৯. বিন্দি
বাড়িটা থমথম করছে। জনা মারা যাওয়ায় বাড়ির পরিবেশটা কেমন যেন পাল্টে গিয়েছে হঠাৎ। কেউ বেশি কথা বলছে না। বললেও সংক্ষেপে সারছে। তাই আশপাশের আওয়াজ যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিন্দির অবশ্য তাতে সুবিধেই হয়েছে। ওকে একটু কমই ডাকা হচ্ছে কাজের জন্য।
আসলে এ সব নিয়ে বিন্দি মাথা ঘামায় না। বড়লোকদের অনেক বড় বড় আর জটিল ব্যাপার-স্যাপার থাকে। সে সবে ওর মতো মেয়েদের না ঢুকলেও চলবে। ও এখন নিজের চিন্তায় পাগল হচ্ছে। বোনটা এটা কী করল! ইমলিকে ওর মনে হত বুদ্ধিমতী। সে এমন একটা কাণ্ড ঘটাল! আরে বাবা, সেক্স করতে হলে প্রোটেকশন নে। এখন কি আর সে সবের অভাব আছে? সেখানে এমন একটা কাণ্ড বাঁধিয়ে বসলি তুই! আর দুর্জয়! জানোয়ার! বলে কিনা পাঁচ লাখ টাকা লাগবে! টাকা গাছে ফলে? না নদীতে জাল দিলে ওঠে? রাতে ভাল করে ঘুমোতে পারে না বিন্দি। সারা গায়ে চিড়বিড়ে একটা অনুভূতি হয়। হাতের আর পায়ের তলা জ্বালা করে। মনে হয় মাথার মাঝখান দিয়ে লাভার মতো আগুন ছিটকে বেরোবে। মনে হয়, ইমলিকে পেলে গলা মুচড়ে ও নিজেই মেরে দেবে! সে দিন কথাটা শোনার পরে ওর যা হয়েছিল তা বলার নয়। তাই তো আর সময় নষ্ট না করে সে দিন মাধুর ওখান থেকে বাড়ি ফিরেই মাকে ফোন করেছিল।
“বিন্দি,” ম্যাডামের ডাক শুনতে পেল এবার। ও উঠে দাঁড়াল। এমনিতে ম্যাডাম যখন ঘরে থাকে, তখন ওকে কাছেপিঠেই থাকতে হয়। কিন্তু আজ ম্যাডামই ওকে বলেছিল নিজের ঘরে যেতে।
বিন্দির ঘরটা একতলায়। বাড়ির শেষ প্রান্তে। ঘরটা মাঝারি। সঙ্গে একটা লাগোয়া বাথরুম আছে। ছিমছাম ঘর। এদিকে বড় বড় কাচের জানলা। খুলে দিলেই বাগান থেকে খুব হাওয়া আসে। তাই এই ঘরে গরমকালেও গরম লাগে না। কবি, লালুদের ঘরে ছোট এসি লাগানো থাকলেও ওর ঘরে নেই। তবে তার দরকারও হয় না। বাগান থেকে রাতে এমন হাওয়া দেয় যে, বিন্দির মনে হয় এসির চেয়ে তা হাজার গুণে ভাল।
এই শেষ বিকেলে ও নিজের ঘরে বসে সেলাই করছিল। আজকাল আবার শুরু করেছে এটা। আসলে মাথাটা সারাক্ষণ এমন থম মেরে থাকে যে, মনে হয় যেন অন্ধকারে ডুবে যাবে যে-কোনও সময়ে। তাই নিজেকে ভুলিয়ে রাখতেই আবার সেলাই শুরু করেছে। এমনি কাপড় কিনে এনে তাতে নক্সা ফুটিয়ে তুলছে। টেবিল ক্লথ। তবে জানে না কার জন্য বানাচ্ছে এটা।
ম্যাডামের ডাক শুনে হাতের সুচটা সুতোর গোল্লার গায়ে গেঁথে রাখল ও। ম্যাডাম অন্য সময়ে ফোনে মিস কল দেয়। মানে, ও যদি কাছে না থাকে। কিন্তু আজ নিজেই ঘরে এসে পড়েছে!
এবার সুচ সমেত সুতোর গোল্লা আর কাপড়টা সরিয়ে রেখে ও খাট থেকে নামল। তার পর হাওয়াই চটি গলাল পায়ে। এ বাড়িতে চটি পরে ঘুরতে হয়।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখল ম্যাডাম দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে ঢিলে একটা সিল্কের কিমোনো পরে আছে আজ। মাথার চুল ক্লিপ দিয়ে এলোমেলো করে জড়ো করা।
“হ্যাঁ ম্যাডাম,” বিন্দি সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ম্যাডাম সামান্য বিরক্ত গলায় বলল, “তপনবাবু কোথায় রে? লোকটাকে ফোন করে যাচ্ছি, ধরছে না!”
