৭. রাজু
পকেটে হাত দিয়ে চাবিটা দেখল রাজু। না, ঠিক আছে। এই নিয়ে চারবার ও দেখল চাবিটা। নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। বাড়ি থেকে চাবিটা নিয়ে ঠিক মতোই তো বেরিয়েছিল। বার বার এ ভাবে কোনও জিনিস ঠিক আছে কি না দেখাটা এক রকমের মানসিক অসুস্থতা। ও তো এমন নয়। তা হলে আজ এমন হচ্ছে কেন? টেনসড হয়ে আছে বলেই কি?
রাজু পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালটা মুছল। শীতের শেষ হলেও আজ দুপুর থেকে একটা ভ্যাপসা গরম পড়েছে। পার্টি অফিসে ওরা যেখানে বসে, সেখানে মান্ধাতার আমলের একটা ঘটঘটে ফ্যান আছে। গদার মতো কনভার্টার লাগানো ডিসি পাখা। সেটা থেকে হাওয়ার চেয়ে ঝুল পড়ে বেশি। শুধু সেতুদার ঘরে এসি চলে। শীত-গ্রীষ্ম সব সময় চলে। আর বাকিরা বাইরে বসে ঘেমেনেয়ে একশা হয়!
এটা মানতে পারে না রাজু। তুমি মানুষের কথা বলছ। সবার মাঝে থেকে কাজের কথা বলছ। লোকের সামনে বিড়ি বের করে খাচ্ছ। আর এদিকে ক্যামেরা, মিডিয়া অফ হলেই এসি, পাঁচশো টাকা দামের সিগারেট, পাঁচ হাজার টাকা দামের টি-শার্ট! এ সব দোগলাবাজি মানতে পারে না ও। চোখের সামনে লোকটা এমন হয়ে যাবে, ভাবতে পারেনি কোনও দিন!
তা ছাড়া রাজুর এও মনে হয়, কে জোগাচ্ছে এত টাকা? ওরা তো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলছে পার্টির জন্য। সেখানে সেতুদার এই লাইফ স্টাইল চলে কী করে? সেতুদা তো পার্টির হোলটাইমার। চাকরিবাকরি করে না। তা হলে? গৌরী সেনটা কে?
এ সবই ন্যায্য প্রশ্ন। কিন্তু রাজু বোঝে যে, এখন যা সময় পড়েছে তাতে সবাই নিজের ধান্দা গোছাতে ব্যস্ত। ন্যায্য প্রশ্নটাই এখন অন্যায্য।
“কী রে, তখন থেকে পকেটে হাত দিয়ে কী দেখছিস?” জহরদা জিজ্ঞেস করল।
জহরদা ওদের পার্টি-মেম্বার। বয়স পঞ্চাশ-বাহান্ন মতো। গড়িয়ার কোথায় একটা থাকে। বাড়িতে বউ আর এক ছেলে আছে। আগে চাকরি করত, কিন্তু সেটা গেছে। এখন একটা ছোট কোম্পানি খুলেছে। একেওকে ধরে পার্টির নাম ভাঙিয়ে নানা কনট্র্যাক্ট বের করে। এই যেমন কোনও সরকারি বিল্ডিংয়ের রঙের কনট্র্যাক্ট! কোনও স্কুলের চেয়ার-টেবিল সাপ্লাইয়ের কনট্র্যাক্ট। বা কোনও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের জন্য স্টেজ তৈরি করা, এই সব আর কী! রাজুর অবাক লাগে এই দেখে যে, সবার মাঝে থেকে জহরদা ঠিক কাজ বাগিয়ে নেয়। পৃথিবীতে সত্যি কিছু মানুষ আছে, যারা কথার জোরে কাজ বাগিয়ে নিতে ওস্তাদ। রাজু যদি এমনটা হতে পারত!
