১২. রাজু
এখানে এর আগে আসেনি রাজু। বিরাটির ভেতর দিয়ে নিমতা যাওয়ার রাস্তার ওপর পড়ে এই জায়গাটা। নাম সেনহাটি। যশোর রোড থেকে বাঁ দিকে বেঁকে রাস্তাটা আঁকাবাঁকা হয়ে চলে গেছে সামনের দিকে। গাড়িটাও চলেছে সেই ভাবে।
রাস্তাটা সামান্য খারাপ। একটু দূরে দূরে গর্ত আছে। সঙ্গে রিকশা ও টোটো এমন করে সারা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যে, মনে হচ্ছে যেন ছোট বাচ্চারা খেলার পরে সারা ঘরে খেলনা ছড়িয়ে রেখে গিয়েছে। গাড়িটা লাফাচ্ছে মাঝে মাঝে। সামনের সিটে বসে জানলার ওপরের হাতলটা ধরে রয়েছে রাজু। পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারছে, ওখানে বসে থাকা লোকজনের মুখের অবস্থা কী!
এমনিতেই রাজুর মনের অবস্থা ভাল নেই। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঝিঁঝি ডাকছে! সব কেমন যেন শূন্য লাগছে ওর। বুকের মধ্যে কিসের যেন হাহাকার। খাদ! যেন ঘন কুয়াশা জমে রয়েছে তার ওপর। মনে হচ্ছে খাদের ওই ঢালু দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যাবে ও। হারিয়ে যাবে চিরতরে।
কিন্তু তাও নিজেকে শক্ত রাখছে প্রাণপণে। মনে মনে নিজেকে বোঝাচ্ছে যে, শক্ত থাকতেই হবে ওকে। ভাই যত দিন না দাঁড়াচ্ছে, ওকে ঠিক থাকতেই হবে। না হলে সংসারটা ভেসে যাবে একদম। সেটা হতে দিতে পারে না ও। একটা মেয়ে ওকে ঠকিয়েছে বলে ও তো সেটার শাস্তি নিজের মা আর ভাইকে দিতে পারে না।
মাঝে মাঝেই চোখে জল চলে আসছে রাজুর। কিন্তু চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাচ্ছে। ঢোঁক গিলে নিয়ে নিচ্ছে সমস্ত যন্ত্রণার ছোট ছোট খণ্ড। কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না কিছু। আজকাল কষ্ট, যন্ত্রণা, আনন্দ, হাসি, দুঃখকে কেমন যেন নানা জ্যামিতিক আকারে দেখতে পাচ্ছে ও। যেন তাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে বুঝতে পারছে।
গত কয়েক দিন যাবৎ কিছু খেতেও ইচ্ছে করছে না রাজুর। পার্টি অফিসেও যায়নি। কারও সঙ্গে কথাও বলছে না। উর্জা কতবার যে ফোন করেছে, মেসেজ করেছে তার ঠিক নেই। কিন্তু একবারও ফোন ধরেনি রাজু। মেসেজের উত্তরও দেয়নি। কী হবে উত্তর দিয়ে! ও নিজের চোখে যা দেখেছে, তার চেয়ে বড় সত্যি আর কী হতে পারে! যে-মেয়ে ওকে সকালবেলা ফোন করে বলে যে, বিয়ের ব্যাপারে পাত্রর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। আর, বলে যে, এটা জাস্ট ফর্মালিটি। এটা কোনও ব্যাপার নয়। ও যেন নিশ্চিন্তে থাকে। যেন টেনশন না করে। সে-ই কিনা রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে গালে চুমু খেতে দিচ্ছে!
রাজু সে দিন উর্জার ফোনটা পাওয়ার পর গোটা সময় ধরেই খুব অস্থির হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল ওর সারা শরীরের চামড়া ফুঁড়ে যেন কাঁটাগাছ বেরিয়ে আসবে বাইরে। কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছিল না। তাই আর থাকতে না পেরে চুপিচুপি চলে গিয়েছিল রেস্তরাঁর সামনে। উর্জাই তো বলেছিল কোথায় যেন যাবে ও!
