিঁঝির শব্দ ছাড়া আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবে মশা আছে বেশ। রাস্তার পাশে মাঠ। তাতে ধান কাটার পরে নাকামানো গালের মতো খোঁচা খোঁচা গাছের গোড়া উঠে আছে। যদিও দেখা যাচ্ছে না অন্ধকারে। তবু এই পথ ওর এত চেনা যে, মনে মনে যেন সব দেখতে পাচ্ছে সেতু ।
বেশ কয়েক বছর হল পার্টির হয়ে ও এখানে এসেছে। মানুষের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। সেই জন্য কলকাতা থেকে ওকে পাঠানো হয়েছে। আর সত্যি বলতে কী, কালাচাঁদও চাইছিল যে সেতু যেন এখানে আসে।
কালাচাঁদ মানে কালাদাকে সেতু চেনে সেই কলেজের দিনগুলো থেকে। ঢোলা পাজামা, হাফ পাঞ্জাবি আর পায়ে বেল্ট লাগানো চামড়ার জুতো। বাঁ হাতে ফিল্টার ছাড়া সিগারেট। লোকটার কথায় খুব ফিল্টার ছাড়া সিগারেট। লোকটার কথায় খুব প্রভাবিত হয়েছিল সেতু। মনে হত বড় হয়ে কালাদার মতো হতে হবে। প্রায় সারাক্ষণই কালাচাঁদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত ও।
কালা বলত, “তোর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে সেতু। আমার মধ্যে নেই। আমি বড়জোর পার্টির লজিস্টিক সাপোর্ট হতে পারি। কিন্তু তুই সামনে থেকে পার্টির মুখ হতে পারিস। তবে জানবি সেখানে পৌঁছোতে হলে গ্রামে যেতে হবে তোকে। গ্রাম আমাদের দেশের ইউনিট। লক্ষ লক্ষ গ্রাম দিয়ে আমাদের এই দেশ তৈরি। গ্রাম থেকে রাজনীতিটা বুঝে ওপরে উঠতে হবে তোকে। আর সেই ওঠার ব্যাপারে কিন্তু রুথলেস হতে হবে। কাউকে দয়া করলে চলবে না। দশের ভালর জন্য এক-কে বলি দিতে হলে দিতে হবে। সেখানে আমি সামনে এলেও কিন্তু রেয়াত করবি না। বুঝেছিস?”
কালাকে অন্ধের মতো মেনেছে সেতু। তার জন্যই কলকাতা ছেড়ে, বাড়ির কথা অমান্য করে গ্রামে এসে পড়ে রয়েছে। কিন্তু তাতে কী ফল হল! ওই জ ঘোষ কী করল কালার সঙ্গে!
গলার কাছে কেমন একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে আছে। চোখ জ্বালা করছে। আর যেন অপেক্ষা করতে পারছে না। কেবলই মনে হচ্ছে কখন আসবে সেই সময়টা?
সেতু বড় ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে একটু সামনের দিকে এগোল। বেশ অন্ধকার। মাঝে মাঝে একটা-দুটো বড় গাড়ি যাচ্ছে। কিন্তু যার জন্য অপেক্ষা করছে সে কই!
“সেতুদা, সরে এসো। এক্সপোজড হয়ে যাচ্ছ,” পেছন থেকে রাজু বলে উঠল।
সেতু পেছনে তাকাল। রাজুকে আবছা দেখা যাচ্ছে। ওর গাঢ় নীল সোয়েটার আর পাঞ্জাবিটা এই অন্ধকারের সঙ্গেই মিলেমিশে গিয়েছে একদম। রাজুর গলায় উদ্বেগ। সঙ্গে কিছুটা ভয়ও।
ছেলেটা ছ’মাস হল এখানে এসেছে। গরিব বাড়ির ছেলে রাজু। মা আর ভাইয়ের সংসার। ওকে প্রতি মাসে সামান্য ক’টা টাকা দেওয়া হয় পার্টি থেকে। আঠারো-উনিশ বছর বয়স। অল্পবয়সি বলেই রাজুর উৎসাহ বেশি, আদর্শও!
হাসি পায় সেতুর। আদর্শ! কিছু কিছু শব্দ ডিকশনারিতে ভাল লাগে। আদর্শ-ও তেমনই একটা শব্দ। আসলে আদর্শ তো ওরও ছিল। কিন্তু গ্রামে এসে কাজ করতে করতে ও বুঝতে পেরেছে যে, ন্যায়নীতির বাইরে জগতের একটা নিজস্ব নিয়ম থাকে। আর দুর্ভাগ্যক্রমে হলেও পৃথিবী ওই নিয়মেই চলে। হ্যাঁ, মানুষ নিজেকে অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে আলাদা ও উন্নত বলে দাবি করলেও আসলে সে এখনও জঙ্গলের নিয়মেই চলে। যাদের ক্ষমতা বেশি তারা কম ক্ষমতার মানুষকে শোষণ করে বাঁচে। আবার সেই কম ক্ষমতার লোকেরা শোষণ করে তার চেয়ে আরও কম ক্ষমতার মানুষকে। এ এক অদ্ভুত খাদ্য শৃঙ্খল! এক অদ্ভুত ইকোসিস্টেমে বেঁচে আছে সবাই! সেই সব শোষণকে জাস্টিফাই আর লেজিটিমাইজ় করার জন্য নানান থিয়োরিও তৈরি করে মানুষ। আর সেগুলো নিজেদের বিভিন্ন মাধ্যমের দ্বারা প্রচার করে, সেই ছোট থেকেই সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে একটা অটো-রিফ্লেক্স তৈরি করে দেওয়া হয়। যাতে সে কোনও প্রশ্ন না করে সেই ধার্য করা নিয়মের যূপকাষ্ঠে মাথা দিয়ে অন্যের জন্য নিজেকে তিলতিল করে শেষ করে দেয়! কিন্তু মোদ্দা ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝলে দেখা যাবে যে, বাঘের হরিণ খাওয়ার মতো নিয়মেই এই পৃথিবী চলছে।
কালাকে এই গ্রামে এসে দেখে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল সেতু। লোকটার মধ্যেকার সেই তীব্র জ্বালাময়ী আদর্শের বদলে যেন এখন দখল করার আগ্রাসী মতবাদ এসে ভর করেছে!
