খ. বাচ্চু
বড়দিনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে বাতাসি আর আগের মতো নেই । সেই যখন ওদের প্রথম বিয়ে হয়েছিল বাতাসি নিজের শাড়ির খুঁটের সঙ্গে বাচ্চুর জামার কোনা বেঁধে ঘুমোত। বাচ্চুকে কাজে বেরোতে দিত না ৷ কান্নাকাটি করত। কাজ থেকে ফিরলে বাচ্চুকে জড়িয়ে ধরে থাকত কতক্ষণ! বাচ্চু কিছুতেই বুঝতে পারত না, কেন মেয়েটা এরকম ভালবাসে ওকে!
ছোটবেলা বাচ্চুর মা নেই ৷ থেকেই। বাবা আবার বিয়ে করেছিল। তার পর নতুন বউকে নিয়ে চলে গিয়েছিল ভাগলপুর। বাচ্চুকে রেখে দিয়ে গিয়েছিল মামার বাড়িতে।
বাচ্চুর চার মামা। চার জনই ভাল মানুষ। জমিজমা ছিল মামাদের। বছর- ভর চাষ হত। খাওয়া-পড়ার অভাব ছিল না। মামিরাও সবাই খুব ভাল ছিল। এমন বাড়ি বাচ্চু কোনও দিন দেখেনি, যেখানে এমন মিলমিশ রয়েছে সবার মধ্যে। মামারা শুধু চাইত বাচ্চু পড়াশোনা করুক!
বাচ্চু চেষ্টা করত, কিন্তু সত্যি বলতে কী, মাথায় কিছুই ঢুকত না ওর! নিউটন, পাস্কাল, আভাগাড্রো, ডালটন- কত নাম, বাপ রে বাপ! এই লোকগুলোর কি খেয়েদেয়ে কোনও কাজ ছিল না যে, এ সব আবিষ্কার- , টাবিষ্কার করে গিয়েছে! আর করেছিস ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের এ সব জানতে হবে কেন? আর জানলেও মনে রাখতে হবে কেন? এই জীবনে বেঁচে থাকায় ডালটন কিসে লাগে? বাঁদরের বাঁশ বেয়ে ওঠানামার বাঁদরামি কিসে লাগে! কিসে লাগে ফ্লেমিং-এর লেফট হ্যান্ড রুল!
তার ওপর ওই পরীক্ষা! বাপ রে বাপ! এ দিয়ে কি আদৌ কিছু মাপা যায়! সব মানুষ তো আলাদা আলাদা । সবার আলাদা আলাদা গুণ থাকে। কিন্তু সে সব না দেখে একটা সিলেবাস তৈরি করে সবাইকে এক পাতে বসিয়ে থালায় করে খেতে দেওয়া কেন? শিয়াল আর বক কি এক রকম? থালায় খেতে শিয়ালের সুবিধে হবে। কিন্তু বক? তার কী হবে? সে কী করবে? গাড্ডু পাবে?
“এই সমস্ত ব্যবস্থা বদলাতে হবে। খোলনলচে সমেত সবটা বদলাতে হবে। মানুষকে তার গুণ অনুযায়ী কাজে লাগালে তার উন্নতি হবে, সমাজের উন্নতি হবে, দেশের উন্নতি হবে। এর জন্য একদম মাটি থেকে আমাদের আন্দোলন শুরু করতে হবে। আমাদের এক হয়ে এক লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। ক্যাপিটালিজম চাইবেই সবাইকে এক ধাঁচে ফেলে একটা মেকানাইজ়ড ওয়ার্ক ফোর্স তৈরি করতে। তাতেই তাদের লাভ। গুণী মানুষ থাকলে তাদের বিপদ। কারণ, তা হলে তারা প্রশ্ন করবে অথরিটি নিয়ে। তাদের চ্যালঞ্জ করবে সব ব্যাপারে। তাই এমন করে সব এরা ছকে রেখেছে, যাতে ছোট থেকেই সবাই ওই এক ধরনের মানুষ তৈরি হয়। যেন কোল্ড ড্রিংকের বোতল! সব এক! এরা মানুষের মধ্যেকার সহজাত ট্যালেন্টকে ভয় পায় বলেই এমন করে । এমন করে। আমাদের এই ব্যবস্থাটাই পাল্টে পাল্টে দিতে হবে।
পৃথিবীতে নিজের ইচ্ছে ও যোগ্যতা মতো বেঁচে থাকাটা মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।”
ক্লাস টেনে পড়ার সময় কথাগুলো শুনেছিল বাচ্চু। যে বলছিল তার বয়স কত? বড়জোর একুশ-বাইশ তখন। গালে কামানো দাড়ি।
চোখে চশমা। গায়ে সাধারণ হাফ শার্ট আর টেরিকটের প্যান্ট। কাঁধে একটা ঝোলা। কথা বলার তেজে ছেলেটার কোঁকড়া চুল এসে পড়ছিল কপালে।
হাঁ করে দেখছিল বাচ্চু। ভাল কথাগুলো শুনতে । লাগছিল মুড়াপোঁতার বাজারের এক কোণে হচ্ছিল সভাটা। বাচ্চুকে মেজো মাইমা বাজারে পাঠিয়েছিল বগাদার দোকান থেকে আলু আর পেঁয়াজ কিনে আনার জন্য।
বগাদা ছিল না দোকানে। পাশের দোকানি ছেলেটা বলেছিল, “তুমি একটু দাঁড়াও, বগাদা একটু কাজে গিয়েছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এসে পড়বে।”
একা একা দাঁড়িয়েছিল বাচ্চু। সন্ধের বাজারে খুব একটা ভিড় ছিল না। শম্ভু ষাঁড় দোকানে ঘুরে ঘুরে নানান সব্জি খাচ্ছিল। সেটাই ও দেখছিল । দেখছিল, এক-একটা সব্জির দোকানে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে শম্ভু, আর সবাই কিছু না কিছু বাড়িয়ে দিচ্ছে!