“কোনও দরকার ছিল ম্যাডাম?”
“না হলে কেন ডাকব?” ম্যাডাম ভুরু কুঁচকে তাকাল। তার পর বলল, “এ বাড়িতে একটা কাজ যদি ঠিক মতো হয়!”
বিন্দি জানে সব কথার উত্তর দিতে নেই। ম্যাডামের এখন মাথা গরম হয়েছে। তাই এ সব বলবে। ও অপেক্ষা করতে লাগল।
ম্যাডাম বলল, “যা, গিয়ে তপনবাবুকে দেখ কোথায় গিয়েছে। আমার ঘরের ফ্যানটা চলছে না। এসিটাতেও কেমন একটা শব্দ হচ্ছে। বিরক্ত লাগছে। আর উর্জার ঘরের বাথরুমের একটা ট্যাপ লিক করছে। সেটাও বল। মেয়েটাও হয়েছে আমার! ওর বাথরুম কিন্তু সেটাও আমায় দেখতে হবে। আরে বাবা, ও না বললে তপনবাবু জানবে কেমন করে! ও তো আর বাথরুমে ঢুকে চেক করতে পারে না! যা, গিয়ে দেখ।”
“যাচ্ছি ম্যাডাম,” বিন্দি ছোট করে বলল।
ম্যাডাম আবার বলল, “আর আমার ড্রিঙ্ক ফুরিয়ে গিয়েছে। মণির দোকানে বলা আছে। ও প্যাক করে রাখবে। তুই নিয়ে আয়। মাথাটা এত ধরে আছে! ভাল লাগছে না কিছু। তপনবাবুকে খবর দিয়ে চলে যা। বুঝলি?”
ম্যাডাম বিন্দির উত্তরের অপেক্ষা না করে এবার চলে গেল। এই করিডোরের মেঝেটা সবুজ পাথরে বাঁধানো। সেই চকচকে মেঝেতে ম্যাডামের উল্টো প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।
বিন্দি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওকে এখন ওই ছোট বাড়িতে যেতে হবে। তপনবাবুকে ও তপনকাকু বলে। খুব ভাল আর ভদ্র ওই মানুষটা। আগে কী যেন একটা চাকরি করত। সেটা চলে যাওয়ার পর বীরেন্দ্র ওকে এখানে এনে রেখেছে। সারা বাড়ির কাজকর্ম দেখাশোনা করে তপনকাকু।
তবে বিন্দি দেখেছে মাঝে মাঝেই বীরেন্দ্র যা নয় তাই বলে অপমান করে তপনকাকুকে। আর সেটা সবার সামনেই করে। লোকটার যেন নিজের কোনও মানসম্মান নেই। সেই কারণে তপনকাকুও কেমন যেন কুঁকড়ে থাকে। সারাক্ষণ সবাইকে খুশি করে যেতে চায়। এই বয়সে কাজ হারানোর ভয় পায়। শত অপমানের পরেও হাসিমুখে থাকে। লোকটাকে দেখলে কেন কে জানে বিন্দির নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। ও বোঝে টাকার কাছে মানুষ কত অসহায়।
বীরেন্দ্র ক্ষমতাশালী লোক। অনেক টাকা। পোষা গুন্ডাও আছে। সবাই ওকে ভয় করে। এমন লোকজন আজকাল রাজনীতির ছত্রছায়ায় ভালই ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। বিন্দি ভেবে দেখেছে এই লোকগুলোর আসলে কিন্তু কোনও গুণ নেই। সৎ ভাবে কোনও কাজ করে খাওয়ার যোগ্যতা নেই। রাস্তায় এমনি ছেড়ে দিলে না খেতে পেয়ে ভিক্ষে করবে। মাঝে মাঝে এত রাগ হয় বিন্দির!
বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বাগানে বেরিয়ে এল বিন্দি। বাইরে এখন শেষ বিকেলের নরম আলো। গাছে গাছে পাখিদের কিচিরমিচির। কত পাখি যে বাসা বেঁধেছে এই বাগানে! আর এই সময়টা তারা সারা দিনের কাজের গল্প করে নিজেদের মধ্যে। বাগানের মধ্য দিয়ে সুন্দর পাথর বাঁধানো আঁকাবাঁকা পথ। পথের পাশে-পাশেই ছোট ছোট আলোর স্তম্ভ। একটু পরেই সব জ্বলে উঠবে। সেই পথ দিয়ে ছোটবাড়ির দিকে এগোল বিন্দি।
দোতলা বাড়ির নীচের তলায় তপনকাকুরা থাকে। ও দেখল, বাইরে বারান্দায় বেতের চেয়ার-টেবিলে বসে ল্যাপটপে ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা করছে জিনি।
বিন্দি নিজের মনে হাসল। মেয়েটা খুব ভাল। শান্ত, সভ্য। পড়াশোনা করে মন দিয়ে। আগে ওদের বড়বাড়ির দিকে বিশেষ যেত না, কিন্তু উর্জা আসার পরে আজকাল কখনও-সখনও যায়। উর্জাই ডাকে।
উর্জার ব্যবহারও বেশ ভাল। তবে বাড়িতে থাকে কম। আর থাকলেও নিজের মনে থাকে। তবে বিন্দির সঙ্গে কথা বলে ভালই। এই তো সে দিন বলছিল, বাগানে একটা বড় দোলনা লাগালে ভাল হয়।
দোলনা লাগালে সত্যিই ভাল হয়। বিন্দি সেটা ম্যাডামকে জানিয়েওছে। বলেছে, উর্জা এমনটা চায়। দোলনা জিনিসটা বিন্দিরও খুব ভাল লাগে। চাকেরিতে ওদের বাড়ির পিছনে একটা বড় শিরীষ গাছে শর্মারা একটা দোলনা টাঙিয়েছিল। সেখানে বোনের সঙ্গে কত দোল খেয়েছে বিন্দি।
বোন। ইমলি। আবার মনে পড়ে গেল বিন্দির। মাথার মধ্যে কট করে উঠল। ওঃ, মেয়েটা যে কী করল! মা-ও হয়েছে আর-এক! কোথায় বোনকে চোখে চোখে রাখবে! তা না সেই দিকে খেয়ালই করল না। সে দিন ফোনে যখন মা কাঁদছিল, বিন্দির এত মাথা গরম হয়েছিল যে, বলার নয়। মনে হচ্ছিল দেয় আচ্ছা করে। কিন্তু বাস্তবে তা করেনি।
“আরে বিন্দিদি, তুমি?” বিন্দি কাছে গিয়ে দাঁড়ালে জিনি মুখ তুলে জিজ্ঞেস করে হাসল।
বিন্দি বলল, “তপনকাকু আছে? ম্যাডাম ফোন করে পাচ্ছে না। তাই খবর নিতে পাঠাল।”
জিনি বলল, “আরে, কাণ্ড দ্যাখো না, বাবার মোবাইলটায় চার্জ ছিল না। তাই চার্জে বসিয়ে একটু বাইরে গিয়েছে। চলে আসবে যে-কোনও সময়। এলেই আমি বলছি।”
বিন্দি মাথা নাড়ল। স্বাভাবিক। কাজ তো থাকতেই পারে। তপনকাকুর যেন কাজের সময়-গময় বলে নেই কিছু। যখন ডাকবে তখনই যেতে হবে! লোকটাকে কোনও দিন কোথাও যেতে দেখেনি বিন্দি। একবেলাও ছুটি নিতে দেখেনি। এ ভাবে কেউ কাউকে খাটায়!
জিনি পাশের একটা ঠোঙা থেকে এক মুঠো বাদাম তুলে বিন্দির হাতে দিয়ে বলল, “এটা নাও। খাও।”
বিন্দি বলল, “আবার এ সব কেন?”
“খাও তো!” জিনি ওর হাতের মুঠোয় একটু চাপ দিল। তার পর বলল, “বাবা আসলে মায়ের ওষুধ আনতে গিয়েছে। আমায় বলেছিল। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আনতে। তাই বাবা গিয়েছে।”
“আরে, ঠিক আছে,” বিন্দি হাসল, “বাদ দাও তো! সারাক্ষণ এটা-ওটা ফরমায়েশ লেগেই রয়েছে এদের। অত সিরিয়াসলি নিয়ো না। আমি বলে দিচ্ছি যে, স্যর মানে বীরেন্দ্র সাহেবের কাজেই একটু গিয়েছে। এসে দেখা করবে। তপনকাকুকে এত চাপ নিতে হবে না।”
“না না, এ সব বলার দরকার নেই। ম্যাডাম আবার স্যরকে জিজ্ঞেস করলে বাজে ব্যাপার হবে,” জিনি যেন সামান্য ভয় পেল।
“কিচ্ছু হবে না,” বিন্দি মাথা নাড়ল, “ওদের মধ্যে কথাই হয় না সে ভাবে। আর এ সব নিয়ে তো প্রশ্নই নেই। তুমি ভেবো না।”
কথাটা সত্যি। ওদের মধ্যে সে ভাবে কথা নেই। এই যে এত বড় একটা কাণ্ড হয়ে গেল। বীরেন্দ্রকে মারার জন্য ওর ওপর হামলা হল, তাতেও যেন ম্যাডামের সেরকম হুঁশ নেই। লোকদেখানো একটু উদ্বেগ দেখিয়েছিল, তার পর যে কে সেই হয়ে গিয়েছে। জনাদা যে মারা গেল, তাতেও যেন কিছু না! সত্যি এটা বাড়ি না অন্য কিছু। এতই যখন অপছন্দ, তখন ডিভোর্স নিয়ে আলাদা থাকলেই তো হয়। কিন্তু তা নয়, এক বাড়িতে থেকে শত্রু দেশের মতো আচরণ।
হাসল। জিজ্ঞেস করল, “চা খাবে?”
