১. বিমল
বিমল
সকালের দিকে আসে পাখিটা। পাতার আড়ালে বসে ডাকে অনেকক্ষণ। তার পর কখন যেন চলে যায়। বিমল জানে এ-ও আসা বন্ধ করে দেবে একদিন। একদিন সব থেমে যাবে। স্তব্ধ হয়ে যাবে। আর কিছু থাকবে না কোথাও। কেবল শান্ত একটা নৈঃশব্দ্য বিরাজ করবে এই চরাচর জুড়ে। সেই দিনটা যেন ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। এই তিরাশি বছর বয়সে এসে সেই দিনটার কথাই আজকাল বারবার মনে হয় বিমলের।
এই নৈঃশব্দ্যই কি মৃত্যু! মৃত্যুর কথাই কি বিমল ভাবে? সঠিক বুঝতে পারে না ও। শুধু মনে হয়, সে আসছে। মনে হয় দূরের জঙ্গলের মতো এগিয়ে আসছে সে। কিন্তু তার আগে কি কেউ আসবে না? সারা জীবন এই যে একাকী কাটল, সে ভাবেই কি ক্রমশ ডুবে যেতে হবে নৈঃশব্দ্যে? কেউ কি আসবে না এখনও?
আজকাল আর রোগী দেখে না বিমল। খুব জোর করলে এক-আধজন বড়জোর। কিন্তু রহমত তা-ও দেখতে দেয় না। রহমতেরও বয়স হল। কিন্তু তা-ও রহমত এখনও প্রায় যুবকের মতোই দাপিয়ে বেড়ায়!
আজও তো ওই শুনতে পাচ্ছে ওর গলা। গোবিন্দ বাউল এসেছে। গান গাইছে। রহমত মাঝে মাঝে গলা মেলাচ্ছে। তিরিশ বছরের বেশি হয়ে গেল গোবিন্দ আসে এখানে। রহমতের সঙ্গে তার কী যে বন্ধুত্ব! খুব ভাল লাগে বিমলের। সামনে না গেলেও দূর থেকে যে গান ভেসে আসে, সেটুকুই শোনে!
বিমল উঠল। সামনে পড়ে থাকা কাগজ আর পেনটা তুলল। তার পর রাখল রোলটপ ডেস্কের ড্রয়ারে। শিউলি এসেছিল। চিঠি লিখে রেখে গিয়েছে। ওই রাখা আছে টেবিলে। রহমত গিয়ে পোস্ট করে দেবে।
মানুষের জীবনের দিকে তাকালে অবাক লাগে বিমলের। এর ভাঁজে ভাঁজে কত কী যে লুকিয়ে থাকে! কত স্পষ্ট, অস্পষ্ট সব ঘটনা, স্মৃতি, মানুষ।
কত বলতে না পারা লজ্জা, কত অপরাধ। কত জটিল সম্পর্ক। নাম-না জানা সম্পর্ক। এ যেন এক জটিল বুনট। যেন এক আশ্চর্য গোলোকধাঁধা । আসলে আজ শিউলি আসার পরেই ওর মনে পড়ে গিয়েছে পুরনো সব কথা।
শিউলি এসে বসেছিল ঘরের এক কোণে। বয়স হয়ে গিয়েছে শিউলির! বেশ কয়েক মাস পর এল এ বাড়িতে। সেই এসেছিল কবিকে নিয়ে কথা বলতে। ওর কাজকর্ম নিয়ে, কলকাতা যাওয়া নিয়ে কথা বলতে।
তখন বিমলই শিউলিকে বলেছিল, কবিকে যেন কলকাতায় বীরেন্দ্রর কাছে পাঠায়। কারণ, এই গ্রামে বিশু আর শিউলি বাদে একমাত্র বিমলই জানত আসল সত্যিটা। জানত কবি আসলে বিশুর ঔরসজাত সন্তান নয়, বীরেন্দ্রর ঔরসজাত সন্তান!
