২০. জিনি
ফ্ল্যাটটা বেশ বড়। চব্বিশ তলার ওপর। একদম ফাঁকা পড়ে আছে। নতুন রঙের গন্ধে ভারী হয়ে আছে হাওয়া। লিভিং এরিয়া নাকি কমসে কম তিন হাজার স্কোয়ার ফিট। না, স্কোয়ার ফিট সম্পর্কে জিনির কোনও ধারণা নেই। নিধিই ওকে বলেছে যে, এই ফ্ল্যাটটা কত বড়। জিনি শুধু চুপচাপ দেখছে। অবাক হচ্ছে।
নিউটাউনে ঢোকার মুখে এমন ঝাঁ-চকচকে একটা ফ্ল্যাটের কেমন দাম হতে পারে, কোনও ধারণাই নেই জিনির। কয়েক কোটি হবে নিশ্চয়ই! ওর কাছে দু’হাজার টাকাই অনেক। সেখানে কোটি বলতে কী বোঝায়, ও ঠিক জানে না। অত টাকা মানুষ কী করে রোজগার করে, সেটাও বোঝে না। নিধিদের অনেক টাকা। তাই ওদের কাছে এমন ফ্ল্যাট কেনা কোনও ব্যাপার নয়।
আজ কলেজ ছিল না। তাও জিনি বেরিয়েছে। একটা কাজ আছে। কিন্তু সেটা বিকেলে। বাড়িতে থাকতে খুব একটা ইচ্ছে করছে না আসলে। মনমেজাজ ভাল নেই ওর। কেন যে নেই সেটা নিয়ে যেন নিজেকে প্রশ্ন করতেও ইচ্ছে করছে না। আসলে মাঝে মাঝে মানুষ নিজের সামনে দাঁড়াতেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। জিনিরও তাই হচ্ছে।
“আবার তুই স্ট্যান্ডবাই মোডে চলে গেলি!” নিধি খোঁচা দিল ওকে। জিনি হেসে মাথা নাড়ল। বলল, “না, কই?”
“কই? শালা! খুব না!” নিধি ঠোঁট কামড়ে হাসল, “প্রেমে পুরো ডালিয়া হয়ে গিয়েছিস।”
“খালি বাজে কথা তোর,” জিনি হেসে কথা ঘোরাল, “এই ফ্ল্যাটটা তোর একার?”
“হ্যাঁ,” নিধি মাথা নাড়ল, “বাপের প্রচুর টাকা। জানিসই তো। এত টাকা দিয়ে কী করবে বোঝে না। আমায় গিফট করল। এখনও ফাঁকা আছে। আমায় বলেছে ইন্টিরিয়র ডিজ়াইনার দিয়ে যেন সাজিয়ে নিই। ভাল একট হাইড আউট হল আমাদের, বল?
“আমাদের!” জিনি অবাক হল, “আমাদের মানে? তোর আর কার?”
নিধি বিরক্ত হয়ে ছোট্ট একটা চড় মারল জিনির কাঁধে, “তোর, ডাফার! আমার আর তোর। আমরা মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকব দু’জনে।” “দু’জনে?” জিনি তাকাল ওর দিকে।
“আরে আরে হ্যাঁ, লাইক সিস্টার্স। আমি লেসবো নই জানিস তো যে, তোর সঙ্গে রিলেশনে যাব। আমার এক দিদি আছে, মাসির মেয়ে। শি ইজ্ লেসবিয়ান। আমার না ওদের লাইফ স্টাইল দারুণ লাগে! সো গাটসি পিপল! নিজেদের টার্মসে বাঁচে। আমাদের দেশে কত ক্লজেট হোমোসেক্সুয়াল আছে, না! তাদের খুব কষ্ট,” নিধি মাথা নাড়ল, “আমরা সবাই এত ভিতু যে বলার নয়। জানিস, আমি একবার ভেনিসে গিয়েছি। ওখানে তো লঞ্চ ট্রিপ হয়। মুরানো বুরানো এমন নানা জায়গায় নিয়ে যায়। ইটস লাইক হেভেন! তো, তেমন যাচ্ছি। সারাটা পথ দুটো স্প্যানিশ ছেলে, গে কাপল, নিজেদের মধ্যে পিডিএ করে গেল। চুমু খাচ্ছে, জড়িয়ে ধরছে। কোলে বসছে। মানে লাইক ফুল-অন আদর! অ্যান্ড দ্য বেস্ট থিং ইজ নোবডি গিভস আ ফাক। আর এখানে! একবার লেক মার্কেটের পেছনে সর্দার শঙ্কর রোড আছে না, সেখানে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ওয়্যার হাগিং ইচ আদার। কিসিং ইচ আদার। আর বলব কী, চার-পাঁচজন সেক্স স্টার্ভড কাকু তাদের ঘিরে ধরে কী বকল! অ্যাজ ইফ দে ওয়্যার কিলিং সামবডি। আই ওয়জ পাসিং বাই। আমি গিয়ে খুব ঝগড়া করেছিলাম। কাকুরা পালিয়েছিল শেষে। ফাকিং মরাল পুলিশিং! এ দিকে মেয়েদের ক্যাটেলের মতো ট্রিট করে! বাসে মেয়েদের এখানে-ওখানে টাচ করে। খোলা জায়গায় স্নান করা দুঃস্থ মেয়েদের নোংরা ভাবে গেজ করে। মনে হয় কানের গোড়ায় দিই জানোয়ারদের,” নিধি একটানা কথা বলে থামল। একটু দম নিল।
জিনি কী বলবে বুঝতে পারল না। এ সব ব্যাপার ও কলেজে ওঠার পরে বুঝেছে। তার আগে এ সব নিয়ে খুব একটা ধারণা ওর ছিল না। গার্লস স্কুলের রাগী দিদিমণিদের শাসনে সিলেবাসের বাইরের কিছু সে ভাবে জানতে পারেনি। আর ওদের বাড়িতে তো এ সব নিয়ে কথাই হয় না। মা ঘরের কাজ নিয়ে থাকে। সেখান থেকে সময় পেলে বই পড়ে। আর বাবা তো সারাক্ষণ নিজের কাজ, মানে বাড়ির মেনটেনেন্স নিয়েই ব্যস্ত। ওর কেউ নেই সেই ভাবে কথা বলার।
জিনি এখন সব বোঝে, কিন্তু কিছু বলে না। আসলে ইচ্ছে করে না। সবার সব বিষয়ে এত মতামত যে, ক্লান্ত লাগে ওর।
আসলে চিরকালই ও এমন চুপচাপ। স্কুলে সে ভাবে কোনও দিন বন্ধু হয়নি জিনির। মানে ও নিজেই করেনি। কিসের যে একটা হীনম্মন্যতা কাজ করত! কেবলই মনে হত যে বন্ধুরা যদি ওর বাড়িতে আসতে চায়? তা হলে কী হবে? তাই সকলের সঙ্গে কথা বললেও সেটা ছিল ওপর ওপর একটা সম্পর্ক। কাউকেই কাছে আসতে দিত না। এর জন্য অন্যরা ওকে অহঙ্কারী, অসভ্য নানা কথা বলত আড়ালে। বলত, সুন্দর দেখতে বলে নিজেকে কী না কী ভাবে!