সেতু জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি জগন্নাথদের পার্টির চারটে ছেলেকে বাজারের মধ্যে মেরে হাত-পা ভেঙে দিলে কেন? এমন রাজনীতি তো তুমি করতে না! ফ্যাসিজিম, পোগ্রোম এ সবের বিরুদ্ধে তুমিই তো কথা বলতে। আর এখন তুমিই ব্রুট ফোর্স ব্যবহার করছ?”
কালা হেসেছিল। পার্টি অফিসের নড়বড়ে বেঞ্চে বসে লাল চায়ে শব্দ করে চুমুক দিয়ে বলেছিল, “বুনো ঘোড়াকে মেরে-ধরে বশে আনতে হয়। তার পর 39 তাকে নিজের মতো করে ট্রেনিং দিয়ে নিতে হয়!
দেখ, পৃথিবীতে জগন্নাথরা একটা ভাবধারায় চলে, আমরা চলি আর-একটা ভাবধারায়। ক্ল্যাশ অফ আইডিয়াজ় বলতে পারিস। কিন্তু আইডিয়ার ক্ল্যাশটা বস্তুময় পৃথিবীতে মারামারিতে পরিণত হয়। ওই যে ওদের মারলাম, তার পর দেখ একটা বড় অংশের মানুষ এসে যোগ দিল আমাদের এখানে। তারা বুঝল, ক্ষমতা কোনদিকে শিফট করছে। শোন সেতু, এ ভাবেই মানুষকে বশ করতে হবে। তার পর যখন দেখব আমরা কন্ট্রোল পেয়ে গিয়েছি, তখন সমাজের উন্নতির জন্য সবাইকে সেই ভাবে ট্রেনিং দিয়ে নেব।
তাই প্রাথমিক ভাবে দখল পেতে গেলে তো ভাই রক্ত ঝরবেই। পৃথিবীর একটাও মহৎ বিপ্লব আছে যেখানে রক্তপাত হয়নি? আছে?
না, নেই।”
“কিন্তু জগন্নাথ, বিহারি এরা ভাল লোক নয় কালাদা,” সেতু চিন্তিত মুখে বলেছিল, “আর তুমি বলছ তো মানুষ শিফট করছে, কিন্তু তারা তো ♡ লোভী মানুষ। ক্ষমতার অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য দিনকে
রাত করতে পারে। তাই ক্ষমতা পাল্টাতে শুরু করেছে দেখে তারাও ডিগবাজি খেতে শুরু করেছে! এদের তো নীতিজ্ঞান নেই। শুধু ক্ষমতা আর টাকার জ্ঞান আছে। তাই না?”
কালা বলেছিল, “শোন, আমাদের সবাইকেই লাগবে। এদের দলে এনে এদের মধ্যে মানসিকতার পরিবর্তন করাতে হবে। কোনওটাই এক দিনে হবে না রে। সময় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। এটা দ্বাপর যুগ নয় যে, আঠারো দিনে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে! এ যুগের যুদ্ধ নিরন্তর। কখনও মনে মনে চলবে। কখনও চলবে শরীরে। কিন্তু চলবে। বুঝেছিস?”
সেতু বলেছিল, “তুমি একটা জিনিস ভাবো। তোমাকেও কিন্তু মেরে দিতে পারে। তুমিও কিন্তু টার্গেট। বিহারিকে আমার বিশ্বাস নেই! তোমার কিছু হয়ে গেলে কী হবে ভেবেছ?”
কালা হেসে একটা সিগারেট বের করে তার পেছন থেকে ফিল্টার ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিল, “কী হবে? মরে যাব! কে আছে আমার? মা নেই, বাবা নেই। কেউ নেই। আমার পিছুটান কিসের বল?
সেতু বলেছিল, “আমি তো আছি কালাদা। আমি তো তোমার ভাই। আমি কি নেই!”
“পাগল ছেলে!” কালার মুখটা নরম হয়ে এসেছিল। ও পকেট থেকে দেশলাই বের করে সিগারেটটা মুখে দিয়ে দেশলাই ঘষে তাতে আগুন দিয়েছিল। তার পর লম্বা টান মেরে বুকের মধ্যে ধোঁয়াটাকে আটকে রেখে বসা গলায় বলেছিল, “তোর জন্যই তো পাগলা আমি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করছি। তুই এ সব ভাবিস না। তুই রেডি হতে থাক, যেমন বলেছি। জানবি তোকে এগোতে হবে। তুই দেখতে ভাল, কথা বলতে পারিস ভাল। সাধারণ মানুষজন এমন মানুষকেই নিজের লিডার হিসেবে দেখতে চায়। তাদের বশ্যতা স্বীকার করতে চায়। বার্নার্ড শ পড়লে বুঝবি এ সব। তুই আমায় নিয়ে ভাবিস না ।”
“সেতুদা পিছিয়ে এসো,” রাজু আবার ডাকল ।
সেতু তাকাল সামনের অন্ধকার রাস্তার দিকে। অন্ধকারে থাকতে থাকতে চোখ সয়ে গিয়েছে সেতুর। কালোর মধ্যে কালো দিয়ে আঁকা গাছপালা দেখা 39 অসুবিধে হচ্ছে না। ও চোয়াল শক্ত করে তাকাল।
কোথায় লোকটা! তবে কি ভুল খবর দিল! ভেতরটা ছটফট করছে সেতুর। আজ হিসেব না মেটাতে পারলে ওর জ্বালাটা কমবে না কিছুতেই।
কালাকে যে কী নৃশংস ভাবে মেরেছিল বিহারি আর জগন্নাথ, সেটা না দেখলে ভাবা যাবে না!