কিন্তু সেটাতেও যে মনে শান্তি আসছিল, তা নয়। ওই খারাপ লাগার সঙ্গে যোগ হয়েছিল একটা অপরাধবোধ। মনে হচ্ছিল এটা ঠিক করছে না। এটুকু বিশ্বাসও কি করে না ও উর্জাকে! যে-মেয়েটা চার বছর বাইরে থাকল রাজুকে ছেড়ে, আর সে সময় রাজু ওকে বিশ্বাস করতে পারল, আর এখন পারছে না!
কিন্তু জীবনে কিছু কিছু ঘটনা ঘটে, যা মানুষ শত চেষ্টা করেও সামলাতে পারে না। তার মধ্যে নিজের মনটা বোধহয় অন্যতম। রাজু বুঝেছিল যে, সত্যিই ও নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না। নিজের কাছে তো আর মানুষ মিথ্যে বলতে পারে না। নিজেকে তো আর ধোঁকা দিতে পারে না। তাই ওই মানসিক অবস্থায় নিজেকে আটকাতে পারেনি ও। প্রেমের জন্য মানুষ কত কী করে! সেখানে এইটুকু করলে কেউ ছোট হয়ে যায় না। নিজেকে এটাই বুঝিয়েছিল রাজু। সে জন্য সময় মেপে ঠিক পৌঁছে গিয়েছিল রেস্তরাঁর সামনে। কিন্তু তার পর সেখানে যা দেখল, তাতে আর অপরাধবোধ কাজ করেনি মনে।
ছেলেটি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উর্জা এগিয়ে এসেছিল ওর কাছে। ওর হাত ধরে এটা-ওটা নানা কথা বলছিল। কিন্তু ও পাত্তা দেয়নি। মাথা, কান সব ঝাঁ ঝাঁ করছিল। মনে হচ্ছিল শরীরের মধ্যে মাইলের পর মাইল কেউ ইলেকট্রিকের পাওয়ার গ্রিড পেতে দিয়েছে। আর তার ঝিঁইইই শব্দে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সব কিছু। উর্জা হাত নাড়িয়ে ওর দিকে ঝুঁকে কী সব যেন বলছিল। কিন্তু না, রাজু সত্যি শুনতে পায়নি কিছু!
তবে রাস্তায় কোনও সিন ক্রিয়েটও করেনি। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়েছিল। আর সব শব্দের তলায় মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল এবার কী করবে। ঠিক করে নিয়েছিল যাই হয়ে যাক, উর্জার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখবে না।
গতকাল সন্ধেবেলা রাজুর বাড়িতে চলে এসেছিল উর্জা। কিন্তু রাজু ভাইকে দিয়ে সামলেছিল ব্যাপারটা। বলেছিল, “ভাই, তুই বল আমি বাড়ি নেই।”
বাইরে উর্জার গলা শুনতে পাচ্ছিল ও। ভাবছিল এই তো দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। সামনে গিয়ে একবার দাঁড়িয়ে হাসলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার পরেই মনে হয়েছিল, সত্যি কি ঠিক হবে! সত্যি কি ঠিক হতে পারে কিছু! উর্জাকে যে ও আর বিশ্বাস করতে পারছে না। তাই যাকে বিশ্বাসই করতে পারছে না তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কী লাভ! বিশ্বাস ছাড়া ভালবাসা যে অর্থহীন। কাঁটার মুকুট।
ভাই যখন বাইরে কথা বলছিল, তখন নিজের ঘরে বালিশে মাথা গুঁজে কাঁদছিল রাজু। আর চাইছিল মনে-মনে এই কষ্টটাকে টপকে যেতে। চাইছিল এমন একটা সকাল আসুক, যেখানে ঘুম থেকে উঠে ও দেখবে, উর্জা হল যে-কোনও একটা মেয়ের নাম। বুঝবে, উর্জার নাম শুনলে আর রক্তের মধ্যে সাইক্লোন উঠছে না।
