১৫. উর্জা
আকাশ কালো হয়ে আছে আজ। সেই দুপুর থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ করে। মার্চে আচমকা এমন বৃষ্টি হবে কেউ ভাবতে পারেনি!
এর মধ্যেও হাসপাতালের বড় চাতালে এলোমেলো হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনেক মানুষ। এক পাশে শব বহনের জন্য কাচের গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা। কয়েকজন মানুষ সেই গাড়িটাকে ফুলের মালা, রজনীগন্ধার স্টিক আর ধূপকাঠি দিয়ে সাজাচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির জন্য জ্বালাতে পারছে না ধূপ। একটু দূরে চোখ লাল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন মহিলা। বোঝা যাচ্ছে যে, কান্নাকাটি করছে তারা। যদিও মৃতদেহের দেখা নেই এখনও। স্বাভাবিক। হাসপাতাল থেকে মরদেহ বের করতে সময় লাগে।
চাতালের অন্যদিকে চারটে অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। দূরে একটা জেনসেটের বড় বাক্স আর তার গা থেকে ওঠা চিমনি, সব ভিজছে। হাসপাতাল বিল্ডিংটা বেশ সুন্দর ভাবে রং করা। ভেতরে বাগানও করা রয়েছে। উঁচু দেওয়াল ঘেঁষে বড় নিম গাছ, শিরীষ গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা উঁচু করে। এ ছাড়াও আরও কী সব গাছ আছে, তবে তাদের নাম জানে না উর্জা।
উর্জার মাঝে মাঝে আফসোস হয়। ও সে ভাবে গাছ চেনে না, ফুল চেনে না, এমনকি পাখিও চেনে না বিশেষ। ওর বাড়ি আলিপুরের হর্টিকালচারের কাছে, কিন্তু সেখানে ও খুব একটা যায়নি। কেবল সুন্দর বাড়ি, দামি গাড়ি, টাকা, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, বিদেশে ঘোরাঘুরি— এ সব করেই যেন একটা জীবন কেটে গেল! আসল পৃথিবীটাকে কাছ থেকে, ভেতর থেকে দেখাই হল না!
উর্জা চায় পৃথিবীর এই সব বিভিন্ন দিক জানতে, শিখতে। কিন্তু কে জানাবে ওকে? কে শেখাবে হাতে ধরে? বই দেখে মিলিয়ে মিলিয়ে তো এ ভাবে জানা যায় না! গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ তো কোনও বইয়ে পাওয়া যায় না।
উর্জা বোঝে, ওর চারিদিকে ওরই মতো বিষয়-আশয়ে ডুবে থাকা মানুষের ভিড়! রোজগার করে একটু ভাল ভাবে থাকতে চাওয়ার অপরাধে যারা জীবনের গোটাটাই বন্ধক রেখেছে সমাজ ও সংসারের জাঁতাকলে। চারিদিকে মনে মনে মরে যাওয়া মানুষজনকেই যেন দেখে উর্জা। দেখে সবাই বেঁচে আছে, কিন্তু আসলে কেউ বেঁচে নেই।
কবি কিন্তু নানা রকম পাখি, গাছ, ফুল চেনে। মানে ওর চেয়ে অন্তত বেশি জানে। যদিও নিজে তা স্বীকার করে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও দু’-একবার কথায় কথায় সে সব নিয়ে বলেও ফেলেছে কিছু কথা। অবাক হয়েছে উর্জা।
ক’দিন আগে এক ছুটির বিকেলে বাড়িতেই ছিল বীরেন্দ্র। ফলে কবিকেও বেরোতে হয়নি। উর্জার নিজের ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগছিল না একটুও। রাজুটা এমন ছেলেমানুষি করছে যে, কষ্ট থেকে ব্যাপারটা বিরক্তির দিকে যাচ্ছে এবার। আর ঘরে একা থাকলেই ও সব মাথার মধ্যে যেন কামড়াচ্ছিল!
উর্জা চেষ্টা করছিল বই পড়ার। কিন্তু মন বসছিল না। সিনেমা দেখতেও ইচ্ছে করছিল না। কী করলে একটু শান্তি পাবে বুঝতে পারছিল না ঠিক।
আর তখনই একটা ডাক শুনেছিল। ‘বুকো-টাকো, ‘বুকো-টাকো।’ বাহ রে! অদ্ভুত তো ডাকটা!
উর্জা কৌতূহলী হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছিল। ডাকটা আরও জোরদার হয়েছিল। ‘বুকো-টাকো, ‘বুকো-টাকো।”
কোথায় ডাকছে পাখিটা! দেখা যাচ্ছে না তো! উর্জার মনে হচ্ছিল, পাখিটাকে দেখতেই হবে। কেন কে জানে আচমকা মনে হচ্ছিল, পাখিটার দেখা পেলে রাজুর সঙ্গে ওর এই ভুল বোঝাবুঝিও মিটে যাবে। খুব বোকা বোকা ভাবনা। কিন্তু তাও আমাদের যুক্তিরও গভীরে যে একটা অযৌক্তিক বোকা আর গোঁয়ার মন থাকে, সে ওকে বলছিল, পাখিটাকে খুঁজে বের কর। ওকে দেখলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। নিজের ওপর বিরক্ত লাগছিল উর্জার, আবার একই সঙ্গে কিসের যেন একটা টানও অনুভব করছিল। রাজু, পাখি, সব যেন এক হয়ে যাচ্ছিল। ওর মনের মধ্যে থেকে কেউ যেন বলছিল, পাখিটাকে খুঁজে না পেলে রাজুর সঙ্গে আর ওর সম্পর্কটাও থাকবে না! আমাদের মন যে কী বিচিত্র জায়গা! মাঝে মাঝে সে এমন জেদি বাচ্চার মতো করে যে, তাকে সামলানো যায় না।
পাখিটাকে খুঁজে পেতেই হবে। কেমন একটা রোখ চেপে গিয়েছিল উর্ভার। ও এবার বারান্দা থেকে বেরিয়ে নেমে এসেছিল নীচে, বাগানে। বিন্দি বসেছিল বাগানে।
ওকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে দিদি?”