সেই বহু বছর আগে শিউলি এসেছিল এক সন্ধেবেলা। বিমলের কাছে এসে মাথা নিচু করে বসেছিল কিছুক্ষণ। বিমল বুঝেছিল কিছু বলতে চায় শিউলি। কিন্তু তাড়া দেয়নি। সময় দিয়েছিল উল্টে।
শিউলি একটা সময় পরে নিজের দ্বিধা কাটিয়ে উঠেছিল। তার পর একদম ভণিতা ছাড়া বলেছিল, “আমি মা হতে যাচ্ছি হাওয়াদাদু। কাকে বলব বুঝতে না পেরে তোমায় বললাম।”
বিমল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “মা! তুই! কিন্তু, বিশু তো… মানে ওর পক্ষে তো…”
“জানি সম্ভব নয়,” চোখ দিয়ে জল পড়ছিল শিউলির। কিন্তু তাও মনে জোর রেখে ও বলেছিল, “হ্যাঁ, আমি জানি এটা ঠিক নয়! কিন্তু হাওয়াদাদু তুমি বলো, আমার জীবনে কি কিছু থাকবে না? তোমার নাতি খুব ভাল। কিন্তু সব ভাল কি সবার জন্য ভাল? সব ভালর সঙ্গে কি আমাদের মিল হয়? আমারও হয়নি। ভাল মানুষ ও। কিন্তু জানো, আমরা স্বামী-স্ত্রী নই, কেবল বন্ধুর সম্পর্কে থাকি। ওর পক্ষে বাবা হওয়া সম্ভব নয়। তুমি তো জানো! সেখানে…. আমি… আমারও তো বেঁচে থাকা আছে!”
বিমল কী বলবে বুঝতে পারছিল না। ও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল শিউলির দিকে। এই চুপচাপ মেয়েটার মধ্যে এমন একটা স্বাধীন ইচ্ছের মেয়েও আছে! মনে মনে কেমন একটা শ্রদ্ধা হচ্ছিল ওর।
বিমল ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই যদি চাস বলতে পারিস যে…..”
“বীরেন্দ্র, বীরেন্দ্র ত্রিবেদী। ওই গেস্ট হাউসে আসে… মানে…” শিউলি আঁচলে চোখ মুছে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল।
বীরেন্দ্র! গেস্ট হাউস! কাজটা তো বিমলই জোগাড় করে দিয়েছিল! কী বলবে বুঝতে না পেরে সে শিউলির দিকে তাকিয়েছিল।
শিউলি বলেছিল, “আমি রাখব ওকে। নিজের করে রাখব। তুমি শুধু তোমার নাতিকে একটু বলবে এই ব্যাপারে! আমি আসলে কী বলব… মানে … ” বিমল দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করেছিল। তার পর আলতো গলায় বলেছিল, “বীরেন্দ্র জানে?”
“না। আজ জেনেছি আমি। কাল সকালে বলব বীরেন্দ্রকে। হাওয়াদাদু, আমি কি পাপ করলাম? বীরেন্দ্র নিজের জীবনে বদ্ধ। কিন্তু ওর ভালবাসা মিথ্যে নয়। আমি কিছু চাই না ওর থেকে। শুধু আমার এই সন্তানকে রাখতে চাই। কিন্তু তোমার নাতিকে কী করে এটা বলি! তুমি বলবে তো ওকে?”
বিমল আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল শিউলির, তার পর বলেছিল, “কাল সকালে পাঠিয়ে দিস।”
পরের দিন সকালে এসেছিল বিশু। সে দিন কী সুন্দর রোদ ছিল আকাশে! ডিসেম্বরের শীতে জড়িয়ে ছিল হাওয়া। গোবিন্দ বাউল এসে রহমতের সামনে গান গাইছিল বড় দরজার কাছে। একটা স্প্রেয়ার দিয়ে গাছপালায় ওষুধ দিচ্ছিল বিমল। আর তখনই দেখেছিল সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বিশু।
বিমল বলেছিল, “বিশু, তোকে আমি ডেকেছি একটা দরকারি কথা বলার জন্য!”