“রাজুদা, কী হবে বলো তো?” পিছন থেকে জিকো জিজ্ঞেস করল। জিকো ছেলেটাকে বেশ কয়েক বছর ধরে চেনে রাজু। বিনির মাসতুতো ভাই হয় জিকো। বিনি কলেজে পড়ার সময় যাদবপুরে পেইং গেস্ট হিসেবে থাকলেও চাকরি পাওয়ার পরে বাগুইআটিতে নিজের মাসির বাড়িতে থাকত। রাজু যেত মাঝে মাঝে। তখনই জিকোর সঙ্গে আলাপ।
বিনি এখন হায়দরাবাদে থাকে। তবে যোগাযোগ আছে রাজুর সঙ্গে। খুবই ভাল মেয়ে বিনি। এমন প্রচারহীন ও নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে সবাই পারে না। তাই ওর যে-কোনও দরকারে রাজু ওকে সাহায্য করে।
এই যে আজ ও এসেছে এখানে, সেটা বিনি ফোন করেছিল বলেই। না হলে থোড়াই আসত। বাড়ি থেকেই বেরোত না। মনমেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে ওর। কিন্তু বিনি ফোন করেছিল বলে ধরতেই হয়েছিল ফোনটা।
বিনি ফোন করে বলেছিল যে, জিকোরা খুব সমস্যায় পড়েছে। যে ভাবেই হোক, রাজু যেন সাহায্য করে জিকোদের। বলেছিল, জিকো এখনই ফোন করবে, ও যেন ফোনটা ধরে।
বিনি ফোন রাখার দু’মিনিটের মধ্যেই জিকো ফোন করেছিল। আর জিকোর সেই ফোন পেয়েই রাজু তড়িঘড়ি তৈরি হয়েছিল বাগুইআটিতে যাওয়ার জন্য।
মা একটু অবাকই হয়েছিল। যে-ছেলে ক’দিন একদম বাড়ি থেকেই বেরোচ্ছে না, সে এ ভাবে না খেয়ে দেয়ে, শুকনো মুখে কোথায় চলল! মা জিজ্ঞেসও করেছিল, “কোথায় যাচ্ছিস তুই?” রাজু ছোট্ট করে বলেছিল, “কাজ আছে।”
“সে তো কত্ত কাজ করে তুমি দেশ উল্টে দিচ্ছ বোঝাই যায়! ক’দিন তো একদম মরার মতো পড়ে রইলে! এখন এমন লেজ তুলে কোথায় চললে? বাড়ির জন্য এই উদ্যম থাকলে আমাকে চোখ খুইয়ে এমন কাজ করতে হত না!”
রাজু কোনও উত্তর দেয়নি। এমন গঞ্জনা ওকে নিত্য শুনতে হয়।
ভাগ্যিস যে দিন উর্জা এসেছিল মা একটু দোকানে গিয়েছিল, না হলে কী যে হত কে জানে!
মা আবার বলেছিল, “কাল রাতেও খাওনি। সকালেও না। এবার অসুস্থ হলে কে দেখবে? তোমার ওই সেতুদা? না গুরান? আমায় উদ্ধার করো, রুটি তরকারি দিচ্ছি খেয়ে যাও। অনশন করে এই দেশে কিছু হবে না।”
রাজু মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আমি ফিরে আসি। তার পর না-হয় আরও বোলো। তাতেও আশ না মিটলে জুতো দিয়ে মেরো যত খুশি। এখন কাজে যাচ্ছি। এ সব ভাল লাগছে না।”
রাজু সচরাচর এমন করে পাল্টা বলে না। তাই মা সামান্য ঘাবড়েই গিয়েছিল যেন। চুপ করে তাকিয়েছিল রাজুর দিকে।
রাজু আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে।
বাগুইআটির মেন রোড থেকে সামান্য ভেতরে জিকোদের আস্তানা। ছোট্ট দু’কামরার ফ্ল্যাট। সঙ্গে দেশলাই বাক্সকে একটু ঠেললে যেমন করে ভেতরের কাঠি রাখার জায়গাটা উঁকি দেয়, সেরকম একটা বারান্দা। এখানে বিনি কী করে সবার সঙ্গে থাকত কে জানে!