ও সুন্দর, নাকি সুন্দর নয় সে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনও দিন মাথা ঘামায়নি জিনি। ও সাজগোজ করে না একটুও। কোনও রূপচর্চাও করে না। শুধু চুলটা কাটাতে হয়। আইব্রো করা, ফেশিয়াল করা বা অন্যান্য আর যা কিছু, সে সব করায় না। নিধি ছদ্মরাগে বলে, “করাবি কী! ভগবানই তো সব করিয়ে পাঠিয়েছে। পারশিয়ালটি করা ভদ্রলোকের মিলেনিয়াম ওল্ড হ্যাবিট!”
কিন্তু এটা পুরোপুরি সত্যি নয়। ইদানীং ওর আয়নার সামনে যেন একটু বেশি সময় কাটছে। মা-ও গত পরশু বলছিল এটা। বলছিল, “কী হয়েছে বল তো তোর? প্রেমেটেমে পড়েছিস নাকি?”
প্রেম! চমকে উঠেছিল জিনি। সকলের সামনে কি ধরা পড়ে যাচ্ছে! কেন এমন হচ্ছে! ও দ্রুত সরে গিয়েছিল আয়নার সামনে থেকে। তার পর বিছানায় উঠে বসেছিল পিসির গা ঘেঁষে।
পিসি বলেছিল, “কী রে? বৌদির কথা শুনে গুটিয়ে গেলি কেন? সত্যি নাকি?”
“এই জিনি,” নিধি বলল, “আবার স্ট্যান্ড-বাই! কী হয়েছে আমায় বল তো! আমাদের দু’জনের এমন একটা ফ্ল্যাট হল। সেখানে কোথায় খুশিতে ফ্ল্যাট হয়ে যাবি, না ক্যালানেগিরি করে যাচ্ছিস!”
“বড্ড বাংলা শিখেছিস। চল একটু বারান্দায় যাই,” জিনি কথা ঘোরাতে হেসে বারান্দার দিকে এগোল।
বড় লিভিং রুমের একটা দেওয়াল পুরোটাই পার্ট বাই পার্ট খোলা যায়, এমন কাচের দরজা দিয়ে ঢাকা। সেটা সম্পূর্ণ খুলে দিলে হু হু করে বিশাল বড় একটা বারান্দা হাওয়া নিয়ে ঢুকে আসে লিভিং রুমে।
এখন সেই পার্টিশনের পুরোটা না খুলে একটা কাচের পার্ট খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এল জিনি আর নিধি।
আজ তেমন গরম নেই। আর এই চব্বিশ তলার ওপরে তো প্রচণ্ড হাওয়া। নিমেষে জিনির চুল এলোমেলো হয়ে গেল। সামনে ছড়ানো একটা শহর। ঝুলনের মতো যেন। কালো সরু ফিতের মতো রাস্তা। দেশলাই বাক্সের মতো ঘরবাড়ি। ছোট্ট সর্ষের দানার মতো মানুষের মাথা। রঙিন নুড়ি পাথরের মতো গাড়ি। দূরে একটা ঝিল দেখা যাচ্ছে। ঠিক যেন কেউ এক বাটি পারদ ঢেলে রেখেছে। জিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কী যে সুন্দর, ভাবা যায় না।
ওর এমন একটা ফ্ল্যাট থাকলে কী যে ভাল হত। কিন্তু যা হলে ভাল হত, তা তো আর হয় না জীবনে। জিনি জানে, এমন ফ্ল্যাট হয়তো কোনও দিনই হবে না ওর। ও চাকরি-বাকরি করে একটা ফ্ল্যাট হয়তো কোনও দিন কিনবে। কিন্তু সেটা হবে কলকাতা থেকে দূরে। শহর হয়ে উঠছে এরকম কোনও মফস্সলে। সেটা হবে অনেকটা ওই মধ্যবিত্তের গড়িয়াহাটার ফুটপাথ থেকে কেনা সফট টয়েজ-এর মতো। এরকম আলিশান ব্যাপার করতে গেলে যে পরিমাণ টাকার দরকার, জিনি জানে, সেটা কোনও দিন রোজগার করতে পারবে না ও।
নিধি যতই বলুক এই ফ্ল্যাটটা ওদের দু’জনের। কিন্তু সেটা তো আর সত্যি নয়। জিনি ওর বন্ধু মাত্র। ইউনিভার্সিটি শেষ হয়ে গেলে কে কোথায় কাজের জন্য ছিটকে যাবে, তার ঠিক নেই। তাই নিধির এ সব কথা ও ধরে না।
বারান্দার রেলিংটা টাফড গ্লাসের। সেটা ধরে নীচের দিকে সামান্য ঝুঁকে তাকাল জিনি। আর মাথা ঘুরে গেল নিমেষের মধ্যে। ও চট করে নিধিকে ধরল। বাপ রে কী উঁচু!
নিধি বলল, “সামলে। ওরকম হুট করে তাকাস না। চল, ঘরে যাই। দারুণ সিনারি কিন্তু, বল?”