“দরকারি!” বিশু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
“হ্যাঁ রে,” বিমল ওর পিঠে হাত রেখে আস্তে আস্তে বাগানের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে বলেছিল, “বিশু, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। উত্তর দে। জীবনবৃক্ষ বলতে কী বুঝিস তুই?”
“জীবনবৃক্ষ!” বিশু কী বলবে বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
বিমল বলেছিল, “হ্যাঁ, জীবনবৃক্ষ। সেই বৃক্ষ, তার ফল, তার বীজ। সেখান থেকে জন্ম নেওয়া আরনতুন সব বৃক্ষ। মানুষের জীবনও যে এমন, তা বুঝিস? বুঝিস এক গাছ থেকে কেমন করে জন্ম নেয় আরও অনেক অনেক গাছ! তাদের আপাত ভাবে আলাদা লাগলেও আসলে তারা কিন্তু আলাদা নয় ৷ একে অপরের থেকে দূরে দূরে থাকলেও, তারা কিন্তু এক। আমরা সবাই কিন্তু আসলে এক। একই বৃক্ষ থেকে জন্ম নিয়েছি। জানিস তো?”
বিশু তাকিয়েছিল হাওয়াদাদুর দিকে। তার পর বলেছিল, “তাই না? আমরা সবাই এক!”
“হ্যাঁ রে। আমার-তোমার ভাগটা সঙ্কীর্ণ মানুষজনেরা করে! জানবি আসলে সব এক। জানবি এই জীবন আমাদের কাছে প্রসাদস্বরূপ। একই বৃক্ষের ফল। তাই এই জীবন যা দেয় হাত পেতে নিতে হয় । কারণ, এ ঈশ্বরের দান। তোকেও নিতে হবে, বুঝলি?”
“আমায়?” বিশু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বিমলের দিকে।
“হ্যাঁ, তোকে,” বিমল সামান্য হেসেছিল, “তুই নিতে প্রস্তুত তো?”
বিশু কেমন একটা আবছা গলায় বলেছিল, “জীবনের এই টান কিসের থেকে আসে হাওয়াদাদু? আমরা সবাই এক বলেই কি এই টান! এই টান কি আসলে নিজের প্রতি নিজের আকর্ষণ?”
বিমল কিছু না বলে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
বিশু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “আমি প্রস্তুত। তুমি বলো।”
বিমল সময় নিয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে বুকপকেটে রেখেছিল। তার পর ধীরেসুস্থে সবটা বলেছিল বিশুকে। বিশু মাথা নিচু করে শুনেছিল গোটা ব্যাপারটা। একটা কথাও বলেনি।
বিমল কথা শেষ করে বলেছিল, “এখন শিউলি রাখতে চায় সন্তানটিকে। এ ব্যাপারে তোর কী মত? তুই কি মেনে নিবি? নাকি শিউলিকে….”
বিশু হেসেছিল উজ্জ্বল ভাবে, তার পর বিমলের হাত দুটো ধরে বলেছিল, “এ তো আমারই সন্তান হাওয়াদাদু! এ তো আমারই সন্তান! যা শিউলির কি আমার নয়! ও যে আমায় সে ভাবে ভালবাসে না, আমি জানি। কিন্তু তাতে কী! আমি তো ভালবাসি। বলতে পারি না সে ভাবে। কিসের যেন সঙ্কোচ হয়। আমি তো বুঝি সবার মতো আমি ঠিক কোনও দিকেই সক্ষম নই। আমাকে ভালবাসাও তাই সহজ নয়। কিন্তু আমার তো ভালবাসতে বাধা নেই । আর তুমিই তো বললে, আমরা সবাই একই জীবনবৃক্ষের অংশ। তাই যে আসছে সে আমারও সন্তান। আমিই তার বাবা। আজ যে কী আনন্দের দিন তুমি জানো না হাওয়াদাদু! আমার জীবনে এমন দিন আসেনি কখনও।”
বিশু যে মিথ্যে বলছিল না, সেটা ওকে দেখেই বুঝেছিল বিমল। ও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বিশুর দিকে। এমন মানুষও হয়! এমন মানুষকে দেখাও তে অনেক ভাগ্যের ব্যাপার। বিমল কিছু না বলে তাকিয়েছিল বিশুর দিকে। আর শিখছিল মনে মনে। বুঝতে পারছিল, জীবনে কত জনের কাছ থেকে কত কিছু যে শেখার আছে!
