১. কবি
এটা বাড়ি না কেল্লা মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না কবি। কুড়ি ফুট উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল! সেই ওয়ালের ওপর পাঁচ ফুট উঁচু স্টেনলেস স্টিলের কাঁটাতার আর সেই কাঁটাতারেও আবার মোটা করে প্লাস্টিক লাগানো, যাতে কোনও ভাবেই বাইরে থেকে ভেতরের কিছু দেখা না যায়! এ ছাড়াও চারিদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা তো আছেই। বাড়ির সামনের দরজায় আর পেছনের দরজায় ছ’জন ছ’জন করে মোট বারো জন গার্ড। এত নিরাপত্তা! এত সতর্কতা! ভাবতেই পারে না কবি ৷
এই বাড়িতে মাস দুয়েক হয়ে গিয়েছে কবির। এতদিনে এখানকার আদবকায়দায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে ও। তাও মাঝে মাঝে অবাক লাগে। ও জানে বীরেন্দ্র ত্রিবেদী খুব নামী লোক। তার যেমন অনেক টাকা, তেমন শত্রুও অনেক। কিন্তু তাই বলে এতটা নিরাপত্তা!
বর্ডার ঘেঁষা এক গ্রামের ছেলে কবি। এখানে একরকম আশ্রিত হয়েই এসেছে। মানে, চাকরি একটা ওকে দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু ও জানে আসলে এটা একরকম আশ্রয়ই।
গ্রামে মা আছে ওর। আর কেউ নেই । বাবা মারা গিয়েছিল সেই ছোট বয়সে। তার পর থেকে গোট জীবন ওর মা আর ও অনেক কষ্টে কাটিয়েছে।
গ্রামে একটা গেস্ট হাউস আছে। সেখানে রান্না করে মা। কিন্তু তাতে আর ক’টা টাকাই-বা হয়! বাবা মারা যাওয়ার পরে, জ্যাঠা-কাকারা ওদের একটা টালির ঘর, চারটে সুপুরি গাছ আর দুটো নারকেল গাছ দিয়ে আলাদা করে দিয়েছিল। ওর মায়ের যদি ওই গেস্ট হাউসের চাকরিটা না থাকত, তা হলে যে কী হত কে জানে!
তবে হ্যাঁ, হাওয়াদাদু আছে। লোকটার ভাল নাম বিমল মুস্তাফি। পেশায় ডাক্তার। ওদের গ্রামের এক পাশে একটা বিশাল বড় বাড়িতে থাকে। সেই বাড়ির এক তলায় চেম্বার খুলে আগে মানুষটা রোগী দেখত ৷ কিন্তু বছর দুয়েক হল সেই সব বন্ধ করে দিয়েছে। রহমতকাকা বলে, “অনেক সেবা করেছেন। এবার নিজের শরীরের সেবা করেন।”
রহমতকাকা ওই বাড়ি আর সেই সঙ্গে হাওয়াদাদুরও দেখাশোনা করে। হাওয়াদাদুর বাড়িতে কবির অবাধ যাতায়াত। ও শুনেছে বাবাকেও নাকি খুব ভালবাসত হাওয়াদাদ, হাওয়াদাদুর কাছেই বাবার সম্পর্কে যা শোনার শুনেছে কবি। মা কখনওই বাবাকে নিয়ে সেই ভাবে কিছু বলে না।
কিন্তু হাওয়াদাদু বলে। বলে, “বিশু ছিল এক্কেবারে শিশুর মতো সরল। সারাক্ষণ একটা বিস্ময় নিয়ে ঘুরত। জানিস তো, যার মনে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা আছে, তাকে জীবনের কোনও দুঃখই ঘায়েল করতে পারে না। বিশুকেও পারত না। আকাশের ওই মেঘ দেখলে, ছোট্ট দুটো প্ৰজাপতি দেখলে, মণি নদীতে মাঝির গান শুনলে, নদীর পাশের মাঠে ছেলেদের ফুটবল খেলা দেখলে, সবেতেই খুব আনন্দ পেত ও। মানে, তোকে কী বলব কবি, সবেতেই কী যে বিস্মিত হত বিশু, ভাবতে পারবি না! কেবল বলত, প্রতিটা দিনই উপহার! চারিদিকে এত কিছু দেখতে পাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে, এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা চাইবে ও! এর সঙ্গে ওর মনটাও ছিল আকাশের মতো বড়। এত বড় মনের মানুষ আমি কোনও দিন দেখিনি আর। কিন্তু আফসোস একটাই, ভাল মানুষ বড় তাড়াতাড়ি চলে যায় পৃথিবী থেকে! বিশুর বেলাতেও তার অন্যথা হয়নি!”