রাজু ফ্ল্যাটে পৌঁছে সময় নিয়ে শুনেছিল পুরো ব্যাপারটা।
জিকোর বাবা মানে সুনীলবাবুর এক দাদা ছিলেন। কিন্তু প্রায় কুড়ি বছর জিকোদের সঙ্গে, মানে শুধু জিকোদের সঙ্গেই শুধু নয়, ওদের গোটা ফ্যামিলির কারও সঙ্গেই কোনও যোগাযোগ রাখতেন না। একরকম বলা যায় যে, তাঁরা নিজেদের এই ফ্যামিলি থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।
আজ সকালে আচমকা খবর আসে যে, সেনহাটিতে সেই দাদা মারা গিয়েছেন। যেহেতু তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, তাই তাঁর স্ত্রী মানে জিকোর জেঠিমার আর কেউ নেই। পাড়ার লোকেরা, ভগবান জানে, কোথা থেকে জিকোদের ফোন নাম্বার পেয়ে ওদের ফোন করেছে। জিকো এ সবে ঢুকতে চায়নি। কিন্তু সুনীলবাবু দাদার জন্য কাতর হয়ে পড়ে বলেছেন যে, ওঁরা যাচ্ছেন। এখন পাড়ার লোকেরা বারবার ফোন করে বলছে যে, জিকোরা যেন এখনই যায়। না হলে বিশাল অশান্তি হবে। থানা-পুলিশ, নারী সমিতি সবাই মিলে নাকি এসে হুজ্জতি করবে। ফোন নাম্বার থেকে এখনকার দিনে ঠিকানা বের করা কঠিন কিছু নয়।
এত দিন যেখানে যোগাযোগ নেই, সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই জিকোরা জানে না কী অবস্থায় জেঠিমা রয়েছে। আচমকা এত বছর পরে এমনি এমনি তো আর ওদের মনে পড়েনি। কোনও ঝামেলায় আছে বলেই না পড়েছে।
তা ছাড়া সত্যি বলতে কী, জেঠিমাকে জিকোর স্পষ্ট মনেও নেই! সেখানে কথা নেই বার্তা নেই আচমকা কেউ যদি এমন উটকো হুমকি দেয়, তা হলে তো মুশকিল। তাই জিকো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে। ও বলেছে রাজু ওদের সঙ্গে গেলে ভাল হয়!
সবটা শুনে রাজু বুঝেছিল যে, মৃত্যু ছাড়াও কিছু একটা তো গোলমাল আছেই। না হলে পাড়ার লোকেরা এ ভাবে উজিয়ে নাম্বার খুঁজে, ফোন করত না।
ওদের বাড়ি থেকেই রাজু, সেতুদাকে ফোন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেতুদাকে পাওয়া যাচ্ছে না ফোনে। কী একটা কাজে সেতুদা দিল্লি গিয়েছে। হতেই পারে। আর সামনের বছর ভোট। এখন সব জায়গাতেই রাজনৈতিক নেতাদের দৌড়োদৌড়ি বেড়েছে। সেতুদাও তাই মাঝে মাঝেই দিল্লি যাচ্ছে। কে জানে কোথায় আছে সেতুদা! মোবাইল বন্ধ মানে কোনও দরকারি কাজেই আছে নিশ্চয়ই।
আর কাউকে ফোন করার কথা ভাবতে পারে না রাজু। সেতুদাকে যতটা ও বলতে পারে, সেটা আর কাউকে পারে না। তবে পারত। সবচেয়ে বেশি যাকে বলতে পারত সে তো উর্জা। ওকে বললেই ওর বাবার মাধ্যমে সব এক সেকেন্ডের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু কেন ফোন করবে উর্জাকে! উর্জা কে হয় ওর যে, সাহায্য চাইবে? উর্জার কথা মনে আসতেই আবার বুকের মধ্যে একটা অস্বস্তি হয়েছিল রাজুর। গলা দিয়ে ছোট ছোট কষ্টের খণ্ড উঠে আসতে চাইছিল যেন! চোয়াল শক্ত করে আবার সে সব গিলে নিয়েছিল রাজু।
জিকো বলেছিল, “কী হবে রাজুদা?”
রাজু ওর পিঠে হাত রেখে বলেছিল, “তুই ভয় পাচ্ছিস কেন?”