কিছুক্ষণ দেখার পরে আর ভাল লাগছিল না। একা একা দাঁড়িয়ে বিরক্তই হচ্ছিল বাচ্চু। আর ঠিক তখনই মাইকে গলাটা শুনেছিল ও। শুনেছিল ক্যাপিটালিজম-টিজ়ম নিয়ে কী সব যেন বলছে একটা লোক। ক্যাপিটালিজ়ম!
জিনিসটা খবরের কাগজে পড়েছে ও। কিন্তু ঠিক কী জিনিস বুঝতে পারেনি। তাই কৌতূহলী হয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়েছিল । সাইকেলটা এক দিকে রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল ভিড়ের মধ্যে। আর অবাক হয়ে দেখেছিল আরে, এ লোক কোথায়! এ যে একটা ছেলে!
সভা ভাঙার পরে পাশে দাঁড়ানো একটা ছেলেকে বাচ্চু জিজ্ঞেস করেছিল, “দাদা, ইনি কে?” ,
ছেলেটা বলেছিল, “চালকলের মালিক যে হারু ঘোষ, তার ভাই। জগন্নাথ ঘোষ।”
দু’দিন পরে মণি নদীর পাশের ইটভাটার কাছে বিকেলে খেলছিল বাচ্চু আর ওর বন্ধুরা। তখনই দূর থেকে জগন্নাথকে যেতে দেখেছিল বাচ্চু। ফুটবল ছেড়ে ও দৌড়ে গিয়েছিল জগন্নাথের দিকে ।
জগন্নাথ ওকে দেখে থমকে গিয়েছিল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী চাই ভাই?”
বাচ্চু সোজাসুজি বলেছিল, “আমার নাম বাচ্চু। বাচ্চু বর্ধন। আমাকে আপনার দলে নেবেন?”
“দলে? কোন দলে?” জগন্নাথ ফুটবল খেলতে থাকা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “ইস্টবেঙ্গল না মোহনবাগান?”
“না, মানে পার্টি। আপনাদের পার্টি। সে দিন বাজারে বলছিলেন। আমার এত ভাল লাগল! আমিও মানুষের জন্য কাজ করতে চাই!” বাচ্চু চোখ বড় বড় করে বলেছিল ।
জগন্নাথ একটা বিড়ি ধরিয়ে ‘তুই’ করে বলেছিল, “কঠিন কাজ কিন্তু। ছুটিছাটা নেই। টাকাপয়সাও পাবি না। গাধার খাটনি!”
“আমি নিজেকে কাজে লাগাতে চাই,” বাচ্চু কী বলবে বুঝতে না পেরে এটাই বলে দিয়েছিল।
জগন্নাথ বলেছিল, “সেটাই তো হওয়া উচিত রে বাচ্চু! কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার পরে সবাই অন্যকে নিজের অফিসে । কাজে লাগায়! ঠিক আছে, চলে আসিস আর তিয়াত্তরের ঘরের নামতা মুখস্থ করে আসবি। কুড়ির গুণিতক অবধি ।
তিয়াত্তরের নামতা! কেন! বাচ্চুর ইচ্ছে হলেও জিজ্ঞেস করেনি। ও সে দিনই রাতে গুণ করে করে তিয়াত্তর ঘরের নামতাটা লিখেছিল প্রথমে। তার পর মন দিয়ে মুখস্থ করেছিল ।
পরের দিন একটু বেলা করে গিয়েছিল পার্টি অফিসে। আগে বহুবার এর সামনে দিয়ে গেছে, কিন্তু সে দিনই প্রথম ভেতরে ঢুকেছিল। বাচ্চা একটা ছেলে ঘরে ঢুকেছে দেখে অনেকেই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল!
জগন্নাথ চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছিল। ওকে দেখে হাত তুলে ডেকেছিল কাছে। বাচ্চু পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। জগন্নাথ চা-টা শেষ করে বলেছিল, “নে, বল নামতা। পড়েছিস তো?”