কেন তাড়াতাড়ি চলে যায় হাওয়াদাদু? আর কে নিয়ে যায় গো?” বালক কবি টালুমালু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করত।
হাওয়াদাদু আনমনা হয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলত, “এই কেনটাই তো জানি না রে! তিনি কেন যে কী করেন, সেটা কেউ জানে না। আর ‘তিনি’ কে! সেটাও আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারল না। তিনি ফুলের ভেতরের গন্ধ। সূর্যের ভেতরের আলো। চাঁদের মধ্যেকার অপার জ্যোৎস্না।
মহাকাশের মধ্যেকার শূন্যতা। শূন্যতার মধ্যেকার শক্তি। শক্তির ভেতরের কোমলতা। তিনিই আবার শিশুর মনের সারল্য। নদীর জলের স্রোত । অন্নের মধ্যেকার ক্ষুধা নিবারণ। আগুনের দাহ্যগুণ। তিনি সর্বত্র বিরাজমান।”
কবি হাঁ হয়ে এ সব শুনত, কিন্তু বুঝতে পারত না ঠিক। শুধু মনে হত, হাওয়াদাদু যখন বলছে, তখন ভাল কথাই হবে। কিন্তু এত কথার পরেও বাবার তাড়াতাড়ি মারা যাওয়ার ব্যাপারটা ঠিক মীমাংসা হত না ।
ও মাকে এই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে মা-ও সেভাবে উত্তর দিত না। শুধু বলত, “খুব ভাল মানুষ ছিল। এটুকুই জেনে রাখ!”
সেটুকুই জেনে রেখেছে ও। মাকে আর বিরক্ত করেনি। আসলে ছোট থেকেই কবি কম কথার ছেলে। নিজের মধ্যে ডুবে, একা একা থাকার ছেলে।
মাকে সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করতে দেখেছে কবি। কিন্তু এখন যেন মা আর পারে না। আসলে বেশ কিছুদিন হল মায়ের শরীরটা বিশেষ ভাল নেই। তার ওপর ওকে নিয়ে চিন্তা করে খুব।
কবি মাকে জিজ্ঞেস করত, “কী হয়েছে মা? আজকাল সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকো কেন?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, “তোর কাজটা চলে গেল। এখন কী যে করবি! সারা জীবন পড়ে আছে। চিন্তা তো হবেই। তাই না?”
কবি জানে হাওয়াদাদু ওকে নিজের কাছে সহকারী হিসেবে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু মা রাজি হয়নি। মা আসলে চায় না এ ভাবে কবির জীবন কাটুক। এই ছোট্ট জায়গায় থেকে কবির মনেও শ্যাওলা ধরে যাক।
কবি মাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, “কিছু একটা ঠিক হয়ে যাবে। তুমি অত ভেবো না। আমি কয়েক জায়গায় বলে রেখেছি।”
মা বলেছিল, “কিছু হয়ে যায় না রে। হওয়াতে হয়। তবে একটা উপায় আছে। সেটা নিয়েই ভাবছি। অবশ্য হাওয়াদাদুর সঙ্গে একবার পরামর্শ করে নেব।”
মাস আড়াই আগের ঘটনা এটা। সেই ‘একটা উপায় আছে’ বলার দু’দিন পরে মা ওর হাতে একটা ছোট্ট রুপো বাঁধানো আয়না আর একটা ঠিকানা লেখা কাগজ দিয়েছিল। সঙ্গে দিয়েছিল পাঁচশো টাকার একটা নোট। বলেছিল, “এই ঠিকানায় গিয়ে বীরেন্দ্র ত্রিবেদীকে এই আয়নাটা দেখাবি। দেখবি, উনি তোর ব্যবস্থা করে দেবেন।”
“বীরেন্দ্র ত্রিবেদীটা কে মা?” আয়নাটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল কবি |
মা বলেছিল, “সে আছে একজন। অনেক দিন তাঁর কোনো খবর পাইনি। এই আয়নাটা দিয়েছিলেন আমায়। বলেছিলেন, দরকারে এটা সমেত তোকে যেন ওঁর কাছে পাঠাই। আমার আর কিছু বলার মতো নেই এ ব্যাপারে। তুই গিয়ে দেখা করিস।”
মাকে দেখে কবি বুঝেছিল, এর বেশি আর কিছু জানা যাবে না। মা এমনই। একবার দরজা বন্ধ করে দিলে পৃথিবীর কারও সাধ্য নেই সেটা খোলে।
মা শুধু বলেছিল, “আমি দেখে যেতে চাই যে, তুই নিজেরটুকু করে নিতে পেরেছিস। এখানে তো সে ভাবে কিছু হল না তোর।”
হ্যাঁ, সত্যি সে ভাবে কিছু করে উঠতে পারেনি কবি। ক্লাস টুয়েলভের পরে ও বুঝেছিল, রোজগার করার চেষ্টা না করলে সংসার আর চলবে না। তাই আর পড়াশোনো না করে কাজ খুঁজতে বেরিয়েছিল। আর পেয়েও গিয়েছিল কাজ। ছোট্ট একটা সার্কাসে খেলা দেখানোর কাজে ঢুকে পড়েছিল।
প্রথমে চার-পাঁচ মাস ধরে কাজ শিখেছিল কবি। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হত। সঙ্গে ছিল সবার ফাইফরমাশ খাটা। সে ভাবে মাইনে পেত না।
ফাইফরমাশ খাটা। সে ভাবে মাইনে পেত না । খাওয়া-পরাটুকু শুধু যা পেত। কিন্তু কষ্ট হলেও বাড়ি ফেরেনি। মায়ের ওপর আর বোঝা হতে চায়নি।
তার পর অবশ্য দিন ফিরেছিল। কাজ শিখে নেওয়ার পর ভাল মাইনেই ধার্য করা হয়েছিল ওর জন্য। আর কোনও অসুবিধে হয়নি।
ওর কাজটা বেশ বিপজ্জনক ছিল। একটা বড় লোহার জাল-কাটা গ্লোবের মধ্যে ফটফটে শব্দওয়ালা বাইক চালাতে হত কবিকে। আর, এর সঙ্গে চোখ বেঁধে শুধু শব্দ শুনে বন্দুক চালিয়ে লক্ষ্যভেদের খেলা দেখাত ও!
