৩২. বিন্দি
আজ রাতটা যেন বড্ড নির্জন। উর্জা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে যেন আরও বেশি নির্জন লাগছে। বিন্দি চুপ করে বাগানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাতলা হাওয়া দিচ্ছে একটা। কলকাতায় রাত গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে। রাতচরা পাখিরা কোথাও যেন ডাকছে। আর ডাকছে একটা কোকিল। এমন রাতে মাঝে মাঝেই একটা কোকিল কোথায় যেন ডাকে। এই বড় বাগানের এত গাছপালার মধ্যেই নিশ্চয়ই কোনও পাতার তলায় বসে আছে পাখিটা। আর ডেকে চলেছে। মানে ডেকেই চলেছে। এমন নির্জন রাতে কোকিলের এই ডাক যেন ছোট ছোট কাচের টুকরোর মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। কেমন যেন গা ছমছমে এই ডাক। শিরশিরে একটা ভয় যেন ভেসে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়। যেন সাংঘাতিক কিছু একটা হবে। কোকিলের গলা দিয়ে যেন স্বর নয়, অন্ধকার রঙের কোনও তরল ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে শহরে।
বিন্দির খেয়াল হল যে, ওর হাতের মধ্যে ঘেমে উঠেছে দু’হাজার টাকার নোটটা। ও টাকাটাকে কুর্তির পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। আর তখনই মোবাইলটা ঠেকল হাতে। একটু আগে এই মোবাইল থেকেই ও ফোন করেছিল বীরেন্দ্রকে।
টাকা। টাকার জন্য আর কী করতে হবে ওকে! টাকা আর এই চাকরি। বীরেন্দ্রর কথা না শুনলে তো ওকে বের করে দেবে এখান থেকে। উর্জার জুতোর ফিতে খুলে গিয়েছিল। সেটা বিন্দিই বেঁধে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু উর্জা তা করতে দেয়নি ওকে। বরং নিজেই ঝুঁকে পড়ে জুতোর ফিতেটা বেঁধেছিল। আর তখনই ব্যাগ থেকে কিছু কাগজপত্র পড়ে গিয়েছিল। প্লেনের টিকিট আর পাসপোর্ট। পাসপোর্ট! উর্জা কি বিদেশে যাচ্ছে! কিন্তু বাড়িতে তো তেমন বলেনি!
বিন্দি দ্রুত ঝুঁকে পড়ে টিকিট আর পাসপোর্টটা তুলেছিল। এক ঝলকে দেখেছিল নামটা। ওয়েলিংটন। এটা আবার কোথায়! কিন্তু পাসপোর্ট আছে যখন সঙ্গে, তখন দেশের বাইরেই হবে নিশ্চয়ই।
উর্জা চটপট সব সামলে নিয়েছিল। বিন্দিও বুঝতে দেয়নি যে, ও কিছু দেখেছে বা বুঝেছে।
উর্জা বেরিয়ে যাওয়ার পরে আর সময় নষ্ট করেনি বিন্দি। দ্রুত মোবাইল বের করে ফোন করেছিল বীরেন্দ্রকে। বীরেন্দ্র আসলে বাড়িতে নেই। কোথায় গিয়েছে কে জানে! কিন্তু যেখানেই যাক না কেন, এই কথাটা ওকে জানাতে হবে। বাড়িতে একরকম বলেছে উর্জা। কিন্তু টিকিট ওয়েলিংটনের। ওয়েলিংটন ভারতের মধ্যে নয়তো আবার! ফোনটা করে দ্বন্দ্বে ভুগছিল বিন্দি। কী বলবে বীরেন্দ্র? বা এমন সময়ে ফোন করছে বলে বীরেন্দ্র আবার বিরক্ত হবে না তো?
রিং হওয়ার মাঝে নানা চিন্তা এসে যেন পিনের মতো মাথার মধ্যে ফুটছিল বিন্দির।
চারবার রিং হওয়ার পরে ফোনটা ধরেছিল বীরেন্দ্র। ছোট করে বলেছিল, “বল।”
“উর্জাদিদি বেরিয়ে গেল।”
“হ্যাঁ, সে তো যাবেই!”