জহরদা সারাক্ষণ সেতুদার পিছন পিছন ঘুরে বেড়ায়! বয়সে জহরদা বড় হলেও পারলে সেতুদাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে দু’বেলা। তেল তেল! সারা দুনিয়া এর ওপরেই ভেসে আছে। টিকে আছে। রাজুর হাসি পায়। না, এ হাসি আনন্দের হাসি নয়। এ হাসি নিরুপায়, হেরে যাওয়া মানুষের হাসি।
আজ সেতুদা অফিসে এসেছে। তাই জহরদাও পিছন পিছন এসেছে। মাঝে মাঝে ফ্রাস্ট্রেটেড লাগে রাজুর। সবাই সব গুছিয়ে নিল। শুধু ওরই কিছু হল না। পার্টির জন্য খেটে মরল বেকার বেকার।
আগে কিন্তু এ সব মনে হত না। কিন্তু ইদানীং হচ্ছে খুব। নিজের ভেতরে একটা বদল টের পাচ্ছে ও। যে-আদর্শ ও সততার মাটিতে মনের নোঙর পোঁতা ছিল, সেটা ক্রমশ কেমন যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে। অন্য স্রোতে জাহাজ ভাসানোর সময় এল কি?
মা ওকে এই পার্টির হয়ে খাটাখাটনির জন্য বকাবকি করে মাঝে মাঝে। বাড়িতে খুবই টানাটানির সংসার। টিউশন করে আর ক’টা টাকাই-বা পায় ও! মাকে সেলাইয়ের কাজ করতে হয়। তাতেও খুব একটা সুরাহা হয় না।
রাজুর ওপর আর মায়ের কোনও ভরসা নেই। ওর ভাই পুলু খুব ভাল ছাত্র। যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। মা এখন আশা করে আছে, পুলু যদি কিছু করে জীবনে!
ক’দিন হল মায়ের শরীরটা ভাল নেই। দুটো হাঁটুই গেছে। ডাক্তার বলেছেন অপারেশন করাতে। কিন্তু তার জন্য টাকার দরকার। ‘নি রিপ্লেসমেন্ট’ কঠিন কাজ। কে দেবে ওকে অত টাকা! মা ওকে দেখলেই সেই নিয়ে কথা শোনায়। গঞ্জনা দেয়। কিন্তু তাতে মনখারাপ হয় না রাজুর। মনখারাপ হয় মাকে হাঁটুর ব্যথায় কাঁদতে দেখলে। কেবলই মনে হয় এত বয়স হল, কিন্তু জীবনে কিছুই করতে পারল না ও। না মানুষের জন্য কিছু করতে পারল, না নিজের বাড়ির লোকেদের জন্য, না নিজের জন্য। কেন বেঁচে আছে ও! কী হবে ওর বেঁচে থেকে!
“কী রে শালা? বোবা মেরে গেলি কেন? কী হয়েছে তোর?” জহরদা হাতের বিড়িটা সামনে রাখা একটা মাটির খুঁড়িতে পিষে দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
রাজু ঠোঁট চাটল। তার পর বিষণ্ণ গলায় বলল, “তোমার কাছে দুশো টাকা হবে? আমি সামনের মাসে দিয়ে দেব।”
জহরদা হেসে উঠে দাঁড়াল। তার পর পিছনের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে জিজ্ঞেস করল, “দুশো?” তার পর একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “রাখ এটা। ফেরত দিতে হবে না। তুই সেতুদার খাস লোক। তোকে এত ভালবাসেন দাদা। আমি কি তোর কাছ থেকে টাকা নিতে পারি?”
রাজু চোয়াল শক্ত করে সময় নিল একটু। কথার মধ্যে যে অন্য কথা লুকিয়ে আছে, সেটা বুঝতে পারল বেশ। কিন্তু সেই নিয়ে কিছু নারাজু টাকাটা নিয়ে বুকপকেটে রেখে বলল, “আমি নেক্সট মাসেই দিয়ে দেব!”