বাচ্চু ঢোঁক গিলে চোখ বড় বড় করে সিরিয়াস গলায় শুরু করেছিল, “তিয়াত্তর এক্কে তিয়াত্তর। তিয়াত্তর দু’গুণে একশো ছেচল্লিশ । তিয়াত্তর…” তিন
জগন্নাথ চুপ করে তাকিয়ে শুনেছিল সবটা। গোটা নামতাটা বলে বাচ্চু নার্ভাস মুখে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
জগন্নাথের মুখে আস্তে আস্তে ফুটে উঠেছিল হাসি। ও বলেছিল, “বাব্বা! সত্যি মুখস্থ করেছিস যে! আমিই তো জানি না! হাবিজাবি ভুলভাল বললেও বুঝতে পারতাম না । ”
“অ্যাঁ!” বাচ্চু হাঁ হয়ে গিয়েছিল।
“গুড বয়! আসিস এখন থেকে। তোকে নিয়ে নিলাম,” জগন্নাথ হাত বাড়িয়ে বাচ্চুর মাথার চুলটা ঘেঁটে দিয়েছিল।
সেই শুরু, তার পর বাইশ বছর জগন্নাথের সঙ্গেই আছে বাচ্চু। পার্টির নানান ওঠা-পড়া দেখেছে। সুন্দর মাইতির মতো কতজনকে দেখেছে পার্টি ছেড়ে অন্য দলে চলে যেতে। যে- জগন্নাথকে মানুষের জন্য এক রকম নিবেদিত প্রাণ হিসেবে ভেবেছিল, দেখেছে সে-ও খুব সোজা মানুষ নয় ৷ দেখেছে, পার্টিতে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য দু’জন জেলাস্তরের নেতাকে সরিয়ে দিয়েছে জগন্নাথ । পার্টিতে নিজেকে কাজের ছেলে প্ৰমাণ করার জন্য বাচ্চুর সামনে বিরোধীদের ন’জনকে খুন করিয়েছে জগন্নাথ। এ ব্যাপারে বিহারি হল জগন্নাথের ডান হাত।
একা পেয়ে বিহারিকে জিজ্ঞেস করেছিল বাচ্চু, “তুই যে এ সব করিস, ভয় লাগে না তোর?”
বিহারি হেসে বলেছিল, “আমি না করলে অন্য কেউ করবে! আমি চান্স ছাড়ব কেন? আমায় শুধু প্রধান হতে হবে। তার পর জেলাস্তরে যেতে হবে। জগন্নাথদা কাজের মানুষ ৷ গ্যাস বেলুনের মতো। অনেক উঁচুতে যাবে।
তার লেজে বেঁধে পড়লে আমিও অনেক দূর যাব, বুঝলি?”
“এই জন্য তুই পার্টি করতে এসেছিস? মানুষের সেবার জন্য নয়?” বাচ্চু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
ওদের কথা হচ্ছিল মণি নদীর ধারে, সরু একটা নৌকোয় বসে ।
ছোট্ট হয়ে যাওয়া বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে সেটা টোকা মেরে জলে ফেলে দিয়ে বিহারি বলেছিল, “ পলিটিক্স আমার কাছে কেরিয়ার। বুঝলি? জানবি সবার কাছেই এটা কেরিয়ার। পলিটিক্স শুধু সেবা হলে মানুষজন নেতা-মন্ত্রী হয়ে মাইনে, লাল নীল আলো লাগানো গাড়ি, হাজার সুযোগ সুবিধে নিত না। সবটাই বিনে পয়সায় করত। করে কি? করে না। তার ওপর ক্ষমতার জায়গায় থাকলে কলাটা-মুলোটা হয়। উপরি তার লেজে বেঁধে পড়লে আমিও অনেক দূর যাব, বুঝলি?”
“এই জন্য তুই পার্টি করতে এসেছিস? মানুষের সেবার জন্য নয়?” বাচ্চু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
ওদের কথা হচ্ছিল মণি নদীর ধারে, সরু একটা নৌকোয় বসে ।
ছোট্ট হয়ে যাওয়া বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে সেটা টোকা মেরে জলে ফেলে দিয়ে বিহারি বলেছিল, “ পলিটিক্স আমার কাছে কেরিয়ার। বুঝলি? জানবি সবার কাছেই এটা কেরিয়ার। পলিটিক্স শুধু সেবা হলে মানুষজন নেতা-মন্ত্রী হয়ে মাইনে, লাল নীল আলো লাগানো গাড়ি, হাজার সুযোগ সুবিধে নিত না। সবটাই বিনে পয়সায় করত। করে কি? করে না। তার ওপর ক্ষমতার জায়গায় থাকলে কলাটা-মুলোটা হয়। উপরি পাওনা হয়। হিসেবের বাইরে যে একটা বিশাল কালো রঙের টাকার সমুদ্র আছে, সেখান থেকে ট্যাঙ্কারে করে সেই কালো জল আসে! বুঝেছ খোকা? সেবা! শালা এমন ঢ্যামনামো দেখলে পুটকি জ্বলে যায়! ভাগ! তুই কী করতে এসেছিস রে পলিটিক্সে?”
বাচ্চু প্ৰথমে এসেছিল ওই ক্যাপিটালিজ়ম কী জানতে। মানুষের দুঃখকষ্ট লাঘব করতে। ক্রমে বুঝেছে ওটা সোজা ব্যাপার নয়। তার পর জগন্নাথের সঙ্গে থাকতে ভাল লাগত বলে থেকেছে। দেখেছে লোকে একটু গুরুত্ব দেয়। তেলে-জলে ভিজিয়ে কথা বলে। কিন্তু তারও পরে আর-একটা কারণে জগন্নাথের সঙ্গে সঙ্গে থেকেছে ও। সেটা হল লীলা!