“না না। কাজ আছে। একটু বাইরে যেতে হবে। আমি আসি,”
“তোমার মা আর বোন কেমন আছেন? ভাল?” জিনি জিজ্ঞেস করল। বোন! ইমলি! আবার মাথার মধ্যে কট করে উঠল বিন্দির। আবার মনে পড়ে গেল সব কিছু।
ও কোনও মতে বলল, “এই আছে আর কী! না, আমি এবার যাই। দেরি হলে ম্যাডাম বকবে। এলাম।”
বিন্দি বলল।
বিন্দি পিছন ঘুরে বড় গেটের দিকে হাঁটতে লাগল। মণির দোকানে যেতে হবে। পাথর বাঁধানো পথের দু’ধারে আলো জ্বলে উঠেছে এবার। সব কিছু বড় মায়াময় লাগে এই সময়টায়। এত সুন্দর পরিবেশের মধ্যেও মুখটা তেতো লাগছে বিন্দির। কোনও কিছুই আজকাল ও ঠিক মতো উপভোগ করতে পারে না। সারাক্ষণ টেনশন হয়। পাঁচ লাখ টাকা। কোথায় পাবে এত টাকা! ম্যাডামকে বললে দেবে না ও জানে। তাই বেকার সে সব বলে মুখ নষ্ট করতে চায় না। এদিকে মা ওকে বলেছে তাড়াতাড়ি টাকাটা জোগাড় না করতে পারলে বাড়ি বিক্রি করে দেবে। ইমলির জীবনের ব্যাপার। কী জীবন এটা! একটা মেয়েকে এখানে এত চাপে আর এমন কুঁকড়ে থাকতে বাধ্য করা হয় কেন! আর মা কেনই-বা সারাক্ষণ ওর ওপর চাপ দেয়! বিন্দি হাতের বাদামগুলো কুর্তির পকেটে ভরে ফেলল। খেতে ইচ্ছে করছে না। বারবার মায়ের কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। সে দিন ফোনে মা এমন কাঁদছিল যে, খুব খারাপ লাগছিল ওর। অসহায় লাগছিল ভীষণ।
সেদিন মাধুর বাড়ি থেকে না খেয়েই তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল। মাধু প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, “না খেয়েই চলে যাবে?”
বিন্দির মনে হচ্ছিল মাধুকে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় মারে। এমন একটা খবর চেপে রেখে ওর সঙ্গে শোয়া-বসা করেছে! সেক্সের জন্য এই নোংরামোটা ও মেনে নিতে পারছিল না। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর চেপে রেখে কী করে ও বিন্দির গায়ে হাত দিতে পারল! সত্যি যদি ওকে ভালবাসত, তা হলে কি বিন্দির এই বিপদে ও এমন করে ওকে সেক্সের জন্য ব্যবহার করতে পারত! কী ভেবেছিল, বিন্দি জানবে না?
বিরিয়ানির গন্ধে গা গোলাচ্ছিল বিন্দির। ও দ্রুত জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে নিয়েছিল।
মাধু আবারও বলেছিল, “এ ভাবে চলে যাবে?”
বিন্দি বেরিয়ে যাওয়ার মুখে দরজার কাছে ঘুরে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, “তোমায় কী নোংরা গালাগাল দেব ভেবে পাচ্ছি না! কেমন জানোয়ার হলে এই অবস্থায় কেউ আমার গায়ে হাত দেয়!”
মাধু হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। ঘামছিল কুল-কুল করে। বুঝতে পারছিল যে, বিশাল একটা গোলমাল করে ফেলেছে, কিন্তু সেটা নিয়ে আর কিছু করার উপায় নেই।
মাধু হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়েছিল। বিন্দিও দ্রুত পিছিয়ে এসেছিল। তার পর কড়া গলায় বলেছিল, “আবার যদি পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাওয়ার নাটক করো, তা হলে কিন্তু লাথি মারব তোমার মুখে!”
“মারো মারো। তাই মারো!” মাধু বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠেছিল, “চাচি না করেছিল বলতে, তাই বলিনি। তুমি টেনশন করবে বলেই বলিনি। সব কিছু নরমাল যাতে লাগে তাই আদর করেছি তোমায়। আর তোমায় দেখলে আমার মাথার ঠিক থাকে না বিন্দি। একটা জানোয়ারের মতো অন্ধ টান অনুভব করি আমি। তাই নিজেকে আটকাতে পারিনি। তুমি আমায় মারতে চাইলে মারো। আমি কী করব বলো! আমি কি একটা দোকান বিক্রি করে দেব? তা হলে বেশ অনেকটা টাকা পাব। তোমার সেলাইয়ের স্কুল আর ইমলির বিয়ে দুটোই হয়ে যাবে। করে দেব বিক্রি?”