“না, ওয়েলিংটন বলে একটা জায়গার টিকিট দেখলাম।”
“ওয়েলিংটন! সে কী!” আচমকা যেন বীরেন্দ্রর গলাটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল, “কতক্ষণ আগে গিয়েছে?”
“এই তো এই মাত্র। সঙ্গে পাসপোর্টও ছিল। দেখেছি। ওয়েলিংটন কি ভারতের মধ্যে? নাকি দেশের…”
বিন্দিকে কথা শেষ করতে দেয়নি বীরেন্দ্র, কেটে দিয়েছিল ফোনটা তার পর থেকে কেমন একটা লাগছে বিন্দির। উর্জার কোনও ক্ষতি করে দিল কি ও! বীরেন্দ্রর গলার স্বর পাল্টে যাওয়া, ফোন কেটে দেওয়া, সব ওকে কেমন যেন অস্বস্তিতে ফেলছে। উর্জা ভাল মেয়ে। বিন্দিকে কোনও দিন খারাপ কথা বলেনি। কাজের মেয়ে বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেনি। কোনও দিন বুঝতে দেয়নি যে, বিন্দি এই বাড়িতে কী হিসেবে রয়েছে। এমনকি, আজ যাওয়ার সময় দু’হাজার টাকা দিয়ে গিয়েছে। এটা তো না দিলেও পারত। এই ভাল মেয়েটাকে কি ও নিজের স্বার্থে কোনও বিপদের মুখে ঠেলে দিল!
কোথা থেকে যেন আবার কোকিলটা ডেকে উঠল। বিন্দির মনে হল রাতের এই নিস্তব্ধতাকে কেমন ভয়ের আবহে জড়িয়ে দিচ্ছে এই ডাক। যেন বলছে, আজ রাতটা ভাল নয় একদম ।
কেন এমন কু ডাকছে ওর মন! বিন্দি চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল। পেটের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। অম্বল হল কি? জ্বালা ধরানো কোনও একটা তরলের স্রোত যেন ঠেলে উঠতে চাইছে পেট থেকে বুকের দিকে। যেন কোনও সাপ বিষ ঢালতে ঢালতে বেরিয়ে আসতে চাইছে শরীরের বাইরে। ওর মধ্যেকার এই বিষাক্ত জীবটাই কি ওকে দিয়ে এ সব করাচ্ছে!
“কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস?”
অমলা মাসির ডাকে যেন হুঁশ ফিরল বিন্দির। অমলা মাসি এসে দাঁড়িয়েছে কাছে। মুখটা যেন সামান্য বিষণ্ণ!
বিন্দি জোর করেই হাসল একটু।
অমলা মাসি বলল, “কুশি কাঁদছে। মেয়ে থাকলে মেয়ের সঙ্গে সে ভাবে কথা বলে না। কিন্তু এখন নেই, আর দেখ, কাঁদছে! মানুষের যে কী রকমসকম, এত বয়স হল তাও বুঝলাম না!”
বিন্দি বলল, “ম্যাডাম তো ঘুমিয়ে ছিলেন। জেগে গিয়েছেন?’
“হ্যাঁ রে, জেগে গিয়েছে,” অমলা মাসি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “এদের এত টাকা যে, তার ভারে সাধারণ জীবনের ভারসাম্যটাই হারিয়ে গিয়েছে। যাক গে, তুই খাবি না?”
বিন্দি বলল, “খুব অম্বল হয়েছে গো! টক জল ওপরে উঠে আসছে!”
“হবে না!” অমলা মাসি বিরক্ত হয়ে শাসনের ভঙ্গিতে বলল, “ওই পোড়া মবিলে ভাজা চপ গিলবি! আরে বাবা এটা শরীর তো! লোহার বাক্স তো নয়!”
বিন্দি আবারও জোর করে হাসল। বুড়ি বড্ড বকছে। ভাল লাগছে না ওর। মনের মধ্যে কেমন যেন একটা কাঁটা বিঁধে আছে। চোখের সামনে উর্জার মুখটা ভাসছে। কেন বীরেন্দ্র অমন করে কেটে দিল ফোনটা?