জিনি হেসে মাথা নাড়ল। তার পর দু’জনে আবার ঘরে ফিরে এল।
জিনি এবার হাতঘড়িটা দেখল। সাড়ে চারটে বাজে। সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ওকে যেতে হবে বাইপাসের একটা বড় হাসপাতালে। পিসির রিপোর্ট আনতে। মা ওকেই ভার দিয়েছে রিপোর্ট আনার। কাল পিসির ডাক্তার দেখানো আছে।
“কী রে, ঘড়ি দেখছিস কেন?” নিধি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে মাটিতেই বসে পড়ল।
জিনি মাথা নাড়ল, “তোকে তো বললাম। পিসির রিপোর্ট আনতে যেতে হবে।”
“যাবি যাবি। আমি তো আছি। চিল,” নিধি হাসল। তার পর বলল, “শোন না, তুই কাউকে নিয়ে আসতে চাইলে এখানে নিয়ে আসতে পারিস। বুঝেছিস?”
“মানে?” জিনি জিজ্ঞেস করল।
“মানে, ফর সাম হুক আপ। কাউকে আনতে চাইলে আমার থেকে চাবি নিয়ে নিস। এখানে এসে তার পর একদম পালং তোড়…” নিধি হিহি করে হাসল, “গিভ মি টেন ডেজ় টাইম, আমি মিনিমাম ফার্নিচার আনিয়ে নেব। দেন ব্রেক দেম!”
জিনি বলল, “তুই তো জানিস আমার ওরকম কিছু নেই।”
“কেন ঢপ মারছ গুরু? তোর সেই পোয়েট!” নিধি হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ল মেঝেতে!
কবি। আচমকা নামটা মনে আসতেই কেমন যেন বুকের ভেতরে একটা ছোট্ট শক খাওয়ার মতো অনুভূতি হল। চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল জিনি। কাউকে ভাল লাগা মানেই যেন বুকের মধ্যে লাইভ ওয়্যার নিয়ে ঘোরা! সেই তারটা একটু ছোঁয়া হল কি হল না, সারা শরীরে বিদ্যুৎ ছিটকে উঠবে।
নিধি উঠে বসল আবার। বলল, “একটা কথা বল তো, আর ইউ আ ভার্জিন?”
“কী!” জিনি ঘাবড়ে গেল। নিধির কোনও বাউন্ডারি জ্ঞান নেই! এ সব কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে? সব কিছু কি জানতেই হয়? সভ্যতার মানে কী তা হলে?
“আঃ, এত লজ্জা পাস কেন? বল না, কোনও দিন করেছিস?” জিনি মাথা নাড়ল।
“সিরিয়াসলি! ইউ আর ফাকিং টুয়েন্টিটু। অ্যান্ড ইউ ডোন্ট নো হাউ ইট ফিলস টু গেট লেড,” নিধি মাথা নাড়ল, “আমার তো সেই সেভেন্টিনে হয়ে গিয়েছে। না না, নট আউট অফ লাভ, বাট আর্জ। এটা তো কমন। তোর আর্জ নেই?”
“ছাড় না!” জিনি এবার একটু বিরক্ত হয়েছে বোঝাতে জোরের গলায় বলল।
“কেন ছাড়ব? আর্জ না থাকলে ডক্টর দেখাতে হবে। আচ্ছা, আর্জ এলে কী করিস? সেলফ হেল?”
“আমি যাব এবার,” জিনি জোরের সঙ্গে বলল।
“আহা, রাগ করছিস কেন?” নিধি উঠে দাঁড়িয়ে জিনির হাত টেনে দাঁড় করাল। বলল, “আমি তো আনব এখানে। পাক্কা!”
জিনি কিছু জিজ্ঞেস না করে তাকাল নিধির দিকে। নিধি বলল, “বিধানকে। আনব। দেখিস!”
বিধান! জিনি ঘাবড়ে গেল। এটা তো বুঝতে পারেনি!
নিধি বলল, “বিধান ইজ্ আফটার ইউ, না? তাও আই লাইক হিম। আই ওয়ান্ট আ রিলেশানশিপ উইথ হিম। খারাপ হবে?”
জিনি বলল, “দেখ, তোর ভাল লাগলে নিশ্চয়ই ওর সঙ্গে রিলেশনে যাবি।”
নিধি বলল, “যাবই তো। আর তুই এ ভাবে কেন থাকছিস? এখনকার দিনে ছেলে বা মেয়ে বলে কিছু হয় না। তোর মনের কথা অন্য কেউ তোর হয়ে বলে দেবে না জিনি। ইউ হ্যাভ টু অ্যাক্ট।”
অ্যাক্ট! সেটা ও করেছে তো। কোনও দিন যা কারও জন্য করেনি। সারাক্ষণ সবার থেকে সরে থেকেছে যে মেয়েটা, সে নিজে গিয়ে বলেছে নিজের ভাল লাগার কথা। গায়ে পড়ে বলেছে যেন পড়াশোনা করে। নিধিকে ওর কাজের ব্যাপারে বলেছে। আর কত অ্যাক্ট করবে! জোর করে তো কোলে উঠে বসা যায় না!
ছেলেটা যে কী! কেন কাঁদে একা বসে! কিছু প্রশ্ন করলে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে দু’-এক ফোঁটা উত্তর বের করা যায় বড়জোর। কথাই বলে না। চোয়াল শক্ত করে থাকে। এমন ছেলেকে কেন ওর ভাল লাগল ভগবান! মানে, এটা তো ওর হাতে ছিল, তা হলে? নাকি ছিল না হাতে? বাবা-মা আত্মীয়স্বজনদের পছন্দ করে যেমন মানুষ পৃথিবীতে আসতে পারে না, তেমন মানুষের কাকে ভাল লাগবে কি লাগবে না, সেটাও কি দৈব নির্ধারিত? মানুষ যদি সবটা কন্ট্রোল করতে পারত, তা হলে কি প্রেমের ব্যাপারে এত ঝামেলা হত? জিনির মাথা গুলিয়ে যায় এ সব ভাবতে গেলে। কী দরকার ছিল ওর কবিকে ভাল লাগার! ফালতু একটা কাঁটা। মনের মধ্যে সারাক্ষণ খচখচ করে। কিছু করে স্বস্তি নেই। কিছু খেয়ে আরাম নেই। ফাউ হল কারণে অকারণে মনখারাপ। নিজেকে মূল্যহীন ভাবা। কেন যে ‘অ্যাক্ট’ করতে গেল ও!