কিন্তু কিছুদিন পরেই সার্কাসের ব্যবসা পড়তে শুরু করেছিল। পুজো-পার্বণ ছাড়া খুব একটা রোজগার হত না। আজকাল লোকে টিভিতে আর মোবাইলে এত কিছু দেখে যে, তাপ্পিমারা তাঁবু, মুখে সাদা রং মাখা ছেলেমেয়ে, বেঁটে-লম্বা মলিন জামাকাপড় পরা জোকার বা নড়বড়ে কাঠের বেঞ্চওলা সিটকে তারা আর একদমই পাত্তা দেয় না!
তাও বছরখানেক টিমটিম করে চলেছিল সার্কাসটা। তার পর গত ছ’মাস আগে একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছে সব। সেই থেকে কবি একদম কাঠ-বেকার। তাই মায়ের কথা শোনা ছাড়া আর উপায় ছিল না ওর।
কবি মায়ের দেওয়া আয়নাটা ধরে এদিক-ওদিক দেখেছিল। ছোট্ট ইঞ্চি চারেক ডিম্বাকৃতি আয়না। চারিদিকে রুপোর কাজ করা ফ্রেম। একটা ছোট্ট হাতলও আছে। ওর অবাক লেগেছিল, এটা দেখালেই ওর একটা হিল্লে হয়ে যাবে! এমন তো সেই ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে পড়েছে! এই আয়নার মধ্যে কী আছে এমন? কোন রহস্য বহন করে চলেছে এই আয়না!
মায়ের কথা মতো কলকাতায় এসেছিল কবি। খুঁজে বের করেছিল বীরেন্দ্র ত্রিবেদীর বাড়ি। কিন্তু দারোয়ানরা কিছুতেই ওকে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেয়নি। আসলে ওর পোশাকআসাক দেখেই ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। রাগের সঙ্গে বলেছিল, এমন অনেকে আসে সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। বলেছিল, সবাই ফালতু পাবলিক!
তাও বাড়ির সামনে থেকে নড়েনি কবি! দু’দিন সামনে ক্রমাগত ঘোরাফেরা করার পরে তৃতীয় দিন দেখা পেয়েছিল বীরেন্দ্রর।
আসলে কলকাতায় কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না কবির। তাই ওই দুটো রাত ফুটপাথেই কাটিয়েছিল শীতের মধ্যে। সামান্য টাকা থেকে কোনও রকমে রুটি-ঘুগনি আর টাইম কলের জল খেয়ে ছিল দুটো দিন!
এই শহরে এর আগে আসেনি ও। মুক্তদহ নামে ওদের ছোট্ট গ্রামের পাশে এ যেন ময়দানবের তৈরি করা নগরী! টিভিতে আগে কলকাতা শহরের ছবি দেখেছিল। কিন্তু সামনে থেকে শহরটাকে দেখে ও বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল।
রাস্তার ওপরেই রান্না করে এরা। সবার সামনে বসে খায়। ফুটপাথের ধুলোর মধ্যে এ ভাবে এদের বাচ্চারা বেড়ে ওঠে। আর এর পাশেই আবার এত বড় শপিং মল। ঝাঁ-চকচকে বাড়ি। বড় বড় আলো। লম্বা দামি গাড়ি। মানে, পাশাপাশি এমন বৈপরীত্য দেখে বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিল কবি ।
তৃতীয় দিনের দিন সকালে উঠে ওর মনে হয়েছিল, হাতে আর মাত্র একশো বিরাশি টাকা পড়ে আছে। আজকের মধ্যে দেখা না করতে পারলে কাল ফিরে যাবে গ্রামে। এই শহরে আর এ ভাবে থাকতে পারবে না। ফিরে গিয়ে হাওয়াদাদুকেই না-হয় বলবে কিছু একটা দেখে দিতে। সে মা যা-ই বলুক, ও আর শুনবে না!