অমলা মাসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোদের জন্য চিন্তা হয়। আসলে আমার নিজের তো কেউ নেই। কুশিকে দেখাশোনা করেই জীবন কাটল। এখন তোরা আছিস তাই আমার একটু ভাল লাগে। কী জানি কবে এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে! তখন যে কোথায় যাব !”
বিন্দির উত্তরের অপেক্ষা না করে অমলা মাসি সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে বড় বাড়ির দিকে চলে গেল।
বিন্দি দেখল ব্যাপারটা। ভাবল, ও কি ঘরে ফিরে যাবে, নাকি লালুর কাছে যাবে একবার! কিন্তু এত রাতে লালুর কাছে গেলে লালু কিছু মনে করবে না তো! একটা ছুতো চাই ওর। সেটা পেলে লালুর কাছে যাওয়া যাবে।
এ সব ভাবতে ভাবতেই পেটের মধ্যে থেকে বুকের দিকে সেই সাপটা আবার ছোবল দিল যেন! বিন্দি চোখ-মুখ কুঁচকে সামলাল নিজেকে। আচ্ছা বিপদ তো!
অমলা মাসি যাই বলুক, ও সব বাইরের তেলেভাজা একটুও খায় না বিন্দি। সন্ধেবেলা একটু পপকর্ন খেয়েছিল আজ। তার পর তো আর কিছু খায়নি। তা হলে এমন হচ্ছে কেন?
ওর ঘরে ওষুধ আছে। কিন্তু সেটা না খেয়ে ও যদি লালুর ঘরের দিকে যায়, তা হলে লালুকে অন্তত এটা বলতে পারবে যে, ওর ওষুধের দরকার। বিন্দি আর অপেক্ষা না করে লালুর ঘরের দিকে এগোল।
জিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে একা। হাতে মোবাইল আর কানে ইয়ারফোন। গান শুনছে। বারান্দায় আজ একটা মৃদু আলো জ্বলছে।
বিন্দিকে দেখে কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে এগিয়ে এল, “উর্জাদি চলে গেল, না?”
বিন্দি মাথা নাড়ল।
“কোথায় গেল গো?” জিনি জিজ্ঞেস করল।
বিন্দি বলতে গিয়েও বলল না। উত্তর দিল, “তা তো জানি না। আচ্ছা, একটা কথা বলবে?”
“কী?”
বারান্দার দুর্বল আলোয় জিনির মুখে কৌতূহল দেখতে পেল বিন্দি। ও বলল, “ওয়েলিংটন কোথায় বলো তো?”
“ওয়েলিংটন!” জিনি যেন থমকে গেল একটু। তার পর বলল, “নিউ জ়িল্যান্ডে। কেন?”
“নিউ জিল্যান্ড? সেটা আবার কোথায়?” বিন্দি এমন জায়গার নাম আগে শোনেনি।
জিনি বলল, “সে দক্ষিণ গোলার্ধে। অস্ট্রেলিয়ার সাউথ ইস্টে। একটা বড় দ্বীপের মতো দেশ। তুমি যাবে নাকি সেখানে?”
” “অস্ট্রেলিয়া? ক্রিকেট খেলে না ওরা? রিকি পয়েন্টিং?” বিন্দি চোখ বড় করল।
“পন্টিং। রিকি পন্টিং। হঠাৎ এ সব জিজ্ঞেস করছ? এ সব দেশ অনেক দূরে,” জিনি এগিয়ে এল দু’পা।
“অনেক দূরে!” বিন্দি চোয়াল শক্ত করল। ভাবল, এই নিউ জিল্যান্ড দেশটায় যাওয়ার জন্য বেরিয়েছে উর্জা। অত দূরে চলে যাচ্ছে! তার পর ভাবল, তা ভালই করছে। এই বাড়িতে থেকে কী করবে? এখানে তো অশান্তি আর ঝামেলা ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু তার পর আবার মনে হল, বাড়িতে এটা লুকোল কেন?