এখনও দিনটার কথা মনে আছে।
যে-ঘরে ও থাকে, সেখানে একটা ছোট্ট হিটার আছে। সে দিন সকালে সেটা জ্বালিয়ে ও চায়ের ব্যবস্থা করছিল। এমন সময় পিন্টু দৌড়ে এসেছিল ওর কাছে।
পিন্টু ছেলেটা ওদের পার্টির হয়েই কাজ করে। কালার সঙ্গে থাকত সব সময়। কিন্তু গত দু’দিন জ্বর ছিল ওর। সেই কারণে বাড়িতেই ছিল।
সেই পিন্টুকে সাতসকালে অমন হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখে বেশ অবাক হয়েছিল সেতু। হাতে চায়ের ছাঁকনি নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী রে তুই? তোর না জ্বর! কী হয়েছে!”
পিন্টুর মুখটা লাল হয়ে ছিল একদম। শ্বাস পড়ছি ঘন ঘন। ও কোনও মতে বলেছিল, “ওরা… ওরা শেষ করে দিয়েছে কালাদাকে। নীলকরদের মাঠে…. কালাদাকে একদম… সেতুদা ওরা… কালাদাকে…”
কথা শেষ করতে পারেনি পিন্টু। দরজার গোড়াতেই বসে পড়ে মাটিতে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলেছিল।
হাত থেকে ছাঁকনিটা পড়ে গিয়েছিল সেতুর। বাড়ির জামাকাপড় না পাল্টেই কোনও মতে একটা চটি পায়ে গলিয়ে দৌড়েছিল সেতু।
সেতুর যেখানে বাড়ি, সেখান থেকে নীলকরদের মাঠটা বেশ কিছুটা দূরে।
সেতু মাঠে পৌঁছে দেখেছিল পুলিশ এসেছে সবে। চারিদিকে ভিড়। দ্রুতহাতে সেই ভিড় সরিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল সেতু। তার পর যা দেখেছিল তাতে শিউরে উঠেছিল একদম।
সেতু দেখেছিল কালার শরীরের একটা দিক পড়ে রয়েছে বড় রাস্তার এক পাশে মাঠের একধারে। আর মাথাটা অন্য পাশে একটা বাবলা গাছের ডালে ঝুলছে!
সবাই জানত কে এটা করেছে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ নেই। তাই কয়েকমাস তদন্ত-তদন্ত খেলার পরে সব নিভে গিয়েছিল।
কিন্তু সেতুর বুকের মধ্যেকার সেই আগুনের জ্বালাটা আজও নেভেনি। কালাকে ও দাদা হিসেবেই মানত। তাকে কেউ এ ভাবে মেরে মাথা কেটে গাছে টাঙিয়ে দিয়ে যাবে, আর সেটা নিয়ে কেউ কিছু করবে না! সামান্য একটা ছয়ের পাতায় দশ লাইনের খবর হয়ে থেকে যাবে নাকি কালাদা! গ্রামের দুটো শোকসভা হবে। তার পর সব যে যার মতো ভুলে যাবে। এত কিছু দেখার পরেও সেতু এটা মেনে নেবে! এটা সম্ভব!
সেতু কলকাতাতেও হাইকম্যান্ডের সঙ্গে কথা বলেছিল। কিন্তু সেখান থেকেও বলা হয়েছিল যে, এখন যেন চুপচাপ থাকে ও।
সেই নিরবতা যেন বধির করে দিয়েছিল সেতুকে। পিন্টু এসে ওকে জিজ্ঞেস করত, এর কিছু কি বিহিত হবে না? জিজ্ঞেস করত, এ ভাবে আর কতদিন?
সেত চোখের সামনে দেখত জগন্নাথ ঘরে বেড়াচ্ছে।
সেতু চোখের সামনে দেখত জগন্নাথ ঘুরে বেড়াচ্ছে। সভা করছে। লোকজন আবার ওদের দিকে ভিড়তে শুরু করেছে। রতি বলে একটা নতুন মেয়ে এসেছে ওদের দলে। জগন্নাথের সঙ্গে নানান জায়গায় যাচ্ছে ।
সব দেখত সেতু। আর খালি কালার কথা মনে পড়ত। ও যেন দেখতে পেত হাসিমুখে সিগারেটের ফিল্টার ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে তাতে আগুন লাগিয়ে কালা বলছে, “আমার আর কে আছে বল!”
কেউ নেই? কালাদার কি সত্যি কেউ নেই! রাতে নিজের ঘরে বসে বাল্বের আলোয় দেওয়ালে পড়া নিজের ছায়াটাকে দেখত সেতু। মনে হত, ও কি কেউ নয় কালাদার? ও কি কিছু করতে পারবে না কোনও দিন?
তার পর আচমকাই একদিন খেলা ঘুরল। আর খেলাটা ঘোরাল কলকাতার ওদের পার্টিরই ওপর তলার একটা লোক। নাম, বীরেন্দ্র ত্রিবেদী।
রাজু জিজ্ঞেস করল, “তুমি শিওর তো সেতুদা? আজ এদিকেই আসবে তো?”