জহরদা হাসল, “শোন রাজু, বেকার চাপ নিস না। পাঁচশো কোনও টাকা আজকের দিনে? একটা পাঁইটেই চলে যায়। তুই শালা এমন চেপে থাকিস কেন রে? সারাক্ষণ এমন মুখ কালো করে থাকিস কেন? দেখলেই মনে হয় যেন মরে গিয়েছিস! গার্লফ্রেন্ড নেই, না! লাগাস-ফাগাস না নিশ্চয়ই!”
রাজু কিছু না বলে বিরক্তিতে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। এ সব ছাড়া যেন আর কোনও কথা নেই এদের!
“শোন না,” জহরদা নিজের চেয়ারটা টেনে কাছে আনল ওর। এই ঘরে সে ভাবে কেউ নেই। সেতুদার ঘরে কারা যেন এসেছে। বাকি লোকজন অফিসের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। পার্টি অফিসের বাইরেই একটা চায়ের দোকান আছে। সেখানে ভিড় করেছে সবাই।
জহরদা এত কাছে এসে বসেছে রাজুর যে, জহরদার গা থেকে কড়া বিড়ির গন্ধ পেল ও। বমি এল রাজুর। খারাপ গন্ধ একদম সহ্য হয় না ওর। ওর বন্ধু গুরান বলে, “শালা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে থাকিস। তাদের হয়ে গলা ফাটাস। আর খারাপ গন্ধ সহ্য হয় না! খেটে খাওয়া মানুষের গা দিয়ে কি ডিয়োডরেন্টের গন্ধ বেরোবে? এই নাক নিয়ে তুমি বিপ্লবী হবে?”
গুরান ঠিকই বলে। আর সত্যি বলতে কী, মানুষের শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ খুব একটা প্রীতিপ্রদ নয়। কিন্তু রাজুর খারাপ লাগলে কী করতে পারে ও?
রাজু একটু পিছন দিকে হেলে বসল। ভাবল, ও সেরকম মানুষ হলে ঠিক জহরদাকে সরে বসতে বলত!
জহরদা খেয়াল করল না সেটা। বরং আরও ঝুঁকে পড়ে কোনও গোপন কথা বলছে এই ভাবে বলল, “যা বলছিলাম, গড়িয়ার ওখানে আমাদের পাড়ায় দুটো বাড়ি ভেঙে আমি একটা মাল্টিস্টোরিড বানাতে চাই। ওখানকার পার্টির ছেলেরা ঝামেলা করছে। আমি যে একই পার্টি করি, সেটা বলেও কাজ হচ্ছে না। তুই একটু বলে দে না সেতুদাকে। তোকে তো ভালবাসে খুব। একটু বলে দে না ভাই। আমি দু’-একবার বলার চেষ্টা করেছিলাম। শালা, সেতুদা উল্টে আমার পেছনে ভরে দিয়েছে! জানিস তো কী সাংঘাতিক মাল! নিজের হাতে কত মানুষ খুন করেছে তার ঠিক নেই। তাই আর সাহস পাই না। বুঝিসই তো। তেলে-জলে রাখতে হয় এদের। তোর ব্যাপার অন্য। তুই করিয়ে দে ভাই। তোকে কিছু দেব।”
“দেবে মানে?” রাজু ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“মানে, তুই সেতুদাকে বলে কাজটা করিয়ে দে। তোকে পঞ্চাশ হাজার দেব। শোন, এ সব খারাপ কাজ নয়। সব কাজের জন্য পারিশ্রমিক হয়। এই যে সেতুদা। এত টাকা পায় কী করে! বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টদের কাজকর্মের সেটিং করিয়ে দেয় নেতা-মন্ত্রী ধরে। সেখান থেকে ভাল কাট পায়। ব্রোকারেজ। বহু বাঙালির আদি ব্যবসা ভাই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় থেকে এ সব করে কত বাঙালিবাবু কত টাকা করল! তুইও কর। জানবি এটা পারিশ্রমিক। রোজগারের পন্থা। কখনও কোনও কাজ ফ্রিতে করবি না। বুঝলি?”