পাশের গ্রাম মুক্তদহর মেয়ে লীলা। দশ গাঁ ঘুরলেও এমন সুন্দরী কাউকে কোনও দিন চোখে লাগেনি বাচ্চুর। ওটা গায়ের রং নাকি মাখন? টানা টানা চোখ। নাকের পাটায় নীল পাথরের নাকছাবিটা মুখ তুলে হাসার সময় রোদ্দুরে এমন ঝিলিক দেয় যে, বাচ্চুর রীতিমতো গুলিয়ে যায় সব। আর হাঁটার সময় শাড়ির তলা দিয়ে অল্প বেরিয়ে থাকা পায়ের পাতা দেখলে মনে হয় ওই পায়েই নিজের জীবনটা দিয়ে দেয় ।
গরিব বাড়ির মেয়ে লীলা। কিন্তু রূপে অন্ধ হয়ে হারু ঘোষ বিয়ে করে এনেছিল। দূর থেকে আগেই লীলাকে দেখেছিল বাচ্চু। কিন্তু কাছে যেতে পারেনি। এখন জগন্নাথের সঙ্গে থাকার সুবাদে ওদের বাড়ি যেতে পারে। লীলাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়। বৌদি বলে ডাকে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, মনে কু চিন্তা আসে!
নিজেকে সেই জন্য গালি দেয় বাচ্চু। কিন্তু মানুষের মন হল আস্তাকুঁড়। বকাঝকা থোড়াই কেয়ার করে সে! ক্লাস টুয়েলভের পরে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল বাচ্চু। সারাক্ষণ জগন্নাথের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। বাড়িতেও ফিরত না। খেতে আসত না। কাউকে কিছু জানাতও না । মামা-মাইমারা দেখছিল যে, ছেলে সারাক্ষণ উড়ু উড়ু করছে। কথা শুনছে না। একে তো বেঁধে রাখা যাবে না ।
ভাগলপুরে চিঠি লিখেছিল বড় মামা। জানিয়েছিল কী হাল। বাবা পাত্তা দেয়নি। উত্তর দিয়েছিল, “ও তোমাদের পাঁঠা, তোমরা ল্যাজে কাটো বা মুড়োয়, তোমাদের ব্যাপার। টাকা লাগলে বোলো, সাধ্য মতো দেব।” মাইমারা তাই আদিম পদ্ধতির দ্বারস্থ হয়েছিল। কাজকর্ম না থাকলেও বাতাসির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল বাচ্চুর।
বাতাসি খুব ভালবাসত বাচ্চুকে। মানে একদম চোখের আড়াল করত না । বেঁধে রাখত। এমনকি, নিজেই গিয়েছিল জগন্নাথের কাছে। তদবির করেছিল বাচ্চুর চাকরির। বলেছিল, “জগন্নাথদা, ওকে একটা কিছু কাজ দিন। মামাদের কাছে হাত পাততে বড্ড মানে লাগে। ওর তো দু’কান কাটা। কিন্তু ওকে কেউ ছোট চোখে দেখলে আমার বড় কষ্ট হয়।”
বাচ্চু জানত জগন্নাথের কাজের চেয়ে আন্দোলনের দিকে ঝোঁক বেশি। কিন্তু বাতাসি এমন করে বলেছিল যে, আর ‘না’ করতে পারেনি ।
নিজের দাদার চালকলের শ্রমিকদের কাজের ব্যাপার নিয়ে জগন্নাথের নানান অসন্তোষ থাকলেও, শেষমেশ সেখানেই ওকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
আর সত্যি বলতে কী, কাজ আর বাতাসির ভালবাসায় সব কিছু ঠিকও হয়ে গিয়েছিল বাচ্চুর। লীলার কথাও মনে পড়ত না সে ভাবে।
তার পর বিয়ের দেড় বছরের মাথায় একটা ছেলে হল ওদের। দেখা গেল ছেলেটার পায়ের একটা সমস্যা আছে। তার পরের বছর হল একটা মেয়ে। কিন্তু চার মাস বয়সেই চলে গেল মেয়েটা ।
এর দু’বছর পর আবারও একটা ছেলে হল। কিন্তু সে-ও থাকল না । দেড় বছর বয়সে পুকুরে ডুবে মারা গেল আচমকা ৷
তার পর থেকে বাতাসি কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ বিড়বিড় করে। কাঁদে। খায় না। নিজের জীবিত একমাত্র ছেলের দিকে মন নেই। মাঝে মাঝে ফিটও হয়ে যায়। আবার মাঝে মাঝে নাকি ঠাকুরে ভর করে। পাড়ার লোকে ঝেঁটিয়ে আসে তখন। মা মা বলে কেউ পায়ে পড়ে! টাকা, শাড়ি, ফল, চাল দিয়ে যায়। কেউ আবার জল- পড়া নিয়ে যায় । নখদর্পণ করায়।
দূর থেকে বসে বাচ্চু দেখে শুধু। বোঝে, ওর আর কিছু করার নেই। নিজের ছেলেটা বড় হচ্ছে। কিন্তু তাকেও যেন সামলাতে পারে না ও। পাশের ঘরের মামাতো দাদা-বৌদি নিজেদের কাছে রাখে ছেলেকে!