“এত রাতে এ সব জেনে কী করবে?” জিনি জিজ্ঞেস করল আবার। “কিছু না এমনি,” বিন্দি হাসল। আর তখনই
আবার জ্বালা ধরানো সেই টক জল বুকের মধ্যে ছোবল মারল। মুখটা বিকৃত হয়ে গেল ওর। “কী হল?” জিনি সামান্য উদ্বিগ্ন হল যেন
“না না, কিছু না। আচমকা অম্বল হয়ে গিয়েছে খুব!” কোনও মতে হাসল বিন্দি।
“আমি জোয়ানের জল এনে দিই? আমাদের কাছে আছে। দেব?” “না না। লালুদা একটা ওষুধ দেয়। সেটাই নিতে যাচ্ছি,” বিন্দি আর অপেক্ষা না করে ওপরের দিকে এগোল।
জিনি যেন কিছু বলতে গিয়েও দ্বিধা করল, তার পর বাধা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বীরেন্দ্র সার এখনও বাড়ি আসেননি, না?”
“না, এখনও আসেননি। তোমার দরকার ছিল?”
“না না,” জিনি যেন লজ্জা পেল সামান্য। বলল, “আসলে কবি চলে আসে তো। আজ এখনও আসেনি। তাই ভাবছিলাম।”
“তেমন হলে একটা ফোন করে নাও!”
“না না, তেমন কিছু নয়,” জিনি মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে তুমি যাও। আমি ঘরে যাই। মা এবার রাগ করবে।”
জিনি চলে গেল ঘরের মধ্যে। দরজা বন্ধ করার শব্দ পেল বিন্দি। ও আর না দাঁড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল ওপরে।
লালুর ঘরের দরজা আজও সামান্য খোলা। ভেতর থেকে আলো এসে পড়েছে বাইরের এই এক ফালি বারান্দায়।
বিন্দি দরজায় টোকা দিল।
“কে?” লালুর গলাটা কি একটু জড়ানো লাগল?
বিন্দি বলল, “আমি লালুদা।”
লালু যেন নিজেকে সামলাল। তার পর বলল, “আয়।”
বিন্দি দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকল। দেখল, লালু বিছানায়
আধশোয়া হয়ে আছে। পাশে মোবাইল রাখা। লালুর হাতে গ্লাস। ঘরের মধ্যে সস্তা মদের গন্ধ।
মদের গন্ধে সেটা সস্তা না দামি, তা এখন বুঝতে পারে বিন্দি। ম্যাডামের দৌলতে এটা ও শিখেছে।
লালুর বিছানার পাশে ছোট্ট একটা টেবিল। সেখানে ছোট্ট বোতলটা রাখা। পাশে একটা প্লাস্টিকের থালায় চানাচুর আর মুরগির মাংসের কাবাব।
লালুর চোখ লাল হয়ে আছে।
বিন্দি কী বলবে বুঝতে না পেরে হাসল।
“এত রাতে! কী ব্যাপার?” লালু জিজ্ঞেস করল।
“আমার খুব অম্বল হয়েছে। আমার কাছে ওষুধ নেই। তোমার কাছে কিছু আছে?”
লালু উঠে বসল এবার। হাতের গ্লাসটা পাশে রেখে নাকটা মুছল। তার পর বলল, ওই সামনের আলমারিটার মধ্যে একটা প্লাস্টিকের বাক্স আছে। ওটা নিয়ে আয়।”
কাঠের ছোট্ট আলমারি। বিন্দি খুলল। দেখল, সামনের হলুদ রঙের একটা প্লাস্টিকের চৌকো বাক্স রাখা আছে। বাক্সটা নিয়ে এসে লালুর সামনে রাখল। তার পর নিজেও বিছানার এক পাশে বসল।
লালু বাক্সটা খুলে ওষুধ ঘেঁটে একটা স্ট্রিপ বের করল। তার পর একটা সাদা চ্যাপটা ট্যাবলেট বের করে এগিয়ে দিল ওর দিকে। বলল, “এটা চুষে খেয়ে নে। চিবোবি না কিন্তু। চুষে খাবি। রায় মেডিক্যালের সুজনদা দিয়েছিল। হেভি ভাল। খা।”
ট্যাবলেটটা মুখে দিল বিন্দি। মিষ্টি। কেমন যেন আইসক্রিমের স্বাদ! খেতে বেশ ভাল। সব ওষুধ যদি এমন সুন্দর খেতে হত!
লালু আবার নাকটা ঘষল। তার পর গ্লাসটা হাতে নিল। জিজ্ঞেস করল, “এত রাতে এলি! আগে আসতে পারতিস!”