রাজু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। হাফ ইতিহাস জানলে এই হয় মুশকিল। হাবিজাবি কথা বলে মানুষ। মোটেও বাঙালিবাবুরা শুধু এই ভাবে
রোজগার করেনি। কিন্তু রাজু জানে, জহরদা অর্ধশিক্ষিত লোক। ওকে এই সব নিয়ে বলে লাভ নেই। কলোনিয়াল হিস্ট্রিতে বাঙালিকে যে কত অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে, সেটা নিয়ে ক’জন মাথা ঘামায় এখন।
জহরদা আবার বলল, “কেউ কোনও কাজ ফ্রিতে করে না। তুইও করবি না। আমি শালা সেতুদার পিছনে পিছনে ঘুরি বটে, কিন্তু দাদা খুব একটা পাত্তা দেয় না। ভাই এটা করিয়ে দে। ঠিক আছে শোন, এখন ক্যাশ পঞ্চাশ দেব। পরে কাজ কিছু আটকে গেলে সেটাও সেতুদাকে বলে ক্লিয়ার করিয়ে দিলে আরও দেব। দারুণ একটা অপরচুনিটি এসেছে। তুই একটু বল। প্লিজ।”
রাজু কিছু বলার আগেই সেতুদার চেম্বারের দরজাটা খুলে গেল হঠাৎ। জহরদা তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল। মানে ব্যাপারটা এমন, যেন ক্লাসে স্যর ঢুকেছেন!
সেতুদার ঘর থেকে চারজন মানুষ বেরিয়ে গেল কোনও দিকে না তাকিয়েই। দেখলেই বোঝা যায় সব মালদার পার্টি। সারাটা ঘর তাদের গা থেকে আসা সুন্দর গন্ধে ভরে উঠল। রাজুর আবার গুরানকে মনে পড়ল।
গুরান, ওদের পাড়ায় মানে, টালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে থাকে। একটা ছোট্ট ইলেকট্রিকাল গুডসের দোকান আছে ওর। সঙ্গে মোবাইলও সারায়।
গুরানের দোকানে সারাক্ষণ লো ভলিউমে রেডিয়ো বাজে। এমনিতে সবার সামনে চুপচাপ থাকে গুরান। কিন্তু রাজুর সঙ্গে অনেক কথা বলে। জীবনে ওর যেটুকু কথা, সেটা যেন শুধু রাজুর সঙ্গেই।
“রাজু, এদিকে আয়,” সেতুদা ঘরের ভেতর থেকেই ডাকল।
রাজু উঠে সেতুদার ঘরের দিকে এগোল। পাশ থেকে জহরদা চাপা স্বরে, সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক করার মতো গলায় বলল, “পঞ্চাশ হাজার, পঞ্চাশ হাজার।”
রাজু চোয়াল শক্ত করে সেতুদার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। পঞ্চাশ হাজার অনেক টাকা। ওর পক্ষে চার মাসেও রোজগার করা সম্ভব নয়। আর অন্যায় তো করছে না কিছু।
কিন্তু ক্যাশ দেবে জহরদা। মানে হিসেবের বাইরের টাকা এটা। কালো টাকা। এটা হাত পেতে নিলে, যে-সামাজিক ব্যবস্থা আর কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ওদের লড়াই, সেই দিকেই কি চলে যাবে না রাজু?
সেতুদার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল রাজু।
সেতুদার বয়স ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ মতো। রোগা, ফর্সা মানুষ। পরিষ্কার করে দাড়ি-গোঁফ কামানো। মাথায় জেল দিয়ে সেট করা চুল। সারাক্ষণ মুখে দারচিনি রেখে চিবোয়।
“বোস,” সেতুদা সামনের চেয়ারটা দেখাল রাজুকে।
রাজু বসল। এই ঘরে ঢুকে আরাম লাগছে। এসিটা এত মোলায়েম। ওর মায়ের মুখ মনে পড়ল। ওদের গুমটি ঘরে কলকাতার গরমের মধ্যে মাথা নিচু করে সেলাই করে মা। আচ্ছা, পঞ্চাশ হাজারে একটা এসি তো হয়েই যাবে, না? আসলে ওর ধারণা নেই এ সবের দাম কত। কিন্তু এসি কিনলেই তো আর হবে না। ইলেকট্রিকের বিলটা কে দেবে? সেটাও তো শুনেছে বেশ ভালই আসে এসি চালালে।
সেতুদা জিজ্ঞেস করল, “মাসিমা কেমন আছেন রে? পায়ের ব্যথাটা কমেছে?”