এই সময় থেকেই বাচ্চুর মদের নেশাটা শুরু হয়েছিল। সাট্টার আড্ডাতেও এই সময় থেকেই যাচ্ছিল। ও বুঝত, আসলে ওর জীবনে আর কিছু নেই!
বাতাসি কাছে ঘেঁষতে দেয় না। পার্টিতেও কেউ পাত্তা দেয় না! শুধু মদ খেলেই যা ভাল লাগে একটু। মাথার ভেতর সব ফাঁকা হয়ে যায়। তখন পাখির মতো লাগে নিজেকে। মনে হয় এই সব ছেড়ে উড়তে উড়তে অনেক দূরে চলে যাবে ও ।
কিন্তু ইদানীং একটা সমস্যা হয়েছে। সেটা হল সাট্টার ঠেকে বিশাল দেনা হয়ে গিয়েছে! প্রায় আঠারো হাজার টাকা ।
ঠেক চালায় বিহারির ভাই ন্যাপা । খুব খতরনাক ছেলে। ওকে বলেছে জলদি টাকা না দিলে ও আর থাকবে না! ন্যাপা কাউকে পরোয়া করে না । যা খুশি তাই করতে পারে। সেই থেকে ভয়ে ভয়ে আছে বাচ্চু ।
বিহারির সঙ্গেও এই নিয়ে কথা বলেছিল বাচ্চু। বলেছে, “বিহারি, তুই কিছু কর ভাই। ন্যাপাকে শালা বিশ্বাস নেই!”
বিহারি সব শুনে শুধু হেসেছে। বলেছে, “তুই আমার বন্ধু। তোকে আমি পছন্দ করি । তাও বলছি, বিজ়িনেস ইজ় বিজ়িনেস! আঠারো হাজার বাকি! আমার কাছে দু’হাজার বাকি রেখে দেখ কী করি!”
টাকাটা খুব দরকার বাচ্চুর। গতকাল এসে আল্টিমেটাম দিয়ে গিয়েছে ন্যাপা ।
বাতাসির কাল খুব শরীর খারাপ ছিল। বিকেলে ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল। মামার বাড়ির এক পাশেই মামারা ওকে দুটো ঘর করে দিয়েছে। সেখানেই থাকে ওরা।ওষুধে কাজ দিয়েছিল। শরীরের খানিকটা আরাম হওয়ায় বাতাসি রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
তার পর সব ঠিক আছে বুঝে বাইরে এসে বসেছিল বাচ্চু। চারিদিকে সব কেমন যেন গুলিয়ে গিয়েছে। ওর মাথাটা ভোঁতা ভোঁতা লাগছিল। কী করলে যে শান্তি পাবে, বুঝতে পারছিল না।
শেষে কিনা জগন্নাথ এমন করল! হ্যাঁ, ও বলত বটে জগন্নাথকে রতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে। কিন্তু তা যে পার্টি অফিসের মধ্যে করবে, সেটা বুঝতে পারেনি।
সেদিন সন্ধেবেলা জগন্নাথকে পার্টি অফিসে একা রেখে বেরিয়ে গেলেও আবার পরে ফিরে এসেছিল বাচ্চু। ওর খইনির ডিবেটা ফেলে গিয়েছিল যে । কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারেনি। দরজা বন্ধ ছিল। আর দরজার ওই পার থেকে যে-আওয়াজ আসছিল, সেটা তো অচেনা নয়!
বৃষ্টির মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে বাচ্চু বন্ধ জানলার ভাঙা কপাটের মধ্য দিয়ে চোখ রেখেছিল। দেখেছিল, জগন্নাথ আর রতি টেবলের ওপর উস্তুম কুস্তুম করছে! মনে হচ্ছিল দু’জন যেন দু’জনকে ছিঁড়ে ফেলে চামড়া আর মাংসের ভেতর থেকে হাড় বের করে আনবে! ও বুঝেছিল লীলা ভুল কিছু সন্দেহ করেনি ।
হ্যাঁ লীলা, হারু ঘোষের বউ। কিছুদিন আগে বাড়ির কাজের ছেলেটাকে দিয়ে লীলা ডেকে পাঠিয়েছিল বাচ্চুকে লীলা ডাকছে! ওকে! কেন? বাচ্চু একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। তবে সত্যি বলতে কী, ভালও লেগেছিল বেশ । লীলার এখন বয়স হয়ে গিয়েছে। তাও যে সুন্দর, তাকে বয়স আর কী করতে পারে! লীলার সামনে গেলে এখনও বুক কাঁপে বাচ্চুর। কিন্তু লীলা ওকে সে ভাবে পাত্তা দেয় না। ঠিকই করে। কেন দেবে পাত্তা! কে ও! সম্রাজ্ঞী কখনও কাগজ কুড়িয়ে বেড়ানো ছেলেকে পাত্তা দেয়!