জিকো পাশে বসা সুনীলবাবুকে দেখিয়ে বলেছিল, “বাবা তো দুম করে ‘আমরা আসছি’ বলে দিল। কিন্তু জেঠিমাকে এনে রাখব কোথায়? আমাদের জায়গা আছে? সেরকম আর্থিক সঙ্গতি আছে? আর আমি তো কোনও দিন সে ভাবে দেখিওনি জেঠিমার মুখ। জানিও না সে কে! কেন গোটা ফ্যামিলির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করল ওরা! সে সব কি ওই পাড়ার লোকজন জানে? জানে না। আর এখন সব জাজ হয়ে এসে ভারডিক্ট শোনাচ্ছে। মানে আমাদের দেশে কোনও উচিত অনুচিত বলে কিছু নেই। সবার ‘প্যাক মেন্টালিটি’! যে দিকে ভিড় আর সেন্টিমেন্ট, সেদিকে গিয়েই ধান্দা গোছানো, লজিক কেউ শোনে না। আর বাবাকেও বলহারি! আপনি শুতে ঠাঁই পায় না শঙ্করাকে ডাক!”
গাড়িতে ওঠার আগে রাজুর হাতে ঠিকানা লিখে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়েছে জিকো। কোথায় যেতে হবে তার ঠিকানা। রাজু যাতে ড্রাইভারকে পথ বলে দিতে পারে।
গাড়ির পিছনের সিটে জিকো, সুনীলবাবু আর জিকোর এক বন্ধু বসে আছে। সবার মুখেই চিন্তা। স্বাভাবিক। এত বছর যোগাযোগ নেই যাদের সঙ্গে, তারা হঠাৎ এমন করে জীবনে উদয় হলে তো মানুষ বিব্রত হবেই। বিশেষ করে যেখানে তার দায়িত্ব নিতে হতে পারে এই বাজারে।
রাস্তার পাশের একটা পানের দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল রাজু। গাড়িটা জিকোর বন্ধুর। ছেলেটা ভাল। জিকোর কাছ থেকে এমন ঘটনা শুনেই গাড়ি ও ড্রাইভার সমেত চলে এসেছে।
রাস্তায় নেমে দোকানে বসে থাকা লোকটাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করল রাজু। দোকানি লোকটা পান তৈরি করছিল। রাজুকে সে ভাবে পাত্তা না দিয়ে কোনও মতে দেখিয়ে দিল পথ। সামনের দিক থেকে বাঁ দিকে গিয়েই আবার ডান দিকে বাঁক নিতে হবে। ব্যস, তা হলেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। রাজু বুঝল, ওরা চলেই এসেছে প্রায়!
রাজু গাড়িতে উঠে ড্রাইভারদাদাকে সেটা বুঝিয়ে দিল কী ভাবে যেতে হবে। তার পর পিছন ফিরে সুনীলবাবুকে বলল, “আপনি বুঝে কথা বলবেন কিন্তু! অচেনা পাড়া। আর আজকাল সবাই খুবই রেগে থাকে সারাক্ষণ। একটা কিছু অজুহাত পেলেই ঝামেলা বাঁধিয়ে দেয়। আর লোকজন এ সব ব্যাপারে খুব ইমোশনাল আর অ্যাগ্রেসিভ হয়। কেউ মানতে চাইবে না যে, আপনাদের সঙ্গে এত বছর ওদের যোগাযোগ নেই। মানে, বুঝলেও মানতে চাইবে না। কারণ, দায় কেউ নিতে চায় না। সবাই অন্যের ঘাড়েই ফেলতে চায়। নিশ্চয়ই খুব সমস্যা বলেই আপনাদের এ ভাবে খুঁজে বের করেছে। তাই যা বলবেন, বুঝে বলবেন!”
সুনীলবাবু ঢোঁক গিলে তাকালেন। বললেন, “নিজের দাদা মারা গিয়েছে। শোনার পরেও কী বলব বলো? ‘যাব না’ বলব? ‘চিনি না’ বলব? এটা হয়! আমাদের ছোটবেলা এক সঙ্গে কেটেছে কোডার্মায়। কী ভাল ছিলাম আমরা সবাই। সেখানে কী ভাবে চুপ করে বসে থাকব?”
জিকো গজগজ করে বলল, “এই জন্য বলে বেশি সেন্টিমেন্টাল হতে নেই। মানুষ ম্যাক্সিমাম বাঁশ খায় সেন্টিমেন্টাল হয়ে গিয়ে। নাও, এবার সামলাও!”