বিন্দি আর কিছু বলেনি। এ সব নাটক ভাল লাগছিল না ওর। মাধুর দিকে কড়া ভাবে তাকিয়ে ও বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। তার পর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে তরতর করে নেমে গিয়েছিল সিঁড়ি দিয়ে।
বাড়ি ফেরার পথে বুকের ভেতরটা এমন করছিল যে, বলার নয়। কিন্তু সবার সামনে মায়ের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। তাই বাড়িতে ফিরে একান্তে কথা বলতে হবে।
সন্ধে পর্যন্ত ছুটি নিয়েছিল সে দিন বিন্দি। তাই দুপুরবেলা বাড়িতে ফিরে এলেও ওর কাজ ছিল না কোনও। বড় বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকলে ওর ঘরটা কাছে পড়ে। সেখান দিয়েই ঢুকেছিল ও। তার পর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর জামাকাপড় না পাল্টেই মাকে ফোন করেছিল।
বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পরে মা ধরেছিল ফোনটা। বিন্দির মাথায় আগুন জ্বলছিল তখন। কিন্তু কোনও দিনই বিন্দি হঠকারীর মতো কোনও কাজ করে না।
বরং সব সময় মনের ভারসাম্য বজায় রাখে। ও জানে মা ওখানে একা থাকে। মায়ের হাই প্রেশার আছে। ইমিলির ব্যাপারটা মূলত একা সামলাতে হচ্ছে মাকেই। তাই রাগ হলেও মাকে এমন কিছু বলা যাবে না, যাতে করে মা আরও চাপে পড়ে যায়। এর মধ্যে মা অসুস্থ হয়ে পড়লে বিশাল অসুবিধে হয়ে যাবে।
মা কাঁপা গলায় বলেছিল, “হ্যালো!”
বিন্দি গম্ভীর গলায় বলেছিল, “মা…”
আর কিছু বলার আগেই মা শব্দ করে কেঁদে উঠেছিল। বিন্দি শুনেছিল মা প্রচণ্ড কাঁদছে। কথাই বলতে পারছে না। হেঁচকি উঠছে।
“মা শান্ত হও মা, শান্ত হও!” বারবার বলেছিল বিন্দি।
মা বেশ কিছুটা সময় পরে শান্ত হয়েছিল। কোনও রকমে বলেছিল, “মাধু ফোন করেছিল আমায়। ও বলেছে যে, তুই জেনে গিয়েছিস। আমিই ওকে বারণ করেছিলাম তোকে বলতে। মানে, আমি নিজেই বলতাম আর কী। কিন্তু কোন মুখে তোকে বলব বুঝতে পারছিলাম না।”
বিন্দি বুঝতে পারছিল মায়ের কথার গায়ে গায়ে কান্না আর মনের দুর্বলতা জড়িয়ে আছে। মায়ের গলা কেঁপে যাচ্ছিল বারবার। নাক টানছিল মা। বিন্দির কষ্ট হচ্ছিল মায়ের জন্য। ওদের দু’বোনকে মা-ই তো সারা জীবন যতটা পেরেছে আগলে রেখেছে। সেখানে ইমলি যে এমন একটা কাণ্ড করবে, সেটা তো ওরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি!
বিন্দি বলেছিল, “তুমি এ ভাবে ভেঙে পোড়ো না। যা হওয়ার হয়েছে। এখন এটা মেটাতে হবে!”
মা বলেছিল, “না মিটলে আমি ইমলিকে মেরে নিজে কুয়োয় ঝাঁপ দেব।”
“মা এ সব কী বলছ!” বিন্দি মাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, “কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিক হবেই!
মা আবার কেঁদে ফেলেছিল। জড়ানো গলায় সারা জীবনের সমস্ত দুঃখের কথা বলতে শুরু করেছিল। বিন্দির অসহায় লাগছিল খুব। ও দেখেছে এটাই হয়। একটা কষ্ট আরও সব কষ্টকে টেনে আনে। মায়ের বেলাতেও সেটাই হচ্ছিল। মা যেন নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারছিল না।
বিন্দি এবার জোরের সঙ্গে মাকে চুপ করিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “ইমলি কী বলছে?”
“ও বলছে বিয়ে না হলে ও একাই বাচ্চা মানুষ করবে! ও নাকি বড় শহরে চলে যাবে। সেখানে একা থাকবে বাচ্চা নিয়ে। টিউশন করে পেট চালাবে। একদম বোকা একটা মেয়ে। বলে বিদেশে এ সব নাকি আকছার হয়! ভাব একবার!” মা ঝরঝর করে বলছিল, “আরে, এটা বিদেশ নাকি? এখানে ও ভাবে জীবন চলে? এখানে মেয়েদের কি মানুষ বলে মনে করে লোকজন, তুই বল?”