ঊর্জা ওকে হাতের ইশারায় সরিয়ে দিয়েছিল।
“বুকো-টাকো,” “বুকো-টাকো”— পাখিটা তখনও ডেকে চলেছিল। কোনদিক থেকে ডাকছে? উর্জা বাগানের গাছের দিকে তাকিয়ে এদিকওদিক খুঁজছিল। মনের ভেতরের সেই অকারণ মনটা বলছিল, খোঁজ, খোঁজ পাখিটাকে! না হলে কিন্তু রাজু…
“ওই যে বসে আছে।”
পিছন থেকে নরম গলা পেয়ে সামান্য চমকে উঠেছিল উর্জা। তার পর মাথা ঘুরিয়ে দেখেছিল, সামনের বড় গাছটার মাঝারি একটা ডালের দিকে হাত বাড়িয়ে ইঙ্গিত করছে কবি।
ওর হাতের সোজাসুজি তাকিয়ে পাখিটাকে এবার দেখতে পেয়েছিল উর্জা। পাতার আড়ালে বসে আছে। পায়রার চেয়ে একটু বড়, আর ধূসর রঙের। পাতার আড়াল আর উঁচু জায়গায় বসে আছে বলে বিশেষ কিছু দেখা যাচ্ছে না।
উর্জা দেখেছিল পাখিটা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে আর চিৎকার করছে, “বুকো-টাকো,” “বুকো-টাকো”! এটা কি ওদের মেটিং কল? কে জানে!
কবি পাখিটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “এটা ‘বৌ কথা কও’ পাখি। আমাদের গ্রামেও আসে। এখানে আজ এল। আগে দেখিনি। মার্চ তো ওদের ডিম পাড়ার সময়, তাই হয়তো এসেছে বাসার খোঁজে!”
“বাসার খোঁজে মানে!” উর্জার ভারী মজা লেগেছিল। যেন অন্য জায়গা থেকে কেউ শহরে এসেছে বাড়িভাড়া নেবে বলে। পাখিদেরও এমন হয় নাকি!
“কোকিল যেমন অন্যের বাসায় ডিম পাড়ে, এরাও শুনেছি তেমনই করে। আমাদের গ্রামে এই পাখি অনেক আছে। আর-এক রকমও আছে— ‘খোকা হোক’। সকাল সকাল ডাক শুনি আমরা। বউ কথা কও-টা কলকাতায় এসে প্রথম শুনলাম!”
“পাখির নাম বৌ কথা কও?” উর্জার অবাক লেগেছিল।
“হ্যাঁ ম্যাডাম। ডাকটা শুনুন। দেখবেন যেন বলছে ‘বৌ কথা কও, বৌ কথা কও’!” কবি সামান্য হেসেছিল।
উর্জা আবার শুনেছিল ডাকটা। আর বুঝতে পেরেছিল সত্যিই তো! তেমনই তো লাগছে! ওর আচমকা কেমন যেন ভাল হয়ে গিয়েছিল মন। কত কী জানার আছে পৃথিবীতে! কত কী শেখার আছে!”
কবি একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলেছিল, “আমার বাবা বলত অন্য কথা।” “অন্য কথা মানে?” উর্জা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কবির দিকে। “আমি ছোট ছিলাম। তাও মনে আছে। এই পাখিটা ডাকলেই বাবা চোখ বন্ধ করে বুকের কাছে হাত নিয়ে বলত, ‘বুকে থাকো,’ ‘বুকে থাকো!’ কাকে বলত কে জানে!” কবি কথাগুলো বলে চোয়াল শক্ত করেছিল।
“বলত মানে? এখন…” উর্জা কথা শেষ না করে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে চুপ করে গিয়েছিল।
“আমি ছোট থাকতেই মারা গিয়েছেন। যাই হোক, এই পাখিটা খুব সুন্দর ডাকে। সরি ম্যাডাম, আমি আপনাকে বিরক্ত করলাম। আসলে স্যর ডেকেছিলেন আমায়, তাই এ দিকে এসেছিলাম,” কবি যেন দ্রুত নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল।
“আরে না না, বিরক্ত কোথায়!” উর্জা হেসেছিল।
কবি আর দাঁড়ায়নি। মাথা ঝুঁকিয়ে চলে গিয়েছিল ওখান থেকে। উর্জাও ফিরেছিল বাড়ির ভিতরে। পাখিটাকে দেখতে পেয়ে মনের মধ্যে কেমন একটা শাস্তি হচ্ছিল! ও শুনছিল পাখিটা তখনও ডাকছে, ‘বুকোটাকো,’ ‘বুকো-টাকো।’ কিন্তু উর্জার মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে কে যেন ওকেই বলছে, ‘বুকে থাকো, বুকে থাকো।”
কবির কাছ থেকে পাখি নিয়ে আরও কিছু জানতে ইচ্ছে করে উর্জার। কিন্তু সামাজিক ভাবে কবি ওর বাবার কাছে কাজ করে। এই বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী এখানে কাজের লোকেদের সঙ্গে একটা দূরত্ব রাখতে হয়। তাই কবিকে তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না, এটা কী গাছ? ওটা কী পাখি? যদিও জানার কোনও বয়স হয় না, বা শিক্ষকের অবস্থানের কোনও অর্থনৈতিক উঁচু-নিচু জায়গা হয় না, তা হলেও এই সমাজের কিছু অলিখিত নিয়ম আছে। আর আমরা ইচ্ছে না থাকলেও সেটা মেনে নিই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।
তবে একটা জিনিস উর্জা দেখেছে। কবি ছেলেটা খুবই চুপচাপ থাকে। দরকারের বাইরে কিছু বলেই না। কারও দিকে তাকায় না। উর্জার দিকে তো নয়ই। উর্জা কথা বললেও হুঁ হাঁ করে শুধু। কে জানে এই বয়সের একটা ছেলে এমন কেন! সে দিনই-বা কী হয়েছিল কে জানে, নিজে থেকে এসে পাখির কথা বলেছিল কবি!