সেতু চোয়াল শক্ত করল। তার পর বলল, “হ্যাঁ। ঘোড়ার মুখের খবর। কেন তোর ভয় করছে নাকি? তুই ফিরে যাবি?”
রাজু ঢোক গিলল। তার পর বলল, “ভয় তো করছেই। কিন্তু পার্টির ভালর জন্য আমি সব করতে পারি। আমি তোমাকেই আদর্শ মানি সেতুদা। তোমায় তো বলেছি, কলেজে তোমায় দেখতাম দূর থেকে। মনে হত তোমার মতো হব।”
সেতু হাসল। যেন নিজের ছবি দেখতে পেল। ও যেমন কালাদাকে দেখত।
সেতু বলল, “আমার মতো হতে হবে না। নিজের মতো হ। সবাই যদি এক রকম হয়, তা হলে ডেমোক্রেসি থাকে না। আমরা তো সফট ড্রিঙ্কের বোতল তৈরি করছি না যে, সব একই জিনিস হবে! মানুষের মধ্যে ডাইভারসিটি না থাকলে সমাজের পক্ষে সেটা খারাপ। কিন্তু বাদ দে। এখন এ সব কথার সময় নয়। এখন কাজের সময়। পিন্টু খবর দিয়ে গেল যখন, জানবি এদিকেই আসছে। বুঝলি? রেডি থাক!”
রাজু মাথা নাড়ল। বলল, “আর যেটা ঘোড়ার মুখের খবর বললে, সেটা যদি সত্যি না হয়!”
সেতু চোয়াল শক্ত করল। তার পর বলল, “অন্য পার্টি হলে এখানেই তোকে শেষ করে দিত লিডারশিপকে কোয়েশ্চেন করছিস বলে। চুপ করে থাক। মাধোকে দেখে চুপ করে থাকাটা শেখ।”
রাজু চুপ করে গেল। বুঝল আর কথা বলা ঠিক হবে না ।
সেতু রাস্তার দিকে তাকাল। তার পর নিজেকে বলল, ধৈর্য ধরতেই হবে। আজকের মতো সুযোগ আর আসবে না। ও গায়ে জড়ানো শাল আর পাঞ্জাবির তলায়, কোমরে গোঁজা শক্ত ধাতব নলটা ধরল। ঠান্ডা। এটা বীরেন্দ্র দিয়ে গিয়েছে ওকে। বলেছে আনট্রেসেবল। কেউ ধরতে পারবে না গুলি কোন পিস্তল থেকে চলেছে।
বীরেন্দ্র লোকটা বেশ ঠান্ডা মাথার। পার্টির ওপরের দিকের মানুষ। সেতু শুনেছে এই লোকটার অঙ্গুলি নির্দেশে পার্টির অনেক কিছু ঠিক হয়।
মুড়াপোঁতার মণি নদীর পাশে বীরেন্দ্র একটা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি করতে চায়। জার্মান কোম্পানির সঙ্গে কন্ট্রাক্ট হয়েছে। ওদের থেকে টেকনোলজি নিয়ে ফ্যাক্টরি খুলতে চায় বীরেন্দ্র।
কিন্তু এবার বাধা দিয়েছে জগন্নাথ। ওর কথা হল, মুড়াপোঁতা কৃষিনির্ভর গ্রাম। আর এখানে নদী খুব গুরুত্বপূর্ণ সেচের জন্য। তাই কেমিক্যাল ফ্যাক্টরির বর্জ্য পদার্থ থেকে চাষের জমি ও নদীর জলের সমূহ ক্ষতি হবে। তাই কিছুতেই এটা করা যাবে না ।
ব্যাপারটা আরও ঘোরালো হয়ে উঠেছে। কারণ, যেজমিতে বীরেন্দ্র ফ্যাক্টরি খুলতে চায়, সেটা আবার জগন্নাথদেরই জমি। একে তো জগন্নাথের পার্টির একটা বিরোধ আছে বীরেন্দ্রদের পার্টির সঙ্গে, তার ওপর গ্রামের জমি আর জলের ক্ষতির সম্ভাবনা। এদিকে আইন অনুযায়ী জগন্নাথ না চাইলে জমিটা কিনতে পারবে না বীরেন্দ্র। তাই এই প্যাঁচে ফেলে জগন্নাথ ফ্যাক্টরি তৈরির সম্ভাবনাটা বন্ধ করে দিয়েছে।
এ সব নিয়ে গত তিন মাস নানান রকম ঝামেলা এ সব নিয়ে গত তিন মাস নানান রকম ঝামেলা চলছে। আর গ্রামের মানুষকে জগন্নাথ এমন করে ফ্যাক্টরি থেকে বেরোনো বর্জ্য পদার্থের মধ্যেকার বিষের কথা বুঝিয়েছে যে, বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ জগন্নাথকে সমর্থন করতে শুরু করেছে।
জার্মান কোম্পানিটি ব্যবসা বোঝে। দেরি হচ্ছে দেখে তাড়া লাগাচ্ছে খুব। বলছে, অন্য জায়গার এক পার্টি নাকি রেডি আছে। এই সব মিলিয়েই বীরেন্দ্র খুব অশান্ত হয়ে উঠেছিল।
সপ্তাহ দুয়েক আগে আচমকা কলকাতা থেকে ফোন পেয়েছিল সেতু। ওদের পার্টি অফিসে ব্যবহারের জন্য একটা মোবাইল ফোন রাখা হয়েছে। তবে খুব কম ওটা ব্যবহার করা হয়। কারণ, ইনকামিং আর আউট গোয়িং কলের খুব খরচ যে! ফোনটা আসায় বেশ অবাক হয়েছিল সেতু। ও ফোনটা ধরেছিল। তখন ওকে বলা হয়েছিল যে, বীরেন্দ্র ত্রিবেদীকে নিয়ে একজন আসবে ওর কাছে। জরুরি দরকার আছে।