“না সেতুদা। ও অপারেশন না করলে হবে না। হাঁটু বদলাতে হবে,” রাজু দীর্ঘশ্বাসটা লুকিয়ে ফেলল।
রাজুর মনে হল এখানেই ওর সঙ্গে ধান্দাবাজ জহরদার পার্থক্য। ওযে দীর্ঘশ্বাসটা গিলে নিল, জহরদা হলে সেটাই স্টিম ইঞ্জিনের মতো শব্দ করে ছাড়ত। দেখাত কত কষ্টে আছে। ও দেখেছে, ধান্দাবাজ মানুষজন সারাক্ষণ নিজের দুঃখকষ্ট অন্যের সামনে সেন্টিমেন্টে মুড়ে বিক্রি করে সুযোগসুবিধে নেওয়ার চেষ্টা করে। আর কী অবাক করার মতো ব্যাপার, তারা সুবিধেও পেয়ে যায়!
সেতুদা মাথা নাড়ল। তার পর প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “শোন, যা বলার ছিল। আমাকে একটা বড় নিউজ পেপার থেকে লিখতে বলেছে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। পরশু লাগবে লেখাটা। এই ধর হাজার শব্দের মধ্যে। তুই যেমন লিখিস, সে ভাবে লিখে দিস, কেমন? আমার দিকটা হবে কঠিন ভাষায় সমালোচনা। পুঁজিবাদের কাছে আমরা মাথা নত করেছি বলেই দেশের আজ এই অর্থনৈতিক দুর্যোগ। এর ওপর বেস করে তথ্য-টথ্য দিয়ে খাড়া করে দিস একটা। বুঝলি?”
রাজু মাথা নাড়ল। এই লেখার কাজটা ও করে দেয়। সেতুদাই শুধু নয়, পার্টির আরও দু’-একজন নেতার হয়ে ও লিখে দেয়। যে-টাকাটা তাঁরা পান, সেটা ওঁরা রাজুকেই দেন।
“ঠিক আছে সেতুদা,” মাথা নাড়ল রাজু।
“তা, এই জন্যই ডাকলাম তোকে। প্লাস কলেজ স্কোয়ারে সেদিন
মিটিংয়ের পরে আমায় বেরিয়ে যেতে হল তাড়াতাড়ি। দেখাই হল না তোর সঙ্গে। তাই জিজ্ঞেসও করার ছিল তোর কী খবর! কাজকর্ম কেমন হচ্ছে?” রাজু হাসল একটু।
সেতুদা উঠে দাঁড়াল, “বাড়ির কিছু দরকার হলে বলিস। সব সময় এমন নতুন বউয়ের মতো লজ্জা লজ্জা মুখ করে ঘুরিস না।”
রাজু মাথা নাড়ল। তার পর মনে মনে বলল, ‘সেতুদা আমার মায়ের অপারেশনটা যাতে বিনে পয়সায় হয়ে যায় সেটা একটু ব্যবস্থা করে দাও।’
কিন্তু মুখে বলল না। বরং ঠোঁট কামড়ে, ভেবে বলল, “একটা কথা ছিল।”
টেবিল থেকে দুটো মোবাইল তুলে পকেটে ভরে ওর দিকে তাকাল সেতু। ডান হাতের কব্জিতে বাঁধা লাল ডোরগুলো ঠিক করতে করতে ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল, “কী!”
রাজু সময় নিয়ে ছোট করে গুছিয়ে জহরদার ব্যাপারটা বলল। সেতুদা শুনল পুরোটা। তারপর হেসে টেবিল ঘুরে এগিয়ে এল ওর কাছে। বলল, “জহরদা কত দেবে বলেছে তোকে?”