কিন্তু ও যদি কেউ না হবে, তা হলে লীলা ওকে ডাকল কেন?
লীলা দুপুরের খাবার খেয়ে রোদে চুল মেলে বসেছিল লম্বা দালানে। বাচ্চু গিয়ে দাঁড়াল মাথা নিচু করে।
দুপুরের রোদে জোর ছিল না তেমন। কেমন ফ্যাকাসে চায়ের মতো আলো। দালানের পাশেই বড় ছাতিম গাছ। সেখানে একটা পাখি বসে গলা ফাটিয়ে কাকে ডাকছিল কে জানে!
লীলার হাতে বেতের গোল ফ্রেমে বন্দি একটা কাপড়। তাতে সুচ দিয়ে লীলা কী একটা নকশা তুলছিল। মাথা নাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নাকের নীল পাথরটা আলোর কুঁচি ছুড়ে মারছিল দালানের এদিক-ওদিক। ইচ্ছে হলেও ভাল করে তাকাতে পারছিল না বাচ্চু। লীলা বলেছিল, “একটা কাজ আছে। করতে পারবে?”
“পারব,” বাচ্চু ক্ষীণ গলায় মাথা নেড়েছিল ।
লীলা বলেছিল, “কেউ যেন জানতে না পারে। তোমার সাহেবের কাজ। কিন্তু আমাকেই খবর দেবে। আর কেউ জানলে তোমার বিপদ হবে, বুঝেছ?”
“আজ্ঞে,” মাথা নেড়েছিল বাচ্চু।
লীলা সময় নিয়েছিল। পাখিটা চিৎকার করে ফাটিয়ে দিচ্ছিল দশদিক! ‘যা যা যা যা,’ এমন একটা স্বরে ডাকছিল পাখিটা। কী পাখি এটা? আর ‘যা’ মানে? ওকে কি চলে যেতে বলছে? কেন বলছে?
লীলা বলেছিল, “আমার ঠাকুরপো জগন্নাথ। তার সঙ্গে তো তোমার খুব ভাব। চ্যালাই বলে তো সবাই তোমায়। তাই না?”
বাচ্চু বলেছিল, “জগন্নাথদা আমায় খুব ভালবাসে।”
“তারই খবর নিতে হবে। গোপনে খবর নিতে হবে যে, কোন মেয়ের পাল্লায় সে পড়েছে! কাকপক্ষী যেন টের না পায়! বুঝেছ?” লীলা এবার মুখ তুলে তাকিয়েছিল বাচ্চুর দিকে ।
বাচ্চু নামিয়ে নিয়েছিল চোখ। সূর্যের দিকে সাধারণ মানুষ তাকিয়ে থাকতে পারে নাকি?
লীলা একটা তেপায়া টেবিল দেখিয়েছিল হাত দিয়ে। দালানের এক পাশে রাখা। লীলা বলেছিল, “ওই খামটা তোমার। হাজার টাকা আছে। ঠিক খবর আনলে আরও হাজার দেব। বুঝেছ? যাও।” নিয়ে আর বাচ্চু খামটা তুলে নিয়ে দাঁড়ায়নি।
কয়েক দিন পর এসেছিল সেই বৃষ্টির সন্ধেবেলা । ছেলের শরীর খারাপের খবর পেলেও ওই দৃশ্য দেখে আর সময় নষ্ট করেনি বাচ্চু। জানত, বাড়িতে মামাতো দাদা-বৌদিরা সামলে দেবে ছেলেকে। ওর অন্য দরকারি কাজ আছে।
পার্টি অফিসের বাইরে থেকে সাইকেল নিয়ে ভিজে ভিজে সোজা লীলার কাছে গিয়েছিল বাচ্চু। শীত লাগছিল। কিন্তু ও সব পাত্তা দেয়নি। লীলা ওকে একটা কাজ বলেছে আর সেটা করতে পেরেছে, এটাই কি কম নাকি? আর টাকাটাও একটা ব্যাপার বটে ।
লীলার কাজের লোকটিকে ও বলেছিল খুব জরু দরকার। এখনই দেখা করতে হবে বৌদির সঙ্গে
কাজের ছেলেটি ওকে একটা গামছা দিয়ে গা-মাথা মুছতে বলে অপেক্ষা করতে বলেছিল। একটু পরেই লীলা ওকে ডেকেছিল নিজের ঘরে। নিজের ঘরে! বাচ্চুর বুকের মধ্যে যেন ফড়িং উড়ছিল! লীলার ঘরে যাবে ও!
ঘরের বাইরে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানিয়েছিল বাচ্চু।
“ভেতরে এসো।”
ও লীলার গলা পেয়েছিল পর্দার ও-পার থেকে।
ঘরে ঢুকে ইলেকট্রিকের আলোয় চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল বাচ্চু। কী সুন্দর ঘর! সেগুন কাঠের আসবাব। ঝালর কাটা পর্দা। আয়নায় ক্রোশের কাজ করা ঢাকনা। ঘরের কোণে ধূপ জ্বলছিল। সারা ঘরে কেমন একটা আচ্ছন্ন করা সুগন্ধ!