বলার দু’দিনের মধ্যে পার্টির এক মেজোকর্তা গোছের নেতার সঙ্গে বীরেন্দ্র এসেছিল মুড়াপোতায়। সেতুকে বলা হয়েছিল, এটা একটা গোপন ভিজিট। তাই কাউকে যেন কিছু না জানায় ও।
রাত প্রায় দেড়টার সময় এসেছিল বীরেন্দ্ররা। পার্টি, অফিসের চাবি সেতুর কাছেই থাকে। ও সেদিন অফিস খোলাই রেখে দিয়েছিল।
রাজু রাত দশটায় বাড়ি ফেরার আগে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, এখনও কেন পার্টি অফিস খোলা রাখছে সেতু। কিন্তু সেতু উত্তর না দিয়ে বলেছিল, “সব ব্যাপার তোকে বুঝতে হবে না। তুই সোজা বাড়ি যাবি।”
বীরেন্দ্র ত্রিবেদী লোকটা পরিষ্কার বাংলা বলে। মোটা গোঁফ। ফর্সা। চেহারাটাও ভারীর দিকে। লম্বাও নয় খুব একটা। এমনিতে সাধারণ দেখতে, কিন্তু লোকটার চোখ দুটোর মধ্যে কেমন যেন বাঘের মতো চাহনি আছে। চোখ দুটো ঠান্ডা, নিষ্ঠুর। দেখলে মনে হয় কাউকে শেষ করে দিতে লোকটার এক মুহূর্তও লাগবে না।
ওদের কথা হয়েছিল অল্প সময়। বীরেন্দ্র ওকে বলেছিল, “তুমিই সত্যভাষ নাথ?”
সেতু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিল।
নেতাটি আর অন্য কথায় সময় নষ্ট না করে বলেছিল, “শোন সেতু, জগন্নাথকে সরিয়ে দিতে হবে। মিনিমাম আশি থেকে একশো কোটি টাকার প্রোজেক্ট! একটা ফালতু লোক আটকে দেবে? এলাকার উন্নয়ন হবে কী করে? লোকে চাকরি পাবে কী করে? অনেকেই তলায় তলায় চায় ফ্যাক্টরি হোক। কিন্তু জগন্নাথের ভয়ে ওদের পার্টিরই অনেকে মুখ খুলছে না। সেতু, তুই যা করার কর। দেখ যাতে নেক্সট মান্থেই ফ্যাক্টরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা যায়। পরের বারের ভোটে অনেক লাভ হবে এতে।”
আগে এমন ‘ভোটে লাভ হবে’ ধরনের কথা শুনলে রাগ হত সেতুর। মনে হত, সব কিছু কি ভোটের জন্য? মানুষের ভালর জন্য কি কিছু করা যায় না, ভোট বা অন্য কোনও লাভের কথা না ভেবে?
কালা ওর ওই রেগে যাওয়া মুখ দেখে হাসত। বলত, “এই জন্যই পাগল বলি তোকে। শোন, এটা ইউটোপিয়া নয়। এখানে দেওয়া-নেওয়াটাই রীতি। আর এটা ভুলও নয়। ভোটে না জিতলে কি ক্ষমতা পাবি তুই? ক্ষমতা না পেলে কী ভাবে সমাজকে সস্ত আর সুন্দর করবি? সাধারণ মানুষ চাক্ষুষ ফল তে চায়। বাড়া জল বিদার চাকরি স্থুল হাসপাতাল চায়। রাস্তা, জল, বিদ্যুৎ, চাকরি, স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা। তাই সেগুলো তৈরি করে মানুষকে বোঝাতে হয় যে, আমরা তোমাদের পাশে আছি। আমাদের ভোট দিলে এ ভাবেই তোমাদের পাশে থাকব। তাই ভোটটা মাথায় রাখা সমাজের জন্যই প্রয়োজনীয়।”
সেতু বলত, “আমরা প্রকৃতির অংশ। কিন্তু প্রকৃতি তো এমন করে না!”
“গাছ ফুল ফোটায় কেন? কেন মধুর লোভানি দিয়ে ডাকে মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গকে? কারণ, সে-ও মধুর পরিবর্তে পরাগ মিলন চায়। নিজের বংশ টিকিয়ে রাখতে চায়। উদ্ভিদ, জগতে সারভাইভ করতে চায়। এই যে সেক্স! এটা এমন আকর্ষক কেন? কারণ, নেচার এটাকে মেকানিজম হিসেবে ব্যবহার করেছে। আকর্ষণ করার মেকানিজম। মানে, এমন একটা ক্রিয়া, যাতে সবাই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। আর এই আনন্দের বদলে নেচার চায় জন্ম নিক নতুন প্রাণ। আরও, আরও বাঁচুক এই সব স্পিশিজ। এখানেও গিভ অ্যান্ড টেক! ফলে ভাবিস না নেচার কিছু ফেরত চায় না। জানবি সবটাই প্রথমে সারভাইভালের জন্য। তার পর ডমিনেন্স-এর জন্য। সারভাইভ না করলে কী করে তুই মানুষের জন্য কাজ করবি? তাই বাই হুক অর বাই ক্রুক, আমাদের ভোটে জিতে ক্ষমতা দখল করতেই হবে। ভাল কাজ করার জন্যও জানবি প্ল্যাটফর্ম লাগে,” কালা শান্ত গলায় বোঝাত ওকে।
সেই রাতে সেতু নেতাটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “কিন্তু কী ভাবে সরাব?”