তবে হতেই পারে। সব মানুষ তো আলাদা আলাদাই হয়। কার জীবন যে কী রকম, সে তো বাইরে থেকে বোঝা যায় না! কাকে কী কষ্ট পার করে আসতে হয়েছে। কী দুর্যোগে মধ্যে বড় হতে হয়েছে, সেটা বাইরের লোকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তাও উর্জার ভালই লাগে ছেলেটাকে। নির্বিবাদী, নিজের মধ্যে থাকা এক মানুষ।
সরকারি হাসপাতালে উর্জা আগে আসেনি কোনও দিন। ওদের বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয় না। ফলে এই অভিজ্ঞতাটা নতুন।
এখানে এসে গাড়ি নিয়ে হাসপাতাল চত্বরে ঢোকেনি উর্জা। পাশের একটা চওড়া গলিতে গাড়িটাকে পার্ক করে রেখেছে। তার পর হেঁটে এসেছে এখানে।
বাইরের টিপটিপে বৃষ্টি পার করে দুটো সিঁড়ি ভেঙে লম্বা বারান্দার মতো জায়গাটায় উঠল উর্জা। একটা কোলাপসিবল গেট টানা রয়েছে। সামনে একজন নীল ইউনিফর্ম পরা গার্ড।
ওকে দেখেই সে বলল, “ম্যাডাম, কার্ড?”
ভিজিটার্স কার্ড ছাড়া ঢুকতে দেবে না, এটা জানত উর্জা। তাই রানাকে আগেই ফোন করে রেখেছিল। ও দেখল, গার্ডের পিছনে গেটের ওই দিকে রানা দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ওকে দেখেই রানা এবার এগিয়ে এল, “দিদি আসুন,” তার পর গার্ডের দিকে তাকিয়ে বলল, “কার্ড আমার কাছে আছে।”
গার্ড ভদ্রলোক কার্ড দেখে গেটটা খুলে দিল বড় করে। উর্জা ভেতরে ঢুকে গেল।
রানা বলল, “চলুন দিদি, ওপরে। লিফটে যাবেন?” “দোতলায় তো? হেঁটেই চলো,” উর্জা সিঁড়ির দিকে এগোল।
লিফটের কাছে বেশ ভিড়। তার ওপর দু’জন ওয়ার্ড বয় স্ট্রেচারে করে একটি রোগীকে নিয়ে অপেক্ষা করছে। মাত্র দোতলায় লিফটে ওঠার কোনও মানে নেই। একতলা অবধি হেঁটেই ওঠা যায়। এতে কোনও অসুবিধে নেই।
উর্জা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর কেউ আসেনি?”
“পার্টি থেকে লোকজন এসেছিল দিদি। কিন্তু আপনি আসবেন বলে আমি সবাইকে কাটিয়ে দিয়েছি আগেই। দাদা একাই আছে। আসুন।”
দোতলায় উঠে একটু থমকাল উর্জা। লম্বা করিডোর। ডেটল আর স্পিরিটের গন্ধে ভরপুর। তবে মেঝে আর দেওয়াল পরিষ্কার। রানা ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল।
করিডোরের দু’পাশে দরজা। বাঁ দিকের দুটো দরজা পার করে তৃতীয় দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল রানা। উর্জাও ঢুকল পিছন পিছন।
বিশাল হলঘর এটা। সারি সারি বিছানা রাখা আছে। তাতে রোগী ভর্তি। ভিজিটিং আওয়ার্স চলছে বলে অনেক লোকজন চারিদিকে। তার মধ্যে ঠিক মতো ঠাহর করতে পারল না উর্জা! ও এদিক-ওদিক তাকাল। আর তখনই দূরে দেখতে পেল রাজুকে।
রানা বলল, “ওই যে। আপনি যে আসবেন, জানে না। আপনি যান, আমি করিডোরে আছি। সারপ্রাইজ হবে একটা। ভাল হবে। আপনি যান দিদি।”
রানা সামান্য হেসে আবার করিডোরে চলে গেল।
উর্জা সময় নিল একটু। না-বলে এসেছে। কে জানে রাজু কী ভাবে নেবে ব্যাপারটা!
উর্জা কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেল বেডের দিকে। দেখল, রাজু এক মনে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে।
উর্জা সন্তর্পণে গিয়ে দাঁড়াল সামনে। রাজু মুখ ফিরিয়ে দেখল। কিন্তু চমকাল না।
বেডের পাশেই একটা প্লাস্টিকের টুল রাখা আছে। সেটা টেনে নিয়ে বসল উর্জা। চারিদিকে কেমন যেন একটা গন্ধ। এই গন্ধটা ভাল লাগে না ওর। অনেক দূরের ধু ধু ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। মানে এমন ছোটবেলা, যখন অধিকাংশই প্রায় আবছা কাচের ওপারে থাকে। শুধু কী করে যেন দু’-একটা দৃশ্য, রোদের ভাপ, আইসক্রিম রঙা বরফ আর দু’-চার ফোঁটা গন্ধ মনে থেকে যায়!