লীলা তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর বলেছিল, “বলো।”
বাচ্চু ঠোঁট চেটে প্রস্তুত করেছিল নিজেকে। তার পর বলেছিল, “রতি।”
“মানে?” লীলা তাকিয়েছিল। চোখ দুটো জ্বলছিল যেন।
বাচ্চু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সবটা খুলে বলেছিল লীলা কাঁপছিল রাগে। চোয়াল শক্ত করছিল বার বার। মাথার দু’পাশের রগ দুটো ফুলে ফুলে উঠছিল।
লীলা সব শুনে বলেছিল, “রতি! ও আজকাল ওখানে আটকেছে! হারামি শালা! ঠিক আছে।”
আর-একটা খাম নিয়ে ফিরে এসেছিল বাচ্চু। শুধু আসার আগে লীলা বলেছিল, “আমি আবার খবর দেব তোমায়।”
কিন্তু কী খবর দেবে লীলা? বাড়ির দাওয়ায় বসে সেই রাতে ভাবছিল বাচ্চু। ঠান্ডা ছিল বেশ। তবু মাথাটা এমন গরম হয়েছিল যে, সে সব কিছু খুব একটা মালুম হচ্ছিল না। ও আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল নানান আলোর বিন্দুর মাঝে লাল রঙে ছোট্ট আলোর মতো একটা গ্রহ। মঙ্গল গ্রহ। যেন ছোট্ট আলোর মতো একটা গ্রহ। মঙ্গল গ্রহ। যেন আকাশের বুকে জেগে উঠেছে কারও তিল! নাকি চোখ! ওর মনে হল ঈশ্বর কি লাল চোখ দেখাচ্ছেন ওকে! সত্যি কি আছেন ঈশ্বর!
এমন সময় একটা মোটরবাইকের আওয়াজ পেয়েছিল বাচ্চু। দেখেছিল বাইক নিয়ে সোজা উঠোনে ঢুকে পড়েছে ন্যাপা ৷
বাচ্চু উঠে দাঁড়িয়েছিল ভয়ে। সর্বনাশ!
ন্যাপা বলেছিল, “আমি শুধু একটা কথা বলতে এলাম। আর এক সপ্তাহের মধ্যে আমার টাকা না দিলে তোর পেছনে বাঁশ দিয়ে বাজারে টাঙিয়ে দেব দিনের বেলা। মনে থাকে যেন! লাস্ট ওয়ার্নিং।”
আজ ছ’নম্বর দিন। কাল ন্যাপার দেওয়া সময় শেষ হচ্ছে। ভেবে ভেবে পাগল হচ্ছিল বাচ্চু। শেষে ভেবেছিল বৌয়ের গয়না দিয়ে দেবে। কিন্তু না, তা হয়তো করতে হবে না। ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছেন। লীলা ডেকেছে ওকে। চোখ চকচক করে উঠেছিল বাচ্চুর। লীলা। হ্যাঁ, লীলার কাছেই ধার চাইবে কাজের ছেলেটা আজ বাচ্চুকে আর ওপরে নিয়ে যায়নি। নীচের একটা ঘরে দাঁড় করিয়ে রেখে দরজাটা ভেজিয়ে রেখে গিয়েছে।
এই ঘরটা ছোট। আলো-বাতাস কম। একটা জানলা আছে বটে, কিন্তু সেটা বন্ধ। দিনের বেলাতেও মাথার ওপর একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। আজ বেশ ঠান্ডা। সাতদিনের মাথায় বড়দিন। ঠান্ডা তো পড়বেই!
আচমকা দরজাটা ক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। বাচ্চু ঘুরে দেখল লীলা এসে ঢুকেছে। লীলা ঘরে ঢুকে ওকে একবার দেখল। তার পর পেছন ঘুরে দরজা ভেজিয়ে দিল আবার। লীলাকে আজ কেমন যেন লাগছে! এলোমেলো, ক্লান্ত। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনও যুদ্ধ থেকে এসেছে! লীলা কাছে এসে দাঁড়াল আজ। বাচ্চু একটু কুঁকড়ে গেল। কেমন একটা ভাপ লাগছে যেন!
লীলা আঁচলটা ঠিক করল। তার পর বলল, “বাচ্চু, তোমায় একটা কাজ করতে হবে। খুব গোপন কাজ । পারবে? এর জন্য তোমায় পঁচিশ হাজার টাকা দেব। বলো, পারবে?”
পঁচিশ! বাচ্চু হাঁ হয়ে গেল।
“কী হল, বলো?” লীলা আচমকা বাচ্চুর হাত ধরে ঝাঁকুনি দিল একটা।
বাচ্চু কেঁপে উঠল। লীলা স্পর্শ করল ওকে!
“বলুন,” বাচ্চু তাকাল লীলার দিকে।
লীলা দম ধরে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার পর বলল, “জগন্নাথকে সরিয়ে দিতে হবে।”
“মানে, মেরে ফেলতে হবে?” বাচ্চু কেঁপে উঠল এবার। এ সব কী বলছে লীলা?