বিন্দি বলেছিল, “আমি দেখছি কী করা যায়। তুমি একদম আজেবাজে কিছু করবে না। আর আমি কি ছেলেটার সঙ্গে কথা বলব?”
“লাভ নেই,” মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “সে ডরপোক! বাপ যা বলবে তাই করবে। তবে ব্যাটা রোজ আসে। ইমলির কাছে বসে। ইমলি কথা বলে না। কিন্তু তাও কুত্তার মতো পায়ে পায়ে ঘোরে। এ দিকে বাপের অমতে নাকি বিয়েও করতে পারবে না! কাকে কী বলব!”
বিন্দি বলেছিল, “তুমি নিজেকে সামলে রাখো। আমি দেখছি কী করে টাকা জোগাড় করা যায়।”
“শোন না…” মা কেমন যেন থমকে গিয়েছিল একটু, তার পর বলেছিল, “আমি তোকে প্রথমে জানাইনি, কারণ তুই অত দূরে একা থাকিস। তাই তোকে টেনশন দিতে চাইনি। মাধুকে বলেছিলাম, কারণ ও পুরুষমানুষ। যদি কিছু বুদ্ধি দিতে পারে। তুই আমার ওপর রাগ করিস না।”
পুরুষমানুষ! বুদ্ধি দেবে! বিন্দির বিরক্ত লেগেছিল। বুদ্ধির বেলায় নারী পুরুষ আবার কী! বরং ছেলেগুলো যে আসলে গবেট হয়, সেটা বিন্দি জানে। পৃথিবীতে এত হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ এত হাজার হাজার বছর ধরে কারা লাগিয়েছে? মেয়েরা?
ফোন রেখে দেওয়ার আগে বিন্দি বলেছিল, “তুমি মাথা ঠান্ডা রাখো। প্রেশারের ওষুধটা ভুলবে না। আমি দেখছি কী করা যায়। আর বাড়িঘর, জমিজিরেত বিক্রির কথা ভাববে না একদম!”
মা বলেছিল, “সেটা এখনও ভাবছি না। তবে… পরে কী করব জানি না।
বিন্দি বলেছিল, “ইমলিকে সামলে রেখো। দেখো, যেন ভুলভাল কিছু করে না বসে!”
মা আবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “মেয়েটাকে কলেজে পাঠিয়েই ভুল হল। মেয়েদের এত পড়াশোনা শেখাতে নেই। বাবা ঠিকই বলত।”
বিন্দির রাগ হয়ে গেল। ও বলল, “না না, ভুল বলত। মেয়েদেরই আগে পড়াশোনা শেখানো উচিত। মা এমন কথা বোলো না। আমি যদি পড়াশোনা করতাম, তা হলে কি এ ভাবে পরের বাড়িতে ঝি-গিরি করতাম! নাকি এই টাকার জন্য আমাদের চিন্তা করতে হত! ইমলি যা করেছে তার সঙ্গে পড়াশোনার কোনও সম্পর্ক নেই। তাই এ সব বোলো না আমায়। আমি রাখছি। তোমরা ঠিক মতো থেকো। বুঝেছ? রাখলাম।”
ফোনটা কেটে বিছানায় ছুড়ে দিয়েছিল বিন্দি। তার পর বড় কাচের জানলা দিয়ে তাকিয়েছিল বাইরে। বাইরে হাওয়া দিচ্ছিল। দুপুরের সোনা-রোদ ছড়িয়ে পড়ছিল বিশাল বড় শিফনের ওড়নার মতো। কী একটা মনে হচ্ছিল ও যেন নরকের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে! পাঁচ লাখ টাকা। কে দেবে ওকে? কেন দেবে? পাখি সুর করে ডাকছিল নিজের মনে। কী সুন্দর পরিবেশ! কিন্তু বিন্দির গেটের কাছে লালুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওর। বিন্দি দেখল চোয়াল নড়ছে লালুর। কিছু খাচ্ছে। ম্যাডাম তো বাড়িতে, তাই লালুর এখন সেরকম কাজ নেই। এই ছেলেটাকে খুব ভাল লাগে বিন্দির। নিজের দাদা থাকলে যেমন ব্যবহার করত ওর সঙ্গে, লালুও যেন তেমনই করে। বিন্দিকে গার্ড করে রাখার চেষ্টা করে। ভাল পরামর্শ দেয়। বিন্দির মনে হয়েছিল লালুকে কি ইমলির ব্যাপারটা বলবে! না, তার পর মত বদলেছে। এ সব পাঁচ কান করে দরকার নেই। লালুর আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। লালু ওকে কোনও সাহায্য করতে পারবে না।
লালু ওকে দেখে এগিয়ে এল। আবছায়া ছিল বলে বোঝেনি, এখন বিন্দি দেখল, লালুর বাঁ হাতে একটা প্যাকেট। আর ডান হাতে আলুর চপ। ইস! বাইরের খাবার খেতে পারে বটে ছেলেটা!