এই গন্ধটা নাকে গেলেই ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু ছবি মনে পড়ে উর্জার।
মায়ের থমথমে মুখ। ভিড় করে দাঁড়ানো কয়েকজন মানুষ। সাদা চাদর। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা একটা দেহ। বাবা।
ব্যস, আর কিছু না। এই গন্ধটা নাকে গেলে শুধু ওটুকুই মনে পড়ে যায়! না, কোনও তীব্র কষ্ট হয় না। ঝাঁপিয়ে পড়ে কান্না আসে না। মনখারাপে বুজে যায় না গলা। কিন্তু কিছু একটা হয়। বুকের মধ্যে যেন শূন্য রাস্তা জেগে ওঠে। আর তাতে যেন গড়াতে থাকে সামান্য খড়কুটো দিয়ে তৈরি একটা পাখির বাসা। শূন্য রাস্তায়, দুপুরের রোদে, সেই ছেঁড়া-ফাটা বাসাটা গড়াতেই থাকে। সব ছেড়ে, সব পার করে সেই বাসা যেন চলে যেতে চায় বহু দূর কোনও অজানায়। একা একা। তাই এই গন্ধটা থেকে প্রাণপণ পালাতে চায় উর্জা।
উর্জা নিজেকে ঠিক করল। এ সব ভাবলে এখন চলবে না। ও তাকাল রাজুর দিকে। রাজুও তাকিয়েই ছিল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না কোনও। শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়েই রইল নিষ্পলক। যেন এই নিস্তব্ধতা দিয়েই রাগ ও অভিমানের বোঝাপড়া হচ্ছে। আসলে শব্দ বা কথার আর সাধ্য কতটুকু! সব কথা যদি মানুষ ‘কথা’ দিয়েই বুঝিয়ে দিতে পারত, তা হলে তো জীবনে কোনও সমস্যাই হত না।
গোটা হলঘরে ভেসে রয়েছে গুঞ্জন। জিনিসপত্র রাখার ধাতব শব্দ। টুল টানার আওয়াজ। আচমকা বেজে ওঠা মোবাইল ফোন। কিন্তু এই সব কিছুই দূরের আবছা কোনও ফিনফিনে পর্দার মতো হয়ে গেল ধীরে ধীরে। শুধু অভিমানের নির্জন নদীর ওপর ওদের দু’জনের মধ্যেকার নিস্তব্ধ এক সেতু জেগে রইল একাকী।
উর্জার চোখে জল চলে এল আচমকা। কী এমন করেছে ও যে, রাজু ওর সঙ্গে এমন করল! ফোন ধরল না, বাড়িতে গেলেও ‘নেই’ বলে তাড়িয়ে দিল একরকম। উমেশ যা করেছে তা তো অতর্কিতে! তাতে উর্জার দোষটা কোথায়! কত রাত একা কেঁদেছে ও, রাজু জানে কি! কার জন্য ফিরেছে এই দেশে! কার জন্য এই জোর করে বিয়ে নামক ফাঁদ কেটে বেরোতে চাইছে! রাজুর জন্য। রাজু ওকে ভালবাসে বলে। কিন্তু রাজু এই ভালবাসে ওকে? এই বিশ্বাস করে?
আচমকা এত মানুষের মধ্যে বসে উর্জার মনের অজানা কোনও এক কোণ থেকে ময়ূরের মতো বিশাল পেখম মেলে দিল এক আকাশ অভিমান। উর্জা দৃষ্টি-সাঁকো ভেঙে নামিয়ে নিল চোখ। টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল কোলের ওপর রাখা ব্যাগটায়।
রাজু তাকিয়ে থাকল একটু। তার পর আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে ধরল উর্জার হাতটা। উর্জা মাথাটা আরও নামিয়ে বুকের সঙ্গে চিবুকটা লাগিয়ে রাখল। চোখ দিয়ে জল পড়েই যাচ্ছে।
রাজু নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এখনও কাঁদবে?”
উর্জা চোয়াল শক্ত করে সামলাল নিজেকে। চারিদিকে লোকজন আছে। সবার সামনে এমন বিচ্ছিরি সিন ক্রিয়েট করার কোনও মানে নেই। ও মুখ তুলল। রাজুর হাত ছাড়িয়ে চোখটা মুছল। তার পর ধরা গলায় বলল, “আমায় কষ্ট দিয়ে কী আনন্দ পাও তুমি?”
রাজু নরম গলায় বলল, “আমি কষ্ট দিই! শুধু সেটাই দেখলে? আমার কষ্টটা দেখলে না?”
উর্জা বলল, “তুমি এত নিষ্ঠুর আমি জানতাম না!”