জিনি দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আবার ঘড়ি দেখল। তার পর বলল, “শোন না, আমায় তুই একটু চিংড়িঘাটায় ড্রপ করে দিবি? তা হলেই হবে।”
“কেন? জিনি বলল, “কবি আসবে। ওর সঙ্গে যাব। আমি ওকে বলেছিলাম গতকাল।”
হসপিটাল থেকে রিপোর্ট নিবি না?” নিধি অবাক হল।
“আরে ওয়াহ্,” নিধি হাসল, “আস্তে আস্তে হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স হচ্ছিস তা হলে। চল।”
ফ্ল্যাট থেকে নীচে নেমে গাড়িতে বসল ওরা। আজ আর নিজের স্কুটি নিয়ে আসেনি নিধি। গাড়ি আর ড্রাইভার নিয়ে এসেছে। পেছনের সিটে হাত-পা ছড়িয়ে বসার মতো জায়গা।
একটা জিনিস এখন জিনি বোঝে। ধনী হওয়া মানে বেশি স্পেস দখল করে রাখা। বড় বাড়ি। বড় গাড়ি। প্লেনে এগজ়িকিউটিভ ক্লাসে নিজের জন্য বেশি স্পেস। ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসে বড় জায়গা। সবটাই আসলে স্পেস। যার যত টাকা তার দখলে তত স্পেস। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের এই একটা ব্যাপার কিন্তু এখনও একই আছে।
নিধি জুতো খুলে পা দুটো তুলে বাবু হয়ে বসল। তার পর বলল “কাউকে বলিস না বিধানের কেসটা।”
“না না,” জিনি হাসল।
নিধি বলল, “এ সব জিনিস বেশি বলতে নেই। কে কোথা দিয়ে কাঁচি করে দেবে। তোকে বললাম এই কারণেই যে, ইউ আর ইন লাভ উইথ ইওর পোয়েট। প্রেমে আর যুদ্ধে মন্ত্রগুপ্তি হল জয়লাভের মন্ত্র। বুঝেছিস?”
“তুই একটা বই লেখ। তোর সব উইজডম সেখানে থাকবে। দিশাহীন মানুষজনের কাজে লাগবে,” জিনি হাসল।
“দূর, ও সব বসে লেখটেখা হবে না আমার দ্বারা! ভাবছি একটা চ্যানেল খুলব। আজকাল তো সবাই খুলছে। হাবিজাবি যা পারছে করছে। আমিও সেরকম একটা চ্যানেল খুলে বকবক করব। কুড়ি-বাইশটা ভিউ হবে। গোটা পঞ্চাশেক সাবস্ক্রাইবার। লাইফ ইনশিওরেন্সের পলিসি বিক্রি করার মতো করে জনে জনে গিয়ে রিকোয়েস্ট করব যদি তারা সাবস্ক্রাইব করে, সেই আশায়। ভেতরে ফাটলেও সবার সামনে ইগো ফুলে ফুলকপি! ইউজলেস পিপলদের আজকাল এটাই তো ওয়ে আউট।”
“এত বিটার কেন তুই!” জিনি হাসল আবার, “যে যা পারছে করুক, তোর কী!”
“কেন? যে যা পারছে করুক মানে! মামদোবাজি! ফ্রেঞ্চ রেভোলিউশনের সময় এমন সোশ্যাল মিডিয়া থাকলে আর দেখতে হত না। ঘরে বসে চিপস খেতে খেতে সবাই বিপ্লব করত। হ্যাশট্যাগ অ্যাটাক বাস্তিল বলে লিখেই তৃপ্তি পেয়ে দেখত, হ্যান্ডেল ট্রেন্ড হল কি না। সত্যি সত্যি বাস্তিল আর ভাঙতে যেত না কেউ। লুই আর তার বৌ মস্তিতে বাকি লাইফ কাটিয়ে দিত। গিলোটিন দিয়ে তরমুজ আর অন্যান্য ফল কেটে সবাই ফ্রুট স্যালাড খেত।”
“আচ্ছা আচ্ছা,” জিনি মাথা নাড়ল, “কিছু একটা পেলেই হল তোর…” নিধি আরও কিছু বলত হয়তো, কিন্তু তার আগেই ওর মোবাইল বেজে উঠল। নিধি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে দেখে নিয়ে জিনিকে বলল, “মা…” তার পর কথা বলতে শুরু করল।
জিনি ঘড়ি দেখল। সময় মতো নিতে হবে রিপোর্ট। ঠিক সময় আসবে তো কবি!
কাল যখন মা বলেছিল এই রিপোর্ট আনার ব্যাপারে, প্রথমে কিন্তু সামান্য গাঁইগুঁই করেছিল জিনি। ওরা থাকে আলিপুর, সেখান থেকে সেই বাইপাস। বাসে করে অত দূর! তা ছাড়া ওর যে নিধির সঙ্গে নিউটাউনের কাছে একটা জায়গায় যেতে হবে। আগে থেকেই ঠিক করা আছে।
ও বলেছিল, “আমায় কেন এ সবে ঢোকাচ্ছ? আমার অন্য কাজ নেই?” মা বলেছিল, “আস্তে কথা বল, রতি দোকানে গিয়েছে, চলে আসবে যে-কোনও সময়ে। শুনলে কষ্ট পাবে।”
রতি মানে রতিপিসি। বাবার খুড়তুতো বোন। থাকে বেশ দূরের মুড়াপোঁতা বলে একটা গ্রামে! সেখানে একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায় রতি পিসি। আগে একটা পলিটিক্যাল পার্টিতে ছিল। কিন্তু বহু দিন হল ও সব ছেড়ে দিয়েছে!