গলির মুখে গাড়িটা দাঁড় করাল ওরা। তার পর গাড়ি থেকে নেমে ওরা চারজন সামনে এগোল। সরু গলি। অপরিচ্ছন্ন রাস্তা। আশপাশে ভাঙাচোরা বাড়ির মাঝে দু’-একটা নতুন বিল্ডিং উঠছে। রাস্তার এক পাশে ডাঁই করে রাখা আছে বালি আর স্টোন চিপস। পড়ে আছে শাটারিংয়ের কাঠ। বেশ কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে রয়েছে ভিড় করে। সবারই মুখচোখে উদ্বেগ আর চাপা উগ্রতা!
রাজু নিজেও সমাজের এমন একটা অর্থনৈতিক ধাপেই থাকে। ও জানে এমন ধরনের মানুষের মনোভাব কী হতে পারে। সারাক্ষণ কেমন একটা ‘বঞ্চিত হচ্ছি’ মনোভাব কাজ করে এদের মধ্যে। “ভিকটিম মেন্টালিটি’। সামান্যতেই এরা যেমন খুশি হয়ে যায়, তেমন সামান্য কারণেই রেগে উঠে মারামারি করতেও দ্বিধাবোধ করে না। গোলমালে ঝাঁপিয়ে পড়া এদের আপাত নিস্তরঙ্গ জীবনে একটা আমোদের মতো। কোনও কিছু ঘটলে ভিড় করে সার্কাস দেখা এদের কাছে বিনোদন।
রাজুদের আসতে দেখে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এল। একজন লম্বা সামান্য কুঁজো মানুষ সুনীলবাবুকে বলল, “সুনীল ঘোষ আপনি? অনিলবাবুর ভাই?”
সুনীলবাবু হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। তার পর লোকগুলোর দিকে এগিয়ে গেলেন। পিছন পিছন জিকো আর ওর বন্ধুও গেল। রাজু চারিদিকটা দেখল একবার। ওরা এসেছে বলে লোকজন আরও বাড়ল যেন। সবারই মুখচোখ শক্ত। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। রাজু বুঝল কিছু একটা গোলমাল হবে। এবার ও নিজেও এগোল সামনের দিকে।
রাস্তার পাশেই একটা চারতলা বাড়ি। সামান্য পুরনো। তার নীচের তলায় দুটো ঘর আর একটা ছোট্ট রান্নাঘর। এক পাশে বাথরুম। এরই একটা ঘরে অনিলবাবুর মরদেহ শোয়ানো আছে। পাড়ার কয়েকজন মহিলা ছলছল চোখে ঘিরে বসে রয়েছে তাঁকে।
জিকোরা ওই ঘরের সামনে দাঁড়াল একটু। রাজু দেখল সুনীলবাবু চশমা খুলে চোখ মুছছেন। রাজু পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হাত রাখল কাঁধে। সুনীলবাবু তাকালেন ওর দিকে। বললেন, “খুব ভাল ফুটবল খেলত, জানো! আমায় সাইকেল করে স্কুলে পৌঁছে দিত। নিজের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে আমায় ব্যাডমিন্টনের র্যাকেট কিনে দিয়েছিল।”
জিকো বাবাকে ধরে কড়া গলায় বলল, “হ্যাঁ, তার পর কুড়ি বছর তোমার মুখও দেখেনি! থামো তুমি!”
দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দু’জন মহিলা। তাদের মধ্যে বেঁটে আর রোগা মতো মহিলা বললেন, “আমার নাম মালতী। আমি দাদার ছোট শালি। আমার দিদি পাশের ঘরে আছে।”
রাজু সবটাই দেখছে পিছন থেকে। সুনীলবাবুরা এবার পাশের ঘরে গেলেন। রাজুও দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, একজন ভদ্রমহিলা একটা চৌকিতে শুয়ে আছেন। ঘরের মধ্যে কেমন একটা বোঁটকা গন্ধ। মহিলার চুল ছোট করে কাটা। রুক্ষ। গায়ের রং ফ্যাকাসে আর চামড়ায় যেন খড়ি উঠছে। ভদ্রমহিলা শুয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। একটা ক্যাথিটারের পাইপ আর ইউরিন ব্যাগ ঝুলছে চৌকির পাশে।
সুনীলবাবু বললেন, “বৌদি!”