বীরেন্দ্র পাশের ব্যাগ থেকে একটা ব্রাউন রঙের তোয়ালে মোড়া জিনিস বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলেছিল, “সেতুবাবু, এটা তোমার জন্য।”
প্রথম আলাপেই তুমি! সেতুর কানে লেগেছিল। কিন্তু ও জানে লোকটার ক্ষমতা আর পজ়িশন কতটা। তাই আর কানে লাগা ব্যাপারটাকে আমল দেয়নি।
সেতু তোয়ালেটা খুলে দেখেছিল একটা পিস্তল । কালো, ঠান্ডা! পাশে গুলি ভরা দুটো ম্যাগাজিন। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল ওর।
“চালিয়েছ তো আগে?” নেতাটি জিজ্ঞেস করেছিল, “এ দেশি মাল নয়। বিলিতি। খুব স্মুদ। এই যে লক। অন করে, লক্ষ্য স্থির করে ট্রিগারে চাপ দেবে। ব্যস। কোনও ভয় নেই। গরম হয়ে লক হবে না। হাতে ফাটবে না। ট্রিগার আটকে যাবে না।”
সেতু হাতে নিয়েছিল পিস্তলটা। বলেছিল, “মারার কী দরকার? ওদের যে মাসল পাওয়ার, বিহারি, সে-ও আমাদের দলে আসতে চায়। ওর কথা হচ্ছে আমার সঙ্গে। ওকে শুধু পঞ্চায়েত প্রধান করতে হবে। ও এলে আর জগন্নাথের কিছু করার থাকবে না। আর বিহারি আমায় বলেছে ও মারেনি কালাদাকে।”
নেতাটি হেসেছিল, “হুঃ মারেনি! তুই গান্ডু নাকি! বিহারি বিশাল চালু জিনিস! গ্লাস দাগি মাল। দলে নিলে ভাবমূর্তি খারাপ হবে আমাদের। প্লাস তুই বিহারির সঙ্গে কথা বলেছিস! কালাকে যে মেরেছে তাকে দলে নিতে চাস! আর, এই কাজটা বাইরের ভাড়াটে কাউকে দিয়ে করালে হবে না। কারণ, সেনসিটিভ ব্যাপার। লিক হয়েছে কী, বাওয়াল বিশাল। কাজটা তুই নিজে করবি সেতু। তোর জন্য কলকাতায় দারুণ প্রসপেক্ট অপেক্ষা করে আছে। এটা তোর একটা পরীক্ষা ভাবতে পারিস। পাশ করতে পারলে হু হু করে ওপরে উঠবি। বুঝলি?”
সেতু মাথা নিচু করে নিয়েছিল। আসলে ওর ইচ্ছে ছিল, বিহারিকে দলে নিয়ে আগে জগন্নাথদের টাইট দেবে। তার পর ও বিহারির ব্যবস্থা করবে নিজে। তবে এখন যে সেটা করা যাবে না, তা ভালই বুঝতে পারছে। কিন্তু তাই বলে খুন! ও খুন করবে!
সেতু বলেছিল, “আমি এটা করতে পারব না ।” “কেন, ভয় লাগছে?” বীরেন্দ্র তাকিয়েছিল ওর দিকে। “একটু তো লাগছেই! আমি মানুষ মারিনি কোনও দিন! এ সব আমার কাজ নাকি?”
বীরেন্দ্র বলেছিল, “তুমি অনেক কিছুই তো করোনি । তাতে কী হল? এটা করতে হবে। যে-প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলছ, সেটা তোমার হয়ে অন্য কেউ করবে ভাবছ কেন? আর না পারলে এখান থেকে তোমায় সরিয়ে দেওয়া হবে। আর এমন করে সরানো হবে, যাতে আর কোনও দিন কোথাও না পারো।”
বীরেন্দ্র থ্রেট করছে ওকে! সেতু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়েছিল বীরেন্দ্রর দিকে।
বীরেন্দ্র সামান্য হেসেছিল। বলেছিল, “এখানে আমি কেন এসেছি বলে মনে হয়? ওপর থেকে এটাকে গ্রিন লিট করা হয়েছে বলেই তো এসেছি, তাই না? কাজটা তোমাকেই করতে হবে। আর এটা মাথায় রাখবে, নো উইটনেস! জগন্নাথের সঙ্গে কেউ থাকলে তাকেও শেষ করে দেবে। উই ওয়ন্ট আ ক্লিন জব। আই উইল ব্যাক ইউ টু দ্য হিল্ট! ইউ ডোন্ট ওয়ারি।”
সেতু ওদের গলার স্বর আর বলার ভঙ্গিমা দেখে বুঝতে পারছিল, এই নিয়ে হ্যাঁ-না বা টালবাহানা করার সময় বা উপায় ওর নেই। ও বুঝতে পারছিল ওকে রাজি হতেই হবে।
বীরেন্দ্র এবার উঠে এসে হাত রেখেছিল সেতুর কাঁধে। এবার তুমি থেকে সরাসরি তুই-তে নেমে গিয়ে বলেছিল, “আরে, ভাবছিস কেন? আমি পার্সোনালি তোকে রিওয়ার্ড দেব। এই কাঁটা সরিয়ে দিলে বড় ব্যবসা হবে আমার। তুইও দশ লাখ পাবি। আর হ্যাঁ, পিস্তলটা আনমার্কড। কেউ এটাকে ট্রেস করতে পারবে না। বুঝলি?”