রাজু বলল, “আমি আর কত কিছু সহ্য করব? আমার এটা কোনও জীবন উর্জা! তুমি জানো না! তুমি আমার একমাত্র আনন্দ, আশ্রয়। মানে জীবনের যেটুকু ভাল, সেটাই তুমি। এত বছর তোমার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। তার পর যেই ফিরলে অমনি তোমার বাড়ি থেকে শুরু করল, বিয়ে করো, এই ছেলের সঙ্গে দেখা করো। এ সব আর কত সহ্য করব আমি? আমার কষ্ট হয় না? আমার তো বেঁচে থাকতেই ইচ্ছে করে না আর! মায়ের চোখে আমি অপদার্থ! রানার ওপরই মায়ের সমস্ত আশা-ভরসা, ভালবাসাও। আমি সেখানে কিছু না। পার্টিতে যাই, সেখানেও আপাদমস্তক নোংরামো! যে-পার্টি করব বলে সে ভাবে কাজকর্ম খুঁজলাম না! মানুষের কাজ করব বলে নিজের দিকে তাকালাম না, সেটা দেখলাম একটা লক্ষ কোটি টাকার ইন্ডাস্ট্রি! একটা বিজনেস! নিজের স্বার্থে বেশির ভাগ নেতা মানুষকে ক্রমাগত নানান ভাবে এক্সপ্লয়েট করে যাচ্ছে। সর্বত্র গ্যাস লাইটিং চালাচ্ছে। কেউ সত্যি কথা বলছে না। চুরিচামারি করে টাকা করছে। ভাল লোকেদের জোর করে চেপে রাখা হচ্ছে। টেক্ ফর গ্রান্টেড হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। কী যে জঘন্য পরিস্থিতি ভাবা যায় না! এখানে সব জায়গায় তো হেরেই গিয়েছি আমি। সেখানে তুমি ছাড়া যে আমার আর কিছু নেই উর্জা। সেই তুমিও যদি…”
উর্জা দেখল, কথা বলতে বলতে রাজুর গলাও ধরে এসেছে। ও দ্রুত সামনে ঝুঁকে রাজুর ঠোঁটে হাত দিয়ে ওকে চুপ করাল। বলল, “মাথায় সেলাই আছে। স্ট্রেস নিয়ো না। ঠিক আছে। সব ঠিক আছে।”
সামান্য উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল রাজু। উর্জার স্পর্শ পেতেই এবার যেন কেমন গা ছেড়ে দিল। কপালে হাত দিয়ে এবার ভাল করে দেখল উর্জা। জ্বর আছে। স্বাভাবিক। যা মার খেয়েছে! জ্বর থাকাই স্বাভাবিক।
ভাগ্যিস বিনির ভাই জিকো ঝামেলার মাঝে আর কোনও উপায় না দেখে ওকে মেসেজ করে দিয়েছিল। ছবি তুলে পাঠিয়েছিল। লোকজনের মারমুখী ভাবের কথা বলেছিল। উর্জা আর দেরি করেনি। বীরেন্দ্রকে ফোন করে বলেছিল সবটা। বলেছিল কিছু করতে। না, বীরেন্দ্রকে রাজুর কথা বলেনি। বলেছিল বিনির আত্মীয় হিসেবে জিকো আর সুনীলবাবুর কথা।
একটাই রক্ষে ছিল যে, ওই জায়গাটার একদম পাশেই ছিল থানা। তাই পুলিশ পৌঁছে গিয়েছিল খুব দ্রুত। কিন্তু তাও রাজুকে উদ্ধার করার পরে দেখা গিয়েছিল যে, মারের চোটে রাজুর মাথা ফেটেছে। সঙ্গে বাঁ হাতেও লেগেছে। মুখে আর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কালশিটে পড়ে গিয়েছে। জ্ঞানই ছিল না রাজুর।
ঊর্জা ভয়ে, টেনশনে কাঁপছিল। ভাগ্যিস জিকো, বিনির থেকে উর্জার মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে রেখেছিল! না হলে কী যে হত! ‘মব’ খুব সাংঘাতিক জিনিস! একা মানুষকে বোঝানো যায়। সামলানো যায়। কিন্তু ‘মব’-কে যায় না। ভিড়ের সঙ্গে থাকলে ইঁদুরও নিজেকে সিংহ ভাবে। সে তখন ঠিক-ভুলের তোয়াক্কা করে না কোনও।
ওই ঘটনার ক’দিন পরে গতকাল রাতে একটু সুস্থ হয়েছে রাজু। এই ক’দিন আসতে পারেনি উর্জা। কলকাতায় ছিল না। দুর্গাপুরে গিয়েছিল অফিসের কাজে। এই সব কিছুই তো দূরে বসে বীরেন্দ্রর সাহায্যে উর্জাই ব্যবস্থা করেছে!
আজ দুপুরে কলকাতায় ফিরেই রানাকে ফোন করেছিল ও। বলেছিল, আজকেই বিকেলের দিকে হাসপাতালে যাবে উর্জা। কিন্তু রাজুকে যেন ওর যাওয়ার ব্যাপারে কিছু না বলে। কে জানে বললে আবার কী করে বসবে! রাজুর যে মাথার ঠিক নেই এখন। না হলে ওরকম একটা অচেনা জায়গায় গিয়ে কেউ ঝামেলা করে! মাথা গরম করে!
তবে ভাল কথা একটাই যে, জিকোর সেই জেঠিমার একটা থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সোনারপুরের কাছে একটা ভাল ওল্ড এজ হোম-এ ভদ্রমহিলাকে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।
বিনির ওপর রাগ হয়েছিল উর্জার। অশান্তিতে পড়েছে যখন, সেটা ওকে না বলে কেন রাজুকে বলতে গিয়েছে কেন ও! রাজুর ক্ষমতা কি বীরেন্দ্রর চেয়ে বেশি!
তাও সব মিটে যাওয়ার পরে বিনিকে ফোন করে একটু বকেইছে উর্জা। বলেছে, “তুই তোর ভাইকে আমাকে ফোন করতে বলিসনি কেন প্রথমে? কেন রাজুকে ফোন করতে বলেছিলিস? জানিস না ও কেমন! আর এ সব ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েন্স লাগে। রাজুর সে সব আছে? দেখ তো কী হল ওর!”
বিনি সে ভাবে কোনও উত্তর দেয়নি। শুধু বলেছিল, “তোকে বিরক্ত করতে চাইনি। তাই বলিনি।
বিরক্ত! উর্জা কেন বিরক্ত হবে! এ সব কথা আসে কেন! তা হলে বিনির মনে কি ওর সম্বন্ধে কোনও খারাপ লাগা আছে! এমন খারাপ লাগা যা মানুষকে ঝগড়া করায় না, কিন্তু বৃষ্টির জলে ভাসানো কাগজের নৌকোর মতো নিঃশব্দে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে যায় একে অপরের থেকে দূরে! আজকাল মনে হয়, কিছুই জানে না উর্জা। মনে হয় কাউকেই চেনে না। শুধু অবাক হয়ে ভাবে, এ সবের কি কোনও গূঢ় ব্যাখ্যা আছে? নাকি মাঝে মাঝে মানুষ এমন সব কাজ করেই থাকে, যার কোনও সঠিক ব্যাখ্যা হয় না!