কিন্তু কবির ভাগ্য এমনই যে, সেদিনই দেখা হয়ে গিয়েছিল বীরেন্দ্রর সঙ্গে।
আগের দু’দিনের মতো সেদিনও আলিপুরে বীরেন্দ্রর বিশাল বাড়ির সামনের ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কবি। দারোয়ানরা ওকে চিনে গিয়েছিল এই দু’দিনে তাই নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছিল ওকে দেখে রাগ হয়ে গিয়েছিল কবির। কিন্তু ছোট থেকে নানান কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ও বুঝেছে, রাগ একটা ঋণাত্মক অনুভূতি। এটাকে লাই দিতে নেই। এর বশীভূত হতে নেই। বরং একে ঠান্ডা মাথায় নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়। রাগ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি নিজেরই হয়।
দারোয়ানদের হাসাহাসির মাঝেই নিজের ছোট ব্যাগটা নিয়ে বড় গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল কবি। ও জানত সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ দুধ-সাদা বড় গাড়ি করে কেউ একটা বেরোয় এই বাড়ি থেকে। গাড়িতে কে থাকে জানত না। কালো কাচের আড়ালে সব ঢাকা থাকে যে! কিন্তু গাড়িটা দেখে ওর মনে হত যেই ভেতরে থাকুক না কেন, সে একজন কেউকেটা হবে।
সেদিনও গাড়িটা বেরিয়েছিল কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটার সময়। আর, কবি বুঝেছিল এটাই ওর শেষ সুযোগ। কিন্তু কী করবে ভেবে না পেয়ে আয়নাটা বের করে নাড়াতে নাড়াতে দৌড়োতে শুরু করেছিল গাড়িটার পাশে-পাশে।
একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল গাড়িটা। তার পর সামনে, ড্রাইভারের পাশের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল একজন ভদ্রলোক। সামান্য মোটা, ফরসা, কাঁচাপাকা মোটা গোঁফওয়ালা একজন মানুষ । মানুষটার পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। হাতে মোটা সোনার চেন। একটু দূর থেকেও কী সুন্দর যে গন্ধ বের হচ্ছিল! লোকটা কি এক বোতল সেন্ট এক দিনেই মেখে নিয়েছে! তখন পারফিউমকে সেন্ট বলেই জানত কবি ।
লোকটার চেহারার মধ্যে কিছু একটা ছিল যে, থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল ও। গেট থেকে দৌড়ে এসে দারোয়ানরাও এর মধ্যে ধরে ফেলেছিল ওকে। এবার গাড়ির পেছন থেকে একটা লম্বা-চওড়া কাঠখোট্টা ধরনের লোক বেরিয়ে এসে জামার কলারটা শক্ত করে চেপে ধরেছিল কবির।
চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করেছিল, “কে তুই? ক’দিন হল দেখছি দাঁড়িয়ে আছিস! কী মতলব তোর?”
“জনা, ওকে ছাড়,” ফরসা লোকটা এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে। লোকটা কবির মুখের দিকে তাকিয়েছিল একবার। তার পর ওর হাতে ধরা ছোট্ট আয়নাটা নিয়ে নিয়েছিল। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেছিল ভাল করে। তার , পর কেটে কেটে জিজ্ঞেস করেছিল, “এটা তোকে কে দিয়েছে?”
কবির গলা শুকিয়ে গিয়েছিল নিমেষে। আশপাশে বেশ ভিড় জমে গিয়েছিল এর মধ্যেই। একটা ধুলোমলিন ছেলেকে এতজন মিলে ঘিরে ধরেছে! লোকে হয়তো ভাবছে, নির্ঘাত চোর-ছ্যাঁচোর হবে। কবির ভয় লাগছিল। লোকজন যদি কিছু শোনার আগেই মারধোর শুরু করে! ওদের গ্রামে তো এমনই হয়! গণধোলাইয়ে মারা যাওয়ার কথা ও শুনেছে বেশ কয়েকবার ।
লোকটা আবার জিজ্ঞেস করেছিল, “কী রে বল! এটা কে দিয়েছে তোকে?” এবার লোকটার গলায় যেন অধৈর্য ভাব!
কবি বলেছিল, “মা দিয়েছে। সঙ্গে এই বাড়ির ঠিকানা। বলেছে বীরেন্দ্র ত্রিবেদীকে এটা দেখাতে। তা হলেই হবে।”
লোকটা বিহ্বল হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর অস্ফুটে বলেছিল, “শিউলি!”
এই বিরাট কেল্লার মতো বাড়িটার চৌহদ্দির মধ্যেই একপাশে একটা ছোট দোতলা বাড়ি আছে। তার নীচের তলায় থাকে এই বাড়ির ম্যানেজার তপন রায় ও তার পরিবার। মানে স্ত্রী রেখা আর মেয়ে জিনি অর্থাৎ জিনিয়া। আর সেই বাড়ির দোতলার দুটো ঘরের একটায় জায়গা হয়েছে কবির।
ওর ঘরটা খুব বড় নয়। তবে বিছানা, চেয়ার টেবিল, আলমারি সব রয়েছে। আর আছে লাগোয়া বাথরুম। এ ছাড়াও এই ঘরে এসি আছে। টিভিও আছে। কোথাও কোনও অসুবিধে নেই কবির।
বড় বাড়ির পাশে একটা মেসের মতো আছে। সেখানেই এই বাড়িতে যারা কাজকর্ম করে, তারা তিনবেলা খায়। কবিও সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে।
সেই গম্ভীর মতো লোকটাই যে বীরেন্দ্র ত্রিবেদী, সেটা পরে বুঝেছিল কবি। অবাকও হয়েছিল। ত্রিবেদী হয়েও এত ভাল বাংলা বলে লোকটা!