“ওই উর্জাদিদি চলে গেল তো! তাই। মানে কাজ ছিল। এখন ফ্রি হলাম। ভাবলাম তোমার কাছে ওষুধ আছে কি না দেখি,” বিন্দি ধীরে ধীরে বলল।
লালু গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে একটা মাংসের টুকরো মুখে দিল। সময় নিয়ে চিবোল। তার পর বলল, “কোথায় গেল?”
“আমি ঠিক জানি না। তবে মনে হয় দেশের বাইরে।”
বিন্দি সময় নিল। ওর মনের মধ্যে দ্বিধা কাজ করছে। লালুকে কি বলা ঠিক হবে? আর বললে কতটা বলবে? লালু এমনিতেই নেশা করে আছে। ও যা বলবে তা কি আদৌ বুঝতে পারবে?
বিন্দি বলল, “কিন্তু আমার না ভয় করছে!”
“ভয়? কেন?” লালু যেন নিজেকে ফোকাস করার চেষ্টা করল।
“স্যর ফোন করেছিলেন। জিজ্ঞেস করছিলেন উর্জাদিদি কোথায়? আমি বলার পরে কেমন করে যেন ফোনটা কেটে দিলেন। আমার ভয় করছে তাই। লোকটা ভাল না। আমি তো বলেইছি তোমায়,” গোটা কথাটায় নিজে থেকে ফোন করার ব্যাপারটা মিথ্যে করে মিশিয়ে দিল ।
“ভাল না মানে? পাক্কা বাঞ্চোত লোক। জানোয়ার শালা! এ সব লোকের বাঁচার অধিকার নেই!” লালু উত্তেজিত হয়ে উঠল।
বিন্দি বলল, “আমার ভয় লাগছে লালুদা। কবি তো সারাক্ষণ স্যরের থাকে। আজ এখনও বাড়ি ফেরেনি। তুমি কি একবার কবিকে ফোন করবে? বলবে?”
“কী বলব?” লালু অবাক হল।
“মানে, জানি না ঠিক। কিন্তু উর্জাদিদির কোনও ক্ষতি হবে না তো! যদি…” বিন্দি কথা শেষ না করে লালুর দিকে তাকিয়ে রইল। লালু নাক টানল। গ্লাসে আর-একটা চুমুক দিয়ে ভাবল যেন কিছুক্ষণ।
পর বিড়বিড় করে বলল, “লেগে যাক ঠাকুর ঠাকুর করে!”
“কী বললে?” বিন্দি অবাক হল সামান্য। লেগে যাক মানে? কী লেগে ? রূপবান ওকে বলেছিল বীরেন্দ্রর বিরুদ্ধে লালুকে উস্কে দিতে। করতে এসেছে ও। তবে আজ সবটা যেন সেটাও নয়। আজ যেন জন্য সত্যিই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। বীরেন্দ্রর ফোন কেটে দেওয়াটা কেমন সাধারণ নয় ।
লালু এবার গোটা গ্লাসটা শেষ করে দিল। তার পর হাতের উল্টো পিঠ মুখটা মুছে বলল, “দেখ, ওদের ব্যাপারে মাথা না গলানোই ভাল। সে আমায় যে ভাবে অপমান করল, তার পর থেকে ঠিক করেছি যে, এ আমি নেই। যা পারে করুক। কে উর্জা কে বীরেন্দ্র, আমার তাতে কী! যা পারে করুক। তুই ঘরে গিয়ে ঘুমো।”
বিন্দি ইতস্তত করল। লালুকে যে কী করে বোঝাবে! লালু অন্য সময় কথা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ যেন বুঝতেই চাইছে না। কেন করছে ও!
বিন্দি জিজ্ঞেস করল, “তুমি খেয়েছ?”
লালু হাসল। বলল, “ইচ্ছে করছে না রে আজ। মালটা বেশি খেয়ে ফেলেছি। সঙ্গে এই ঝাল চিকেন কাবাব। আমাকেও না ওষুধ খেতে হয়!”
বিন্দি আর কী বলবে বুঝে পেল না যেন। ও উঠে দাঁড়াল। তার পর শেষ চেষ্টা করার মতো করে বলল, “তুমি তাও একবার কি কবিকে ফোন করবে?”