জিকোর জেঠিমাকে ওখানে রাখতে ভাল খরচ আছে। বীরে । ওই সংস্থার ডিরেক্টরকে বলে একটা ডিসকাউন্ট করিয়ে দিলেও, তাও মাসে পনেরো হাজার দিতেই হবে। সেটা সুনীলবাবু আর বিনি ভাগ করে দেবে। বিনির দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু উর্জা জানে, বিনি দেবেই।
রাজু দম নিল একটু। তার পর বলল, “আমি রানার কাছে শুনেছি তুমি কী করেছ। জেঠিমার একটা থাকার জায়গা হয়েছে, এটা খুব ভাল কথা। আর সত্যি বলতে কী, এমনটা হবে আমি ভাবিনি! ওখানে পিলু নামে একজন আমায় গায়ে হাত দিয়েছিল আগে। আর আমার মাথা ফাথা তো খারাপ ছিলই। কোথা থেকে যে আচমকা কী হয়ে গেল! আমিও নিজেকে সামলাতে পারিনি।”
“ঠিক আছে, ও সব কথা এখন থাক। যা হওয়ার হয়েছে,” উর্জা ব্যাগ থেকে একটা বড় চকোলেট বের করে ওর পাশের ছোট টেবিলটায় রাখল। বলল, “এটা খেয়ো। আর স্ট্রেস করবে না একদম। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমায় দু’-একদিনের মধ্যে ছেড়েও দেবে ঠিক। তোমার মা এসেছিলেন এখানে?”
রাজু মাথা নিচু করে নিল।
উর্জা যা বোঝার বুঝল। বলল, “আসবেন কী করে? পায়ে ব্যথা তো। আমারই বোঝা উচিত ছিল।”
রাজু বলল, “রানার কিছু হলে কি মা বাড়িতে থাকত?” উর্জা বলল, “ছাড়ো এ সব কথা। তুমি এ সব বলছ কেন? চার বছর আগে কিন্তু এমন বলতে না। কী হয়েছে তোমার? এমন হয়ে যাচ্ছ কেন?”
রাজু চোয়াল শক্ত করল। তার পর ধীরে ধীরে বলল, “চার বছর অনেকটা সময় উৰ্জা! একটা ওয়ার্ল্ড কাপ থেকে আর একটা ওয়ার্ল্ড কাপ হয়ে যায়। ক্লাস সিক্সে পড়া ছেলে চার বছরে মাধ্যমিক দিয়ে দেয়। সদ্যোজাত বাচ্চা চার বছরে রীতিমতো স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে পোক্ত হয়ে যায়। আর আমি পাল্টাব না? আটত্রিশ-ঊনচল্লিশ বছর বয়স হয়ে গেল! কিন্তু ঠিক মতো এখনও কোনও প্রফেশন হল না। পার্টি থেকে কিছু টাকা পাই। পার্টির দাদাদের হয়ে গোস্ট রাইটিং করে মাঝে মাঝে কিছু পাই। টিউশনি করি কয়েকটা। তাও পার্টির কাজ থাকে বলে টিউশনে কামাই হয় মাঝে মাঝে। লোকে পড়ানো ছাড়িয়ে দেয়। সংসারের খরচ চালাতে মাকে সেলাই করতে হয়। রাতে যখন ভাতের থালা এগিয়ে দেয়, এমন মুখ করে দেয়, যেন রাক্ষসকে নিজের সন্তান খেতে দিচ্ছে! চার বছরে সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে আমার। আমি পার্টি ছাড়তে চাই। তার সঙ্গে কলকাতাও ছাড়তে চাই এখন। এ সব ফেলে চলে যেতে চাই ঠিক মতো একটা কাজ পেলে।”
উর্জা বলল, “আমি কাজ জোগাড় করে দিতে পারলে তুমি নেবে?”