সেদিন থেকে এখন, এই সময়ের মধ্যে বাকিটা জেনেছে কবি। জেনেছে বীরেন্দ্ররা সাত পুরুষ ধরে আছে কলকাতায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বীরেন্দ্রদের পূর্বপুরুষরা ব্যবসা করে ফুলেফেঁপে উঠেছিল। আর সেই ফুলেফেঁপে ওঠার ধারা এখনও অব্যাহত।
বীরেন্দ্রর স্ত্রী কৌশানি, বাঙালি। আর খুব বড়লোক বাড়ির মেয়ে। তবে বীরেন্দ্রর সঙ্গে এক বাড়িতে থেকেও সে ভাবে সম্পর্ক নেই। বড় বাড়ির অন্য দিকে আলাদা থাকে ম্যাডাম। নিজের ব্যবসা আছে। বুটিক আর বিউটি সালোঁর। কবি শুনেছে সেটাও খুবই ভাল চলে।
লালু বলে, “ম্যাডাম হেভি কড়া। রাগীও। শুধু ওইটা উঠলে ম্যাডামের শক্ত মনটা আর শক্ত থাকে না। তখন অন্য খেল।”
লালু ছেলেটা ম্যাডাম মানে কৌশানির ‘ম্যান ফ্রাইডে’। ম্যাডাম বাইরে বেরোলে অনেকটা সময় 34 সঙ্গে সঙ্গে থাকে। দরকারি সব কাজকর্ম করে দেয়।
আর প্রথম থেকেই কেন কে জানে, কবিকে পছন্দ করে খুব। ওর পাশের ঘরেই থাকে এই লালু।
ছেলেটা রোগা, শ্যামলা। সামনের একটা দাঁত ভাঙা। পায়ে কী একটা সমস্যাও আছে। খুঁড়িয়ে হাঁটে। আর কথাবার্তায় বেশ ভাল। বোঝা যায় যে, পড়াশোনা করেছে।
প্রথম দিন থেকেই লালু ওর সঙ্গে সহজ ভাবে কথাবার্তা বলে। তবে মাঝে মাঝে বড্ড বেশি কথা বলে ফেলে ছেলেটা, এটাই যা সমস্যা। মানে, এমন সব কথা বলে ফেলে, যা কাউকে বলার নয়। ,
“ওইটা উঠলে মানে? কী উঠলে?” কবি অবাক হয়ে গিয়েছিল প্রথম দিন ।
লালু হেসেছিল খুব। তার পর বলেছিল, “সেক্স কাকা, সেক্স! হিট! তখন আমাকে ছেলে ধরে আনতে হয়। বুঝলে? একটা লোক আছে। পাখিদা। এজেন্ট। সে সাপ্লাই করে।”
আর শুনতে চায়নি কবি। লালুর কোনও বোধ নেই। কী সব যে বলে! যার হয়ে কাজ করে মানুষ, তার, সম্বন্ধে এ সব কেউ বলে!
ও লজ্জা পাচ্ছে দেখে লালু হেসেছিল। বলেছিল, “সেক্স শুনেই লজ্জা পেলে! আরে বাবা ওটাও তো একটা নিড, না কি! সাহেব আলাদা থাকেন। কিছু করেন না। তা, ম্যাডাম কী করবেন? বাড়িতে রান্না না হলে মানুষ তো বাজার থেকেই কিনে খাবে, না কি!”
“ঠিক আছে, এ সব আমাকে বলার দরকার নেই,” কবি মাথা নামিয়ে নিয়েছিল।
লালু হেসে বলেছিল, “তুমি তো আমার বন্ধু! তোমায় বলব না তো কাকে বলব?”
বন্ধু! ওকে ক’দিন চেনে লালু! লালুর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কবি। এই চব্বিশ বছরে কোনও দিন কোনও বন্ধু হয়নি কবির! সার্কাসে একটা ছেলে ছিল। মাধব। সে একটু বন্ধুর মতো হচ্ছিল, কিন্তু তার পর কামিনীকে নিয়ে বেকার ঝামেলা হয়ে গিয়েছিল ওদের মধ্যে। বা বলা ভাল মাধবই ঝামেলা করেছিল ফালতু ফালতু।
কামিনী কিন্তু খেলা দেখাত না। কামিনী সার্কাসের টিকিট কাউন্টারে বসত। মাধবের পছন্দ ছিল সেই কামিনীকে। কিন্তু কামিনী পছন্দ করত কবিকে। কিন্তু কামিনী পছন্দ করত কবিকে। সেই নিয়ে কী ঝামেলা! মাধব তো এক রাতে আকণ্ঠ মদ খেয়ে একটা বড় ছোরা নিয়ে মারতেই এসেছিল কবিকে। কবি অনেক বুঝিয়েছিল। কিন্তু মাধব শুনছিলই না। লোকজন ধরে রাখতেও পারছিল না কিছুতেই। মাধবের গায়ে যেন অসুরের শক্তি এসে জড়ো হয়েছিল সে রাতে!