লীলা বলল, “হ্যাঁ। ও আমাদের অনেক ক্ষতি করে দিচ্ছে! অনেক। তোমার সাহেব আর পারছেন না! তা ছাড়া আরও নানান কারণ আছে। বীরেন্দ্র ত্রিবেদী নামে একটা লোক এখানে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি করতে চায়। জগন্নাথ সেটাও হতে দিচ্ছে না। এতে তো বাবুরও অসুবিধে হচ্ছে। ব্যবসার ব্যাপার তো!
তোমায় সরাসরি কিছু করতে হবে না। তোমাদের বিরোধীদের কাজে লাগালেই হবে। শুনেছি সেতু না কে আছে! তাকে যদি তুমি বলো…”
লীলা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। অত বড় বড় চোখ! নাকের পাটা উত্তেজনায় ফুলে ফুলে উঠছে! নীল পাথরটা যেন সাপের চোখের মতো তাকিয়ে আছে ওর দিকে! গায়ে আচমকা কাঁটা দিল বাচ্চুর। পঁচিশ হাজার টাকা!
লীলা আবার বলল, “কেউ জানবে না। সেতু আর তুমি। পঁচিশ হাজার। ভাবো। পারবে?”
বাচ্চু চোয়াল শক্ত করল। কাল আঠারো দিতে হবে। তার পরও হাতে থাকবে সাত। জগন্নাথ ওর কে? এতদিন পার্টি করে কী লাভ হয়েছে ওর? কাঁচকলা। তা হলে?
বাচ্চুর মনের মধ্যে কেমন করছে! অতগুলো টাকা! ছেড়ে দেবে! কালাচাঁদকে তো মেরেছিল বিহারি আর জগন্নাথ। সেতুরা তার প্রতিশোধ নেবে। অসুবিধে কী আছে! আর এর মধ্যে ও কোথাও নেই ।
লীলা এবার অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হল? বলো?”
বাচ্চু জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল একটু। তার পর বলল, “পঁয়ত্রিশ হাজার। আজকেই চাই। আর… ‘ “
“ঠিক আছে পঁয়ত্রিশ। আজকেই,” লীলা যেন মরিয়া হয়ে রাজি হয়ে গেল একবারে, “কিন্তু দ্রুত কাজ চাই। সাত-আট দিনের মধ্যেই। নতুন বছরে বীরেন্দ্র আসবে। এসে যেন কাজ সারতে পারে।”
“শুনুন, আর-একটা শর্ত আছে,” বাচ্চু লীলার চোখ থেকে চোখ সরাল না। শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে ওর। গলা শুকনো।
“কী, বলো?” লীলা তাকাল ।
“দেখব। শুধু একবার। আপনার বুক দুটো একবার দেখব,” বাচ্চু সামান্য হাঁপাচ্ছে উত্তেজনায়।
“কী!” লীলা যেন বুঝতে পারল না!
“বুক দুটো দেখব একবার। অনেক দিনের ইচ্ছে… একবার…” বাচ্চুর শ্বাস ঘন হয়ে এল আরও।
“শয়তান! এত বড় সাহস!” লীলা ফোঁস করে উঠল।
“মার্ডার করতে বলছেন নিজের দেওরকে। সেটা কি কম সাহস হল? আমি কী এমন বেশি চেয়েছি? শুধু তো দেখব। সেই কবে থেকে ইচ্ছে! একবার মাত্র । না হলে বলে দিন আমি চলে যাই।”
লীলা তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
বাচ্চু বলল, “আমি তা হলে এলাম।”
“দাঁড়াও,” লীলা চোয়াল শক্ত করল, “আমায় ছোবে না কিন্তু।”
“দেখব শুধু। আর কিছু না,” বাচ্চুর গলায় কোথা থেকে যে এত সাহস এসেছে, ও নিজেই বুঝতে পারছে না।
লীলা চোয়াল শক্ত করল। মাথার দু’পাশের রগ ফুলে উঠছে ওর। লীলা গা থেকে প্রথমে চাদর, তার পর আঁচল সরিয়ে ব্লাউজ়ের হুকে হাত দিল।
বাচ্চুর মনে হচ্ছে বুকের মধ্যে বাজারের সেই শম্ভু ষাঁড়টা ঢুকে পড়ে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে! হারু ঘোষের স্ত্রী ওর সামনে বুকের কাপড় সরাচ্ছে! এই দৃশ্য ভেবে ও কতবার যে নিজেকে মোচন করেছে তার ঠিক নেই।
লীলা আস্তে আস্তে নীল রঙের ব্লাউজ়ের সামনের হুকগুলো খুলল। তার পর থমকাল এক মুহূর্ত। যেন নিজেকে প্রস্তুত করল এই অবস্থার জন্য। তার পর এক ঝটকায় জানলার পাল্লার মতো খুলে দিল সবটা।
ঘরের ঘোলাটে আলোটা যেন পিটপিট করে উঠল হঠাৎ। ঘরটাও কি কাত হয়ে গেল একটু! বাচ্চুর মুখ হাঁ হয়ে গেল। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লীলার উন্মুক্ত বুকের দিকে। দেখল, ডান বৃন্তের ওপরে মটরদানার মতো একটা লাল তিল! যেন আকাশের বুকে চকচক করছে মঙ্গল গ্রহ! ঈশ্বরের চোখ!