“কেন নেব না? আমার অমন মেল ইগো নেই। কিন্তু আমি আর-একটা জিনিস চাই। আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা থিতু হোক। আমার আর তোমার থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছে করে না। জানি, এমন ভাবা ঠিক নয়। সেই ভাস্কর চক্রবর্তী বলেছেন না, এত কিশোর হলে চলবে কী ভাবে? সেটা বুঝেও এমন মনে হয়। আমার, তোমার থেকে দূরে থাকতে এখন ফিজিকালি একটা কষ্ট হয়। মাথার মধ্যে কেমন যেন করে। বুকের ভেতরে একটা চাপ ব্যথা হয়ে থাকে।”
উর্জা বলল, “ঠিক আছে। আর এ সব বোলো না। আমি দেখছি।” “না দেখছি নয়। আমি সুস্থ হয়েই তোমার বাড়ি যাব। তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলব। আমার আর এ ভাবে ঝুলিয়ে রাখতে ভাল লাগছে না কিছু।”
উর্জা তাকাল ওর দিকে। পাগল হয়েছে নাকি? বীরেন্দ্রর কাছে যাবে! বীরেন্দ্র যে কী সাংঘাতিক অর্থোডক্স ও কি বলেনি! তার ওপর বড়লোকের ছেলে হলে কিছু একটা কনসিডার করত বীরেন্দ্র। কিন্তু রাজুকে মানবেই না। বীরেন্দ্রর জীবনের গোটাটাই সেই পুরনো সামন্ত প্রভুদের মনোভাব দিয়ে গড়া। রাজু ওর কাছে গেলে বিশাল গন্ডগোল হবে।
মনে মনে ভয় পেল উর্জা। ও তো অফিসে চেষ্টা করছে আবার দেশের বাইরে চলে যেতে। মঞ্জীভকে বলেওছে সেই ভাবে।
মঞ্জীভ তো প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ওর ওরকম কথা শুনে। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এই তো দেশে ফিরলে! আবার বাইরে যাবে? কেন? আর যাবেই যদি, তা হলে এত কাঠখড় পুড়িয়ে দেশে ফিরলে কিসের জন্য?” উর্জা বলেছিল, “আমার কিছু পার্সোনাল প্রবলেম হচ্ছে এখানে। প্লিজ স্যর, একটু দেখবেন। না হলে আমায় হয়তো অন্য জায়গায় কাজ নিয়ে বাইরে চলে যেতে হবে।”
“আরে চিল! চিল!” মঞ্জীভ হেসে হাত তুলে ওকে আশ্বস্ত করেছিল, “অন্য জায়গায় কিছু করতে হবে না। আমাদের ইউরোপে দুটো সাইট আছে আর নিউ জিল্যান্ডে আছে একটা। দেখছি কোথায় তোমায় প্লেস করা যায়। তুমি টেনশন নিয়ো না। আসলে ইউরোপে কোভিড-এর জন্য বিশাল টেনশন চলছে জানোই তো। তাই যা করতে হবে তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমি দেখছি।”
“আর সার, আমার বয়ফ্রেন্ডও আমার সঙ্গে যাবে। ওর জন্য যদি কিছু একটা কাজ দেখে দেন! মানে ইটস ভেরি ভেরি ইমপর্ট্যান্ট!” উর্জার বাধোবাধো ঠেকছিল কথাটা বলতে। কিন্তু ও জানত লজ্জা করলে আর হবে না।
মঞ্জীভ একটু থমকে গিয়েছিলেন। এমন ধরনোর কথা তো খুব একটা শুনতে হয় না। কর্পোরেট কালচারে সবটাই যে দম দেওয়া পুতুলের মতো চলে। সেখানে কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অন্য কিছুর জায়গা নেই।
“সরি স্যর। বাট ইটস আ নেসেসিটি। না হলে আমি এ ভাবে বলতাম না আপনাকে,” উর্জা চোয়াল শক্ত করে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল।
মঞ্জীভ হেসে বলেছিলেন, “সে বুঝতে পারছি। না হলে তো আবার তুমি অন্য জায়গায় কাজ খুঁজবে।”
ঊর্জা সময় নিয়েছিল একটু। তার পর মাথা নেড়ে জানিয়ে দিয়েছিল যে, মঞ্জীভ ঠিকই বলছেন।
মঞ্জীভ এবার শব্দ করে হেসে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, “আই লাইক ইওর অনেস্টি। ঠিক আছে। আমাদের সাব-কন্ট্রাক্টে অনেক প্রাইভেট ফার্ম কাজ করে। কিছু একটা হয়ে যাবে। ডোন্ট ওয়ারি। শুধু ওর পেপার্সগুলো আমাকে দিয়ো। মানে কী পড়েছে। কী ডিগ্রি আছে। সার্টিফিকেটস। মার্কশিটস। এটসেট্রা… গট ইট?”
উর্জা জানে, একবার যদি রাজুকে সঙ্গে করে বিদেশ যেতে পারে, তা হলে আর চিন্তা নেই। সব ঝামেলা মিটে যাবে। ও একটা জিনিস বুঝেছে, রাজুকে বীরেন্দ্রর মুখোমুখি হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। তা হলেই সব ভন্ডুল হয়ে যাবে। ওর বিদেশে বদলি আর তার সঙ্গে রাজুকে নিয়ে যাওয়ার আগে অবধি সব কিছু ব্যালেন্স করে রাখতে হবে ওকে। তার জন্য ওকে যা করতে হয় ও করবে।
উর্জা দেখল, রাজু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও বুঝল, এখন কিছু বললেই ঝগড়া করবে রাজু। জেদ দেখাবে। তাই শুধু শুধু ঝামেলা করে লাভ নেই।
আবহাওয়াটাকে একটু স্বাভাবিক করতে উর্জা হালকা গলায় বলল, “তুমি চুপ করো এখন। আগে সুস্থ হও। তার পর ভাবা যাবে। আর আমি দেখছি কী করা যায়।”
আরও কিছুক্ষণ থেকে উর্জা উঠল। ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হয়ে গিয়েছে। সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলা হচ্ছে।
রাজু বলল, “দু’-একদিনেই আমায় হয়তো ছেড়ে দেবে। তোমাকে আর এখানে আসতে হবে না। আমি বেরিয়ে দেখা করব। কেমন? সাবধানে থাকবে। বাকি আর আমি কী বলি!”
“কিচ্ছু বলতে হবে না,” উর্জা, রাজুর গালের দাড়ি ঘেঁটে দিয়ে বলল, “পাগল একটা। কে কী করল তাতে আমায় কষ্ট দেওয়া খালি! এর পর এমন করলে অ্যায়সা মারব না! কোনও ডাক্তার আর সেই ড্যামেজ রিপেয়ার করতে পারবে না। বুঝেছ?”
রাজু হাসল না। তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তার পর মৃদু গলায় বলল, “এই যে চলে যাচ্ছ, আমার যে কী কষ্ট হচ্ছে, তুমি বুঝবে না!”