লালু এবার পাশের টেবিলে রাখা জলের বোতলটা নিল। সেখান থেকে এক ঢোঁক জল খেয়ে বলল, “বিন্দি শোন। যা আমাদের নাগালের বাইরে, সেখানে আমাদের হাত না-দেওয়াই ভাল। কবি যখন স্যরের সঙ্গে থাকে, তখন ওকে ফোন করতে বারণ করেছে। আর আমাদের কী দরকার অন্যের ঝামেলায় ঢুকে? স্যরের মেয়ে। স্যর বুঝবে। তুই বেকার মাথা খাস না আমার! আমি ফোন করে কেস খাই আর কী! সে দিন যা খিস্তি খেলাম আর ইচ্ছে করে না। আমার এমনিতেই মটকা খারাপ হয়ে আছে। নিজের অশাস্তি কি কম আমার, বল? তুই ঘরে যা। আমিও শোব। শালা, নেশাটা কেটে গেলে আর ঘুম আসবে না। তুই কাট এখন।” এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল লালু। তার পর আবার যেন কিছু মনে পড়ে গিয়েছে এমন ভাবে বলল, “শোন, এক-একটা ঘটনায় লাইফ পুরো পাল্টে যায়। বুঝেছিস? লাইফ পাল্টাতে এক সেকেন্ড লাগে না রে বিন্দি! তাই সাবধান থাকতে হয়। বুঝলি? যা, তুই ঘরে যা। আমি ঘুমোব। দরকার হলে আর-একটা ওষুধ নিয়ে যা সঙ্গে করে। রাখ নিজের কাছে। অম্বল বাজে জিনিস। প্রেমের মতো। যা!”
বিন্দি ঘরের বাইরে এসে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল নীচে। লালুও কেমন যেন অদ্ভুত ব্যবহার করল। আচ্ছা ওর এই ব্যবহারের পিছনে কি রূপবান আছে? রূপবান কী করাতে চায় লালুকে দিয়ে? বীরেন্দ্রর কোনও ক্ষতি করাতে চায় কি? কিন্তু লালুর মতো একজন বীরেন্দ্রর কি ক্ষতি করতে পারে?
বিন্দির গুলিয়ে যাচ্ছে সব। কিছুই যেন বুঝতে পারছে না। মুখের ভেতর সাদা ট্যাবলেটটা ক্রমে ছোট আর পাতলা হয়ে গিয়েছে। অসাবধানে এবার চিবিয়ে ফেলল বিন্দি। তার পরেই খেয়াল হল লালু এমনটা করতে বারণ করেছিল।
মনের ভেতরটা কেমন যেন করছে বিন্দির। ও তাকাল চারিদিকে। রাতের শুনশান বাগান। ওই বড় বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। জানলার মধ্যে দিয়ে নরম হলুদ আলো কেমন যেন বাষ্পের মতো হয়ে আছে। হাওয়া দিচ্ছে হালকা। গাছের পাতায় কী আশ্চর্য একটা মশমশে শব্দ! দূরে অন্ধকার কোণে জোনাকি টিপটিপ করছে কিছু। বিন্দির শরীরটা এমন অস্থির করছে কেন?
ও ঘরের দিকে না গিয়ে বড় গাছে ঝোলানো দোলনার দিকে এগোল। নরম আলোর মধ্যে ও নিজের শ্বাসের শব্দও যেন শুনতে পাচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে বিন্দির। অকারণেই কেমন যেন বুকের মধ্যে আস্তে আস্তে জলের স্তর বাড়ছে। ডুবে যাচ্ছে ওর ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, কণ্ঠনালী। মাথার মধ্যেও কেমন যেন ভার! ও আকাশের দিকে তাকাল। ওই কিছু তারা দেখা যাচ্ছে।
মনে হচ্ছে আকাশের কালো প্লাস্টিককে কে যেন পিন ফুটিয়ে ছিদ্র করে দিয়েছে। আর সেখান দিয়ে অন্য কোনও জগতের আলোর গুঁড়ো দেখা যাচ্ছে মাত্র! আচ্ছা অন্য কোনও জগৎ কি সত্যি আছে? সেই জগতেই ঈশ্বর থাকেন? তিনি কি আদৌ দেখতে পান আমাদের? বুঝতে পারেন আমাদের কষ্ট?