সেতু নিজেকে শান্ত করেছিল। নিজেকে বোঝাচ্ছিল যে, কালার মৃত্যুর একটা হিসেব বাকি আছে। সেটা মেটাতে হবে। তার সঙ্গে ওকে এবার নিজের দিকটাও ভাবতে হবে। সবাই নিজেরটা দেখছে যখন, ও কেন দেখবে না? ও দেখবে, ওকে দেখতেই হবে। মানুষের জন্য কাজ করার ফাঁকে নিজের জন্য কিছু করার সময় এসেছে। ক্ষমতার সঙ্গে সেলফ এমপাওয়ারমেন্টও জরুরি। আর রাজনীতিতে এমন লোকজন তো হাজার হাজার বছর ধরেই মারা যাচ্ছে! যে কাজের যে সাইড এফেক্ট।
সেতু সোজা তাকিয়েছিল বীরেন্দ্রর দিকে। হেসে বলেছিল, “টাকা আমার লাগবে না। শুধু কথা দিন আমায় অন্য ভাবে হেল্প করবেন। কথা দিন।”
বীরেন্দ্র হেসেছিল সামান্য। তার পর নিজের জায়গায় গিয়ে বসে বলেছিল, “শালা, দুধের দাঁত পড়েনি আর এখনই মোল-ভাও করছিস! তুই পারবি। তোর হবে এই লাইনে। ঠিক আছে।”
সেতু চোয়াল শক্ত করে ভেবেছিল, টাকা নিলে সব কিছু খেলো হয়ে যায়। সবার সামনে ও পাতি খুনি হয়ে যাবে। তাই ও টাকা চায় না। কিন্তু এমন ক্ষমতা চায় যে, তার সাহায্যে টাকা ছাপাতে পারবে পরে। বীরেন্দ্র ত্রিবেদীই ওকে সেই ক্ষমতার গুহায় ঢোকার চিচিং-ফাঁক মন্ত্রটা দিতে পারে।
“ওই যে সেতুদা।”
রাজুর গলায় সচকিত হল সেতু। রাজুকে ও বলেছে জগন্নাথের ব্যাপারে। বলেছে শত্রুকে শেষ করতে সেতু পিস্তলটা বের করে হাতের টর্চটা নিয়ে বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল কয়েক পা। রাজু আর মাধোও এল সঙ্গে।
শীতকাল বলেই হয়তো পিস্তলটা এমন ঠান্ডা হয়ে আছে। এর আগে কলকাতায় থাকার সময় পিস্তল চালিয়েছে সেতু। এটা নতুন কিছু নয় ওর কাছে। তাও শরীরের মধ্যে কেমন একটা করছে। কিন্তু ও জানে নিজেকে ঠিক রাখতে হবে। সাহস হারালে চলবে না! কী ভাবে কালাকে মেরেছিল জগন্নাথ আর বিহারিরা সেটা ভুললে চলবে না। তার সঙ্গে ওপরে ওঠার সেই চিচিং ফাঁক ব্যাপারটাও ভুললে চলবে না।
সেদিন ‘হ্যাঁ’ তো বলে দিয়েছিল সেতু। কিন্তু কী যে করবে বুঝতে পারছিল না। জগন্নাথের সঙ্গে সারাক্ষণ লোকজন থাকে। একা না পেলে তো মুশকিল। তা হলে? পিন্টু আর রাজুকে লাগিয়ে জগন্নাথের গতিবিধির খবর নিয়েছিল সেতু। কিন্তু ফাঁক-ফোকর কিছু পাচ্ছিল না। তা হলে? কী করে করবে কাজ আছি।”
আর ঠিক তখনই একদিন রাতে পার্টি অফিস বন্ধ করে বাড়ি যাওয়ার পথে ওকে ধরেছিল বাচ্চু। বাচ্চু বর্ধন। জগন্নাথের ঘনিষ্ঠ লোক।
সেতু সচকিত হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হল? তুমি? কী চাও?”
বাচ্চুর মুখ দিয়ে মদের গন্ধ বেরোচ্ছিল। কিন্তু গলা কাঁপছিল না একটুও। ও কোনওরকম ভনিতা না করে বলেছিল, “জগাদাকে সরাতে হবে। তোমরা পারবে?”
সেতু থমকে গিয়েছিল। এ যে মেঘ না চাইতেই জল! ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল ও।
তাও সেতু সময় নিয়েছিল একটু। তার পর জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার লাভ?”
বাচ্চু মাথা নিচু করে বলেছিল, “পার্টি সবার চেয়ে বড়। কিন্তু জগাদা নিজেকে আজকাল পার্টির চেয়ে বড় ভাবছে। তাই… পারবে কি না বলো। ব্যবস্থা আমি করে দেব। কেউ জানবে না।”
“তোমায় বিশ্বাস করব কেন?” সেতু জিজ্ঞেস করেছিল।
বাচ্চু বলেছিল, “কারণ, আমিও তোমাদের পার্টিতে আসব। আমার ওখানে কোনও দাম নেই। আমি চাই জগাদার পরিবর্তে আমায় তোমরা জেলায় একটা পোস্ট দেবে। পোস্ট! বুঝেছ?”
সেতু ভাল করে দেখেছিল বাচ্চুকে। তার পর বলেছিল, “আমাদের পিন্টুকে চেনো তো? ও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।”
বাচ্চু কথা রেখেছে। ওই আসছে ওরা। পিন্টুকে যেমন বলেছিল, ঠিক সেরকম।
ঝোপের ভেতর থেকেই বড় টর্চটা জ্বালিয়ে সাইকেল আরোহীর মুখের ওপর ফেলল সেতু। হ্যাঁ, ওই তো জগন্নাথ। সারা শরীরে নিমেষের মধ্যে কেমন যেন একটা গরম ভাপ খেলে গেল সেতুর!
চোখ কুঁচকে কোনও মতে সাইকেলটাকে ব্রেক কষে দাঁড় করাল জগন্নাথ। সেতু দেখল, পিছন থেকে বাচ্চু নেমে দাঁড়িয়েছে মাটিতে।
জগন্নাথ চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোন শুয়োরের বাচ্চা রে?”