উর্জা হাসল শুধু। সব কথার কি আর পাল্টা কথা হয়! বাইরে বেরিয়ে রানার সঙ্গে মামুলি দু’-চারটে কথা বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল উর্জা। কে জানে এখনও বৃষ্টি হচ্ছে কি না। বাড়ি ফিরতে ফিরতে উর্জার সাড়ে আটটা বেজে গেল। হাসপাতাল থেকে বাড়ি অবধি আসতে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কলকাতায় এত গাড়ি বেড়ে গিয়েছে যে, বলার নয়। ফ্লাইওভার করেও রেহাই নেই। বরং ফ্লাইওভার যেখানে রাস্তায় এসে মিশেছে সেখানে বটল নেক হয়ে যাচ্ছে সব। জ্যামের ঠেলায় মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়! তার মধ্যে আবার বৃষ্টি! সেই জন্য আরওই জট!
গ্যারাজে গাড়িটা রেখে একটু দ্রুতপায়ে বাড়ির দিকে গেল উর্জা। স্নান করতে হবে। হাসপাতালের সেই গন্ধটা এখনও যেন গায়ে, মনে লেগে আছে! খুব অস্বস্তি হচ্ছে!
“ম্যাডাম, স্যর আপনাকে ডেকেছেন। বাইরের বসার ঘরে আছেন।” উর্জা থমকে দেখল কবি এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। মুখে সেই এক অদ্ভুত নির্লিপ্তি! শান্ত ভাব।
উর্জা হাসল। বলল, “তুমি কেমন আছ? কয়েক দিন দেখা নেই! সেই পাখি দেখিয়ে হাওয়া!”
কবি বলল, “আমি ঠিক আছি। আপনি একটু যদি তাড়াতাড়ি যান। মানে স্যর কয়েকবার খুঁজেছেন। আমি আসছি ম্যাডাম।”
ওকে আর কিছু বলতে না দিয়েই কবি চলে গেল দারোয়ানদের ঘরের দিকে। উর্জা দেখল কবির চলে যাওয়াটা। মাথা নামিয়ে শান্ত ভাবে হেঁটে যাচ্ছে ছেলেটা। তার পর কী মনে হওয়ায় তাকাল একটু দূরের ছোট বাড়িটার দিকে। দেখল, সেখানে নীচের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কবির দিকেই তাকিয়ে রয়েছে জিনি।
বীরেন্দ্র বাইরের বসার ঘরে বসেছিল। পরনে সিল্কের কালো শার্ট আর সিল্কের কালো লুঙ্গি। হাতে টিভির রিমোট। এয়ার কন্ডিশনার চলছে গুনগুন শব্দে।
বীরেন্দ্রর সামনের নিচু টেবিলে একটা দামি স্কচের বোতল। সিঙ্গল মল্ট কথাটা দেখা যাচ্ছে। পাশেই বেঁটে কাচের গ্লাসে টলটল করছে সূর্যাস্ত রঙের পানীয়। কাজুবাদাম আর পেস্তা রাখা আছে একটা রুপোর প্লেটে। সারা ঘরে অ্যালকোহলের হালকা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে!
বীরেন্দ্র কম কিন্তু সোজা কথার মানুষ। উর্জা গিয়ে দাঁড়াতেই টিভিটাকে অফ করে দিল। তার পর রিমোটটা সামনের টেবলে রেখে দিয়ে কোনও রকম ভনিতা না করে বলল, “নেক্সট সানডে উমেশের বাড়ির লোকজন আসতে চান এখানে। বিয়ের ব্যাপারে কথা এগোতে হবে এবার। উমেশ দ্রুত বিয়ে করতে চাইছে। তা ছাড়া নেক্সট ইয়ারে ভোট। এখন থেকেই ব্যস্ততা শুরু। ওর বাবার নানা কাজও আছে। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়ব। তাই সবটা ফিক্স করতে চাইছেন দ্রুত। আমিও চাইছি।”
উর্জা থমকে গেল। এ যে আর এক নতুন ঝামেলা শুরু হল। সারা দিন অফিস করে, হাসপাতাল থেকে এসে এখন আবার এই!
বীরেন্দ্র একবারও ভাবে না যে, বাইরে থেকে মানুষ কী ভাবে কাজ সেরে ফেরে! ভাবে না যে, তার কোনও প্রবলেমও হতে পারে, শরীর খারাপ হতে পারে, সে ক্লান্ত থাকতে পারে। বাবার যা ইচ্ছে সেটাই যেন শেষ কথা! এই যে কথাগুলো বলল, সেটার মধ্যেও একটা প্রচ্ছন্ন আদেশ আছে। এই বয়সের একটা মেয়েকে কেউ কী করে এমন করে ফোর্স করতে পারে! মানে এটা একটা সভ্য সমাজ তো!
উর্জার মাথাটা গরম হয়ে গেল। ও চোয়াল শক্ত করল। ভাবল এর একটা শেষ হওয়া দরকার। এমন ভাবে তো কেউ সারাক্ষণ চাপ দিয়ে যাবে, সেটা হয় না! কিছু না বলতে বলতে মাথায় উঠে গিয়েছে একদম! অনেক হয়েছে ব্যালেন্স করে চলা! ভেবেছিল সব চুপচাপ সারবে। কোনও ঝামেলা করবে না। কিন্তু এই লোকটা ভাল কথার মানুষ নয়। ওকে যখন পুশ করতে শুরু করেছে, তখন এবার ওকেও পাল্টা দিতে হবে!
উর্জা বড় করে শ্বাস নিল একটা। তার পর বীরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে কেটে কেটে স্পষ্ট করে বলল, “আমি উমেশকে বিয়ে করব না। আমার ওকে পছন্দ নয়। আমার জীবন শুধুমাত্র আমার। তাই আমারটা আমি ঠিক দেখে নেব। তুমি এই নিয়ে প্লিজ কিছু ভেবো না।”