লালু কিছু বলার আগেই বিন্দি বলল, “আবার ওই পোড়া মবিলে ভাজা জিনিসগুলো খাচ্ছ?”
লালু হাসল। বলল, “আমার পেট লোহা দিয়ে তৈরি। সব খাই আমি। আমার অম্বল-টম্বল হয় না। তুই চিন্তা করিস না।”
বিন্দি বলল, “যখন হবে তখন বুঝবে।”
“তুই খাবি? এই দেখ পেঁয়াজি আছে। সাইজ দেখ। বিটনুন ছড়িয়ে দিয়েছে। খা না একটা!” লালু ঠোঙাটা বাড়িয়ে দিল।
বিন্দি নাক কোঁচকাল। বলল, “পেঁয়াজি না ছাই! ওই দামে পেঁয়াজি দেবে! পেঁয়াজের দাম জানো? বাঁধাকপি কুঁচিয়ে দিয়েছে। খেয়ো না ও সব।”
লালু পাত্তা দিল না। জিজ্ঞেস করল, “তা, তুই কোথায় যাচ্ছিস!” “আর কোথায়!” বিন্দি মাথা নাড়ল, “ম্যাডামের জন্য মাল কিনতে যাচ্ছি। মণিদার দোকানে ম্যাডাম ফোন করে দিয়েছে।”
লালু অবাক হল, “এই তো সে দিন এতগুলো আনাল আমায় দিয়ে। এর মধ্যে শেষ! শালা পুরো পিপে হয়ে গিয়েছে! তা তুই থাক আমি যাচ্ছি।”
“না লালুদা,” বিন্দি বাধা দিল, “আমায় বলেছে আমিই যাচ্ছি।” লালু বলল, “জানিস তো সামনে পার্টি হবে। মেয়ে ফিরে এসেছে সেই উপলক্ষে পার্টি। ঘ্যামা হবে মাইরি।”
বিন্দি নির্বিকার গলায় বলল, “হলে হবে! আমি কী করব?” “ক’দিন ধরেই দেখছি তোর মেজাজটা খারাপ। কেন রে?” লালু চপটা শেষ করে নিজের প্যান্টে হাত মুছল।
“কিছু না, এমনি,” বিন্দি জোর করে হাসার চেষ্টা করল। লালু বলল, “আমায় বলতেই পারিস। জোর করছি না। কিন্তু কোনও অসুবিধে হলে আমায় বলতে পারিস বিন্দি। বুঝলি?”
“হ্যাঁ গো বুঝলাম,” বিন্দি হাসল, “আমি যাই। ম্যাডাম আবার রাগ করবে দেরি হলে। আসি।”
লালু মাথা নেড়ে সরে দাঁড়াল। বিন্দি বড় গেটের দিকে এগিয়ে গেল। ও পিছনে না তাকালেও বুঝল, লালু ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে। এই অঞ্চলটা বেশ ফাঁকা। কলকাতার পশ এলাকার অন্যতম এই আলিপুর। বিন্দি ফুটপাথের একপাশ ধরে হাঁটতে লাগল। এখানে পায়ে হাঁটা লোকজন খুব অল্প। মাঝে মাঝে শুধু গাড়ি বেড়িয়ে যাচ্ছে হুস-হাস শব্দ তুলে। হাওয়া দিচ্ছে একটা। গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ শোনা যাচ্ছে। কলকাতার এই অংশে গাছপালা বেশি। ওদের চাকেরির কথা মনে করিয়ে দেয়।
অন্য দিন হলে বিন্দির এই সব ভাল লাগত। কিন্তু এখন সারাক্ষণ ওর শরীরের মধ্যে কেমন যেন একটা ঝিঁঝি ডাকে। মাথার মধ্যে যেন বহু দিনের পুরনো বন্ধ ঘরের অন্ধকার আটকে আছে। বুকের মধ্যে কিসের যেন এক কষ্ট। এই বয়সেই জীবন ওকে ক্রমাগত নানা বিপদে ফেলতে থাকে। বিন্দির মনে হয়, ওর টাকা নেই বলেই জীবন ওর কাছে এক দুর্বিষহ বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদি কোনও উপায়ে টাকা রোজগারের সুযোগ থাকে, তা হলে ও পিছনে হটবে না। ও কি জানে না যে, বীরেন্দ্রর এই যে এত টাকা, সে সব সোজা উপায়ে রোজগার করা নয়! আজকালকার দিনে কেউ সোজা পথে এত টাকা রোজগার করতে পারে না। সভ্য, ভদ্র, নিয়ম মেনে চলা মানুষের জীবন সব সময় কঠিন হয়। পদে পদে তাদের হেনস্থার শিকার হতে হয়। অমানুষদের হাতে পীড়িত হতে হয়। একদিন বিন্দি শুনেছিল যে, বীরেন্দ্র কাকে যেন ফোনে বলছিল, “এই পৃথিবীতে বাঁচতে গেলে বুচার হতে হয়।” বুচার। এর মানে জানে বিন্দি। ও নিজেও এখন বুচার হতে চায়। অনেক হয়েছে ভাল সেজে থাকা। ইমলি তো ভাল ছিল, কিন্তু কী হল ওর! বিন্দিও সুযোগ পেলে দেখে নেবে সবাইকে। নিজের অজান্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল বিন্দির। মাথার দুটো পাশ কেমন যেন ব্যথা করে উঠল।