রাজু ঘাবড়ে গেল। সেতুদা বুঝে ফেলেছে। ও কোনও মতে লজ্জার সঙ্গে বলল, “ইয়ে… মানে পঞ্চাশ হাজার।
সামনের বছর বিধানসভা নির্বাচন। খুব টাফ ফাইট হবে। সেতুদার ওপর পার্টির অনেক কিছু নির্ভর করছে। সেতুদা টিকিট তো পাবেই আর এমন কথাও হাওয়ায় উড়ছে যে, সেতুদা নাকি একটা ভাল ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী হতে পারে।
“পাগল নাকি? আমি তোকে পছন্দ করি রাজু। ওই জায়গায় দুটো বাড়ি ভেঙে একটা বড় মাল্টিস্টোরিড বিক্রি করে ও কত কামাবে জানিস? সেখানে আমাকে বলে কাজ করিয়ে দেওয়ার জন্য পঞ্চাশ হাজার দেবে তোকে! দশ লাখ চাইবি তুই। আমায় কিছু দিতে হবে না। সবটাই তোর। আমি অন্য কিছু নিয়ে নেব ওর থেকে। যদি তোকে দশ লাখ দেয়, তা হলে আমি করে দেব কাজটা। বুঝেছিস? কিন্তু আমার নাম বলবি না যে, আমি এ সব বলেছি।”
রাজু হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
সেতুদা আলতো করে ওর গালে চাপড় মেরে বলল, “নিজের ভালটা বোঝ গান্ডু। এটা বিজনেস বুঝলি, বিজনেস। রাজনীতি হল চয়ে বড় বিজনেস! চিরকাল ছিল। চিরকাল থাকবে। চল এখন। আমি বেরোই।” “এত টাকা!” রাজু ঘাবড়ে গেল!
“দশ লাখ অত হল! জানিস, কত টাকায় এমন সব কাজ হয়!
নিজেকে আন্ডারভ্যালু করিস না। কিছুই তো শিখলি না। গাধা একটা। তোদের ব্যাপারটা বুঝি না। কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে কী মহত্ত্ব আছে রে? চার্বাক পড়িসনি? সেই আর্কিটাইপ বঞ্চিত ভাল ছেলে হয়ে সারা জীবন কাটাতে চাস? বাংলায় আর এখন সেই আর্ট ফিল্ম তৈরি হয় না, জানিস না? ওয়েক আপ রাজু। জেন্টলম্যান বনে যা। এখন আয়।”
সেতুদার সঙ্গে সঙ্গে জহরদাও বেরিয়ে গেল পার্টি অফিস থেকে। ভাগ্যিস গেল! না হলে এখনই ধরত ওকে, কাজের কী হল বলে। কী করে জহরদাকে অত টাকার কথা বলবে ও? এটা সম্ভব নাকি! রাজুর অপরাধ বোধ হতে লাগল।
ও পার্টি অফিসের বাইরে এসে দেখল, সেতুদা বেরিয়ে গেল গাড়ি করে, সঙ্গে আরও দুটো জিপ ধরনের গাড়ি গেল। তাতে ভর্তি লোকজন। সারাক্ষণ যেন একটা পাড়া নিয়ে ঘুরছে লোকটা!
সামনের বছর বিধানসভা নির্বাচন। খুব টাফ ফাইট হবে। সেতুদার ওপর পার্টির অনেক কিছু নির্ভর করছে। সেতুদা টিকিট তো পাবেই আর এমন কথাও হাওয়ায় উড়ছে যে, সেতুদা নাকি একটা ভাল ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী হতে পারে।
মোবাইলটা বের করে দেখল রাজু। ঝকঝকে স্মার্ট ফোন! ওর হাতে বড্ড বেমামান। এই ফোনটা দেখলেই ওর কেমন একটা হীনম্মন্যতা হয়। মনে হয় বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা। কিন্তু উপহার যে! কী করবে! তাই ফেলতেও পারে না। এর আগের সব ফোনই ওকে অফার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
রাজু দেখল মেসেজটা এসেছে। পেটের মধ্যেকার পুকুরটায় কে যেন টুপ করে একটা নুড়ি ফেলল!