দোলনার সামনে গিয়ে গাছের ডাল থেকে ঝোলানো দোলনার দড়িতে হাত রাখল বিন্দি। আর ওর স্পর্শে যেন জেগে উঠল দোলনাটা। ঘুমন্ত শিশুর শ্বাসে তার বুক যতটুকু ওঠাপড়া করে, ঠিক সেই স্পন্দে দুলতে লাগল দোলনাটা।
বিন্দি ভাবল এখন কে বসবে এখানে? কার সময় আছে?
আচমকা কুর্তির পকেটের ফোনটা নড়ে উঠল। এত রাতে কে ফোন করল আবার! এখন কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না একটুও। কিন্তু এই সময় যে ফোন করেছে, তার নিশ্চয়ই দরকার আছে খুব। তাই কিছুটা অনিচ্ছের সঙ্গেই ফোনটা বের করল বিন্দি।
আরে মা! এখন! বিন্দি ফোনটা ধরে কানে লাগাল, “মা বলো।” “বিন্দি!” মায়ের গলাটা ফোনের ও-পারে কেমন যেন হাহাকারের মতো লাগল!
বিন্দি নিমেষে সোজা হয়ে দাঁড়াল। মায়ের গলাটা এমন কেন! কী হয়েছে?
“মা কী হয়েছে?” বিন্দি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল। “ইমলি… ইমলি…” মা যেন কথা খুঁজে পাচ্ছে না, “শহরে গিয়েছিল…. ফিরতে রাত হচ্ছিল। তার পর খবর পেলাম…. হাইওয়েতে বাস থেকে নেমে হেঁটে আসছিল… তখন কারা যেন খেতের মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে…. ওই অবস্থায় ওকে… বিন্দি আমি কী করব! ওকে পাথর দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে তার পরে… গ্রামের লোকেরা জড়ো হয়েছে… আমায় ডাকছে…. দুর্জয় আসেনি….. ওদের বাড়ির লোকেরা আসেনি! ওরা শেষের দিকে রাজি হচ্ছিল না। টাকা পেলেও না… আমার ইমলি….. কারা ইমলিকে এমনটা করল? বিন্দি তুই….. তুই….” মায়ের গলা বুজে এল। কথা ডুবে গেল জলে। জল…. জলে ভরে গেল চারিদিক। কণ্ঠনালী ছাপিয়ে জল উঠে এল চোখ অবধি।
পাশ থেকে কে যেন এবার ফোনটা নিয়ে সংক্ষেপে বলল, “তুই চলে আয় তাড়াতাড়ি। আমাদের মনে হচ্ছে দুর্জয়রাই করিয়েছে। তুই কালকেই আয়! এখন রাখছি।”
গলাটা শুনে ওদের পাশের বাড়ির প্রীতমচাচার গলা বলে মনে হল। তা হলে ওরাই কি জেনে গিয়েছে? না হলে দুর্জয়ের নাম বলল কেন? আর ইমলি কেন শহরে গিয়েছিল? একা ফিরছিল কেন? ইমলিকে খেতের মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে কী করেছে? ইমলি কি আর ….
মাটিতে বসে পড়ল বিন্দি। গলা বন্ধ হয়ে আসছে ওর। শ্বাস নিতে পারছে না। প্রচণ্ড একটা কষ্ট বুক বেয়ে উঠতে চাইছে, কিন্তু যেন পারছে না বেরোতে। চোখ জ্বালা করছে বিন্দির। এ কী খবর এল এত রাতে! এখন কী করবে ও! কার কাছে যাবে? আজ কি কালরাত্রি? এমন রাতে কি নরকের দ্বার খুলে যায়? আর এক মুহূর্তে পালটে যায় জীবন?