আজ সেই কথাই মনে পড়েছিল বিমলের। দেখেছিল মাথা নত করে বসে আছে শিউলি। অবিকল সে দিনের মতো। শুধু পঁচিশটা বছর কোথা দিয়ে যেন চলে গেল!
বিমল বলেছিল, “আমি শুনেছি খবরে। বীরেন্দ্র যে মারা গিয়েছে, তা শুনেছি।”
শিউলি বলেছিল, “তাই তোমার কাছে এলাম হাওয়াদাদু। আমি আর কার কাছে যাব বলো! বীরেন্দ্র যাওয়ার আগে আমায় একটা ছোট্ট আয়না দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল কোনও দিন সন্তানের কোনও দরকারে যেন তাকে এই আয়নাটা হাতে দিয়ে আমি পাঠাই ওর কাছে। তুমি তো জানো এটা। এখন লোকটা নেই। খবরে দেখলাম তার ছবি। এত বছর পরে কেমন যেন মনে হল। খবরে বলল, ওর মেয়েও নাকি ক’দিন আগে খুন হয়েছিল। বলল, সঙ্গে কবিও নাকি জখম হয়েছে। ওই বাড়ি থেকে একটা মেয়ে ফোন করেছিল আমায়। জিনিয়া নাম। বলেছে কবি আহত হলেও ভয়ের কিছু নেই। এখন ঠিক আছে। আমি যেন চিন্তা না করি। জানো, খবরে বলল আর কোনও সন্তান নেই বীরেন্দ্রর। কিন্তু তুমি বলো হাওয়াদাদু? কেউ কি নেই! আছে তো! ওর সন্ত তো কাছেই আছে। বীরেন্দ তো জানত। তা হলে তো কাছেই আছে! বীরেন্দ্র তো জানত! তা হলে মৃত্যুর পরে ও কি….”
শিউলির গলা বুজে এসেছিল।
বিমল বলেছিল, “হ্যাঁ, সময় এসেছে। তুই এবার জানিয়ে দে কবিকে। বলে দে আসলে ও কার ঔরসজাত। জানি বিশুই ওর বাবা, কিন্তু একটা মানুষের তো এটা জানার অধিকার আছে যে, কার শরীর থেকে সে উৎপন্ন হল। তুই জানা ওকে। আর বলিস শ্রাদ্ধের কাজটা যেন করে।”
“কাজ!” শিউলি বিহ্বল হয়ে তাকিয়েছিল।
“হ্যাঁ। পিতৃপুরুষকে জল দেওয়া আসলে জীবনবৃক্ষের গোড়ায় জল সিঞ্চন করা। সেই জীবনবৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের কর্তব্য। কারণ, তাকে বুঝতে হবে সে এই জীবনবৃক্ষেরই ফল। তার অংশ।”
“ও যে কী ভাবে নেবে… আমায় যে কী ভাববে? আর আমি ওকে বলবই-বা কী ভাবে? নিজের মুখে বলতে তো পারব না কোনও দিন!” শিউলি তাকিয়েছিল উদ্বেগ নিয়ে ।
বিমল বলেছিল, “তাও সত্যিটা জানানো গুরুত্বপূর্ণ। কবির অধিকার আছে জানার। এখন যাই ভাবুক । তোর স্নেহ তো মিথ্যে নয়। তোর ভালবাসা তো খাঁটি। না, এগুলো আমার কথা নয়। বিশু একদিন শিখিয়েছিল আমায়। আমি তোকে বললাম মাত্র ৷ আমি কাগজ কলম দিচ্ছি। তুই এখানেই বসে লেখ। জানা ওকে। মা হয়ে তুই যে এই কথাটা মুখে বলতে পারবি না, আমি বুঝতে পারছি। তাই লিখে জানা ৷ পুরনো দিনের মতো চিঠি লিখে জানা। তার পর চিঠিটা রেখে যাস। রহমতকে দিয়ে পোস্ট করিয়ে দেব। লকডাউন চললেও পোস্ট অফিস তো খোলা।”
“আমি লিখব! কিন্তু… আমি যে পারি না সে ভাবে। হাওয়াদাদু, তুমি যদি…” শিউলি অসহায় ভাবে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
বিমল মাথা নামিয়ে ভেবেছিল একটু। তার পর বলেছিল, “ঠিক আছে, আমি বলে বলে দিচ্ছি। তুই লেখ। কেমন!”