যাদবপুরের এইট বি ছাড়িয়ে সুলেখার দিকে যেতে গেলে বাঁ দিকে একটা পাড়া আছে। রবীন্দ্রপল্লি। সেখানে রাজুর এক বন্ধুর বাড়ি আছে। ফাঁকা থাকে বাড়িটা। কারণ, বন্ধু বিদেশে থাকে। সেখানেই যেতে হবে ওকে।
ও সময় দেখল। সাড়ে পাঁচটা বাজে। এই মনোহরপুকুর থেকে ওখানে যেতে টাইম লাগবে। ও সেই মতো মেসেজে জানিয়ে দিল ক’টা নাগাদ ও পৌঁছবে।
রাজুর আবার মনে হল চাবিটা হাত দিয়ে দেখে, ঠিক আছে কি না! কিন্তু নিজেই নিজেকে ধমকে থামাল ও। এ এক ধরনের পাগলামো। এ সবকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। সামান্য ব্যাপারে এত টেনশনের কী আছে!
ওর এখন অন্য একটা কাজ রয়েছে। দেশপ্রিয় পার্কের কাছে একটা দোকান আছে। সেখানে বারোটা ব্লাউজ দিতে হবে। অল্টার করে মা ওকে দিয়ে দিয়েছে। দোকানের বয়স্ক মাসিমা ওর মাকে কাজকর্ম দেয়। যদিও রাজুকেই সে সব দেওয়া-নেওয়া করতে হয়।
মনোহরপুকুর থেকে দেশপ্রিয় পার্কের ওই দোকানটা হেঁটে পাঁচ মিনিট। রাজু কাঁধের ব্যাগটা সামলে হাঁটা দিল।
দোকানের সামনে এসে রাজু দেখল, বেশ ভিড় আছে দোকানে। দেখল, নতুন সাইনবোর্ড লাগিয়েছে মাসিমা। দোকানের নাম ‘সুলগ্না টেলার্স’! শেষ বিকেলের এই নরম হয়ে আসা আলোয় শব্দ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
মাসিমা ভিড়ের মধ্যেও দেখতে পেল রাজুকে। হাত তুলে ডাকল, “অভ্যুদয়, তুমি সাইড দিয়ে সাইড দিয়ে চলে এসো।”
রাজু সে ভাবেই মানুষজনকে কাটিয়ে এগোল কাউন্টার অবধি। তার পর পাশের ঝোলা থেকে ব্লাউজগুলো বের করে মাসিমার সামনের শোকেসের ওপরে রাখল।
মাসিমা একটা একটা করে ব্লাউজ় হাতে নিয়ে দেখে নিল ভাল করে। তার পর একটা ছোট্ট ক্যালকুলেটর বের করে হিসেব করল। পাশের ড্রয়ার থেকে চারশো আশি টাকা আর ভাড়া বাবদ আরও চল্লিশ টাকা বের করে হাতে দিল রাজুর।
রাজু ধন্যবাদ জানিয়ে টাকাটা ঢুকিয়ে নিল পকেটে। মাসিমা আর-একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে বলল, “এখানে আরও এক ডজন আছে। পাঁচ দিন টাইম। কোনটার কত সাইজ অল্টার হবে লেখা আছে। মনে করে দিয়ে যেয়ো অভ্যুদয়। কাজের চাপ আছে।”
রাজু হাসল। তার পর মা যেমন শিখিয়ে দিয়েছিল, তেমন ভাবে বলল, “মা বলছিল, যদি নতুন ব্লাউজের অর্ডার দেন। মা তো বেশ সুন্দরই তৈরি করে। অল্টারে আর কী হয়! আসলে কাজের দরকার ছিল আর কী।”
মাসিমা মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে পরের সপ্তাহে দেব না হয় দুটো। কাজ দেখে তার পর বাড়াব, কেমন! আর এগুলো টাইম মতো দিয়ো কিন্তু। বুঝেছ? মা ভাল আছে তো?”