পিসি বিয়ে করেনি। কেন করেনি জানে না জিনি। আর সত্যি বলতে কী, জেনেই বা কী করবে। যে যার জীবনে যেমন খুশি থাকবে।
বছরে একবারের বেশি ওদের বাড়িতে আসে না পিসি। তবে এলে ভালই লাগে জিনির। খুব শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। আর যেটা সবচেয়ে ভাল লাগে জিনির, তা হল খাবার। পিসি এত খেতে ভালবাসে। মাঝে মাঝেই বাইরে থেকে খাবার কিনে আনে। মা আর বাবা পিসিকে বারণ করে এমন করে টাকাপয়সা খরচ করতে। বকাবকি করে। কিন্তু পিসি হেসে উড়িয়ে দেয় সব কথা। বলে, “খাব না তো কি টাকাপয়সা সঙ্গে করে নিয়ে ওপরে যাব? কে করে নিয়ে যেতে পেরেছে রে দাদা!”
গতকাল যখন ও আর মা কথা বলছিল, পিসি বেরিয়েছিল চাইনিজ কিনে আনতে!
আজকাল নানা অ্যাপ আছে খাবার আনার। কিন্তু সে সব নেই জিনির মোবাইলে। বাবা পছন্দ করে না বাইরের খাবার। তা ছাড়া দামেরও একটা ব্যাপার আছে। তাই বাইরে প্রায় খাওয়াই হয় না জিনির।
পিসি এলেই বাইরের খাবার কিনে আনে। কালও নিজে গিয়েছিল। ওদের বাড়ি থেকে হেঁটে মিনিট দশেক। পিসি বলেছিল, “আমি নিয়ে আসছি খাবার। বাড়িতে রান্না বন্ধ আজ। দাদাকেও খাওয়াব জোর করে। খালি বুড়োটেপনা!”
পিসির ইউটেরাসে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। সেজন্য শরীর ভাল নেই। টেস্ট করিয়ে এসেছে গতকাল। আর আজ তারই রিপোর্ট আনার কথা।
মা তাই জিনিকে বলেছিল, “তুই না গেলে হবে? তোর বাবা পারবে না। গতকাল রতিকে নিয়ে টেস্ট করিয়ে এনেছে। আর ছুটি পাবে না। জানিসই তো। তা ছাড়া রতির পক্ষে অত দূরে একা যাওয়া মুশকিল। তোকে মানি রিসিট দিয়ে দেবে। জাস্ট দেখাবি। রিপোর্ট নিয়ে আসবি। আমি আমার থেকে দুশো টাকা দিচ্ছি তোকে যাতায়াতের জন্য। কাউকে বলতে হবে না। লক্ষ্মীটি, না করিস না। তেমন হলে কাউকে নিয়ে যা।”
কাউকে নিয়ে যাবে? কাকে নিয়ে যাবে? নিধিকে বললে, যাবে।
গাড়ি করেই ওকে নিয়ে যাবে। কিন্তু জিনির তা ইচ্ছে করেনি। ওর কেবলই মনে হচ্ছিল, আছে তো একজন। ওকে বলে দেখবে? যদি রাজি হয়? বেশ কিছুটা সময় তা হলে থাকতে পারবে এক সঙ্গে।
জিনি মাকে বলেছিল, “ঠিক আছে আমি দেখছি।”
বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল জিনি। দোতলার দিকে তাকিয়েছিল। আলো বন্ধ। মানে, কবি নেই ঘরে। তা হলে নিশ্চয়ই ওই ছোট বাগানটায় আছে।
পায়ে পায়ে সেই দিকে গিয়েছিল জিনি। দেখেছিল, ঠিক তাই। বাগানের কোনার বেঞ্চে কবি বসে রয়েছে একা। কানে হেডফোন। গান শুনছে বোধহয়।
জিনি গিয়ে আলতো করে একটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ডেকেছিল কবিকে। কবি তাকিয়েছিল অবাক হয়ে। তার পর কান থেকে হেডফোনটা খুলে সামান্য ঘুরে বসেছিল ওর দিকে।
বাগানটায় খুব সুন্দর করে আলো লাগানো। নিচু স্টাম্পের মাথায় হুড দেওয়া নরম আলো। চোখে লাগে না, কিন্তু জ্যোৎস্নার মতো আভা ছড়িয়ে থাকে চারিদিকে।
কবির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েছিল জিনি। বসন্তের হাওয়া বইছিল নরম পশমের মতো। আশপাশের গাছপালা থেকে ঝিরঝির শব্দে খসে পড়ছিল পাতা। এই বাগানে ওরা মাত্র দু’জন। আর কেউ নেই। কবি তাকিয়েছিল ওর দিকে। কবির মুখে হালকা দাড়ি, এলোমেলো চুল, বড় বড় চোখ।
জিনির বুকের মধ্যে কী যে হচ্ছিল! মনে হচ্ছিল সব ভুলে, কিছুর তোয়াক্কা না করে জড়িয়ে ধরে কবিকে। সারা শরীর ডাকছিল কোনও এক অজানা ইশারায়। যুক্তিকে অতিক্রম করে আদিম নারী যেন আচ্ছন্ন করে তুলছিল ওকে। জিনি বুঝতে পারছিল, এই বসন্ত বাতাস ওকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।
নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে, জোর করে স্বাভাবিক গলায় জিনি বলেছিল, “আমায় একটা হেল্প করবে?”
“বলো,” কবি তাকিয়েছিল ওর দিকে।
জিনি বলেছিল, “আমার সঙ্গে কাল একটা জায়গায় যাবে? আমার পিসি এসেছে। ওর টেস্ট হয়েছে। কাল রিপোর্ট আনতে যেতে হবে। আমাকেই যেতে হবে। কিন্তু মানে একা…”
কবি জিজ্ঞেস করেছিল, “কোথায়? ক’টার সময়ে?” হসপিটালের নামটা বলে জিনি বলেছিল, “কাল সাড়ে পাঁচটা।
বিকেল। যদি চিংড়িঘাটায় আসো পাঁচটার সময়… তা হলে…* কোনও বাক্যই আর সম্পূর্ণ করছিল না জিনি। ওর মনের একটা অংশ ওকে বলছিল, এটা কি ঠিক হচ্ছে! আবার আর একটা অংশ বলছিল, কেন ঠিক নয়? যাকে ভাল লাগে, তার সঙ্গে আলাদা করে সময় কাটানোতে খারাপ কিছু নেই।
তবে নিজের ওপর বিরক্তও লাগছিল জিনির। স্পষ্ট করে ভাল লাগার কথা বলার পরও যে-ছেলে অমন আড় হয়ে থাকে, তার পেছনে কেন ঘুরছে ও! নিজেকে মাঝে মাঝে এত পেটাতে ইচ্ছে করে! কেন এ ভাবে কবির কাছে যেতে ইচ্ছে করে ওর! কেন এমন কথা বলতে ইচ্ছে করে! নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না? কেন পারে না?