লেখা শেষ করে চিঠি রেখে চলে গিয়েছে শিউলি যাওয়ার আগে শুধু বলেছিল, “আজ সত্যিটা বলে হয়তো আমি সন্তানকে হারালাম!”
বিমল দেখেছিল শিউলির চোখের কোণে জল। ও বলেছিল, “যা সত্যি করে তোর, তা কোনও দিন তোর থেকে হারাবে না। জানবি, বাইরে থেকে সব শেষ হয়ে গেছে মনে হলেও, কিছু একটা থেকেই যায়। যা দৃষ্টির বাইরে। স্পর্শ আর বোধের বাইরে। তাই তো জীবন এমন রহস্যময়। যা তোর, তা আজীবন তোরই থাকবে।”
ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানে এসে দাঁড়াল বিমল। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। বাতাসে ভাসছে গুলমোহরের পাতা, ধুলোর নরম কুটো। আর ওই পাশের গাছ থেকে মল্লিকা ফুল ঝরে পড়েছে মাটিতে। সাদা হয়ে আছে গাছতলা।
শূন্য পথে কার জন্য ঝরে পড়ছে মল্লিকা? কেউ কি আসবে? নাকি এসেছিল কেউ অলক্ষ্যে? সে-ই চলে যাওয়ার সময় ফুলে ফুলে রেখে গিয়েছে তার চিহ্ন! অলক্ষ্যে কত কী যে ঘটে যায় জীবনে! কত কে আসে, আবার চলে যায় কত কত মানুষ! সব কি আমরা বুঝতে পারি? নাকি মেনে নিতে পারি সব চলে যাওয়া?
তবু জীবন চলে। ওই পথের বাঁক ঘুরে কেউ আসবে এই ভরসায়, এই আনন্দে একটা করে দিন পার করে মানুষ। বেঁচে থাকে সব সহ্য করে।
বিমল দেখল, রোদের নীচে পথের বুকে পড়ে আছে সাদা নরম সব ফুল। হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে তাদের পাপড়ি। বিমল তাকিয়ে রইল ওই শূন্য পথে ঝরে যাওয়া মল্লিকার দিকে। সেই নৈঃশব্দ্য আসার আগে আর কি কেউ আসবে? কে জানে, হয়তো কেউ আর আসবে না। তবু তাকিয়ে রইল।
আজ রোদ বড় নরম। আকাশও যেন বড্ড নীল। হাওয়াতেও কিসের এত টান! তার মধ্যে দূরে ওই গোবিন্দ বাউল গান গাইছে। রহমত গলা মিলিয়েছে তার সঙ্গে। ভেসে আসছে সেই গান— “আছে সে নয়ন তারায় আলোকধারায়, তাই না হারায়ওগো তাই দেখি তায় যেথায় সেথায় / তাকাই আমি যেদিক পানে ৷৷/ আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি তায় সকল খানে৷৷”।
বিমল নিজের মনেই হাসল। তার পর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলোর দিকে পাখিটা আবার ডাকল কোনও এক গাছের পাতার আড়াল থেকে। সূর্য আরও কিছুটা বেয়ে উঠল আকাশের গায়ে। হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে গেল
মেঘ। আর এই নশ্বর জীবন চলতে লাগল ।
(দেওয়াল টপকে ঢুকে আসা ক্যাম্বিসের বল, শূন্য দোলনা আর গাছতলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই সমস্ত মল্লিকা ফুল ছাড়া এই গল্পের আর বাকি সব কিছু কল্পনা)
সমাপ্ত