“সুনীল!” ভদ্রমহিলা কেমন একটা ধরা গলায় বললেন, “তোমার দাদা… তোমার দাদা আর নেই…”
“দিদির অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। কোমর ভেঙে গিয়েছিল। অপারেশন হয়েছে। কিন্তু চার মাস পরেও এখনও হাঁটতে পারছে না। গায়ে জোর নেই! জামাইবাবু যে আচমকা এমন সেরিব্রাল হয়ে চলে যাবে, আমরা ভাবতে পারিনি!” মালতী বলল কোনও মতে।
“দাদা, শুনছেন? একটু আসুন এ দিকে।”
সেই সামান্য কুঁজো মতো লোকটি এবার বাইরে ডাকল ওদের। সুনীলবাবু-সহ সবাই বাইরে বেরিয়ে এল। রাজু দেখল আরও লোকজন ভিড় করেছে!
অবস্থা যে ভাল নয় সেটা বেশ বুঝতে পারছে ও। শুধু যে দাদা মারা গিয়েছে বলে সুনীলবাবুদের খবর দিয়েছেন, তা কিন্তু নয়। রাজু বুঝতে পারছে যে, অসুস্থ ভদ্রমহিলাটিকে নিয়ে সবাই বিব্রত হয়ে আছে। একে নিয়ে কী করা হবে সেটার জন্যই মূলত ওদের ডাকা হয়েছে।
সামান্য কুঁজো লোকটা যে এখানকার মাতব্বর, সেটা বুঝতে পারছে রাজু। মাথার সাদা চুল ঢাকতে লোকটা কলপ লাগিয়েছে। কিন্তু পাকা চুলের গোড়া, পেঁয়াজকলির ফ্যাকাসে গোড়ার মতো বেরিয়ে পড়েছে। লোকটার পরনে সাদা প্যান্ট। পায়ে একটা সাদা চটি। বুকের বোতাম খোলা। সেখানে একটা রুপোর চেন ঝুলছে। তাতে কার একটা ঘষে যাওয়া ছবি। পেটে তিন নম্বর ফুটবলের সাইজের একটা ভুঁড়ি। লোকটার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে জলপথে ভালই বিচরণ করে!
ওরা বাইরে এসে দাঁড়াতেই আশপাশের লোকজন এসে গোল করে ঘিরে ধরল ওদের। ব্যূহ রচনা করল একটা।
লোকটা বলল, “আমার নাম পিলু। এখানকার লোকজন আমাকে মানে আর কী। তা আপনি কী ভাবলে অনিলদার সৎকার করতে হবে এখন। তার জন্য তো মালকড়ি লাগবে। নিমতলায় নিয়ে যাব। সঙ্গে ছেলেপিলেরা যাবে। ম্যাটাডোর লাগবে। আর মালা, কাপড়, ধূপ ইত্যাদি নানা জিনিস লাগবে। ও আর হ্যাঁ, ছেলেপিলেরা একটু খাবেও। বুঝতেই তো পারছেন!”
পিলু এক চোখ টিপে বুড়ো আঙুল তুলে একটা ইশারা করল। সুনীলবাবু কিছু না বলে পকেট থেকে দশ হাজার টাকা বের করে দিয়ে দিলেন।
জিকো এতক্ষণ মোবাইলে কাকে যেন মেসেজ করছিল। এবার মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “আরে, তুমি এত টাকা দিচ্ছ কেন?”
পিলু চট করে টাকাটা ছিনিয়ে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে বলল, “এত কই ভাই! দশে কিছু হয়? আর খচ্চা নেই! তোমরা খবর নেবে না। যোগাযোগ রাখবে না। দুটো মানুষ কুকুর বেড়ালের মতো পড়ে থাকবে, আর এখন এই ক’টা টাকা দিয়ে বলা হচ্ছে এত টাকা!”