কিন্তু কী করবে জিনি? এমনি বললে যে আসত না ছেলেটা, সে ব্যাপারে জিনি ভাবল, এটা কি ডেট? মানে, এমন করে কি কেউ ডেটে যায়? হাসপাতাল। মেডিক্যাল এগজামিনেশনের রিপোর্ট আনা। এ সব কী! ও নিশ্চিত।
গতকাল ওই প্রস্তাব দিয়ে দম আটকে দাঁড়িয়েছিল জিনি। যেন অপেক্ষা করছিল রেজাল্ট বেরোনোর। কোনও দিন দু’জনে একা কোথাও বাড়ির বাইরে যায়নি তো! কিন্তু কবি কি রাজি হবে? বসন্তের হাওয়া কি বিফলে যাবে এবারও?
কবি বলেছিল, “আমার একটু কাজ আছে। কিন্তু ঠিক আছে। আমি পাঁচটায় পৌঁছে যাব। স্যর নেই। তাই ফাঁকা আছি একটু। স্কুটিতে তোমার প্রবলেম নেই তো?”
স্কুটি? জিনির পিঠ দিয়ে চারটে বরফের দানা গড়িয়ে গিয়েছিল আচমকা। রোমাঞ্চে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ওর শরীরের রোম। স্কুটিতে বসে যেতে হবে! মানে অত কাছে! শরীরকে স্পর্শ করবে শরীর!
কবি জিজ্ঞেস করেছিল, “অসুবিধে হবে? তুমি স্টেডিয়ামে যাওয়ার দিকের রাস্তার বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে। আমি পৌঁছে যাব।”
“থ্যাঙ্কস,” জিনির মনের ভেতরটা যেন উপচে উঠেছিল খুশিতে। ও দেখেছিল, কবি আবার নিজের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। যেন পরোক্ষে জিনিকে চলে যেতে বলছে। কিন্তু জিনি যায়নি। ও তাও দাঁড়িয়ে ছিল।
কবি এবার ভুরুটা তুলে তাকিয়েছিল ওর দিকে। মানে, জিনির আর কিছু বলার আছে? না।
“তুমি চাইনিজ খাও?” আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করেছিল জিনি। ছোট্ট করে মাথা নেড়েছিল কবি।
“খাও না? কেন?” অবাক হয়ে তাকিয়েছিল জিনি।
“ভাল লাগে না,” কবি ছোট করে বলেছিল।
“কেন ভাল লাগে না?” জিনির মধ্যে থেকে আর একটা জিনি যেন এ সব ওকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছিল। নিজের কানকেই যেন নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। এ সব কেন জিজ্ঞেস করছে জিনি? ওর কী দরকার, কবির কী ভাল লাগল কী লাগল না সেটা জানার! স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কবি সরে থাকছে। তাও এমনটা কেন?
কবি সময় নিয়েছিল। তার পর শান্ত গলায় বলেছিল, “ছোট থেকে খাইনি। গ্রামে এ সব পাওয়া যায় না সে ভাবে। তাই।”
জিনির জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল, কেন খায়নি? সেখানে তা হলে কেমন খাবার পাওয়া যায়। আর কোনও দিন খায়নি বলে এখন খেতে অসুবিধে কী? মানুষ তো নতুন জিনিস ট্রাই করে। তা হলে মুশকিলটা কোথায়! কিন্তু এবার গলা বুজে আসছিল ওর। কেবলই মনে হচ্ছিল, কবির গলায় কি নিরাসক্তি না বিরক্তি? ও কি বেশি প্রশ্ন করে ফেলছে? জিনি কখনও চায় না কবি ওর সম্বন্ধে কোনও খারাপ ধারণা করুক বা ওর ওপর কোনও ভাবে বিরক্ত হোক।
জিনির জিভ যেন ভারী হয়ে গিয়েছিল। তাও এতটা যখন বলে ফেলেছে, বাকিটাও বলে দিয়েছিল, “আমাদের বাড়িতে আজ খাবে? পিসিমণি এসেছে। চাইনিজ আনতে গিয়েছে। আসবে?”
কবি সামান্য হেসেছিল। আর গালে জেগে উঠেছিল লম্বা দুটো টোল। হাওয়ার জোর কি বেড়েছিল তখনই? পাশের বকুল গাছ থেকে কি ঝরে পড়ছিল রাশি রাশি সুগন্ধি তুষার? বাগানের নরম আলো কি নরম হয়ে গিয়েছিল আরও? কবি কি বুঝতে পারছিল, মাটি ভিজে উঠছে জিনির? জিনি আপ্রাণ সামলাচ্ছিল নিজেকে। কান্না আসছিল ওর। নিজেকে যে কী তুচ্ছ আর ভিখিরি মনে হচ্ছিল! তাও কেন যে দাঁড়িয়েছিল ও? কেন দাঁড়িয়েছিল?
কবি হেসে বলেছিল, “অন্য দিন খাব। আজ না, কেমন? কিছু মনে কোরো না। কাল আমি ঠিক পৌঁছে যাব।”
ওই ছোট্ট বাগান থেকে জিনির নিজের ঘর অবধি আসার পথটা মনে হচ্ছিল কে যেন টেনে অযুত যোজন লম্বা করে দিয়েছে। বুকের মধ্যে পাক খাচ্ছিল ঘূর্ণি। জ্বালা করছিল চোখ। সারা শরীরে যেন শিরায় শিরায় কেউ ভরে দিয়েছিল ফুটন্ত তেল। মনে হচ্ছিল, ওকে এই ভাবে তাড়িয়ে দিল!
চাইনিজ় খুব ভালবাসে জিনি। তবু রাতে খেতে পারছিল না একটুও। সব খাবার যেন বুকের মধ্যে আটকে যাচ্ছিল। গলা বুজে আসছিল। মাংস বা মাছ কিছুই ভাল লাগছিল না। মা, পিসি জিজ্ঞেস করছিল কী হয়েছে? জিনির কি শরীর খারাপ!