মণির দোকানটা বেশ বড়। দূর থেকেই বিন্দি দেখল ভিড় হয়ে আছে। নানা শ্রেণির পুরুষদের ভিড়। এই সব জায়গায় আসতে কেমন যেন সঙ্কোচ হয় বিন্দির। যদিও এই শহরে ছেলে আর মেয়েদের মধ্যেকার বিভেদ প্রায় আর নেই বললেই চলে। তাও ওর মধ্যেকার আধা-গ্রামের মেয়েটার নিজস্ব সংস্কার এখনও কাজ করে।
মণি দূর থেকে দেখে হাত তুলে দোকান থেকে দূরেই দাঁড়াতে বলল। তার পর একটা ছেলেকে দিয়ে কালো বড় প্লাস্টিকের একটা প্যাকেট পাঠিয়ে দিল।
বিন্দি বুঝল ওতেই জিনিসটা আছে। ওর আসলে ভুল হয়ে গিয়েছে।
বাড়ি থেকে একটা ব্যাগ নিয়ে আসা উচিত ছিল। আজকাল মাঝে মাঝেই এমন টুকটাক ভুল করে ফেলছে ও।
ও ছেলেটার কাছ থেকে প্যাকেটটা নিল। টাকা দেওয়ার এখনই দরকার নেই। ম্যাডাম ওদের নিয়মিত খরিদ্দার।
আবার বাড়ির দিকে ফিরল বিন্দি। বাঁ হাতে প্যাকেট নিয়ে ডান হাতটা কুর্তির পকেটে ঢোকাল। বাদাম। জিনি দিয়েছিল। ও কয়েকটা বাদাম বের করল। তার পর মুখে দিল। বাদাম খেতে ওর ভাল লাগে। “নমস্কার!”
আচমকা পাশ থেকে গলাটা পেয়ে চমকে গেল বিন্দি। ও থাকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামান্য বিষমও খেল যেন। কে লোকটা! এমন আচমকা কেউ ডাকে!
বিন্দি দেখল লোকটাকে। লম্বা। দোহারা চেহারা। দেখতে বেশ ভাল। ছোট করে কাটা চুল। চোখে একটা সরু ফ্রেমের চশমা। রাস্তার আলোয় দেখে মনে হল বয়স মধ্য তিরিশের মতো।
লোকটির গলার স্বরটি নরম।
বিন্দি জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার?”
লোকটি হাসল। সুন্দর দাঁতের সেটিং। বলল, “আপনি বিন্দি শর্মা তো?” “হ্যাঁ!” বিন্দি অবাক হল।
লোকটা হাসল। তার পর বলল, “মাধুর কাছ থেকে জানলাম আপনার ব্যাপারে।”
কথাটা বলে লোকটা তাকিয়ে রইল ওর দিকে। যেন ওর প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়!
বিন্দি সামান্য কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী দরকার আপনার যদি বলতেন।”
“আমার? আমার সামান্য দরকার আছে আপনার সঙ্গে। কিন্তু,” লোকটা হাসল আবার। বলল, “আপনার আমার সঙ্গে তার চেয়েও বেশি দরকার আছে। বুঝলেন? আপনার দরকার আছে। আপনার মায়ের দরকার আছে। এমনকি, আপনার বোন ইমলিরও দরকার আছে।”
বিন্দি হাঁ করে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। কে লোকটা?
লোকটা সেরকমই হাসি হাসি মুখে বলল, “মাধু কিন্তু আপনাকে খুব ভালবাসে। আর আপনি? আপনি তো নিজেকে ভালবাসেন, তাই না? তাই বলছি আপনার আমার সঙ্গে খুব দরকার।”
“কে আপনি!” বিন্দির সামান্য ভয় লাগল এবার। পিঠ দিয়ে বরফের টিকটিকি হেঁটে গেল যেন।
লোকটা বলল, “ভয় পাবেন না। আমাদের এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। আমি ক্ষতি করব না আপনার। আমার নাম ধরে নিন রূপবান। আমাকে আপনার বন্ধু ভাবতে পারেন। কেমন?”