জিকো বলল, “দেখুন, আপনি জানেন না যা, তা নিয়ে কথা বলবেন না। আমার জেঠুরা আমাদের ফ্যামিলির কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখত না। কারও সঙ্গে না। সারা জীবন নিজের শ্বশুর বাড়ির লোকেদের টেনে গিয়েছে জেঠু। আচ্ছা, বেশ করেছে টেনে। কিন্তু তারা এখন কই! সারা জীবন জেঠুকে চুষে খেয়ে এখন আসল বিপদের সময় পালিয়ে গিয়েছে। আর আমাদের ডেকে এনে এ সব বলা হচ্ছে।”
“শ্যামলীদি, এদিকে আসুন তো!” পিলু এবার ভিড়ের থেকে একটু দূরে দাঁড়ানো একজন মহিলাকে ডাকল।
শ্যামলী নামে ভদ্রমহিলার বয়স মধ্য চল্লিশ। ফর্সা। বেঁটে। পান খেয়ে দাঁত তরমুজের বিচি রঙের হয়ে আছে। মহিলার নাকের ওপর একটা আঁচিল। মাথার চুল সিঁথির কাছে পাতলা।
শ্যামলী এগিয়ে এসে খরখরে গলায় বলল, “পিলুদা, এরা কি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করছে?”
“হ্যাঁ,” পিলু দাঁত খিঁচিয়ে বলল, “এরা বলছে অনিলদার বৌয়ের দায়িত্ব নেবে না।”
“বললেই হল!” শ্যামলী রেগে গেল আচমকা। চারিদিকে তাকিয়ে জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলল, “নেবে না? মামার বাড়ির আবদার! আমি ডাকছি লোকজন। থানাতেও খবর দিচ্ছি! বলে কিনা নেবে না!”
রাজু আর থাকতে পারল না। বলল, “আরে, দাঁড়ান দাঁড়ান। কী বলছেন দিদি? এই পিলুবাবু সবার সামনেই দশ হাজার টাকা নিলেন সৎকার করার জন্য। এত টাকা কি লাগে, বলুন তো! আর এখন এ ভাবে চাপ দিচ্ছেন! আপনি ভেবে বলুন আপনার সঙ্গে যার কুড়ি বছর সম্পর্ক নেই, আচমকা দশ মিনিটের নোটিসে যদি তার সারা জীবনের দায়িত্ব আপনাকে নিতে হয়, আপনি নেবেন? তাও এমন মেডিক্যাল কন্ডিশনে! সব কিছুর তো একটা লজিক থাকবে, না কি? যা খুশি তাই বললেই হয়?”
“খুব লজিক মারাচ্ছ তো বাঞ্চোত! ধরে শালা এমন ক্যালাব না! লজিক? লজিক দেখবে? পেছনে বাঁশ দিয়ে লজিক ঢুকিয়ে দেব!” পিলু আচমকা রাজুর কলারটা চেপে ধরল, “হারামি! বয়স্ক মহিলাকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার ধান্দা! মাস্তানি!”
“আপনি গায়ে হাত দিলেন কেন?” রাজু এক ধাক্কায় পিলুকে সরিয়ে দিল। ওর মাথার মধ্যে যেন আগুন জ্বলে উঠল হঠাৎ। সব জায়গায় এমন করে অপমানিত হতে হবে নাকি? সত্যি তো! এটা মামার বাড়ি নাকি? যে আসবে সে-ই অসভ্যতা করে যাবে! রাজু আর কিছু না ভেবে ধাঁই করে একটা ঘুষি চালিয়ে দিল পিলুর মুখে।
ফ্যাঁৎ করে একটা শব্দ হল। আর “বাবারে” বলে পিলু নাক চেপে বসে পড়ল। রাজু দেখল পিলুর নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে!
“শুয়োরের বাচ্চা!” চিৎকার করে চার-পাঁচজন ছেলে ভিড়ের মধ্য থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাজুর ওপর। কিছু বোঝার আগেই মাথায় কী দিয়ে যেন একটা মারল ওকে। নিমেষে সারা পৃথিবী দুলে উঠল রাজুর। আর মনে হল কে যেন পৃথিবীর সমস্ত আলো একটা সুইচ টিপে নিভিয়ে দিল এক সঙ্গে। কুয়াশার চাদর বিছানো অতল কোনও এক খাদের গভীরে ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল ও। দেখল সেই খাদের ধারে, ওই ওপরে, ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে যাওয়া উর্জা যেন তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।