জিনি কাউকে কিচ্ছু বলেনি। কী বলবে জিনি! যা হয়েছে তা কি বলার মতো! এই পৃথিবী-পৃষ্ঠের হাজার হাজার কিলোমিটার তলায় যে আগুন পাক খায়, গলন্ত লাভা বয়ে যায়, চাপে আর তাপে লক্ষ বছরের উদ্ভিদ পাল্টে যায় তেলে আর কয়লায়, সে সব কি মানুষ বুঝতে পারে ওপর থেকে? এ প্রক্রিয়া যে পৃথিবীর নিজের। এ কষ্ট যে মাটির খুব গোপন।
রাতে পিসির পাশে শুয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল জিনি। বুকের মধ্যে কী যে কষ্ট হচ্ছিল! কবির মুখটা মনে পড়ছিল কেবল। আর কারণ ছাড়াই কোনও এক টান যেন ওকে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল জলের তলায়। শ্বাস নিতে পারছিল না জিনি। কেন ওর এমন হচ্ছে বুঝতে পারছিল না। কিসের এই টান! এমন অযৌক্তিক টান! কবি ওকে সে ভাবে লক্ষ করে না বলেই কি আরও জেদ চেপে যাচ্ছে ওর! এ কি ভালবাসা? নাকি ঘোর? নাকি… নাকি… বুকের মধ্যে কেমন যেন চাপ লাগছিল জিনির। কাল আসবে তো? নাকি সেটাও কাটিয়ে দেবে? ওকে সরিয়ে দেবে তুচ্ছ পতঙ্গের মতো! আর থাকতে না পেরে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একসময় শব্দ করে কেঁদে উঠেছিল জিনি।
“কী হয়েছে জিনি?” পিসি বিছানায় পাশ ফিরে ওর দিকে তাকিয়েছিল। তিনি নিজেকে আর আটকাতে পারেনি। পিসিকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ রেখে কেঁদে যাচ্ছিল। কেঁদেই যাচ্ছিল।
ঘরে লাল নাইট ল্যাম্প জ্বলছিল। তার আলোয় সব কেমন ভূতুড়ে লাগছিল জিনির। মনে হচ্ছিল ও আর নিজের মধ্যে নেই। মনে হচ্ছিল ও অশরীরী হয়ে গিয়েছে! পিসি ওকে আলতো করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বসেছিল। কিছু বলছিল না। কাঁদতে দিচ্ছিল জিনিকে।
বেশ কিছু পরে, জিনি সামলেছিল নিজেকে। তার পর ঠিক মতো উঠে বসে চোখ মুছেছিল।
পিসিও সময় দিয়েছিল জিনিকে। একটু পরে নরম গলায় বলেছিল, “শান্ত থাক জিনি। আমি জিজ্ঞেস করব না কী হয়েছে। আমি তো এখানে থাকি না, বছরে একবার আসি মাত্র। তাই তোর কেন কষ্ট, সেটা জেনেও কিছু করতে পারব না। শুধু জানবি, তোর কষ্ট কেউ দূর করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুই সেটা নিজে করবি। তাই কান্নাকাটি না করে, হাল না ছেড়ে দিয়ে সেটাকে সলভ করার চেষ্টা কর। এই জীবন অনেকটা বড়, এ ভাবে গুমরে বাঁচতে পারবি বলে মনে হয় তোর?”
কিছু না বলে, শুয়ে চোখ বন্ধ করেছিল জিনি। পিসি কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেছিল, “কেউ অন্তর্যামী নয়। মনের কথা বলে দিতে হয় স্পষ্ট করে।”
হতে হবে না অন্তর্যামী। জিনি কি স্পষ্ট করে বলেনি? বলেছে তো! তাও অমন করে থাকে কেন ও? কিসের এত অহঙ্কার? কিসের এত নিস্পৃহতা?
চিংড়িঘাটা মোড়ে জিনিকে নামানোর আগে নিধি বলল, “মা খুব চিন্তিত। মায়ের এক ভাই মানে আমার ছোটমামা আমেরিকায় থাকে। সেখানে করোনাভাইরাসের জন্য খুব সমস্যা শুরু হয়েছে। বলছে, ওরা নাকি চলে আসবে। কারণ, এটা নাকি প্যান্ডেমিক হবে। ‘হু’ ক’দিনের মধ্যেই ঘোষণা করবে। সারা পৃথিবীতে ছড়াবে এটা। তাই মামারা চলে আসতে চাইছে। তোর কী মনে হয় রে জিনি? প্যান্ডেমিক না কী সব বলছে, এমনটা হবে? সত্যি?”
জিনি পড়েছে ব্যাপারটা। টিভিতেও দেখেছে। কিন্তু ও আর কী বলবে। এই দেশে তো এখনও সে ভাবে বিশাল কিছু হয়নি।
নিধি ওকে নামিয়ে, গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, “শান্তিতে কেউ থাকতে দেবে না, বুঝেছিস! নাঃ, এ সব ঝামেলা শুরুর আগে বিধানকে নিয়ে একবার… কখন কী হয়ে যায়, বলা তো যায় না। তাই না?”