ইমলির মুখটা মনে পড়ছে ওর! দুর্জয়ের জন্য তো পাঁচ লাখ জোগাড় করছিল ও। এখন টাকা নিয়ে কী করবে? টাকা, টাকার জন্যই তো এত কিছু করা! চাকরি বাঁচানোর চেষ্টা। সেটা করতে গিয়ে বীরেন্দ্রর কাছে উর্জার খবর দেওয়া। সব বৃথা হয়ে গেল এক মুহূর্তে! মা এবার কী করবে? ইমলি নেই! সেই ছোট্ট বোনটা নেই! দুই বিনুনি ঝুলিয়ে খেতের মধ্যে যে-মেয়েটা হাতে একটা কঞ্চি নিয়ে পাখি উড়িয়ে বেড়াত, সেই মেয়েটা নেই! কোথায় গেল? কে নিয়ে গেল ওকে? ওই কালো প্লাস্টিকের আড়ালে যে বসে থাকে সে কি নিয়ে গেল? পাখির মতোই কি উড়ে গেল ইমলি? ওকে সমস্ত যন্ত্রণার থেকে মুক্তি দিয়ে গেল? শেষ মুহূর্তে কি ইমলির ওর কথা মনে পড়েছিল? কারা করল এমন কাজ? নরকের দরজা খুলে কি আজ রাক্ষসরা নেমে এসেছে পৃথিবীতে? আজ কি কারও রেহাই নেই?
একটু দূরে, বড় কোনও গাছের পাতার আড়ালে বসে আচমকা আবার ডেকে উঠল কোকিলটা! আর, তার পর ডাকতে থাকল। এ কোন বিরহী কোকিল? কেন এই রাতে এমন গলা চিরে সে ডেকে চলেছে? মানুষের জীবনের সমস্ত কষ্ট, যন্ত্রণা, অসহায়তা আর একাকিত্বের কথাই কি সে বলতে চাইছে?
পৃথিবী যেন নিবে আসছে বিন্দির চারিদিকে! মাথার মধ্যে যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এক-এক করে আলো। যেন দেখতে পাচ্ছে খেতের মধ্যে একটা বাচ্চা মেয়ে ঝর্নার মতো হাসতে হাসতে পাখিদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে! আর পাখিরা উড়ে যাচ্ছে দূরে। বাচ্চা মেয়েটাও যেন তাদের সঙ্গে উড়ে গেল আজ। হারিয়ে গেল। ও যেন দেখতে পেল দূর গ্রামের অন্ধকার খেতের মধ্যে শুয়ে ইমলি তাকিয়ে আছে আকাশের ফুটো ফুটো কালো প্লাস্টিকের দিকে।
আর কোকিলটা ডেকে চলেছে। এবং তার মধ্যে থেকে এক গভীর অন্ধকার যেন ছড়িয়ে পড়ছে কলকাতায়। সেই তরল যেন ডুবিয়ে নিতে চাইল বিন্দিকে। যেন শেষ করে দিতে চাইল ওকে।
কিন্তু বিন্দি চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল। এ জীবনে হেরে গেলে তো হেরে যাওয়াই যায়। তাই বলে এত সহজে ও হারবে কেন? ইমলিকে যারা মারল তারা কি পার পেয়ে যাবে? মা যে একা হয়ে গেল! তার কী হবে? নিজে শেষ হওয়ার আগে কি একবার রাক্ষসদের শেষটা দেখবে না ও! এত সহজে কি ছেড়ে দেবে সব!
বিন্দি চোয়াল শক্ত করে নিজেকে প্রাণপণে সামলানোর চেষ্টা করল। তার পর হাত বাড়িয়ে একটা ঢিল তুলে উঠে দাঁড়াল। কোকিলটা ডাকছে। কোন দিক থেকে ডাকছে? ওই পেছনের গেটের দিকের রাস্তাটার দিকের বড় গাছটার থেকে না?
চোয়াল শক্ত করে সেই দিকে হাতের ঢিলটা প্রাণপণে ছুড়ে দিল বিন্দি! তার পর চিৎকার করে উঠল, “চুপ হো যা…
ওর গলার স্বর প্রেতের মতো ভেসে গেল রাতের অন্ধকারে। আর কী অবাক কাণ্ড, সেই চিৎকারে আচমকা চুপ করে গেল কোকিলটা! বিন্দি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখটা মুছে নিল এবার। ফোনটা ঢোকাল কুর্তির পকেটে। তার পর দৃঢ় পায়ে বড় বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