শেষে কামিনী এসে অনেক কষ্টে সামলেছিল ব্যাপারটা। সকালে নেশা কেটে যাওয়ার পরে মাধব এসে ক্ষমা চেয়েছিল। কবিও আর ঝামেলা বাড়ায়নি। কিন্তু সেদিনের পর থেকে মাধবের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্কটা ভেঙে গিয়েছিল। সেটা আর জোড়া লাগেনি।
কবির একটা ব্যাপার আছে। কোথাও থেকে বা কারও থেকে ওর মন একবার সরে গেলে, তার প্রতি সেই ভরসা আর ফিরে আসে না। এই ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। তবে সেই দিনের পর থেকে কবি জেনেছে যে, প্রেম-ফেম হেভি ঝামেলার জিনিস। এতে মানুষের ণত্ব-যত্ব জ্ঞান থাকে না। এ যেন এক ে স্রোতের টান। এক জায়গা থেকে টেনে নিয়ে মানুষকে অন্য কোথাও ছুড়ে ফেলে দেয়। আর তার ফাঁকে কী সব যে করিয়ে নেয়! মানুষ নিজেই বোঝে না! তাই এখন এ সব থেকে দূরে থাকতে চায় ও।
ছোট থেকে নানা সমস্যা, কষ্ট আর অবহেলার মধ্য দিয়ে গিয়ে কবি বুঝেছে, জীবনে কেউ কারও নয়। বুঝেছে, মানুষ শুধু সুযোগ খোঁজে অন্যকে অপমান করার, অপদস্থ করার আর ব্যবহার করার। তাই এই চব্বিশেই ও অনেক নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করে। ওর নিজের ভেতরে যে একটা মরুভূমি আছে সেটা বোঝে। বোঝে, ভালবাসা পাওয়ার জন্য একটা ছটফটানি আছে। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও বোঝে যে, এতে একবার পড়লে চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়ার মতো করে চিরদিনের জন্য তলিয়ে যাবে। কিন্তু সেটা তো হতে দিতে পারে না কবি। মায়ের দায়িত্ব ওর ওপর। ও বোঝে, জীবনে সব কিছু সবার জন্য নয় ৷
গত দু’মাসে ওকে এই বাড়িতে সে ভাবে কিছুই করতে হয়নি। শুধু মাঝে মাঝে তপনকাকুর সঙ্গে বেরোতে হয়েছে ব্যাঙ্কে বা পোস্ট অফিসে। কখনও ওষুধ এনে দিতে হয়েছে। পাম্প খারাপ হলে মি ডেকে আনতে হয়েছে।
বসে বসে বিরক্তি ধরে যাচ্ছিল কবির। মাস গেলে এদিকে ওর হাতে দশ হাজার টাকাও দেওয়া হচ্ছে। খাওয়াদাওয়া তো এমনিতেই ফ্রি। তার ওপর দশ হাজার টাকা! মাকে আট হাজার পাঠিয়ে হাতে বাকিটা রেখে দিয়েছে। কিন্তু এ ভাবে কিছু না করে এই টাকা নিতে ওর সম্মানে লাগছে। সামান্য একটা আয়নার মধ্যে কী এমন আছে যে, তার জন্য টাকা পাচ্ছে ও? জীবনের কোন রহস্য আড়াল হয়ে রয়েছে ওর থেকে? তা ছাড়া কোনও কাজ না করে আর কতদিনই-বা এ ভাবে টাকা নেবে?
কবি তো ঠিক করেছিল তলায় তলায় কাজ খুঁজবে। এখানে এ ভাবে কতদিন থাকবে? নিজেকে অন্যের গলগ্রহ ভাবতে ইচ্ছে করে না ওর। কিন্তু তার পরে গতকালই কবিকে বলা হয়েছে যে, আজ থেকে ওকে কাজে জয়েন করতে হবে।
আজ রোদটা কেমন যেন বাটার-পেপার দিয়ে মোড়া! দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে এই ছড়ানো বাগানে দাঁড়িয়ে ভাল করে চারিদিকটা দেখল কবি । কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। শিবশিবে হাওয়া দিচ্ছে একটা। আকাশে আছে। শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছে একটা। আকাশে পাউডারের ফোঁটার মতো আবছা চাঁদ দেখা যাচ্ছে এই সকালে! কবি জামার হাতাটা নামিয়ে বোতাম আটকে দিল। তারপর বড় বাড়ির দিকে এগোল। দু’পা এগোতেই তপনকাকুকে দেখতে পেল কবি । হন্তদন্ত হয়ে আসছে বড় বাড়ির দিক থেকে। ওকে দেখেই হাত তুলে চেঁচিয়ে বলল, “দশটা পঁচিশ বাজে। সাহেব বেরোচ্ছেন। কী করছিস তুই? আয় তাড়াতাড়ি।”
বীরেন্দ্র যে খুব সময় ধরে চলে, সেটা জানে কবি । ও বড় বাড়ির সামনে গিয়ে বলল, “দশটা একুশ বাজে।”
“একই হল। চল।”
তপনকাকু লোকটা ভাল। তবে একটু খিটখিট করে। জিনি বলে, “বাবা আসলে টেনশন থেকে এমন করে, জানো!”