রাস্তার ও পাড়ে নীল রঙের স্কুটি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল কবি। স্কুটিটা চেনে জিনি। বাড়ির গ্যারাজেই দেখেছে। জিনি দেখল একটা হেলমেট সিটে রাখা। আর হাতে আর একটা হেলমেট নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে কবি। রাইডার্স হেলমেট। বুঝল জিনি৷
জিনি ধীর পায়ে কাছে যেতেই কবি বলল, “সওয়া পাঁচটা বাজে। সময় হয়েই গিয়েছে। চলো।”
জিনির বুকের মধ্যে কেমন একটা করছে। সোজা তাকাতে পারছে না যেন কবির দিকে। কবি নিজের হাতের হেলমেটটা ওর হাতে দিল। তার পর সিটে রাখা হেলমেটটা তুলে মাথায় পরে নিল। বসল সিটে।
জিনি বুঝল, কবি বেশ অনেকটা এগিয়ে বসেছে, যাতে ও ঠিক মতো বসতে পারে।
হেলমেট মাথায় পরে, ওড়নাটা সামনে সামলে সাইড করে বসল জিনি।
“রেডি?” কবি ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” জিনি সঙ্কোচে কবির পিঠটা ধরল। স্কুটিটা মসৃণ ভাবে এগোতে লাগল।
হাওয়া আসছে। মুখে-চোখে লাগছে জিনির। আলতো করে কবির কাঁধটা ধরে আছে ও। কী যে ভাল লাগছে ওর! কবি কথা বলছে না। জিনিও না। শুধু হাওয়ার শব্দ, মানুষের অস্পষ্ট গুঞ্জন আর পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়ির আওয়াজ ওদের হয়েই যেন বলে দিচ্ছে সব কথা। জিনির ইচ্ছে করছে আরও ভাল করে কবিকে ধরতে, কিন্তু পারছে না। এই সামান্য স্পর্শেই নত হয়ে আসছে ওর মন। আর্দ্র হয়ে উঠছে শরীর। নিজেকেই যেন অচেনা ঠেকছে জিনির। মনে হচ্ছে নিধির ওই ফ্ল্যাটে যদি ও আর কবি কোনও দিন যায়!
হাসপাতালের মেন গেট দিয়ে স্কুটিটা ঢুকিয়ে দিল কবি। তার পর পার্কিং লটের এক পাশে দাঁড় করিয়ে বলল, “তোমায় যেতে হবে না। স্লিপটা দাও। আমি নিয়ে আসছি।”
ব্যাগ খুলে স্লিপটা বাড়িয়ে দিল জিনি। টাকা আগেই দেওয়া আছে। জিনি এবার তাকাল কবির দিকে। ওর যে যেতে ইচ্ছে করছে কবির সঙ্গে। কিন্তু বলতে পারছে না। কেন?
কবি ওকে দেখল একবার। তার পর দ্রুত চলে গেল রিসেপশনের দিকে।
হাওয়া দিচ্ছে বেশ। কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া, লাল-হলুদ ফুল ঝরিয়ে চলেছে ক্রমাগত। হাসপাতালে ঢোকার পথটা কী সুন্দর রঙে রাঙা হয়ে আছে। পথের এক পাশে সার দিয়ে দাঁড়ানো অশোক গাছের মাথায় বেশ কিছু টিয়া পাখি দেখল জিনি। এখানে টিয়া পাখি আছে! ও আকাশের দিকে তাকাল। ধূসর। তার মধ্যেও বেশ কিছু লালচে মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। হাওয়ায়, গাছে, মেঘে সব কিছুতেই যেন কী আনন্দ আজ। দূরে গেটের কাছে সিকিওরিটির একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হেসে গল্প করছে। আর হাসতে হাসতে মেয়েটা ছেলেটার গাল থেকে কিসের একটা কুটে৷ সরিয়ে দিল। ছেলেটা আরও জোরে হেসে উঠল। সামান্য দূরে দাঁড়ানো একটা পুলিশ তাকিয়ে দেখল ওদের। তার পর মাথার একটা হেলমেট খুলে হাসল নিজের মনে। সিগারেট ধরাল।
জিনির কী যে ভাল লাগল দেখে! ভাস্কর চক্রবর্তীর একটা কবিতা মনে পড়ে গেল। ও ভাবল কী ভাবে যে দিন পালটায়। মানুষের মন পালটায়। কাল যে-মেয়ে কাঁদছিল রাতে, যে-মনে সারাক্ষণ মেঘ করে আসছিল, সেই মনে আজ এত আলো! এত আনন্দ! ওর ভাল লাগছিল এই ভেবে যে, এখান থেকে স্কুটি করে অনেকটা দূরে সেই আলিপুরে, ওরা এক সঙ্গে যাবে। ও তো ঠিক করে রেখেছে, ফেরার সময় মাঝপথে দাঁড় করাবে কবিকে। চিকেন রোল খাবে। খিদে পেয়েছে ওর। তা ছাড়া সময়ও পাওয়া যাবে আর-একটু। আরও দু’-চার ফোঁটা ভাললাগার মধু জমিয়ে রাখা যাবে বুকের মধ্যেকার ছোট্ট কৌটোয়।
“হয়ে গেছে।”
কবি পেছন থেকে কবির গলা পেল জিনি। ও ঘুরে তাকাল। দেখল, এসে গিয়েছে। হাতে একটা বড় খাম।
জিনি হাসল। বলল, “তা হলে এবার…”
“জিনি,” কবি ওর হাতে রিপোর্টের খামটা ধরিয়ে দিয়ে তাকাল ওর দিকে, “আমি সরি, তোমায় বাড়ি নিয়ে যেতে পারছি না। আমার একটা কাজ পড়ে গিয়েছে। এখনই এয়ারপোর্টের দিকে যেতে হবে। তোমায় আমি একটা ক্যাব বুক করে দিচ্ছি। তুমি চলে যাও।”
“কিন্তু…” জিনি বলতে গেল।
কবি ভুরু কুঁচকে বলল, “কিন্তুর তো কিছু নেই। আমি তো রিপোর্ট নিয়ে এলাম। কাজটা জরুরি। তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, ক্যাব বুক করে দিচ্ছি, চলে যাও। অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।”
কী ছিল কবির গলায়? ওর উচ্চারিত শব্দের মধ্যে? বিরক্তিতে কুঁচকে থাকা ভুরুর মধ্যে? জিনির মনের ভেতরে যেন শব্দ করে ফেটে গেল হাজার হাজার মাইল মাটি। ও দেখল, দূরে গেটের কাছে সেই ছেলেটা আর মেয়েটা দু’দিকে মুখ করে বসে আছে চেয়ারে। পুলিশটা রাগী মুখে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে যেন। কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়ার ফুল ঝাঁট দিয়ে ফেলে দিচ্ছে বিরক্ত মুখের এক জমাদার। অশোক গাছের মাথায় আর কোনও টিয়া পাখি নেই।
জিনি বুঝল, আলো চলে গিয়েছে। আকাশের মতো মনেও জমছে পাটকিলে রঙের মেঘ! অন্ধকার নেমে আসছে। বৃষ্টি হবে? ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে সব?