ঝোপের ধার থেকে সেতু উত্তর দিল, “তোর বাপ, শুয়োরের বাচ্চা!”
জগন্নাথ কিছু বোঝার আগেই ঝোপ থেকে মাধো আর রাজুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়াল সেতু।
জগন্নাথ সাইকেলে বসে মাটিতে এক পা রেখে জিজ্ঞেস করল, “কী চাস? এ ভাবে পথ আটকালি কেন?”
সেতু কিছু না বলে আচমকা হাতটা তুলল।
জগন্নাথ থতমত খেয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলল, “কী করছিস? কী করছিস এটা?”
“কালাদাকে তুই যা করেছিলিস!” সেতুর গলা কাঁপছে।
জগন্নাথ আচমকা সাইকেলের ব্রেকটা ছেড়ে দ্রুত প্যাডেল করে ছেলেগুলোর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে গেল। কিন্তু পারল না। পেছনে কী যেন আটকে আছে।
নিমেষে পিছনে ঘুরল জগন্নাথ। আর অবাক হয়ে দেখল, বাচ্চু সাইকেলের ক্যারিয়ারটা টেনে ধরে রেখেছে! ও এগোতে দিচ্ছে না জগন্নাথকে।
“বাচ্চু!” বিহ্বল হয়ে বাচ্চুর দিকে তাকাল জগন্নাথ ।
বাচ্চু কাঁপা গলায় বলল, “ক্ষমা করে দাও জগন্নাথদা । কিন্তু উপায় নেই!”
জগন্নাথ বলল, “আমায় মারিস না! প্লিজ়, মারিস না আমায়! আমি সব ছেড়ে দিচ্ছি। সব ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি এখান থেকে। বিশ্বাস কর, রাজনীতিতে আমি আর থাকব না। মারিস না আমায়…. পায়ে পড়ছি তোদের…”
সেতু চোয়াল শক্ত করে বলল, “কালাদাকে গিয়ে প্লিজ় বলিস শুয়োরের বাচ্চা! আজ তোকে….”
ভয়ে সামনের দিকে তাকাল জগন্নাথ। দেখল, লক্ষ্য নিশ্চিত করতে সেতু আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। পিস্তলটা কাঁপছে সেতুর হাতে।
জগন্নাথ কিছু বলতে গেল। কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। ও শেষবারের মতো বড় করে শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।
সেতু সময় নষ্ট করল না আর। মাথা লক্ষ করে ট্রিগার টেনে দিল।
বাঁশ ফাটার মতো একটা শব্দ হল। টর্চের হলুদ আলোয় দেখা গেল জগন্নাথের মাথার এক পাশ দিয়ে রক্ত ছিটকে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। জগন্নাথ মাটিতে পড়ে গেল। টর্চটা নামিয়ে দেখল সেতু। জগন্নাথের চোখ খোলা। মুখটা সামান্য হাঁ। মাথার এক দিকে খোঁদল হয়ে আছে।
সেতুর সারা শরীর কাঁপছে। এই প্রথম মানুষ মারল ও! বুকের মধ্যে কেমন একটা খালি ভাব। পেট গোলাচ্ছে। মাথার পিছনে কিট কিট করছে একটা ব্যথা। তাও জোর করে নিজেকে সামলাল সেতু। বাচ্চুর মুখে আলো ফেলল। দেখল, বাচ্চু কাঁপছে সামান্য। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে আছে! গলার আপেলটা ওঠা-নামা করছে।
বাচ্চু বলল, “আমি… আমি তা হলে…’ ” সেতু চোয়াল শক্ত করে বলল, “এসো।”
তার পর নিমেষের মধ্যে পিস্তলটা তুলে বাচ্চুর মাথা লক্ষ করে আবার ট্রিগার টানল। আবার শব্দ! বাচ্চু কিছু বোঝার আগেই পড়ে গেল মাটিতে।
“এটা কী করলে!” রাজু ভয়ে চিৎকার করে উঠে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল মাটিতে। মাধো চট করে ধরে ফেলল ওকে।
সেতু ঝুঁকে পড়ে রাজুর বুকের কাছে সোয়েটারটা খামচে ধরে বলল, “প্রমাণ রেখে দেব? ঘোড়াকে শেষ করতেই হত! আমি গান্ডু নাকি? আর, তুই এমন করছিস কেন? বাচ্চু এতদিনের লোককে যদি বিট্রে করতে পারে, তা হলে তুই-আমি কী ওর কাছে? শোন রাজু, মানুষের জন্য কাজ করতে এসেছিস। মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে এমন হবে। আরও হবে। ভয় পেলে চলবে না। ভয় পেলে তুইও মরবি। মনে থাকে যেন! আজ যেটা ঘটল এই নীলকরদের মাঠে, সেটা এখানেই ভুলে যা। কোনও দিন এই কথা তুলবি না। কাউকে বলবি না। এই কথা যদি কোনও দিন তুলিস, জানবি তোরও কোনও সিকিওরিটি থাকবে না। এখন চল।
সারা দিন বাড়ি থেকে বেরোবি না। বুঝেছিস?” দূরে বটগাছের নীচে ওর সাইকেলটা রাখা আছে। অন্ধকারে সেই দিকে পা বাড়াল সেতু। ও জানে, আজকের এই দিনটা ওর জীবনটাকেই পাল্টে দেবে একেবারে। জানে, এই অন্ধকার ওকে আসলে ক্ষমতার আলোর দিকেই নিয়ে যাবে।
সেতু আকাশের দিকে তাকাল। দেখল, কুয়াশা কেটে রাংঝালের ফোঁটার মতো তারা দেখা যাচ্ছে এবার।