জিনি মানে জিনিয়া। তপনকাকুর মেয়ে। সদ্য ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে এমএ-তে ভর্তি হয়েছে। সুন্দর দেখতে জিনিকে। চোখ দুটো উজ্জ্বল। আর হাসলে গালে লম্বা টোল পড়ে! দাঁতের গঠনও বিজ্ঞাপনের মতো! জিনিকে দেখলেই মনে হয় আজ অনেক দিন মেঘ করে থাকার পরে রোদ উঠল!
লালু বলে, “পুরো আলিয়া ভাটের জেরক্স, না গো? তোমার সঙ্গে হেব্বি মানাবে!”
জিনি লালুকে দাদা বলে ডাকে। কবিকে বলে, “লালুদা লোকটা ভাল। শুধু বকে বেশি।”
কবি আর বলে না যে, জিনিও কিছু কম যায় না! এই তো ওর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরেই বলেছিল, “কবি কোনও নাম নাকি? তোমার আসল নাম কী?”
আসল নাম? দীর্ঘশ্বাস চেপে কবি চুপ করেছিল। সেদিন হাওয়া দিচ্ছিল বেশ। বাগানের মধ্যে গাছের পাতায় কেমন যেন ঝরঝর শব্দ হচ্ছিল। আলো এসে পাতার ছাঁকনি দিয়ে ঘাসে পড়ে ফুটিয়ে তুলছিল এক অন্যরকম আলপনা। তারই মধ্যে কবির মনে পড়ছিল যে, একদিন ওর একটা আসল নাম ছিল বটে। কিন্তু সে নামে আর কেউ ডাকে না।
গ্রামে ওর বাবার একটা ছোট্ট দোকান ছিল। সেখানেই সারা দিন বসে থাকত বাবা। টুকটাক বিক্রিবাটা হত। তার সঙ্গে বাবা ওই দোকানে বসেই লেখালিখি করত। হ্যাঁ, ওর বাবা কবিতা লিখত। সে সব যে খুব ছাপা হত তা নয়। তাও বাবা লিখত।
কবিতা এমন একটা জিনিস, যা লোকে পড়ে কম, বোঝে আরও কম, কিন্তু সেটা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে সবচেয়ে বেশি।
সেই পথ ধরে ওর বাবাকে নিয়েও গ্রামের সবাই খুব ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত। আর ওকে দেখলেই ‘কবির ছেলে’ বলে ডাকত! খেপাত! খুব আবছা ভাবে বাবার অপমানিত মুখটা মনে পড়ে কবির। মনে পড়ে এই নিয়ে কবি বাবাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে, ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে থাকা বাবার অসহায় মুখ।
বাবা নেই বহু দিন। হার্টের অসুখ ছিল। ওর সেই কোন ধু ধু ছোটবেলায় মারা গিয়েছে বাবা। কবিতার খাতাগুলোও পুড়িয়ে ফেলেছে মা। ‘কবির ছেলে’ ডাক থেকে ‘র’ আর ‘ছেলে’ খসে পড়ে গিয়েছে সেটাও আর মনে নেই ওর। শুধু ওর বাবার নাম কোনও কবি হতে না পারার বিদ্রুপটুকু সারা জীবনের মতো আটকে গিয়েছে ওর নামে। তবু এটাকেই ও ধরে থেকেছে। বাবার সঙ্গে যেন এই নাম দিয়েই কোথায় একটা যোগসূত্র থেকে গিয়েছে ওর।
এত কথা ও সেদিন বলেনি জিনিকে। বলেনি ওর আসল নাম অমলকান্তি গুহ। এটাও বলেনি যে, বাবা বলত, “কবিতার অমলকান্তি পারেনি। কিন্তু তোকে রোদ্দুর হতে হবে।” জিনিকে কিছুই বলেনি ও। শুধু ওর থেকে মুখ ঘুরিয়ে দূরে তাকিয়ে দেখেছিল, বড় আমগাছ থেকে একটা কাঠবিড়ালী নেমে এসে একা একা কী যেন খুঁজছে সুন্দর করে সাজানো লনে!