রাজু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। যারা ক্লায়েন্ট, তাদের কাছে কখনও শরীর খারাপের কথা বলতে নেই। কারণ, তা হলে আর কাজ পাওয়া যায় না।
দোকান থেকে বেরিয়ে পাশের একটা চকচকে পানের দোকানে গেল রাজু। একটা চকোলেট বার কিনল। তার পর ব্যাগে ঢুকিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগোল। সময় মতো পৌঁছোতে হবে।
রবীন্দ্রপল্লির মোড়ে যখন বাস থেকে নামল রাজু, তখন সাড়ে ছ’টা বেজে গিয়েছে। পনেরো মিনিট লেট ও। হবেই। রাস্তায় যা জ্যাম! পৃথিবীর সমস্ত লোক যেন এই শহরটায় এসে বাসা বেঁধেছে!
বড়রাস্তা থেকে পাড়ার ভেতরে ঢুকল রাজু। পাশেই একটা টিউবওয়েল। সেটা টিপে জল নিয়ে মুখে-চোখে দিল। সারা দিনের ক্লান্তি আর ধুলো-ময়লা কিছুটা হলেও তো ধুয়ে যাবে।
এই রাস্তা থেকে কিছুটা এগিয়ে আর-একটা গলিতে ঢুকতে হয়। বাড়িটা ওই গলির একদম শেষে। আশপাশে আরও দু’-একটা বাড়ি আছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি তেমন জোরালো নয়। মোটের ওপর পাড়াটা একদম শান্ত। চুপচাপ।
ওর বুকের মধ্যে কেমন একটা করছে। এই বাড়ির চাবিটা ওর কাছে বছরখানেক হল আছে। মাঝে মাঝে লোক নিয়ে এসে পরিষ্কার করে যায় ও। কিন্তু এ ভাবে নিজের জন্য ব্যবহার করেনি কোনও দিন। তাই কেমন একটা লাগছে। আসলে নিজের ব্যক্তিস্বার্থে কোনও কিছু করতেই কেমন একটা বাধো বাধো ঠেকে রাজুর। ও জানে, এটা এখনকার দিনে দুর্বলতা। এটাকে কাটিয়ে উঠতে হবে ওকে। না হলে জীবনে কিছু করতে পারবে না। পৃথিবী চিরকালই বীরভোগ্যাদের। কিন্তু এখন বীরের সঙ্গে দু’কান কাটা নির্লজ্জ, সেয়ানা আর তেলবাজ-ভোগ্যাও হয়েছে! সেটা অন্তত কিছুটা না হতে পারলে চিরকাল ‘সাল্ক’ করে আর খিটখিটে মেজাজ নিয়ে সারা পৃথিবীর হাতে নিপীড়িত হতে হবে।
পাড়ায় একটা আলো খারাপ হয়ে আছে। বেশ অন্ধকার রাস্তা। ও এগিয়ে গিয়ে মেনগেট খুলে ঢুকল। বাড়িটার চারিদিকে পাঁচিল দেওয়া। ফলে ভেতরটাও আবছায়া হয়ে আছে।
গেট থেকে ছোট্ট একটা মাটির রাস্তা গিয়েছে মূল বাড়ি অবধি। সেই পথ পার করে ও আস্তে আস্তে ছোট্ট বারান্দাটায় উঠল। চোখ-সওয়া অন্ধকারে হাত বাড়াল তালার দিকে। না, তালা নেই। মানে এসে গিয়েছে ও। রাজু আলতো করে কড়া নাড়ল।
একটু পরেই দরজা খুলে গেল সামনে। আর এক ঝলক সুন্দর গন্ধ এসে ধুয়ে দিল রাজুকে। ওর মনে হল এবার সত্যিই সারা দিনের ক্লান্তি চলে গিয়েছে ওর!
রাজু ওই আবছা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখল দরজা খুলে দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে উর্জা!