বড় বাড়িতে ঢোকার আগে লম্বা খোলা শ্বেতপাথরের চাতাল। সেখানে তিন ধাপ সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাড়িতে ঢোকার বড় কাচের দরজা।
দরজা পার করে বড় হলঘরে গিয়ে দাঁড়াল কবি। এই ঘরটা বাইরের লোকেদের বসার জায়গা। এখানে সার দিয়ে চেয়ার রাখা। আর এক পাশে বড় একটা সোফা সেট ।
কবি দেখল বীরেন্দ্র ফোনে কথা বলছে। পাশে জনা দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখেই চোখের ইশারায় দাঁড়াতে বলল।
জনা বীরেন্দ্রর পার্সোনাল বডিগার্ড। সারাক্ষণ একটা নাইন এম এম ব্লক পিস্তল নিয়ে ঘোরে। আসলে বন্দুক নিয়ে একটা আগ্রহ আছে কবির। তাই জনাকে জিজ্ঞেস করে জিনিসটা দেখেছে।
কিন্তু জনা বন্দুকটা ধরতে দেয়নি ওকে। বলেছে, “তুই এ সব ধরে কী করবি? কোনও দিন চালিয়েছিস?”
কবি বলেনি কিছু। সার্কাসে পিস্তল চালানো ছাড়াও এমনি পিস্তলও চালিয়েছে। সার্কাসের মালিকেরই ছিল। আর সেটাতেও ওর টিপ খুব ভাল। কিন্তু এখানে এ সব বলে কী হবে? কেনই-বা বলবে!
কবি দেখল জনার কোমরের কাছের জামাটা উঁচু হয়ে আছে।
জনা এই বাড়িতে থাকে না। তবে কাছেই একটা ফ্ল্যাটে একা থাকে। শুনেছে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু জনাকে ছেড়ে ওর বউ চলে গিয়েছে।
লালু বলেছিল ওকে। বলেছিল, “মালটার যত হম্বিতম্বি সাধারণ লোকের ওপর। আসলে ওর দাঁড়ায় না। তাই বউ পালিয়েছে!
সেক্স ভাই আসল জিনিস। না দিতে পারলে কোনও পাখি পোষ মানবে না!”
লালু কী সব যে বলে! তাও জনাকে দেখলে লালুর ওই মুখ, হেসে বলা ওই কথা আর সামনের ভাঙা দাঁতটা মনে পড়ে। মনে মনে হাসি পায় লালুর বলার ভঙ্গিমায়!
“এসেছিস!” ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে ওর দিকে তাকাল বীরেন্দ্র। তার পর জিজ্ঞেস করল, “গাড়ি চালাতে পারিস?”
মাথা নাড়ল কবি, পারে। বলল, “তবে লাইসেন্স নেই!”
বীরেন্দ্র হাসল, “সে হয়ে যাবে। আমার একটা গাড়ি নিয়ে সোজা চলে যা এয়ারপোর্ট। আমার মেয়ে আসছে। নিয়ে আয় ওকে। তার পর কাল থেকে আমার সঙ্গে বেরোবি। বুঝলি! দু’মাস হল, এবার তো কাজকর্মে ঢুকতে হবে। কাজ শেখাটা ইমপর্ট্যান্ট।”
কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনা পকেট থেকে একটা চাবি বের করে ছুড়ে দিল ওর দিকে। কবি ধরল এক হাতে ।
জনা এবার ওর দিকে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল, “এতে তোর নতুন মোবাইল আছে। সব কানেকশন-টন করে চালু করে দেওয়া আছে। ওতে একটাই ছবি আছে। বিটিয়ার ছবি। দেখে নে। আর, গ্যারাজ় থেকে বড় নীল এসইউভি-টা নিয়ে নে।
বিটিয়া কে! কিছু জিজ্ঞেস না করেই ও তাকাল বীরেন্দ্রর দিকে।
বীরেন্দ্র হেসে বলল, “আমার মেয়ে। উর্জা। জনা বিটিয়া ডাকে। যা বেরিয়ে পর। এটাই প্রথম কাজ তোর। সাবধানে নিয়ে আসবি। বুঝলি? এয়ারপোর্ট চিনিস তো?”
কবি মাথা নাড়ল। দু’মাস তো এমনি বসে থাকেনি ও।
চাবিটা মুঠো করে নিয়ে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল কবি। যাক, শেষমেশ কাজ পেল একটা। কিন্তু কেমন যেন লাগল ওর! তা হলে কি ওকে গাড়িই চালাতে হবে? এই করতে এসেছে কলকাতায়?
গ্যারাজের দিকে যেতে যেতে বাবার সেই আবছায়া মুখটা আবার মনে পড়ল কবির। মনে পড়ল দোকানে বসে মাথা নিচু করে খাতায় লিখে যাওয়া একটা মানুষ। চোখ তুলে অবাক হয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকা একটা মানুষ। ওর বাবা।
আকাশের দিকে তাকাল কবি। বাটার-পেপারের রোদ্দুর! শীতের আকাশ যেন রোদ ছড়াতেও ভয় পাচ্ছে! এটাই কি ভীরু আকাশ?
নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল ওর। ভাবল, অমলকান্তি কি ভুলে যাবে ওর কী হওয়ার কথা ছিল?
